📄 সময়কাল, প্রেক্ষাপট ও নামকরণ
ঐতিহাসিকরা একমত যে, গাযওয়ায়ে যাতুর রিকা গাযওয়ায়ে খায়বারের পূর্বে সংঘটিত হয়েছে। তবে তারিখের ব্যাপারে মতানৈক্য রয়েছে। ইবনে ইসহাক বলেন, ৪র্থ হিজরীতে গাযওয়ায়ে বনু নাযিরের পর রবিউস সানী ও জুমাদাল উলার কয়েক দিন রসূল সা. মদীনা মুনাওয়ারায় কাটান। পরে তিনি গাতফান গোত্রের বনু মাহারিব ও বনু সা'লাবার সাথে নজদ এলাকায় যুদ্ধ করেন। ৭০২
আল্লামা ইবনে সাআদ ও ইবনে হিব্বানের মতে এই যুদ্ধ ৫ম হিজরীতে সংঘটিত হয়। ৭০০
আবু মা'শার সিন্ধী বলেন, এই যুদ্ধ ৫ম হিজরীতে গাযওয়ায়ে বনু কুরাইযার পরে সংঘটিত হয়েছে। সুতরাং এই যুদ্ধের সময়কাল ছিল ৫ম হিজরীর শেষ এবং ৬ষ্ঠ হিজরীর শুরু। কেননা বনু কুরাইযা থেকে মুসলিম বাহিনী ফিরে আসে যিলহজের শেষ দিকে। ৭০৪
মূসা ইবনে উকবারও দৃঢ় মত হলো, এই যুদ্ধ গাযওয়ায়ে খায়বারের পূর্বে সংঘটিত হয়েছে। তবে এ ব্যাপারে তিনি যথেষ্ট সন্দিহান যে, এই যুদ্ধ বদরের আগে হয়েছিল, না পরে কিংবা উহুদের আগে হয়েছিল, নাকি পারে।
ঐতিহাসিকদের বিপরীতে ইমামুল মুহাদ্দিসীন ইমাম বুখারী রহ. কয়েকটি দলিলের মাধ্যমে এই যুদ্ধ গাযওয়ায়ে খায়বারের পরে সংঘটিত হয়েছে বলে প্রমাণ করেছেন। ড. বুতি বলেন, এই গাযওয়া সংঘটিত হয়েছিল চতুর্থ হিজরিতে বনু নাযির নির্বাসিত হওয়ার ছয় মাস পর। অধিকাংশ সীরাত-গ্রন্থকারের মতে এ মতটিই বিশুদ্ধ বলে তিনি উল্লেখ করেন।
এই যুদ্ধের কারণ ইতিহাসের গ্রন্থাবলীতে এভাবে এসেছে যে, আরবের নজদ অঞ্চলের লোকেরা প্রতারণার মাধ্যমে मुसलमानों ৭০ জন ধর্মপ্রচারককে শহীদ করে। জনৈক ব্যবসায়ী ব্যবসায়িক পণ্য নিয়ে মদীনা মুনাওয়ারায় আসে এবং সে বাজারে বেচা-কেনা করতে থাকে। এ সময়ে সে গভীরভাবে মদীনাবাসীর কর্মকাণ্ড পর্যবেক্ষণ করতে থাকে। ভাবতে থাকে, তাদের শত্রুরা তাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধের প্রস্তুতি নিচ্ছে, অথচ এরা দেখি একেবারেই নিরুদ্বেগ। একদিন কিছু লোক তাকে জিজ্ঞাসা করলো, তুমি এই মালপত্র কোথেকে নিয়ে এসেছো? সে বললো, নজদ থেকে। সাথে সে এও বললো, আমি ওখানে দেখেছি বনু আম্মার এবং বনু সা'লাবার লোকজন তোমাদের বিরুদ্ধে বাহিনী প্রস্তুত করছে। অথচ তোমাদের মাঝে সে রকম কোনো প্রস্তুতি দেখা যাচ্ছে না! রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে এ ব্যাপারে অবহিত করা হলে তিনি নিজে চারশো, অন্য ইতিহাসবিদদের বর্ণনা মতে, সাতশো বা আটশো জানবাজ সাথী নিয়ে ওই গোত্রগুলো দমন করতে বের হন। ৭০৫
