📄 শত্রু বাহিনীর কৌশল সম্পর্কে রসূলুল্লাহ সা. অবহিত হলেন
কুরায়েশ বাহিনী ময়দান ত্যাগ করে রওয়ানা হয়ে যাবার পর রসূলুল্লাহ সা. আলী রা.-কে এই বলে পাঠালেন যে, 'ওদের পেছনে পেছনে গিয়ে লক্ষ করো, ওরা কোথায় যায় এবং কি করে। তারা যদি অশ্বপালকে দক্ষিণ দিকে নিয়ে যায় এবং উটে আরোহণ করে তাহলে বুঝতে হবে, তারা মক্কা অভিমুখে চলেছে। আর যদি ঘোড়ায় আরোহণ করে ও উট টেনে নিয়ে যায় তাহলে বুঝতে হবে তারা মদীনার উদ্দেশ্যে যাত্রা করেছে। আল্লাহর শপথ, তারা মদীনা আক্রমণ করতে চাইলে আমি তাদের দিকে সৈন্য নিয়ে এগিয়ে যাবো এবং প্রতিরোধ করবো।' আলী রা. বলেন, আমি তাদের অনুসরণ করলাম। দেখলাম, তারা অশ্বপাল নিয়ে দক্ষিন দিকে যাচ্ছে এবং উটে চড়ে মক্কা অভিমুখে যাত্রা করেছে।৫২৬
আলী রা. ফিরে এসে রসূলুল্লাহ সা.-কে বিস্তারিত জানান।
এ ঘটনা দ্বারা আমরা যেসব শিক্ষা পাই, তা হলো: রসূলুল্লাহ সা. সব সময় শত্রুপক্ষের গতিবিধির ওপর কঠোর দৃষ্টি রেখেছেন এবং তাদের পরিকল্পনা জানার চেষ্টা করেছেন। শত্রুরা যদি মদীনার ওপর আক্রমণ করতো, তাহলে তারা কঠিন প্রতিরোধের মুখোমুখী হতো। এই ঘটনায় আমরা আলী রা.-এর বীরত্বেরও পরিচয় পাই। এমন ভয়াবহ পরিস্থিতিতে শত্রুবাহিনীর অবস্থা পর্যবেক্ষণ করে খোঁজ খবর নিয়ে আসা সহজ ছিল না। শত্রুর হাতের নাগালে পড়লে তারা তাকে হত্যা করতে দ্বিধা করতো না। ৫২৭
যুদ্ধ শেষে নবীজি সা. আহত ও নিহতদের অবস্থা সম্পর্কে খোঁজ খবর নিয়ে যুদ্ধের ময়দানে থেকে শহীদগণের লাশ দাফন করার ব্যবস্থা করেছেন এবং আল্লাহর প্রশংসা করেছেন এবং তার কাছে দোআ করেছেন। এ সময় তিনি আলী রা.-কে শত্রুর অবস্থা জানার জন্য পাঠান। এসব তৎপরতার মাধ্যমে রসূলুল্লাহ সা. এই যুদ্ধে مسلمانوں সফলতাসমূহ সংরক্ষণ করতে চেয়েছিলেন। আল্লাহ তাআলা জয় ও পরাজয়ের কারণসমূহ নির্ধারণ করে রেখেছেন। তাই যে ব্যক্তি বিজয় ও সাহায্যপ্রাপ্ত হওয়ার কারণসমূহ অবলম্বন করবে এবং আল্লাহ তাআলার ওপর পরিপূর্ণ আস্থা রাখবে, আল্লাহ তাআলা নিঃসন্দেহে তাকে বিজয়ী হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করবেন। আল্লাহ তাআলা বলেন:
سُنَّةَ اللَّهِ الَّتِي قَدْ خَلَتْ مِنْ قَبْلُ وَلَنْ تَجِدَ لِسُنَّةِ اللَّهِ تَبْدِيلًا
তোমাদের পূর্বে যারা গত হয়েছে তাদের ব্যাপারে এটি আল্লাহর নিয়ম; আর তুমি আল্লাহর নিয়মে কোন পরিবর্তন পাবে না। ৫২৮
