📄 রসূলুল্লাহ সা. ও তার সঙ্গীদের সাথে আবু সুফিয়ানের কথোপকথন
বারা ইবনে আযেব রা. বলেন, গাযওয়ায়ে উহুদ শেষে আবু সুফিয়ান এক দিক থেকে এসে জিজ্ঞেস করেন, তোমাদের মধ্যে কি মুহাম্মাদ আছেন? রসূলুল্লাহ সা. তার আশেপাশের লোকদের বলেন, তোমরা তার কথার উত্তর দিয়ো না। তিনি আবার প্রশ্ন করেন, তোমাদের মধ্যে কি ইবনে আবী কুহাফা তথা আবু বকর রা. আছেন? রসূলুল্লাহ সা. আবারও তার উত্তর দিতে নিষেধ করেন। অতঃপর তিনি জিজ্ঞেস করেন, তোমাদের মধ্যে কি খাত্তাব-এর ছেলে অর্থাৎ, ওমর ইবনুল খাত্তাব আছেন? मुसलमानों পক্ষ থেকে কোনো উত্তর না এলে তিনি বলেন, নিঃসন্দেহে এরা সবাই যুদ্ধে নিহত হয়েছে। তার এ কথা শুনে ওমর ইবনুল খাত্তাব রা. আর চুপ থাকতে পারলেন না। তিনি বললেন, হে আল্লাহর শত্রু! তুমি মিথ্যা বলছো। আল্লাহ তোমাকে লাঞ্ছিত করার জন্য এদের এখনও বাঁচিয়ে রেখেছেন।
আবু সুফিয়ান বললেন, হে হুবল! (মূর্তির নাম) তুমি পরাক্রান্ত হও। সাহাবায়ে কেরাম আরজ করলেন, হে আল্লাহর রসূল! আমরা কী বলে তার উত্তর দেবো? রসূলুল্লাহ সা. বলেন, 'তোমরা বলো, আল্লাহ সর্বশ্রেষ্ঠ ও সর্বোচ্চ।' এ কথা শুনে আবু সুফিয়ান বলেন, আমাদের 'উজ্জা' নামক মূর্তি রয়েছে, তোমাদের কোনো 'উজ্জা' নেই। রসূলুল্লাহ সা. তার কথার উত্তর দেওয়ার নির্দেশ দিলে সাহাবায়ে কেরام রা. তাকে জিজ্ঞাসা করেন, আমরা কী বলে তার উত্তর দেবো? রসূলুল্লাহ সা. বলেন, তোমরা বলো, 'আল্লাহ আমাদের অভিভাবক, তোমাদের কোনো অভিভাবক নেই।'
আবু সুফিয়ান বললেন, আজকের দিন বদরের দিনের প্রতিশোধ। যুদ্ধের জয়-পরাজয় পালাক্রমে হয়ে থাকে। অতঃপর আবু সুফিয়ান ওমর রা.-কে সম্বোধন করে বললেন, তোমাদের নিহতদের কিছু লাশ বিকৃত করা হয়েছে। বিশ্বাস করো, আমি তা করতে নির্দেশ দেইনি, নিষেধও করিনি। আবার এ কাজে আমি খুশিও নই, অসন্তুষ্টও নই।
এক বর্ণনায় পাওয়া যায়, তার এ কথার উত্তরে ওমর রা. বলেছিলেন, আমরা তোমাদের সমান নই। আমাদের নিহতরা জান্নাতী আর তোমাদের নিহতরা জাহান্নামী।
রসূলুল্লাহ সা.-এর ব্যাপারে প্রশ্ন করার পর আবু সুফিয়ানের আবু বকর ও ওমর রা.-এর ব্যাপারে প্রশ্ন করায় এ কথার স্পষ্ট ইঙ্গিত পাওয়া যায় যে, মুশরিকরা আবু বকর ও ওমর রা.-এর ব্যক্তিত্বকে কতটা গুরুত্ব দিতো। তারা অনুধাবন করতো এই দুই মহান ব্যক্তি ইসলামের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ইসলামের ভিত তাদের মাধ্যমে সুদৃঢ় ছিল। তারা একথাও বিশ্বাস করতো যে, এদের শহীদ করে দিতে পারলে ইসলামের আর নাম-নিশানা থাকবে না।
