📘 নবীজির যুদ্ধ জীবন পাঠ ও পর্যালোচনা > 📄 ইসলাম ও নারীকে রক্ষায় নারীদের ভূমিকা

📄 ইসলাম ও নারীকে রক্ষায় নারীদের ভূমিকা


গাযওয়ায়ে উহুদে নারীদের মধ্যে শুধু উম্মে উমারা নুসাইবাহ বিনতে কাব রা. প্রত্যক্ষ যুদ্ধে অংশ নিয়েছিলেন। জামরা ইবনে সাঈদ তার দাদীর যুদ্ধে অংশগ্রহণের কথা আলোচনা করতে গিয়ে বলেন, উম্মে উমারা পানি পান করাতে গাযওয়ায়ে উহুদে গিয়েছিলেন। আমি রসূলুল্লাহ সা.-কে এ কথা বলতে শুনেছি, নুসাইবা বিনতে কাআব আজকের যুদ্ধে অমুক অমুক পুরুষের চাইতে উত্তম বীরত্ব প্রদর্শন করেছে। রসূলুল্লাহ সা. তার বীরত্ব দেখে এ মন্তব্য করেছিলেন। তিনি কোমরে কাপড় বেঁধে শত্রুদের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়েছিলেন। সে যুদ্ধে তিনি তেরোটি আঘাত পেয়েছিলেন। তিনি ইনতেকাল করলে তার গোসল দানকারীদের মধ্যে আমিও ছিলাম। আমি গুনে দেখেছিলাম তার শরীরে তেরোটি আঘাত রয়েছে।
নুসাইবা রা. নিজেই বলেন, ইবনে কুমাইয়া যে ভাবে আমার ওপর তরবারি দিয়ে আক্রমণ করেছিল, সেই ভয়াবহ দৃশ্য এখনো আমার চোখে ভাসে। যে আঘাতটি ছিল আমার অন্যান্য আঘাতের তুলনায় গুরুতর এবং এর জন্য আমাকে প্রায় এক বছর চিকিৎসা করাতে হয়েছিল।
রসূলুল্লাহ সা. হামরাউল আসাদ অভিমুখে রওনা হওয়ার ঘোষণা করলে তিনিও প্রস্তুতি গ্রহণ করেছিলেন। কিন্তু অতিরিক্ত রক্ত প্রবাহিত হওয়ার কারণে তাদের সঙ্গে যেতে পারেননি। তিনি বলেন, অতঃপর আমি সারারাত আমার আহত অঙ্গের চিকিৎসা করতে থাকি। রসূলুল্লাহ সা. হামরাউল আসাদ থেকে ফিরে এলে ঘরে প্রবেশ করার পূর্বেই নুসাইবার ভাই আবদুল্লাহ ইবনে কাআবকে নুসাইবার ব্যাপারে খোঁজখবর নেওয়ার জন্য পাঠান। ৫৫৫
তিনি ফিরে নুসাইবা রা.-এর সুস্থতার খবর দেন। নবীজি এতে স্বস্তি পান। ৫৫৬
অধ্যাপক হোসাইন বাকেরী হযরত নুসাইবা রা.-এর যুদ্ধে অংশগ্রহণ সম্পর্কে আলোচনা করতে গিয়ে বলেন, পুরুষদের সাথে তার যুদ্ধে অংশগ্রহণ এক অনুপম ঘটনা। মূলত অবস্থার পরিপ্রেক্ষিতে তিনি যুদ্ধে শরিক হতে বাধ্য হয়েছিলেন। যখন মানুষ বিচ্ছিন্ন হয়ে ছড়িয়ে পড়ে, তখন রসূলুল্লাহ সা. শত্রুদের ঘেরাওয়ের মুখে পড়েন, এমন অবস্থায় পুরুষ ও নারী প্রত্যেকের জন্যই অস্ত্র হাতে নেওয়ার প্রয়োজনীয়তা দেখা দেয়। ৫৫৭