রসূলুল্লাহ সা. কীভাবে সাহায্যপ্রাপ্তির পন্থা নির্ণয় করেছিলেন, গাযওয়ায়ে হামরাউল আসাদের আলোচনা দ্বারাও আমরা অনেকটা আঁচ করতে পারি।
টিকাঃ
৫২৬ আল বিদায়া ওয়ান নিহায়া: ৪/৪১।
৫২৭ আবু ফারিস প্রণীত গাযওয়ায়ে উহুদ : ৯৫-৯৬।
৫২৮ সুরা ফাতাহ : ২৩।
📄 গাওওয়ায় হামরাউল আসাদ
বিভিন্ন বর্ণনা দ্বারা প্রমাণিত, রসূলুল্লাহ সা. নিজের গোয়েন্দাদের মাধ্যমে আরবের মুশরিকদের পুরো অবস্থা সম্পর্কে খোঁজ খবর রাখতেন। মুশরিক বাহিনী উহুদ থেকে মক্কায় পৌঁছার পরও রসূলুল্লাহ সা.-এর তথ্য সংগ্রহের এ ধারাবাহিকতা চলতে থাকে। রসূলুল্লাহ সা. জানতে পারেন, मुसलमानों বিরুদ্ধে পরিপূর্ণ প্রতিশোধ নিতে না পারায় আবু সুফিয়ান যুদ্ধফেরত সৈন্যদের তাচ্ছিল্য করেছে। আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস রা. বলেন, আবু সুফিয়ান এবং কাফের-বাহিনী যখন উহুদযুদ্ধ থেকে প্রত্যাবর্তন করে রাওহা প্রান্তরে পৌঁছায়। ৫২৯
তখন আবু সুফিয়ান তাদের বলেছিল, তোমরা কিছুই করতে পারলে না। তোমরা মুহাম্মাদকে হত্যা করতে পারলে না। তাদের যুবতী নারীদের দাসী বানাতে পারলে না। তার এসব বক্তব্য রসূলুল্লাহ সা.-এর কাছে পৌঁছে। ৫০০
এ বর্ণনা থেকে আমরা জানতে পারি, যুদ্ধ সমাপ্ত হওয়ার পর রসূলুল্লাহ সা. শত্রুদের অনাকাঙ্ক্ষিত যেকোনো হামলা থেকে নিরাপদে থাকার লক্ষ্যে কীভাবে শত্রুদের কর্মকাণ্ড পর্যবেক্ষণ করতেন।
রসূলুল্লাহ সা. যখন খবর পেলেন, কুরায়েশের কাফেররা পুনরায় মদীনা আক্রমণ করার উদ্দেশ্যে রওয়ানা হচ্ছে, তিনি অন্যান্য مسلمانوں বাদ দিয়ে শুধু গাযওয়ায়ে উহুদে অংশগ্রহণকারী সাহাবীদের সঙ্গে নিয়ে হামরাউল আসাদে যান। ইবনে ইসহাক বর্ণনা করেন, উহুদযুদ্ধ ১৫ শাওয়াল শনিবার দিন সংঘটিত হয়েছিল। পরবর্তী দিন রবিবার ১৬ শাওয়াল রসূলুল্লাহ সা.-এর পক্ষ থেকে ঘোষণা দেওয়া হয়, আমরা শত্রুদের পিছু ধাওয়া করবো। সাথে সাথে বলে দেওয়া হয়, যারা গতকালের যুদ্ধে অংশগ্রহণ করেনি, তারা যেন এই যুদ্ধযাত্রায় অংশ না নেয়। জাবের ইবনে আবদুল্লাহ রা. রসূলুল্লাহ সা.-এর দরবারে উপস্থিত হয়ে এ যুদ্ধে অংশগ্রহণের অনুমতি প্রার্থনা করলে রসূলুল্লাহ সা. শুধু তাকে অনুমতি দেন। এই অভিযানের উদ্দেশ্য ছিল শুধু শত্রুকে ভয় দেখানো। উহুদ যুদ্ধের বিপর্যয় যে মুসলমানদের কিছুমাত্র হতোদ্যম করতে পারেনি, শত্রুকে তা বুঝিয়ে দেওয়া। ৫৩১
