📄 রসূলুল্লাহ সা.-এর বীরত্ব ও জাবের ইবনে আবদুল্লাহর ঘটনা
ক. রসূলুল্লাহ সা.-এর বীরত্ব
রসূলুল্লাহ সা. তখন যাতুর রিকা যুদ্ধে নজদ এলাকায় অবস্থান করছেন। একদিন নাখলা প্রান্তরে কায়লুলার সময় তিনি একটি কাঁটাযুক্ত গাছের ছায়ায় বিশ্রাম নিচ্ছিলেন। সাহাবায়ে কেরামও ছায়াবিশিষ্ট গাছের নিচে রসূল সা.-কে রেখে অন্যত্র যেখানে ছায়া পাওয়া গেছে সেখানে গিয়ে বিশ্রামের জন্য শুয়ে পড়েন। সফরের ক্লান্তি আর দুপুরের তপ্ত রোদের গরমে খানিকটা গাছের ছায়ার আশ্রয় পেয়ে সবাই নিদ্রায় ডুবে যান।
এদিকে শত্রুপক্ষ مسلمانوںকে ঘুমন্ত অবস্থায় দেখতে পেয়ে বনু মাহারিবের গাওরাস ইবনে হারেস বলে উঠলো, আমি কি তোমাদের কাজ সহজ করার জন্য মুহাম্মাদের মাথা কেটে তোমাদের কাছে আনবো? তারা জিজ্ঞেস করলো, এমন অসাধ্য কাজ তুমি কীভাবে করবে? সে বললো, আমি এই সময়টাকে কাজে লগিয়ে ধোঁকায় ফেলে তাকে হত্যা করবো। এরপর সে সাহাবায়ে কেরामদের চোখ ফাঁকি দিয়ে রসূল সা.-এর কাছে পৌঁছে গেলো। রসূল সা.-এর তরবারি গাছের সঙ্গে ঝোলানো ছিল। সে তরবারিখানা হাতে নিয়ে তা নবীজির ওপর উঁচিয়ে ধরলো। রসূল সা. জেগে গেলেন। কাফের তাকে বললো, তুমি আমাকে ভয় পাও কি? তিনি বললেন, না। এরপর সে বললো, এখন তোমাকে আমার হাত থেকে কে রক্ষা করবে? তিনি বললেন, আল্লাহ আমাকে বাঁচাবেন।
রসূল সা.-এর এই জবাব শুনে কাফেরের অন্তরাত্মা কেঁপে উঠলো। হাতের কম্পনের কারণে তার হাত থেকে তরবারি পড়ে গেলো। তখন রসূল সা. তরবারি উঠিয়ে বললেন, 'এবার তুমি বলো আজ তোমাকে কে আমার হাত থেকে বাঁচাবে?' ভয়ে তার প্রাণ আগেই ওষ্ঠাগত ছিল। রসূল সা.-এর এই প্রশ্ন শুনে সে ভীতকণ্ঠে নিবেদন করলো, আপনি বড়োই দয়াবান ও কোমল হৃদয়ের অধিকারী। আমার ভুল ক্ষমা করে দিন। রসূল সা. তাকে ক্ষমা করে দিলেন। পরে তাকে ইসলামের দাওয়াত দিয়ে জিজ্ঞেস করলেন, 'তুমি কি এর সাক্ষ্য দাও যে, আল্লাহ ছাড়া আর কোনো উপাস্য নেই এবং আমি আল্লাহর রসূল?'
সে বললো, জি না। তবে আমি এই অঙ্গিকার অবশ্যই করছি যে, ভবিষ্যতে আর কখনো আপনার বিরুদ্ধে লড়াই করবো না এবং আপনার শত্রুদেরও সঙ্গ দেবো না। রসূল সা. তাকে ক্ষমা করে দেন। অতঃপর রসূল সা. সাহাবায়ে কেরামদের ডাকেন। তারা উপস্থিত হলে রসূল সা. তাদেরকে এই যাযাবর গাওরাসের পুরো ঘটনা শোনান।
পরে রসূল সা. তাকে ফিরে যাবার অনুমতি দেন। সে চলে যায়। তার স্বজাতি তার কৃতিত্বের সংবাদ শোনার জন্য অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করছিল। সে তাদের কাছে পৌছলে গোত্রের লোকেরা তাকে ঘটনা খুলে বলার জন্য তাড়া দিলো। সে বললো, আমি পৃথিবীর সর্বোত্তম ও সর্বশ্রেষ্ঠ মানুষের কাছ থেকে এসেছি। ৭২২
এই ঘটনায় আমরা রসূলুল্লাহ সা.-এর নবুওয়াত, বীরত্ব, বিশ্বাস, ধৈর্য ও দৃঢ়তার প্রমাণ পাই। মূর্খ মানুষদের ক্ষমা করে দেওয়া ছিল নবীজির পবিত্র অভ্যাস। আলোচ্য ঘটনা থেকে আমরা আরও জানতে পারি, আক্রমণের আশঙ্কা না থাকলে বিশ্রামের জন্যে বিচ্ছিন্ন স্থানে মুজাহিদদের অবস্থানের অনুমতি রয়েছে। ৭২৩
নবীজি সা. সবসময় আল্লাহ তাআলার হেফাজত-বেষ্টনীতে থাকতেন এর প্রমাণও আমরা ঘটনাটি থেকে বুঝতে পারি। এটা নবীজির মুজিযা। নবুওয়াতের প্রমাণ। ৭২৪
পৃথিবীর বাহ্যিক রীতিনীতি ও নিয়মতান্ত্রিকতার ঊর্ধ্বে একমাত্র আল্লাহই তাকে রক্ষা করেছেন। এভাবেই আল্লাহ তাআলা তার মনোনীত নবী ও দীনকে রক্ষা করে থাকেন। ৭২৫
