📄 উহুদের শহীদরা
ক. শ্রেষ্ঠ শহীদ হামযা ইবনে আবদুল মুত্তালিব রা.
শত্রু বাহিনীর ওপর সেদিন আল্লাহর সিংহ হযরত হামযা রা. ভয়াবহ আক্রমণ করেছিলেন। বহু কাফেরকে জাহান্নামে পৌছে দেন তিনি। কাফেরদের পতাকাবাহী আবদুদ্দার গোত্রের লোকদের ওপর আক্রমণ করে তিনি তাদের কয়েকজনকে হত্যা করেন। সেদিন হামযার বীরত্ব ও সাহসিকতা ইতিহাসের পাতায় স্বর্ণাক্ষরে লেখা আছে। তাকে হত্যার জন্য ওত পেতে ছিল ওয়াহশী। হযরত হামযা রা. তার তীরের নিশানায় আসার সঙ্গে সঙ্গে সে তাকে হত্যা করলো।
এ ঘটনার বিবরণ দিতে গিয়ে ওয়াহশী বলেন, বদরযুদ্ধে হামযা রা. তুআইমা ইবনে আদি ইবনে খিয়ারকে হত্যা করেছিলেন। তাই আমার মনিব যুবায়ের ইবনে মুতয়িম আমাকে বললেন, তুমি যদি আমার চাচার বদলা হিসেবে হামযাকে হত্যা করতে পারো তাহলে তুমি মুক্ত। যে বছর উহুদ পর্বত সংলগ্ন আইনাইন পর্বতের উপত্যকায় যুদ্ধ হয়েছিল, সে যুদ্ধে আমি সবার সঙ্গে বেরিয়ে যাই। লড়াইয়ের জন্য সকলে সারিবদ্ধ হলে সিবা নামক এক ব্যক্তি ময়দানে এসে বললো, মল্লযুদ্ধের জন্য কেউ প্রস্তুত আছো কি?
ওয়াহশী বলেন, হামজা তাকে দেখে হুংকার ছাড়লেন, "আয় আমার কাছে, মজা দেখাই!” এই বলেই তাকে আঘাত হানলেন। কিন্তু তার মাথায় আঘাত লাগলো না বলে মনে হলো। আমি হামযার দিকে আমার বর্শা তাক করলাম। লক্ষ্য ঠিক হয়েছে বলে যখন নিশ্চিত হলাম, তখন বর্শাটি ছুঁড়ে মারলাম তার দিকে। বর্শা তার তলপেটে গিয়ে বিদ্ধ হলো এবং দুই উরুর মাঝখান দিয়ে বেরিয়ে পড়লো।
ওয়াহশী বলেন, এটাই হলো তার শাহাদাতের মূল ঘটনা। অতঃপর আমি মক্কাতেই বসবাস করতে লাগলাম। রসূলুল্লাহ সা. মক্কা জয় করলে আমি পালিয়ে তায়েফে গিয়ে অবস্থান করতে লাগলাম। কিন্তু তায়েফ থেকে একদল প্রতিনিধি ইসলাম গ্রহণের জন্য রসূলুল্লাহ সা.-এর কাছে গেলে আমি দিশেহারা হয়ে গেলাম। বুঝে উঠতে পারছিলাম না যে, কোথায় যাবো। ভাবলাম, সিরিয়া কিংবা ইয়েমেনে চলে যাবো। কেননা সেখানে আমি নিশ্চিন্তে থাকতে পারবো। ইতোমধ্যে এক ব্যক্তি আমাকে বললো, মুহাম্মাদ সা. ইসলাম গ্রহণ করলে এবং কালেমায়ে শাহাদাত পড়লে কাউকেই হত্যা করেন না। এ কথা শুনে আমি রসূলুল্লাহ সা.