📄 আয়েশার নির্দোষিতায় ওহী অবতীর্ণ
আয়েশা রা. বলেন, রসূলুল্লাহ সা. তখনও উঠে দাঁড়াননি এবং ঘরের কেউ বের হয়নি, এমন সময় রসূলুল্লাহ সা.-এর ওপর ওহী অবতীর্ণ হতে লাগলো। শীতের মধ্যেও রসূল সা.-এর শরীর থেকে মুক্তা দানার মতো ফোঁটা ফোঁটা ঘাম ঝরতে লাগলো। এটা ছিল ওহী অবতীর্ণ হওয়ার লক্ষণ। ওহী অবতরণ শেষ হলে রসূলুল্লাহ সা. হাসলেন। তখন তিনি প্রথম যে বাক্যটি বলেছিলেন তা হলো, হে আয়েশা! আল্লাহ্ তোমার নির্দোষিতা প্রকাশ করেছেন। এ সময় আমার মা আমাকে বললেন, তুমি উঠে বসো এবং তার কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করো। আমি বললাম, আল্লাহর কসম! আমি তার কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করবো না, আল্লাহ্ ব্যতীত আর কারো প্রশংসা করবো না। আল্লাহ তাআলা অবতীর্ণ করলেন,
إِنَّ الَّذِينَ جَاءُوا بِالْإِفْكِ عُصْبَةٌ مِنْكُمْ لَا تَحْسَبُوهُ شَرًّا لَكُمْ بَلْ هُوَ خَيْرٌ لَكُمْ لِكُلِّ امْرِئٍ مِنْهُمْ مَا اكْتَسَبَ مِنَ الْإِثْمِ وَالَّذِي تَوَلَّى كِبْرَهُ مِنْهُمْ لَهُ عَذَابٌ عَظِيمٌ لَوْلَا إِذْ سَمِعْتُمُوهُ ظَنَّ الْمُؤْمِنُونَ وَالْمُؤْمِنَاتُ بِأَنْفُسِهِمْ خَيْرًا وَقَالُوا هَذَا إِفْكُ مُبِينٌ لَوْلَا جَاءُوا عَلَيْهِ بِأَرْبَعَةِ شُهَدَاءَ فَإِذْ لَمْ يَأْتُوا بِالشُّهَدَاءِ فَأُولَئِكَ عِنْدَ اللَّهِ هُمُ الْكَاذِبُونَ وَلَوْلَا فَضْلُ اللَّهِ عَلَيْكُمْ وَرَحْمَتُهُ فِي الدُّنْيَا وَالْآخِرَةِ لَمَسَّكُمْ فِي مَا أَفَضْتُمْ فِيهِ عَذَابٌ عَظِيمٌ إِذْ تَلَقَّوْنَهُ بِأَلْسِنَتِكُمْ وَتَقُولُونَ بِأَفْوَاهِكُمْ مَا لَيْسَ لَكُمْ بِهِ عِلْمٌ وَتَحْسَبُونَهُ هَيِّنًا وَهُوَ عِنْدَ اللَّهِ عَظِيمٌ وَلَوْلَا إِذْ سَمِعْتُمُوهُ قُلْتُمْ مَا يَكُونُ لَنَا أَنْ نَتَكَلَّمَ بِهَذَا سُبْحَانَكَ هَذَا بُهْتَانُ عَظِيمٌ يَعِظُكُمُ اللَّهُ أَنْ تَعُودُوا لِمِثْلِهِ أَبَدًا إِنْ كُنْتُمْ مُؤْمِنِينَ وَيُبَيِّنُ اللَّهُ لَكُمُ الْآيَاتِ وَاللَّهُ عَلِيمٌ حَكِيمٌ إِنَّ الَّذِينَ يُحِبُّونَ أَنْ تَشِيعَ الْفَاحِشَةُ فِي الَّذِينَ آمَنُوا لَهُمْ عَذَابٌ أَلِيمٌ فِي الدُّنْيَا وَالْآخِرَةِ وَاللَّهُ يَعْلَمُ وَأَنْتُمْ لَا تَعْلَمُونَ وَلَوْلَا فَضْلُ اللَّهِ عَلَيْكُمْ وَرَحْمَتُهُ وَأَنَّ اللَّهَ رَءُوفٌ رَحِيمٌ
