📄 দুনিয়াকে আখেরাতের ওপর প্রাধান্য দেওয়া
পবিত্র কুরআনের বিভিন্ন আয়াত ও বহু হাদীসে আল্লাহ তাআলার চোখে পৃথিবীর গুরুত্ব কতোটুকু তা তুলে ধরা হয়েছে। এই জগতকে মহব্বত করতে নিষেধ করা হয়েছে। আল্লাহ বলেন:
زُيِّنَ لِلنَّاسِ حُبُّ الشَّهَاتِ مِنَ النِّسَاءِ وَ الْبَنِينَ وَالْقَنَاطِيرِ الْمُقَنْطَرَةِ مِنَ الذَّهَبِ وَالْفِضَّةِ وَ الْخَيْلِ الْمُسَوَّمَةِ وَالْأَنْعَامِ وَالْحَرْثِ ذَلِكَ مَتَاعُ الحيوة الدُّنْيَا وَاللَّهُ عِنْدَه حُسْنُ الْمَابِ
মানুষের কাছে সুশোভিত করা হয়েছে নারী, সন্তান, স্তূপীকৃত স্বর্ণ ও রৌপ্যভান্ডার, চিহ্নযুক্ত অশ্বরাজি, গৃহপালিত পশু এবং শস্যক্ষেত্র, এসব পার্থিব জীবনের সম্পদ, আর আল্লাহর নিকট রয়েছে উত্তম আশ্রয়স্থল। ৫৮৬
রসূলুল্লাহ সা. তার উম্মতকে বারবার জাগতিক মোহ থেকে দূরে থাকার নির্দেশ দিয়েছেন। এ সংক্রান্ত কয়েকটি হাদীস : আবু সাঈদ খুদরী রা. বলেন, রসূলুল্লাহ সা. বলেছেন, পৃথিবী অত্যন্ত সুমিষ্ট এবং শস্যশ্যামল। আল্লাহ তাআলা তোমাদের পৃথিবীতে তার প্রতিনিধি হিসেবে পাঠিয়েছেন। তোমরা কেমন কাজ করো, তা তিনি দেখতে চান। তাই তোমরা দুনিয়া এবং নারীদের ব্যাপারে আল্লাহকে ভয় করো। কেননা, বনী ইসরাইলের প্রথম ফেতনা সংঘটিত হয়েছিল নারীদের কারণেই। ৫৮৭
যে কোনো সীরাত পাঠক গাযওয়ায়ে উহুদের ঘটনাপ্রবাহে দুনিয়ার প্রতি মোহের ভয়াবহ ফল দেখতে পাবে।
আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস রা. বলেন, গাযওয়ায়ে উহুদের দিন শত্রুসেনারা রসূলুল্লাহ সা.-এর কাছে পরাজিত হলে তীরন্দাজরা পরস্পর বলাবলি করছিলেন, চলো রসূল সা. এবং অন্যান্য মুজাহিদদের সাথে মিলিত হই। তারা যেন আমাদের আগে গণিমতের সম্পদ সংগ্রহ করতে না পারেন এবং আমাদের ভাগে যেন তাদের চেয়ে কম সম্পদ না পড়ে। তীরন্দাজদের কয়েকজন মতামত দিচ্ছিলেন যে, রসূলুল্লাহ সা. সরাসরি অনুমতি না দেওয়া পর্যন্ত আমরা এখানেই দৃঢ়ভাবে অবস্থান করবো। ৫৮৮
এ প্রেক্ষিতে আল্লাহ তাআলা বলেন :
مِنْكُمْ مَّنْ يُرِيدُ الدُّنْيَا وَ مِنْكُمْ مَّنْ يُرِيدُ الْآخِرَةَ
তোমাদের মধ্যে কেউ দুনিয়া চায় আর কেউ চায় আখেরাত। ৫৮৯
ইমাম তাবারী রহ. বলেন, আয়াতে 'দুনিয়া' অর্থ গণিমত। আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ রা. বলেন, এ আয়াত অবতীর্ণ হওয়ার পূর্বে আমরা কল্পনাও করতাম না যে রসূলুল্লাহ সা.-এর সাহাবাদের মধ্যে দুনিয়া-প্রত্যাশী কেউ আছেন। ৫৯০
