📄 উহুদে অনাকাঙ্ক্ষিত পরিস্থিতির কারণ
আল্লাহ তাআলা বলেন :
إِنْ يَمْسَسْكُمْ قَرْحٌ فَقَدْ مَسَّ الْقَوْمَ قَرْحٌ مَّثْلُهُ وَ تِلْكَ الْأَيَّامُ نُدَاوِلُهَا بَيْنَ النَّاسِ وَلِيَعْلَمَ اللهُ الَّذِينَ آمَنُوا وَيَتَّخِذَ مِنْكُمْ شُهَدَاءَ وَاللَّهُ لَا يُحِبُّ الظَّلِمِينَ وَلِيُمَحِّصَ اللهُ الَّذِينَ آمَنُوا وَ يَمْحَقَ الْكَفِرِينَ أَمْ حَسِبْتُمْ أَنْ تَدْخُلُوا الْجَنَّةَ وَ لَمَّا يَعْلَمِ اللَّهُ الَّذِينَ جُهَدُوا مِنْكُمْ وَيَعْلَمَ الصَّبِرِينَ وَلَقَدْ كُنْتُمْ تَمَنَّوْنَ الْمَوْتَ مِنْ قَبْلِ أَنْ تَلْقَوْهُ فَقَدْ رَأَيْتُمُوهُ وَأَنْتُمْ تَنْظُرُوْنَ
যদি তোমাদেরকে কোনো আঘাত স্পর্শ করে থাকে তবে তার অনুরূপ আঘাত উক্ত কওমকেও স্পর্শ করেছে। আর এইসব দিন আমি মানুষের মধ্যে পালাক্রমে আবর্তন করি এবং যাতে আল্লাহ ঈমানদারদেরকে জেনে নেন এবং তোমাদের মধ্য থেকে শহীদদেরকে গ্রহণ করেন। আর আল্লাহ জালিমদেরকে ভালোবাসেন না। আর যাতে আল্লাহ পরিশুদ্ধ করেন ঈমানদারদেরকে এবং ধ্বংস করে দেন কাফেরদেরকে। তোমরা কি মনে কর যে, তোমরা জান্নাতে প্রবেশ করবে? অথচ আল্লাহ এখনো জানেননি তাদেরকে যারা তোমাদের মধ্য থেকে জিহাদ করেছে এবং জানেননি ধৈর্যশীলদেরকে। মৃত্যুর সম্মুখীন হওয়ার আগে তোমরা মৃত্যু কামনা করতে, এখন তো তোমরা তা স্বচক্ষে দেখলে। ৫৭২
এ আয়াতগুলোতে আল্লাহ তাআলা বলেছেন, উহুদে বিপর্যস্ত হওয়ার কারণে মুসলমানরা যেন যুদ্ধবিমুখ না হয়, কেননা, মুসলমানরা যেমন ক্ষয়ক্ষতির শিকার হয়েছে শত্রুপক্ষও তো ইতোপূর্বে এরকম ক্ষয় ক্ষতির শিকার হয়েছিল, তারপরও যদি তারা নিজেদের পথভ্রষ্টতার পরিণام জেনেও যুদ্ধ করে, সত্যপথের ওপর অবিচল থাকার ফলাফল জানার পর তোমরা কেন যুদ্ধ থেকে বিরত থাকবে? আল্লামা যামাখশারী রহ. এই আয়াতের ব্যাখ্যায় বলেন, যদি গাযওয়ায়ে উহুদে তারা তোমাদের ক্ষতি করে থাকে, তোমরাও তাদেরকে বদরযুদ্ধে ক্ষতিগ্রস্থ করেছো। তারা যদি ক্ষতিগ্রস্থ হওয়ার পরও বিরত না থাকে, তাহলে তোমরা কেনো দুর্বলতা দেখাবে? তোমাদের দুর্বলতা প্রদর্শন না করাই উত্তম। ৫৭২
আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস রা. বলেন, গাযওয়ায়ে উহুদ ছিল প্রকৃতপক্ষে বদরের বদলা। উহুদের দিন মুমিনদের মধ্যে যাঁরা শাহাদাতবরণ করেছিলেন আল্লাহ তাআলা তাদের শাহাদাতের জন্য নির্বাচিত করেছিলেন। গাযওয়ায়ে বদরের দিন রসূলুল্লাহ সা. মুশরিকদের ওপর বিজয়ী হয়েছিলেন। ৫৭৩
