📘 নবীজির যুদ্ধ জীবন পাঠ ও পর্যালোচনা > 📄 বনু নাযিরকে সতর্কীকরণ, অবরোধ ও নির্বাসন

📄 বনু নাযিরকে সতর্কীকরণ, অবরোধ ও নির্বাসন


ক. বনু নাযিরকে সতর্কিকরণ
বিখ্যাত সীরাতের বইগুলোতে এসেছে, রসূলুল্লাহ সা. বনু নাযিরকে দশ দিনের মধ্যে মদীনা ছেড়ে যাওয়ার আদেশ দেন। তিনি মুহাম্মাদ ইবনে মাসলামা রা.- কে নির্দেশ দেন, তিনি যেন বনু নাযিরকে বলেন, রসূলুল্লাহ সা. তোমাদেরকে আমাদের এলাকা থেকে বেরিয়ে যাওয়ার নির্দেশ দিয়েছেন। তোমরা প্রতারণা করেছো। তাই আমাদের পারস্পরিক চুক্তি বাতিল। তোমাদেরকে দশ দিনের সুযোগ দেওয়া হচ্ছে। দশ দিন পরে যদি তোমাদের কাউকে এখানে দেখা যায়, তাহলে তাকে হত্যা করা হবে।
বনু নাযিরের লোকেরা রসূলের বার্তার কোনো জবাব দেয়নি। তারা শুধু বলেছিল, আমরা কখনও এটা আশা করিনি যে, আউস গোত্রের কোনো ব্যক্তি আমাদের কাছে এ ধরনের বার্তা নিয়ে আসবে। জবাবে মুহাম্মাদ ইবনে মাসলামা রা. তাদের বললেন, মানুষের চিন্তা-চেতনায় বিবর্তন ঘটেছে। ইসলাম মানুষের ইসলামপূর্ব সকল প্রতিশ্রুতি বাতিল করে দিয়েছে। তারা বললো, আমরা এই নির্দেশ মেনে নিলাম। তারা দেশত্যাগের প্রস্তুতি নিতে শুরু করে। ৬৫০
আবদুল্লাহ ইবনে উবাই তখন বনু নাযিরের কাছে এ মর্মে পয়গাম পাঠিয়েছিল—তোমরা ভয় পেয়ো না বা আত্মসমর্পণ করো না। আমরা কিছুতেই তোমাদেরকে مسلمانوں হাতে পরাজিত হতে দেবো না। তারা যদি তোমাদের সাথে যুদ্ধ করে তাহলে আমরাও তোমাদের সাথে যাবো। ৬৫১
তোমরা দেশত্যাগ কোরো না। আমার সাথে আমার গোত্রের প্রায় দুই হাজার সদস্য প্রস্তুত রয়েছে। তারাও তোমাদের সাথে তোমাদের দুর্গে যুদ্ধের জন্য সমবেত হবে। তোমরা নিজেদের স্থানে অবিচল থাকো। মুসলমানরা যদি হামলা চালাতে চায়, তবে এই দুই হাজার মানুষের লাশ ডিঙ্গিয়ে যেতে হবে। ৬৫২
আবদুল্লাহ ইবনে উবাইয়ের এই আহ্বানে ইহুদিদের মাঝে প্রাণসঞ্চার হয়। ইহুদি নেতা হুয়াই ইবনে আখতাব তাদের সাহস বাড়িতে দেয়। সে জাদা ইবনে আখতাবের মাধ্যমে নবীজির কাছে বার্তা পাঠায়, আমরা আমাদের আবাসস্থল ত্যাগ করবো না। তোমাদের যা ইচ্ছা করতে পারো। তাদের এই বার্তা পেয়ে নবীজি সা. উচ্চৈস্বরে 'আল্লাহু আকবার' বলেন। সাহাবায়ে কেরাম রা.ও তার সঙ্গে উচ্চৈস্বরে 'আল্লাহু আকবার' বলেন। রসূলুল্লাহ সা. বলেন, ইহুদিরা যুদ্ধ করবে। ৬৫৩

