📄 গাযওয়ায়ে বনু নাযির হতে প্রাপ্ত শিক্ষা ও তাৎপর্য
কুরআনে কারীমে একটি সূরা বনু নাযির গোত্রের দেশান্তর সম্পর্কে অবতীর্ণ হয়েছে। সূরাটি হচ্ছে সূরায়ে হাশর। 'হিবরুল উম্মাহ' নামে খ্যাত আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস রা. এ সূরাকে 'সূরা বনু নাযির' বলতেন। ইমাম বুখারী রহ. সাঈদ ইবনে যুবায়েরের সূত্রে বর্ণনা করেন, আমি আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস-এর সামনে একবার 'সূরা হাশর' বললে তিনি বলেন, বরং তুমি বলো 'সূরা বনু নাযির'। ৬৫৮
সূরা হাশরে গাযওয়ায়ে বনু নাযির সংক্রান্ত যাবতীয় বিষয়ে আলোকপাত করা হয়েছে। বিনা যুদ্ধে প্রাপ্ত কাফেরদের সম্পদ তথা 'মালে ফায়'-এর বিধানও এসেছে এ সূরায়। ইহুদিদের সাথে মুনাফেকদের গভীর সম্পর্ক ও ইহুদিদের মানসিক অবস্থার কথাও বলা হয়েছে। যুদ্ধের ব্যাপারে আলোচনা করতে গিয়ে আল্লাহ তাআলা मुसलमानों সম্বোধন করে নির্দেশনা দিয়েছেন, যেন তারা তাকওয়া অর্জন করে এবং আল্লাহর অবাধ্য না হয়। অতঃপর আল্লাহ তাআলা কুরআনে কারীমের উচ্চ মর্যাদা ও সম্মানের কথা তুলে ধরেছেন। পাশাপাশি তাওহীদ, আল্লাহর বড়ত্ব ও কেয়ামতের প্রস্তুতির শিক্ষা দিয়েছেন। সূরা হাশরের কিছু শিক্ষা এখানে উল্লেখ করছি :
ক. আল্লাহর প্রশংসা
সূরাটি শুরু করা হয়েছে আল্লাহর প্রশংসাবাণীর মাধ্যমে। বলা হয়েছে, সমুদয় সৃষ্টিজগত তথা মানবজগত, প্রাণীজগৎ, উদ্ভিদ এমনকি সব ধরনের জড়বস্তুও আল্লাহ তাআলার গুণকীর্তন করে এবং তার একত্ববাদ, শক্তি ও মর্যাদার গুণগান গায়। ৬৫৯
আল্লাহ তাআলা বলেন :
سَبَّحَ لِلَّهِ مَا فِي السَّمَاوَاتِ وَمَا فِي الْأَرْضِ وَهُوَ الْعَزِيزُ الْحَكِيمُ
আকাশমন্ডলী ও পৃথিবীতে যা কিছু আছে সবই তার পবিত্রতা ও মহিমা ঘোষণা করে, তিনি পরাক্রমশালী, প্রজ্ঞাময়। ৬৬০
সূরার শুরুতেই বলা হয়েছে, আকাশমন্ডলী ও পৃথিবীতে যা কিছু আছে সবই আল্লাহ তাআলার পবিত্রতা ও মহিমা ঘোষণা করে। তিনি কোনো জিনিস অনর্থক তৈরি করেননি ও অপ্রয়োজনীয় কোনো বিধান প্রয়োগ করেননি। বনু নাযিরের বিরুদ্ধে তার রসূলকে সাহায্য করাও আল্লাহ তাআলার প্রজ্ঞাময় পরিকল্পনার অন্তর্ভুক্ত। তারা मुसलमानों সাথে প্রতিশ্রুতি ভঙ্গ করার ফলে তিনি তাদের বিতাড়িত করেন তাদের প্রিয় জন্মভূমি ও ঘর থেকে। ৬৬১
টিকাঃ
৬৫৮ সহীহ বুখারী: ৪০২৯।
৬৫৯ হাদীসুল কুরআনিল কারীম আন গাযাওয়াতির রসূল: ১/৩২৭।
৬৬০ সূরা হাশর: ১।
৬৬১ তাফসীরে সাদী: ৩/৩২৭।
📄 ভয়-ভীতি ও প্রভাব আল্লাহর পক্ষ হতে আসে
এ মর্মে আল্লাহ তাআলা বলেন :
هُوَ الَّذِي أَخْرَجَ الَّذِينَ كَفَرُوا مِنْ أَهْلِ الْكِتَابِ مِنْ دِيَارِهِمْ لِأَوَّلِ الْخَشْرِ مَا ظَنَنْتُمْ أَنْ يَخْرُجُوا وَظَنُّوا أَنَّهُمْ مَانِعَتُهُمْ حُصُونُهُمْ مِنَ اللَّهِ فَأَتَاهُمُ اللَّهُ مِنْ حَيْثُ لَمْ يَحْتَسِبُوا وَقَذَفَ فِي قُلُوبِهِمُ الرُّعْبَ يُخْرِبُونَ بُيُوتَهُمْ بِأَيْدِيهِمْ وَأَيْدِي الْمُؤْمِنِينَ فَاعْتَبِرُوا يَا أُولِي الْأَبْصَارِهِ وَلَوْلَا أَنْ كَتَبَ اللهُ عَلَيْهِمُ الْجَلَاءَ لَعَذَّبَهُمْ فِي الدُّنْيَا وَلَهُمْ فِي الْآخِرَةِ عَذَابُ النَّارِه ذَلِكَ بِأَنَّهُمْ شَاقُوا اللَّهَ وَرَسُولَهُ وَمَنْ يُشَاقَّ اللَّهَ فَإِنَّ اللَّهَ شَدِيدُ الْعِقَابِ .
