📄 ইফকের আয়াত থেকে শিক্ষণীয়
ইফকের ঘটনার পর অবতীর্ণ পবিত্র কুরআনের বাণী থেকে আলেমগণ বহু আদব ও আহকাম গ্রহণ করেছেন। তম্মধ্যে রয়েছে:
ক. পবিত্র কুরআনে উম্মুল মুমিনীন আয়েশা রা.-এর চারিত্রিক নির্দোষিতা বর্ণিত হয়েছে-যা কেয়ামত পর্যন্ত মানুষ তেলাওয়াত করতে থাকবে। আল্লাহ তাআলা বলেন:
إِنَّ الَّذِينَ جَاءُوا بِالْإِفْكِ عُصْبَةٌ مِنْكُمْ
নিশ্চয়ই যারা এ অপবাদ রটনা করেছে, তারা তোমাদেরই একটি দল। ৮০০
খ. এই ঘটনা অকল্যাণ থেকে কল্যাণের দিকে গড়িয়েছিল আল্লাহ তাআলার ইচ্ছায়। এই ঘটনা ছিল আবু বকর সিদ্দীক রা.-এর পরিবারের জন্য অনেক বড় পরীক্ষা। তবে শেষ পর্যন্ত এটা তাদের ধৈর্য ও ঈমানের বদৌলতে কল্যাণ বয়ে আনে। আল্লাহ তাআলা বলেন:
لَا تَحْسَبُوهُ شَرًّا لَكُمْ بَلْ هُوَ خَيْرٌ لَكُمْ
এটকে তোমরা তোমাদের জন্য অকল্যাণকর মনে করো না, বরং এটা তোমাদের জন্য কল্যাণকর। ৮০১
গ. পবিত্র কুরআনে মুমিনদের পরস্পরের প্রতি সহমর্মিতা ও উত্তম ধারণা রাখার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। আল্লাহ তাআলা বলেন :
لَوْلَا إِذْ سَمِعْتُمُوهُ ظَنَّ الْمُؤْمِنُونَ وَالْمُؤْمِنَاتُ بِأَنْفُسِهِمْ خَيْرًا وَقَالُوا هَذَا إِفْكُ مُبِينٌ
তোমরা যখন এটা শুনতে পেলে তখন কেন মুমিন পুরুষ ও মুমিন স্ত্রীরা তাদের নিজেদের লোক সম্পর্কে ভালো ধারণা করলো না আর বললো না, 'এটা তো খোলাখুলি অপবাদ। ৮০২
ঘ. যারা অপবাদের রটনা রটিয়েছিল, পবিত্র কুরআনে তাদের মিথ্যাবাদী হিসেবে আখ্যায়িত করা হয়। আল্লাহ তাআলা বলেন:
لَوْلَا جَاءُوا عَلَيْهِ بِأَرْبَعَةِ شُهَدَاءَ فَإِذْ لَمْ يَأْتُوا بِالشُّهَدَاءِ فَأُولَئِكَ عِنْدَ اللَّهِ هُمُ الْكَاذِبُونَ
তারা কেন এ ব্যাপারে চার জন সাক্ষী হাজির করেনি? যেহেতু তারা সাক্ষী হাজির করেনি, সেই কারণে তারা আল্লাহর বিধানে মিথ্যাবাদী। ৮০৩
ঙ. পবিত্র কুরআনে মুমিনদের প্রতি আল্লাহ তাআলার অনুগ্রহ ও মহব্বতের আলোচনা করতে গিয়ে আল্লাহ তাআলা বলেন:
وَلَوْلَا فَضْلُ اللَّهِ عَلَيْكُمْ وَرَحْمَتُهُ فِي الدُّنْيَا وَالْآخِرَةِ
আর যদি দুনিয়া ও আখেরাতে তোমাদের উপর আল্লাহর দয়া ও তার অনুগ্রহ না থাকতো। ৮০৪
চ. পবিত্র কুরআনে সংবাদ প্রচারের পূর্বে তা যাচাই-বাছাইয়ের নির্দেশ দেওয়া হয়। আল্লাহ তাআলা বলেন:
وَلَوْلَا إِذْ سَمِعْتُمُوهُ قُلْتُمْ مَا يَكُونُ لَنَا أَنْ نَتَكَلَّمَ بِهَذَا سُبْحَانَكَ هَذَا بُهْتَانُ عَظِيمٌ
তোমরা যখন এটা শুনলে তখন তোমরা কেন বললে না যে, এ ব্যাপারে আমাদের কথা বলা ঠিক নয়। আল্লাহ পবিত্র ও মহান, এটা তো এক গুরুতর অপবাদ! ৮০৫
ছ. পবিত্র কুরআনে এ জাতীয় মহাপাপ থেকে দূরে থাকার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। আল্লাহ তাআলা বলেন:
يَعِظُكُمُ اللَّهُ أَنْ تَعُودُوا لِمِثْلِهِ أَبَدًا إِنْ كُنْتُمْ مُؤْمِنِينَ
আল্লাহ তোমাদেরকে উপদেশ দিচ্ছেনঃ তোমরা যদি মুমিন হও তাহলে কখনও অনুরূপ আচরণের পুনরাবৃত্তি করো না। ৮০৬
জ. পবিত্র কুরআনে অশ্লীলতার প্রচার-প্রসার থেকে দূরে থাকার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। আল্লাহ তাআলা বলেন:
إِنَّ الَّذِينَ يُحِبُّونَ أَنْ تَشِيعَ الْفَاحِشَةُ فِي الَّذِينَ آمَنُوا لَهُمْ عَذَابٌ أَلِيمٌ فِي الدُّنْيَا وَالْآخِرَةِ وَاللَّهُ يَعْلَمُ وَأَنْتُمْ لَا تَعْلَمُونَ
নিশ্চয় যারা এটা পছন্দ করে যে, মুমিনদের মধ্যে অশ্লীলতা ছড়িয়ে পড়ুক, তাদের জন্য দুনিয়া ও আখেরাতে রয়েছে যন্ত্রণাদায়ক আযাব। আর আল্লাহ জানেন এবং তোমরা জানো না। ৮০৭
ঝ. কুরআনে মুমিনদের প্রতি আল্লাহর দয়া ও মহব্বতের কথা আলোচনা করা হয়েছে:
وَلَوْلَا فَضْلُ اللَّهِ عَلَيْكُمْ وَرَحْمَتُهُ وَأَنَّ اللَّهَ رَءُوفٌ رَحِيمٌ
তোমাদের প্রতি আল্লাহর অনুগ্রহ ও দয়া না থাকলে (তোমরা ধ্বংস হয়ে যেতে), আল্লাহ দয়ার্দ্র, বড়ই দয়াবান। ৮০৮
ঞ. মানুষকে ধ্বংসের পথ প্রদর্শনকারী শয়তানের অনুসরণ করতে নিষেধ করা হয়েছে। আল্লাহ তাআলা বলেন:
يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا لَا تَتَّبِعُوا خُطُوَاتِ الشَّيْطَانِ وَمَنْ يَتَّبِعْ خُطُوَاتِ الشَّيْطَانِ فَإِنَّهُ يَأْمُرُ بِالْفَحْشَاءِ وَالْمُنْكَرِ وَلَوْلَا فَضْلُ اللَّهِ عَلَيْكُمْ وَرَحْمَتُهُ مَا زَكَا مِنْكُمْ مِنْ أَحَدٍ أَبَدًا وَلَكِنَّ اللَّهَ يُزَكِّي مَنْ يَشَاءُ وَاللَّهُ سَمِيعٌ عَلِيمٌ
হে মুমিনগণ, তোমরা শয়তানের পদাঙ্কসমূহ অনুসরণ করো না। আর যে শয়তানের পদাঙ্কসমূহ অনুসরণ করবে, নিশ্চয় সে অশ্লীলতা ও মন্দ কাজের নির্দেশ দেবে। আর যদি তোমাদের প্রতি আল্লাহর অনুগ্রহ ও তার দয়া না থাকতো, তাহলে তোমাদের কেউই কখনো পবিত্র হতে পারতে না; কিন্তু আল্লাহ যাকে ইচ্ছা করেন, পবিত্র করেন। আর আল্লাহ সর্বশ্রোতা, মহাজ্ঞানী। ৮০৯