খ. অবরোধ ও নির্বাসন
ঘোষণার পর দশ দিন অতিবাহিত হয়ে গেলো। কিন্তু বনু নাযির নিজেদের বাসস্থান ত্যাগ করলো না। মুসলিম সেনাবাহিনী তাদের এলাকা অবরোধ করলো। পনেরো দিন যাবৎ তারা অবরুদ্ধ রইলো। রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সাহাবীদেরকে খেজুরের গাছসমূহ কেটে ফেলতে ও তা জ্বালিয়ে দিতে নির্দেশ দিলেন। তা দেখে বনু নাযিরের লোকেরা দূর থেকে চিৎকার করে বলতে লাগলো, মুহাম্মাদ, তুমি তো বিপর্যয় সৃষ্টি করতে নিষেধ করতে এবং যে তা করতো তার নিন্দা করতে এখন কেন তুমি খেজুর গাছ কাটছো এবং জ্বালিয়ে দিচ্ছো?
বনু নাযির ইবনে উবাইয়ের বাহিনীর সাহায্যের অপেক্ষায় থেকে আত্মসমর্পন বা মুকাবিলা কোনোটাই করলো না। কিন্তু দীর্ঘ অপেক্ষার পরও তাদের কাছে কোনো সাহায্য এলো না। আল্লাহ তাদের মনে ভীতি সৃষ্টি করে দিলেন। তারা রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে অনুরোধ করলো, আমাদের মদীনা থেকে চলে যেতে দিন। আমরা আমাদের সব অস্ত্রশস্ত্র রেখে যাবো। অস্থাবর সম্পত্তির যতটুকু প্রত্যেকের উট বহন করে নিয়ে যেতে পারে, ততটুকু নিয়ে যাওয়ার অনুমতি দিন। রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাদের প্রস্তাবে রাজি হলেন। তারা উটের পিঠে বহনোপযোগী অস্থাবর সম্পদ নিয়ে গেলো। কেউ কেউ ঘরের দরজার ওপরের অংশ ভেঙ্গে উটের পিঠে করে নিয়ে গেলো। তাদের কিছু লোক খায়বারে এবং কিছু লোক সিরিয়ায় চলে গেলো। ৬৫৪
তারা নিজেদের সাথে বিপুল পরিমাণে স্বর্ণ ও রৌপ্য নিয়ে যায়। সাল্লাম ইবনে আবুল হুকাইক একটি গরুর চামড়া ভরে সোনা-রূপা নিয়ে যায়। সে বলছিল, আমরা আমাদের জীবনের বিভিন্ন সংকটে স্বস্থিতে থাকার জন্য তা নিয়ে যাচ্ছি। অবশ্য খেজুরগাছসমূহ আমরা ফেলে রেখে যাচ্ছি। এতে চিন্তার কিছু নেই। কেননা, খায়বারেও পর্যাপ্ত খেজুরগাছ আছে।
মুসলমানরা যেন বনু নাযিরের ইহুদিদের বহিষ্কারে আনন্দ করতে না পারে, সে লক্ষ্যে তারা ছয়শো উট বোঝাই করে নিজেদের ধন-সম্পদ নিয়ে গান বাজনাসহ বিপুল শোভাযাত্রা সহকারে নিজেদের অঞ্চল ত্যাগ করে। ইহুদিদের অধিকাংশ খায়বার অঞ্চলে চলে গেলেও তাদের কিছু লোক সিরিয়ার আজরায়াতে যায়। ৬৫৫
রসূলুল্লাহ সা.-এর নির্দেশে তাদের নির্বাসনের যাবতীয় কার্যক্রম তদারকি করেন মুহাম্মাদ ইবনে মাসলামা রা.। ৬৫৬
যারা খায়বার গিয়েছিল, তাদের মধ্যে নেতৃস্থানীয় ব্যক্তি ছিল সালাম ইবনে আবুল হুকাইক, কিনানা ইবনে রাবী ইবনে আবুল হুকাইক ও হুয়াই ইবনে আখতাব। খায়বারের অধিবাসীরা বনু নাযিরের ইহুদিদের আন্তরিকভাবেই অভ্যর্থনা জানায়। ৬৫৭

