📘 নবীজির যুদ্ধ জীবন পাঠ ও পর্যালোচনা > 📄 রসূলুল্লাহ সা. একজন মানুষ

📄 রসূলুল্লাহ সা. একজন মানুষ


আল্লাহ তাআলার পক্ষ থেকে ইফকের ঘটনায় প্রচুর শিক্ষণীয় বিষয় রয়েছে। এর মাধ্যমে আল্লাহ তাআলা রসূলুল্লাহ সা.-এর চরিত্রকে সব ধরনের ত্রুটি থেকে মুক্ত করে তার ব্যক্তিত্বকে আরও শক্তিশালী করেন। নবীদের ইচ্ছে মতো যদি ওহী অবতীর্ণ হতো, তাহলে নবীজি সা. এক মাসের এ বিশাল পরীক্ষায় পড়তেন না। এর মাধ্যমে বোঝা যায়, রসূলুল্লাহ সা. একজন মানুষ এবং নবী। আপদ-বিপদে তিনিও নিপতিত হন। দুঃখ-বেদনা তারও আছে। সুতরাং আমরা দেখতে পাই, ওহির মাধ্যমে আয়েশা-এর বিরুদ্ধে অপবাদ সংক্রান্ত ঘূর্ণিঝড় শেষ হলে নবীজি সা.ও ফিরে আসেন স্বাভাবিক অবস্থায়। বিপদের ঘনঘটা শেষে প্রত্যেকের চেহারায় ফিরে আসে পুরনো দীপ্তি। উপরোক্ত ঘটনায় আসমানি ওহির সত্যতা সম্পর্কে বিভিন্ন আপত্তি ও সন্দেহের অপনোদন হয়। আল্লাহ যদি এসব স্পষ্ট না করতেন, তাহলে এ ঘটনার অজানা দিকগুলোর কারণে নবীজি সা.-এর অন্তর কিছুটা হলেও দ্বিধান্বিত থাকতো। যার প্রভাব পড়তো পরবর্তী জীবনে আয়েশা-এর সাথে তার আচরণে। এই বড় পরীক্ষাটি আল্লাহ তাআলার ইচ্ছাতেই হয়েছে। এটা রসূলুল্লাহ সা.-এর নবুওয়াতের সত্যতার পক্ষে একটি দলিল। ৮২১