রসূলুল্লাহ সা. প্রথমে আবু সুফিয়ানের কথার উত্তর দিতে নিষেধ করেছিলেন তাকে লজ্জা দেওয়ার জন্য। সবাই নিহত হয়েছে মনে করে সে যখন আনন্দে আত্মহারা হলো, তখন তাকে বাস্তবতা সম্পর্কে জানানো হয়। তার আনন্দে ভাটা পড়ে যায়। ৫১৪
আবু সুফিয়ানের এ জাতীয় কথাবার্তার ব্যাপারে ইবনুল কাইয়্যিম রহ. বলেন, রসূলুল্লাহ সা. সাহাবায়ে কেরামকে তখন উত্তর দিতে বলেছিলেন, যখন তারা নিজেদের ধারণা অনুযায়ী তাদের দেব-দেবীদের গুণকীর্তন ও আল্লাহ তাআলার সাথে শিরকের ব্যাপারে অহংকার প্রকাশ করছিল। রসূলুল্লাহ সা. চেয়েছিলেন, আল্লাহ ও তার একত্বের শ্রেষ্ঠত্বের কথা সাহাবায়ে কেরামের মুখে ঘোষিত হোক। তিনি কাফেরদের বোঝাতে চেয়েছিলেন যে, মুসলমানরা যার ইবাদত করেন মূলত তিনি সকল সম্মানের মালিক এবং সর্বশক্তিমান। তাকে পরাজিত করা যায় না এবং আমরা মুসলমানরা তার বাহিনী।
যখন আবু সুফিয়ান বলেছিলেন, তোমাদের মধ্যে কি মুহাম্মাদ জীবিত রয়েছে? আবু বকর জীবিত আছে? উমর জীবিত আছে? তখন রসূলুল্লাহ সা. তার উত্তর দিতে নিষেধ করেছিলেন। বলেছিলেন, তোমরা তার কথার উত্তর দিও না। কেননা, মুসলমানদের বিপুল পরিমাণে হতাহত করতে পারলেও मुसलमानों বিরুদ্ধে কাফেরদের ক্রোধ তখনো কমেনি। কিন্তু যখন সে তৃপ্তির ঢেকুর তুলে তার সঙ্গীদের একথা বলে আশ্বস্ত করছিল যে, مسلمانوں যাবতীয় শক্তি ফুরিয়ে গেছে, তখন ওমর ইবনুল খাত্তাব রা.- এর ঈমানী চেতনা জেগে ওঠে। তিনি ক্রদ্ধ ভঙ্গিতে আবু সুফিয়ানের কথার জবাবে বলেন, হে আল্লাহর শত্রু! তুমি মিথ্যা বলছো। তার এ বক্তব্যের উদ্দেশ্য ছিল মূলত কাফেরদের লাঞ্ছিত করা এবং নিজেদের বীরত্বের কথা জানান দেওয়া। তিনি শত্রুদের বুঝিয়ে দিয়েছিলেন যে, মুসলমানদের মধ্যে এখনো তোমাদের সাথে লড়াই করার শক্তি-সাহস আছে। আমি ও আমার সঙ্গীরা তোমাদের ভয়ে ভীত নই।
তাদের জীবিত থাকার সংবাদ দেওয়ার মাধ্যমে কাফেরদের মধ্যে ভয়ের সঞ্চার করাও উদ্দেশ্য ছিল।
আলোচ্য তিন মহান ব্যক্তি সম্পর্কে আবু সুফিয়ানের জানতে চাওয়া এবং নিজের বাহিনীকে তাদের মৃত্যুসংবাদ দেওয়াটা ছিল তাদের একটা রণকৌশল। নবীজি তাদের এই ধূর্ততার শেষ কোথায় তা দেখার জন্য অপেক্ষা করছিলেন। তারা যখন তাদের কৌশলের শেষপ্রান্তে, তখন ওমর রা. সময়োচিত জবাব দিয়েছেন। প্রথমে তাদের উত্তর না দেওয়া যতটা উপকারী ছিল, শেষ পর্যায়ে এসে তাদের উত্তর দেওয়াটা ঠিক ততটাই উপকারী ও যথাযথ ছিল। প্রথম সে যখন প্রশ্ন করছিল, তখন নিরুত্তর থেকে তাকে এক প্রকার অপমান করা হয়েছিল। যখন সে তাদের নিহত হবার মনগড়া স্বপ্ন দেখে আনন্দে বিভোর হলো, তখন উত্তর দিয়ে তার মোহ ভেঙ্গে দেওয়া হয়।
