📄 ওহী আসতে দেরি হওয়ায় সাহাবীদের সাথে নবীজির পরামর্শ
অন্যদিকে ওহী আসতেও দেরি হচ্ছিলো। রসূলুল্লাহ সা. আলী ইবনে আবু তালিব রা. ও উসামা ইবনে যায়েদ রা.-কে ডাকলেন তার স্ত্রীর বিচ্ছেদের ব্যাপারে তাদের সাথে পরামর্শের জন্য। আয়েশা রা. বলেন, উসামা ইবনে যায়েদ আমার পবিত্রতার ব্যাপারে জানতেন। সে অনুযায়ী তিনি বললেন, হে আল্লাহর রসূল! আপনার স্ত্রী সম্পর্কে আমরা ভাল ধারণাই পোষণ করি। আলী ইবনে আবু তালিব রা. বললেন, হে আল্লাহর রসূল! আল্লাহ্ আপনার উপর কোনো পথ সংকীর্ণ করে দেননি এবং তিনি ছাড়া বহু নারী রয়েছেন। আপনি যদি দাসীকে জিজ্ঞেস করেন, সে আপনার কাছে সত্য ঘটনা বলবে।
তারপর রসূলুল্লাহ সা. আয়েশা রা.-এর দাসী বারীরাকে ডাকলেন এবং বললেন, হে বারীরা! তুমি কি তার মধ্যে সন্দেহজনক কিছু দেখেছো? বারীরা বললেন, যিনি আপনাকে সত্যসহ প্রেরণ করেছেন, তার কসম! আমি এমন কোনো কিছু তার মধ্যে দেখিনি, যা আমাকে গোপন করতে হবে। তবে তিনি একজন অল্পবয়স্কা বালিকা। কখনও কখনও আটার খামির রেখে ঘুমিয়ে পড়তেন, ছাগলের বাচ্চা এসে তা খেয়ে ফেলতো।
এরপরে রসূলুল্লাহ সা. মিম্বরে দাঁড়ালেন। আবদুল্লাহ ইবনে উবাই-এর বিরুদ্ধে তিনি সমর্থন চাইলেন। রসূলুল্লাহ সা. বললেন, হে মুসলিম সম্প্রদায়! তোমাদের মধ্যে কে ওই ব্যক্তি থেকে আমাকে নিস্কৃতি দিতে পারবে, যে আমার স্ত্রীর ব্যাপারে আমাকে কষ্ট দিয়েছে। আল্লাহর কসম! আমি আমার স্ত্রী সম্পর্কে ভালই জানি এবং তারা এমন এক পুরুষ সম্পর্কে অভিযোগ এনেছে, যার সম্পর্কে আমি ভাল ব্যতীত কিছু জানি না। সে কখনও আমার অনুপস্থিতিতে আমার ঘরে আসেনি।
এ কথা শুনে সাআদ ইবনে মুআয আনসারী রা. দাঁড়িয়ে বললেন, হে আল্লাহর রসূল! তার বিরুদ্ধে আমি আপনাকে সাহায্য করবো, যদি সে আউস গোত্রের হয়, তবে আমি তার গর্দান উড়িয়ে দেবো। আর যদি আমাদের ভাই খাযরাজ গোত্রের লোক হয়, তবে আপনি নির্দেশ দিলে আমি আপনার নির্দেশ কার্যকর করব।
📄 ইফকের ফেনার প্রভাব
আয়েশা রা. বলেন, এরপর খাযরাজ গোত্রের সর্দার সাআদ ইবনে উবাদা দাঁড়ালেন। তিনি একজন নেককার ব্যক্তি। কিন্তু এ সময় স্বগোত্র-প্রীতি তাকে উত্তেজিত করে তোলে। তিনি সাআদকে বললেন, চিরঞ্জীব আল্লাহর কসম! তুমি মিথ্যা বলেছো, তুমি তাকে হত্যা করতে পারবে না এবং তাকে হত্যা করার ক্ষমতা তুমি রাখো না। তারপর উসায়েদ ইবনে হুযায়ের দাঁড়ালেন-যিনি সাআদের চাচাতো ভাই-তিনি সাআদ ইবনে উবাদাকে বললেন, চিরঞ্জীব আল্লাহর কসম! তুমি মিথ্যা বলছো। আমরা অবশ্যই তাকে হত্যা করবো।
তুমি নিজেও মুনাফেক এবং মুনাফেকের পক্ষে প্রতিবাদ করছো। এতে আউস এবং খাযরাজ উভয় গোত্রের লোকেরা উত্তেজিত হয়ে উঠলো। তাদের মধ্যে যুদ্ধ বেঁধে যাওয়ার মতো অবস্থা হলো। রসূলুল্লাহ সা. মিম্বরে দাঁড়িয়ে ছিলেন। রসূলুল্লাহ সা. অনেক চেষ্টা করে তাদের থামালেন এবং নিজেও চুপ হয়ে গেলেন।
আয়েশা রা. বলেন, আমি অনবরত কেঁদেই যাচ্ছিলাম। দুই রাত এক দিন ধরে আমি কাঁদলাম। পরদিন সকালে আব্বা আম্মা আমার কাছে এলেন। তারা আশংকা করছিলেন, কাঁদতে কাঁদতে আমার কলজে ফেটে যাবে!