-এর নিকট গেলাম। তিনি আমার উপস্থিতি এবং তার সামনে দাঁড়িয়ে আমাকে সত্য দীনের প্রতি আনুগত্য ঘোষণা করতে দেখে বিস্ময়ে অভিভূত হয়ে গেলেন। চোখ তুলে একবার আমর দিকে তাকিয়ে বললেন, 'বসো। তুমি কীভাবে হামযাকে হত্যা করেছিলে আমাকে বলো।' আমি তার কাছে ঘটনাটি আদ্যোপান্ত বর্ণনা করলাম। সব শুনে রসূলুল্লাহ সা. বললেন, 'তুমি কখনো আমার সামনে আসবে না। আমি যেন তোমাকে না দেখি।' ওয়াহশী বলেন, তখন আমি চলে এলাম। রসূলুল্লাহ সা.-এর ইনতেকালের পর মুসায়লামাতুল কায্যাব আবির্ভূত হলে আমি বললাম, আমি অবশ্যই মুসায়লামার বিরুদ্ধে যুদ্ধে অবতীর্ণ হবো এবং তাকে হত্যা করে হামযা রা.-কে হত্যা করার ক্ষতি পূরণ করবো।
ওয়াহশী বলেন, এক সময় আমি দেখলাম, হালকা কালো বর্ণের উটের মতো উস্কোখুস্কো চুলবিশিষ্ট এক ব্যক্তি একটি ভগ্ন দেয়ালের আড়ালে দাঁড়িয়ে আছে। তখন সঙ্গে সঙ্গে আমি আমার বর্শা দ্বারা তার ওপর আঘাত করলাম এবং তার বুকের ওপর এমনভাবে বসিয়ে দিলাম যে, তা তার দু-কাঁধের মাঝ দিয়ে বেরিয়ে গেলো। এরপর আনসারী এক সাহাবী এসে তার ওপর ঝাঁপিয়ে পড়লেন এবং তরবারি দিয়ে তার মাথার খুলিতে খুব জোরে আঘাত করলেন। আবদুল্লাহ ইবনে ফাযল রহ. বর্ণনা করেন, সুলাইমান ইবনে ইয়াসির রহ. আমাকে জানিয়েছেন, তিনি আবদুল্লাহ ইবনে ওমর রা.-কে বলতে শুনেছেন, ঘরের ছাদে একটি বালিকা বলছিল; হায়, হায়, আমিরুল মুমিনীন (মুসায়লামাহ)-কে এক কালো দাস হত্যা করেছে। ১৪৭০
খ. হামযার শাহাদাতস্থলের ব্যাপারে নবীজির জিজ্ঞাসা
গাযওয়ায়ে উহুদ শেষে রসূলুল্লাহ সা. তার সঙ্গীদের জিজ্ঞেস করলেন, 'হামযা রা.-এর শাহাদাতস্থল কেউ দেখেছো কি?' জনৈক ব্যক্তি বললো, হে আল্লাহর রসূল! আমি সেই স্থান দেখেছি। রসূলুল্লাহ সা. বলেন, 'চলো, আমাকেও সেই জায়গাটি দেখাও।' রসূলুল্লাহ সা. সেখানে যান। তিনি হামযার মৃতদেহের পাশে উপস্থিত হয়ে দেখেন, তার বুক চিরে কলিজা বের করা হয়েছে এবং নাক কান কেটে তার লাশ বিকৃত করা হয়েছে। ১৪৭১
এক বর্ণনায় এসেছে, যখন নবীজিকে হামযার শাহাদাতের সংবাদ দেওয়া হয়, তখন তিনি কাঁদতে থাকেন এবং হামযার লাশের কাছে পৌঁছে হেঁচকি দিয়ে কেঁদে উঠেন। ৪৭২
এরপর রসূলুল্লাহ সা. উহুদের শহীদদের মাঝখানে দাঁড়িয়ে বলেন, 'আমি এদের জন্য আল্লাহর দরবারে সাক্ষী। তাদেরকে রক্তসহ কাফন দিয়ে দাও। কেননা, আল্লাহর রাস্তায় যে কোনো ধরনের আঘাত কেয়ামতের দিন সে অবস্থায় রক্তাক্তভাবে উত্থিত হবে। বাহ্যিকভাবে সে সবের রঙ রক্তের মতো লাল হলেও সুগন্ধির দিক থেকে মৃগনাভির মতো হবে। যে কুরআনে কারীম বেশি অংশ পাঠ করেছে, গণকবর দেওয়ার ক্ষেত্রে তাকে প্রথমে দাফন করবে।