ভীত সন্ত্রস্ত শত্রুবাহিনী নিজেদের স্ত্রী-পরিজন ও সন্তানদের রেখেই পালিয়ে পাহাড়ে আশ্রয় নেয়। নামাযের সময় হলে মুসলমানরা শত্রুদের পক্ষ থেকে অতর্কিত হামলার ভয়ে ভীত সন্ত্রস্ত ছিলেন। তাই রসূলুল্লাহ সা. তাদের নিয়ে 'সালাতুল খাওফ' বা ভয়ের নামায আদায় করেন। শেষে মুজাহিদদের নিয়ে ফিরে আসেন মদীনায়। ৭০৬
গাতফানের যেসব গোত্র মদীনায় আক্রমণের স্বপ্নে বিভোর ছিল, তাদের নিরাশ করে এই গাযওয়া। শত্রুরা বুঝতে পারে মুসলমানরা কেবল মদীনায় আক্রমণকারীদের প্রতিহত করতে নয়; বরং শত্রুদেশে গিয়েও লড়াই করতে সক্ষম। ৭০৭
ইতিহাস গন্থাদিতে এই যুদ্ধ কয়েকটি নামে প্রসিদ্ধ। তবে সবচেয়ে অধিক প্রসিদ্ধ হচ্ছে 'গাযওয়ায়ে যাতুর রিকা' (জোড়াতালিবিশিষ্ট যুদ্ধ) নামে। এই যুদ্ধকে এই নাম কেনো দেয়া হলো? তার কয়েকটি কারণ বলা হয়েছে।
এই নামের যৌক্তিকতা সম্মন্ধে ইবনে হিশাম বলেন, মুজাহিদগণ টুকরো টুকরো কাপড় জোড়া দিয়ে তাদের পতাকা তৈরি করেছিলেন বলে ওই যুদ্ধ 'যাতুর রিকা' নামে প্রসিদ্ধ। কেউ কেউ বলেন, ওখানে যাতুর রিকা নামে একটি গাছ ছিল বলে সেটি যাতুর রিকা যুদ্ধ নামে পরিচিত হয়েছে। ৭০৮
কতক ইতিহাসবিদ বলেন, ওখানে একটি পাহাড় ছিল। সেটির কিছু অংশ ছিল লাল, কিছু অংশ কালো এবং কিছু অংশ ছিল সাদা। বিভিন্ন রঙয়ের হওয়ার কারণে পাহাড়টির নাম ছিল যাতুর রিকা। আর কিছু ইতিহাসবিদের অভিমত হচ্ছে, মুজাহিদদের ঘোড়া বা পাহাড়ের রঙ সাদা-কালো ছিল। এ কারণে এর নাম যাতুর রিকা হয়। ৭০৯
ইমাম বুখারী রহ. আবু মূসা রা. থেকে বর্ণনা করেন, কোনো যুদ্ধে আমরা নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর সঙ্গে বের হলাম। আমরা ছিলাম ছয়জন। আমাদের কাছে ছিল মাত্র একটি উট। পালাক্রমে আমরা এর পিঠে চড়তাম। হাঁটতে হাঁটতে আমাদের পা ফেটে যায়। আমার পা দু'খানাও ফেটে গেল, নখগুলো খসে পড়লো। আমরা পায়ে নেকড়া জড়িয়ে নিলাম। একে যাতুর রিকা' যুদ্ধ বলা হয় কারণ এ যুদ্ধে আমরা আমাদের পায়ে নেকড়া দিয়ে পট্টি বেঁধেছিলাম। আবু মূসা রা.-ও উক্ত ঘটনা বর্ণনা করেছেন। পরবর্তীকালে তিনি এ ঘটনা বর্ণনা করাকে অপছন্দ করেন। তিনি বলেন, আমি এভাবে বর্ণনা করাকে ভালো মনে করি না। সম্ভবত তিনি তার কোনো আমল প্রকাশ করাকে অপছন্দ করতেন। ৭১০
সীরাত-গ্রন্থকারগণ যেসব কারণ উল্লেখ করেছেন, তার সবই সম্ভব। তবে প্রণিধানযোগ্য কারণ হচ্ছে, যেটা ইমাম বুখারী রহ. সহীহ বুখারীতে বর্ণনা করেছেন। কেননা এটা বিশুদ্ধতম সনদে উদ্ধৃত। ইমাম সুহাইলী ও নববী রহ. এটাকে প্রাধান্য দিয়েছেন। ৭১১