আহলে কিতাবদের মধ্যে যারা কুফরী করেছিল তিনিই তাদেরকে তাদের ঘর-বাড়ি থেকে বের করে দিয়েছিলেন প্রথমবারের মত। তোমরা ধারণাও করনি যে, তারা বেরিয়ে যাবে। আর তারা ধারণা করেছিল যে, তাদের দুর্গগুলো তাদেরকে আল্লাহর আযাব থেকে রক্ষা করবে। কিন্তু আল্লাহর আযাব এমন এক দিক থেকে আসল যা তারা কল্পনাও করতে পারেনি এবং তিনি তাদের অন্তরসমূহে ত্রাসের সঞ্চার করলেন, ফলে তারা তাদের বাড়ি-ঘর আপন হাতে ও মুমিনদের হাতে ধ্বংস করতে শুরু করলো। অতএব হে দৃষ্টিমান লোকেরা তোমরা উপদেশ গ্রহণ কর। আর আল্লাহ যদি তাদের জন্য নির্বাসন লিপিবদ্ধ না করতেন, তবে তিনি তাদেরকে দুনিয়াতে শাস্তি দিতেন এবং তাদের জন্য আখেরাতে রয়েছে আগুনের শাস্তি। এটি এ জন্য যে, তারা সত্যিই আল্লাহ ও তাঁর রসূলের বিরুদ্ধাচরণ করেছিল। আর যে আল্লাহর বিরুদ্ধাচরণ করে, তবে নিশ্চয় আল্লাহ আযাব প্রদানে কঠোর। ৬৬২
উপরোক্ত আয়াতগুলোতে গভীরভাবে চিন্তা করলে দেখতে পাবেন, একমাত্র আল্লাহ তাআলার ইচ্ছায় বনু নাযির গোত্রের ইহুদিরা তাদের অঞ্চল থেকে সিরিয়ার দিকে নির্বাসিত হয়েছে। অথচ যুদ্ধের সাজ-সরঞ্জামে তারাই ছিল শক্তিশালী। তাদের দুর্গও ছিল দুর্ভেদ্য। তাদেরকে এই এলাকা থেকে উৎখাতের শক্তি কারোই ছিল না। এ ব্যাপারে তারা নিশ্চিতও ছিল। কিন্তু অতর্কিত আক্রমণে তারা ভীত সন্ত্রস্ত হয়ে পড়ে। তারা নিজেরাই নিজেদের বাড়ি-ঘর ধ্বংস করে চলে যায়।
পবিত্র কুরআনের বর্ণনাভঙ্গি ইতিহাসবেত্তাদের বর্ণনাভঙ্গির সাথে মেলে না। কারণ আল্লাহ তাআলার কাছে সব ঘটনার প্রকৃতি ও গোপন রহস্যসমূহ উদ্ভাসিত। কুরআনে প্রতিটি ঘটনাকে সর্বময় কর্তৃত্বের অধিকারী ক্ষমতাবান আল্লাহ তাআলার দিকেই সম্বন্ধিত করা হয়। যেমনটি আমরা এ সূরার শুরুর দিকে দেখতে পাই। এখানে আল্লাহ বলেছেন, বনু নাযির গোত্রকে তাদের ঘর- বাড়ি থেকে তিনিই বের করেছেন। বর্ণিত হচ্ছে :
هُوَ الَّذِي أَخْرَجَ الَّذِينَ كَفَرُوا مِنْ أَهْلِ الْكِتَابِ
যারা কুফরী করেছিল তিনিই তাদেরকে তাদের ঘর-বাড়ি থেকে বের করে দিয়েছিলেন। ৬৬৩
এর পরের আয়াতগুলোতে পর্যায়ক্রমে বনু নাযিরের ইহুদিদের মানসিক অবস্থার চিত্র তুলে ধরা হয়েছে। বলা হয়েছে, পৃথিবীর যাবতীয় ভোগ্যসামগ্রী দিয়ে তাদের সচ্ছল করা হয়েছিল। কিন্তু তারা একেবারে শীর্ষ থেকে শূন্যে নেমে আসতে বাধ্য হয়। তাদের পরাজয়ের হেতু হচ্ছে ভীরুতা। তারা তাদের নিজের কাছেই হার মেনেছে।