হামযা ও অন্যান্য সাহাবীর শাহাদাতের মাধ্যমে রসূলুল্লাহ সা.-এর সেই দুঃস্বপ্ন ব্যাখ্যা বাস্তবায়িত হয় যা তিনি উহুদ প্রান্তরে রওনা হওয়ার পূর্বে সাহাবীদের শুনিয়েছিলেন। তিনি তাদের বলেছিলেন, 'আমি স্বপ্নে দেখেছি, আমার তরবারি যুলফিকারে কিছু ফাটল দেখা দিয়েছে। যার ব্যাখ্যায় আমি বলেছি, তোমাদের মধ্যে কিছু পরাজয়ের নমুনা দেখা দেবে। আমি দেখেছি, আমার পেছনে একটি ছাগলের বাচ্চা আরোহণ করিয়ে নিয়েছি। এর ব্যাখ্যায় বলেছি, দলের সরদার। আমি স্বপ্নে দেখেছি, আমি একটি সংরক্ষিত বর্ম পরিধান করে রয়েছি। এর ব্যাখ্যায় বলেছি, এটা মদীনা। এরপর আমি দেখলাম, বেশ কিছু গরু জবাই করা হচ্ছে। পরে আমি দেখলাম আরও কিছু গরু। আল্লাহ কল্যাণ করুন। এরপর আরও কিছু গরু জবাই করা হচ্ছে।' রসূলুল্লাহ সা. স্বপ্নের কথা যেমনটি বলেছিলেন হুবহু তেমনই ঘটেছিল।
খ. ভাইয়ের শাহাদাতে বোন সাফিয়ার ধৈর্যধারণ
যুবায়ের ইবনুল আওয়ام রা. বলেন, উহুদযুদ্ধের দিন একজন নারী দৌড়ে শহীদদের মৃতদেহের কাছাকাছি চলে যাচ্ছিলেন। রসূল সা. চাচ্ছিলেন না নারীরা শহীদদের লাশের বিকৃত দৃশ্য দেখুক। তাই তিনি নির্দেশ দেন, 'তোমরা নারীদের বাঁধা দাও, নারীদের বাঁধা দাও।' যুবায়ের বলেন, আমি চিনতে পারলাম যে, তিনি সাফিয়া। তাই দৌড়ে তার কাছে গেলাম এবং শহীদদের লাশের কাছে পৌছার পূর্বেই তাকে ধরে ফেললাম। তিনি অত্যন্ত শক্তিশালী মহিলা ছিলেন। আমাকে সজোরে ধাক্কা দিয়ে বললেন, আমার পথ থেকে সরে যাও। আমি তাকে বললাম, রসূলুল্লাহ সা. তোমাদেরকে বাঁধা দেওয়ার নির্দেশ দিয়েছেন।
রসূলুল্লাহ সা.-এর নির্দেশের কথা শুনে তিনি থমকে দাঁড়ালেন এবং নিজের কাছে সংরক্ষিত দুটি কাপড় বের করে বললেন, আমার কাছে আমার ভাইয়ের শাহাদাতের সংবাদ পৌঁছেছে। আমি এ দুটি কাপড় তার কাফনের জন্য এনেছি।
যুবায়ের ইবনুল আওয়ام রা. বলেন, আমরা তার কাছ থেকে দুটি কাপড় হামযার কাফনের জন্য নিয়ে নিলাম। তার মৃতদেহের কাছে পৌঁছে আমরা দেখতে পেলাম, তার পাশেই আরেকজন আনসারী সাহাবীর মৃতদেহ বীভৎস অবস্থায় পড়ে আছে। হযরত হামযার কাফনের জন্য দুটি কাপড় আর আনসারী সাহাবীর জন্য একটি কাপড়ও নেই-আমাদের সেটা ভালো লাগেনি। তাই আমরা একটি কাপড় হামযা ও অপরটি আনসারী সাহাবীকে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিলাম। উভয় কাপড়ের একটি অপরটির চাইতে বড় হওয়ায় আমরা লটারির মাধ্যমে নির্ধারণ করে তাদের কাফন পরাই এবং দাফন করি। ৪৭৩