এ পর্যায়ে এসে ওমর রা.-এর পক্ষ থেকে জবাব দেওয়া রসূলুল্লাহ সা.-এর পক্ষ হতে জবাব না দেওয়ার নির্দেশের বিরোধী ছিল না। কেননা, যখন এক এক করে তাদের প্রত্যেকের ব্যাপারে প্রশ্ন করা হয়েছিল, তখন রসূলুল্লাহ সা. নির্দেশটি দিয়েছিলেন। কিন্তু যখন তারা তিনজন শহীদ হয়েছেন মনে করে সে আনন্দের জোয়ারে ভাসছিল, তখন রসূলুল্লাহ সা. উত্তর দিতে নিষেধ করেননি।
সুতরাং বোঝা যায়, প্রথমে সুফিয়ানের কথার উত্তর না দেওয়াটা যেমন উপকারী কৌশল ছিল, তদ্রূপ শেষ দিকে তার কথার জবাব দেওয়া ততটাই উপকারী ছিল। ৫১৫
টিকাঃ
৫১৪ আস সীরাতুন নববিয়্যাহ আসসহীহাহ: ২/৩৯২।
৫১৫ যাদুল মাআদ: ৩/২২৫-২২৬।
📄 রসূল সা. শহীদদের খোঁজখবর নিলেন
আবু সুফিয়ান তার নিজ বাহিনী নিয়ে রণাঙ্গন ত্যাগের পর রসূলুল্লাহ সা. তার সঙ্গীদের খোঁজখবর নিতে শুরু করেন। অনেকের লাশের সামনে তিনি দাঁড়ান। যাদের মধ্যে হামযা ইবনে আবদুল মুত্তালিব, মুসআব ইবনে উমায়ের, হানযালা ইবনে আবী আমের, সাআদ ইবনে রবী ও উসাইরিমসহ অন্যান্য সাহাবায়ে কেরাম ছিলেন। তিনি শহীদদের লাশ দেখে বললেন, 'আমি এঁদের সম্পর্কে সাক্ষ্য দিচ্ছি যে, আল্লাহর পথে যে-ই আঘাত পেয়েছে, কেয়ামতের দিন আল্লাহ যখন তাকে পুনর্জীবিত করবেন, তখন তার ক্ষতস্থান থেকে রক্ত ঝরতে থাকবে। সে রক্তের রং থাকবে রক্তেরই মতো আর ঘ্রাণ হবে মৃগনাভির মত। তোমরা দেখো, এদের মধ্যে কে বেশি কুরআন হিফয করেছিল, তাকে আগে কাফন পরাও। ৫১৬
সহীহ বুখারীর বর্ণনায় জাবের ইবনে আবদুল্লাহ রা. হতে বর্ণিত; তিনি বলেন, রসূলুল্লাহ সা. উহুদযুদ্ধের শহীদগণের দুজনকে একই কাপড়ে কাফন পরিয়েছিলেন। কবরে নামানোর সময় তিনি জিজ্ঞেস করতেন, এদের মধ্যে কে অধিক কুরআন জানে? যার দিকে ইশারা করা হতো তিনি তাকেই কবরে আগে নামাতেন এবং বলতেন, কেয়ামতের দিন আমি তাদের জন্য সাক্ষী হবো। তাদেরকে রক্তসহ দাফন করা হয়েছিল, তাদের জানাযা পড়ানো হয়নি এবং তাদেরকে গোসলও দেওয়া হয়নি। ৫১৭
জাবের থেকে আরও বর্ণিত আছে, রসূলুল্লাহ সা. তাদের সবাইকে নিজ নিজ শাহাদাতের স্থানে দাফন করার আদেশ দিয়েছিলেন। তাই যাদের মৃতদেহ শাহাদাতের স্থান থেকে সরানো হয়েছিল, তাদেরকে আবার শাহাদাতের স্থানে নিয়ে দাফন করা হয়।