ট. কাছের মানুষ যদি মন্দ আচরণও করে, তবুও তাদের জন্য ব্যয়ের হাত উন্মুক্ত রাখা উচিত। ৮১০
এ প্রসঙ্গে বলা হয়েছে:
وَلَا يَأْتَلِ أُولُو الْفَضْلِ مِنْكُمْ وَالسَّعَةِ أَنْ يُؤْتُوا أُولِي الْقُرْبَى وَالْمَسَاكِينَ وَالْمُهَاجِرِينَ فِي سَبِيلِ اللَّهِ وَلْيَعْفُوا وَلْيَصْفَحُوا أَلَّا تُحِبُّونَ أَنْ يَغْفِرَ اللَّهُ لَكُمْ وَاللَّهُ غَفُورٌ رَحِيمٌ
আর তোমাদের মধ্যে যারা মর্যাদা ও প্রাচুর্যের অধিকারী, তারা যেন এমন কসম না করে যে, তারা নিকটাত্মীয়দের, মিসকীনদের ও আল্লাহর পথে হিজরতকারীদের কিছুই দেবে না। আর তারা যেন তাদের ক্ষমা করে এবং তাদের দোষত্রুটি উপেক্ষা করে। তোমরা কি পছন্দ কর না যে, আল্লাহ তোমাদের ক্ষমা করে দেন? আর আল্লাহ বড়ই ক্ষমাশীল, পরম দয়ালু। ৮১১
ঠ. যেসব ঈমানদার সত্য ও ন্যায়ের পথে থাকে, আল্লাহ তাদের প্রতি দয়া করে থাকেন। তাদের বিরুদ্ধে যারা মিথ্যা অপবাদ রটায়, তিনি তাদের দুনিয়া ও আখেরাতে ধ্বংস করেন। এ মর্মে আল্লাহ তাআলার বাণী:
إِنَّ الَّذِينَ يَرْمُونَ الْمُحْصَنَاتِ الْغَافِلَاتِ الْمُؤْمِنَاتِ لُعِنُوا فِي الدُّنْيَا وَالْآخِرَةِ وَلَهُمْ عَذَابٌ عَظِيمٌ يَوْمَ تَشْهَدُ عَلَيْهِمْ أَلْسِنَتُهُمْ وَأَيْدِيهِمْ وَأَرْجُلُهُمْ بِمَا كَانُوا يَعْمَلُونَ يَوْمَئِذٍ يُوَفِّيهِمُ اللَّهُ دِينَهُمُ الْحَقَّ وَيَعْلَمُونَ أَنَّ اللَّهَ هُوَ الْحَقُّ الْمُبِينُ
যারা সচ্চরিত্রা সরলমনা মুমিন নারীদের প্রতি অপবাদ আরোপ করে, তারা দুনিয়া ও আখেরাতে অভিশপ্ত। আর তাদের জন্য রয়েছে মহাআযাব। যেদিন তাদের বিরুদ্ধে সাক্ষ্য দেবে তাদের জিহবা, তাদের হাত, তাদের পা তাদের কৃতকর্মের ব্যাপারে। সেদিন আল্লাহ তাদেরকে তাদের ন্যায্য প্রতিদান পুরোপুরি দিয়ে দেবেন, আর তারা জানবে যে, আল্লাহই সুস্পষ্ট সত্য। ৮১২
তাফসির গ্রন্থ কাশশাফ-এর লেখক উপরোক্ত আয়াতসমূহের ব্যাখ্যায় লিখেন, পবিত্র কুরআনে যত স্থানে পাপিষ্ট ব্যক্তিদের ব্যাপারে শাস্তির ধমক দেওয়া হয়েছে, কোথাও আয়েশা-রা.