গাযওয়ায়ে উহুদে ঈমানদার ব্যক্তিদের ওপর অপতিত বিপর্যয়ের চারটি হেকমত বর্ণনা করেছেন আল্লাহ। এক. মুমিনদের এটা জানিয়ে দেওয়া যে, আল্লাহ তাআলা যে বিষয়ে জ্ঞাত ছিলেন, তারই বাস্তবায়ন হয়েছে। দুই. মুমিনদের একাংশকে শাহাদাত দান করা, যার মাধ্যমে তারা উচ্চ মর্যাদায় অভিষিক্ত হয়েছিলেন। তিন. মুমিনদের ক্ষমা ও মুনাফেকদের থেকে পৃথকীকরণ। চার. কাফেরদের নিশ্চিহ্ন করা এবং পর্যায়ক্রমে তাদের ধ্বংস করা। ৫৭৪
টিকাঃ
৫৭১ সূরা আলে ইমরান : ১৪০-১৪২।
৫৭২ তাফসীরে কাশশাফ : ১/৪৬৫।
৫৭৩ তাফসীরে রাযী: ৪/১০৫।
৫৭৪ হাদীসুল কুরআনিল কারীম আন গাযাওয়াতির রসূল: ১/১৯৯।
📄 ভুল সংশোধনের ধারণা
গাযওয়ায়ে উহুদে মুসলমানরা যেসব পরিস্থিতির মুখোমুখি হয়েছিলেন, কুরআনে কারীমে বদর যুদ্ধের বিপরীতে তার বর্ণনা দিতে গিয়ে আল্লাহ তাআলা অত্যন্ত কোমল ভাষা ব্যবহার করেছেন। বদরের যুদ্ধবন্দীদের ব্যাপারে রসূল সা.-এর সিদ্ধান্তের সমালোচনায় কুরআনে তুলনামূলক কঠিন ভাষা ব্যবহার করা হয়েছে। বদরযুদ্ধের যুদ্ধবন্দীদের কাছ থেকে মুক্তিপণ আদায়ের সিদ্ধান্তের ব্যাপারে আল্লাহ তাআলা বলেছেন:
مَا كَانَ لِنَبِيٌّ أَنْ يَكُوْنَ لَه أَسْرَى حَتَّى يُثْخِنَ فِي الْأَرْضِ تُرِيدُوْنَ عَرَضَ الدُّنْيَا وَ اللهُ يُرِيدُ الْآخِرَةَ وَ اللهُ عَزِيزٌ حَكِيمٌ لَوْلَا كِتَبٌ مِّنَ اللَّهِ سَبَقَ لَمَسَّكُمْ فِيْمَا أَخَذْتُمْ عَذَابٌ عَظِيمٌ
কোনো নবীর জন্য সঙ্গত নয় যে, তার নিকট যুদ্ধবন্দী থাকবে (এবং পণের বিনিময়ে তিনি তাদেরকে মুক্ত করবেন) যতক্ষণ না তিনি যমীনে (তাদের) রক্ত প্রবাহিত করেন। তোমরা দুনিয়ার সম্পদ কামনা করছো, অথচ আল্লাহ চাচ্ছেন আখেরাত। আর আল্লাহ পরাক্রমশালী, প্রজ্ঞাবান। আল্লাহর লিখন অতিবাহিত না হয়ে থাকলে, অবশ্যই তোমরা যা গ্রহণ করেছো, সে বিষয়ে তোমাদেরকে মহা আযাব স্পর্শ করতো। ৫৭৫
গাযওয়ায়ে উহুদ সম্পর্কে বলা হয়েছে:
وَ لَقَدْ صَدَقَكُمُ اللهُ وَعْدَه إِذْ تَحُسُّوْنَهُمْ بِإِذْنِهِ حَتَّى إِذَا فَشِلْتُمْ وَ تَنَازَعْتُمْ فِي الْأَمْرِ وَ عَصَيْتُمْ مِّن بَعْدِ مَا أَرْىكُمْ مَّا تُحِبُّوْنَ مِنْكُمْ مَّنْ يُرِيدُ الدُّنْيَا وَ مِنْكُمْ مَّنْ يُرِيدُ الْآخِرَةَ ثُمَّ صَرَفَكُمْ عَنْهُمْ لِيَبْتَلِيَكُمْ وَ لَقَدْ عَفَا عَنْكُمْ وَاللَّهُ ذُو فَضْلٍ عَلَى الْمُؤْمِنِينَ