ড. আকরাম জিয়া ওমরী গাযওয়ায়ে উহুদে নারীদের অংশগ্রহণের ব্যাপারে বলেন, উক্ত বর্ণনার আলোকে প্রমানিত হয়, জরুরি অবস্থায় নারীদের কাছ থেকেও সাহায্য নেওয়া যেতে পারে। যেমন, আহতদের দেখাশোনা করা তাদের সেবা করা ইত্যাদি। কিন্তু এসব ক্ষেত্রে পর্দার প্রতি খেয়াল রাখতে হবে। তাদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে। যেন এ সংক্রান্ত কোনো ফেতনায় নিপতিত হতে না হয়। তদ্রূপ শত্রুদের আক্রমণের মুখেও তাদের পরিপূর্ণ নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে। এটা নিশ্চিত যে, সাধারণ অবস্থায় জিহাদ কেবল মুসলিম পুরুষদের ওপরই ফরয। কিন্তু যদি মুসলমান এলাকায় শত্রুবাহিনী ঢুকে পড়ে, তখন পুরুষ-নারী নির্বিশেষে সবার জন্য যুদ্ধে অংশগ্রহণ ফরজ। ৫৫৮
অধ্যাপক মুহাম্মাদ আহমদ বাশমীল বলেন, উহুদ যুদ্ধে ইসলামে প্রথমবারের মতো নারী-পুরুষ সবাই মুশরিকদের বিরুদ্ধে যুদ্ধে অংশগ্রহণ করেছে। অবশ্য এই কথাও স্বীকৃত যে, একজন নারী শুধু যুদ্ধে সরাসরি অংশগ্রহণ করেছিলেন আবার তাও রসূলুল্লাহ সা.-এর নিরাপত্তা রক্ষা করার জন্য। এটা স্পষ্ট যে, যেসব নারী যুদ্ধে অংশগ্রহণ করেছিলেন, তারা সরাসরি অস্ত্র হাতে লড়াই করার জন্য বের হননি এবং পুরুষদের মতো তারা অস্ত্রসজ্জিত ছিলেন না; বরং পরিস্থিতি অনুযায়ী পুরুষ যোদ্ধাদের যথাসাধ্য সহযোগিতা করাই ছিল তাদের উদ্দেশ্য। যেমন, আহতদের পানি পান করানো, তাদের সেবা-শুশ্রুষা করা ইত্যাদি। এটাও লক্ষণীয় যে, গাযওয়ায়ে উহুদে অংশগ্রহণ করা এসব নারী ছিলেন অধিকাংশ ক্ষেত্রেই বয়স্ক। তারা রণাঙ্গনে নিজেদের স্বামী বা ছেলেদের সঙ্গে অংশগ্রহণ করেছিলেন। পাশাপাশি এসব নারী সাহাবী ছিলেন উন্নত চরিত্র ও ধর্মীয় গুণাবলির অধিকারী এবং প্রশিক্ষিত। তাই তাদের সাথে বর্তমান যুগের নারী সৈন্যদের তুলনা করা চলে না; যারা উত্তেজক আটো সাটো পোশাক পরে। যারা পুরুষদের সামনে নিজেদের প্রকাশ করতে উন্মুখ থাকে এবং বিভিন্ন ধরণের ফেতনার জন্ম দেয়।
এছাড়াও সেই যুগের পুরুষরা ছিলেন তাকওয়া ও উত্তম চরিত্রের অধিকারী। বর্তমান যুগের পুরুষদের তুলনা চলে না সেই যুগের পুরুষদের সাথে। উহুদযুদ্ধে যেসব পুরুষের সাথে নারীরা যুদ্ধে অংশগ্রহণ করেছিলেন, তারা ছিলেন এই উম্মাহর নির্বাচিত ব্যক্তি এবং ধর্মীয় বিধিবিধান পালনে তারা ছিলেন অতুলনীয়। তাই উহুদ যুদ্ধের দৃষ্টান্ত পেশ করে নারীদেরকে সেনাবাহিনীতে অন্তর্ভুক্ত করার বৈধতা দেওয়া যাবে না। ফিকহের নীতিমালায় এ ধরনের কিয়াস বা তুলনাকে বলা হয় 'কিয়াস মাআল ফারেক' যা বাতিল এবং অগ্রহণযোগ্য। ৫৫৯