নিশ্চয়ই যারা এ অপবাদ রটনা করেছে, তারা তোমাদেরই একটি দল। এটাকে তোমরা তোমাদের জন্য অকল্যাণকর মনে করো না, বরং এটা তোমাদের জন্য কল্যাণকর। তাদের থেকে প্রত্যেক ব্যক্তির জন্য রয়েছে, যতটুকু পাপ সে অর্জন করেছে। আর তাদের থেকে যে ব্যক্তি এ ব্যাপারে প্রধান ভূমিকা পালন করেছে, তার জন্য রয়েছে মহা শাস্তি।
তোমরা যখন এটা শুনতে পেলে তখন কেন মুমিন পুরুষ ও মুমিন স্ত্রীরা তাদের নিজেদের লোক সম্পর্কে ভালো ধারণা করলো না আর বললো না, 'এটা তো খোলাখুলি অপবাদ।' তারা কেন এ ব্যাপারে চার জন সাক্ষী হাজির করেনি? যেহেতু তারা সাক্ষী হাজির করেনি, সেই কারণে তারা আল্লাহর বিধানে মিথ্যাবাদী।
আর যদি দুনিয়া ও আখেরাতে তোমাদের ওপর আল্লাহর দয়া ও তার অনুগ্রহ না থাকতো, তবে তোমরা যাতে লিপ্ত ছিলে, তার জন্য তোমাদেরকে অবশ্যই কঠিন আযাব স্পর্শ করতো। যখন এটা তোমরা মুখে মুখে ছড়াচ্ছিলে আর তোমাদের মুখ দিয়ে এমন কথা বলছিলে যে বিষয়ে তোমাদের কোন জ্ঞান ছিল না, আর তোমরা এটাকে নগণ্য ব্যাপার মনে করেছিলে, কিন্তু আল্লাহর নিকট তা ছিল গুরুতর ব্যাপার।
তোমরা যখন এটা শুনলে তখন তোমরা কেন বললে না যে, এ ব্যাপারে আমাদের কথা বলা ঠিক নয়। আল্লাহ পবিত্র ও মহান, এটা তো এক গুরুতর অপবাদ! আল্লাহ তোমাদেরকে উপদেশ দিচ্ছেন যে, যদি তোমরা মুমিন হও, তাহলে আর কখনো এর পুনরাবৃত্তি করবে না। আল্লাহ তোমাদের জন্য তাঁর আয়াতসমূহ সুস্পষ্টভাবে বিবৃত করেন এবং আল্লাহ সর্বজ্ঞ, প্রজ্ঞাময়। নিশ্চয় যারা এটা পছন্দ করে যে, মুমিনদের মধ্যে অশ্লীলতা ছড়িয়ে পড়ুক, তাদের জন্য দুনিয়া ও আখেরাতে রয়েছে যন্ত্রণাদায়ক আযাব। আর আল্লাহ জানেন এবং তোমরা জান না।
আর যদি তোমাদের উপর আল্লাহর অনুগ্রহ ও তার দয়া না থাকতো, (তাহলে তোমরা ধ্বংস হয়ে যেতে) আর নিশ্চয় আল্লাহ বড় মেহেরবান, পরম দয়ালু। ৭৯৬
📄 আবু বকর মিসতাহের সাহায্য বন্ধ করে দিলেন
আয়েশা রা. বলেন, আবু বকর সিদ্দীক রা. যিনি মিসতা ইবনে উসাসাকে আত্মীয়তা ও দারিদ্র্যের কারণে আর্থিক সাহায্য করতেন। যখন আল্লাহ তাআলা আমার নির্দোষিতার আয়াত অবতীর্ণ করলেন, তখন তিনি বললেন, আল্লাহর কসম! মিসতাহ আয়েশা সম্পর্কে যা বলেছে, এরপর আমি তাকে কখনই কিছুই দান করবো না। তারপর আল্লাহ তাআলা এই আয়াত অবতীর্ণ করলেন:
وَلَا يَأْتَلِ أُولُو الْفَضْلِ مِنْكُمْ وَالسَّعَةِ أَنْ يُؤْتُوا أُولِي الْقُرْبَى وَالْمَسَاكِينَ وَالْمُهَاجِرِينَ فِي سَبِيلِ اللَّهِ وَلْيَعْفُوا وَلْيَصْفَحُوا أَلَّا تُحِبُّونَ أَنْ يَغْفِرَ اللَّهُ لَكُمْ وَاللَّهُ غَفُورٌ رَحِيمٌ
