📘 নবীজির যুদ্ধ জীবন পাঠ ও পর্যালোচনা > 📄 গাতফান নেতাদের সাথে নবীজির প্রস্তাবিত কর্মপন্থা

📄 গাতফান নেতাদের সাথে নবীজির প্রস্তাবিত কর্মপন্থা


গাতফান গোত্রের নেতাদের সাথে সন্ধিচুক্তির পরিকল্পনা গ্রহণ করে রসূলুল্লাহ সা. তার রাজনৈতিক দক্ষতার প্রমাণ দেন। রসূল সা. ভালোভাবেই বুঝতে পেরেছিলেন, গাতফান কাফেরদের সম্মিলিত এ বাহিনীর সাথে কোনো বিশেষ রাজনৈতিক উদ্দেশ্য বা উচ্চাভিলাসের কারণে আসেনি। তাদের উদ্দেশ্য শুধু মদীনায় লুটতরাজ করে নিজেদের কিছু ধন সম্পদ হাসিল করা। রসূলুল্লাহ সা. ইহুদি নেতা হুয়াই ইবনে আখতাব, কিনানা ইবনে রবী বা কুরায়েש সেনাপতি আবু সুফিয়ান ইবনে হারবের সাথে সন্ধি করার ইচ্ছা পোষণ করেননি। কেননা, তারা অর্থনৈতিক লোভ-লালসা বা সম্পদের মোহে যুদ্ধে লিপ্ত হয়নি। তারা ধর্মীয় ও রাজনৈতিক কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠার উদ্দেশ্যে যুদ্ধে নেমেছিল। তারা চেয়েছিল মদীনার ইসলামী রাষ্ট্র ধ্বংস হয়ে যাক। এ কারণেই রসূলুল্লাহ সা. শুধু গাতফান গোত্রের নেতাদের সাথে যোগাযোগ করেন। গাতফানের দুজন প্রভাবশালী নেতা উয়ায়না ইবনে হাসান ও হারেস ইবনে আউফ কোনো ধরনের চিন্তা-ভাবনা ছাড়াই রসূলুল্লাহ সা.-এর প্রস্তাবনা গ্রহণ করতে আগ্রহ প্রকাশ করে। তারা তাদের সমমনা কয়েকজন নেতাকে নিয়ে নবীজির কাছে উপস্থিত হয়। মুসলমানদের খননকৃত পরিখার পেছনে অত্যন্ত গোপনীয়তার সাথে তারা মতবিনিময় করে। রসূলুল্লাহ সা. তাদের সাথে সন্ধিচুক্তি সম্পর্কে আলোচনা করতে থাকেন। এই চুক্তি মূলত কৃষিজাত পণ্যের বিনিময়ে সম্পন্ন হয়েছিল। সন্ধিচুক্তির মূল ধারাগুলো ছিল নিম্নরূপ:
১. মুসলমান এবং শুধু গাতফান গোত্র যারা মিত্রবাহিনীর অংশ হিসেবে যুদ্ধে লিপ্ত হয়েছে তাদের মধ্যে এ সন্ধিচুক্তি হবে।
২. গাতফান ও মুসলমান একে অপরের বিরুদ্ধে কোনো ধরনের যুদ্ধ করবে না। (বিশেষত এই সময়ে)
৩. গাতফান গোত্রের লোকেরা মদীনার অবরোধ তুলে নেবে এবং নিজেদের এলাকায় ফিরে যাবে।
৪. কাফেরদের সঙ্গ ত্যাগ করলে এবং অবরোধ উঠিয়ে ফিরে গেলে এর বিনিময়ে তাদেরকে مسلمانوں পক্ষ হতে মদীনার উৎপাদিত ফসলের এক তৃতীয়াংশ দেওয়া হবে।৮৮২
ওয়াকিদী রহ. বর্ণনা করেন, রসূলুল্লাহ সা. গাতফান নেতাদের প্রস্তাব দেন, মদীনায় উৎপাদিত ফসলের এক তৃতীয়াংশ তাদের দেওয়া হলে তারা কাফের জোট বাহিনীর সঙ্গ ত্যাগ করবে কিনা? গাতফান গোত্রের উভয় নেতা রসূলুল্লাহ সা.-এর কাছে মদীনায় উৎপাদিত ফসলের অর্ধেক দাবি করে। তখন রসূলুল্লাহ সা. এক-তৃতীয়াংশের চাইতে বেশি দিতে অস্বীকৃতি জানান। শেষ পর্যন্ত তারা তাতে রাজি হয়। চুক্তি নিশ্চিত করার জন্য তারা তাদের গোত্রের দশজন লোককে নিয়ে রসূলুল্লাহ সা.-এর দরবারে আসে।৮৮৩