গাযওয়ায়ে উহুদে সংঘটিত ঘটনাবলীর মাঝে মুসলিম দায়ীদের জন্য বহু শিক্ষা ও উপদেশ রয়েছে। ঈমানদারদের অন্তরে কীভাবে জাগতিক মোহ-মায়া স্থান করে নেয়, কীভাবে এক পর্যায়ে তারা দুনিয়াকে আখেরাতের ওপর প্রাধান্য দিতে শুরু করে, এ সব আমরা এখানে পাই। তীরন্দাজ সাহাবীরা জাগতিক মোহে রসূলুল্লাহ সা.-এর স্পষ্ট নির্দেশ অমান্য করেছিলেন। ভুল ব্যাখ্যার দ্বারা প্রবৃত্তির চাহিদাকে প্রাধান্য দিয়েছিলেন। ফলে যা হবার তাই হয়েছিল। ঈমানদারদের এ ব্যাপারে সতর্ক থাকতে হবে। ধীরে ধীরে এমন মোহ তাকে আচ্ছন্ন করে ফেলতে পারে। দীন ও শরীয়ত পালনে এসব কারণ যেন প্রতিবন্ধক হয়ে না দাঁড়ায়। প্রবৃত্তির চাহিদায় ভ্রান্তব্যাখ্যা ও জাগতিক ভোগবিলাসের প্রতি আকৃষ্ট হয়ে শরীয়তবিরোধী কাজ কিছুতেই করা যাবে না। ৫৯১
টিকাঃ
৫৮৬ সূরা আলে ইমরান: ১৪।
৫৮৭ সহীহ মুসলিম: ২৭৪২।
৫৮৮ তাফসীরে তাবারী: ৩/৪৭৪।
৫৮৯ সূরা আলে ইমরান: ১৫২।
৫৯০ তাফসীরে তাবারী: ৩/৪৭৪।
৫৯১ আল মুসতাফাদ মিন কাসাসিল কুরআন: ২/১৯৭।
📄 দ্বীনের সাথে দৃঢ় বন্ধন
ইবনে কাসীর রহ. বলেন, গাযওয়ায়ে উহুদের দিন যখন কিছু মুসলমান শহীদ হলো এবং কেউ কেউ যুদ্ধ ছেড়ে দিলো, তখন শয়তান উঁচুকণ্ঠে ঘোষণা করলো, মুহাম্মাদ নিহত হয়েছে। অন্যদিকে, ইবনে কুমাইয়া শত্রুসেনাদের কাছে এসে বলতে লাগলো, আমি মুহাম্মাদকে হত্যা করেছি। অথচ সে রসূলুল্লাহ সা.- এর মাথায় পাথর মেরে তাকে আহত করেছিল। অনেকেই রসূলুল্লাহ সা. শাহাদাতবরণের সংবাদ বিশ্বাস করলো। কুরআনে কারীমে আল্লাহর নবীদের ইন্তেকাল সংক্রান্ত বিভিন্ন বর্ণনার প্রেক্ষিতে রসূলুল্লাহ সা.-এর শাহাদাতবরণ অসম্ভব ছিল না। ফলে কিছু মুসলমান নিরাশ হয়ে যুদ্ধক্ষেত্র থেকে পিছু হটেন। কুরআনের ভাষায়:
وَ مَا مُحَمَّدُ إِلَّا رَسُولٌ قَدْ خَلَتْ مِنْ قَبْلِهِ الرُّسُلُ أَفَابِنُ مَاتَ أَوْ قُتِلَ انْقَلَبْتُمْ عَلَى أَعْقَابِكُمْ وَ مَنْ يَنْقَلِبْ عَلَى عَقِبَيْهِ فَلَنْ يَضُرَّ اللَّهَ شَيْئًا وَ سَيَجْزِي اللَّهُ الشَّكِرِينَ
মুহাম্মাদ হচ্ছে একজন রসূল মাত্র, তাঁর পূর্বে আরও অনেক রসূল গত হয়েছে; কাজেই যদি সে মারা যায় কিংবা নিহত হয়, তবে কি তোমরা উল্টাদিকে ঘুরে দাঁড়াবে? এবং যে ব্যক্তি উল্টাদিকে ফিরে দাঁড়ায় সে আল্লাহর কোনই ক্ষতি করতে পারবে না এবং আল্লাহ কৃতজ্ঞদেরকে অতিশীঘ্র বিনিময় প্রদান করবেন। ৫৯২
অর্থাৎ নবী হওয়া সত্ত্বেও শহীদ হওয়ার নজীর পূর্ববর্তী নবী রসূলগণের মধ্যে রয়েছে। ৫৯৩