টিকাঃ
৫৫৫ সিয়ারু আলামিন নুবালা: ২/২৭৮।
৫৫০ ওয়াকেদী প্রণীত মাগাযী: ১/২৬৯-২৭০।
৫৫৭ মারবিয়াতে গাযওয়ায়ে উহুদ: ২৫৪।
৫৫৮ আস সীরাতুন নববিয়‍্যাহ আসসহীহাহ: ২/৩৯১।
৫৫৯ মুহাম্মাদ বাশমীল প্রণীত গাযওয়ায়ে উহুদ: ১৭১-১৭৩।

📘 নবীজির যুদ্ধ জীবন পাঠ ও পর্যালোচনা > 📄 শোকসন্তপ্ত নারীজির धैर्य হতে প্রাপ্ত শিক্ষা

📄 শোকসন্তপ্ত নারীজির धैर्य হতে প্রাপ্ত শিক্ষা


ক. সাফিয়া বিনতে আবদুল মুত্তালিব রা.
হামযাকে দেখতে আবদুল মুত্তালিবের কন্যা সাফিয়া এলেন। হামযা ছিলেন তার সহোদর ভাই। রসূলুল্লাহ সা. সাফিয়ার পুত্র যুবায়ের ইবনুল আওয়امকে বললেন, 'তুমি তোমার মার সাথে দেখা করে তাকে বুঝিয়ে সুজিয়ে ফেরত পাঠিয়ে দাও যেন সে ভাইয়ের এ বিকৃত অবস্থা দেখতে না পায়।' যুবায়ের রা. গিয়ে বললেন, মা, রসূলুল্লাহ সা. আপনাকে ফিরে যেতে বলছেন। সাফিয়া রা. বললেন, কেন? আমার ভাইয়ের লাশ বিকৃত করার কথা আমি শুনেছি। ওটা আল্লাহর পথেই হয়েছে এবং তা আমার জন্য খুশির ব্যাপার। ইনশাআল্লাহ আমি সবর করবো এবং সন্তুষ্ট থাকবো।
যুবায়ের রসূল সা.-এর কাছে গিয়ে সাফিয়ার এই বক্তব্য জানালে রসূল সা. বললেন, আচ্ছা, তাহলে তাকে বাঁধা দিও না। সাফিয়া গিয়ে হামযাকে দেখে ইন্নালিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন পড়লেন ও তার জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করলেন। ৫৬০

খ. হামনা বিনতে জাহাশ রা.
রসূলুল্লাহ সা. মদীনা অভিমুখে রওনা হলেন। এই সময় হামনা বিনতে জাহাশ তার সাথে দেখা করলেন। তখন তাকে তার ভ্রাতা আবদুল্লাহ ইবনে জাহাশের শাহাদাতের খবর দেয়া হলে তিনি ইন্না লিল্লাহ পড়লেন ও ইস্তিগফার করলেন। এরপর তাকে তার মামা হামযা ইবনে আবদুল মুত্তালিবের শাহাদাতের খবর দেয়া হলে তিনি পুনরায় ইন্না লিল্লাহ পড়লেন ও ইস্তিগফার করলেন। এরপর তাকে জানানো হলো যে, তার স্বামী মুসআব ইবনে উমায়ের শহীদ হয়েছেন, তখন তিনি চিৎকার করে উঠলেন। তখন রসূলুল্লাহ সা. মন্তব্য করলেন, 'এজন্য মেয়ের স্বামী তার কাছে বিশেষ মর্যাদার অধিকারী।' মামা ও ভাইয়ের মৃত্যুর খবরে তাকে অবিচলিত এবং স্বামীর মৃত্যুর খবরে চিৎকার করতে দেখেই তিনি এ কথা বলেন।
রসূলুল্লাহ সা. হামনাকে তার বিচলিত হওয়ার কারণ জিজ্ঞেস করলে তিনি বলেন, হে আল্লাহর রসূল! আমার সন্তানদের এতিম হয়ে যাওয়ার কথা মনে করেই আমি বেশি ব্যথিত হয়েছি। এ কথা শুনে রসূলুল্লাহ সা. তার জন্য ও তার সন্তানদের জন্য উত্তম প্রতিদানের দোআ করেন। ৫৬১
পরে হামনা বিনতে জাহাশ তালহা ইবনে উবায়দুল্লাহর সাথে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হন এবং তাদের ঘরে মুহাম্মাদ ও ইমরান জন্মগ্রহণ করেন। ৫৬২
তালহা ইবনে উবায়দুল্লাহ হামনার পূর্বের সন্তানদেরও খুব ভালোবাসতেন। ৫৬৩