গ. সাফিয়া রা.-এর শোক-কবিতা
হামযা রা.-এর শোকে সাফিয়া রা. নিন্মোক্ত কবিতা পাঠ করেন:
أسائلة أصحاب أحد مخافة بنات أبي من أعجم وخبير فقال الخبير إن حمزة قد ثوى وزير رسول الله خير وزير دعاه إله الحق ذو العرش دعوة إلى جنة يحيا بها وسرور فذلك ما كنا نرجي ونرتجي الحمزة يوم الحشر خير مصير فوالله لا أنساك ما هبت الصبا بكاء وحزنا محضري ومسيري على أسد الله الذي كان مدرها يذود عن الإسلام كل كفور فيا ليت شلوي عند ذاك وأعظمي لدى أضبع تعتادني ونسور أقول وقد أعلى النعي عشيرتي جزى الله خيرا من أخ ونصر
আমার বাবার মেয়েরা! ভয়ে ভয়ে উহুদ যুদ্ধের শহীদানদের কথা জিজ্ঞেস করছে জ্ঞাত-অজ্ঞাত সবাইকে।
তখন যে ব্যক্তি ওয়াকিফহাল সে বললো, হামযা রা. তো রসূলুলাহ সা.-এর উযীর রূপে নিয়োগ পেয়েছেন।
সত্য নাযিলকারী মাবুদ আরশের মালিক মাবুদ তাকে ডেকেছেন জান্নাতের দিকে। তিনি সেখানে জীবিত থাকবেন এবং আনন্দে মগ্ন থাকবেন।
আমরা হযরত হামযা রা.-এর জন্যে এটাই কামনা করেছিলাম যে, হাশর দিবসে তিনি সর্বোত্তম বাসস্থানের অধিকারী হবেন।
আল্লাহর কসম! পূবাল হাওয়া যত দিন প্রবাহিত হবে ততদিন আমি তোমাকে ভুলবো না। আমার নিজ দেশে এবং সফর অবস্থায় সর্বাবস্থায় আমি তোমার জন্যে কাঁদবো ও শোক প্রকাশ করবো।
আমি কাঁদব এমন ব্যক্তির শোকে যিনি আল্লাহর সিংহ। যিনি নেতা; ইসলামের উপর আগত সকল কাফেরী আক্রমণ যিনি প্রতিহত করতেন।
হায় আমার দেহ ও হাঁড় যদি ওই ব্যক্তির নিকট থাকতো যিনি প্রচণ্ড আক্রমণকারী ও বাজপাখী।
আমার প্রতিবেশীগণ তাঁর মৃত্যু সংবাদ ঘোষণা করছে আর আমি বলছি যে, আমার ওই ভাই ও সাহায্যকারীকে মহান আল্লাহ উত্তম পুরস্কার ও বিনিময় দান করুন। ৪৮৪
ঘ. 'হামযার জন্য কোনো ক্রন্দনকারিনী নেই'
রসূলুল্লাহ সা. যখন উহুদ থেকে ফিরলেন, তখন শুনলেন আনসারী নারীরা কাঁদছে। রসূল সা. বললেন, 'হামযার জন্য কোনো ক্রন্দনকারিনী নেই!' আনসারী সাহাবীদের কাছে রসূলুল্লাহ সা.-এর এই কথা পৌঁছলে তারা হামযার জন্যেও কাঁদলেন। এরপর রসূল সা. ঘুমিয়ে পড়লেন। ঘুম থেকে উঠেও রসূল সা. দেখলেন, তারা কাঁদছে। রসূলুল্লাহ সা. তখন বললেন, 'তাদের জন্যে আফসোস, তারা এতো দিন ধরে মৃত ব্যক্তির জন্য এভাবে কান্নাকাটি করে আসছে-তাই আজ কাঁদুক। আজকের পর তারা যেন আর কখনও কোনো মৃত ব্যক্তির জন্য না কাঁদে। ৪৮৫
এভাবেই মৃত ব্যক্তির জন্য বিলাপ করা হারাম হয়ে যায়।