আর তোমাদের মধ্যে যারা মর্যাদা ও প্রাচুর্যের অধিকারী, তারা যেন এমন কসম না করে যে, তারা নিকটাত্মীয়দের, মিসকীনদের ও আল্লাহর পথে হিজরতকারীদের কিছুই দেবে না। আর তারা যেন তাদের ক্ষমা করে এবং তাদের দোষত্রুটি উপেক্ষা করে। তোমরা কি পছন্দ কর না যে, আল্লাহ তোমাদের ক্ষমা করে দেন? আর আল্লাহ বড়ই ক্ষমাশীল, পরম দয়ালু। ৭৯৭
আবু বকর রা. এ আয়াত শুনে বললেন, আল্লাহর কসম! আমি অবশ্যই পছন্দ করি যে আল্লাহ্ আমাকে ক্ষমা করুন। তারপর তিনি মিসতাহকে আগের মতই সাহায্য দিতে লাগলেন এবং বললেন, আল্লাহর কসম! আমি এ সাহায্য কখনও বন্ধ করব না।
আয়েশা রা. বলেন, রসূলুল্লাহ সা. যয়নব বিনতে জাহশকেও আমার সম্পর্কে জিজ্ঞেস করেছিলেন। তিনি বলেছিলেন, হে জয়নব! (আয়েশা সম্পর্কে) কী জানো আর কী দেখেছো? তিনি বললেন, হে আল্লাহর রসূল! আমি আমার কান ও চোখকে বাঁচিয়ে রাখতে চাই। আমি তার সম্পর্কে ভাল ব্যতীত অন্য কিছু জানি না। রসূলুল্লাহ সা.-এর সহধর্মিণীদের মধ্যে তিনি আমার প্রতিদ্বন্দ্বী ছিলেন। কিন্তু আল্লাহ তাআলা তাকে তাকওয়ার কারণে রক্ষা করেছেন। তার বোন হামনা তার পক্ষ অবলম্বন করে অপবাদ দানকারীদের অন্তর্ভুক্ত হয় এবং যারা ধ্বংস হয়েছিল তাদের মধ্যে সেও ধ্বংস হয়। ৭৯৮
ইসলামের ওপর শত্রুদের পক্ষ থেকে যেসব ফেতনা এসেছিল, ইফকের ঘটনা সেগুলোর একটি। শত্রুদের পক্ষ থেকে আরোপিত এই অপবাদকে মিথ্যা।
টিকাঃ
৭৯৬ সূরা নূর: ১১-২০।
৭৯৭ সূরা নুর: ২২।
৭৯৮ সহীহ বুখারী: ৪৭৫০।
📄 ইফকের আয়াত থেকে শিক্ষণীয়
ইফকের ঘটনার পর অবতীর্ণ পবিত্র কুরআনের বাণী থেকে আলেমগণ বহু আদব ও আহকাম গ্রহণ করেছেন। তম্মধ্যে রয়েছে:
ক. পবিত্র কুরআনে উম্মুল মুমিনীন আয়েশা রা.-এর চারিত্রিক নির্দোষিতা বর্ণিত হয়েছে-যা কেয়ামত পর্যন্ত মানুষ তেলাওয়াত করতে থাকবে। আল্লাহ তাআলা বলেন:
إِنَّ الَّذِينَ جَاءُوا بِالْإِفْكِ عُصْبَةٌ مِنْكُمْ
নিশ্চয়ই যারা এ অপবাদ রটনা করেছে, তারা তোমাদেরই একটি দল। ৮০০
খ. এই ঘটনা অকল্যাণ থেকে কল্যাণের দিকে গড়িয়েছিল আল্লাহ তাআলার ইচ্ছায়। এই ঘটনা ছিল আবু বকর সিদ্দীক রা.-এর পরিবারের জন্য অনেক বড় পরীক্ষা। তবে শেষ পর্যন্ত এটা তাদের ধৈর্য ও ঈমানের বদৌলতে কল্যাণ বয়ে আনে। আল্লাহ তাআলা বলেন:
لَا تَحْسَبُوهُ شَرًّا لَكُمْ بَلْ هُوَ خَيْرٌ لَكُمْ
এটকে তোমরা তোমাদের জন্য অকল্যাণকর মনে করো না, বরং এটা তোমাদের জন্য কল্যাণকর। ৮০১