এর ওপর অপবাদ রটনাকারীদের মতো শব্দ ব্যবহার করা হয়নি। ইফকের ঘটনায় জড়িতদের ব্যাপারে যে ধরনের কঠিন শাস্তি ও মারাত্মক পরিণামের কথা কুরআনে কারীমে বলা হয়েছে; তা অন্য কারও ব্যাপারে বলা হয়নি। কেননা, তাদের অপরাধ ছিল মারাত্মক। এ কারণে মহান আল্লাহ বিভিন্নভাবে তাদের অপরাধের জঘন্যতা তুলে ধরেছেন। এ জাতীয় অপরাধের জন্য তাদের আখেরাতের শাস্তির ব্যাপারে উপযুক্ত আয়াত অবতীর্ণ না হলেও, শুধু একজন মুসলমানের ওপর অপবাদের কারণে إِنَّ الَّذِينَ جَاءُو بِالإِفْكِ থেকে শুরু করে هُمْ الْمُفْلِحُونَ পর্যন্ত যেসব শাস্তির কথা কুরআনে বলা হয়েছে, তা-ই ছিল যথেষ্ট।
ড. এটা আল্লাহ তাআলার চিরন্তন নিয়ম যে, তিনি পবিত্র পুরুষদের জন্য পবিত্র নারীদের এবং পবিত্র নারীদের জন্য পবিত্র পুরুষদের নির্ধারিত করে থাকেন। এ প্রসঙ্গে বলা হয়েছে:
الْخَبِيثَاتُ لِلْخَبِيثِينَ وَالْخَبِيثُونَ لِلْخَبِيثَاتِ وَالطَّيِّبَاتُ لِلطَّيِّبِينَ وَالطَّيِّبُونَ لِلطَّيِّبَاتِ أُولَئِكَ مُبَرَّءُونَ مِمَّا يَقُولُونَ لَهُمْ مَغْفِرَةٌ وَرِزْقٌ كَرِيمٌ
চরিত্রহীনা নারী চরিত্রহীন পুরুষদের জন্য, আর চরিত্রহীন পুরুষ চরিত্রহীনা নারীদের জন্য, চরিত্রবতী নারী চরিত্রবান পুরুষের জন্য, আর চরিত্রবান পুরুষ চরিত্রবতী নারীদের জন্য। লোকেরা যা বলে তা থেকে তারা পবিত্র। তাদের জন্য আছে ক্ষমা ও সম্মানজনক জীবিকা।
ঢ. উম্মুল মুমিনীন আয়েশা রা.-এর ব্যাপারে অপবাদ রটনায় সাধারণত চার ভাগে বিভক্ত লোকজন দেখা যায়। শায়েখ আবদুল কাদের শাইবাতুল হামদ ইফকের হাদীস সম্পর্কে মন্তব্য করতে গিয়ে বলেন, এ ব্যাপারে মানুষেরা চার ভাগে বিভক্ত হয়ে পড়ে। যথা:
১. বেশিরভাগ মানুষ নিজেদের কান এবং মুখের লাগাম টেনে ধরতে সক্ষম হন। তারা এ ধরনের আলোচনাকে সত্যও বলেননি, মিথ্যাও বলেননি।
২. কিছু মানুষ শুরু থেকেই এ ধরনের বক্তব্যকে মিথ্যা অপবাদ হিসেবে ধরে নেন। তাদের মধ্যে রয়েছেন, আবু আইয়ুব আনসারী রা. ও উম্মে আইয়ুব রা. প্রমুখ।
৩. অনেকে এটাকে সত্যও বলেননি, মিথ্যাও বলেননি। তবে ইফকের ঘটনায় জড়িতরা যা বলছিল তা নিয়ে কথা বলতেন। এটাকে তারা আল্লাহ তাআলার পক্ষ থেকে শাস্তি হতে পারে এমন জঘন্য কাজ মনে করেননি। তারা মনে করেছিলেন, কুফরি বক্তব্য বর্ণনা করা কুফরি নয়। তাই তারা ভেবেছিলেন হয়তো ইফকের ঘটনা শুধু বর্ণনা করা অপবাদ হিসেবে গণ্য হবে না। এদের মধ্যে ছিলেন হামনা বিনতে জাহাশ, হাসসান ইবনে সাবিত ও মিসতাহ ইবনে উসাসা।
৪. একটি দল এমন অপবাদের ঘটনা রটায় এবং ব্যাপকভাবে প্রচার করে। আল্লাহর শত্রু মুনাফেক নেতা আবদুল্লাহ ইবনে উবাই ছিল এই পক্ষের নেতা। অপবাদের ঘটনার মূল হোতা ছিল সেই।