ঙ. নবীজি সা. এক আনসারী শিশুর নাম রাখলেন 'হামযা'
জাবের ইবনে আবদুল্লাহ রা. বর্ণনা করেন, আমাদের আনসারদের একজনের শিশুপুত্রের জন্ম হলো। তিনি রসূলুল্লাহ সা.-এর কাছে নামকরণের জন্য পরামর্শ চাইলে রসূলুল্লাহ সা. বলেন, 'তোমরা নতুন ভূমিষ্ঠ বাচ্চাটির নাম আমার সর্বাধিক প্রিয় হামযার নামে রেখো।'৪৭৬
দীর্ঘদিন পর্যন্ত হামযা রা.-এর জন্য রসূল সা.-এর মন কাঁদতে থাকে। বার বার তার কথা বলতেন তিনি। অবশ্য পরে আল্লাহ তার সর্বাধিক প্রিয় নামের ব্যাপারে জানিয়ে দেন। তখন রসূল সা. সাহাবীদের উদ্দেশে বলেন, 'আল্লাহর কাছে সর্বাধিক প্রিয় নাম হচ্ছে, আবদুল্লাহ ও আবদুর রহমান।'৪৭৭
চ. তুমি কি আমার সামনে না-এসে থাকতে পারো!৪৭৮
রসূলুল্লাহ সা. ওয়াহশীকে বলেছিলেন, 'এমন কি হতে পারে যে, তুমি আমার সামনে আসবে না?' এই নিষেধ তার প্রতি কোনো বিদ্বেষপ্রসূত ছিল না বা তার অন্যায়ের জন্য তাকে অনুশোচনায় দগ্ধ করার উদ্দেশ্যেও ছিল না। বরং ওয়াহশী রসূলুল্লাহ সা.-এর সামনে এলে তাকে দেখে হামযার শাহাদাতের হৃদয়বিদারক দৃশ্য নবীজির মনে পড়ে যেতো বিধায় তিনি তাকে সামনে আসতে নিষেধ করেছিলেন। হত্যার পর তার লাশ বিকৃতির স্মৃতিগুলোও তার মনে পড়তো। এ কারণে তিনি ওয়াহশীকে তার সামনে না আসার পরামর্শ দেন।৪৭৯
আরেক বর্ণনায় এসেছে, ওয়াহশী বলেন, আমি নবীজির কাছে এলে তিনি আমাকে জিজ্ঞেস করলেন, 'তুমি কি ওয়াহশী?' আমি ইতিবাচক উত্তর দিলে তিনি বললেন, 'তুমি কি হামযাকে শহীদ করেছিলে?' আমি বললাম, হ্যাঁ, আল্লাহর কৃতজ্ঞতা আদায় করছি যে, তিনি আমার হাতে হামযাকে সম্মানিত করেছেন এবং আমাকে তিনি লাঞ্ছিত তথা কুফুরি অবস্থায় নিহত হওয়া থেকে বাঁচিয়েছেন।
কুরায়েশ গোত্রের লোকেরা বললো, এই লোক হামযাকে শহীদ করেছে এর পরও কি আপনি তাকে ভালোবাসেন? আমি রসূলুল্লাহ সা.-এর কাছে নিবেদন করলাম, হে আল্লাহর রসূল! আমার জন্য মাগফিরাতের দোআ করুন। রসূলুল্লাহ সা. তিনবার মাটিতে থুতু নিক্ষেপ করেন এবং তিনবার আমার বুকে ধাক্কা দেন এবং বলেন, 'হে ওয়াহশী, যাও, আল্লাহর রাস্তায় এমন বীরত্বের সাথে লড়াই করো, যেভাবে তুমি আল্লাহর পথে বাধা দেওয়ার জন্য লড়তে।'
রসূলুল্লাহ সা. এভাবেই ক্ষমা পাওয়ার পথ দেখিয়ে দিয়েছিলেন। রসূলুল্লাহ সা. তাকে ইসলামের পক্ষে যুদ্ধে অংশগ্রহণ করতে উৎসাহ দেন। এরই ফলাফল আমরা দেখতে পাই, ওয়াহশীর হাতে ইয়ামামার মুসায়লামা কাযযাবের নিহত হওয়ার ঘটনায়।