গ. পবিত্র কুরআনে মুমিনদের পরস্পরের প্রতি সহমর্মিতা ও উত্তম ধারণা রাখার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। আল্লাহ তাআলা বলেন :
لَوْلَا إِذْ سَمِعْتُمُوهُ ظَنَّ الْمُؤْمِنُونَ وَالْمُؤْمِنَاتُ بِأَنْفُسِهِمْ خَيْرًا وَقَالُوا هَذَا إِفْكُ مُبِينٌ
তোমরা যখন এটা শুনতে পেলে তখন কেন মুমিন পুরুষ ও মুমিন স্ত্রীরা তাদের নিজেদের লোক সম্পর্কে ভালো ধারণা করলো না আর বললো না, 'এটা তো খোলাখুলি অপবাদ। ৮০২
ঘ. যারা অপবাদের রটনা রটিয়েছিল, পবিত্র কুরআনে তাদের মিথ্যাবাদী হিসেবে আখ্যায়িত করা হয়। আল্লাহ তাআলা বলেন:
لَوْلَا جَاءُوا عَلَيْهِ بِأَرْبَعَةِ شُهَدَاءَ فَإِذْ لَمْ يَأْتُوا بِالشُّهَدَاءِ فَأُولَئِكَ عِنْدَ اللَّهِ هُمُ الْكَاذِبُونَ
তারা কেন এ ব্যাপারে চার জন সাক্ষী হাজির করেনি? যেহেতু তারা সাক্ষী হাজির করেনি, সেই কারণে তারা আল্লাহর বিধানে মিথ্যাবাদী। ৮০৩
ঙ. পবিত্র কুরআনে মুমিনদের প্রতি আল্লাহ তাআলার অনুগ্রহ ও মহব্বতের আলোচনা করতে গিয়ে আল্লাহ তাআলা বলেন:
وَلَوْلَا فَضْلُ اللَّهِ عَلَيْكُمْ وَرَحْمَتُهُ فِي الدُّنْيَا وَالْآخِرَةِ
আর যদি দুনিয়া ও আখেরাতে তোমাদের উপর আল্লাহর দয়া ও তার অনুগ্রহ না থাকতো। ৮০৪
চ. পবিত্র কুরআনে সংবাদ প্রচারের পূর্বে তা যাচাই-বাছাইয়ের নির্দেশ দেওয়া হয়। আল্লাহ তাআলা বলেন:
وَلَوْلَا إِذْ سَمِعْتُمُوهُ قُلْتُمْ مَا يَكُونُ لَنَا أَنْ نَتَكَلَّمَ بِهَذَا سُبْحَانَكَ هَذَا بُهْتَانُ عَظِيمٌ
তোমরা যখন এটা শুনলে তখন তোমরা কেন বললে না যে, এ ব্যাপারে আমাদের কথা বলা ঠিক নয়। আল্লাহ পবিত্র ও মহান, এটা তো এক গুরুতর অপবাদ! ৮০৫
ছ. পবিত্র কুরআনে এ জাতীয় মহাপাপ থেকে দূরে থাকার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। আল্লাহ তাআলা বলেন:
يَعِظُكُمُ اللَّهُ أَنْ تَعُودُوا لِمِثْلِهِ أَبَدًا إِنْ كُنْتُمْ مُؤْمِنِينَ
আল্লাহ তোমাদেরকে উপদেশ দিচ্ছেনঃ তোমরা যদি মুমিন হও তাহলে কখনও অনুরূপ আচরণের পুনরাবৃত্তি করো না। ৮০৬
জ. পবিত্র কুরআনে অশ্লীলতার প্রচার-প্রসার থেকে দূরে থাকার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। আল্লাহ তাআলা বলেন:
إِنَّ الَّذِينَ يُحِبُّونَ أَنْ تَشِيعَ الْفَاحِشَةُ فِي الَّذِينَ آمَنُوا لَهُمْ عَذَابٌ أَلِيمٌ فِي الدُّنْيَا وَالْآخِرَةِ وَاللَّهُ يَعْلَمُ وَأَنْتُمْ لَا تَعْلَمُونَ