আর আল্লাহ তোমাদের কাছে তার ওয়াদা সত্যে পরিণত করেন, যখন তোমরা তাদেরকে হত্যা করছিলে তাঁর নির্দেশে। অবশেষে যখন তোমরা দুর্বল হয়ে গেলে এবং নির্দেশ সম্পর্কে বিবাদ করলে আর তোমরা অবাধ্য হলে তোমরা যা ভালোবাসতে তা তোমাদেরকে দেখানোর পর। তোমাদের মধ্যে কেউ দুনিয়া চায় আর কেউ চায় আখেরাত। তারপর আল্লাহ তোমাদেরকে তাদের থেকে ফিরিয়ে দিলেন যাতে তিনি তোমাদেরকে পরীক্ষা করেন। আর অবশ্যই আল্লাহ তোমাদেরকে ক্ষমা করে দিয়েছেন এবং আল্লাহ মুমিনদের উপর অনুগ্রহশীল। ৫৭৬
কুরআন এভাবেই ব্যবহারিকভাবে শিক্ষা দিয়েছে। শিক্ষা-দীক্ষা ও দাওয়াতি কাজে নিয়োজিত ও নেতৃত্বস্থানীয় ব্যক্তিদের জন্য এখানে অনেক উপদেশ রয়েছে। ৫৭৭
টিকাঃ
৫৭৫ সূরা আনফাল: ৬৭-৬৮।
৫৭৬ সূরা আলে ইমরান: ১৫২।
৫৭৭ সুয়ার ওয়া ইবার মিনাল জিহাদিন নববী ফিল মাদিনাহ: ১৩৭।
📄 আগের যুগের মুজাহিদদের উদাহরণ
আল্লাহ তাআলা বলেন:
وَ كَأَيِّنْ مِّنْ نَّبِيَّ قُتَلَ مَعَه رَبَّيُّوْنَ كَثِيرُ فَمَا وَ هَنُوا لِمَا أَصَابَهُمْ فِي سَبِيْلِ اللهِ وَ مَا ضَعُفُوا وَ مَا اسْتَكَانُوا وَ اللهُ يُحِبُّ الصَّبِرِينَ وَ مَا كَانَ قَوْلَهُمْ إِلَّا أَنْ قَالُوا رَبَّنَا اغْفِرْ لَنَا ذُنُوبَنَا وَ إِسْرَافَنَا فِي أَمْرِنَا وَ ثَبِّتْ أَقْدَامَنَا وَ انْصُرْنَا عَلَى الْقَوْمِ الْكَفِرِينَ فَاتْهُمُ اللهُ ثَوَابَ الدُّنْيَا وَ حُسْنَ ثَوَابِ الْآخِرَةِ وَاللَّهُ يُحِبُّ الْمُحْسِنِينَ
আর কত নবী ছিল, যার সাথে থেকে অনেক আল্লাহওয়ালা লড়াই করেছে। তবে আল্লাহর পথে তাদের উপর যা আপতিত হয়েছে তার জন্য তারা হতোদ্যম হয়নি। আর তারা দুর্বল হয়নি এবং তারা নত হয়নি। আর আল্লাহ ধৈর্যশীলদেরকে ভালোবাসেন। আর তাদের কথা শুধু এই ছিল যে, তারা বললো, 'হে আমাদের রব, আমাদের পাপ ও আমাদের কর্মে আমাদের সীমালঙ্ঘন ক্ষমা করুন এবং আমাদের পা দৃঢ় রাখুন, আর কাফের কওমের উপর আমাদেরকে সাহায্য করুন'। অতঃপর আল্লাহ তাদেরকে দিলেন দুনিয়ার প্রতিদান এবং আখেরাতের উত্তম সওয়াব। আর আল্লাহ সৎকর্মশীলদেরকে ভালোবাসেন। ৫৭৮
