📘 নবীজির যুদ্ধ জীবন পাঠ ও পর্যালোচনা > 📄 গাযওয়ায়ে উহুদে মুসলিম নারীরা

📄 গাযওয়ায়ে উহুদে মুসলিম নারীরা


গাযওয়ায়ে উহুদের শুরুতে মুসলিম নারীরা অংশগ্রহণ করেছিলেন। বেশ ক'জন সাহসী নারী তাদের ঈমানী পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়ে বিশেষ সম্মানে ভূষিত হয়েছিলেন। তারা পিপাসুদের পানি পান করানো ও আহতদের দেখাশোনা করার কাজে ঘর থেকে বেরিয়েছিলেন। রসূলুল্লাহ সা.-এর ওপর মুশরিকদের হামলা প্রতিহত করতে তাদের কেউ কেউ লড়াই করেছিলেন। গাযওয়ায়ে উহুদে অংশগ্রহণকারী নারীদের মধ্যে ছিলেন উম্মুল মুমিনীন আয়েশা, উম্মে উমারা, হামনা বিনতে জাহাশ, উম্মে সালিত ও উম্মে সুলাইমসহ বেশ কয়েকজন আনসারী নারী। ৫৪৭
সালাবা ইবনে আবু মালেক রা. বলেন, একবার ওমর ইবনুল খাত্তাব রা. মদীনার নারীদের মধ্যে কিছু চাদর বণ্টন করছিলেন। সব চাদর দিয়ে দেওয়ার পর উন্নতমানের একটি চাদর অবশিষ্ট রয়ে গেলো। উপস্থিত ব্যক্তিদের কেউ বললেন, হে আমীরুল মুমিনীন, এই চাদরটি আল্লাহর রসূলের নাতনীকে দিয়ে দিন। যিনি আপনার সাথে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ। অর্থাৎ, তারা এই চাদরটি আলী-এর মেয়ে উম্মে কুলসুমকে দেওয়ার জন্য অনুরোধ করছিলেন। উত্তরে ওমর রা. বলেন, না, উম্মে সালিত এই চাদরটি পাওয়ার বেশি উপযুক্ত একজন আনসারী নারী যিনি রসূলুল্লাহ সা.-এর হাতে বায়আত হয়েছিলেন। গাযওয়ায়ে উহুদের দিন ইনি আমাদের জন্য মশক ভরে পানি এনেছিলেন। ৫৪৮

টিকাঃ
৫৪৭ আস সীরাতুন নববিয়‍্যাহ আসসহীহাহ: ২/৩৮৭।
৫৪৮ সহীহ বুখারী: ৪০৭১।

📘 নবীজির যুদ্ধ জীবন পাঠ ও পর্যালোচনা > 📄 গাওয়ায় উহুদে নারীদের পানি পান করানো

📄 গাওয়ায় উহুদে নারীদের পানি পান করানো


আনাস রা. বলেন, গাযওয়ায়ে উহুদে সাহাবীরা রসূল সা.-এর কাছ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়লেন। আমি দেখলাম, আয়েশা বিনতে আবু বকর ও উম্মু সুলাইম রা. তাদের আঁচল এতটুকু উঠিয়ে নিয়েছেন যে, আমি তাদের উভয় পায়ের গহনা দেখছিলাম। তারা দুজনেই পানির মশক ভরে ভরে সাহাবীদের মুখে ঢেলে দিচ্ছিলেন। পানি শেষ হয়ে গেলে আবার মশক ভরে পান করাচ্ছিলেন। ৫৪৯
কাআব ইবনে মালেক রা. বলেন, আমি উম্মে সুলাইম ও আয়েশা রা.-কে গাযওয়ায়ে উহুদের দিন পিঠে করে পানির পাত্র বহন করতে দেখেছি। হামনা বিনতে জাহাশ পিপাসুদের পানি পান করাতেন এবং আহতদের ব্যান্ডেজ করে দিতেন। আহতদের পানি পান করাতেন উম্মে আইমান রা.। ৫৫০