নিশ্চয় যারা এটা পছন্দ করে যে, মুমিনদের মধ্যে অশ্লীলতা ছড়িয়ে পড়ুক, তাদের জন্য দুনিয়া ও আখেরাতে রয়েছে যন্ত্রণাদায়ক আযাব। আর আল্লাহ জানেন এবং তোমরা জানো না। ৮০৭
ঝ. কুরআনে মুমিনদের প্রতি আল্লাহর দয়া ও মহব্বতের কথা আলোচনা করা হয়েছে:
وَلَوْلَا فَضْلُ اللَّهِ عَلَيْكُمْ وَرَحْمَتُهُ وَأَنَّ اللَّهَ رَءُوفٌ رَحِيمٌ
তোমাদের প্রতি আল্লাহর অনুগ্রহ ও দয়া না থাকলে (তোমরা ধ্বংস হয়ে যেতে), আল্লাহ দয়ার্দ্র, বড়ই দয়াবান। ৮০৮
ঞ. মানুষকে ধ্বংসের পথ প্রদর্শনকারী শয়তানের অনুসরণ করতে নিষেধ করা হয়েছে। আল্লাহ তাআলা বলেন:
يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا لَا تَتَّبِعُوا خُطُوَاتِ الشَّيْطَانِ وَمَنْ يَتَّبِعْ خُطُوَاتِ الشَّيْطَانِ فَإِنَّهُ يَأْمُرُ بِالْفَحْشَاءِ وَالْمُنْكَرِ وَلَوْلَا فَضْلُ اللَّهِ عَلَيْكُمْ وَرَحْمَتُهُ مَا زَكَا مِنْكُمْ مِنْ أَحَدٍ أَبَدًا وَلَكِنَّ اللَّهَ يُزَكِّي مَنْ يَشَاءُ وَاللَّهُ سَمِيعٌ عَلِيمٌ
হে মুমিনগণ, তোমরা শয়তানের পদাঙ্কসমূহ অনুসরণ করো না। আর যে শয়তানের পদাঙ্কসমূহ অনুসরণ করবে, নিশ্চয় সে অশ্লীলতা ও মন্দ কাজের নির্দেশ দেবে। আর যদি তোমাদের প্রতি আল্লাহর অনুগ্রহ ও তার দয়া না থাকতো, তাহলে তোমাদের কেউই কখনো পবিত্র হতে পারতে না; কিন্তু আল্লাহ যাকে ইচ্ছা করেন, পবিত্র করেন। আর আল্লাহ সর্বশ্রোতা, মহাজ্ঞানী। ৮০৯
ট. কাছের মানুষ যদি মন্দ আচরণও করে, তবুও তাদের জন্য ব্যয়ের হাত উন্মুক্ত রাখা উচিত। ৮১০
এ প্রসঙ্গে বলা হয়েছে:
وَلَا يَأْتَلِ أُولُو الْفَضْلِ مِنْكُمْ وَالسَّعَةِ أَنْ يُؤْتُوا أُولِي الْقُرْبَى وَالْمَسَاكِينَ وَالْمُهَاجِرِينَ فِي سَبِيلِ اللَّهِ وَلْيَعْفُوا وَلْيَصْفَحُوا أَلَّا تُحِبُّونَ أَنْ يَغْفِرَ اللَّهُ لَكُمْ وَاللَّهُ غَفُورٌ رَحِيمٌ
আর তোমাদের মধ্যে যারা মর্যাদা ও প্রাচুর্যের অধিকারী, তারা যেন এমন কসম না করে যে, তারা নিকটাত্মীয়দের, মিসকীনদের ও আল্লাহর পথে হিজরতকারীদের কিছুই দেবে না। আর তারা যেন তাদের ক্ষমা করে এবং তাদের দোষত্রুটি উপেক্ষা করে। তোমরা কি পছন্দ কর না যে, আল্লাহ তোমাদের ক্ষমা করে দেন? আর আল্লাহ বড়ই ক্ষমাশীল, পরম দয়ালু। ৮১১
ঠ. যেসব ঈমানদার সত্য ও ন্যায়ের পথে থাকে, আল্লাহ তাদের প্রতি দয়া করে থাকেন। তাদের বিরুদ্ধে যারা মিথ্যা অপবাদ রটায়, তিনি তাদের দুনিয়া ও আখেরাতে ধ্বংস করেন। এ মর্মে আল্লাহ তাআলার বাণী:
إِنَّ الَّذِينَ يَرْمُونَ الْمُحْصَنَاتِ الْغَافِلَاتِ الْمُؤْمِنَاتِ لُعِنُوا فِي الدُّنْيَا وَالْآخِرَةِ وَلَهُمْ عَذَابٌ عَظِيمٌ يَوْمَ تَشْهَدُ عَلَيْهِمْ أَلْسِنَتُهُمْ وَأَيْدِيهِمْ وَأَرْجُلُهُمْ بِمَا كَانُوا يَعْمَلُونَ يَوْمَئِذٍ يُوَفِّيهِمُ اللَّهُ دِينَهُمُ الْحَقَّ وَيَعْلَمُونَ أَنَّ اللَّهَ هُوَ الْحَقُّ الْمُبِينُ
যারা সচ্চরিত্রা সরলমনা মুমিন নারীদের প্রতি অপবাদ আরোপ করে, তারা দুনিয়া ও আখেরাতে অভিশপ্ত। আর তাদের জন্য রয়েছে মহাআযাব। যেদিন তাদের বিরুদ্ধে সাক্ষ্য দেবে তাদের জিহবা, তাদের হাত, তাদের পা তাদের কৃতকর্মের ব্যাপারে। সেদিন আল্লাহ তাদেরকে তাদের ন্যায্য প্রতিদান পুরোপুরি দিয়ে দেবেন, আর তারা জানবে যে, আল্লাহই সুস্পষ্ট সত্য। ৮১২
তাফসির গ্রন্থ কাশশাফ-এর লেখক উপরোক্ত আয়াতসমূহের ব্যাখ্যায় লিখেন, পবিত্র কুরআনে যত স্থানে পাপিষ্ট ব্যক্তিদের ব্যাপারে শাস্তির ধমক দেওয়া হয়েছে, কোথাও আয়েশা-রা.এর ওপর অপবাদ রটনাকারীদের মতো শব্দ ব্যবহার করা হয়নি। ইফকের ঘটনায় জড়িতদের ব্যাপারে যে ধরনের কঠিন শাস্তি ও মারাত্মক পরিণামের কথা কুরআনে কারীমে বলা হয়েছে; তা অন্য কারও ব্যাপারে বলা হয়নি। কেননা, তাদের অপরাধ ছিল মারাত্মক। এ কারণে মহান আল্লাহ বিভিন্নভাবে তাদের অপরাধের জঘন্যতা তুলে ধরেছেন। এ জাতীয় অপরাধের জন্য তাদের আখেরাতের শাস্তির ব্যাপারে উপযুক্ত আয়াত অবতীর্ণ না হলেও, শুধু একজন মুসলমানের ওপর অপবাদের কারণে إِنَّ الَّذِينَ جَاءُو بِالإِفْكِ থেকে শুরু করে هُمْ الْمُفْلِحُونَ পর্যন্ত যেসব শাস্তির কথা কুরআনে বলা হয়েছে, তা-ই ছিল যথেষ্ট।
ড. এটা আল্লাহ তাআলার চিরন্তন নিয়ম যে, তিনি পবিত্র পুরুষদের জন্য পবিত্র নারীদের এবং পবিত্র নারীদের জন্য পবিত্র পুরুষদের নির্ধারিত করে থাকেন। এ প্রসঙ্গে বলা হয়েছে:
الْخَبِيثَاتُ لِلْخَبِيثِينَ وَالْخَبِيثُونَ لِلْخَبِيثَاتِ وَالطَّيِّبَاتُ لِلطَّيِّبِينَ وَالطَّيِّبُونَ لِلطَّيِّبَاتِ أُولَئِكَ مُبَرَّءُونَ مِمَّا يَقُولُونَ لَهُمْ مَغْفِرَةٌ وَرِزْقٌ كَرِيمٌ
চরিত্রহীনা নারী চরিত্রহীন পুরুষদের জন্য, আর চরিত্রহীন পুরুষ চরিত্রহীনা নারীদের জন্য, চরিত্রবতী নারী চরিত্রবান পুরুষের জন্য, আর চরিত্রবান পুরুষ চরিত্রবতী নারীদের জন্য। লোকেরা যা বলে তা থেকে তারা পবিত্র। তাদের জন্য আছে ক্ষমা ও সম্মানজনক জীবিকা।