📘 নবীজির যুদ্ধ জীবন পাঠ ও পর্যালোচনা > 📄 মুসলমানদের সম্মান রক্ষার গুরুত্ব

📄 মুসলমানদের সম্মান রক্ষার গুরুত্ব


আল্লাহর পক্ষ থেকে এমন নতুন নতুন বিভিন্ন ঘটনা দ্বারা মুসলমানদের শিক্ষা প্রদান করা হয়। ইফকের ঘটনার মাধ্যমে আল্লাহ তাআলা এমন কিছু বিধিবিধান অবতীর্ণ করেন, যা مسلمانوں সম্মান ও মর্যাদার রক্ষাকবচ। সূরা নূর অবতীর্ণের হেতুও ছিল তাই। এ সূরায় যিনাকার নারী ও পুরুষের শাস্তির কথা তুলে ধরা হয়েছে। আলোচনা করা হয়েছে যিনা-ব্যভিচারের নোংরা দিকগুলো। তদ্রূপ স্বামী-স্ত্রী যদি একে অপরের ব্যাপারে অপবাদ আরোপ করে, বিচারক সে সময় কী করবে, এরও আলোচনা করা হয়েছে। পাশাপাশি নিষ্কলুশ চরিত্রের অধিকারী নারীদের ব্যাপারে যারা অপবাদ দেয়, তারা যদি তাদের অপবাদ শরীয়ত সমর্থিত সাক্ষীর মাধ্যমে প্রমাণ করতে না পারে, সেক্ষেত্রে তাদের ব্যাপারে কী উদ্যোগ নেওয়া হবে, সে ব্যাপারেও নির্দেশনা দেওয়া হয়। এ ছাড়া আরও বিভিন্ন বিধিবিধান এসেছে আলোচ্য সূরায়। ৮২২
ইসলামে যিনা হারাম। যিনাকারের জন্য শাস্তি নির্ধারিত রয়েছে। এছাড়া যেসব কারণে যিনা-ব্যভিচার সংঘটিত হয়, সেগুলোকেও নিষিদ্ধ করেছে ইসলাম। শুধু তাই নয়, ইসলামী সমাজকে এ ধরনের নোংরামি থেকে মুক্ত রাখার লক্ষ্যে অশ্লীলতার প্রচার-প্রসার ও অন্যায়ভাবে কারও ওপর অপবাদ আরোপকে ইসলামে নিষিদ্ধ করা হয়েছে। কারণ, অশ্লীল কথা মানুষের কানে কানে পৌঁছলে এবং এ ব্যাপারে আলোচনা-সমালোচনা করলে সবাই এটাকে সাধারণ অপরাধ বলে মনে করবে। সাধারণ মানুষ এ ধরনের অপরাধে জড়িয়ে পড়ার সাহস পাবে। তাই কাউকে অশ্লীলতার অপবাদ দেওয়া শরীয়তে নিষিদ্ধ করা হয়েছে। কোনো ব্যক্তি যদি নিষ্কলুশ চরিত্রের নারী ও পুরুষের ব্যাপারে এমন অপবাদ দেয়, তাহলে তার জন্য শরীয়তে হদ্দে কযফ তথা আশিটি বেত্রাঘাতের শাস্তি রয়েছে। এক্ষেত্রে অপবাদ আরোপকারী ব্যক্তির সাক্ষ্য গ্রহণ করা হবে না বলেও শরীয়তে সিদ্ধান্ত রয়েছে। ৮২০
রসূলুল্লাহ সা. আলোচ্য ইফকের ঘটনার পর মিসতাহ, হাসসান ইবনে সাবিত ও হামনা বিনতে জাহাশের ওপর অপবাদ আরোপের শাস্তি প্রয়োগ করেছিলেন। প্রখ্যাত ঐতিহাসিক মুহাম্মাদ ইবনে ইসহাক বর্ণনা করেন, রসূলুল্লাহ সা. অপবাদ আরোপের অভিযোগে দুজন পুরুষ ও একজন নারী তথা মিসতাহ, হাসসান ইবনে সাবিত ও হামনা-এর ওপরে শাস্তি প্রয়োগ করেন। ইমাম তিরমিযী রহ. এই রেওয়ায়াত বর্ণনা করেছেন। ৮২৪
ইমাম কুরতুবী রহ. বলেন, হাসসান ইবনে সাবিত, মিসতাহ ও হামনা বিনতে জাহাশের ওপর অপবাদ আরোপের শাস্তি প্রয়োগের ব্যাপারটি উলামায়ে কেরামের মধ্যে প্রসিদ্ধ। যদিও আবদুল্লাহ ইবনে উবাইকে এ শাস্তির আওতায় আনার ব্যাপারে কোনো আলোচনা পাওয়া যায় না। ৮২৫
যদিও দুর্বল কিছু সূত্রের রেওয়ায়াতে আছে, আবদুল্লাহ ইবনে উবাইকেও এ শাস্তি দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু সূত্রটি 'যঈফ'। এর দ্বারা এটা প্রমাণ করা যায় না। ৮২৬
আবদুল্লাহ ইবনে উবাইয়ের ওপর কযফের শাস্তি প্রয়োগ না করার কারণ বর্ণনা করতে গিয়ে ইবনুল কাইয়্যিম রহ. বলেছেন:
১. এটা জানা কথা যে, হদ্দে কযফের মাধ্যমে পাপ হালকা হয়ে যায়। শাস্তিটি সেই অপরাধের কাফফারা হয়ে যায়। কিন্তু আবদুল্লাহ ইবনে উবাই এমন হীন, নিচ ও দুষ্কৃতিকারী ব্যক্তি ছিল যে, তার অপরাধ হালকা হওয়া বা কাফফারার কোনো মানে ছিল না। আল্লাহ তাআলা তার জন্য পরকালে বড় শাস্তির অঙ্গীকার করেছেন।
২. সে তার সঙ্গী ও সমমনাদের সাথে এ বিষয়ে কথা বললেও তারা তার বিরুদ্ধে সাক্ষ্য দেয়নি।
৩. কারো কারো মতে, যে কোনো ধরনের শরয়ী শাস্তি সাক্ষ্য-প্রমাণ বা স্বীকারোক্তির মাধ্যমে প্রয়োগ করা হয়। আর আবদুল্লাহ ইবনে উবাই এই অপরাধ স্বীকারও করেনি এবং তার বিরুদ্ধে কেউ সাক্ষীও দেয়নি। ঈমানদার ব্যক্তিদের সামনে তা আলোচনাও হয়নি।
৪. কেউ কেউ বলেছেন, রসূলুল্লাহ সা. বিশেষ বিবেচনায় তাকে শাস্তি দেননি। এছাড়া এর আগে তার বিভিন্ন মুনাফেকি কর্মকাণ্ড ও সারাক্ষণ মুসলমানদের ধোঁকা দেওয়ার প্রবণতা প্রকাশ পাওয়া সত্ত্বেও রসূলুল্লাহ সা. তার উপযুক্ত শাস্তি মৃত্যুদণ্ডও তার ওপর কার্যকর করেননি। উদ্দেশ্য ছিল তার গোত্রের লোকদের ইসলামের প্রতি আকৃষ্ট করা। রসূলুল্লাহ সা. চাননি তারা ইসলাম থেকে দূরে সরে যাক।
ইবনুল কাইয়্যিম বলেন, হয়তো রসূলুল্লাহ সা. এসব বিবেচনায় তাকে শাস্তির আওতায় আনেননি। ৮২৭