মুসলমানরা যখন রসূলুল্লাহ সা.-কে অত্যন্ত মর্মাহত ও চাচার সাথে কৃত পাশবিক আচরণের কারণে বিক্ষুব্ধ ও বিচলিত দেখলো, তখন তারাও প্রতিজ্ঞা করলো, কোনো সময় কুরায়েশদের বিরুদ্ধে বিজয়ী হলে তারা তাদের লাশ এমনভাবে বিকৃত করবে যার কোন নজীর আরবের ইতিহাসে নেই। আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস বলেন, রসূলুল্লাহ সা. ও তার সাহাবীগণের ওই প্রতিজ্ঞা প্রসঙ্গেই আল্লাহ এই আয়াত নাযিল করেন : ৫১৮
وَإِنْ عَاقَبْتُمْ فَعَاقِبُوا بِمِثْلِ مَا عُوْقِبْتُمْ بِه وَ لَئِنْ صَبَرْتُمْ لَهُوَ خَيْرٌ لِلصَّبِرِينَ
আর যদি তোমরা শাস্তি দাও, তবে ঠিক ততটুকু শাস্তি দাও যতটুকু তোমাদের দেয়া হয়েছে। আর যদি তোমরা সবর কর, তবে তাই সবরকারীদের জন্য উত্তম। ৫১৯
মুশরিকরা মুসলমান শহীদদের লাশ বিকৃত করতে গিয়ে তাদের পেট কেটে, নাক ও কান কর্তন করে আবার কারও কারও লজ্জাস্থান কেটে চূড়ান্ত পর্যায়ের হিংস্রতা প্রদর্শন করে। ৫২০
তারপরও রসূলুল্লাহ সা. ও সাহাবায়ে কেরام ধৈর্যের পরিচয় দিয়েছিলেন। আল্লাহর নির্দেশ অনুযায়ী উত্তম পথই অবলম্বন করেন। রসূল সা. সাহাবীদের লাশ বিকৃত করতে নিষেধ করে দেন এবং কসমের কাফফারা আদায় করেন।
হযরত সামুরা ইবনে জুনদুব রা.-এর সূত্রে ইবনে আসাকির উল্লেখ করেছেন, রসূলুল্লাহ সা. যখনই আমাদের উপদেশ দিতে দাঁড়াতেন, তখনই দান-সদকা করার কথা বলতেন এবং লাশ বিকৃত করতে নিষেধ করতেন। ৫২১
টিকাঃ
৫১৬ সহীহ আসসীরাতুন নববিয়্যাহ: ২৯১।
৫১৭ সহীহ বুখারী: ৪০৭৯।
৫১৮ সীরাতে ইবনে হিশাম: ৩/১০৬।
৫১৯ সুরা নাহল: ১২৬।
৫২০ আবু ফারিস প্রণীত গাযওয়ায়ে উহুদ : ১০৪।
৫২১ সীরাতে ইবনে হিশাম: ৩/১০৭।
📄 গাযওয়ায়ে উহুদে দিন নবীজির দোআ
গাযওয়ায়ে উহুদের দিন নবীজি সা. যোহরের নামায বসে পড়িয়েছিলেন। অতিরিক্ত রক্তক্ষরণ হওয়ায় তিনি খুবই দুর্বল হয়ে পড়েছিলেন। সাহাবায়ে কেরামও রসূলুল্লাহ সা.-এর পেছনে বসে নামায আদায় করেন। নামাযের পর রসূলুল্লাহ সা. আল্লাহ তাআলার প্রশংসাবাণী উচ্চারণের পর আল্লাহর পক্ষ থেকে আসা পরীক্ষা ও বিপদাপদের ব্যাপারে আল্লাহর কাছে দোআ করেন।
দোআ করতে গিয়ে তিনি সাহাবীদেরকে বলেন, তোমরা সোজা হয়ে বসো! যেন আমি আমার রবের প্রশংসা করতে পারি। সাহাবায়ে কেরাম রসূলুল্লাহ সা.-এর পেছনে সারিবদ্ধ হয়ে বসেন। নবীজি সা. দোআ করেন। ৫২২
দোয়ায় তিনি বলেন:
اللَّهُمَّ لَكَ الْحَمْدُ كُلُّهُ اللَّهُمَّ لَا قَابِضَ لِمَا بَسَطْتَ وَلَا بَاسِطَ لِمَا قَبَضْتَ وَلا هَادِيَ لِمَنْ أَضْلَلْتَ وَلا مُضِلَّ لِمَنْ هَدَيْتَ وَلَا مُعْطِيَ لِمَا مَنَعْتَ وَلَا مَانِعَ لِمَا أَعْطَيْتَ وَلَا مُقَرِّبَ لِمَا بَاعَدْتَ وَلَا مُبَاعِدَ لِمَا قَرَّبْتَ اللَّهُمَّ ابْسُطْ عَلَيْنَا مِنْ بَرَكَاتِكَ وَرَحْمَتِكَ وَفَضْلِكَ وَرِزْقِكَ اللَّهُمَّ إِنِّي أَسْأَلُكَ النَّعِيمَ الْمُقِيمَ الَّذِي لَا يَحُولُ وَلَا يَزُولُ اللَّهُمَّ إِنِّي أَسْأَلُكَ النَّعِيمَ يَوْمَ الْعَيْلَةِ وَالأَمْنَ يَوْمَ الْخَوْفِ اللَّهُمَّ إِنِّي عَائِذُ بِكَ مِنْ شَرِّ مَا أَعْطَيْتَنَا وَشَرَّ مَا مَنَعْتَنَا اللَّهُمَّ حَبَّبْ إِلَيْنَا الإِيمَانَ وَزِيَّنْهُ فِي قُلُوبِنَا وَكَرَّهُ إِلَيْنَا الْكُفْرَ وَالْفُسُوقَ وَالْعِصْيَانَ وَاجْعَلْنَا مِنَ الرَّاشِدِينَ اللَّهُمَّ تَوَفَّنَا مُسْلِمِينَ وَأَحْيِنَا مُسْلِمِينَ وَأَلْحِقْنَا بِالصَّالِحِينَ غَيْرَ خَزَايَا وَلَا مَفْتُونِينَ اللَّهُمَّ قَاتِلِ الْكَفَرَةَ الَّذِينَ يُكَذِّبُونَ رُسُلَكَ وَيَصُدُّونَ عَنْ سَبِيلِكَ وَاجْعَلْ عَلَيْهِمْ رِجْزَكَ وَعَذَابَكَ اللَّهُمَّ قَاتِلِ الكَفَرَةَ الَّذِينَ أُوتُوا الْكِتَابَ إِلَهَ الْحَقِّ
হে আল্লাহ, আপনার জন্যই সকল প্রশংসা। হে আল্লাহ, আপনি যাকে স্বচ্ছলতা দান করেন তাকে কেউ অভাবী বানাতে পারে না এবং যাকে অভাবী বানান তাকে কেউ স্বচ্ছলতা দিতে পারে না। যাকে আপনি পথভ্রষ্ট করে দেন, তাকে কেউ সঠিক পথের দিশা দিতে পারে না আর যাকে আপনি সঠিক পথের দিশা দেন, কেউ তাকে পথভ্রষ্ট করতে পারে না। যাকে আপনি না দেন তাকে কেউ দান করতে পারে না আর যাকে আপনি দান করেন তার প্রাপ্তিকে কেউ ঠেকিয়ে রাখতে পারে না। যাকে আপনি দূরে সরিয়ে দেন তাকে কেউ নিকটবর্তী করতে পারে না আর যাকে আপনি নিকটবর্তী করে দেন তাকে কেউ দূরে সরিয়ে দিতে পারে না। হে আল্লাহ, আমাদের ওপর আপনার বরকত, দয়া ও রিজিকের ভান্ডার খুলে দিন। হে আল্লাহ, আমরা আপনার কাছে চিরস্থায়ী নেয়ামত প্রার্থনা করছি; যা কখনও ধ্বংস হবে না, কখনও নিঃশেষ হবে না। হে আল্লাহ, আমরা আপনার কাছে বিজয়ের দিনে শান্তি, ও ভীতির দিনে নিরাপত্তা কামনা করছি।