ইবনে কাসীর রহ. বলেন, গাযওয়ায়ে উহুদে যেসব সাহাবী পিছু হটেছেন, এ আয়াত এবং পূর্বোক্ত আয়াতসমূহে আল্লাহ তাদের ভর্ৎসনা করেছেন। ৫৭৯
আল্লাহ তাআলা তাদের সামনে পূর্ববর্তী উম্মতের মুজাহিদদের দৃষ্টান্ত উল্লেখ করে বলেছেন, তারা আল্লাহর রাস্তায় জিহাদের ক্ষেত্রে নিজেদের নবীদের পদাঙ্ক অনুসরণ করতেন। সে পথে চলতে গিয়ে তারা কখনও নিজেদের দুর্বলতা প্রকাশ করেননি। আহত হয়েও তারা যুদ্ধক্ষেত্র পরিত্যাগ করেননি এবং শত্রুপক্ষের কাছে আত্মসমর্পণ করেননি; বরং যুদ্ধক্ষেত্রে তারা দৃঢ় ও অবিচল ছিলেন। উল্লেখিত আয়াতে মূলত ওই মুমিনদের প্রতি ইঙ্গিত করা হয়েছে যাঁরা রসূলুল্লাহ সা.-এর শাহাদাতের মিথ্যা প্রপাগান্ডা শুনে মানসিক দুর্বলতার শিকার হয়েছিলেন এবং যুদ্ধে দুর্বলতা-অলসতা প্রদর্শন করেছিলেন। তাই আল্লাহ তাআলা পূর্ববর্তী যুগে দীনের জন্য আত্মোৎসর্গকারী ব্যক্তিদের বাণী উদ্ধৃত করেছেন যেন মুসলমানরা তা থেকে শিক্ষা অর্জন করেন এবং দৃঢ়তার সবক গ্রহণ করতে পারেন। ইরশাদ হয়েছে, 'হে আমাদের রব, আমাদের পাপ ও সীমালঙ্ঘন ক্ষমা করুন এবং আমাদের অবিচল রাখুন, আর কাফের কওমের উপর আমাদেরকে সাহায্য করুন।'
পূর্ববর্তী মুজাহিদরা দোয়ায় অপরাধ ও বাড়াবাড়ি নিজেদের দিকে সম্পৃক্ত করেছেন অথচ তারা আল্লাহর বাহিনী ছিলেন। নিজেদের দুর্বলতাগুলো তারা নিজেদের দিকেই সম্পৃক্ত করেছেন। এমনিভাবে তারা শত্রুদের বিরুদ্ধে যুদ্ধে দৃঢ়পদ থাকার দোআর আগে আল্লাহর দরবারে নিজেদের কৃত অপরাধের জন্য ক্ষমা চেয়েছেন, যেন পাপমুক্ত হয়ে বিনয়ের সাথে আল্লাহ তাআলার সাহায্য প্রার্থনা করা সম্ভব হয়। এ থেকে এই উম্মতের শিক্ষা হচ্ছে, ক্ষমাপ্রার্থনা এবং তাওবা করতে হবে বিনয়ের সাথে। এসব গুণ অর্জনের প্রতিদান হিসেবে শত্রুদের বিরুদ্ধে আল্লাহর পক্ষ থেকে সাহায্য আসার সংবাদ দিয়ে আল্লাহ তাআলা বিষয়টি আরও স্পষ্ট করেছেন। আল্লাহ তাআলা বলেন: 'অতঃপর আল্লাহ তাদেরকে দিলেন দুনিয়ার প্রতিদান এবং আখেরাতের উত্তম সওয়াব। আর আল্লাহ সৎকর্মশীলদেরকে ভালোবাসেন।৫৮০
মোটকথা, উপরোক্ত গুণের কারণে তারা ইহকাল ও পরকালে মুক্তি পেয়েছেন। এগুলো ইখলাসের প্রতিদান। এছাড়া মুজাহিদদের জন্য আল্লাহ তাআলার পক্ষ থেকে পেশ করা উত্তম দৃষ্টান্ত হওয়াও ছিল তাদের জন্য বড় প্রাপ্তি। ইহকালীন প্রাপ্তির বিবরণের পর পরকালীন প্রাপ্তির বিবরণের সময় তার চাইতেও উত্তম শব্দ ব্যবহার করেছেন। আল্লাহ তাআলা বুঝিয়েছেন যে, পরকালীন প্রাপ্তি তাদের জন্য ইহকালীন প্রাপ্তির চাইতেও উত্তম হবে। ৫৮১