এই গাযওয়া থেকে সকলের শিক্ষা নেওয়া উচিত। প্রকৃতপক্ষে সবকিছুর নিয়ন্ত্রক একমাত্র আল্লাহ। তার সিদ্ধান্তের সামনে কোনো বস্তু বা কোনো কর্ম প্রভাব বিস্তার করতে পারে না। তিনি সব কিছুই করতে সক্ষম। তাই তার শক্তিমত্তার ওপর সত্যিকারের বিশ্বাস প্রতিটি মানুষের অর্জন করা জরুরি। প্রতিটি ক্ষেত্রে আল্লাহ তাআলার প্রদর্শিত পন্থায়ই নিজেদের পরিশুদ্ধ করতে হবে। আল্লাহ তাআলার নির্দেশিত বিধানসমূহ বাস্তবায়ন করলেই কেবল সফলতা লাভ করা সম্ভব। তখন আল্লাহ অকল্পনীয়ভাবে সাহায্য করেন।
এই গাযওয়া উম্মতকে একটি মৌলিক শিক্ষা দেয়। আর তা হলো, একমাত্র আল্লাহ তাআলার ওপর ভরসা ও তার বিধান পালনের মাধ্যমে তার সাহায্য আসে। যারা এই বিশ্বাস রাখবে, তারা অবশ্যই আল্লাহর সাহায্য পাবে। শত্রুপক্ষ যত ক্ষমতাবান ও শক্তিমান হোক, তাতে কিছু যায় আসে না। কেননা, আল্লাহ এক চিরন্তন অপরাজিত সত্ত্বা। বনু নাযির গোত্রের ঘর-বাড়ি ছেড়ে যাওয়া আল্লাহ যে পরাক্রমশালী-এটা তার প্রমাণ। এখানে বুদ্ধিমান ও সৌভাগ্যবানদের জন্য উপদেশ নেওয়ার মতো রসদ রয়েছে।
এরপর আল্লাহ তাআলা বলেছেন, যদি তাদের নির্বাসনের শাস্তি না দেওয়া হতো, তাহলে অবশ্যই তাদের হত্যা করা হতো। পরকালেও জাহান্নামের কঠিন শাস্তি তাদের ভোগ করতে হতো। ৬৬৪
টিকাঃ
৬৬২ সূরা হাশর: ২-৪।
৬৬৩ সূরা হাশর : ২।
৬৬৪ হাদীসুল কুরআনিল কারীম আন গাযাওয়াতির রসূল: ১/২৭০-২৭১।
📄 শত্রুদের সম্পদ ও ফসল নষ্ট করা
রসূলুল্লাহ সা. মুজাহিদদের নিয়ে বনু নাযিরের এলাকায় যান। কিছুদিন তাদের অবরোধ করে রাখেন। বনু নাযির গোত্রের লোকেরা শক্তিশালী দুর্গে নিরাপদে অবস্থান নেয়। এমতাবস্থায় রসূলুল্লাহ সা. সাহাবীদেরকে খেজুরের গাছসমূহ কেটে ফেলতে ও জ্বলিয়ে দিতে আদেশ দেয়। তা দেখে বনু নাযিরের লোকেরা দূর থেকে চিৎকার করে বলতে লাগলো, মুহাম্মাদ, তুমি তো বিপর্যয় সৃষ্টি করতে নিষেধ করতে এবং যে তা করতো তার নিন্দা করতে, এখন কেন তুমি খেজুর গাছ কাটছো এবং জ্বালিয়ে দিচ্ছো? ৬৬৫
এ প্রেক্ষিতে আল্লাহ তাআলা বলেন : ৬৬৬
مَا قَطَعْتُمْ مِنْ لِينَةٍ أَوْ تَرَكْتُمُوهَا قَائِمَةٌ عَلَى أُصُولِهَا فَبِإِذْنِ اللَّهِ وَلِيُخْزِيَ الْفَاسِقِينَ
তোমরা যেসব নতুন খেজুর গাছ কেটে ফেলছ অথবা সেগুলোকে তাদের মূলের ওপর দাঁড়িয়ে থাকতে দিয়েছ। তা তো ছিল আল্লাহর অনুমতিক্রমে এবং যাতে তিনি ফাসেকদের লাঞ্ছিত করতে পারেন। ৬৬৭
শায়েখ আবু যুহরা এ আয়াত নিয়ে বিশদ আলোচনা করেন। তিনি এ ব্যাপারে ফকীহগণের দৃষ্টিভঙ্গি বিশ্লেষণ করে বলেন, যুদ্ধক্ষেত্রে ধ্বংসাত্মক কার্যক্রমের ব্যাপারে শরীয়তের বিভিন্ন উৎস ও যুদ্ধক্ষেত্রে নবীজির নীতিমালা থেকে আমরা যেসব সিদ্ধান্ত পাই তা হলো :