ইবনে ইসহাকও এটাকে অগ্রাধিকার দিয়েছেন। ৭১২
টিকাঃ
৭০২ সীরাতে ইবনে ইসহাক: ২/৩৮৭
৭০০ তাবাকাতে ইবনে সাআদ ২/৬১; ইবনে হিব্বান প্রণীত আস-সিকাত: ১/৯৬
৭০৪ শারহুয যুরকানী আলাল মাওয়াহিব ২/৫২২
৭০৫ ওয়াকেদী প্রণীত আল-মাগাযী : ১/৩৩৩; সীরাতে ইবনে হিশাম: ৩/২২৪
৭০৬ আবু ফারিস প্রণীত গাযওয়ায়ে আহযাব: ১৪।
৭০৭ মুহাম্মাদ আহমাদ বাশমীল প্রণীত গাযওয়ায়ে আহযাব: ৭৭-৭৮।
৭০৮ সীরাতে ইবনে হিশাম: ৩/২১৪।
৭০৯ ফাতহুল বারী: ৭/৫২৩; আল-বিদায়া ওয়ান নিহায়া: ৪/৮৫।
৭১০ সহীহ বুখারী: ৪১২৮।
৭১১ ফাতহুল বারী: ৭/৫২৩।
৭১২ সীরাতে ইবনে ইসহাক: ২/৩৮৭।
📄 সালাতুল খাওফ ও সীমান্ত পাহারা
ক. সালাতুল খাওফ
এই গাযওয়া চলাকালে আল্লাহ তাআলা সালাতুল খাওফের বিধান নাযিল করেন। বিপদকালে কীভাবে নামায আদায় করতে হবে, এ ব্যাপারে সুস্পষ্ট নির্দেশনা দিয়ে বলেন:
وَإِذَا كُنْتَ فِيهِمْ فَأَقَمْتَ لَهُمُ الصَّلَاةَ فَلْتَقُمْ طَائِفَةٌ مِنْهُمْ مَعَكَ وَلْيَأْخُذُوا أَسْلِحَتَهُمْ فَإِذَا سَجَدُوا فَلْيَكُونُوا مِنْ وَرَائِكُمْ وَلْتَأْتِ طَائِفَةٌ أُخْرَى لَمْ يُصَلُّوا فَلْيُصَلُّوا مَعَكَ وَلْيَأْخُذُوا حِذْرَهُمْ وَأَسْلِحَتَهُمْ وَدَّ الَّذِينَ كَفَرُوا لَوْ تَغْفُلُونَ عَنْ أَسْلِحَتِكُمْ وَأَمْتِعَتِكُمْ فَيَمِيلُونَ عَلَيْكُمْ مَيْلَةً وَاحِدَةً وَلَا جُنَاحَ عَلَيْكُمْ إِنْ كَانَ بِكُمْ أَذًى مِنْ مَطَرٍ أَوْ كُنْتُمْ مَرْضَى أَنْ تَضَعُوا أَسْلِحَتَكُمْ وَخُذُوا حِذْرَكُمْ إِنَّ اللَّهَ أَعَدَّ لِلْكَافِرِينَ عَذَابًا مُهِينًاه
আর যখন তুমি তাদের মধ্যে থাকবে। অতঃপর তাদের জন্য নামায কায়েম করবে, তখন যেন তাদের মধ্য থেকে একদল তোমার সাথে দাঁড়ায় এবং তারা তাদের অস্ত্র ধারণ করে। এরপর যখন সিজদা করে ফেলবে, তখন তারা যেন তোমাদের পেছনে অবস্থান নেয়। আর অপর একটি দল যারা নামায আদায় করেনি তারা যেন তোমার সাথে এসে নামায আদায় করে এবং তারা যেন তাদের সতর্কতা অবলম্বন ও অস্ত্র ধারণ করে। কাফেররা কামনা করে যদি তোমরা তোমাদের অস্ত্র-শস্ত্র ও আসবাব-পত্র সম্বন্ধে অসতর্ক হও তাহলে তারা তোমাদের ওপর একসাথে ঝাঁপিয়ে পড়বে। আর যদি বৃষ্টির কারণে তোমাদের কোনো কষ্ট হয় অথবা তোমরা অসুস্থ হও তাহলে অস্ত্র রেখেদেয়াতে তোমাদের কোন দোষ নেই। আর তোমরা তোমাদের সতর্কতা অবলম্বন করবে। নিশ্চয় আল্লাহ কাফেরদের জন্য প্রস্তুত করেছেন লাঞ্ছনাদায়ক আযাব। ৭১৩