যেমনটি আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেছেন:
يَا أَيُّهَا الرَّسُولُ بَلِّغْ مَا أُنْزِلَ إِلَيْكَ مِنْ رَبِّكَ وَإِنْ لَمْ تَفْعَلْ فَمَا بَلَّغْتَ رِسَالَتَهُ وَاللَّهُ يَعْصِمُكَ مِنَ النَّاسِ إِنَّ اللَّهَ لَا يَهْدِي الْقَوْمَ الْكَافِرِينَ
হে রসূল, তোমার রবের পক্ষ থেকে তোমার নিকট যা নাযিল করা হয়েছে, তা পৌঁছে দাও আর যদি তুমি না করো তবে তুমি তার রিসালাত পৌঁছালে না। আর আল্লাহ তোমাকে মানুষ থেকে রক্ষা করবেন। নিশ্চয় আল্লাহ কাফের সম্প্রদায়কে হেদায়াত করেন না। ৭২৬
পবিত্র এ আয়াতে মানুষের হাত থেকে রসূলুল্লাহ সা.-কে রক্ষা করার অর্থ এই নয় যে, তার গোত্রের পক্ষ থেকে আসা কষ্ট-ক্লেশ ইত্যাদিও রসূলুল্লাহ সা.-কে সহ্য করতে হবে না। আল্লাহর নির্বাচিত বান্দাদের জন্য এ ধরনের বিপদাপদের সম্মুখিন হওয়া স্বাভাবিক বিষয়। আল্লাহর পক্ষ থেকে নিরাপত্তার অর্থ হচ্ছে, প্রতারণার মাধ্যমে কোনো ব্যক্তি প্রিয়নবী সা.-কে হত্যা করতে সক্ষম হবে না। কেননা আল্লাহ তাআলা তার মাধ্যমে দীনের প্রচার পূর্ণ করবেন। ৭২৭
খ. জাবের ইবনে আবদুল্লাহর ঘটনা
রসূলুল্লাহ সা. ছিলেন একজন মহান সেনাপতি এবং প্রিয় নেতা। তিনি তার প্রাণোৎসর্গী সাথীদের ভীষণ ভালোবাসতেন। তাদের প্রয়োজন ও সমস্যার প্রতি সব সময় সজাগ দৃষ্টি রাখতেন এবং তা সমাধানে যথাসাধ্য চেষ্টা করে যেতেন। নিজের সেনাবাহিনীর অবস্থা সম্পর্কে পরিপূর্ণভাবে অবহিত থাকার জন্য সফর থেকে ফেরার সময় তিনি কাফেলার পেছনে পেছনে থাকতেন। যাতে প্রয়োজনে তাদের সহযোগিতা করা যায়।
গাযওয়ায়ে যাতুর রিকা থেকে ফেরার সময় রসূল সা. দেখলেন, হযরত জাবের রাযি. কাফেলার পেছনে রয়ে গেছেন। তিনি বলেন, আল্লাহর রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমার সঙ্গে মিলিত হন; আমি তখন আমার পানি-সেচের উটনীর ওপর আরোহী ছিলাম। উটনী ক্লান্ত হয়ে পড়েছিল; মোটেই চলতে পারছিল না। আল্লাহর রসূল সা. আমাকে জিজ্ঞেস করলেন, তোমার উটের কী হয়েছে? আমি বললাম, উটটি ক্লান্ত হয়ে পড়েছে। আমাকে নিয়ে অত্যন্ত ধীর গতিতে চলছে। ফলে আমি পিছনে পড়ে গেছি। রসূল সা. জিজ্ঞেস করলেন, তোমার কাছে কি পানি আছে? আমি পানি পেশ করলাম। তিনি পানিতে ফুঁক দিয়ে উটের মাথায়, কোমরে ও পিঠে মেখে দিলেন। এরপর আল্লাহর রসূল সা. বললেন, আমাকে একটি ছড়ি দাও। আমি রসূল সা.-কে ছড়ি দিলে তিনি পেছন দিক থেকে উটনীটিকে হাঁকালেন। রসূল সা.-এর এই হাঁকানোর পর উটের মৃত শিরা-উপশিরায় যেন নবজীবন ফিরে এলো। সে বিজলীর গতিতে দৌড়াতে লাগলো। সবক'টি উটের আগে আগে চলতে লাগলো। রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর উটেরও আগে দৌড়তে চেষ্টা করলো। জাবের রা. খুব কষ্টে সেটিকে নিয়ন্ত্রণে রাখলেন।
টিকাঃ
৭২২ সহীহ বুখারী: ৪১৩৬ ও ৪১৩৯; সহীহ মুসলিম: ৮৪৩; সীরাতে ইবনে ইসহাক: ২/৩৮৮; আল- বিদায়া ওয়ান নিহায়া: ৪/২৭০, ২৭১; ফাতহুল বারী: ৭/৫৩৪; বায়হাকী প্রণীত দালায়েলুন নুবুওয়াহ : ৩/৩৭৩-৩৭৬
৭২৩ ফাতহুল বারী: ১৫/৩১৭। আসসীরাতুন নববিয়্যাহ ফি জুয়িল মাসাদিরিল আসলিয়্যাহ: ৪২৭।
৭২৪ ফিকহুস সীরাহ লিলবুতী: ২০০।
৭২৫ দুরুস ও ইবার মিনাল জিহাদিন নববী: ১৭৮।
৭২৬ সূরা মায়িদাহ: ৬৭।
৭২৭ ফিকহুস সীরাহ লিলবুতী: ২০০।