রসূলুল্লাহ সা.-এর জন্য উৎসর্গিতপ্রাণ সাহাবায়ে কেরাম যুদ্ধের ডাকে দ্বিতীয়বারও সাগ্রহে সাড়া দিয়েছিলেন। এমনকি উহুদযুদ্ধে আহত সাহাবায়ে কেরামও বসে থাকেননি। আবদে আশহাল গোত্রের জনৈক সাহাবী বলেন, আমি এবং আমার ভাই উভয়েই উহুদযুদ্ধে অংশগ্রহণ করেছিলাম। যুদ্ধ শেষে আমাদের আহতরা অত্যন্ত দুর্বল হয়ে পড়েছিল; এমন পরিস্থিতিতে শত্রুদের পিছু ধাওয়া করতে যাওয়ার ঘোষণা দেওয়া হয়। আমরা একে অপরকে বললাম, আমরা দুজনই কি রসূলুল্লাহ সা.-এর সাথে এই যুদ্ধে অংশগ্রহণ করার সৌভাগ্য থেকে বঞ্চিত থেকে যাবো। আল্লাহর শপথ! আমাদের কাছে এখন কোনো বাহন নেই এবং আমাদের প্রত্যেকেই গুরুতর আহত। তবু আমরা রসূলুল্লাহ সা.-এর সাথে যুদ্ধে বের হয়ে পড়লাম। আমি আমার ভাইয়ের তুলনায় কিছুটা কম আহত ছিলাম, আমার ভাইয়ের অবস্থা অত্যন্ত শোচনীয় ছিল। কিছুদূর আমি তাকে বহন করে নিয়ে যেতাম এবং কিছু জায়গা তিনি পায়ে হেঁটে চলতেন। শেষ পর্যন্ত আমরা মুসলমানদের সাথে কাঙ্ক্ষিত গন্তব্যে পৌছি। ৫৩২
রসূলুল্লাহ সা. হামরাউল আসাদে গমন করেন এবং সেখানে শত্রুপক্ষের কাছাকাছি পৌঁছে যান। কাফের-বাহিনীর জন্য তিন দিন পর্যন্ত সেখানে অবস্থান করেন। কিন্তু তারা مسلمانوں মুখোমুখি হওয়ার সাহস করতে পারেনি। রসূলুল্লাহ সা. রাতে সাহাবীদের বেশি পরিমাণে অগ্নি প্রজ্বলিত করার আদেশ দিয়েছিলেন। ফলে সাহাবায়ে কেরাম প্রতিরাতে একসাথে প্রায় পাঁচশো অগ্নিমশাল জ্বালাতেন। ৫৩৩
মা'বাদ ইবনে আবী মা'বাদ আল খুযায়ী তখনো মুশরিক ছিলেন। তার গোত্র খুযাআর মুসলমান ও মুশরিক নির্বিশেষে প্রত্যেকেই রসূলুল্লাহ সা.-এর কাছে আসা যাওয়া করতো এবং তিহামা অঞ্চলে তার গোপনীয়তা রক্ষা করতো। আর তিহামায় যা-ই ঘটুক তা রসূলুল্লাহ সা.-কে অবহিত করতো। তার কাছে কিছুই গোপন করতো না। মা'বাদের সাথে একদিন রসূলুল্লাহ সা.-এর দেখা হলো। উহুদের ঘটনা সম্পর্কে সে বললো, মুহাম্মাদ আপনার যে বিপর্যয় ঘটেছে তাতে আমরা ব্যথিত ও দুঃখিত। আমরা সবাই কামনা করছিলাম যে, আপনাকে যেন আল্লাহ নিরাপদ রাখেন। অতঃপর মা'বাদ চলে গেলেন। রসূলুল্লাহ সা. হামরাউল আসাদেই রইলেন। রাওহাতে৫৩৪ গিয়ে মা'বাদের দেখা হলো আবু সুফিয়ান ও তার অনুচরদের সাথে। তারা তখন রসূলুল্লাহ সা. ও সাহাবাদের ওপর পুনরায় হামলা করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে।