টিকাঃ
৬৪৮ সূরা মায়িদা: ১১।
৬৪৯ হাদীসুল কুরআনিল কারীম আন গাযাওয়াতির রসূল: ১/২৫২।
৬৫০ তাফসীরে তাবারী: ২/৫৫২।
৬৫১ সীরাতে ইবনে হিশাম: ৩/২১২।
৬৫২ তারীখে তাবারী: ২/৫৫৩।
৬৫৩ ইবনে কাসীর প্রণীত আস সীরাতুন নববিয়‍্যাহ : ৩/১৪৬।
৬৫৪ হাদীসুল কুরআনিল কারীম আন গাযাওয়াতির রসূল: ১/২৫৭।
৬৫৫ আস সীরাতুল হালাবিয়া: ২/৫৬৫-২৬৬।
৬৫৬ ওয়াকেদী প্রণীত মাগাযী : ১/৩৭৪। আল ইয়াহুদ ফিস সুন্নাতিল মুতাহহারাহ: ১/৩২১।
৬৫৭ সীরাতে ইবনে হিশাম: ৩/২১২।

📘 নবীজির যুদ্ধ জীবন পাঠ ও পর্যালোচনা > 📄 গাযওয়ায়ে বনু নাযির হতে প্রাপ্ত শিক্ষা ও তাৎপর্য

📄 গাযওয়ায়ে বনু নাযির হতে প্রাপ্ত শিক্ষা ও তাৎপর্য


কুরআনে কারীমে একটি সূরা বনু নাযির গোত্রের দেশান্তর সম্পর্কে অবতীর্ণ হয়েছে। সূরাটি হচ্ছে সূরায়ে হাশর। 'হিবরুল উম্মাহ' নামে খ্যাত আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস রা. এ সূরাকে 'সূরা বনু নাযির' বলতেন। ইমাম বুখারী রহ. সাঈদ ইবনে যুবায়েরের সূত্রে বর্ণনা করেন, আমি আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস-এর সামনে একবার 'সূরা হাশর' বললে তিনি বলেন, বরং তুমি বলো 'সূরা বনু নাযির'। ৬৫৮
সূরা হাশরে গাযওয়ায়ে বনু নাযির সংক্রান্ত যাবতীয় বিষয়ে আলোকপাত করা হয়েছে। বিনা যুদ্ধে প্রাপ্ত কাফেরদের সম্পদ তথা 'মালে ফায়'-এর বিধানও এসেছে এ সূরায়। ইহুদিদের সাথে মুনাফেকদের গভীর সম্পর্ক ও ইহুদিদের মানসিক অবস্থার কথাও বলা হয়েছে। যুদ্ধের ব্যাপারে আলোচনা করতে গিয়ে আল্লাহ তাআলা मुसलमानों সম্বোধন করে নির্দেশনা দিয়েছেন, যেন তারা তাকওয়া অর্জন করে এবং আল্লাহর অবাধ্য না হয়। অতঃপর আল্লাহ তাআলা কুরআনে কারীমের উচ্চ মর্যাদা ও সম্মানের কথা তুলে ধরেছেন। পাশাপাশি তাওহীদ, আল্লাহর বড়ত্ব ও কেয়ামতের প্রস্তুতির শিক্ষা দিয়েছেন। সূরা হাশরের কিছু শিক্ষা এখানে উল্লেখ করছি :
ক. আল্লাহর প্রশংসা
সূরাটি শুরু করা হয়েছে আল্লাহর প্রশংসাবাণীর মাধ্যমে। বলা হয়েছে, সমুদয় সৃষ্টিজগত তথা মানবজগত, প্রাণীজগৎ, উদ্ভিদ এমনকি সব ধরনের জড়বস্তুও আল্লাহ তাআলার গুণকীর্তন করে এবং তার একত্ববাদ, শক্তি ও মর্যাদার গুণগান গায়। ৬৫৯
আল্লাহ তাআলা বলেন :
سَبَّحَ لِلَّهِ مَا فِي السَّمَاوَاتِ وَمَا فِي الْأَرْضِ وَهُوَ الْعَزِيزُ الْحَكِيمُ
আকাশমন্ডলী ও পৃথিবীতে যা কিছু আছে সবই তার পবিত্রতা ও মহিমা ঘোষণা করে, তিনি পরাক্রমশালী, প্রজ্ঞাময়। ৬৬০
সূরার শুরুতেই বলা হয়েছে, আকাশমন্ডলী ও পৃথিবীতে যা কিছু আছে সবই আল্লাহ তাআলার পবিত্রতা ও মহিমা ঘোষণা করে। তিনি কোনো জিনিস অনর্থক তৈরি করেননি ও অপ্রয়োজনীয় কোনো বিধান প্রয়োগ করেননি। বনু নাযিরের বিরুদ্ধে তার রসূলকে সাহায্য করাও আল্লাহ তাআলার প্রজ্ঞাময় পরিকল্পনার অন্তর্ভুক্ত। তারা मुसलमानों সাথে প্রতিশ্রুতি ভঙ্গ করার ফলে তিনি তাদের বিতাড়িত করেন তাদের প্রিয় জন্মভূমি ও ঘর থেকে। ৬৬১