এসব আয়াতের ব্যাখ্যায় বলা হয়েছে, পূর্ববর্তী নবীরা তাদের জাতির মধ্যে সব সময় জীবিত থাকেননি। প্রত্যেকেই মৃত্যুবরণ করেছিলেন। আর রসূলুল্লাহ সা.-এর দায়িত্ব ছিল আল্লাহর প্রেরিত বার্তাসমূহ অন্যদের কাছে পৌঁছে দেওয়া। রসূলুল্লাহ সা. তা পালন করেছিলেন। রিসালাতের দায়িত্ব পালন করার জন্য রসূলুল্লাহ সা.-কে সব সময় নিজের গোত্রের মধ্যেই অবস্থান করতে হবে, এটা জরুরি নয়। কেননা, কোনো সৃষ্টিজীবই পৃথিবীতে স্থায়ী বা অমর নয়। আল্লাহ তাআলা তার রসূলের শাহাদাত বা মৃত্যুর প্রপাগান্ডায় হতবিহ্বল হয়ে যাওয়া ব্যক্তিদের ভর্ৎসনা করে বলেন, 'যদি সে মারা যায় কিংবা নিহত হয়, তবে কি তোমরা উল্টাদিকে ঘুরে দাঁড়াবে?' তোমরা কি পূর্বের অবস্থায় ফিরে যাবে? জিহাদ ছেড়ে দেবে? 'যে ব্যক্তি উল্টাদিকে ঘুরে দাঁড়ায় সে আল্লাহর কোনো ক্ষতি করতে পারবে না এবং আল্লাহ কৃতজ্ঞদেরকে অতিশীঘ্র বিনিময় প্রদান করবেন।' অর্থাৎ, যারা পশ্চাদপসরণ করেনি এবং জীবিত ও মৃত উভয় অবস্থায় নবীজির পদাঙ্ক অনুসরণ করে চলেছেন, তারা উত্তম প্রতিদান লাভ করবে। ৫৯৪
গাযওয়ায়ে উহুদের মুসলমানরা দুর্দশায় পড়ার একটি কারণ ছিল, তারা নিজেদের বিশ্বাস ও আল্লাহ তাআলার বাণী সমুন্নত করার মেহনতের সাথে আল্লাহর রসূলের ব্যক্তিসত্তাকে জড়িয়ে ফেলেছিলেন। তাই তারা মহান স্রষ্টার একত্ববাদে বিশ্বাস এবং রসূলুল্লাহ সা.-এর চিরঞ্জীব না হওয়ার মধ্যকার পার্থক্য স্পষ্টভাবে অনুধাবন করতে পারেননি। উভয়টিকে তারা একই ভেবে নিয়েছিলেন। তারা ভেবেছিলেন রসূলুল্লাহ সা.-এর রেসালত যেমন কেয়ামত পর্যন্ত সময়কালের জন্য, ঠিক সেভাবে নবীজির ব্যক্তিসত্তাও চিরস্থায়ী। আর এটিই সাহাবায়ে কেরامকে দুশ্চিন্তায় ফেলে দিয়েছিল।
নবীজির দেখানো পন্থা ব্যতীত তার পূর্ণাঙ্গ অনুসরণ সম্ভব নয়। বিপদাপদে ধৈর্যধারণ, দীনের দাওয়াত দিতে গিয়ে সর্বোচ্চ প্রচেষ্টা, ধারাবাহিক কর্মপরিকল্পনা এবং সত্যধর্মের সাহায্য ছাড়া আল্লাহর রসূলের পূর্ণাঙ্গ অনুসরণ সম্ভব নয়। এটিই ইসলামের দাওয়াতের আলোকোজ্জ্বল দিক। এমনিভাবে রসূলুল্লাহ সা.-এর অস্তিত্বের সাথে দীনের স্থায়িত্ব ও জিহাদের বিধানের স্থায়িত্ব সম্পর্কযুক্ত নয়, এ বিষয়টিও সবার সামনে স্পষ্ট করা জরুরি।