পবিত্র কুরআনে আল্লাহ তাআলা দ্বিতীয় শ্রেণির মানুষদের প্রশংসা করেছেন। সবার কাছ থেকে এমন আচরণই কাম্য ছিল। এ প্রসঙ্গে বলা হয়েছে:
لَوْلَا إِذْ سَمِعْتُمُوهُ ظَنَّ الْمُؤْمِنُونَ وَالْمُؤْمِنَاتُ بِأَنْفُسِهِمْ خَيْرًا وَقَالُوا هَذَا إِفْكُ مُبِينٌ
তোমরা যখন এটা শুনতে পেলে তখন কেন মুমিন পুরুষ ও মুমিন স্ত্রীরা তাদের নিজেদের লোক সম্পর্কে ভালো ধারণা করলো না আর বললো না, 'এটা তো খোলাখুলি অপবাদ। ১৮১৬
তৃতীয় প্রকার মানুষের আচরণ অনুচিত বলে মন্তব্য করে আল্লাহ তাআলা বলেন,
وَلَوْلَا إِذْ سَمِعْتُمُوهُ قُلْتُمْ مَا يَكُونُ لَنَا أَنْ نَتَكَلَّمَ بِهَذَا سُبْحَانَكَ هَذَا بُهْتَانُ عَظِيمٌ
তোমরা যখন এটা শুনলে তখন তোমরা কেন বললে না যে, এ ব্যাপারে আমাদের কথা বলা ঠিক নয়। আল্লাহ পবিত্র ও মহান, এটা তো এক গুরুতর অপবাদ! ৮১৭
অবশ্য আল্লাহ তাআলা এ ধরনের মানুষের অতীতের সৎকর্মসমূহের আলোচনাও করেছেন। যেমন, যখন আবু বকর সিদ্দীক মিসতাহ-এর এ অপরাধের কারণে তাকে কোনো ধরনের সদকা না দেওয়ার শপথ করেছিলেন, তখন কুরআনে কারীমে মিসতাহ-এর ইসলামগ্রহণ ও হিজরতসহ বিভিন্ন গুণের কথা বলা হয়েছে। আল্লাহ বলেছেন:
وَلَا يَأْتَلِ أُولُو الْفَضْلِ مِنْكُمْ وَالسَّعَةِ أَنْ يُؤْتُوا أُولِي الْقُرْبَى وَالْمَسَاكِينَ وَالْمُهَاجِرِينَ فِي سَبِيلِ اللَّهِ وَلْيَعْفُوا وَلْيَصْفَحُوا أَلَّا تُحِبُّونَ أَنْ يَغْفِرَ اللَّهُ لَكُمْ وَاللَّهُ غَفُورٌ رَحِيمٌ
আর তোমাদের মধ্যে যারা মর্যাদা ও প্রাচুর্যের অধিকারী, তারা যেন এমন কসম না করে যে, তারা নিকটাত্মীয়দের, মিসকীনদের ও আল্লাহর পথে হিজরতকারীদের কিছুই দেবে না। আর তারা যেন তাদের ক্ষমা করে এবং তাদের দোষত্রুটি উপেক্ষা করে। তোমরা কি পছন্দ কর না যে, আল্লাহ তোমাদের ক্ষমা করে দেন? আর আল্লাহ বড়ই ক্ষমাশীল, পরম দয়ালু।৮১৮
চতুর্থ যে দলটির নেতৃত্ব দিয়েছিল আবদুল্লাহ ইবনে উবাই ও তার অনুসারীরা। কুরআনে কারীমে তাদের কুফুরির ওপর অটল থাকা, ভবিষ্যতে তাওবার সুযোগ না-হওয়া, দুনিয়া ও আখেরাতে অভিশপ্ত৮১৯ হওয়ার ঘোষণা দেওয়া হয়েছে। এ মর্মে আল্লাহ তাআলার বাণী:
إِنَّ الَّذِينَ يَرْمُونَ الْمُحْصَنَاتِ الْغَافِلَاتِ الْمُؤْمِنَاتِ لُعِنُوا فِي الدُّنْيَا وَالْآخِرَةِ وَلَهُمْ عَذَابٌ عَظِيمٌ يَوْمَ تَشْهَدُ عَلَيْهِمْ أَلْسِنَتُهُمْ وَأَيْدِيهِمْ وَأَرْجُلُهُمْ بِمَا كَانُوا يَعْمَلُونَ يَوْمَئِذٍ يُوَفِّيهِمُ اللَّهُ دِينَهُمُ الْحَقَّ وَيَعْلَمُونَ أَنَّ اللَّهَ هُوَ الْحَقُّ الْمُبِينُ
যারা সচ্চরিত্রা সরলমনা মুমিন নারীদের প্রতি অপবাদ আরোপ করে, তারা দুনিয়া ও আখেরাতে অভিশপ্ত। আর তাদের জন্য রয়েছে মহাআযাব। যেদিন তাদের বিরুদ্ধে সাক্ষ্য দেবে তাদের জিহবা, তাদের হাত, তাদের পা তাদের কৃতকর্মের ব্যাপারে। সেদিন আল্লাহ তাদেরকে তাদের ন্যায্য প্রতিদান পুরোপুরি দিয়ে দেবেন, আর তারা জানবে যে, আল্লাহই সুস্পষ্ট সত্য।৮২০
টিকাঃ
৭৯৯ আসসীরাতুন নববিয়্যাহ ফি জুয়িল মাসাদিরিল আসলিয়্যাহ: ৪৪০।
৮০০ সূরা নূর: ১১।
৮০১ সূরা নূর: ১১।
৮০২ সূরা নূর: ১২।
৮০৩ সূরা নূর: ১৩।
৮০৪ সূরা নূর: ১৪।
৮০৫ সূরা নূর: ১৬।
৮০৬ সূরা নূর: ১৭।
৮০৭ সূরা নূর: ১৯।
৮০৮ সূরা নূর: ২০।
৮০৯ সূরা নূর: ২১।
৮১০ হাদীসুল কুরআনিল কারীম আন গাযাওয়াতির রসূল: ১/৩৮৫-৩৮৬।
৮১১ সূরা নূর: ২২।
৮১২ সূরা নূর: ২৩-২৫।
৮১৬ সূরা নূর: ১২।
৮১৭ সূরা নূর: ১৬।
৮১৮ সূরা নূর: ২২।
৮১৯ ফিহুল ইসলাম শরহি বুলুগুল মারাম: ৫/৯।
৮২০ সূরা নূর: ২৩-২৫।
📄 বনু মুসতালিকের যুদ্ধ ও ইফকের ঘটনা থেকে প্রাপ্ত শিক্ষা
এই অধ্যায়ে কোনো কন্টেন্ট এখনো যোগ করা হয়নি।
📄 রসূলুল্লাহ সা. একজন মানুষ
আল্লাহ তাআলার পক্ষ থেকে ইফকের ঘটনায় প্রচুর শিক্ষণীয় বিষয় রয়েছে। এর মাধ্যমে আল্লাহ তাআলা রসূলুল্লাহ সা.-এর চরিত্রকে সব ধরনের ত্রুটি থেকে মুক্ত করে তার ব্যক্তিত্বকে আরও শক্তিশালী করেন। নবীদের ইচ্ছে মতো যদি ওহী অবতীর্ণ হতো, তাহলে নবীজি সা. এক মাসের এ বিশাল পরীক্ষায় পড়তেন না। এর মাধ্যমে বোঝা যায়, রসূলুল্লাহ সা. একজন মানুষ এবং নবী। আপদ-বিপদে তিনিও নিপতিত হন। দুঃখ-বেদনা তারও আছে। সুতরাং আমরা দেখতে পাই, ওহির মাধ্যমে আয়েশা-এর বিরুদ্ধে অপবাদ সংক্রান্ত ঘূর্ণিঝড় শেষ হলে নবীজি সা.ও ফিরে আসেন স্বাভাবিক অবস্থায়। বিপদের ঘনঘটা শেষে প্রত্যেকের চেহারায় ফিরে আসে পুরনো দীপ্তি। উপরোক্ত ঘটনায় আসমানি ওহির সত্যতা সম্পর্কে বিভিন্ন আপত্তি ও সন্দেহের অপনোদন হয়। আল্লাহ যদি এসব স্পষ্ট না করতেন, তাহলে এ ঘটনার অজানা দিকগুলোর কারণে নবীজি সা.-এর অন্তর কিছুটা হলেও দ্বিধান্বিত থাকতো। যার প্রভাব পড়তো পরবর্তী জীবনে আয়েশা-এর সাথে তার আচরণে। এই বড় পরীক্ষাটি আল্লাহ তাআলার ইচ্ছাতেই হয়েছে। এটা রসূলুল্লাহ সা.-এর নবুওয়াতের সত্যতার পক্ষে একটি দলিল। ৮২১