টিকাঃ
৬৫৮ সহীহ বুখারী: ৪০২৯।
৬৫৯ হাদীসুল কুরআনিল কারীম আন গাযাওয়াতির রসূল: ১/৩২৭।
৬৬০ সূরা হাশর: ১।
৬৬১ তাফসীরে সাদী: ৩/৩২৭।

📘 নবীজির যুদ্ধ জীবন পাঠ ও পর্যালোচনা > 📄 ভয়-ভীতি ও প্রভাব আল্লাহর পক্ষ হতে আসে

📄 ভয়-ভীতি ও প্রভাব আল্লাহর পক্ষ হতে আসে


এ মর্মে আল্লাহ তাআলা বলেন :
هُوَ الَّذِي أَخْرَجَ الَّذِينَ كَفَرُوا مِنْ أَهْلِ الْكِتَابِ مِنْ دِيَارِهِمْ لِأَوَّلِ الْخَشْرِ مَا ظَنَنْتُمْ أَنْ يَخْرُجُوا وَظَنُّوا أَنَّهُمْ مَانِعَتُهُمْ حُصُونُهُمْ مِنَ اللَّهِ فَأَتَاهُمُ اللَّهُ مِنْ حَيْثُ لَمْ يَحْتَسِبُوا وَقَذَفَ فِي قُلُوبِهِمُ الرُّعْبَ يُخْرِبُونَ بُيُوتَهُمْ بِأَيْدِيهِمْ وَأَيْدِي الْمُؤْمِنِينَ فَاعْتَبِرُوا يَا أُولِي الْأَبْصَارِهِ وَلَوْلَا أَنْ كَتَبَ اللهُ عَلَيْهِمُ الْجَلَاءَ لَعَذَّبَهُمْ فِي الدُّنْيَا وَلَهُمْ فِي الْآخِرَةِ عَذَابُ النَّارِه ذَلِكَ بِأَنَّهُمْ شَاقُوا اللَّهَ وَرَسُولَهُ وَمَنْ يُشَاقَّ اللَّهَ فَإِنَّ اللَّهَ شَدِيدُ الْعِقَابِ .
আহলে কিতাবদের মধ্যে যারা কুফরী করেছিল তিনিই তাদেরকে তাদের ঘর-বাড়ি থেকে বের করে দিয়েছিলেন প্রথমবারের মত। তোমরা ধারণাও করনি যে, তারা বেরিয়ে যাবে। আর তারা ধারণা করেছিল যে, তাদের দুর্গগুলো তাদেরকে আল্লাহর আযাব থেকে রক্ষা করবে। কিন্তু আল্লাহর আযাব এমন এক দিক থেকে আসল যা তারা কল্পনাও করতে পারেনি এবং তিনি তাদের অন্তরসমূহে ত্রাসের সঞ্চার করলেন, ফলে তারা তাদের বাড়ি-ঘর আপন হাতে ও মুমিনদের হাতে ধ্বংস করতে শুরু করলো। অতএব হে দৃষ্টিমান লোকেরা তোমরা উপদেশ গ্রহণ কর। আর আল্লাহ যদি তাদের জন্য নির্বাসন লিপিবদ্ধ না করতেন, তবে তিনি তাদেরকে দুনিয়াতে শাস্তি দিতেন এবং তাদের জন্য আখেরাতে রয়েছে আগুনের শাস্তি। এটি এ জন্য যে, তারা সত্যিই আল্লাহ ও তাঁর রসূলের বিরুদ্ধাচরণ করেছিল। আর যে আল্লাহর বিরুদ্ধাচরণ করে, তবে নিশ্চয় আল্লাহ আযাব প্রদানে কঠোর। ৬৬২
উপরোক্ত আয়াতগুলোতে গভীরভাবে চিন্তা করলে দেখতে পাবেন, একমাত্র আল্লাহ তাআলার ইচ্ছায় বনু নাযির গোত্রের ইহুদিরা তাদের অঞ্চল থেকে সিরিয়ার দিকে নির্বাসিত হয়েছে। অথচ যুদ্ধের সাজ-সরঞ্জামে তারাই ছিল শক্তিশালী। তাদের দুর্গও ছিল দুর্ভেদ্য। তাদেরকে এই এলাকা থেকে উৎখাতের শক্তি কারোই ছিল না। এ ব্যাপারে তারা নিশ্চিতও ছিল। কিন্তু অতর্কিত আক্রমণে তারা ভীত সন্ত্রস্ত হয়ে পড়ে। তারা নিজেরাই নিজেদের বাড়ি-ঘর ধ্বংস করে চলে যায়।