টিকাঃ
৫৪৯ সহীহ বুখারী: ২৮৮০।
৫৫০ ওয়াকেদী প্রণীত মাগাযী: ১/২৪৯।

📘 নবীজির যুদ্ধ জীবন পাঠ ও পর্যালোচনা > 📄 আহত মুজাহিদদের সেবায় মুসলিম নারীরা

📄 আহত মুজাহিদদের সেবায় মুসলিম নারীরা


আনাস ইবনে মালেক রা. বলেন, রসূলুল্লাহ সা. কোনো যুদ্ধে অংশগ্রহণ করলে উম্মে সুলাইম ও কয়েকজন আনসারী নারীকে সঙ্গে নিতেন। তারা মুজাহিদদের পানি পান করাতেন এবং আহতদের ব্যান্ডেজ বেঁধে দিতেন। ৫৫১
ইমাম আবদুর রায্যাক ইমাম যুহরীর সূত্রে বর্ণনা করেন, নারীরা নবীজির সাথে যুদ্ধে অংশগ্রহণ করতেন; সৈন্যদের পানি পান করাতেন ও আহতদের ব্যান্ডেজ বেঁধে দিতেন। ৫৫২
রুবাইয়্যি' বিনতে মুআব্বিয রা. বলেন, আমরা রণাঙ্গনে রসূলুল্লাহ সা.-এর সঙ্গে থেকে লোকদের পানি পান করাতাম, আহতদের পরিচর্যা করতাম এবং নিহতদের মদীনায় পাঠাতাম। আরেক বর্ণনায় এসেছে, আমরা রসূলুল্লাহ সা.- এর সঙ্গে যুদ্ধে শরিক হয়ে লোকদের পানি পান করাতাম, তাদের সেবা-শুশ্রূষা করতাম এবং আহত ও নিহত লোকদের মদীনায় ফেরত পাঠাতাম। ৫৫৩
সাহল ইবনে সাআদ রা. থেকে বর্ণিত, তাকে রসূলুল্লাহ সা.-এর আহত হওয়ার ব্যাপারে জিজ্ঞেস করা হলে তিনি বলেছেন, আল্লাহর শপথ! আমি ভালোভাবেই জানি কে রসূলুল্লাহ সা.-এর আঘাতের স্থান ধুয়ে দিয়েছিলেন। কে পানি ঢেলেছিলেন। কীভাবে তার চিকিৎসা করা হয়েছিল। রসূলুল্লাহ সা.-এর মেয়ে ফাতিমা রা. আঘাতের স্থান ধুয়ে দিয়েছিলেন। আলী রা. পানি ঢেলেছিলেন। ফাতিমা রা. যখন দেখলেন রক্তপড়া বন্ধ হচ্ছে না, তখন তিনি এক টুকরো চাটাই পুড়িয়ে ক্ষতস্থানে লাগিয়ে দেন। এতে রক্তপ্রবাহ বন্ধ হয়ে যায়। ৫৫৪

টিকাঃ
৫৫১ সহীহ মুসলিম: ১৮১০।
৫৫২ ফাতহুল বারী: ৬/৯২।
৫৫০ সহীহ বুখারী: ২৮৮২, ২৮৮৩।
৫৫৪ সহীহ বুখারী: ৪০৭৫।