হে আল্লাহ, আপনি যা কিছু আমাদের দিয়েছেন এবং যা কিছু আমাদের দেননি সবকিছুর অনিষ্ট থেকে আমরা আপনার কাছে আশ্রয় চাচ্ছি। হে আল্লাহ, আপনি আমাদের কাছে ঈমানকে প্রিয় বানিয়ে দিন এবং আমাদের কাছে ঈমানকে সুসজ্জিত করে উপস্থাপন করুন। কুফর ও অবাধ্যতাকে আমাদের চোখে মন্দ বানিয়ে দিন এবং আমাদেরকে হেদায়াতপ্রাপ্ত লোকদের অন্তর্ভুক্ত করে দিন। হে আল্লাহ, মুসলমান অবস্থায় আমাদের মৃত্যু দান করুন এবং মুসলমান হিসেবে আমাদের পুনরুত্থিত করুন। লাঞ্ছনা ও বঞ্চনা ছাড়াই আমাদের সৎকর্মপরায়নশীলদের অন্তর্ভুক্ত করুন, যারা কখনও ফেতনায় নিপতিত হয় না।
হে আল্লাহ, আপনি ওই কাফেরদের ধ্বংস করুন, তাদের ওপর শাস্তি নাজিল করুন, তাদের ব্যাপারে কঠোরতা আরোপ করুন; যারা আপনার নবীদের মিথ্যাপ্রতিপন্ন করে। আপনার পথে বাধা তৈরি করে। যারা আসমানি কিতাব পেয়েও আপনাকে অস্বীকার করে তাদের ধ্বংস করে দিন। ৫২৩
এরপর নবীজি সা. নিজের বাহনে আরোহণ করে মদীনার দিকে রওনা হন। ৫২৪
রসূলুল্লাহ সা. আল্লাহ তাআলার দরবারে দোআর মাধ্যমে উম্মতের সামনে একটি আদর্শ উপস্থাপন করেছিলেন, তারা যেন সাহায্য ও সামর্থ্য আল্লাহ তাআলার কাছে চায়। তিনি তার উম্মতকে বোঝাতে চেয়েছেন যে, বিজয়ে ও পরাজয়ে আল্লাহর কাছে দোআ করা জরুরি। কেননা, দোআ সকল ইবাদাতের মূল। বিপদ দূরীভূত করা এবং উঁচু লক্ষ্য অর্জনের বড় মাধ্যম হচ্ছে আল্লাহ তাআলার দরবারে দোআ। দোআর মাধ্যমে মানুষ আত্মিকভাবে তার স্রষ্টার সাথে সম্পর্ক তৈরি করতে সক্ষম হয়। এতে তার মধ্যে স্থিরতা আসে। এর মাধ্যমে এমন আত্মিক শক্তি তৈরি হয় যা মানুষের চিন্তা ও পরিকল্পনাকে উন্নত করে এবং আল্লাহ তাআলার নেয়ামতসমূহের প্রতি আগ্রহী করে।
রসূলুল্লাহ সা. যুদ্ধ শেষে আল্লাহর প্রশংসার জন্য প্রস্তুতি নিয়ে সাহাবায়ে কেরামকে সারিবদ্ধভাবে বসান। নিঃসন্দেহে প্রতিকূল-অনুকূল সর্বাবস্থায় আল্লাহ তাআলার প্রশংসা করাই ঈমানের আলামত। দোআর মাধ্যমে আল্লাহর প্রিয় বান্দারা মাবুদের সামনে আনুগত্য প্রকাশ করেন, আল্লাহর মর্যাদা ও বড়ত্ব ঘোষণা করেন।৫২৫
টিকাঃ
৫২২ আবু শাহবা প্রণীত আসসীরাতুন নববিয়াহ ২/২১০।
৫২৩ মাজমাউজ জাওয়াইদ: ২/১২১-১২২।
৫২৪ আস সীরাতুন নববিয়্যাহ আসসহীহাহ: ২/৩৯৪।
৫২৫ সুয়ার ওয়া ইবার মিনাল জিহাদিন নববী ফিল মাদিনাহ: ১৩২-১৩৩।
📄 শত্রু বাহিনীর কৌশল সম্পর্কে রসূলুল্লাহ সা. অবহিত হলেন