১. যুদ্ধ চলাকালে শত্রুপক্ষের গাছপালা কাটা যাবে না। তাদের বাড়ি-ঘর ভেঙে ফেলা যাবে না। জনগণকে দুর্ভোগে ঠেলে দেয়া যাবে না। এটাই ইসলামের মূলনীতি। জিহাদের মৌলিক লক্ষ্য হচ্ছে, জিহাদের মাধ্যমে জনগণকে অত্যাচারী শাসকদের অত্যাচার থেকে মুক্তি দিয়ে ইসলামের সুবিচারের অধীনে নিয়ে আসা। কুরআন-হাদীস দ্বারা এটা প্রমাণিত।
২. তবে কথা হচ্ছে, গাছপালা কাটা ও বাড়ি-ঘর ভেঙে ফেলা ছাড়া যদি কোনো উপায় না থাকে, সে ক্ষেত্রে তা অবশ্যই করা উচিত। যেমন শত্রুবাহিনী যদি কোনো বাগানের পেছনে আশ্রয় নেয় বা তার মাধ্যমে ইসলামী-বাহিনীর ক্ষতি করার চেষ্টা করে, তাহলে সে ক্ষেত্রে গাছপালা কাটলে ও বাড়ি-ঘর ভেঙে ফেললে কোনো সমস্যা নেই। কেননা, রণাঙ্গনে মাঝেমাঝে এরকম প্রয়োজনীয়তা দেখা দেয়। তাই আমরা দেখতে পাই, রসূলুল্লাহ সা. সাকিফ গোত্রের দুর্গ ধ্বংসের সময় এমনটি করেছিলেন।
৩. যেসব ফকিহ গাছপালা কাটা ও বাড়ি-ঘর ভেঙে ফেলার অনুমতি দিয়েছেন, তারাও এই মূলনীতির আলোকেই এর অনুমতি দিয়েছেন। জনদুর্ভোগ সৃষ্টির লক্ষ্যে নয়, বরং শত্রুদের বিরুদ্ধে কার্যকরী ভূমিকা রাখার স্বার্থেই এই অনুমতি। مسلمانوں বিরুদ্ধে অস্ত্র নিয়ে যারা যুদ্ধে লিপ্ত, তাদের শায়েস্তা করার জন্য এ ধরনের কর্মকাণ্ড বৈধ। ৬৬৮
টিকাঃ
৬৬৫ হাদীসুল কুরআনিল কারীম আন গাযাওয়াতির রসূল: ১/২৭৪।
৬৬৬ তাফসীরে তাবারী: ২৮/৩৪।
৬৬৭ সূরা হাশর: ৫।
৬৬ শায়খ আবু যুহরা প্রণীত খাতামুন নাবিয়্যীন: ২/২৬৫-২৬৯।
📄 ইসলামী রাষ্ট্রের অর্থনৈতিক কাঠামো
বনু নাযিরের লোকেরা দেশান্তরী হওয়ার পর তাদের যেসব ধন-সম্পদ مسلمانوں হাতে আসে, তা বণ্টনের নীতিমালার ব্যাপারে আল্লাহ তাআলা বলেন:
وَمَا أَفَاءَ اللَّهُ عَلَى رَسُولِهِ مِنْهُمْ فَمَا أَوْجَفْتُمْ عَلَيْهِ مِنْ خَيْلٍ وَلَا رِكَابٍ وَلَكِنَّ اللَّهَ يُسَلِّطُ رُسُلَهُ عَلَى مَنْ يَشَاءُ وَاللَّهُ عَلَى كُلِّ شَيْءٍ قَدِيرُه
আল্লাহ তার রসূলকে তাদের কাছ থেকে যে ফায় (বিনা যুদ্ধে পাওয়া সম্পদ) দিয়েছেন তার জন্য তোমরা ঘোড়াও দৌড়াওনি, আর উটেও চড়োনি; বরং আল্লাহ তার রসূলগণকে যার উপর ইচ্ছে আধিপত্য দান করেন; আল্লাহ সর্ববিষয়ে ক্ষমতাবান। ৬৬৯
আল্লাহ এখানে বলেছেন, বনু নাযিরে কোনো বড় যুদ্ধ ছাড়াই مسلمانوں তিনি সম্পদ দান করেছেন। মুসলমানরা শুধু বনু নাযিরের দিকে যুদ্ধের জন্য যাত্রা করেছিল। কিন্তু যুদ্ধ করতে হয়নি। যুদ্ধ ছাড়াই রসূল সা. ইহুদিদের পতন নিশ্চিত করেছেন। তাদের নির্বাসনে পাঠিয়ে গণিমতের সম্পদ লাভ করেছেন। তিনি আল্লাহর নির্দেশনা অনুযায়ী এসব সম্পদ ব্যয় করেন। আল্লাহ তাআলা বনু নাযির গোত্রের সম্পদগুলো দিয়েছেন তার রসূলকে। যার মাধ্যমে নবীজি সা. নিজের বাৎসরিক ব্যয় নির্বাহ করতেন এবং মুসলিম মুজাহিদদের জন্য অস্ত্রশস্ত্র কিনতেন। ৬৭০