টিকাঃ
৫৭৮ সূরা আলে ইমরান: ১৪৬-১৪৮।
৫৭৯ তাফসীরে ইবনে কাসীর: ১/৪১০।
৫৮০ সূরা আলে ইমরান: ১৪৮।
৫৮১ আল মুসতাফাদ মিন কাসাসিল কুরআন: ২/২০৪।
📄 নেতার আদেশের লংঘন যুদ্ধক্ষেত্রে পরাজয়ের কারণ
রণাঙ্গনে তীরন্দাজ বাহিনী রসূলুল্লাহ সা.-এর নির্দেশ অমান্য করা ও ভ্রান্তির শিকার হওয়ার কারণে যুদ্ধের ফল পাল্টে যায়। ফলে মুসলমানদের চরম দুর্দশায় পড়তে হয়। এ ঘটনার শিক্ষা হলো, রণাঙ্গনে নেতার আদেশ লঙ্ঘন পরাজয়ের কারণ হয়। এ ঘটনা থেকে একটি কাফেলার আমীরের আদেশ অমান্য করার ভয়াবহতা বোঝা যায়। মুনাফেক নেতা জিহাদের ময়দান থেকে সাথিদের নিয়ে পৃষ্ঠপ্রদর্শন করেছে। তাতে যুদ্ধে কোনো প্রভাব পড়েনি। কিন্তু রসূলুল্লাহ সা. যেসব তীরন্দাজকে রণাঙ্গনের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব দিয়েছিলেন, তারা আদেশ অমান্য করার কারণে মুসলমানরা ভয়ঙ্কর বিপদে পড়েছিলেন। তাদের এ ভ্রান্তির কারণে আল্লাহ তাআলা শত্রুদের আপতিত করেন مسلمانوں ওপর। ময়দানের পুরো দৃশ্য পালটে যায়। মুসলিম বাহিনী চরম বিপর্যয়ের মুখে পড়ে। ইসলামের চারাগাছটি সেদিনই উপড়ে যাওয়ার উপক্রম হয়।
গাযওয়ায়ে উহুদের আলোচনা থেকে বোঝা যায়া, যতক্ষণ পর্যন্ত তীরন্দাজরা রসূলুল্লাহ সা.-এর নির্দেশনা ও তাদের নেতা আবদুল্লাহ ইবনে যুবায়ের রা.-এর কথা যথাযথভাবে পালন করেছিলেন ততক্ষণ পর্যন্ত তারা বিজয়ী ছিলেন। কিন্তু যখন তারা রসূলুল্লাহ সা.-এর নির্দেশ অমান্য করেন, অন্যান্যদের সাথে মিলে যুদ্ধলব্ধ সম্পদ সংগ্রহ করতে নিজেদের নির্ধারিত স্থান থেকে সরে যান, ৫৮২
তখনই তারা পরাজয়ের মুখে পড়েন। এ ব্যাপারে আল্লাহ তাআলা বলেন:
إِذْ تُصْعِدُوْنَ وَ لَا تَلُونَ عَلَى أَحَدٍ وَ الرَّسُوْلُ يَدْعُوْكُمْ فِي أُخْرُىكُمْ فَأَثَابَكُمْ غَمَّا بِغَمَّ لَكَيْلَا تَحْزَنُوا عَلَى مَا فَاتَكُمْ وَ لَا مَا أَصَابَكُمْ وَ اللَّهُ خَبِيرٌ بِمَا تَعْمَلُوْنَ
স্মরণ কর, যখন তোমরা উপরে উঠছিলে এবং কারো দিকে ফিরে দেখছিলে না, আর রসূল তোমাদেরকে ডাকছিল তোমাদের পেছন থেকে। ফলে তিনি তোমাদেরকে দুশ্চিন্তার পর দুশ্চিন্তা দিয়েছিলেন, যাতে তোমাদের যা হারিয়ে গিয়েছে এবং তোমাদের উপর যা আপতিত হয়েছে তার জন্য দুঃখ না করো। আর তোমরা যা করো সে সম্পর্কে আল্লাহ সম্যক অবগত। ৫৮৩