চুক্তির শর্তাবলী মেনে নেয় গাতফান নেতারা। এর মাধ্যমেই তাদের যুদ্ধে অংশগ্রহণের মানসিকতা আঁচ করা যায়। তারা কেবল সম্পদ ও মদীনার ফসলের লোভেই যুদ্ধে এসেছিল। সেনাবাহিনীর একটা বড় অংশে যদি সম্পদের মোহ থাকে, তাহলে যুদ্ধে পরাজয় অনিবার্য হয়ে ওঠে। রসূলুল্লাহ সা. শত্রুপক্ষের বিশাল একটি অংশের এই মানসিক অবস্থা পর্যবেক্ষণ করে একে মোক্ষম সুযোগ হিসেবে গ্রহণ করেন। এই দুর্বলতা কাজে লাগিয়ে জোটবাহিনীকে দুর্বল করে ফেলেন।৮৮৪
এই ঘটনা থেকে আমরা ভয়াবহ বিপদের মুখে মানসিকভাবে ভেঙে না পড়ে ধৈর্য ও বুদ্ধিমত্তার সাথে পরিস্থিতি মোকাবিলার শিক্ষা পাই। পাশাপাশি ভয়াবহ পরিস্থিতি থেকে মুক্তির লক্ষ্যে অপেক্ষাকৃত সহজ পদ্ধতি অবলম্বন করা এবং শত্রুর দিকে মৈত্রীর হাত বাড়িয়ে দেওয়ার নীতি শিখতে পারি।৮৮৫
রসূলুল্লাহ সা. চুক্তিনামায় স্বাক্ষরের পূর্বে সাহাবায়ে কেরামের সাথে পরামর্শ করেন। সাহাবায়ে কেরাম গাতফান গোত্রকে কোনোভাবেই মদীনার খাদ্যশস্য না দেওয়ার পরামর্শ দেন। আনসার গোত্রসমূহের নেতা সাআد ইবনে মুআয ও সাআد ইবনে উবাদা রসূলুল্লাহ সা.-এর সামনে আরজ করেন, ইয়া রসূলাল্লাহ, এটা কি আমাদের কল্যাণার্থে আপনার প্রস্তাব, না আল্লাহ আপনাকে এজন্য নির্দেশ দিয়েছেন যা আমাদের করতেই হবে? তিনি বললেন, 'এটা আমার নিজের উদ্যোগ। কারণ আমি দেখছি গোটা আরব ঐক্যবদ্ধ হয়ে তোমাদের ওপর সর্বাত্মক হামলা চালিয়েছে এবং সবদিক দিয়ে তোমাদের ওপর দুর্লংঘ্য অবরোধ আরোপ করেছে। তাই যতটা পারা যায় আমি তাদের শক্তি খর্ব করতে চাচ্ছি।'
সাআد ইবনে মুআয বললেন, ইয়া রসূলাল্লাহ, ইতোপূর্বে আমরা এবং এসব লোক শিরক ও মূর্তিপূজায় লিপ্ত ছিলাম। তখন আমরা আল্লাহকে চিনতাম না এবং আল্লাহর ইবাদাতও করতাম না। সে সময় তারা মেহমানদারী অথবা বিক্রয়ের সূত্র ছাড়া আমাদের একটা খোরমাও খেতে পারেনি। আর আজ আল্লাহ যখন আমাদেরকে ইসলামের গৌরব দান করেছেন, সত্যের পথে চালিত করেছেন, তখন তাদেরকে আমাদের ধন-সম্পদ দিতে হবে? আল্লাহর কসম, আমাদের এ চুক্তির কোন প্রয়োজন নেই। তরবারীর আঘাত ছাড়া তাদেরকে আমরা আর কিছুই দেবো না। এভাবেই আল্লাহ তাদের ও আমাদের ভাগ্য নির্ধারণ করে দেবেন।