তারা পরস্পর বলাবলি করছিল, মুহাম্মাদের সহচরদের প্রভাবশালী ও নেতৃস্থানীয় লোকদের অনেককেই তো খতম করেছি, কিন্তু একেবারে নিশ্চিহ্ন না করে মক্কায় ফিরে যাচ্ছি কেন? অবশিষ্টদের ওপর বরং আবার হামলা করবো এবং তাদেরকে শেষ করেই তবে ক্ষান্ত হবো। এই সময় মা'বাদকে দেখে আবু সুফিয়ান বললো, মা'বাদ, ওদিককার খবর কি? মা'বাদ বললো, দেখলাম মুহাম্মাদ তার সহচরদের নিয়ে বিপুল সংখ্যক মানুষের সমাবেশ ঘটিয়েছে এবং তোমাদের দিকে ছুটে আসছে। আমি এরকম জনসমাবেশ আর কখনো দেখিনি। উহুদের যুদ্ধের দিন যারা যুদ্ধে আসেনি, তারাও মুহাম্মাদের সাথে যোগ দিয়েছে। তারা তাদের কৃতকর্মের জন্য অনুতপ্ত হয়েছে।
তাদের মধ্যে এমন ভয়ংকর ক্রোধ ও আক্রোশ দেখলাম, যা আমি আর কখনো দেখিনি। আবু সুফিয়ান বললো, বলো কি? মা'বাদ বললো, আল্লাহর কসম খেয়ে বলছি। ওরা হয়তো এক্ষুণি এসে পড়বে। তুমি রওনা হবার আগেই হয়তো ওদের ঘোড়ার মাথা দেখা যাবে। আবু সুফিয়ান বললো আমরা তো ওদের অবশিষ্ট লোকগুলোকে সাবাড় করে দেয়ার জন্য পুনরায় হামলা করতে প্রস্তুত হয়েছি।
মা'বাদ বললো, তাহলে আমি নিষেধ করছি। এ কাজটি করো না। তাদের প্রস্তুতি দেখে আমি একটা কবিতা পর্যন্ত রচনা করে ফেলেছি। আবু সুফিয়ান বললো, কি কবিতা রচনা করেছো? শোনাও তো দেখি। মা'বাদ বললো, কবিতাটি এই:
كادت تهد من الأصوات راحلتي إذ سالت الأرض بالجرد الأبابيل تردى بأسد كرام لا تنابلة عند اللقاء ولا ميل معازيل فظلت عدوا أظن الأرض مائلة لما سموا برئيس غير مخذول فقلت : ويل ابن حرب من لقائكم إذا تغطمطت البطحاء بالجبل إني نذير لأهل البسل ضاحية لكل ذي إربة منهم ومعقول من جيش أحمد لا وخش تنابلة وليس يوصف ما أنذرت بالقيل
তাদের তর্জন-গর্জনে আমার উটের তো ভয়ে ভিমরি খাওয়ার যোগাড়। খাট চুলওয়ালা ঘোড়ার পাল যখন যমীনের ওপর সয়লাবের মত বয়ে চললো। দ্রুতবেগে ধেয়ে চললো দীর্ঘদেহী দৃপ্ত সিংহপুরুষদের নিয়ে রণাঙ্গনে নিরস্ত্র সিপাহীদের মত তারা টলটলায়মান নতশির নয়।
আমি তৎক্ষনাৎ দৌড়ে পালালাম। ভাবলাম, পৃথিবীটা নুয়ে যাচ্ছে। যখন তারা আমাদের দিকে ধেয়ে এলো এক অপরাজেয় অধিনায়কের সাথে। আমি বললাম, তোমাদের মোকাবেলায় যারা আসবে তাদের জন্য আফসোস! উপত্যাকা যেন পাহাড়ের আঘাতে কেঁপে উঠছিল।
পবিত্র হারামের অধিবাসীদের মধ্যে যারা বুদ্ধিমান ও কাণ্ড-জ্ঞানসম্পন্ন, তাদেরকে আমি দ্ব্যর্থহীন ভাষায় সাবধান করে দিচ্ছি আহমমাদের সেনাবাহিনী থেকে। আসলে আমি যে হুঁশিয়ারী উচ্চারণ করছি তার জন্য উপযুক্ত ভাষা নেই। ৫৩০
নিজেদের পলায়নপরতা গোপন করতে এবং مسلمانوں প্রভাবিত করতে আবু সুফিয়ান একটি মনস্তাত্ত্বিক ফন্দি আঁটলো। বনু আবদুল কায়েসের একটি কাফেলার সাথে আবু সুফিয়ানের দেখা হলে সে বললো, তোমরা কোথায় যাচ্ছ?