টিকাঃ
৮২১ আসসীরাতুন নববিয়্যাহ ফি যুয়িল মাসাদিরিল আসলিয়্যাহ: ৪৪১।
৮২২ হাদীসুল কুরআনিল কারীম আন গাযাওয়াতির রসূল: ১/৩৫৭।
৮২০ আসারুত তাতবীকিশ শারইয়াহ: ১১৭।
৮২৪ তাফসীরে কুরতুবী: ১২/১৯৭।
৮২৫ তাফসীরে কুরতুবী: ১২/২০১।
৮২৬ মারবিয়াতে গাযওয়ায়ে বানিল মুসতালিক: ২৪২।
৮২৭ যাদুল মাআদ: ৩/২৬৩-২৬৪।

📘 নবীজির যুদ্ধ জীবন পাঠ ও পর্যালোচনা > 📄 হাসান ইবনে সাবিত রা. এর ক্ষমা প্রার্থনা

📄 হাসান ইবনে সাবিত রা. এর ক্ষমা প্রার্থনা


বহু বর্ণনা দ্বারা প্রমাণিত, আবদুল্লাহ ইবনে উবাই ছাড়া ইফকের ঘটনায় যারা অংশগ্রহণ করেছিলেন, পরবর্তীতে তারা সবাই তাওবা করেছিলেন। হাসসান ইবনে সাবিত রা.-ও এ অপবাদে অংশগ্রহণের জন্য অনুতপ্ত হয়ে ক্ষমাপ্রার্থনা করেন। আয়েশা রা.-এর প্রশংসায় তিনি এই কবিতা রচনা করেন: ৮২৮
رأيتك وليغفر لك الله حرة من المحصنات غير ذات غوائل حصان رزان ما تزن بريبة وتصبح غرثى من لحوم الغوافل فإن الذي قد قيل ليس بلائط ولكنه قول امرئ بي ماحل فإن كنت قد قلت الذي قد زعمتم فلا رفعت سوطي إلي أنامل فكيف وودي ما حييت ونصرتي لال نبي الله زين المحافل وإن لهم عزا يرى الناس دونه قصارا وطال العز كل التطاول
মর্মার্থ: আপনাকে আমি সম্ভ্রান্ত নারী হিসেবে দেখেছি। আল্লাহ আপনাকে ক্ষমা করুন। সন্দে‍হ নেই আপনি পুতঃপবিত্র ও জ্ঞানী। নির্দোষদের নিন্দা করে আপনি দিন শুরু করেন না। তিনি এমন এক বংশের সন্তান, যাদের মান-মর্যাদা বিলীন হওয়ার নয়।
তার সম্পর্কে যা বলা হয়েছে তা ভিত্তিহীন। বরং তা এক নিন্দুকের উক্তি। যদি সে কথা আমি বলেই থাকি, যা তোমরা অনুমান করো; তাহলে আমি তো নিজের হাতে আমার ওপর কোড়া উত্তোলন করবো না।
তা কীভাবে হতে পারে, অথচ আমার ভালোবাসা আর সাহায্য তো রসূল সা.-এর পরিবার পরিজনের জন্য উৎসর্গিত। তিনিই তো মজলিসের দীপ্তি! তাদের জন্য রয়েছে সম্মান আর মর্যাদা, এর বাইরে লোকদেরকে তুমি দেখতে পাবে খর্বকায়। তাদের মর্যাদা সকলের উর্ধ্বে। ৮২৯