📘 নবীজির যুদ্ধ জীবন পাঠ ও পর্যালোচনা > 📄 ইসলাম ও নারীকে রক্ষায় নারীদের ভূমিকা

📄 ইসলাম ও নারীকে রক্ষায় নারীদের ভূমিকা


গাযওয়ায়ে উহুদে নারীদের মধ্যে শুধু উম্মে উমারা নুসাইবাহ বিনতে কাব রা. প্রত্যক্ষ যুদ্ধে অংশ নিয়েছিলেন। জামরা ইবনে সাঈদ তার দাদীর যুদ্ধে অংশগ্রহণের কথা আলোচনা করতে গিয়ে বলেন, উম্মে উমারা পানি পান করাতে গাযওয়ায়ে উহুদে গিয়েছিলেন। আমি রসূলুল্লাহ সা.-কে এ কথা বলতে শুনেছি, নুসাইবা বিনতে কাআব আজকের যুদ্ধে অমুক অমুক পুরুষের চাইতে উত্তম বীরত্ব প্রদর্শন করেছে। রসূলুল্লাহ সা. তার বীরত্ব দেখে এ মন্তব্য করেছিলেন। তিনি কোমরে কাপড় বেঁধে শত্রুদের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়েছিলেন। সে যুদ্ধে তিনি তেরোটি আঘাত পেয়েছিলেন। তিনি ইনতেকাল করলে তার গোসল দানকারীদের মধ্যে আমিও ছিলাম। আমি গুনে দেখেছিলাম তার শরীরে তেরোটি আঘাত রয়েছে।
নুসাইবা রা. নিজেই বলেন, ইবনে কুমাইয়া যে ভাবে আমার ওপর তরবারি দিয়ে আক্রমণ করেছিল, সেই ভয়াবহ দৃশ্য এখনো আমার চোখে ভাসে। যে আঘাতটি ছিল আমার অন্যান্য আঘাতের তুলনায় গুরুতর এবং এর জন্য আমাকে প্রায় এক বছর চিকিৎসা করাতে হয়েছিল।
রসূলুল্লাহ সা. হামরাউল আসাদ অভিমুখে রওনা হওয়ার ঘোষণা করলে তিনিও প্রস্তুতি গ্রহণ করেছিলেন। কিন্তু অতিরিক্ত রক্ত প্রবাহিত হওয়ার কারণে তাদের সঙ্গে যেতে পারেননি। তিনি বলেন, অতঃপর আমি সারারাত আমার আহত অঙ্গের চিকিৎসা করতে থাকি। রসূলুল্লাহ সা. হামরাউল আসাদ থেকে ফিরে এলে ঘরে প্রবেশ করার পূর্বেই নুসাইবার ভাই আবদুল্লাহ ইবনে কাআবকে নুসাইবার ব্যাপারে খোঁজখবর নেওয়ার জন্য পাঠান। ৫৫৫
তিনি ফিরে নুসাইবা রা.-এর সুস্থতার খবর দেন। নবীজি এতে স্বস্তি পান। ৫৫৬
অধ্যাপক হোসাইন বাকেরী হযরত নুসাইবা রা.-এর যুদ্ধে অংশগ্রহণ সম্পর্কে আলোচনা করতে গিয়ে বলেন, পুরুষদের সাথে তার যুদ্ধে অংশগ্রহণ এক অনুপম ঘটনা। মূলত অবস্থার পরিপ্রেক্ষিতে তিনি যুদ্ধে শরিক হতে বাধ্য হয়েছিলেন। যখন মানুষ বিচ্ছিন্ন হয়ে ছড়িয়ে পড়ে, তখন রসূলুল্লাহ সা. শত্রুদের ঘেরাওয়ের মুখে পড়েন, এমন অবস্থায় পুরুষ ও নারী প্রত্যেকের জন্যই অস্ত্র হাতে নেওয়ার প্রয়োজনীয়তা দেখা দেয়। ৫৫৭