বিষয়টি ওয়াহশীও অনুধাবন করতেন। তাই তিনি মুসায়লামা কাযযাবকে হত্যা করার পর বলেছিলেন, আমি ইসলাম গ্রহণের পূর্বে সর্বশ্রেষ্ঠ মানুষ হামযা ইবনে আবদুল মুত্তালিব রা.-কে শহীদ করেছিলাম। ইসলাম গ্রহণের পর সর্বনিকৃষ্ট মানুষ মুসায়লামা কায্যাবকে জাহান্নামে পাঠিয়েছি। ৪৮০
ছ. মুসআব ইবনে উমায়েরের শাহাদাত
খাব্বাব বলেন, আমরা আল্লাহর সন্তুষ্টি কামনা করে রসূলুল্লাহ সা.-এর সঙ্গে মদীনায় ফিরছিলাম। আমাদের মধ্যে অনেকে শহীদ হয়েছিলেন। তারা তাদের বিনিময়ের কিছুই ভোগ করে যাননি। তাদেরই একজন মুসআব ইবনে উমায়ের রা.। আর আমাদের মধ্যে অনেকে এমনও আছেন, যাঁদের প্রতিদানের ফল পরিপক্ক হয়েছে। আর তারা তা ভোগ করছেন। মুসআব রা. উহুদের দিন শহীদ হয়েছিলেন। আমরা তাকে কাফন পরানোর জন্য শুধু একটি চাদর পেয়েছিলাম; যা দিয়ে তার মাথা ঢেকে দিলে দু-পা বাইরে থাকতো আর তার দু-পা ঢেকে দিলে মাথা বাইরে থাকতো। রসূলুল্লাহ সা. আমাদের নির্দেশ দিয়েছিলেন, তার মাথা ঢেকে দাও আর পায়ের ওপর ইযখির (এক প্রকার ঘাস) দিয়ে দাও। ৪৮১
আবদুর রহমান ইবনে আউফের বর্ণনায় এসেছে: এক দিন রোযাদার অবস্থায় আবদুর রহমান ইবনে আউফ রা.-এর সামনে খাবার আনা হলো। তিনি বললেন, 'মুসআব ইবনে উমায়ের আমার চেয়ে শ্রেষ্ঠ ছিলেন। তিনি শহীদ হওয়ার পর তার কাফনের জন্য একটি চাদর ছাড়া আর কিছুই পাওয়া যায়নি। হামযা রা. বা আমার চেয়ে উত্তম অপর এক ব্যক্তি শহীদ হওয়ার পর তার কাফনের জন্যেও একটি চাদর ছাড়া কিছু পাওয়া যায়নি। আমার ভয় হয়, আমাদের নেক আমলের বিনিময় এ পার্থিব জীবনেই দিয়ে দেওয়া হচ্ছে কি না!' অতঃপর তিনি কাঁদতে লাগলেন। ৪৮২
আবু হুরায়রা রা.-এর বর্ণনায় এসেছে: রসূলুল্লাহ সা. গাযওয়ায়ে উহুদ থেকে ফেরার সময় পথিমধ্যে মুসআব ইবনে উমায়েরের মৃতদেহ পড়ে থাকতে দেখেন। রসূলুল্লাহ সা. তার মৃতদেহের পাশে কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকেন এবং তাঁর জন্য আল্লাহর দরবারে প্রার্থনা করেন। এরপর তিনি এ আয়াত তিলাওয়াত করেন:
مِنَ الْمُؤْمِنِينَ رِجَالٌ صَدَقُوا مَا عَاهَدُوا اللَّهَ عَلَيْهِ فَمِنْهُمْ مَّنْ قَضَى نَحْبَهُ وَ مِنْهُمْ مَّنْ يَنْتَظِرُ وَ مَا بَدَّلُوا تَبْدِيلًا
মুমিনদের মধ্যে কতক লোক আল্লাহর সঙ্গে কৃত তাদের অঙ্গীকার সত্যে পরিণত করেছে। তাদের কতক উদ্দেশ্য বাস্তবায়ন (শাহাদাত বরণ) করেছে আর তাদের কতক অপেক্ষায় আছে। তারা (তাদের সংকল্প) কখনো তিল পরিমাণ পরিবর্তন করেনি। ৪৮৩
