📄 নবীজির মুজিযা
ক. কাতাদা ইবনে নোমানের চোখের উপাখ্যান
গাযওয়ায়ে উহুদে শত্রুসেনাদের আক্রমণে কাতাদা ইবনে নোমান রা.-এর চোখে মারাত্মক আঘাত লাগে। চোখ বেরিয়ে গালের ওপর ঝুলে গড়ে। রসূলুল্লাহ সা. নিজের পবিত্র হাতে তার চোখ কোটরে প্রবেশ করিয়ে দেন এবং তার জন্য প্রার্থনা করেন। তখন কাতাদা রা.-এর সেই চোখটি অন্য চোখের চাইতে অধিক তীক্ষ্ণ ও সতেজ হয়ে যায়। পরবর্তীকালে তিনি চোখ ওঠার ব্যাধিতে আক্রান্ত হলেও রসূলুল্লাহ সা.-এর হাতের স্পর্শ পাওয়া সেই চোখটি কখনও ব্যাধিগ্রস্থ হতো না। ৫১০
কাতাদা ইবনে নোমান-এর পুত্র একবার খলিফাতুল মুসলিমিন উমর ইবনে আবদুল আযীয রহ-এর কাছে যান। পরিচয় জানতে চাইলে তিনি নিজের পরিচয় দেন এই কবিতা বলে:
أنا ابن الذي سالت على الخد عينه فردت بكف المصطفى أحسن الرد فعادت كما كانت لأول أمرها فيا حُسْنَها عينا ويا حُسْنُ ما خد
আমি সেই ব্যক্তির পুত্র যার চোখ ঝুলে তার গালের ওপর পড়েছিল। এরপর মুস্তাফা সা. নিজ হাতে সুন্দরভাবে সেটি যথাস্থানে পুনঃস্থাপন করেছিলেন। এরপর সেটি হয়ে গেলো তেমন যেমনটি ছিল ইতোপূর্বে। কী চমৎকার ওই চোখ! কী চমৎকার ওই গণ্ডদেশ। তখন উমর ইবনে আবদুল আযীয রহ. বলেন,
تِلْكَ الْمَكَارِمُ لا قَعْبَانِ مِنْ لَبَنٍ شِيبًا بِمَاءٍ فَعَادَا بَعْدُ أَبْوَالا
সেইসব কীর্তি দুই পেয়ালা পানি মিশ্রিত দুধ নয় যে পরে মূত্রে পরিণত হবে। তারপর তিনি তাদের অভ্যর্থনা জানান এবং তাকে মূল্যবান উপঢৌকন প্রদান করেন। ৫১১
খ. উবাই ইবনে খালাফের মৃত্যু
উবাই ইবনে খালাফ মক্কায় রসূলুল্লাহ সা.-এর সাথে দেখা হলে বলতেন, হে মুহাম্মাদ, আমার একটা ঘোড়া আছে। তার নাম 'আওজ'। তাকে আমি প্রতিদিন এক ফারাক (৪০ কেজি) ভুট্টা খাওয়াই। এই ঘোড়ায় চড়েই আমি তোমাকে হত্যা করবো। রসূলুল্লাহ সা. জবাব দিতেন, 'বরং আল্লাহ চাইলে আমিই তোমাকে হত্যা করবো।'
উহুদের দিন রসূলুল্লাহ সা. যখন পর্বতের ঘাঁটিতে বিশ্রাম নিচ্ছিলেন তখন উবাই ইবনে খালাফ সেখানে পৌঁছলো। সে বললো, হে মুহাম্মাদ, এ যাত্রা তুমি বাঁচবে না। মুসলমানরা বললেন, ইয়া রসূলাল্লাহ, এ লোকটিকে সহানুভূতি দেখানো কি আমাদের কারো জন্য ঠিক হবে? রসূলুল্লাহ সা. বললেন, 'ওকে আসতে দাও।' সে রসূলুল্লাহ সা.-এর কাছে গেলে তিনি হারেস ইবনে সিম্মারের কাছ থেকে বর্শা নিলেন। কোনো কোনো বর্ণনানুসারে, বর্শা হাতে নেয়ার পর রসূলুল্লাহ সা. এমনভাবে ঘোরালেন যে, আমরা ছত্রভঙ্গ হয়ে দূরে সটকে পড়লাম। অতঃপর রসূলুল্লাহ সা. তার দিকে এগিয়ে গেলেন এবং তার ঘাড়ের ওপর বর্শার আঘাত হানলেন। আঘাত খেয়ে উবাই ইবনে খালাফ ঘোড়ার পিঠ থেকে ছিটকে পড়লো এবং মাটিতে গড়াগড়ি খেলো।