সুতরাং মুসলমানরা যুদ্ধচলাকালে সালাতুল খাওফ আদায় করেন। মুজাহিদদের একটি দল রসূলুল্লাহ সা.-এর সাথে কাতারবন্দী হয়ে দাঁড়ান এবং অন্য দলটি শত্রুদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করতে থাকেন। রসূলুল্লাহ সা. প্রথম দলটিকে এক রাকাত নামায পড়ান এবং দাঁড়িয়ে থাকেন। এরপর প্রথমোক্ত দলটি নিজেদের নামায পরিপূর্ণ করে শত্রুদের সামনে চলে যায়। অন্যদিকে, সেখানে অবস্থানরত দ্বিতীয় দলটি রসূলুল্লাহ সা.-এর ইমামতিতে নামাযের জন্য কাতারবন্দী হয়। রসূলুল্লাহ সা. তাদের অবশিষ্ট নামায আদায় করে বসে থাকেন। তারা নিজেদের নামায শেষ করার পর তিনি তাদের সাথে সালাম ফেরান। ৭১৪
আরেক বর্ণনা মতে, রসূলুল্লাহ সা. একটি দলকে দুই রাকাত নামায পড়ান। অতঃপর তারা পেছনে সরে যায়। অনুরূপভাবে, আরেক দলকেও দুরাকাত নামায পড়ান। এভাবে রসূলুল্লাহ সা. চার রাকাত নামায পড়েন। আর উভয় দল আলাদা আলাদাভাবে দুই দুই রাকাত করে নামায পড়ে নেয়। ৭১৫
ড. বুতি উভয় হাদীসের মাঝে সমন্বয় করতে গিয়ে বলেন, প্রকৃতপক্ষে রসূলুল্লাহ সা. সাহাবীদের নিয়ে একাধিকবার সালাতুল খাওফ আদায় করেছিলেন। বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন পদ্ধতিতে পড়ানোর কারণে সালাতুল খাওফ বিষয়ক হাদীসে ভিন্নতা দেখা যায়।
মদীনা থেকে দুই দিনের পথের দূরত্বে অবস্থিত 'নাখাল' এলাকায় নবীজি সা. সালাতুল খাওফ আদায় করিয়েছিলেন। ৭১৬
এই নামাযের বিধান দ্বারা নামাযের অপরিসীম গুরুত্বের কথা অনুধাবন করা যায়। বোঝা যায়, যুদ্ধ- পরিস্থিতিতেও নামায ছাড়া যাবে না। নবীজি সা. তা অনুশীলন করিয়ে গেছেন। তিনি দেখিয়েছেন, জিহাদের পাশাপাশি ইবাদতও সমানভাবে চলবে। কোনোটিই ছাড়া যাবে না। ৭১৭
খ. সীমান্ত প্রহরা
জাবের বলেন, আমরা রসূলুল্লাহ সা.-এর সঙ্গে যাতুর রিকা যুদ্ধাভিযানে বের হলাম। পথটি ছিল খুবই দুর্গম। পথে একজন রূপসী যুবতীর দেখা মেলে। তাকে বন্দী করা হয়। তার স্বামী তাকে ভীষণ ভালোবাসতো। ওই সময় সে ঘরে ছিল না। ফিরে এসে সে তার স্ত্রীর বন্দী হওয়ার ব্যাপারটি জানতে পারে। ফলে ওই মুশরিক এ মর্মে শপথ করে যে, যতক্ষণ পর্যন্ত মুহাম্মাদের কোনো সাথীর রক্তপাত না করবো, ততক্ষণ পর্যন্ত আমি ক্ষ্যান্ত হবো না। অতএব সে নবী সা.-এর সন্ধানে বেরিয়ে পড়ে। সফরের এক পর্যায়ে ঘোর অন্ধকার নেমে আসে। রসূল সা. রাতের বেলা তাঁবু স্থাপনের জন্য একটি পাহাড়ী উপত্যকা চয়ন করলেন। কাফেলাকে উপত্যকা থেকে নেমে বিশ্রাম নেয়ার অনুমতি দিলেন এবং মুজাহিদদের জিজ্ঞেস করলেন, 'এমন কে আছো, যে আমাদের পাহারা দেবে?'