ইবনুল কাইয়্যেম রহ. বলেন, গাযওয়ায়ে উহুদ ছিল নবীজির ইন্তেকালের পূর্বে তার ইন্তেকালের একটি ভূমিকা। এর মাধ্যমে আল্লাহ তাআলা সে পরিস্থিতিতেও ধর্মের ওপর অবিচল থাকার নির্দেশনা প্রদান করেছেন। রসূলুল্লাহ সা.-এর মৃত্যুতে বা শাহাদাতে ইসলামের বিধান থেকে পেছনে সরে আসাকে তিরস্কার করেছেন। আল্লাহ তাআলা মুমিনদের বুঝিয়েছেন, নবীরা মৃত্যু বা শাহাদাতের মুখোমুখি হলেও মুমিনদের আল্লাহ তাআলার একত্ববাদ ও দীনের ওপর অবিচল থাকতে হবে। কেননা, তারা ইবাদত করছেন মহান রাব্বুল আলামিনের। যিনি চিরঞ্জীব। নবীজির ইবাদত উদ্দেশ্য নয়। তিনি তো নশ্বর। যদি মুহাম্মাদ সা. মৃত্যুবরণ করেন বা শাহাদাতবরণ করেন কোনো মুসলমানের জন্য উচিত হবে না আল্লাহর রসূলের মৃত্যুতে ধর্ম ও একত্ববাদের পথ পরিত্যাগ করা। আল্লাহ ব্যতীত প্রতিটি সত্তাকেই মৃত্যুর স্বাদ গ্রহণ করতে হবে। কোনো মানুষ, প্রাণী, এমন কি রসূল সা.-ও চিরস্থায়ী হিসেবে পৃথিবীতে আসেননি। মুসলমানদের উচিত তারা যেন আমৃত্যু ইসলাম ও তাওহীদের ওপর অবিচল থাকে। রসূলুল্লাহ সা. যদি ইন্তেকাল করেন, তাতে যেন তারা পথচ্যুত না হন। এ জন্যই শয়তান যখন চিৎকার করে 'মুহাম্মাদ শহীদ হয়েছেন' বলে ঘোষণা দেয়, তখন বিভ্রান্ত হয়ে যেসব মুসলিম রণাঙ্গন ত্যাগ করেছিলেন আল্লাহ তাআলা তাদের ভর্ৎসনা করেছেন। আল্লাহ বলেছেন: 'মুহাম্মাদ হচ্ছে একজন রসূল, তাঁর পূর্বে আরও অনেক রসূল গত হয়েছে; কাজেই যদি সে মারা যায় কিংবা নিহত হয়, তবে কি তোমরা উল্টাদিকে ঘুরে দাঁড়াবে? যে ব্যক্তি উল্টাদিকে ঘুরে দাঁড়ায় সে আল্লাহর কোনই ক্ষতি করতে পারবে না এবং আল্লাহ কৃতজ্ঞদেরকে অতিশীঘ্র বিনিময় প্রদান করবেন।৫৯৬
ইমাম কুরতুবী রহ. বলেন, যারা উহুদ যুদ্ধে রণাঙ্গন থেকে পেছনে সরে গিয়েছিল, তাদের ব্যাপারে এটাই হচ্ছে কুরআনের সর্বশেষ আয়াত। এখানে বলা হয়েছে, যদি সত্যিকারভাবে মুহাম্মাদ শহীদ হতেন, তবুও তাদের হতবিহ্বল হয়ে যাওয়া উচিত হতো না। নবুওয়াতপ্রাপ্তির কারণে কেউ অমর হয়ে যায় না। নবীর ইন্তেকাল হলে তার দীন শেষ হয়ে যায় না।৫৯৭
ইমাম কুরতুবী রহ. বেশ চমৎকারভাবে তুলে ধরেছেন যে, যারা ভেবেছিল রসূলুল্লাহ সা.-এর ওফাতের মাধ্যমেই ইসলাম ধ্বংসপ্রাপ্ত হবে অথবা ইসলামের বিজয় ও উত্তরোত্তর সাফল্য নবীজির ব্যক্তিসত্তার সাথে সম্পর্কিত; উভয় দলের দৃষ্টিভঙ্গিই ভ্রান্ত ছিল। তারা দীনের হাকীকত বুঝতে পারেনি। কেননা, ইসলাম ধর্মের বিজয় ও স্থায়িত্ব আল্লাহ তাআলার পক্ষ থেকে নির্ধারিত। এটা কেউ পরিবর্তন করতে পারবে না। আল্লাহ তাআলা বলেন :
هُوَ الَّذِي أَرْسَلَ رَسُوْلَهُ بِالْهُدَى وَدِيْنِ الْحَقَّ لِيُظْهِرَهُ عَلَى الدِّيْنِ كُلِّهِ وَ لَوْ كَرِهَ الْمُشْرِكُونَ