রসূলুল্লাহ সা. বললেন, বেশ, তাহলে এ ব্যাপারে তোমার মতই মেনে নিলাম। এরপর সাআদ ইবনে মুআয চুক্তিপত্রটি হাতে নিয়ে সমস্ত লেখা মুছে ফেলে বললেন, ওরা যা পারে করুক। ৮৮৬
আনসারদের নেতা সাআد ইবনে উবাদা ও সাআد ইবনে মুআয রা. যদিও চুক্তির বিরোধী ছিলেন তবুও তাদের কথা থেকে রসূলুল্লাহ সা.-এর প্রতি আনুগত্য প্রকাশ পেয়েছে। তারা রসূলুল্লাহ সা.-এর প্রতি পরিপূর্ণ শিষ্টাচার বজায় রেখেই কথা বলেছিলেন। গাতফান গোত্রের সাথে সন্ধিচুক্তিটি তিন রকম হওয়া সম্ভব বলে তারা ভেবেছিলেন। তাদের কথা থেকে বোঝা যায় একেক ক্ষেত্রে তাদের মতামত হতো একেক রকম।
১. যদি এ সিদ্ধান্ত আল্লাহর পক্ষ থেকে এসে থাকতো, তাহলে এর বিরোধিতা করতেন না। আল্লাহর সিদ্ধান্তকে তারা অবনত মস্তকে মেনে নিতেন।
২. রসূলুল্লাহ সা. যদি কোনো সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলতেন, তাহলে তারা তা নিঃসংকোচে মেনে নিতেন এবং সে অনুযায়ী কাজও করতেন।
৩. যেহেতু مسلمانوں কল্যাণার্থে এটি ছিল রসূলুল্লাহ সা.-এর নিজস্ব সিদ্ধান্ত, তাই এ ক্ষেত্রে সাহাবায়ে কেরামের মতামত ব্যক্ত করার সুযোগ ছিল।
রসূলুল্লাহ সা.-এর কাছ থেকে প্রশ্ন করে সাআد ইবনে মুআয ও সাআد ইবনে উবাদা রা. জেনে নিয়েছিলেন যে, এই পরিকল্পনাটি তৃতীয় পর্যায়ভুক্ত প্রস্তাবনার অন্তর্ভুক্ত। রসূলুল্লাহ সা. মদীনাবাসীকে উদ্ভূত সংকট থেকে সহজে মুক্তি দেওয়ার জন্য এ ধরনের সিদ্ধান্ত গ্রহণ করতে চাচ্ছিলেন। আর সে প্রেক্ষিতেই সাআد ইবনে মুআয রসূলুল্লাহ সা.-এর সামনে নিজের বক্তব্য পেশ করেন। এতে গাতফান নেতারা মাথা নত করতে বাধ্য হয়। সাআد ইবনে মুআয রা. বলেছিলেন, ইয়া রসূলাল্লাহ, ইতোপূর্বে আমরা এবং এসব লোক শিরক ও মূর্তিপূজায় লিপ্ত ছিলাম। তখন আমরা আল্লাহকে চিনতাম না এবং আল্লাহর ইবাদাতও করতাম না। সে সময় তারা মেহমানদারী অথবা বিক্রয়ের সূত্র ছাড়া আমাদের একটা খোরমাও খেতে পারেনি। আর আজ আল্লাহ যখন আমাদেরকে ইসলামের গৌরব ও সম্মানে ভূষিত করেছেন, সত্যের পথে চালিত করেছেন, তখন তাদেরকে আমাদের ধন-সম্পদ দিতে হবে? আল্লাহর কসম, আমাদের এ সবের কোন প্রয়োজন নেই।
সাআد ইবনে মুআযের বক্তব্য ছিল যথার্থ। রসূলুল্লাহ সা. তার এই মতামত পছন্দ করেন। আনসারদের এ ধরনের দৃঢ় মনোবল ও উন্নত মানসিকতা দেখে তিনি গাতফান নেতাদের সাথে সন্ধিচুক্তি বাতিল করে দেন। ৮৮৭
রসূলুল্লাহ সা. সাহাবীদের উদ্দেশে বলেন, 'গোটা আরব একত্রিত হয়ে জোটবদ্ধ হয়ে তোমাদের ওপর আক্রমণ করে যাচ্ছে। ১৮৮৮