পবিত্র কুরআনের বর্ণনাভঙ্গি ইতিহাসবেত্তাদের বর্ণনাভঙ্গির সাথে মেলে না। কারণ আল্লাহ তাআলার কাছে সব ঘটনার প্রকৃতি ও গোপন রহস্যসমূহ উদ্ভাসিত। কুরআনে প্রতিটি ঘটনাকে সর্বময় কর্তৃত্বের অধিকারী ক্ষমতাবান আল্লাহ তাআলার দিকেই সম্বন্ধিত করা হয়। যেমনটি আমরা এ সূরার শুরুর দিকে দেখতে পাই। এখানে আল্লাহ বলেছেন, বনু নাযির গোত্রকে তাদের ঘর- বাড়ি থেকে তিনিই বের করেছেন। বর্ণিত হচ্ছে :
هُوَ الَّذِي أَخْرَجَ الَّذِينَ كَفَرُوا مِنْ أَهْلِ الْكِتَابِ
যারা কুফরী করেছিল তিনিই তাদেরকে তাদের ঘর-বাড়ি থেকে বের করে দিয়েছিলেন। ৬৬৩
এর পরের আয়াতগুলোতে পর্যায়ক্রমে বনু নাযিরের ইহুদিদের মানসিক অবস্থার চিত্র তুলে ধরা হয়েছে। বলা হয়েছে, পৃথিবীর যাবতীয় ভোগ্যসামগ্রী দিয়ে তাদের সচ্ছল করা হয়েছিল। কিন্তু তারা একেবারে শীর্ষ থেকে শূন্যে নেমে আসতে বাধ্য হয়। তাদের পরাজয়ের হেতু হচ্ছে ভীরুতা। তারা তাদের নিজের কাছেই হার মেনেছে।
এই গাযওয়া থেকে সকলের শিক্ষা নেওয়া উচিত। প্রকৃতপক্ষে সবকিছুর নিয়ন্ত্রক একমাত্র আল্লাহ। তার সিদ্ধান্তের সামনে কোনো বস্তু বা কোনো কর্ম প্রভাব বিস্তার করতে পারে না। তিনি সব কিছুই করতে সক্ষম। তাই তার শক্তিমত্তার ওপর সত্যিকারের বিশ্বাস প্রতিটি মানুষের অর্জন করা জরুরি। প্রতিটি ক্ষেত্রে আল্লাহ তাআলার প্রদর্শিত পন্থায়ই নিজেদের পরিশুদ্ধ করতে হবে। আল্লাহ তাআলার নির্দেশিত বিধানসমূহ বাস্তবায়ন করলেই কেবল সফলতা লাভ করা সম্ভব। তখন আল্লাহ অকল্পনীয়ভাবে সাহায্য করেন।
এই গাযওয়া উম্মতকে একটি মৌলিক শিক্ষা দেয়। আর তা হলো, একমাত্র আল্লাহ তাআলার ওপর ভরসা ও তার বিধান পালনের মাধ্যমে তার সাহায্য আসে। যারা এই বিশ্বাস রাখবে, তারা অবশ্যই আল্লাহর সাহায্য পাবে। শত্রুপক্ষ যত ক্ষমতাবান ও শক্তিমান হোক, তাতে কিছু যায় আসে না। কেননা, আল্লাহ এক চিরন্তন অপরাজিত সত্ত্বা। বনু নাযির গোত্রের ঘর-বাড়ি ছেড়ে যাওয়া আল্লাহ যে পরাক্রমশালী-এটা তার প্রমাণ। এখানে বুদ্ধিমান ও সৌভাগ্যবানদের জন্য উপদেশ নেওয়ার মতো রসদ রয়েছে।
এরপর আল্লাহ তাআলা বলেছেন, যদি তাদের নির্বাসনের শাস্তি না দেওয়া হতো, তাহলে অবশ্যই তাদের হত্যা করা হতো। পরকালেও জাহান্নামের কঠিন শাস্তি তাদের ভোগ করতে হতো। ৬৬৪