তিনিই তাঁর রসূলকে হেদায়াত ও সত্য দীন সহ প্রেরণ করেছেন, যাতে তিনি একে সকল দীনের উপর বিজয়ী করেন, যদিও মুশরিকরা অপছন্দ করে।৫৯৮
গাযওয়ায়ে উহুদের সময় সংঘটিত ঘটনাকে কেন্দ্র করে আল্লাহর পক্ষ থেকে ভর্ৎসনার যেসব আয়াত অবতীর্ণ হয়েছে, সেগুলোর সবই বাস্তব রূপ লাভ করেছিল রসূলুল্লাহ সা.-এর ইন্তেকালের সময়। যখন রসূলুল্লাহ সা. ইনতেকাল করেন, আবু বকর রা. ঘোড়ায় আরোহণ করে তার সুনহে অবস্থিত বাড়ি থেকে আসেন। ঘোড়া থেকে নেমে তিনি মসজিদে নববীতে প্রবেশ করেন। কারও সঙ্গে কোনো কথা না বলে আয়েশা রা.-এর কাছে উপস্থিত হন। তখন রসূলুল্লাহ সা. ইয়েমেনী চাদর দ্বারা আবৃত ছিলেন। তিনি তার চেহারা থেকে কাপড় সরিয়ে তার ওপর ঝুঁকে চুমু দিয়ে কেঁদে ফেলেন।
তারপর বলেন, আমার মাতা-পিতা আপনার জন্য কুরবান হোন! আল্লাহর কসম! আল্লাহ তো আপনাকে দুবার মৃত্যু দেবেন না। যে মৃত্যু আপনার জন্য নির্ধারিত ছিল সে মৃত্যুর স্বাদ আপনি পেয়েছেন। ৫৯৯
আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস রা. বলেন, আবু বকর রা. যখন বের হয়ে আসেন তখন ওমর রা. লোকজনের সঙ্গে কথা বলছিলেন। আবু বকর রা. তাকে বললেন, হে উমর, বসে পড়। ওমর রা. বসতে অস্বীকার করলেন। তখন সাহাবীগণ ওমর রা.-কে ছেড়ে আবু বকর রা.-এর দিকে গেলেন। আবু বকর রা. বললেন, অতঃপর আপনাদের মধ্যে যাঁরা মুহাম্মাদ সা.-এর ইবাদত করতেন, তিনি তো ইনতেকাল করেছেন। আর যাঁরা আপনাদের মধ্যে আল্লাহর ইবাদত করতেন (জেনে রাখুন) আল্লাহ চিরঞ্জীব, কখনও মরবেন না। আল্লাহ বলেন, 'মুহাম্মাদ হচ্ছে একজন রসূল মাত্র, তাঁর পূর্বে আরও অনেক রসূল গত হয়েছে; কাজেই যদি সে মারা যায় কিংবা নিহত হয়, তবে কি তোমরা উল্টাদিকে ঘুরে দাঁড়াবে? এবং যে ব্যক্তি উল্টাদিকে ঘুরে দাঁড়ায় সে আল্লাহর কোনো ক্ষতি করতে পারবে না এবং আল্লাহ কৃতজ্ঞদেরকে অতিশীঘ্র বিনিময় প্রদান করবেন।' ৬০০
ইবনে আব্বাস রা. বলেন, আল্লাহর কসম! আবু বকর রা. এই আয়াত পাঠ করার পূর্বে লোকেরা যেন জানতো না যে, আল্লাহ তাআলা এরকম কোনো আয়াত অবতীর্ণ করেছেন। এরপর সমস্ত সাহাবী তার থেকে ওই আয়াত শিখে নিলেন। তখন সবাইকে উক্ত আয়াত তিলাওয়াত করতে শুনলাম। সাঈদ ইবনে মুসাইয়্যাব রহ. বলেন, ওমর রা. বলেছেন, আল্লাহর কসম! আমি যখন আবু বকর রা.-কে উক্ত আয়াত তিলাওয়াত করতে শুনলাম, তখন ভীত হয়ে পড়লাম। আমার পা দু'টি যেন আমার ভার নিতে পারছিল না, আমি মাটিতে পড়ে গেলাম। যখন তাকে আয়াতটি তেলাওয়াত করতে শুনলাম, তখন বুঝতে পারলাম নবী সা. ইনতেকাল করেছেন। ৬০১