তারা বললো, মদীনায়। আবু সুফিয়ান বললো, কি উদ্দেশ্যে? তারা বললো, খাদ্য আনা নেয়ার উদ্দেশ্যে। সে বললো, তোমরা কি মুহাম্মাদের নিকট আমার একটা বার্তা পৌঁছে দেবে? পৌঁছে দিলে আমি আগামীকাল উকাযের বাজারে গিয়ে তোমাদেরকে প্রচুর পরিমাণ কিসমিস দেবো। তারা বার্তা পৌঁছে দিতে সম্মত হলো।
সে বললো, মুহাম্মাদকে বলবে যে, আমরা তার ও তার দলবলের ওপর হামলা চালিয়ে তাদের অবশিষ্টাংশকে নির্মূল করার সিদ্ধান্ত নিয়েছি। রসূলুল্লাহ সা. তখনো হামরাউল আসাদে অবস্থান করছিলেন। তার সাথে তারা সেখানে দেখা করলো এবং আবু সুফিয়ানের বার্তা তার নিকট পৌঁছে দিলো। রসূলুল্লাহ সা. সে কথা শুনে বললেন, 'হাসবুনাল্লাহ ওয়া নি'মাল ওয়াকীল! (আল্লাহই আমাদের জন্য যথেষ্ট এবং তিনি অতি উত্তম অভিভাবক।) ৫০৬
মুসলমানরা যুদ্ধের মনোভাব নিয়ে হামরাউল আসাদে অবস্থান করতে লাগলেন। এদিকে শত্রুসেনারা যুদ্ধ এড়িয়ে মক্কায় ফিরে যাওয়াকেই উত্তম মনে করলো। ফলে مسلمانوں মর্যাদা ও প্রভাব বেড়ে যায়। কাফেরদের এগিয়ে আসার কোনো সম্ভাবনা যখন আর বাকি রইলো না, তখন তারা স্বাচ্ছন্দে মদীনার পথ ধরলেন। এ যুদ্ধযাত্রা উহুদের সাময়িক পরাজয়ের গ্লানি কিছুটা হলেও মুছে দিয়েছিল। কাফেরদের বিজয়কে মাটিতে মিলিয়ে মনস্তাত্ত্বিক যুদ্ধে তাদের পরাজিত করে মুসলমানরা মদীনায় ফিরে যান। মদীনার মুনাফেক ও ইহুদিদের আনন্দ মলিন হয়ে যায়। ৫০৭
এ ব্যাপারে আল্লাহ তাআলা বলেন:
الَّذِينَ اسْتَجَابُوا لِلَّهِ وَالرَّسُولِ مِنْ بَعْدِ مَا أَصَابَهُمُ الْقَرْحُ لِلَّذِينَ أَحْسَنُوا مِنْهُمْ وَاتَّقَوْا أَجْرٌ عَظِيمُ الَّذِينَ قَالَ لَهُمُ النَّاسُ إِنَّ النَّاسَ قَدْ جَمَعُوا لَكُمْ فَاخْشَوْهُمْ فَزَادَهُمْ إِيمَانًا وَقَالُوا حَسْبُنَا اللَّهُ وَنِعْمَ الْوَكِيلُ انْقَلَبُوا بِنِعْمَةٍ مِنَ اللَّهِ وَفَضْلٍ لَمْ يَمْسَسْهُمْ سُوءُ وَاتَّبَعُوا رِضْوَانَ اللَّهِ وَاللَّهُ ذُو فَضْلٍ عَظِيمٍ إِنَّمَا ذَلِكُمُ الشَّيْطَانُ يُخَوِّفُ أَوْلِيَاءَهُ فَلَا تَخَافُوهُمْ وَخَافُونِ إِنْ كُنْتُمْ مُؤْمِنِينَ
যারা আল্লাহ ও রসূলের ডাকে সাড়া দিয়েছে যখমপ্রাপ্ত হওয়ার পরও, তাদের মধ্য থেকে যারা সৎকর্ম করেছে এবং তাকওয়া অবলম্বন করেছে তাদের জন্য রয়েছে মহাপুরস্কার। যাদেরকে মানুষেরা বলেছিল যে, নিশ্চয় লোকেরা তোমাদের বিরুদ্ধে সমবেত হয়েছে। সুতরাং তাদেরকে ভয় কর। কিন্তু তা তাদের ঈমান বাড়িয়ে দিয়েছিল এবং তারা বলেছিল, আল্লাহই