টিকাঃ
৬৬২ সূরা হাশর: ২-৪।
৬৬৩ সূরা হাশর : ২।
৬৬৪ হাদীসুল কুরআনিল কারীম আন গাযাওয়াতির রসূল: ১/২৭০-২৭১।

📘 নবীজির যুদ্ধ জীবন পাঠ ও পর্যালোচনা > 📄 শত্রুদের সম্পদ ও ফসল নষ্ট করা

📄 শত্রুদের সম্পদ ও ফসল নষ্ট করা


রসূলুল্লাহ সা. মুজাহিদদের নিয়ে বনু নাযিরের এলাকায় যান। কিছুদিন তাদের অবরোধ করে রাখেন। বনু নাযির গোত্রের লোকেরা শক্তিশালী দুর্গে নিরাপদে অবস্থান নেয়। এমতাবস্থায় রসূলুল্লাহ সা. সাহাবীদেরকে খেজুরের গাছসমূহ কেটে ফেলতে ও জ্বলিয়ে দিতে আদেশ দেয়। তা দেখে বনু নাযিরের লোকেরা দূর থেকে চিৎকার করে বলতে লাগলো, মুহাম্মাদ, তুমি তো বিপর্যয় সৃষ্টি করতে নিষেধ করতে এবং যে তা করতো তার নিন্দা করতে, এখন কেন তুমি খেজুর গাছ কাটছো এবং জ্বালিয়ে দিচ্ছো? ৬৬৫
এ প্রেক্ষিতে আল্লাহ তাআলা বলেন : ৬৬৬
مَا قَطَعْتُمْ مِنْ لِينَةٍ أَوْ تَرَكْتُمُوهَا قَائِمَةٌ عَلَى أُصُولِهَا فَبِإِذْنِ اللَّهِ وَلِيُخْزِيَ الْفَاسِقِينَ
তোমরা যেসব নতুন খেজুর গাছ কেটে ফেলছ অথবা সেগুলোকে তাদের মূলের ওপর দাঁড়িয়ে থাকতে দিয়েছ। তা তো ছিল আল্লাহর অনুমতিক্রমে এবং যাতে তিনি ফাসেকদের লাঞ্ছিত করতে পারেন। ৬৬৭
শায়েখ আবু যুহরা এ আয়াত নিয়ে বিশদ আলোচনা করেন। তিনি এ ব্যাপারে ফকীহগণের দৃষ্টিভঙ্গি বিশ্লেষণ করে বলেন, যুদ্ধক্ষেত্রে ধ্বংসাত্মক কার্যক্রমের ব্যাপারে শরীয়তের বিভিন্ন উৎস ও যুদ্ধক্ষেত্রে নবীজির নীতিমালা থেকে আমরা যেসব সিদ্ধান্ত পাই তা হলো :