রসূলুল্লাহ সা.-এর আঘাতে উবাইয়ের কাঁধে যে জখমটি হয়েছিল, সেটা তেমন গুরুতর জখম না হলেও তা থেকে রক্ত ঝরছিল। ওই অবস্থাতেই সে কুরায়েশদের কাছে ফিরে গিয়ে বললো, আল্লাহর কসম, মুহাম্মাদ আমাকে খুন করেছে। কুরায়েশরা বললো, আসলে তুমি অতিমাত্রায় ঘাবড়ে গেছো। তোমার কোনো ভয় নেই। সে বললো, মক্কায় থাকাকালেই মুহাম্মাদ আমাকে বলেছিল, তোমাকে আমিই হত্যা করবো। এখন আমার আশংকা হয়, সে যদি আমার দিকে শুধু থুথুও নিক্ষেপ করতো তা হলেও আমি মরে যেতাম। কুরায়েশরা তাকে নিয়ে মক্কা অভিমুখে রওনা হলো। পথিমধ্যে সারেফ নামক স্থানে আল্লাহর এই দুשমনের জীবনলীলা সাঙ্গ হয়। ৫১২
আলোচ্য ঘটনায় নবীজির বীরত্বের একটি দৃষ্টান্ত পাওয়া যায়। উবাই ইবনে খালাফ পরিপূর্ণ অস্ত্রসজ্জিত হয়ে বর্ম পরিধান করে রসূলুল্লাহ সা.-এর সামনে উপস্থিত হয়েছিল। তবুও রসূলুল্লাহ সা. তার শিরস্ত্রাণ ও বর্মের মধ্যবর্তী স্থান কাঁধে আঘাত করতে সক্ষম হন যা আল্লাহর রসূলের সামরিক যোগ্যতার প্রমাণ বহন করে। এ ঘটনা রসূলুল্লাহ সা.-এর একটি মু'জিযা। রসূলুল্লাহ সা. উবাই ইবনে খালাফকে অতীতে সতর্ক করেছিলেন যে, তিনি তাকে হত্যা করবেন। সেটি বাস্তবায়িত হয়েছিল। শুধু তাই নয়, উবাই ইবনে খালাফের বক্তব্য থেকে বোঝা যায়, মুশরিকরাও রসূলুল্লাহ সা.-কে সত্যবাদী হিসেবে জানতো। তাদের বিশ্বাস ছিল, রসূলুল্লাহ সা. যা বলেন, তা অবশ্যই কার্যকর হয়। তবুও তাদের অবাধ্যতা ও প্রবৃত্তিপূজা তাদেরকে ইসলাম থেকে দূরে সরিয়ে রাখতো। ৫১৩
হাসসান ইবনে সাবেত এই ঘটনাটিকে কবিতায় বলেছেন,
সে তার পিতার কাছ থেকে পেয়েছে ভ্রান্তির উত্তরাধিকার
উবাই সেদিন রসূল সা.-এর সাথে দ্বন্দ্ব যুদ্ধে লিপ্ত হলো
তুমি এলে তার দিকে বড় বর্শা হাতে নিয়ে
তাকে হুমকি দিলে অথচ তুমি তার সম্পর্কে কিছুই জানো না
টিকাঃ
৫১০ আত তারীখুল ইসলামী: ৫/১৬৯।
৫১১ আল বিদায়া ওয়ান নিহায়া: ৪/৩৫।
৫১২ সীরাতে ইবনে হিশাম: ৩/৯৩-৯৪।
৫১০ 'আত তারীখুল ইসলামী: ৫/১৬৯।