গ. দিনার গোত্রের এক নারী সাহাবীর ঘটনা
সাআদ ইবনে আবী ওয়াক্কাস রা. বলেন, দিনার গোত্রের জনৈক নারীর স্বামী, ভাই ও পিতা উহুদ যুদ্ধে শহীদ হয়েছিল। তাকে তার আপনজনের নিহত হওয়ার খবর শোনানো হলে সে নির্বিকারভাবে বললো, রসূলুল্লাহ সা.-এর কি অবস্থা? সবাই বললো, তিনি ভালো আছেন। তুমি যেমন পছন্দ কর, তিনি সে রকমই আছেন। মহিলা বললো, রসূলুল্লাহ সা.-কে একটু দেখাও। আমি তাকে দেখে নিই। তখন রসূলুল্লাহ সা.-কে দেখানো হলো। মহিলা দেখেই বললেন, ইয়া রসূলাল্লাহ, আপনি নিরাপদে আছেন, এটা দেখার পর আমার কাছে অন্য যে কোন মসিবত নিতান্তই তুচ্ছ। ৫৬৪
এমনই ছিল মুসলমানদের ঈমানী চেতনা।

ঘ. সাদ ইবনে মুআযের মা কাবশা রা.-এর ঘটনা
রসূলুল্লাহ সা.-এর দিকে দৌড়ে আসছিলেন সাআদ ইবনে মুআয রা.-এর মা। তখন রসূলুল্লাহ সা. ঘোড়ায় আরোহী ছিলেন এবং তার লাগাম ছিল সাআد-এর হাতে। সাআদ বললেন, আল্লাহর রসূল! আমার মা আসছেন। রসূলুল্লাহ সা. বললেন, তার আগমন শুভ হোক। তিনি কাছে এসে সুতীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে নবীজিকে পর্যবেক্ষণ করে বললেন, যখন আমি আপনাকে নিরাপদ দেখছি তখন প্রতিটি বিপদ আমার জন্য অত্যন্ত তুচ্ছ। রসূলুল্লাহ সা. তাকে তার ছেলে আমর ইবনে মুআয রা.-এর শাহাদাতের ব্যাপারে সান্তনা দিয়ে ধৈর্য ধারণ করার উপদেশ দিয়ে বললেন, সাআদের মা! তুমি খুশি হও এবং অন্যান্য শহীদদের স্বজনদের সুসংবাদ দাও। নিঃসন্দেহে তারা সবাই জান্নাতে সমবেত হয়েছেন। তারা সংখ্যায় ১২ জন এবং তাদেরকে পরিবার-পরিজনদের জন্য সুপারিশ করার অনুমতি দেওয়া হয়েছে এবং তা আল্লাহ কবুল করবেন।
উম্মে সাআদ বললেন, আল্লাহর রসূল! আমরা এতে সন্তুষ্ট। এত বড় সুসংবাদের পর আর কি কান্না করতে পারি? আবার তিনি বলেন, হে আল্লাহর রসূল! আমরা যারা তাদের মৃত্যুর পরেও বেঁচে আছি আমাদের জন্য দোআ করুন। রসূলুল্লাহ সা. বললেন, হে আল্লাহ! তাদের দুশ্চিন্তা দূর করুন, তাদের বিপদ লাঘব করে দিন। তাদেরকে কল্যাণ দান করুন। ৫৬৫

টিকাঃ
৫৬০ সীরাতে ইবনে হিশাম: ৩/১০৮।
৫৬১ আল বিদায়া ওয়ান নিহায়া: ৪/৭৪।
৫৬২ আল ইসাবাহ: ৮/৮৮।
৫৬০ আবু ফারিস প্রণীত গাযওয়ায়ে উহুদ : ১০৯।
৫৬৪ আল বিদায়া ওয়ান নিহায়া : ৪/৪৮।
৫৬৫ ওয়াকেদী প্রণীত মাগাযী : ১/৩১৫-৩১৬।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00