ঢ. উম্মুল মুমিনীন আয়েশা রা.-এর ব্যাপারে অপবাদ রটনায় সাধারণত চার ভাগে বিভক্ত লোকজন দেখা যায়। শায়েখ আবদুল কাদের শাইবাতুল হামদ ইফকের হাদীস সম্পর্কে মন্তব্য করতে গিয়ে বলেন, এ ব্যাপারে মানুষেরা চার ভাগে বিভক্ত হয়ে পড়ে। যথা:
১. বেশিরভাগ মানুষ নিজেদের কান এবং মুখের লাগাম টেনে ধরতে সক্ষম হন। তারা এ ধরনের আলোচনাকে সত্যও বলেননি, মিথ্যাও বলেননি।
২. কিছু মানুষ শুরু থেকেই এ ধরনের বক্তব্যকে মিথ্যা অপবাদ হিসেবে ধরে নেন। তাদের মধ্যে রয়েছেন, আবু আইয়ুব আনসারী রা. ও উম্মে আইয়ুব রা. প্রমুখ।
৩. অনেকে এটাকে সত্যও বলেননি, মিথ্যাও বলেননি। তবে ইফকের ঘটনায় জড়িতরা যা বলছিল তা নিয়ে কথা বলতেন। এটাকে তারা আল্লাহ তাআলার পক্ষ থেকে শাস্তি হতে পারে এমন জঘন্য কাজ মনে করেননি। তারা মনে করেছিলেন, কুফরি বক্তব্য বর্ণনা করা কুফরি নয়। তাই তারা ভেবেছিলেন হয়তো ইফকের ঘটনা শুধু বর্ণনা করা অপবাদ হিসেবে গণ্য হবে না। এদের মধ্যে ছিলেন হামনা বিনতে জাহাশ, হাসসান ইবনে সাবিত ও মিসতাহ ইবনে উসাসা।
৪. একটি দল এমন অপবাদের ঘটনা রটায় এবং ব্যাপকভাবে প্রচার করে। আল্লাহর শত্রু মুনাফেক নেতা আবদুল্লাহ ইবনে উবাই ছিল এই পক্ষের নেতা। অপবাদের ঘটনার মূল হোতা ছিল সেই।
পবিত্র কুরআনে আল্লাহ তাআলা দ্বিতীয় শ্রেণির মানুষদের প্রশংসা করেছেন। সবার কাছ থেকে এমন আচরণই কাম্য ছিল। এ প্রসঙ্গে বলা হয়েছে:
لَوْلَا إِذْ سَمِعْتُمُوهُ ظَنَّ الْمُؤْمِنُونَ وَالْمُؤْمِنَاتُ بِأَنْفُسِهِمْ خَيْرًا وَقَالُوا هَذَا إِفْكُ مُبِينٌ
তোমরা যখন এটা শুনতে পেলে তখন কেন মুমিন পুরুষ ও মুমিন স্ত্রীরা তাদের নিজেদের লোক সম্পর্কে ভালো ধারণা করলো না আর বললো না, 'এটা তো খোলাখুলি অপবাদ। ১৮১৬
তৃতীয় প্রকার মানুষের আচরণ অনুচিত বলে মন্তব্য করে আল্লাহ তাআলা বলেন,
وَلَوْلَا إِذْ سَمِعْتُمُوهُ قُلْتُمْ مَا يَكُونُ لَنَا أَنْ نَتَكَلَّمَ بِهَذَا سُبْحَانَكَ هَذَا بُهْتَانُ عَظِيمٌ
তোমরা যখন এটা শুনলে তখন তোমরা কেন বললে না যে, এ ব্যাপারে আমাদের কথা বলা ঠিক নয়। আল্লাহ পবিত্র ও মহান, এটা তো এক গুরুতর অপবাদ! ৮১৭
অবশ্য আল্লাহ তাআলা এ ধরনের মানুষের অতীতের সৎকর্মসমূহের আলোচনাও করেছেন। যেমন, যখন আবু বকর সিদ্দীক মিসতাহ-এর এ অপরাধের কারণে তাকে কোনো ধরনের সদকা না দেওয়ার শপথ করেছিলেন, তখন কুরআনে কারীমে মিসতাহ-এর ইসলামগ্রহণ ও হিজরতসহ বিভিন্ন গুণের কথা বলা হয়েছে। আল্লাহ বলেছেন:
وَلَا يَأْتَلِ أُولُو الْفَضْلِ مِنْكُمْ وَالسَّعَةِ أَنْ يُؤْتُوا أُولِي الْقُرْبَى وَالْمَسَاكِينَ وَالْمُهَاجِرِينَ فِي سَبِيلِ اللَّهِ وَلْيَعْفُوا وَلْيَصْفَحُوا أَلَّا تُحِبُّونَ أَنْ يَغْفِرَ اللَّهُ لَكُمْ وَاللَّهُ غَفُورٌ رَحِيمٌ
আর তোমাদের মধ্যে যারা মর্যাদা ও প্রাচুর্যের অধিকারী, তারা যেন এমন কসম না করে যে, তারা নিকটাত্মীয়দের, মিসকীনদের ও আল্লাহর পথে হিজরতকারীদের কিছুই দেবে না। আর তারা যেন তাদের ক্ষমা করে এবং তাদের দোষত্রুটি উপেক্ষা করে। তোমরা কি পছন্দ কর না যে, আল্লাহ তোমাদের ক্ষমা করে দেন? আর আল্লাহ বড়ই ক্ষমাশীল, পরম দয়ালু।৮১৮
চতুর্থ যে দলটির নেতৃত্ব দিয়েছিল আবদুল্লাহ ইবনে উবাই ও তার অনুসারীরা। কুরআনে কারীমে তাদের কুফুরির ওপর অটল থাকা, ভবিষ্যতে তাওবার সুযোগ না-হওয়া, দুনিয়া ও আখেরাতে অভিশপ্ত৮১৯ হওয়ার ঘোষণা দেওয়া হয়েছে। এ মর্মে আল্লাহ তাআলার বাণী:
إِنَّ الَّذِينَ يَرْمُونَ الْمُحْصَنَاتِ الْغَافِلَاتِ الْمُؤْمِنَاتِ لُعِنُوا فِي الدُّنْيَا وَالْآخِرَةِ وَلَهُمْ عَذَابٌ عَظِيمٌ يَوْمَ تَشْهَدُ عَلَيْهِمْ أَلْسِنَتُهُمْ وَأَيْدِيهِمْ وَأَرْجُلُهُمْ بِمَا كَانُوا يَعْمَلُونَ يَوْمَئِذٍ يُوَفِّيهِمُ اللَّهُ دِينَهُمُ الْحَقَّ وَيَعْلَمُونَ أَنَّ اللَّهَ هُوَ الْحَقُّ الْمُبِينُ
যারা সচ্চরিত্রা সরলমনা মুমিন নারীদের প্রতি অপবাদ আরোপ করে, তারা দুনিয়া ও আখেরাতে অভিশপ্ত। আর তাদের জন্য রয়েছে মহাআযাব। যেদিন তাদের বিরুদ্ধে সাক্ষ্য দেবে তাদের জিহবা, তাদের হাত, তাদের পা তাদের কৃতকর্মের ব্যাপারে। সেদিন আল্লাহ তাদেরকে তাদের ন্যায্য প্রতিদান পুরোপুরি দিয়ে দেবেন, আর তারা জানবে যে, আল্লাহই সুস্পষ্ট সত্য।৮২০
টিকাঃ
৭৯৯ আসসীরাতুন নববিয়্যাহ ফি জুয়িল মাসাদিরিল আসলিয়্যাহ: ৪৪০।
৮০০ সূরা নূর: ১১।
৮০১ সূরা নূর: ১১।
৮০২ সূরা নূর: ১২।
৮০৩ সূরা নূর: ১৩।
৮০৪ সূরা নূর: ১৪।
৮০৫ সূরা নূর: ১৬।
৮০৬ সূরা নূর: ১৭।
৮০৭ সূরা নূর: ১৯।
৮০৮ সূরা নূর: ২০।
৮০৯ সূরা নূর: ২১।
৮১০ হাদীসুল কুরআনিল কারীম আন গাযাওয়াতির রসূল: ১/৩৮৫-৩৮৬।
৮১১ সূরা নূর: ২২।
৮১২ সূরা নূর: ২৩-২৫।
৮১৬ সূরা নূর: ১২।
৮১৭ সূরা নূর: ১৬।
৮১৮ সূরা নূর: ২২।
৮১৯ ফিহুল ইসলাম শরহি বুলুগুল মারাম: ৫/৯।
৮২০ সূরা নূর: ২৩-২৫।
📄 বনু মুসতালিকের যুদ্ধ ও ইফকের ঘটনা থেকে প্রাপ্ত শিক্ষা
এই অধ্যায়ে কোনো কন্টেন্ট এখনো যোগ করা হয়নি।