১. যুদ্ধ চলাকালে শত্রুপক্ষের গাছপালা কাটা যাবে না। তাদের বাড়ি-ঘর ভেঙে ফেলা যাবে না। জনগণকে দুর্ভোগে ঠেলে দেয়া যাবে না। এটাই ইসলামের মূলনীতি। জিহাদের মৌলিক লক্ষ্য হচ্ছে, জিহাদের মাধ্যমে জনগণকে অত্যাচারী শাসকদের অত্যাচার থেকে মুক্তি দিয়ে ইসলামের সুবিচারের অধীনে নিয়ে আসা। কুরআন-হাদীস দ্বারা এটা প্রমাণিত।
২. তবে কথা হচ্ছে, গাছপালা কাটা ও বাড়ি-ঘর ভেঙে ফেলা ছাড়া যদি কোনো উপায় না থাকে, সে ক্ষেত্রে তা অবশ্যই করা উচিত। যেমন শত্রুবাহিনী যদি কোনো বাগানের পেছনে আশ্রয় নেয় বা তার মাধ্যমে ইসলামী-বাহিনীর ক্ষতি করার চেষ্টা করে, তাহলে সে ক্ষেত্রে গাছপালা কাটলে ও বাড়ি-ঘর ভেঙে ফেললে কোনো সমস্যা নেই। কেননা, রণাঙ্গনে মাঝেমাঝে এরকম প্রয়োজনীয়তা দেখা দেয়। তাই আমরা দেখতে পাই, রসূলুল্লাহ সা. সাকিফ গোত্রের দুর্গ ধ্বংসের সময় এমনটি করেছিলেন।
৩. যেসব ফকিহ গাছপালা কাটা ও বাড়ি-ঘর ভেঙে ফেলার অনুমতি দিয়েছেন, তারাও এই মূলনীতির আলোকেই এর অনুমতি দিয়েছেন। জনদুর্ভোগ সৃষ্টির লক্ষ্যে নয়, বরং শত্রুদের বিরুদ্ধে কার্যকরী ভূমিকা রাখার স্বার্থেই এই অনুমতি। مسلمانوں বিরুদ্ধে অস্ত্র নিয়ে যারা যুদ্ধে লিপ্ত, তাদের শায়েস্তা করার জন্য এ ধরনের কর্মকাণ্ড বৈধ। ৬৬৮

টিকাঃ
৬৬৫ হাদীসুল কুরআনিল কারীম আন গাযাওয়াতির রসূল: ১/২৭৪।
৬৬৬ তাফসীরে তাবারী: ২৮/৩৪।
৬৬৭ সূরা হাশর: ৫।
৬৬ শায়খ আবু যুহরা প্রণীত খাতামুন নাবিয়্যীন: ২/২৬৫-২৬৯।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00