আল্লাহ তাআলা কাফেরদের অন্যান্য এলাকা থেকে বিনা যুদ্ধে প্রাপ্ত 'মালে ফায়'-এর বিধান সম্পর্কে ইরশাদ করেন:
لِلْفُقَرَاءِ الْمُهَاجِرِينَ الَّذِينَ أُخْرِجُوا مِنْ دِيَارِهِمْ وَأَمْوَالِهِمْ يَبْتَغُونَ فَضْلًا مِنَ اللَّهِ وَرِضْوَانًا وَيَنْصُرُونَ اللَّهَ وَرَسُولَهُ أُولَئِكَ هُمُ الصَّادِقُونَ
এই সম্পদ অভাবগ্রস্ত মুহাজিরদের জন্য যারা নিজেদের ঘরবাড়ি ও সম্পত্তি হতে উৎখাত হয়েছে। তারা আল্লাহর অনুগ্রহ ও সন্তুষ্টি কামনা করে এবং আল্লাহ ও তার রসূলের সাহায্য করে। তারাই তো সত্যাশ্রী। ৬৭১
বনু নাযির গোত্রের যুদ্ধলব্ধ সম্পদ বিশেষভাবে রসূলুল্লাহ সা.-কে দেওয়া হয়েছিল। তিনি প্রয়োজন অনুযায়ী তা থেকে নিজের জন্য ব্যয় করতেন। মুসলমানদের জন্যও ব্যয় করতেন। আরো ব্যয় করতেন আল্লাহ তাআলার নির্দেশিত বিভিন্ন প্রয়োজনে। বনু নাযির থেকে বিপুল পরিমাণ যুদ্ধলব্ধ সম্পদ পাওয়ার পর নবীজি সা. সাআদ ইবনে কায়েসকে ডেকে বলেন, তুমি তোমার গোত্রের লোকদের ডাকো। সাবিত জানতে চাইলেন, শুধু খাজরাজদের? রসূলুল্লাহ সা. বলেন, না, সকল আনসারীকে ডেকে আনো। অতঃপর তিনি আউস-খাজরাজ নির্বিশেষে সবাইকে ডেকে আনেন।
সবাই সমবেত হলে রসূলুল্লাহ সা. প্রথমে আল্লাহর হামদ পাঠ করেন। অতঃপর আনসার এবং মুহাজিরদের পারস্পরিক হৃদ্যতা ও ভালোবাসার বিষয়টি তুলে ধরেন। নিজেদের ঘরবাড়ি ও অন্যান্য সম্পদের ক্ষেত্রেও আনসাররা যেভাবে মুহাজিরগণকে প্রাধান্য দিয়েছিলেন, সে বিষয়টিও তুলে ধরেন। এরপর তিনি বলেন, যদি তোমরা চাও তাহলে বনু নাযির হতে প্রাপ্ত যুদ্ধলব্ধ সম্পদ আমি তোমাদের ও মুহাজিরগণের মধ্যে বণ্টন করে দেবো। এ ক্ষেত্রে মুহাজিররা তোমাদের যেসব আবাসন ব্যবহার করছে বা তোমাদের যেসব সম্পত্তিতে অংশীদার হয়েছে, তা সেভাবেই বহাল থাকবে।
অথবা তোমরা যদি চাও তবে এসব সম্পদ আমি শুধু তাদের মধ্যে বণ্টন করে দিতে পারি। তাহলে তোমাদের যেসব সম্পদ তারা উপভোগ করছে, তা তারা তোমাদের ফিরিয়ে দেবে।
জবাবে সাআদ ইবনে মুআয ও সাআد ইবনে উবাদা রা. সমস্বরে বলে ওঠেন, হে আল্লাহর রসূল, আমরা বরং এসব সম্পত্তি মুহাজিরগণের মধ্যে বণ্টন করে দিচ্ছি এবং তারা অতীতের মতো আমাদের যেসব সম্পদ ভোগ-দখল করে আসছিলেন, তাও সেভাবে বহাল থাকুক। সকল আনসারী সাহাবী অতঃপর সমস্বরে বলে ওঠেন, হে আল্লাহর রসূল! আমরা এ বণ্টনে একমত ও সন্তুষ্ট। ৬৭২