তারা আমার কাছে বসে ছিলেন। এ সময় এক আনসারী নারী আমার কাছে আসতে চাইলেন। আমি তাকে অনুমতি দিলাম। তিনিও বসে আমার সঙ্গে কাঁদতে লাগলেন। এ অবস্থার মধ্যেই রসূলুল্লাহ সা. আমাদের ঘরে এলেন এবং সালাম দিয়ে বসলেন। রটনা শুরু হওয়ার পর সেদিনই প্রথম তিনি আমার কাছে বসলেন।
📄 নবীজি আয়েশা-এর কাছে ব্যাখ্যা চাইলেন
আয়েশা রা. বলেন, রসূল সা. একমাস অপেক্ষা করেছেন, কিন্তু আমার সম্পর্কে কোনো ওহী আসেনি। তিনি আমার কাছে বসে তাশাহুদ পাঠ করলেন। তারপর বললেন, হে আয়েশা! তোমার সম্পর্কে এরূপ এরূপ কথা আমার কাছে পৌঁছেছে, তুমি যদি নির্দোষ হয়ে থাক, তবে অচিরেই আল্লাহ তাআলা তোমার পবিত্রতা ঘোষণা করে দেবেন। আর যদি তুমি কোনো পাপে লিপ্ত হয়ে থাকো, তবে আল্লাহর কাছে ক্ষমা চাও এবং তার কাছে তাওবা করো। কেননা, বান্দা যখন তার পাপ স্বীকার করে নেয় এবং আল্লাহর কাছে তাওবা করে, তখন আল্লাহ্ তার তাওবা কবুল করেন। আয়েশা রা. বললেন, যখন রসূলুল্লাহ সা. তার কথা শেষ করলেন, তখন আমার চোখের পানি পুরোপুরি শুকিয়ে গেলো। এক ফোঁটা পানিও আর ঝরলো না। আমি আমার পিতাকে বললাম, আপনি রসূলুল্লাহ সা.-এর কথার জবাব দিন। তিনি বললেন, কী জবাব দেবো বুঝতে পারছি না। আমি আম্মাকে বললাম, আপনি রসূল সা.-এর কথার জবাব দিন। ততক্ষণে তিনি বললেন, আমি বুঝতে পারছি না কী বলবো। আমি তখন একজন অল্প বয়স্কা বালিকা, কুরআন খুব অধিক পড়িনি। তবুও আমি নিজেই বললাম, আল্লাহর কসম! আমি জানি, আপনারা এ ঘটনা শুনেছেন, এমনকি তা আপনারা সত্য বলে বিশ্বাসও করে নিয়েছেন। এখন যদি আমি বলি, আমি নির্দোষ এবং আল্লাহ্ ভালভাবেই জানেন আমি নির্দোষ, তবে আপনারা তা বিশ্বাস করবেন না। আর আমি যদি আপনাদের কাছে এ বিষয় স্বীকার করে নেই, অথচ আল্লাহ্ জানেন আমি তা থেকে নির্দোষ, তবে আপনারা আমার কথা বিশ্বাস করে নেবেন। আল্লাহর কসম! এ ক্ষেত্রে আমি আপনাদের জন্য ইউসুফ আ.-এর পিতার উক্তির চেয়ে উত্তম কোনো কথা খুঁজে পাচ্ছি না। তিনি বলেছিলেন, فَصَبْرٌ جَمِيلٌ وَاللهُ الْمُسْتَعَانُ عَلَى مَا تصِفُوْنَ (অর্থাৎ উত্তম ধৈর্য ধারণ করছি এবং তোমরা যা বলছো সে বিষয়ে একমাত্র আল্লাহর কাছেই সাহায্য চাওয়া যায়।