টিকাঃ
৫৯২ সূরা আলে ইমরান: ১৪৪।
৫৯৩ তাফসীরুল কুরআনিল আজিশ: ১/৪৪১।
৫৯৪ আল মুসতাফাদ মিন কাসাসিল কুরআন: ২/১৯৭।
সাদিক উরজুন প্রণীত মুহাম্মাদুর রসূলুল্লাহ: ৩/৬১৬।
৫৯৬ সূরা আলে ইমরান: ১৪৪।
৫৯৭ তাফসীরে কুরতুবী: ৪/২২২।
৫৯৮ সূরা তাওবা: ৩৩।
৫৯৯ সহীহ বুখারী: ৪৪৫৪।
৬০০ সূরা আলে ইমরান: ১৪৪।
৬০ 1 সহীহ বুখারী: ৪৪৫৪।
📄 তীরন্দাজ ও মুনাফেকদের ব্যাপারে রসূলের দৃষ্টিভঙ্গি
ক. তীরন্দজা বাহিনী
গাযওয়ায়ে উহুদে যেসব তীরন্দাজরা ভুল করেছিলেন রসূলুল্লাহ সা. তাদেরকে সেনাবাহিনী থেকে বের করে দেননি। রসূলুল্লাহ সা. তাদের এ কথা বলেননি যে, যুদ্ধক্ষেত্রে অভিজ্ঞতা ও ত্রুটির কারণে তোমরা আমাদের সাথে থাকার উপযুক্ত নও, বরং তাদের ত্রুটি সত্ত্বেও রসূল সা. তাদেরকে নিজের সাথেই রেখেছিলেন। শেষ পর্যন্ত আল্লাহ তাআলার অফুরন্ত ভালোবাসা ও দোআর বহিঃপ্রকাশ ঘটিয়ে এ যুদ্ধে অংশগ্রহণকারী সবাইকে সাধারণভাবে ক্ষমা করে দেওয়া হয়। অথচ তাদের ভুলের কারণে সব মুসলমান দুর্দশায় পড়েছিলেন। এ ব্যাপারে আল্লাহ তাআলা বলেন:
وَ لَقَدْ صَدَقَكُمُ اللهُ وَعْدَه إِذْ تَحُسُّوْنَهُمْ بِإِذْنِهِ حَتَّى إِذَا فَشِلْتُمْ وَ تَنَازَعْتُمْ فِي الْأَمْرِ وَ عَصَيْتُمْ مِّنْ بَعْدِ مَا أَرْىكُمْ مَّا تُحِبُّوْنَ مِنْكُمْ مَّنْ يُرِيدُ الدُّنْيَا وَ مِنْكُمْ مَّنْ يُرِيدُ الْآخِرَةَ ثُمَّ صَرَفَكُمْ عَنْهُمْ لِيَبْتَلِيَكُمْ وَلَقَدْ عَفَا عَنْكُمْ وَاللَّهُ ذُو فَضْلٍ عَلَى الْمُؤْمِنِينَ
আর আল্লাহ তোমাদের কাছে তার ওয়াদা সত্যে পরিণত করেন, যখন তোমরা তাদেরকে হত্যা করছিলে তার নির্দেশে। অবশেষে যখন তোমরা দুর্বল হয়ে গেলে এবং নির্দেশ সম্পর্কে বিবাদ করলে আর তোমরা অবাধ্য হলে তোমরা যা ভালোবাসতে তা তোমাদেরকে দেখানোর পর। তোমাদের মধ্যে কেউ দুনিয়া চায় আর কেউ চায় আখেরাত। তারপর আল্লাহ তোমাদেরকে তাদের থেকে ফিরিয়ে দিলেন যাতে তিনি তোমাদেরকে পরীক্ষা করেন। আর অবশ্যই আল্লাহ তোমাদেরকে ক্ষমা করে দিয়েছেন এবং আল্লাহ মুমিনদের উপর অনুগ্রহশীল। ৬০২
আল্লাহর ক্ষমা ছাড়াও আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে সাহাবায়ে কেরামের মনে ভয় কাজ করছিল। সেটি ছিল, তাদের ভ্রান্তির বিষয়ে রসূলুল্লাহ সা.-এর মনোভাব। তাই আল্লাহ তাআলার পক্ষ থেকে ক্ষমা ঘোষণার পাশাপাশি নবীজির পক্ষ থেকেও ক্ষমা ঘোষণা করা হয়। আল্লাহ তাআলা এটাও বলেছেন, এসব ত্রুটির কারণে তাদের পরামর্শ ও মতামত যেন উপেক্ষা করা না হয়। বরং তাদের মতামত ও পরামর্শের প্রতি যেন সম্মান দেখানো হয়। ৬০০