এরপর রসূলুল্লাহ সা. সব সম্পদ মুহাজিরগণের মধ্যে বণ্টন করে দিলেন এবং আনসারদের মধ্যে আবু দুজানা ও সাহাল ইবনে হুনাইফ ছাড়া কাউকে কিছুই দিলেন না। ৬৭৩
রসূলুল্লাহ সা. ভালোভাবেই জানতেন, এ সম্পদ যে কোনোভাবে ব্যয় করার পূর্ণ এখতিয়ার তার রয়েছে। তবুও তিনি আনসারদের খুশি করতে তাদের সমবেত করেছিলেন এবং সম্পদ বণ্টন সম্পর্কে তাদের সাথে পরামর্শ করেছিলেন। রাজনৈতিক ও সামাজিক বিভিন্ন কর্মকাণ্ডে রসূলুল্লাহ সা.-এর এমন উত্তম আচরণ অহরহ দেখা যেতো।
আনসারী সাহাবীদের কষ্ট কিছুটা কমে যায় এমন বণ্টনের ফলে। বনু নাযিরের এলাকায় মুহাজির সাহাবীরা ঘর তৈরি করেন। আনসারীদের যেসব সম্পদ তাদের দখলে ছিল, তা ফিরিয়ে দেন। অবশ্য মুহাজিরগণের মধ্যে যেসব সাহাবীর বনু নাযিরের সম্পদের প্রয়োজন ছিল না, তারা সেখান থেকে কোনো অংশ নেননি। এভাবে অর্থনৈতিকভাবে ক্রমান্বয়ে সচ্ছল হন মুহাজির সাহাবীরা। ৬৭৪
ইসলামী রাষ্ট্রের অর্থনীতিতে এই বণ্টন ছিল এক বিরাট মাইলফলক। এর আগে যুদ্ধলব্ধ যাবতীয় সম্পদ আল্লাহর নির্দেশিত পদ্ধতিতে এক পঞ্চমাংশ ইসলামী রাষ্ট্রের জন্য নির্ধারিত রেখে যুদ্ধে অংশগ্রহণকারী ব্যক্তিদের মধ্যে বণ্টন করা হতো। কিন্তু বনু নাযির যুদ্ধের পর যুদ্ধলব্ধ সম্পদ বণ্টনে নতুন নীতি অনুসরণ করা হয়। কাফেরদের থেকে অধিকৃত সম্পদ দুই প্রকার:
এক. মুসলিম মুজাহিদরা যুদ্ধের মাধ্যমে শত্রুপক্ষকে পরাজিত করে যেসব সম্পদ অর্জন করেন। এই সম্পদের এক পঞ্চমাংশ ইসলামী রাষ্ট্রের জন্য রেখে অবশিষ্ট সম্পদ মুসলিম মুজাহিদদের মধ্যে বণ্টন করে দেওয়া হয়।
দুই. বিনাযুদ্ধে প্রাপ্ত সম্পদ। এই সম্পদ ব্যবহারের পরিপূর্ণ অধিকার ইসলামী রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ নেতার। তিনি প্রয়োজন মাফিক নিজের ইচ্ছে মতো তা ব্যয় করবেন। ইচ্ছে করলে রাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ অর্থনৈতিক উন্নয়ন, দারিদ্র্য বিমোচন, রণসরঞ্জাম ক্রয়, শহর পুনঃগঠন বা যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নতি সাধনে ব্যয় করতে পারবেন। এক কথায় ইসলামী রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ নেতার হাতে রিজার্ভ বাজেট হিসেবে এই সম্পদ রক্ষিত থাকবে। ৬৭৫
সূরা হাশরে বনু নাযির গোত্রের সম্পদ বণ্টন সম্পর্কে আলোচনা করা হয়েছে। সম্পদ যেন কেবল বিত্তশালীদের মধ্যেই আবর্তিত না হয়, এ লক্ষ্যে আল্লাহ তাআলা কাউকে দিতে আর কাউকে না দিতে বলেছেন। এ মর্মে ইরশাদ হয়েছে:
مَا أَفَاءَ اللَّهُ عَلَى رَسُولِهِ مِنْ أَهْلِ الْقُرَى فَلِلَّهِ وَلِلرَّسُولِ وَلِذِي الْقُرْبَى وَالْيَتَامَى وَالْمَسَاكِينِ وَابْنِ السَّبِيلِ كَيْ لَا يَكُونَ دُولَةً بَيْنَ الْأَغْنِيَاءِ مِنْكُمْ وَمَا آتَاكُمُ الرَّسُولُ فَخُذُوهُ وَمَا نَهَاكُمْ عَنْهُ فَانْتَهُوا وَاتَّقُوا اللَّهَ إِنَّ اللَّهَ شَدِيدُ الْعِقَابِ
আল্লাহ জনপদবাসীদের নিকট থেকে তার রসূলকে ফায় হিসেবে যা দিয়েছেন তা আল্লাহর, রসূলের, আত্মীয়-স্বজনদের, এতিমদের, মিসকীন ও মুসাফিরদের এটি এ জন্য যে, যাতে ধন-সম্পদ তোমাদের মধ্যকার বিত্তশালীদের মাঝেই কেবল আবর্তিত না থাকে। রসূল তোমাদের যা দেয় তা গ্রহণ কর, আর যা থেকে সে তোমাদের নিষেধ করে তা থেকে বিরত হও এবং আল্লাহকেই ভয় কর, নিশ্চয় আল্লাহ শাস্তি প্রদানে কঠোর। ৬৭৬
সম্পদ ধনাঢ্যদের মাঝেই ঘুরপাক না খাওয়ার হেকমতের কথা এ আয়াতে বলা হয়েছে। এ থেকে বোঝা যায় ইসলামী অর্থনীতির অন্যতম মূলনীতি এটা। ধনী-নির্ধন তথা বিভিন্ন স্তরের মানুষকে পরস্পরের কাছাকাছি আনার এবং বিভিন্ন সম্প্রদায়ের মানুষের মধ্যে একতা ও সম্প্রীতির বন্ধন তৈরি করার চেষ্টা করে ইসলাম। এক কথায় ব্যক্তি, সমাজ ও রাষ্ট্রীয় জীবনে যেন ইনসাফময় জীবনব্যবস্থা জারি থাকে, এটা ইসলামী অর্থনীতির অন্যতম লক্ষ্য।
প্রকৃত প্রস্তাবে, মানুষ যদি ইসলামী অর্থনীতি পরিপূর্ণভাবে মেনে চলে, যেমন জাকাত আদায় করে, সুদের কারবার বন্ধ করে, অন্যায়ভাবে স্টক কারসাজি না করে; তাহলে নিঃসন্দেহে মানুষের অর্থনৈতিক জীবনব্যবস্থা উন্নতির উচ্চশিখরে পৌঁছবে। অর্থনৈতিক দিক থেকে স্তরগত তারতম্য বিদ্যমান থাকলে সমাজের প্রতিটি মানুষ স্বাভাবিকভাবে জীবনযাপন করতে পারবে। ৬৭৭
আল্লাহ তাআলা সম্পদ বণ্টনের নীতিমালা আলোচনা করেছেন। আরো বলেছেন কী কারণে এভাবে সম্পদ বণ্টন করতে হবে। এরপর মানুষ যেন রসূলুল্লাহ সা.-এর আদিষ্ট বিষয়সমূহ পালন করে ও তার বারণকৃত বিষয়সমূহ থেকে বিরত থাকে, এ ব্যাপারে তিনি مسلمانوں নির্দেশনা দিয়েছেন। এর মাধ্যমে ঈমান পরিপূর্ণ হয়। আল্লাহ তাআলা তাকওয়া অবলম্বনের নির্দেশ দিয়েছেন। কারণ, যারা আল্লাহকে ভয় করে না, তাদেরকে আল্লাহ তাআলা কঠিন শাস্তি দেন। তিনি বলেন:
مَا أَفَاءَ اللَّهُ عَلَى رَسُولِهِ مِنْ أَهْلِ الْقُرَى فَلِلَّهِ وَلِلرَّسُولِ وَلِذِي الْقُرْبَى وَالْيَتَامَى وَالْمَسَاكِينِ وَابْنِ السَّبِيلِ كَيْ لَا يَكُونَ دُولَةٌ بَيْنَ الْأَغْنِيَاءِ مِنْكُمْ وَمَا آتَاكُمُ الرَّسُولُ فَخُذُوهُ وَمَا نَهَاكُمْ عَنْهُ فَانْتَهُوا وَاتَّقُوا اللَّهَ إِنَّ اللَّهَ شَدِيدُ الْعِقَابِ