তিনি বলেন, এরপর আমি আমার চেহারা ঘুরিয়ে নিলাম এবং কাত হয়ে বিছানায় শুয়ে পড়লাম। এ সময় আমার বিশ্বাস ছিল, আল্লাহ তাআলা আমার নির্দোষিতা প্রকাশ করে দেবেন। কিন্তু আল্লাহর কসম! আমি তখন কল্পনাও করতে পারিনি যে, আল্লাহ্ আমার সম্পর্কে এমন ওহী অবতীর্ণ করবেন যা যুগ যুগ ধরে তিলাওয়াত করা হবে। আমার দৃষ্টিতে আমার মর্যাদা এর চাইতে অনেক কম ছিল। আমি আশা করেছিলাম, হয়ত রসূলুল্লাহ সা. কোন স্বপ্ন দেখবেন, যে স্বপ্নে আল্লাহ তাআলা আমার নির্দোষিতা তাকে জানিয়ে দেবেন।
📄 আয়েশার নির্দোষিতায় ওহী অবতীর্ণ
আয়েশা রা. বলেন, রসূলুল্লাহ সা. তখনও উঠে দাঁড়াননি এবং ঘরের কেউ বের হয়নি, এমন সময় রসূলুল্লাহ সা.-এর ওপর ওহী অবতীর্ণ হতে লাগলো। শীতের মধ্যেও রসূল সা.-এর শরীর থেকে মুক্তা দানার মতো ফোঁটা ফোঁটা ঘাম ঝরতে লাগলো। এটা ছিল ওহী অবতীর্ণ হওয়ার লক্ষণ। ওহী অবতরণ শেষ হলে রসূলুল্লাহ সা. হাসলেন। তখন তিনি প্রথম যে বাক্যটি বলেছিলেন তা হলো, হে আয়েশা! আল্লাহ্ তোমার নির্দোষিতা প্রকাশ করেছেন। এ সময় আমার মা আমাকে বললেন, তুমি উঠে বসো এবং তার কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করো। আমি বললাম, আল্লাহর কসম! আমি তার কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করবো না, আল্লাহ্ ব্যতীত আর কারো প্রশংসা করবো না। আল্লাহ তাআলা অবতীর্ণ করলেন,
إِنَّ الَّذِينَ جَاءُوا بِالْإِفْكِ عُصْبَةٌ مِنْكُمْ لَا تَحْسَبُوهُ شَرًّا لَكُمْ بَلْ هُوَ خَيْرٌ لَكُمْ لِكُلِّ امْرِئٍ مِنْهُمْ مَا اكْتَسَبَ مِنَ الْإِثْمِ وَالَّذِي تَوَلَّى كِبْرَهُ مِنْهُمْ لَهُ عَذَابٌ عَظِيمٌ لَوْلَا إِذْ سَمِعْتُمُوهُ ظَنَّ الْمُؤْمِنُونَ وَالْمُؤْمِنَاتُ بِأَنْفُسِهِمْ خَيْرًا وَقَالُوا هَذَا إِفْكُ مُبِينٌ لَوْلَا جَاءُوا عَلَيْهِ بِأَرْبَعَةِ شُهَدَاءَ فَإِذْ لَمْ يَأْتُوا بِالشُّهَدَاءِ فَأُولَئِكَ عِنْدَ اللَّهِ هُمُ الْكَاذِبُونَ وَلَوْلَا فَضْلُ اللَّهِ عَلَيْكُمْ وَرَحْمَتُهُ فِي الدُّنْيَا وَالْآخِرَةِ لَمَسَّكُمْ فِي مَا أَفَضْتُمْ فِيهِ عَذَابٌ عَظِيمٌ إِذْ تَلَقَّوْنَهُ بِأَلْسِنَتِكُمْ وَتَقُولُونَ بِأَفْوَاهِكُمْ مَا لَيْسَ لَكُمْ بِهِ عِلْمٌ وَتَحْسَبُونَهُ هَيِّنًا وَهُوَ عِنْدَ اللَّهِ عَظِيمٌ وَلَوْلَا إِذْ سَمِعْتُمُوهُ قُلْتُمْ مَا يَكُونُ لَنَا أَنْ نَتَكَلَّمَ بِهَذَا سُبْحَانَكَ هَذَا بُهْتَانُ عَظِيمٌ يَعِظُكُمُ اللَّهُ أَنْ تَعُودُوا لِمِثْلِهِ أَبَدًا إِنْ كُنْتُمْ مُؤْمِنِينَ وَيُبَيِّنُ اللَّهُ لَكُمُ الْآيَاتِ وَاللَّهُ عَلِيمٌ حَكِيمٌ إِنَّ الَّذِينَ يُحِبُّونَ أَنْ تَشِيعَ الْفَاحِشَةُ فِي الَّذِينَ آمَنُوا لَهُمْ عَذَابٌ أَلِيمٌ فِي الدُّنْيَا وَالْآخِرَةِ وَاللَّهُ يَعْلَمُ وَأَنْتُمْ لَا تَعْلَمُونَ وَلَوْلَا فَضْلُ اللَّهِ عَلَيْكُمْ وَرَحْمَتُهُ وَأَنَّ اللَّهَ رَءُوفٌ رَحِيمٌ
নিশ্চয়ই যারা এ অপবাদ রটনা করেছে, তারা তোমাদেরই একটি দল। এটাকে তোমরা তোমাদের জন্য অকল্যাণকর মনে করো না, বরং এটা তোমাদের জন্য কল্যাণকর। তাদের থেকে প্রত্যেক ব্যক্তির জন্য রয়েছে, যতটুকু পাপ সে অর্জন করেছে। আর তাদের থেকে যে ব্যক্তি এ ব্যাপারে প্রধান ভূমিকা পালন করেছে, তার জন্য রয়েছে মহা শাস্তি।
তোমরা যখন এটা শুনতে পেলে তখন কেন মুমিন পুরুষ ও মুমিন স্ত্রীরা তাদের নিজেদের লোক সম্পর্কে ভালো ধারণা করলো না আর বললো না, 'এটা তো খোলাখুলি অপবাদ।' তারা কেন এ ব্যাপারে চার জন সাক্ষী হাজির করেনি? যেহেতু তারা সাক্ষী হাজির করেনি, সেই কারণে তারা আল্লাহর বিধানে মিথ্যাবাদী।
আর যদি দুনিয়া ও আখেরাতে তোমাদের ওপর আল্লাহর দয়া ও তার অনুগ্রহ না থাকতো, তবে তোমরা যাতে লিপ্ত ছিলে, তার জন্য তোমাদেরকে অবশ্যই কঠিন আযাব স্পর্শ করতো। যখন এটা তোমরা মুখে মুখে ছড়াচ্ছিলে আর তোমাদের মুখ দিয়ে এমন কথা বলছিলে যে বিষয়ে তোমাদের কোন জ্ঞান ছিল না, আর তোমরা এটাকে নগণ্য ব্যাপার মনে করেছিলে, কিন্তু আল্লাহর নিকট তা ছিল গুরুতর ব্যাপার।
তোমরা যখন এটা শুনলে তখন তোমরা কেন বললে না যে, এ ব্যাপারে আমাদের কথা বলা ঠিক নয়। আল্লাহ পবিত্র ও মহান, এটা তো এক গুরুতর অপবাদ! আল্লাহ তোমাদেরকে উপদেশ দিচ্ছেন যে, যদি তোমরা মুমিন হও, তাহলে আর কখনো এর পুনরাবৃত্তি করবে না। আল্লাহ তোমাদের জন্য তাঁর আয়াতসমূহ সুস্পষ্টভাবে বিবৃত করেন এবং আল্লাহ সর্বজ্ঞ, প্রজ্ঞাময়। নিশ্চয় যারা এটা পছন্দ করে যে, মুমিনদের মধ্যে অশ্লীলতা ছড়িয়ে পড়ুক, তাদের জন্য দুনিয়া ও আখেরাতে রয়েছে যন্ত্রণাদায়ক আযাব। আর আল্লাহ জানেন এবং তোমরা জান না।
আর যদি তোমাদের উপর আল্লাহর অনুগ্রহ ও তার দয়া না থাকতো, (তাহলে তোমরা ধ্বংস হয়ে যেতে) আর নিশ্চয় আল্লাহ বড় মেহেরবান, পরম দয়ালু। ৭৯৬