আমাদের জন্য যথেষ্ট এবং তিনি কতই না উত্তম কর্মবিধায়ক'! অতঃপর তারা ফিরে এসেছে আল্লাহর পক্ষ থেকে নিআমত ও অনুগ্রহসহ। কোন মন্দ তাদেরকে স্পর্শ করেনি এবং তারা আল্লাহর সন্তুষ্টির অনুসরণ করেছিল। আর আল্লাহ মহা অনুগ্রহশীল। সে তো শয়তান। সে তোমাদেরকে তার বন্ধুদের ভয় দেখায়। তোমরা তাদেরকে ভয় করো না, বরং আমাকে ভয় কর, যদি তোমরা মুমিন হও। ৫৩৮
এলাকায় রসূলুল্লাহ সা.-এর হাতে দুশমনের দু'জন চর মুয়াবিয়া ইবনে মুগীরা ইবনে আবুল আস ও আবু ইযযাত যুমাহী ধরা পড়েছিল। শেষোক্ত ব্যক্তিকে রসূলুল্লাহ সা. বদর যুদ্ধে যুদ্ধবন্দী হিসেবে আটক করেছিলেন এবং পরে বিনা মুক্তিপণেই ছেড়ে দিয়েছিলেন। সে বললো, হে আল্লাহর রসূল, আমাকে হত্যা করবেন না। রসূলুল্লাহ সা. বললেন, 'মক্কায় গিয়ে তুমি তৃপ্তির সাথে বলবে যে, 'মুহাম্মাদকে দু'বার ধোঁকা দিয়েছি' সে সুযোগ তোমাকে আর দেয়া হবে না। হে যুবায়ের, ওর শিরচ্ছেদ কর।' যুবায়ের সঙ্গে সঙ্গে তার শিরচ্ছেদ করেন। ৫৩৯
রসূলুল্লাহ সা. বলেন, 'মুমিন কখনও এক গর্ত থেকে দুবার দংশিত হয় না। ৫৪০
পরে এই কথাটি প্রবাদবাক্যে পরিণত হয়। এর আগে এ ধরনের কথা কেউ বলেনি।
রসূলুল্লাহ সা.-এর এ সিদ্ধান্ত ছিল শরয়ী দৃষ্টিকোণ থেকে সঠিক। কেননা, এই কবি ছিল যমিনে ফাসাদ সৃষ্টিকারীদের একজন। তার ওপর দয়া করার অর্থ ছিল তাকে مسلمانوں বিরুদ্ধে কাফেরদের যুদ্ধে উদ্বুদ্ধ করার সুযোগ দেওয়া। আবু উজ্জাহ যুমাহী ছাড়া উহুদযুদ্ধে مسلمانوں পক্ষ থেকে আর কাউকে বন্দী বানানো হয়নি। ৫৪১
গাযওয়ায়ে উহুদে সত্তরজন মুসলমান শাহাদাত বরণ করেন। এ মর্মে আল্লাহ তাআলা বলেন:
أَوَلَمَّا أَصَابَتْكُمْ مُصِيبَةٌ قَدْ أَصَبْتُمْ مِثْلَيْهَا قُلْتُمْ أَنَّى هَذَا قُلْ هُوَ مِنْ عِنْدِ أَنْفُسِكُمْ إِنَّ اللَّهَ عَلَى كُلِّ شَيْءٍ قَدِيرٌه
আর যখন তোমাদের উপর বিপদ এল, (অথচ) তোমরা তো এর দ্বিগুণ বিপদে আক্রান্ত হলে (বদর যুদ্ধে)। তোমরা বলেছিলে এটা কোত্থেকে? বল, তা তোমাদের নিজদের থেকে। নিশ্চয় আল্লাহ সব কিছুর উপর ক্ষমতাবান। ৫৪২
গাযওয়ায়ে উহুদে শাহাদাতবরণকারীদের ব্যাপারে مسلمانوں সান্ত্বনা দিতে গিয়ে এই আয়াত অবতীর্ণ হয়। ইবনে আতিয়্যা রহ. বলেন, মুশরিকরা গাযওয়ায়ে উহুদে مسلمانوں ৭০ জন সাহাবীকে শহীদ করেছিল অন্যদিকে বদরযুদ্ধে মুশরিকদের ৭০ জন নিহত ও ৭০ জন বন্দী হয়। ৫৪৩
গাযওয়ায়ে উহুদে ২২ জন মুশরিক নিহত হয়।
যেসব কারণে গাযওয়ায়ে হামরাউল আসাদের প্রয়োজনীয়তা দেখা দেয়, তা হলো:
১. গাযওয়ায়ে উহুদে অংশগ্রহণকারীদের মনে পরাজয়ের যে গ্লানি তৈরি হয়েছিল, তা যেন দীর্ঘস্থায়ী না হয়।
২. মুসলমানরা যেন এটা উপলব্ধি করে যে, আল্লাহ ও তার রসূলের আহ্বানে সাড়া দিলে এবং নিজেদের দুর্বলতা দূরে নিক্ষেপ করলে শত্রুপক্ষের ওপর বিজয়ী হওয়া সম্ভব।
৩. সাহাবারা যেন শত্রুপক্ষের বিরুদ্ধে যেকোনো পরিস্থিতিতে যুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়ার সাহস পায়।
৪. মুসলমানরা যেন এটা উপলব্ধি করে যে, রণাঙ্গনে যা কিছু ঘটেছে তা আল্লাহ তাআলার ইচ্ছায়ই ঘটেছে। এটা ছিল مسلمانوں জন্য এক প্রকার পরীক্ষা। তারাই প্রকৃত সাহসী ও সামর্থ্যবান। শত্রুসেনারা কেবল সাময়িক ও বাহ্যিক বিজয় পেয়েছে। বস্তুত তারা ভীরু ও কাপুরুষ। ৫৪৪
রসূলুল্লাহ সা.-এর হামরাউল আসাদ পর্যন্ত এগিয়ে যাওয়া ছিল একধরনের মনস্তাত্ত্বিক যুদ্ধ। এর দ্বারা শত্রুপক্ষের ওপর মনস্তাত্ত্বিক প্রভাব পড়েছে। রসূলুল্লাহ সা. নিজের বাহিনী নিয়ে হামরাউল আসাদে পৌঁছেছিলেন। সেখানে তিন দিন অবস্থান করেছিলেন। অগ্নিকুণ্ড জ্বালিয়ে পুরো এলাকা আলোকিত করে রাখার আদেশ দিয়েছিলেন; যা দূরদুরান্ত থেকে শত্রুপক্ষের দৃষ্টিগোচর হতো। ফলে কুরায়েশরা ভাবতে থাকে, মুসলিম বাহিনী অত্যন্ত বৃহৎ। যার মোকাবিলা করার সামর্থ্য তাদের নেই। ৫৪৫
ইবনে সাআদ-এর বর্ণনায় এসেছে: রসূলুল্লাহ সা. সাহাবীদের নিয়ে হামরাউল আসাদে গিয়ে তাঁবু ফেলেন। পরের রাতগুলোতে মুসলমানরা সেখানে পাঁচশো অগ্নিমশাল জ্বালিয়ে রাখেন। বহু দূর পর্যন্ত আলো ছড়িয়ে পড়ে। অবশেষে আল্লাহ তাআলা শত্রুদের লাঞ্ছিত করে ফিরিয়ে দেন। ৫৪৬
টিকাঃ
৫২৯ মদিনা হতে মক্কার রাস্তায় ৭৩ কি. মি. দূরবর্তী একটি শহর।
৫০০ মাজমাউজ জাওয়াইদ: ৬/১২১। ইমাম হায়সামি বলেন, এর বর্ণনাকারীগণ বিশুদ্ধ সূত্রের।
৫৩১ আল বিদায়া ওয়ান নিহায়া: ৪/৫০।
৫০২ আল বিদায়া ওয়ান নিহায়া: ৪/৫০।
৫৩৩ আবু ফারিস প্রণীত গাযওয়ায়ে উহুদ : ১৪৪।
৫৩৪ মুযাইনা গোত্রের বাসস্থান এই রাওহা জনপদ হাঁটাপথে মদীনা থেকে দুই দিনের দূরত্বে অবস্থিত।
৫৩০ আল বিদায়া ওয়ান নিহায়া: ৪/৫১।
৫০৬ ইমাম যাহাবী প্রণীত তারীখুল ইসলাম: আল মাগাযী: ২২৬।
৫০৭ সুয়ার ওয়া ইবার মিনাল জিহাদিন নববী ফিল মাদিনাহ: ১৪২।
৫৩৮ সূরা আলে ইমরান: ১৭২-১৭৫।
৫৩৯ সীরাতে ইবনে হিশাম: ৩/১১৬।
৫৪০ সহীহ বুখারী: ৬১৩৩।
৫৪১ আল বিদায়া ওয়ান নিহায়া: ৪/৫৩।
৫৪২ সুরাআলে ইমরান: ১৬৫।
৫৪৩ আল মুহরিরুল ওয়াজিজ: ৩/৪১১।