আল্লাহ জনপদবাসীদের নিকট থেকে তার রসূলকে ফায় হিসেবে যা দিয়েছেন তা আল্লাহর, রসূলের, আত্মীয়-স্বজনদের, এতিমদের, মিসকীন ও মুসাফিরদের এটি এ জন্য যে, যাতে ধন-সম্পদ তোমাদের মধ্যকার বিত্তশালীদের মাঝেই কেবল আবর্তিত না থাকে। রসূল তোমাদের যা দেয় তা গ্রহণ কর, আর যা থেকে সে তোমাদের নিষেধ করে তা থেকে বিরত হও এবং আল্লাহকেই ভয় করো, নিশ্চয় আল্লাহ শাস্তি প্রদানে কঠোর। ৬৭৮
অর্থাৎ, রসূলের কথা মতো চলো। কারণ, তিনি নিঃসন্দেহে তোমাদেরকে ভালো কাজের আদেশ দেন এবং মন্দ কাজ করতে বারণ করেন।
اتَّقُوا اللَّهَ 'আল্লাহকেই ভয় করো' অর্থাৎ, আদেশ-নিষেধসমূহ পালনের ক্ষেত্রে আল্লাহ তাআলার ভয় অন্তরে সজাগ রাখো। إِنَّ اللَّهَ شَدِيدُ الْعِقَابِ 'নিঃসন্দেহে আল্লাহ তাআলা কঠোর শাস্তিদাতা।' যারা আল্লাহর কথা মানবে না, তাদের শাস্তি অত্যন্ত ভয়াবহ হবে। তাফসীরকারকগণ বলেন, এ আয়াত যদিও 'মালে ফায়' তথা বিনাযুদ্ধে প্রাপ্ত সম্পদের সাথে সম্পৃক্ত কিন্তু এর বিধান শরীয়তের যাবতীয় বিধিবিধান ও আদেশ-নিষেধের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য হবে। চাই সেটি ওয়াজিব বিধান হোক অথবা মুস্তাহাব বা হারাম। ৬৭৯
পবিত্র কুরআনের বহু আয়াতে এভাবেই সর্বাবস্থায় আল্লাহ ও তার রসূলের আনুগত্য ও তাদের নির্দেশিত পথে চলার আদেশ দেওয়া হয়েছে। আল্লাহ তাআলা বলেন:
فَلَا وَرَبِّكَ لَا يُؤْمِنُونَ حَتَّى يُحَكِّمُوكَ فِيمَا شَجَرَ بَيْنَهُمْ ثُمَّ لَا يَجِدُوا فِي أَنْفُسِهِمْ حَرَجًا مِمَّا قَضَيْتَ وَيُسَلِّمُوا تَسْلِيمًا
অতএব তোমার রবের কসম, তারা মুমিন হবে না যতক্ষণ না তাদের মধ্যে সৃষ্ট বিবাদের ব্যাপারে তোমাকে বিচারক নির্ধারণ করে, তারপর তুমি যে ফয়সালা দেবে সে ব্যাপারে নিজদের অন্তরে কোনো দ্বিধা অনুভব না করে এবং পূর্ণ সম্মতিতে মেনে নেয়। ৬৮০
রসূলুল্লাহ সা. বলেন, আমি যেসব কাজ করতে তোমাদের বাধা দিই, তা থেকে বিরত থাকো। আর যেসব কাজ করার নির্দেশ দিই, তা যথাসম্ভব পালন করো। কেননা, তোমাদের পূর্ববর্তী লোকেরা তাদের নবীদের বেশি বেশি প্রশ্ন করতো ও মতবিরোধে জড়াতো আর এটাই ছিল তাদের ধ্বংসের কারণ। ৬৮১
টিকাঃ
৮৬৯ সূরা হাশর: ৬।
৬৭০ সহীহ মুসলিম: ১৭৫৭।
৬৭১ সূরা হাশর: ৮।
৬৭২ সহীহ মুসলিম: ১৭৫৭।
৬৭০ শারহুজ জারকানি আলাল মাওয়াহিব: ২/৮৬।
৬৭৪ সালিহ আশশামী প্রণীত আস সীরাতুন নববিয়াহ: ২২২।
৬৭৫ কিরাআতুন সিয়াসিয়াতুন লিস সীরাতিন নববিয়াহ: ১৬৯।
৬৭৬ সূরা হাশর: ৭।
৬৭৭ ফিকহুস সীরাহ লিলবুতী: ১৯৪।
৬৭৮ সূরা হাশর: ৭।
৬৭৯ তাফসীরে রাজী: ২৯/২৮। সাফওয়াতুত তাফাসীর: ৩/৩৫১।
৬৮০ সূরা নিসা: ৬৫।
৬৮১ সহীহ মুসলিম: ১৮৩০।