আল্লাহ বলেন:
فَبِمَا رَحْمَةٍ مِّنَ اللَّهِ لِنْتَ لَهُمْ وَ لَوْ كُنْتَ فَظًّا غَلِيظَ الْقَلْبِ لَا نُفَضُّوا مِنْ حَوْلِكَ فَاعْفُ عَنْهُمْ وَ اسْتَغْفِرْ لَهُمْ وَ شَاوِرْهُمْ فِي الْأَمْرِ فَإِذَا عَزَمْتَ فَتَوَكَّلْ عَلَى اللَّهِ إِنَّ اللَّهَ يُحِبُّ الْمُتَوَكَّلِينَ
অতঃপর আল্লাহর পক্ষ থেকে রহমতের কারণে তুমি তাদের জন্য নম্র হয়েছিলে। আর যদি তুমি কঠোর স্বভাবের, কঠিন হৃদয়সম্পন্ন হতে, তবে তারা তোমার আশপাশ থেকে সরে পড়ত। সুতরাং তাদেরকে ক্ষমা কর এবং তাদের জন্য ক্ষমা প্রার্থনা কর। আর কাজে-কর্মে তাদের সাথে পরামর্শ কর। অতঃপর যখন সংকল্প করবে তখন আল্লাহর উপর তাওয়াক্কুল করবে। নিশ্চয় আল্লাহ তাওয়াক্কুলকারীদেরকে ভালোবাসেন। ৬০৪
টিকাঃ
৬০২ সূরা আলে ইমরান: ১৫২।
৬০০ গাযওয়ায়ে উহুদ দিরাসাতুন দাবিয়াহ: ২১৬।
৬০৪ সূরা আলে ইমরান: ১৫৯।
📄 মুনাফেক ইবনে উবাইয়ের সঙ্গত্যাগ
মুনাফেক নেতা আবদুল্লাহ ইবনে উবাই তিন শত মুনাফেক নিয়ে আলাদা হয়ে যায়। সে মুসলিম বাহিনীর মধ্যে বিশৃঙ্খলা ও দুর্বলতা সৃষ্টির অপচেষ্টা চালায়। ইসলামকে দুর্বল করে দিতে কঠিন পরিস্থিতিতে مسلمانوں সঙ্গে তার প্রতারণা ছিল অত্যন্ত ঘৃণ্য। আবদুল্লাহ ইবনে হারাম রা. তাদেরকে বিরত রাখতে চেষ্টা করেছিলেন। কিন্তু মুনাফেকরা তার ডাকে সাড়া দেয়নি। ৬০৫
তাদের ব্যাপারে আল্লাহ তাআলা বলেন:
وَ مَا أَصَابَكُمْ يَوْمَ الْتَقَى الْجَمْعُنِ فَبِإِذْنِ اللَّهِ وَ لِيَعْلَمَ الْمُؤْمِنِينَ وَ لِيَعْلَمَ الَّذِينَ نَافَقُوْا وَقِيلَ لَهُمْ تَعَالَوْا قَاتِلُوا فِي سَبِيلِ اللَّهِ أَوِ ادْفَعُوْا قَالُوا لَوْ نَعْلَمُ قِتَالًا لَّا تَبَعْنَكُمْ هُمْ لِلْكُفْرِ يَوْمَئِذٍ أَقْرَبُ مِنْهُمْ لِلْإِيْمَانِ يَقُوْلُوْنَ بِأَفْوَاهِهِمْ مَّا لَيْسَ فِي قُلُوْبِهِمْ وَاللَّهُ أَعْلَمُ بِمَا يَكْتُمُوْنَ
আর তোমাদের উপর যে বিপদ এসেছিল দুই দল মুখোমুখি হওয়ার দিন তা আল্লাহর অনুমতিক্রমে এবং যাতে তিনি মুমিনদেরকে জেনে নেন। আর যাতে তিনি জেনে নেন মুনাফেকদেরকে। আর তাদেরকে বলা হয়েছিল, 'এসো, আল্লাহর পথে লড়াই কর অথবা প্রতিরোধ কর'। তারা বলেছিল, 'যদি আমরা লড়াই হবে জানতাম তবে অবশ্যই তোমাদেরকে অনুসরণ করতাম'। সেদিন তারা কুফরীর বেশি কাছাকাছি ছিল তাদের ঈমানের তুলনায়। তারা তাদের মুখে বলে, যা তাদের অন্তরসমূহে নেই। আর তারা যা গোপন করে সে সম্পর্কে আল্লাহ অধিক অবগত। ৬০৬