শায়েখ মুহাম্মাদ ইবনে উসাইমীন বলেন, রসূলুল্লাহ সা.-এর আদেশ মাত্র কয়েকজন সাহাবী লঙ্ঘন করেছেন। কিন্তু এর করুণ ফল সবাইকে ভোগ করতে হয়। অথচ আল্লাহ তাআলার দীনকে বিজয়ী করার লক্ষ্যে যুদ্ধে লিপ্ত ছিলেন তারা। প্রথমে মুসলমানদের বিজয়ের আলামত স্পষ্টভাবে দেখা গিয়েছিল। তীরন্দাজ সাহাবীরা মুশরিকদের পরাজিত দেখতে পাচ্ছিলেন। কিন্তু তারা যখন সেই আদেশটি লঙ্ঘন করেন, তখন পেছন দিক থেকে তাদের ওপর শত্রুরা আক্রমণ চালায় এবং মুসলমানদের ওপর তখন মারাত্মক বিপর্যয় নেমে আসে। বিষয়টি আল্লাহ তাআলা উপস্থাপন করেছেন এভাবে:
وَ لَقَدْ صَدَقَكُمُ اللهُ وَعْدَه إِذْ تَحُسُّوْنَهُمْ بِإِذْنِهِ حَتَّى إِذَا فَشِلْتُمْ وَ تَنَازَعْتُمْ فِي الْأَمْرِ وَ عَصَيْتُمْ مِّنْ بَعْدِ مَا أَرْىكُمْ مَّا تُحِبُّوْنَ مِنْكُمْ مِّنْ يُرِيدُ الدُّنْيَا وَ مِنْكُمْ مَّنْ يُرِيدُ الْآخِرَةَ ثُمَّ صَرَفَكُمْ عَنْهُمْ لِيَبْتَلِيَكُمْ وَ لَقَدْ عَفَا عَنْكُمْ وَاللَّهُ ذُو فَضْلٍ عَلَى الْمُؤْمِنِينَ
আর আল্লাহ তার ওয়াদা সত্যে পরিণত করেন, যখন তোমরা তাদেরকে হত্যা করছিলে তার নির্দেশে। অবশেষে যখন তোমরা দুর্বল হয়ে গেলে এবং নির্দেশ সম্পর্কে বিবাদ করলে আর তোমরা অবাধ্য হলে তোমরা যা ভালোবাসতে তা তোমাদেরকে দেখানোর পর। তোমাদের মধ্যে কেউ দুনিয়া চায় আর কেউ চায় আখেরাত। তারপর আল্লাহ তোমাদেরকে তাদের থেকে ফিরিয়ে দিলেন যাতে তিনি তোমাদেরকে পরীক্ষা করেন। আর অবশ্যই আল্লাহ তোমাদেরকে ক্ষমা করে দিয়েছেন এবং আল্লাহ মুমিনদের উপর অনুগ্রহশীল। ৫৮৪
নিশ্চিত বিজয় পরাজয়ে রূপান্তরিত হয়েছিল এই একটি ভুলের কারণে। রসূলুল্লাহ সা.-এর উপস্থিতিতে তারা কেবল একটিমাত্র ভুলই করেছিলেন। চিন্তা করে দেখুন! আমরা তো অসংখ্য পাপে লিপ্ত, এর পরিণام কত করুণ হতে পারে? সুতরাং এটা নিশ্চিত যে, আমাদের পাপের কারণেই আল্লাহ তাআলা অত্যাচারীদের একদলকে আরেক দলের ওপর লেলিয়ে দেন। আমরা যতো বেশি পাপ করি, ততো বেশি দূরে সরে যায় আল্লাহর সাহায্য। ৫৮৫
টিকাঃ
৫৮২ গাযওয়ায়ে উহুদ দিরাসাতুন দা'বিয়্যাতুন: ২০৭-২০৯।
৫৮৩ সূরা আলে ইমরান: ১৫৩।
৫৮৪ সূরা আলে ইমরান: ১৫২।
৫৮৫ আত তাআতু ওয়াল মাসিয়াহ ও আছারুহুমা ফিল মুজতামা: ২১১।