কুরায়েশ বাহিনী ময়দান ত্যাগ করে রওয়ানা হয়ে যাবার পর রসূলুল্লাহ সা. আলী রা.-কে এই বলে পাঠালেন যে, 'ওদের পেছনে পেছনে গিয়ে লক্ষ করো, ওরা কোথায় যায় এবং কি করে। তারা যদি অশ্বপালকে দক্ষিণ দিকে নিয়ে যায় এবং উটে আরোহণ করে তাহলে বুঝতে হবে, তারা মক্কা অভিমুখে চলেছে। আর যদি ঘোড়ায় আরোহণ করে ও উট টেনে নিয়ে যায় তাহলে বুঝতে হবে তারা মদীনার উদ্দেশ্যে যাত্রা করেছে। আল্লাহর শপথ, তারা মদীনা আক্রমণ করতে চাইলে আমি তাদের দিকে সৈন্য নিয়ে এগিয়ে যাবো এবং প্রতিরোধ করবো।' আলী রা. বলেন, আমি তাদের অনুসরণ করলাম। দেখলাম, তারা অশ্বপাল নিয়ে দক্ষিন দিকে যাচ্ছে এবং উটে চড়ে মক্কা অভিমুখে যাত্রা করেছে।৫২৬
আলী রা. ফিরে এসে রসূলুল্লাহ সা.-কে বিস্তারিত জানান।
এ ঘটনা দ্বারা আমরা যেসব শিক্ষা পাই, তা হলো: রসূলুল্লাহ সা. সব সময় শত্রুপক্ষের গতিবিধির ওপর কঠোর দৃষ্টি রেখেছেন এবং তাদের পরিকল্পনা জানার চেষ্টা করেছেন। শত্রুরা যদি মদীনার ওপর আক্রমণ করতো, তাহলে তারা কঠিন প্রতিরোধের মুখোমুখী হতো। এই ঘটনায় আমরা আলী রা.-এর বীরত্বেরও পরিচয় পাই। এমন ভয়াবহ পরিস্থিতিতে শত্রুবাহিনীর অবস্থা পর্যবেক্ষণ করে খোঁজ খবর নিয়ে আসা সহজ ছিল না। শত্রুর হাতের নাগালে পড়লে তারা তাকে হত্যা করতে দ্বিধা করতো না। ৫২৭
যুদ্ধ শেষে নবীজি সা. আহত ও নিহতদের অবস্থা সম্পর্কে খোঁজ খবর নিয়ে যুদ্ধের ময়দানে থেকে শহীদগণের লাশ দাফন করার ব্যবস্থা করেছেন এবং আল্লাহর প্রশংসা করেছেন এবং তার কাছে দোআ করেছেন। এ সময় তিনি আলী রা.-কে শত্রুর অবস্থা জানার জন্য পাঠান। এসব তৎপরতার মাধ্যমে রসূলুল্লাহ সা. এই যুদ্ধে مسلمانوں সফলতাসমূহ সংরক্ষণ করতে চেয়েছিলেন। আল্লাহ তাআলা জয় ও পরাজয়ের কারণসমূহ নির্ধারণ করে রেখেছেন। তাই যে ব্যক্তি বিজয় ও সাহায্যপ্রাপ্ত হওয়ার কারণসমূহ অবলম্বন করবে এবং আল্লাহ তাআলার ওপর পরিপূর্ণ আস্থা রাখবে, আল্লাহ তাআলা নিঃসন্দেহে তাকে বিজয়ী হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করবেন। আল্লাহ তাআলা বলেন:
سُنَّةَ اللَّهِ الَّتِي قَدْ خَلَتْ مِنْ قَبْلُ وَلَنْ تَجِدَ لِسُنَّةِ اللَّهِ تَبْدِيلًا
তোমাদের পূর্বে যারা গত হয়েছে তাদের ব্যাপারে এটি আল্লাহর নিয়ম; আর তুমি আল্লাহর নিয়মে কোন পরিবর্তন পাবে না। ৫২৮
রসূলুল্লাহ সা. কীভাবে সাহায্যপ্রাপ্তির পন্থা নির্ণয় করেছিলেন, গাযওয়ায়ে হামরাউল আসাদের আলোচনা দ্বারাও আমরা অনেকটা আঁচ করতে পারি।
টিকাঃ
৫২৬ আল বিদায়া ওয়ান নিহায়া: ৪/৪১।
৫২৭ আবু ফারিস প্রণীত গাযওয়ায়ে উহুদ : ৯৫-৯৬।
৫২৮ সুরা ফাতাহ : ২৩।