মুসলমানদের সৈন্যসংখ্যা কাফেরদের তুলনায় খুবই কম থাকায় তাদের আরও সৈন্যের প্রয়োজন ছিল। তারপরও রসূলুল্লাহ সা. মুনাফেকদের চলে যাওয়ার সুযোগ দিয়েছেন। শুধু মানুষদের সামনে তাদের অপদস্থ হওয়াকেই তিনি যথেষ্ট মনে করেছিলেন। ৬০৭
রসূলুল্লাহ সা. তাদের চলে যাওয়াকে গুরুত্ব দেননি, এটাই ইবনে উবাইয়ের জন্য অত্যন্ত লজ্জাজনক হয়ে দাঁড়িয়েছিল। বিষয়টি ফুটে ওঠে নিম্নের ঘটনায় :
মদীনায় আবদুল্লাহ ইবন উবাই ইবনে সুলুল প্রত্যেক জুমআর দিন তখন রসূলুল্লাহ সা. যখনই জনগণের সামনে ভাষণ দিতে শুরু করতেন, তখন সে নিজেকে বিশেষ মর্যাদার অধিকারী জাহির করার জন্য উঠে দাঁড়িয়ে বলতো, 'হে জনমণ্ডলী, এই যে আল্লাহর রসূল তোমাদের সামনে উপস্থিত। তার দ্বারা আল্লাহ তোমাদের শক্তি ও সম্মান বৃদ্ধি করেছেন। সুতরাং তোমরাও তাঁকে সাহায্য ও সহযোগিতা করো, তার কথা শোনো এবং মেনে চলো।' এই বলেই সে বসে পড়তো।
উহুদ যুদ্ধের আগে এতে কেউ আপত্তি করতো না। কিন্তু উহুদ যুদ্ধে সে জঘন্য বিশ্বাসঘাতকের ভূমিকায় অবতীর্ণ হয় এবং বহু সংখ্যক লোককে যুদ্ধের পথ থেকে ফিরিয়ে নিয়ে আসে। এরপরও সে একদিন রসূলুল্লাহ সা.-এর ভাষণ দেয়ার সময় জুমআর দিন আগের মতই উঠে দাঁড়ালো। মুসলমানগণ তৎক্ষণাৎ চারদিক থেকে তার কাপড় টেনে ধরে বললেন, আল্লাহর দুশমন, বস্। তুই যা করেছিস এরপরে তোর মুখে আর ওসব কথা শোভা পায় না।
তখন সে সমবেত মুসল্লীদের ঘাড়ের ওপর দিয়ে দ্রুত বেরিয়ে যেতে যেতে বললো, রসূলুল্লাহ সা.-এর সমর্থন করার জন্য যে কথাটি বলছিলাম তা যেন খারাপ কথা হয়ে গেলো। মসজিদের দরজায় জনৈক আনসারী সাহাবীর সাথে তার দেখা হলো। তিনি বললেন, তোমার কী হলো? সে বললো, রসূলুল্লাহ সা.-কে সমর্থন করার চেষ্টা করছিলাম। তাতে তার সহচরগণ আমার ওপর চড়াও হয়ে আমাকে টেনে বসিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করলো এবং তিরস্কার করতে লাগলো। আনসারী সাহাবী বললেন, তোমার জন্য আফসোস! তুমি মসজিদে ফিরে যাও। রসূলুল্লাহ সা. তোমার জন্য আল্লাহর কাছে ক্ষমা চাইবেন। সে বললো, আমি চাই না তিনি আমার জন্য ক্ষমা চান। ৬০৮
টিকাঃ
৬০৫ গাযওয়ায়ে উহুদ দিরাসাতুন দাবিয়াহ: ২১৯।
৬০৬ সূরা আলে ইমরান : ১৬৬-১৬৭।
৬০৭ গাযওয়ায়ে উহুদ দিরাসাতুন দাবিয়াহ : ২২০।
৬০৮ আল বিদায়া ওয়ান নিহায়া: ৪/৫৩।