এ বক্তব্য থেকে বোঝা যায়, রসূলুল্লাহ সা. চেয়েছিলেন যেন গোটা আরবের অধিবাসী একত্রিত হয়ে কখনও مسلمانوں ওপর আক্রমণ না করে। তার এই পরিকল্পনা থেকে مسلمانوں জন্য যে দিকনির্দেশনা রয়েছে তা হলো: * শত্রুদের দুর্বল দিকগুলো চিহ্নিত করা مسلمانوں জন্য জরুরি। * প্রতিপক্ষ কয়েকটি গোত্র ও গোষ্ঠীর জোট হলে তাদের মধ্যে বিভেদ সৃষ্টির চেষ্টা করা উচিত।
এ ক্ষেত্রে ইসলামী রাষ্ট্রের বর্তমান ও ভবিষ্যতের উপকারী দিক বিবেচনা করে মুসলিম নেতাদের পরামর্শের ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত নেওয়া উচিত। ৮৮৯
রসূলুল্লাহ সা. সাহাবায়ে কেরামের সাথে পরামর্শ করেন। এর মাধ্যমে তার কর্মপদ্ধতি অনুধাবন করা যায়। তিনি যুদ্ধাবস্থা ও অন্যান্য সকল পরিস্থিতিতে সাহাবায়ে কেরামের সাথে পরামর্শ করতেন। আল্লাহ তাআলা مسلمانوں সকল ব্যাপারে পরামর্শের নির্দেশ দিয়েছেন। এমনকি তিনি তার রসূলকেও এ বিধানের আওতামুক্ত রাখেননি। কোনো ব্যাপারে আল্লাহ তাআলার পক্ষ থেকে ওহি না এলে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হতো পরামর্শের মাধ্যম। ৮৯০
আলোচ্য ঘটনা থেকে আমরা এ শিক্ষাও পেলাম যে, একজন সফল নেতার সবসময় অধীনস্থদের সাথে সুসম্পর্ক রাখা উচিত। অধীনস্থদের উচিত নেতার মর্যাদা ও গুরুত্ব অনুধাবন করা। অন্যদিকে নেতাও যেন তার অধীনস্থদের যোগ্যতা ও মর্যাদার যথাযোগ্য মূল্যায়ন করেন। তাদের মতামত ও মন্তব্যের প্রতি সম্মান প্রদর্শন করেন।
গোত্রীয় সুযোগ-সুবিধার প্রতি পূর্ণ লক্ষ রেখে গাতফান নেতাদের সাথে রসূলুল্লাহ সা. সন্ধিচুক্তির পরিকল্পনা করেছিলেন। ৮৯১
এ সন্ধিচুক্তির ব্যাপারে সাহাবায়ে কেরামের অবস্থান দ্বারা তিনটি বিষয় বুঝা যায়। যথা:
১. আদবের প্রতি লক্ষ রেখে সাহাবারা নবীজিকে যে পরামর্শ দেন, তাতে তাদের সাহসিকতা ও বীরত্বের যথেষ্ট ইঙ্গিত পাওয়া যায়। সবার সুবিধার প্রতি লক্ষ রেখে সাথিদের যে কোনো পরামর্শ দেওয়ার সুযোগদানের দৃষ্টান্তও আমরা আলোচ্য ঘটনায় দেখতে পাই।
২. সাহাবায়ে কেরামের এ ধরনের বক্তব্য থেকে আল্লাহ, তার রসূল এবং তার দীনের সাথে তাদের গভীর সম্পর্কের ব্যাপারটি আঁচ করা যায়।
৩. তাদের মনোবল অনুধাবন করা যায়। এমন ভয়াবহ পরিস্থিতিতে তারা মনোবল হারাননি। শত্রুপক্ষ যেভাবেই সজ্জিত হয়ে জোটবদ্ধভাবে উপস্থিত হোক না কেন, তারা এসবের পরোয়া করতেন না। ৮৯২

টিকাঃ
৮৮২ মুহাম্মাদ আহমাদ বাשমীল প্রণীত গাযওয়ায়ে আহযাব: ২০১।
৮৮৩ ওয়াকেদী প্রণীত মাগাযী: ২/৪৭৭।