তখন আম্মার ইবনে ইয়াসির রা. ও আব্বাদ ইবনে বিশর রা. প্রস্তুত হয়ে যান। বলেন, আজ রাতে কাফেলার পাহারা আমরা দেবো। এরপর দুই সাহাবী উপত্যকার চূড়ায় গিয়ে বসেন। বাকি কাফেলা যখন ঘুমিয়ে পড়লো এবং অন্ধকার ঘণিভূত হলো, হযরত আম্মার ও আব্বাদ ইবনে বিশর রা. কিছুক্ষণ বসে রইলেন। পরে উভয়ে পরামর্শ করলেন যে, এভাবে বসে বসে রাত কাটানো তো দুষ্কর। আমাদের একজন কিছুক্ষণ ঘুমিয়ে নিই, আর অন্যজন পাহারা দিই। পরে দ্বিতীয়জন রাতের শেষ দিকে বিশ্রাম নেবে এবং প্রথমজন পাহারার জন্য দাঁড়িয়ে যাবে। এ ব্যাপারে উভয়ে একমত হলেন।
আম্মার রা. ঘুমিয়ে পড়লেন এবং আব্বাদ রা. পাহারার জন্য দাঁড়িয়ে গেলেন। পরে মনে মনে ভাবলেন, কেনো স্বীয় প্রতিপালকের দরবারে সিজদা করে ধন্য হচ্ছি না! অন্ধকার অনেকটাই কমে গেছে। রাতের নিস্তব্ধতা ও নির্জনতায় কুরআন তেলাওয়াতের সুবর্ণ সুযোগ হাতছাড়া করা ঠিক হবে না।
যেমন ভাবনা তেমন কাজ। তিনি নফল নামাযের নিয়ত করে দাঁড়িয়ে গেলেন এবং কুরআন তেলাওয়াত করতে লাগলেন। তিনি তাঁর প্রিয় সূরা কাহাফ খুব তৃপ্তিভরে তেলাওয়াত করছিলেন।
এমন সময় ওই শত্রু লোকটি এসে আব্বাদকে দেখে বুঝতে পারলো তিনি مسلمانوں নিরাপত্তা প্রহরী। সে আব্বাদ রা.-এর দিকে একটি তীর নিক্ষেপ করলো, যা তাঁর দেহে বিঁধে গেল। তিনি তা বের করে নিলেন। সে একে একে তিনটি তীর নিক্ষেপ করলো। রক্ত বয়ে প্রবাহিত হচ্ছিলো শরীর থেকে। দুর্বলতার কারণে বেশিক্ষণ কিয়াম ও তেলাওয়াত অব্যাহত রাখা তাঁর পক্ষে সম্ভব হলো না। মুসলিম বাহিনীর পাহারা বিষয়টিও তাঁর মাথায় ছিল। তাই তিনি যথারীতি নামায শেষ করে আম্মার রা.-কে জাগিয়ে বললেন, শত্রু আমাকে মারাত্মক আহত করেছে। তুমি এখন উপত্যকার নিরাপত্তার দায়িত্ব পালন করো।
আম্মার রা. সঙ্গীকে রক্তাক্ত দেখতে পেয়ে বললেন, সুবহানাল্লাহ! প্রথম তীরটি তোমার শরীরে বিদ্ধ হবার পরেই আমাকে সর্তক করোনি কেন? তিনি বললেন, 'আমি (নামাযে) এমন একটি সূরাহ তিলাওয়াত করছিলাম যা শেষ না করে নামায ছাড়তে চাচ্ছিলাম না। मुसलमानों ক্ষতির কোনো আশংকা যদি না থাকতো, তাহলে প্রাণ চলে গেলেও আমি নামায ও তেলাওয়াত ছাড়তাম না। ৭১৮
এ ঘটনা দ্বারা আমরা যেসব শিক্ষা পেলাম:
১. বাহিনীর নিরাপত্তাবিধানে রসূলুল্লাহ সা.-এর সতর্কতাস্বরূপ সাহাবাদের মধ্য থেকে উত্তম গুণে গুণান্বিত দুইজন সাহাবীকে রাতের বেলা পাহারাদার হিসেবে নিযুক্ত করেন।
২. যে দুজন সাহাবীকে রাতের বেলা পাহারাদার হিসেবে নিযুক্ত করা হয়েছিল, তাঁরা নিজেদের পক্ষ থেকে রাতকে দুই ভাগে ভাগ করে নেন। কারণ, একজন সৈনিকের শারীরিক বিশ্রামও দরকার।
৩. এই ঘটনায় কুরআনে কারীমের সাথে সাহাবায়ে কেরামের ভালোবাসা ও হৃদ্যতার প্রমাণ পাওয়া যায়। আব্বাদ রা. কুরআন তেলাওয়াতে এতটাই মোহিত হয়ে পড়েন যে, তীরবিদ্ধ হয়েও তিনি ব্যাথাকে গুরুত্ব দেননি। তাঁর শরীরে তীর বিদ্ধ হয়, রক্ত ঝরতে থাকে, এরপরও তিনি কুরআন তেলাওয়াতে মগ্ন থাকেন। ৭১৯
৪. পাহারাদারির দায়িত্ববোধ আমরা দেখতে পাই আব্বাদ ইবনে বিশর রা.-এর মধ্যে। আঘাতের যন্ত্রনায় তিনি নামায সংক্ষিপ্ত করেননি, বরং পাহারাদারির দায়িত্ববোধ তাকে নামায সংক্ষিপ্ত করতে বাধ্য করেছে। ৭২০
