📄 শত্রু বাহিনীর মধ্যে গুজব ছড়ানোর কৌশল
জোটবদ্ধ শত্রুসেনাদের পারস্পরিক একতা ও বিশ্বাস ধ্বংস করার লক্ষ্যে রসূলুল্লাহ সা. তাদের বিরুদ্ধে গুজব ছড়ানোর কৌশল গ্রহণ করেন। শত্রুপক্ষের সৈন্যরা মানসিকভাবে কতটা দুর্বল, তা রসূল সা. ভালোভাবেই জানতেন। তাই তিনি তাদের পারস্পরিক দ্বন্দ্বগুলোকে মানুষের সামনে এনে তাদের ভেতরকার বিদ্বেষগুলোকে পরিপূর্ণভাবে উস্কে দেওয়ার পদক্ষেপ নেন। পূর্বোক্ত আলোচনায় আমরা দেখেছি, রসূলুল্লাহ সা. মদীনার শস্য ইত্যাদির লোভ দেখিয়ে গাতফান নেতাদের যুদ্ধ থেকে নিবৃত্ত করার চেষ্টা করেছিলেন। আল্লাহ তাআলার অনুগ্রহে নুয়াইম ইবনে মাসউদ গাতফানী নবীজির কাছে এসে ঈমান আনেন। তিনি আবেদন করেন, ইয়া রাসুলাল্লাহ, আমি ইসলাম গ্রহণ করেছি। আমার গোত্র এ কথা জানে না। এখন আপনি আমাকে প্রয়োজনীয় যে কোনো নির্দেশ দিন। রসূলুল্লাহ সা. বললেন, 'আমাদের মধ্যে তুমিই একমাত্র ব্যক্তি যে শত্রুপক্ষের বিশ্বাসভাজন। তুমি যদি পার, আমাদের পক্ষ হয়ে শত্রুদের পর্যুদস্ত করো। যুদ্ধ তো কৌশলেরই নামান্তর। ১৮৯৩
রসূলুল্লাহ সা.-এর কথা মতো ইহুদি ও মুশরিকদের মধ্যে সন্দেহের বীজ বপন করতে থাকেন নুয়াইম। নুয়াইম ইবনে মাসউদ বনু কুরাইযা গোত্রের কাছে গেলেন। জাহিলী যুগে তিনি তাদের অন্তরঙ্গ বন্ধু ছিলেন। তিনি তদেরকে বললেন, হে বুন করাইযা, আমি তোমাদের কত ভালোবাসি তা নিশ্চয়ই তোমাদের জানা আছে। বিশেষ করে তোমাদের সাথে আমার যে নিখাদ সম্পর্ক রয়েছে, তা তোমাদের অজানা নয়। তারা বললো, হ্যাঁ, এ তো সত্য। তোমার বিরুদ্ধে আমাদের কোন অভিযোগ ছিল না। তিনি বললেন, কুরায়েש ও গাতফানের অবস্থা তোমাদের থেকে আলাদা। এ শহর তোমাদেরই শহর। এখানে তোমাদের স্ত্রী, সন্তান ও ধন-সম্পদ রয়েছে। এগুলো অন্যত্র সরিয়ে নেয়া তোমাদের পক্ষে সম্ভব নয়। কুরায়েש ও গাতফান মুহাম্মাদ ও তার সাহাবীদের সাথে লড়তে এসেছে। তোমরা তাদের সাহায্য সহযোগিতা করছো। অথচ তাদের আবাসভূমি, ধন-সম্পদ ও পরিবার-পরিজন অন্যত্র রয়েছে। সুতরাং তারা তোমাদের মত অবস্থায় নেই। তারা যদি এখানে স্বার্থ দেখতে পায় তাহলে তারা তা নেবে। আর যদি না পায় তবে নিজেদের আবাসভূমিতে চলে যাবে। তখন তোমরা এই শহরে একাকী মুহাম্মাদের সম্মুখীন হবে। এই অবস্থায় তার বিরুদ্ধে তোমরা টিকতে পারবে না। অতএব मुसलमानों সাথে লড়াই করতে হলে আগে কুরায়েশদের মধ্য হতে কতিপয় নেতাকে জিম্মি হিসেবে হাতে নাও। তারা তোমাদের হাতে জামানত হিসেবে থাকবে। তখন তোমরা নিশ্চিন্ত হতে পারবে। তাদেরকে সাথে নিয়ে মুহাম্মাদের সাথে লড়াই করা তোমাদের উচিত হবে না। তারা বললো, তুমি ঠিক পরামর্শ দিয়েছো।
এরপর নুয়াইস কুরায়েשদের কাছে গিয়ে আবু সুফিয়ান ও তার সহযোগী কুরায়েশ নেতৃবৃন্দকে বললেন, তোমরা নিশ্চয়ই জানো যে, আমি তোমাদের পরম হিতাকাঙ্ক্ষী এবং মুহাম্মাদের ঘোর বিরোধী। আমি একটা খবর শুনেছি। সেটা তোমাদেরকে জানানো আমার কর্তব্য। কথাটা তোমরা কারো কাছে প্রকাশ করো না। ইহুদীরা মুহাম্মাদ ও তার সঙ্গীদের সাথে তাদের সম্পাদিত চুক্তি লংঘন করে অনুতপ্ত হয়েছে। তারা মুহাম্মাদের কাছে বার্তা পাঠিয়েছে যে, আমরা যা করেছি তার জন্য অনুতপ্ত। এখন আমরা যদি কুরায়েש ও গাতফান গোত্রের নেতৃস্থানীয় কিছু লোককে পাকড়াও করে তোমার কাছে হস্তান্তর করি আর তুমি তাদের হত্যা করো তাহলে কি তুমি আমাদের ওপর খুশী হবে?
এরপর আমরা তোমার সাথে মিলিত হয়ে কুরায়েש ও গাতফানের অবশিষ্ট সবাইকে খতম করবো। এ কথায় মুহাম্মাদ রাজী হয়েছে। নুয়াইম আবু সুফিয়ানকে আরো বললেন, ইহুদীরা যদি তোমাদের কতিপয় লোককে জিম্মী রাখতে চায় তাহলে খবরদার কাউকে তাদের হাতে সোপর্দ করো না।
এরপর নুয়াইম গাতফানীদের কাছে গিয়ে বললেন, হে বনু গাতফান, তোমরা আমার স্বগোত্র ও আপনজন। তোমরা আমার কাছে সবার চাইতে প্রিয়। আমার বিরুদ্ধে নিশ্চই তোমাদের কোনো অভিযোগ নেই। তারা বললো, তুমি সত্য বলেছো। তোমার বিরুদ্ধে আমাদের কোন অভিযোগ নেই। নুয়াইম বললেন, তাহলে আমি যে খবর দিচ্ছি তা কাউকে জানতে দিওনা। তারা বললো, ঠিক আছে। তোমার কথার গোপনীয়তা রক্ষা করা হবে। নুয়াইম তখন তাদেরকে তাই বললেন যা তিনি কুরায়েשদের বলেছিলেন। তিনি তাদেরকেও জিম্মী না রাখার পরামর্শ দিলেন। ৮৯৪
টিকাঃ
৮৯০ আল বিদায়া ওয়ান নিহায়া: ৪/১১৩।
৮৯৪ সীরাতে ইবনে হিশাম।