৫৪4 ফি যিলালিল কুরআন: ১/৫১৯।
৫৪৫ আবু ফারিস প্রণীত গাযওয়ায়ে উহুদ: ৫১।
৫৪৬ ইবনে সাআদ প্রণীত তাবাকাতে কুবরা: ২/৪৭।
📄 গাযওয়ায়ে উহুদে মুসলিম নারীরা
গাযওয়ায়ে উহুদের শুরুতে মুসলিম নারীরা অংশগ্রহণ করেছিলেন। বেশ ক'জন সাহসী নারী তাদের ঈমানী পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়ে বিশেষ সম্মানে ভূষিত হয়েছিলেন। তারা পিপাসুদের পানি পান করানো ও আহতদের দেখাশোনা করার কাজে ঘর থেকে বেরিয়েছিলেন। রসূলুল্লাহ সা.-এর ওপর মুশরিকদের হামলা প্রতিহত করতে তাদের কেউ কেউ লড়াই করেছিলেন। গাযওয়ায়ে উহুদে অংশগ্রহণকারী নারীদের মধ্যে ছিলেন উম্মুল মুমিনীন আয়েশা, উম্মে উমারা, হামনা বিনতে জাহাশ, উম্মে সালিত ও উম্মে সুলাইমসহ বেশ কয়েকজন আনসারী নারী। ৫৪৭
সালাবা ইবনে আবু মালেক রা. বলেন, একবার ওমর ইবনুল খাত্তাব রা. মদীনার নারীদের মধ্যে কিছু চাদর বণ্টন করছিলেন। সব চাদর দিয়ে দেওয়ার পর উন্নতমানের একটি চাদর অবশিষ্ট রয়ে গেলো। উপস্থিত ব্যক্তিদের কেউ বললেন, হে আমীরুল মুমিনীন, এই চাদরটি আল্লাহর রসূলের নাতনীকে দিয়ে দিন। যিনি আপনার সাথে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ। অর্থাৎ, তারা এই চাদরটি আলী-এর মেয়ে উম্মে কুলসুমকে দেওয়ার জন্য অনুরোধ করছিলেন। উত্তরে ওমর রা. বলেন, না, উম্মে সালিত এই চাদরটি পাওয়ার বেশি উপযুক্ত একজন আনসারী নারী যিনি রসূলুল্লাহ সা.-এর হাতে বায়আত হয়েছিলেন। গাযওয়ায়ে উহুদের দিন ইনি আমাদের জন্য মশক ভরে পানি এনেছিলেন। ৫৪৮
টিকাঃ
৫৪৭ আস সীরাতুন নববিয়্যাহ আসসহীহাহ: ২/৩৮৭।
৫৪৮ সহীহ বুখারী: ৪০৭১।
📄 গাওয়ায় উহুদে নারীদের পানি পান করানো
আনাস রা. বলেন, গাযওয়ায়ে উহুদে সাহাবীরা রসূল সা.-এর কাছ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়লেন। আমি দেখলাম, আয়েশা বিনতে আবু বকর ও উম্মু সুলাইম রা. তাদের আঁচল এতটুকু উঠিয়ে নিয়েছেন যে, আমি তাদের উভয় পায়ের গহনা দেখছিলাম। তারা দুজনেই পানির মশক ভরে ভরে সাহাবীদের মুখে ঢেলে দিচ্ছিলেন। পানি শেষ হয়ে গেলে আবার মশক ভরে পান করাচ্ছিলেন। ৫৪৯
কাআব ইবনে মালেক রা. বলেন, আমি উম্মে সুলাইম ও আয়েশা রা.-কে গাযওয়ায়ে উহুদের দিন পিঠে করে পানির পাত্র বহন করতে দেখেছি। হামনা বিনতে জাহাশ পিপাসুদের পানি পান করাতেন এবং আহতদের ব্যান্ডেজ করে দিতেন। আহতদের পানি পান করাতেন উম্মে আইমান রা.। ৫৫০
টিকাঃ
৫৪৯ সহীহ বুখারী: ২৮৮০।
৫৫০ ওয়াকেদী প্রণীত মাগাযী: ১/২৪৯।