৫. উপরোক্ত ঘটনায় আমরা দেখতে পাই, রসূলুল্লাহ সা. পাহারাদারির জন্য একটি উপত্যকার প্রবেশমুখে উপযুক্ত জায়গা নির্বাচন করেন। যা পাহারাদারীর জন্য ছিল যথাযথ। কেননা এদিক থেকে শত্রুদের হামলার প্রবল আশঙ্কা ছিল।
৬. উপরোক্ত ঘটনায় আমরা আরও দেখতে পাই, আব্বাদ ইবনে বিশর রা. তার সহকর্মীকে তাৎক্ষণিক জাগ্রত করতে পেরেছিলেন। এর দ্বারা বোঝা যায়, পাহারাদারির কাজে নিয়োজিত ব্যক্তির বিশ্রামের স্থান হওয়া উচিত কর্মক্ষেত্রের কাছে। উক্ত সাহাবীদ্বয়ের বিশ্রামস্থল যদি দূরে হতো, তাহলে ঠিক সময়ে তিনি তাকে জাগাতে পারতেন না। এতে আরো মারাত্মক দুর্ঘটনা ঘটে যেতে পারতো। ৭২১
টিকাঃ
৭১৩ সূরা নিসা: ১০২।
৭১৪ আসসীরাতুন নববিয়্যাহ ফি জুয়িল মাসাদিরিল আসলিয়্যাহ : ৪২৫।
৭১৫ সহীহ মুসলিম: ৮৪৩।
৭১৬ ফিকহুস সীরাহ লিলবুতী: ২০৭।
৭১৭ আত তারবিয়াতুল কিয়াদিয়্যাহ ২/৩০৩-৩০৪।
৭১৮ ওয়াকেদী প্রণীত আল-মাগাযী: ১/৩৩৪, ৩৩৫; সীরাতে ইবনে ইসহাক: ২/৩৯০। আরো দেখুন- সুনানে আবি দাউদ: ১৯৮।
৭১৯ আবু ফারিস প্রণীত গাযওয়ায়ে আহযাব: ৩০-৩১।
৭২০ আসসীরাতুন নববিয়্যাহ ফি জুয়িল মাসাদিরিল আসলিয়্যাহ: ৪২৭।
৭২১ আবু ফারিস প্রণীত গাযওয়ায়ে আহযাব: ৩২।
📄 রসূলুল্লাহ সা.-এর বীরত্ব ও জাবের ইবনে আবদুল্লাহর ঘটনা
ক. রসূলুল্লাহ সা.-এর বীরত্ব
রসূলুল্লাহ সা. তখন যাতুর রিকা যুদ্ধে নজদ এলাকায় অবস্থান করছেন। একদিন নাখলা প্রান্তরে কায়লুলার সময় তিনি একটি কাঁটাযুক্ত গাছের ছায়ায় বিশ্রাম নিচ্ছিলেন। সাহাবায়ে কেরামও ছায়াবিশিষ্ট গাছের নিচে রসূল সা.-কে রেখে অন্যত্র যেখানে ছায়া পাওয়া গেছে সেখানে গিয়ে বিশ্রামের জন্য শুয়ে পড়েন। সফরের ক্লান্তি আর দুপুরের তপ্ত রোদের গরমে খানিকটা গাছের ছায়ার আশ্রয় পেয়ে সবাই নিদ্রায় ডুবে যান।
এদিকে শত্রুপক্ষ مسلمانوںকে ঘুমন্ত অবস্থায় দেখতে পেয়ে বনু মাহারিবের গাওরাস ইবনে হারেস বলে উঠলো, আমি কি তোমাদের কাজ সহজ করার জন্য মুহাম্মাদের মাথা কেটে তোমাদের কাছে আনবো? তারা জিজ্ঞেস করলো, এমন অসাধ্য কাজ তুমি কীভাবে করবে? সে বললো, আমি এই সময়টাকে কাজে লগিয়ে ধোঁকায় ফেলে তাকে হত্যা করবো। এরপর সে সাহাবায়ে কেরामদের চোখ ফাঁকি দিয়ে রসূল সা.-এর কাছে পৌঁছে গেলো। রসূল সা.-এর তরবারি গাছের সঙ্গে ঝোলানো ছিল। সে তরবারিখানা হাতে নিয়ে তা নবীজির ওপর উঁচিয়ে ধরলো। রসূল সা. জেগে গেলেন। কাফের তাকে বললো, তুমি আমাকে ভয় পাও কি? তিনি বললেন, না। এরপর সে বললো, এখন তোমাকে আমার হাত থেকে কে রক্ষা করবে? তিনি বললেন, আল্লাহ আমাকে বাঁচাবেন।
রসূল সা.-এর এই জবাব শুনে কাফেরের অন্তরাত্মা কেঁপে উঠলো। হাতের কম্পনের কারণে তার হাত থেকে তরবারি পড়ে গেলো। তখন রসূল সা. তরবারি উঠিয়ে বললেন, 'এবার তুমি বলো আজ তোমাকে কে আমার হাত থেকে বাঁচাবে?' ভয়ে তার প্রাণ আগেই ওষ্ঠাগত ছিল। রসূল সা.-এর এই প্রশ্ন শুনে সে ভীতকণ্ঠে নিবেদন করলো, আপনি বড়োই দয়াবান ও কোমল হৃদয়ের অধিকারী। আমার ভুল ক্ষমা করে দিন। রসূল সা. তাকে ক্ষমা করে দিলেন। পরে তাকে ইসলামের দাওয়াত দিয়ে জিজ্ঞেস করলেন, 'তুমি কি এর সাক্ষ্য দাও যে, আল্লাহ ছাড়া আর কোনো উপাস্য নেই এবং আমি আল্লাহর রসূল?'