📄 মুসলমানদের সম্মান রক্ষার গুরুত্ব
আল্লাহর পক্ষ থেকে এমন নতুন নতুন বিভিন্ন ঘটনা দ্বারা মুসলমানদের শিক্ষা প্রদান করা হয়। ইফকের ঘটনার মাধ্যমে আল্লাহ তাআলা এমন কিছু বিধিবিধান অবতীর্ণ করেন, যা مسلمانوں সম্মান ও মর্যাদার রক্ষাকবচ। সূরা নূর অবতীর্ণের হেতুও ছিল তাই। এ সূরায় যিনাকার নারী ও পুরুষের শাস্তির কথা তুলে ধরা হয়েছে। আলোচনা করা হয়েছে যিনা-ব্যভিচারের নোংরা দিকগুলো। তদ্রূপ স্বামী-স্ত্রী যদি একে অপরের ব্যাপারে অপবাদ আরোপ করে, বিচারক সে সময় কী করবে, এরও আলোচনা করা হয়েছে। পাশাপাশি নিষ্কলুশ চরিত্রের অধিকারী নারীদের ব্যাপারে যারা অপবাদ দেয়, তারা যদি তাদের অপবাদ শরীয়ত সমর্থিত সাক্ষীর মাধ্যমে প্রমাণ করতে না পারে, সেক্ষেত্রে তাদের ব্যাপারে কী উদ্যোগ নেওয়া হবে, সে ব্যাপারেও নির্দেশনা দেওয়া হয়। এ ছাড়া আরও বিভিন্ন বিধিবিধান এসেছে আলোচ্য সূরায়। ৮২২
ইসলামে যিনা হারাম। যিনাকারের জন্য শাস্তি নির্ধারিত রয়েছে। এছাড়া যেসব কারণে যিনা-ব্যভিচার সংঘটিত হয়, সেগুলোকেও নিষিদ্ধ করেছে ইসলাম। শুধু তাই নয়, ইসলামী সমাজকে এ ধরনের নোংরামি থেকে মুক্ত রাখার লক্ষ্যে অশ্লীলতার প্রচার-প্রসার ও অন্যায়ভাবে কারও ওপর অপবাদ আরোপকে ইসলামে নিষিদ্ধ করা হয়েছে। কারণ, অশ্লীল কথা মানুষের কানে কানে পৌঁছলে এবং এ ব্যাপারে আলোচনা-সমালোচনা করলে সবাই এটাকে সাধারণ অপরাধ বলে মনে করবে। সাধারণ মানুষ এ ধরনের অপরাধে জড়িয়ে পড়ার সাহস পাবে। তাই কাউকে অশ্লীলতার অপবাদ দেওয়া শরীয়তে নিষিদ্ধ করা হয়েছে। কোনো ব্যক্তি যদি নিষ্কলুশ চরিত্রের নারী ও পুরুষের ব্যাপারে এমন অপবাদ দেয়, তাহলে তার জন্য শরীয়তে হদ্দে কযফ তথা আশিটি বেত্রাঘাতের শাস্তি রয়েছে। এক্ষেত্রে অপবাদ আরোপকারী ব্যক্তির সাক্ষ্য গ্রহণ করা হবে না বলেও শরীয়তে সিদ্ধান্ত রয়েছে। ৮২০
রসূলুল্লাহ সা. আলোচ্য ইফকের ঘটনার পর মিসতাহ, হাসসান ইবনে সাবিত ও হামনা বিনতে জাহাশের ওপর অপবাদ আরোপের শাস্তি প্রয়োগ করেছিলেন। প্রখ্যাত ঐতিহাসিক মুহাম্মাদ ইবনে ইসহাক বর্ণনা করেন, রসূলুল্লাহ সা. অপবাদ আরোপের অভিযোগে দুজন পুরুষ ও একজন নারী তথা মিসতাহ, হাসসান ইবনে সাবিত ও হামনা-এর ওপরে শাস্তি প্রয়োগ করেন। ইমাম তিরমিযী রহ. এই রেওয়ায়াত বর্ণনা করেছেন। ৮২৪