টিকাঃ
৮২৮ আবু শাহবা প্রণীত আসসীরাতুন নববিয়াহ: ২/২৬৩।
৮২৯ তারীখুল ইসলাম যাহাবী প্রণীত : ২৮১।

📘 নবীজির যুদ্ধ জীবন পাঠ ও পর্যালোচনা > 📄 গাযওয়ায়ে বনু মুসতালিক হতে প্রাপ্ত ইসলামী বিধিবিধান

📄 গাযওয়ায়ে বনু মুসতালিক হতে প্রাপ্ত ইসলামী বিধিবিধান


যারা আগেই ইসলামের দাওয়াত পেয়েছে কিন্তু ইসলাম গ্রহণ করেনি, তাদের ওপর অতর্কিত আক্রমণ বৈধ। এছাড়া কাউকে মুক্ত করার বিনিময়কেই তার মোহর হিসেবে নির্ধারণ করার বৈধতা পাওয়া যায় আলোচ্য গাযওয়ায়। এ যুদ্ধে রসূলুল্লাহ সা. জুয়াইরিয়া বিনতে হারেসের মুক্তিকেই তার মোহর হিসেবে নির্ধারিত করেছিলেন।
আলোচ্য গাযওয়ার ঘটনা দ্বারা বোঝা যায়, সফরের ক্ষেত্রে একাধিক স্ত্রীর মধ্যে নির্দিষ্ট একজনকে সফরসঙ্গী বানানোর জন্য লটারি করা জায়েয। আলোচ্য গাযওয়ার ঘটনা থেকে আরও বোঝা যায়, আরবের যুদ্ধবন্দীদেরও দাস বানানো জায়েয। জামহূর আলেমগণের অভিমতও এটাই। ৮৩০
উলামায়ে কেরামের ইজমা হলো, কুরআনে কারীমের বর্ণনায় যেভাবে স্পষ্টভাবে উম্মুল মুমিনীন আয়েশা সিদ্দীকা রা.-এর চারিত্রিক পবিত্রতার আলোচনা করা হয়েছে এবং তা প্রমাণ করা হয়েছে, তারপরেও কেউ যদি তার ব্যাপারে মন্দ মন্তব্য করে, তাহলে বোঝা যাবে সে কুরআনে কারীমের বিরুদ্ধাচরণ করে কুফরিতে লিপ্ত হয়েছে। ৮৩১
আলোচ্য গাযওয়ার ঘটনা থেকে আরও বোঝা যায়, নিজের স্ত্রীগণের সাথে আজল করা বৈধ। এ যুদ্ধে সাহাবায়ে কেরামের পক্ষ থেকে রসূলুল্লাহ সা.-কে আযল সম্পর্কে প্রশ্ন করা ও রসূলুল্লাহ সা.-এর অনুমতি প্রদানের মাধ্যমে এটা প্রমাণিত হয়। আরও জানা যায় যে, কেয়ামত পর্যন্ত যতগুলো শিশু জন্ম নেবে বলে আল্লাহ সিদ্ধান্ত নিয়েছেন, তারা যে কোনো ভাবেই হোক পৃথিবীতে আসবে। ৮৩২
তবে অধিকাংশ আলেমের অভিমত হচ্ছে, স্বাধীন নারীদের সাথে আজল করতে তাদের অনুমতি নিতে হবে। ৮৩৩
আলোচ্য গাযওয়ার সময়েই তায়াম্মুমের আয়াত অবতীর্ণ হয়। পানি পাওয়া না গেলে বা ব্যবহার করতে না পারলে তায়াম্মুম করে নামায আদায় করতে হবে। যেকোনো বিপদ ও ভয়ের সময়ও নামায পরিত্যাগ করা যাবে না। ৮৩৪

টিকাঃ
৮৩০ ইমাম শাফিয়ী প্রণীত কিতাবুল উম্ম: ৪/১৮৬।
৮৩১ শারহুন নববী আলা সহীহ মুসলিম: ৫/৬৪৩।
৮৩২ আস সীরাতুন নববিয়্যাহ আসসহীহাহ: ২/৪১৫।
৮৩৩ নাইলুল আওতার: ৬/২২২-২২৪।
৮৩৪ সুয়ার ওয়া ইবার মিনাল জিহাদিন নববী ফিল মদীনা: ২১০-২১১।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00