ড. আকরাম জিয়া ওমরী গাযওয়ায়ে উহুদে নারীদের অংশগ্রহণের ব্যাপারে বলেন, উক্ত বর্ণনার আলোকে প্রমানিত হয়, জরুরি অবস্থায় নারীদের কাছ থেকেও সাহায্য নেওয়া যেতে পারে। যেমন, আহতদের দেখাশোনা করা তাদের সেবা করা ইত্যাদি। কিন্তু এসব ক্ষেত্রে পর্দার প্রতি খেয়াল রাখতে হবে। তাদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে। যেন এ সংক্রান্ত কোনো ফেতনায় নিপতিত হতে না হয়। তদ্রূপ শত্রুদের আক্রমণের মুখেও তাদের পরিপূর্ণ নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে। এটা নিশ্চিত যে, সাধারণ অবস্থায় জিহাদ কেবল মুসলিম পুরুষদের ওপরই ফরয। কিন্তু যদি মুসলমান এলাকায় শত্রুবাহিনী ঢুকে পড়ে, তখন পুরুষ-নারী নির্বিশেষে সবার জন্য যুদ্ধে অংশগ্রহণ ফরজ। ৫৫৮
অধ্যাপক মুহাম্মাদ আহমদ বাশমীল বলেন, উহুদ যুদ্ধে ইসলামে প্রথমবারের মতো নারী-পুরুষ সবাই মুশরিকদের বিরুদ্ধে যুদ্ধে অংশগ্রহণ করেছে। অবশ্য এই কথাও স্বীকৃত যে, একজন নারী শুধু যুদ্ধে সরাসরি অংশগ্রহণ করেছিলেন আবার তাও রসূলুল্লাহ সা.-এর নিরাপত্তা রক্ষা করার জন্য। এটা স্পষ্ট যে, যেসব নারী যুদ্ধে অংশগ্রহণ করেছিলেন, তারা সরাসরি অস্ত্র হাতে লড়াই করার জন্য বের হননি এবং পুরুষদের মতো তারা অস্ত্রসজ্জিত ছিলেন না; বরং পরিস্থিতি অনুযায়ী পুরুষ যোদ্ধাদের যথাসাধ্য সহযোগিতা করাই ছিল তাদের উদ্দেশ্য। যেমন, আহতদের পানি পান করানো, তাদের সেবা-শুশ্রুষা করা ইত্যাদি। এটাও লক্ষণীয় যে, গাযওয়ায়ে উহুদে অংশগ্রহণ করা এসব নারী ছিলেন অধিকাংশ ক্ষেত্রেই বয়স্ক। তারা রণাঙ্গনে নিজেদের স্বামী বা ছেলেদের সঙ্গে অংশগ্রহণ করেছিলেন। পাশাপাশি এসব নারী সাহাবী ছিলেন উন্নত চরিত্র ও ধর্মীয় গুণাবলির অধিকারী এবং প্রশিক্ষিত। তাই তাদের সাথে বর্তমান যুগের নারী সৈন্যদের তুলনা করা চলে না; যারা উত্তেজক আটো সাটো পোশাক পরে। যারা পুরুষদের সামনে নিজেদের প্রকাশ করতে উন্মুখ থাকে এবং বিভিন্ন ধরণের ফেতনার জন্ম দেয়।
এছাড়াও সেই যুগের পুরুষরা ছিলেন তাকওয়া ও উত্তম চরিত্রের অধিকারী। বর্তমান যুগের পুরুষদের তুলনা চলে না সেই যুগের পুরুষদের সাথে। উহুদযুদ্ধে যেসব পুরুষের সাথে নারীরা যুদ্ধে অংশগ্রহণ করেছিলেন, তারা ছিলেন এই উম্মাহর নির্বাচিত ব্যক্তি এবং ধর্মীয় বিধিবিধান পালনে তারা ছিলেন অতুলনীয়। তাই উহুদ যুদ্ধের দৃষ্টান্ত পেশ করে নারীদেরকে সেনাবাহিনীতে অন্তর্ভুক্ত করার বৈধতা দেওয়া যাবে না। ফিকহের নীতিমালায় এ ধরনের কিয়াস বা তুলনাকে বলা হয় 'কিয়াস মাআল ফারেক' যা বাতিল এবং অগ্রহণযোগ্য। ৫৫৯

টিকাঃ
৫৫৫ সিয়ারু আলামিন নুবালা: ২/২৭৮।
৫৫০ ওয়াকেদী প্রণীত মাগাযী: ১/২৬৯-২৭০।
৫৫৭ মারবিয়াতে গাযওয়ায়ে উহুদ: ২৫৪।
৫৫৮ আস সীরাতুন নববিয়‍্যাহ আসসহীহাহ: ২/৩৯১।
৫৫৯ মুহাম্মাদ বাশমীল প্রণীত গাযওয়ায়ে উহুদ: ১৭১-১৭৩।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00