ইমাম কুরতুবী রহ. বলেন, হাসসান ইবনে সাবিত, মিসতাহ ও হামনা বিনতে জাহাশের ওপর অপবাদ আরোপের শাস্তি প্রয়োগের ব্যাপারটি উলামায়ে কেরামের মধ্যে প্রসিদ্ধ। যদিও আবদুল্লাহ ইবনে উবাইকে এ শাস্তির আওতায় আনার ব্যাপারে কোনো আলোচনা পাওয়া যায় না। ৮২৫
যদিও দুর্বল কিছু সূত্রের রেওয়ায়াতে আছে, আবদুল্লাহ ইবনে উবাইকেও এ শাস্তি দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু সূত্রটি 'যঈফ'। এর দ্বারা এটা প্রমাণ করা যায় না। ৮২৬
আবদুল্লাহ ইবনে উবাইয়ের ওপর কযফের শাস্তি প্রয়োগ না করার কারণ বর্ণনা করতে গিয়ে ইবনুল কাইয়্যিম রহ. বলেছেন:
১. এটা জানা কথা যে, হদ্দে কযফের মাধ্যমে পাপ হালকা হয়ে যায়। শাস্তিটি সেই অপরাধের কাফফারা হয়ে যায়। কিন্তু আবদুল্লাহ ইবনে উবাই এমন হীন, নিচ ও দুষ্কৃতিকারী ব্যক্তি ছিল যে, তার অপরাধ হালকা হওয়া বা কাফফারার কোনো মানে ছিল না। আল্লাহ তাআলা তার জন্য পরকালে বড় শাস্তির অঙ্গীকার করেছেন।
২. সে তার সঙ্গী ও সমমনাদের সাথে এ বিষয়ে কথা বললেও তারা তার বিরুদ্ধে সাক্ষ্য দেয়নি।
৩. কারো কারো মতে, যে কোনো ধরনের শরয়ী শাস্তি সাক্ষ্য-প্রমাণ বা স্বীকারোক্তির মাধ্যমে প্রয়োগ করা হয়। আর আবদুল্লাহ ইবনে উবাই এই অপরাধ স্বীকারও করেনি এবং তার বিরুদ্ধে কেউ সাক্ষীও দেয়নি। ঈমানদার ব্যক্তিদের সামনে তা আলোচনাও হয়নি।
৪. কেউ কেউ বলেছেন, রসূলুল্লাহ সা. বিশেষ বিবেচনায় তাকে শাস্তি দেননি। এছাড়া এর আগে তার বিভিন্ন মুনাফেকি কর্মকাণ্ড ও সারাক্ষণ মুসলমানদের ধোঁকা দেওয়ার প্রবণতা প্রকাশ পাওয়া সত্ত্বেও রসূলুল্লাহ সা. তার উপযুক্ত শাস্তি মৃত্যুদণ্ডও তার ওপর কার্যকর করেননি। উদ্দেশ্য ছিল তার গোত্রের লোকদের ইসলামের প্রতি আকৃষ্ট করা। রসূলুল্লাহ সা. চাননি তারা ইসলাম থেকে দূরে সরে যাক।
ইবনুল কাইয়্যিম বলেন, হয়তো রসূলুল্লাহ সা. এসব বিবেচনায় তাকে শাস্তির আওতায় আনেননি। ৮২৭
টিকাঃ
৮২১ আসসীরাতুন নববিয়্যাহ ফি যুয়িল মাসাদিরিল আসলিয়্যাহ: ৪৪১।
৮২২ হাদীসুল কুরআনিল কারীম আন গাযাওয়াতির রসূল: ১/৩৫৭।
৮২০ আসারুত তাতবীকিশ শারইয়াহ: ১১৭।
৮২৪ তাফসীরে কুরতুবী: ১২/১৯৭।
৮২৫ তাফসীরে কুরতুবী: ১২/২০১।
৮২৬ মারবিয়াতে গাযওয়ায়ে বানিল মুসতালিক: ২৪২।
৮২৭ যাদুল মাআদ: ৩/২৬৩-২৬৪।