সে বললো, জি না। তবে আমি এই অঙ্গিকার অবশ্যই করছি যে, ভবিষ্যতে আর কখনো আপনার বিরুদ্ধে লড়াই করবো না এবং আপনার শত্রুদেরও সঙ্গ দেবো না। রসূল সা. তাকে ক্ষমা করে দেন। অতঃপর রসূল সা. সাহাবায়ে কেরামদের ডাকেন। তারা উপস্থিত হলে রসূল সা. তাদেরকে এই যাযাবর গাওরাসের পুরো ঘটনা শোনান।
পরে রসূল সা. তাকে ফিরে যাবার অনুমতি দেন। সে চলে যায়। তার স্বজাতি তার কৃতিত্বের সংবাদ শোনার জন্য অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করছিল। সে তাদের কাছে পৌছলে গোত্রের লোকেরা তাকে ঘটনা খুলে বলার জন্য তাড়া দিলো। সে বললো, আমি পৃথিবীর সর্বোত্তম ও সর্বশ্রেষ্ঠ মানুষের কাছ থেকে এসেছি। ৭২২
এই ঘটনায় আমরা রসূলুল্লাহ সা.-এর নবুওয়াত, বীরত্ব, বিশ্বাস, ধৈর্য ও দৃঢ়তার প্রমাণ পাই। মূর্খ মানুষদের ক্ষমা করে দেওয়া ছিল নবীজির পবিত্র অভ্যাস। আলোচ্য ঘটনা থেকে আমরা আরও জানতে পারি, আক্রমণের আশঙ্কা না থাকলে বিশ্রামের জন্যে বিচ্ছিন্ন স্থানে মুজাহিদদের অবস্থানের অনুমতি রয়েছে। ৭২৩
নবীজি সা. সবসময় আল্লাহ তাআলার হেফাজত-বেষ্টনীতে থাকতেন এর প্রমাণও আমরা ঘটনাটি থেকে বুঝতে পারি। এটা নবীজির মুজিযা। নবুওয়াতের প্রমাণ। ৭২৪
পৃথিবীর বাহ্যিক রীতিনীতি ও নিয়মতান্ত্রিকতার ঊর্ধ্বে একমাত্র আল্লাহই তাকে রক্ষা করেছেন। এভাবেই আল্লাহ তাআলা তার মনোনীত নবী ও দীনকে রক্ষা করে থাকেন। ৭২৫
যেমনটি আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেছেন:
يَا أَيُّهَا الرَّسُولُ بَلِّغْ مَا أُنْزِلَ إِلَيْكَ مِنْ رَبِّكَ وَإِنْ لَمْ تَفْعَلْ فَمَا بَلَّغْتَ رِسَالَتَهُ وَاللَّهُ يَعْصِمُكَ مِنَ النَّاسِ إِنَّ اللَّهَ لَا يَهْدِي الْقَوْمَ الْكَافِرِينَ
হে রসূল, তোমার রবের পক্ষ থেকে তোমার নিকট যা নাযিল করা হয়েছে, তা পৌঁছে দাও আর যদি তুমি না করো তবে তুমি তার রিসালাত পৌঁছালে না। আর আল্লাহ তোমাকে মানুষ থেকে রক্ষা করবেন। নিশ্চয় আল্লাহ কাফের সম্প্রদায়কে হেদায়াত করেন না। ৭২৬
পবিত্র এ আয়াতে মানুষের হাত থেকে রসূলুল্লাহ সা.-কে রক্ষা করার অর্থ এই নয় যে, তার গোত্রের পক্ষ থেকে আসা কষ্ট-ক্লেশ ইত্যাদিও রসূলুল্লাহ সা.-কে সহ্য করতে হবে না। আল্লাহর নির্বাচিত বান্দাদের জন্য এ ধরনের বিপদাপদের সম্মুখিন হওয়া স্বাভাবিক বিষয়। আল্লাহর পক্ষ থেকে নিরাপত্তার অর্থ হচ্ছে, প্রতারণার মাধ্যমে কোনো ব্যক্তি প্রিয়নবী সা.-কে হত্যা করতে সক্ষম হবে না। কেননা আল্লাহ তাআলা তার মাধ্যমে দীনের প্রচার পূর্ণ করবেন। ৭২৭