৮৮৪ আল কিয়াদাতুল আসকারীয়া ফি আহদির রসূল: ৪১৩।
৮৮৫ সাদিক উরজুন প্রণীত মুহাম্মাদুর রসূলুল্লাহ: ৪/১৭৬।
৮৮৬ সীরাতে ইবনে হিশাম: ৩/২৫২।
৮৮৭ আত তারীখুল ইসলামী: ৬/১২৫।
৮৮৮ আল বিদায়া ওয়ান নিহায়া ৪/১০৬।
৮৮৯ আল আসাসু ফিস সুন্নাহ: ২/৬৮৭।
৮৯০ আল আবকারিয়ুল আসকারীয়া ফি গাযাওয়াতির রসূল: ৪১৪।
৮৯১ আল কিয়াদাতুল আসকারীয়া ফি আহদির রসূল: ৪১৪।
৮৯২ আল কিয়াদাতুল আসকারীয়া ফি আহদির রসূল: ৪১৪-৪১৬।

📘 নবীজির যুদ্ধ জীবন পাঠ ও পর্যালোচনা > 📄 শত্রু বাহিনীর মধ্যে গুজব ছড়ানোর কৌশল

📄 শত্রু বাহিনীর মধ্যে গুজব ছড়ানোর কৌশল


জোটবদ্ধ শত্রুসেনাদের পারস্পরিক একতা ও বিশ্বাস ধ্বংস করার লক্ষ্যে রসূলুল্লাহ সা. তাদের বিরুদ্ধে গুজব ছড়ানোর কৌশল গ্রহণ করেন। শত্রুপক্ষের সৈন্যরা মানসিকভাবে কতটা দুর্বল, তা রসূল সা. ভালোভাবেই জানতেন। তাই তিনি তাদের পারস্পরিক দ্বন্দ্বগুলোকে মানুষের সামনে এনে তাদের ভেতরকার বিদ্বেষগুলোকে পরিপূর্ণভাবে উস্কে দেওয়ার পদক্ষেপ নেন। পূর্বোক্ত আলোচনায় আমরা দেখেছি, রসূলুল্লাহ সা. মদীনার শস্য ইত্যাদির লোভ দেখিয়ে গাতফান নেতাদের যুদ্ধ থেকে নিবৃত্ত করার চেষ্টা করেছিলেন। আল্লাহ তাআলার অনুগ্রহে নুয়াইম ইবনে মাসউদ গাতফানী নবীজির কাছে এসে ঈমান আনেন। তিনি আবেদন করেন, ইয়া রাসুলাল্লাহ, আমি ইসলাম গ্রহণ করেছি। আমার গোত্র এ কথা জানে না। এখন আপনি আমাকে প্রয়োজনীয় যে কোনো নির্দেশ দিন। রসূলুল্লাহ সা. বললেন, 'আমাদের মধ্যে তুমিই একমাত্র ব্যক্তি যে শত্রুপক্ষের বিশ্বাসভাজন। তুমি যদি পার, আমাদের পক্ষ হয়ে শত্রুদের পর্যুদস্ত করো। যুদ্ধ তো কৌশলেরই নামান্তর। ১৮৯৩
রসূলুল্লাহ সা.-এর কথা মতো ইহুদি ও মুশরিকদের মধ্যে সন্দেহের বীজ বপন করতে থাকেন নুয়াইম। নুয়াইম ইবনে মাসউদ বনু কুরাইযা গোত্রের কাছে গেলেন। জাহিলী যুগে তিনি তাদের অন্তরঙ্গ বন্ধু ছিলেন। তিনি তদেরকে বললেন, হে বুন করাইযা, আমি তোমাদের কত ভালোবাসি তা নিশ্চয়ই তোমাদের জানা আছে। বিশেষ করে তোমাদের সাথে আমার যে নিখাদ সম্পর্ক রয়েছে, তা তোমাদের অজানা নয়। তারা বললো, হ্যাঁ, এ তো সত্য। তোমার বিরুদ্ধে আমাদের কোন অভিযোগ ছিল না। তিনি বললেন, কুরায়েש ও গাতফানের অবস্থা তোমাদের থেকে আলাদা। এ শহর তোমাদেরই শহর। এখানে তোমাদের স্ত্রী, সন্তান ও ধন-সম্পদ রয়েছে। এগুলো অন্যত্র সরিয়ে নেয়া তোমাদের পক্ষে সম্ভব নয়। কুরায়েש ও গাতফান মুহাম্মাদ ও তার সাহাবীদের সাথে লড়তে এসেছে। তোমরা তাদের সাহায্য সহযোগিতা করছো। অথচ তাদের আবাসভূমি, ধন-সম্পদ ও পরিবার-পরিজন অন্যত্র রয়েছে। সুতরাং তারা তোমাদের মত অবস্থায় নেই। তারা যদি এখানে স্বার্থ দেখতে পায় তাহলে তারা তা নেবে। আর যদি না পায় তবে নিজেদের আবাসভূমিতে চলে যাবে। তখন তোমরা এই শহরে একাকী মুহাম্মাদের সম্মুখীন হবে। এই অবস্থায় তার বিরুদ্ধে তোমরা টিকতে পারবে না। অতএব मुसलमानों সাথে লড়াই করতে হলে আগে কুরায়েশদের মধ্য হতে কতিপয় নেতাকে জিম্মি হিসেবে হাতে নাও। তারা তোমাদের হাতে জামানত হিসেবে থাকবে। তখন তোমরা নিশ্চিন্ত হতে পারবে। তাদেরকে সাথে নিয়ে মুহাম্মাদের সাথে লড়াই করা তোমাদের উচিত হবে না। তারা বললো, তুমি ঠিক পরামর্শ দিয়েছো।
এরপর নুয়াইস কুরায়েשদের কাছে গিয়ে আবু সুফিয়ান ও তার সহযোগী কুরায়েশ নেতৃবৃন্দকে বললেন, তোমরা নিশ্চয়ই জানো যে, আমি তোমাদের পরম হিতাকাঙ্ক্ষী এবং মুহাম্মাদের ঘোর বিরোধী। আমি একটা খবর শুনেছি। সেটা তোমাদেরকে জানানো আমার কর্তব্য। কথাটা তোমরা কারো কাছে প্রকাশ করো না। ইহুদীরা মুহাম্মাদ ও তার সঙ্গীদের সাথে তাদের সম্পাদিত চুক্তি লংঘন করে অনুতপ্ত হয়েছে। তারা মুহাম্মাদের কাছে বার্তা পাঠিয়েছে যে, আমরা যা করেছি তার জন্য অনুতপ্ত। এখন আমরা যদি কুরায়েש ও গাতফান গোত্রের নেতৃস্থানীয় কিছু লোককে পাকড়াও করে তোমার কাছে হস্তান্তর করি আর তুমি তাদের হত্যা করো তাহলে কি তুমি আমাদের ওপর খুশী হবে?
এরপর আমরা তোমার সাথে মিলিত হয়ে কুরায়েש ও গাতফানের অবশিষ্ট সবাইকে খতম করবো। এ কথায় মুহাম্মাদ রাজী হয়েছে। নুয়াইম আবু সুফিয়ানকে আরো বললেন, ইহুদীরা যদি তোমাদের কতিপয় লোককে জিম্মী রাখতে চায় তাহলে খবরদার কাউকে তাদের হাতে সোপর্দ করো না।
এরপর নুয়াইম গাতফানীদের কাছে গিয়ে বললেন, হে বনু গাতফান, তোমরা আমার স্বগোত্র ও আপনজন। তোমরা আমার কাছে সবার চাইতে প্রিয়। আমার বিরুদ্ধে নিশ্চই তোমাদের কোনো অভিযোগ নেই। তারা বললো, তুমি সত্য বলেছো। তোমার বিরুদ্ধে আমাদের কোন অভিযোগ নেই। নুয়াইম বললেন, তাহলে আমি যে খবর দিচ্ছি তা কাউকে জানতে দিওনা। তারা বললো, ঠিক আছে। তোমার কথার গোপনীয়তা রক্ষা করা হবে। নুয়াইম তখন তাদেরকে তাই বললেন যা তিনি কুরায়েשদের বলেছিলেন। তিনি তাদেরকেও জিম্মী না রাখার পরামর্শ দিলেন। ৮৯৪

টিকাঃ
৮৯০ আল বিদায়া ওয়ান নিহায়া: ৪/১১৩।
৮৯৪ সীরাতে ইবনে হিশাম।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00