খ. জাবের ইবনে আবদুল্লাহর ঘটনা
রসূলুল্লাহ সা. ছিলেন একজন মহান সেনাপতি এবং প্রিয় নেতা। তিনি তার প্রাণোৎসর্গী সাথীদের ভীষণ ভালোবাসতেন। তাদের প্রয়োজন ও সমস্যার প্রতি সব সময় সজাগ দৃষ্টি রাখতেন এবং তা সমাধানে যথাসাধ্য চেষ্টা করে যেতেন। নিজের সেনাবাহিনীর অবস্থা সম্পর্কে পরিপূর্ণভাবে অবহিত থাকার জন্য সফর থেকে ফেরার সময় তিনি কাফেলার পেছনে পেছনে থাকতেন। যাতে প্রয়োজনে তাদের সহযোগিতা করা যায়।
গাযওয়ায়ে যাতুর রিকা থেকে ফেরার সময় রসূল সা. দেখলেন, হযরত জাবের রাযি. কাফেলার পেছনে রয়ে গেছেন। তিনি বলেন, আল্লাহর রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমার সঙ্গে মিলিত হন; আমি তখন আমার পানি-সেচের উটনীর ওপর আরোহী ছিলাম। উটনী ক্লান্ত হয়ে পড়েছিল; মোটেই চলতে পারছিল না। আল্লাহর রসূল সা. আমাকে জিজ্ঞেস করলেন, তোমার উটের কী হয়েছে? আমি বললাম, উটটি ক্লান্ত হয়ে পড়েছে। আমাকে নিয়ে অত্যন্ত ধীর গতিতে চলছে। ফলে আমি পিছনে পড়ে গেছি। রসূল সা. জিজ্ঞেস করলেন, তোমার কাছে কি পানি আছে? আমি পানি পেশ করলাম। তিনি পানিতে ফুঁক দিয়ে উটের মাথায়, কোমরে ও পিঠে মেখে দিলেন। এরপর আল্লাহর রসূল সা. বললেন, আমাকে একটি ছড়ি দাও। আমি রসূল সা.-কে ছড়ি দিলে তিনি পেছন দিক থেকে উটনীটিকে হাঁকালেন। রসূল সা.-এর এই হাঁকানোর পর উটের মৃত শিরা-উপশিরায় যেন নবজীবন ফিরে এলো। সে বিজলীর গতিতে দৌড়াতে লাগলো। সবক'টি উটের আগে আগে চলতে লাগলো। রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর উটেরও আগে দৌড়তে চেষ্টা করলো। জাবের রা. খুব কষ্টে সেটিকে নিয়ন্ত্রণে রাখলেন।
টিকাঃ
৭২২ সহীহ বুখারী: ৪১৩৬ ও ৪১৩৯; সহীহ মুসলিম: ৮৪৩; সীরাতে ইবনে ইসহাক: ২/৩৮৮; আল- বিদায়া ওয়ান নিহায়া: ৪/২৭০, ২৭১; ফাতহুল বারী: ৭/৫৩৪; বায়হাকী প্রণীত দালায়েলুন নুবুওয়াহ : ৩/৩৭৩-৩৭৬
৭২৩ ফাতহুল বারী: ১৫/৩১৭। আসসীরাতুন নববিয়্যাহ ফি জুয়িল মাসাদিরিল আসলিয়্যাহ: ৪২৭।
৭২৪ ফিকহুস সীরাহ লিলবুতী: ২০০।
৭২৫ দুরুস ও ইবার মিনাল জিহাদিন নববী: ১৭৮।
৭২৬ সূরা মায়িদাহ: ৬৭।
৭২৭ ফিকহুস সীরাহ লিলবুতী: ২০০।