তারপর রসূলুল্লাহ সা. বলেন, 'আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি এরা কেয়ামতের দিন আল্লাহর দরবারে শহীদ হিসেবে উপস্থিত হবেন। তোমরা তাদের কাছে এসো এবং তাদের কবর যিয়ারত কোরো। ওই সত্তার শপথ যার হাতে আমার জীবন, কেয়ামত পর্যন্ত যারা তাদের সালাম দেবে, তারা তাদের সালামের উত্তর দেবে। '৪৮৪
জ. সাআদ ইবনে রবী রা.-এর শাহাদাত
রসূলুল্লাহ সা. সাআদ ইবনে রবী রা.-কে কুরায়েשদের মক্কা থেকে বের হওয়ার সংবাদ গোপন রাখতে বলেছিলেন। তিনি তাকে অত্যন্ত ভালোবাসতেন। গাযওয়ায়ে উহুদের পর তিনি উপস্থিত লোকদেরকে বললেন, 'সাআদ ইবনে রাবীর সন্ধান নিয়ে দেখো, সে মৃত, না জীবিত।' রসূলুল্লাহ সা. তাকে বর্শার আঘাতপ্রাপ্ত হতে দেখেছিলেন। উবাই ইবনে কাব বললেন, হে আল্লাহর রসূল! আমি আপনার কাছে তার খবর নিয়ে আসছি। রসূলুল্লাহ সা. বলেন, 'যদি তুমি সাআদ ইবনে রাবিকে জীবিত দেখো, তাহলে আমার পক্ষ থেকে সালাম দিয়ে তাকে বলো, রসূলুল্লাহ সা. জিজ্ঞেস করেছেন, তুমি কেমন অনুভব করছো।' উবাই ইবনে কাব অবশেষে তাকে নিহতদের মাঝে মারাত্মক আহত ও মুমূর্ষু অবস্থায় পেলেন। তাকে বললেন, রসূলুল্লাহ সা. আমাকে হুকুম দিয়েছেন তুমি বেঁচে আছো না মারা পড়েছো তা দেখতে। সাআদ বললেন, আমি বারোটি আঘাত পেয়েছি এবং প্রায় মরেই গেছি। রসূলুল্লাহ সা.-কে আমার সালাম জানিয়ে বোলো, সাআদ জান্নাতের সুবাস পাচ্ছে। আমার গোত্রের আনসারদের আমার সালাম পৌঁছে দিয়ে বোলো, সাআদ ইবনে রবী বলেছে, তোমাদের একটি লোকও জীবিত থাকতে তোমাদের নবীর কাছে যদি দুশমন পৌঁছতে পারে, তাহলে আল্লাহর কাছে তোমরা কোনো সাফাই পেশ করতে পারবে না।
উবাই ইবনে কাব বলেন, এ কথা বলার কিছুক্ষণের মধ্যেই সাআদ মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়লেন। ৪৮৫
জীবনের শেষ মুহূর্তে মুমূর্ষু অবস্থায়ও আল্লাহর রসূল সা.-এর প্রতি কল্যাণকামিতা তার ঈমানী চেতনা ও রসূলুল্লাহ সা.-এর হাতে কৃত বায়আতের প্রতি পরিপূর্ণ বিশ্বস্ততার প্রমাণ বহন করে। মৃত্যু ও আঘাতের যন্ত্রণা তার ঈমানী চেতনার ওপর কোনো প্রভাব ফেলতে পারেনি।
ঝ. আবদুল্লাহ ইবনে জাহাশ রা.-এর শাহাদাত
সাআদ ইবনে আবী ওয়াক্কাস রা. বলেন, গাযওয়ায়ে উহুদের দিন আমাকে আবদুল্লাহ ইবনে জাহাশ রা. বললেন, তুমি আল্লাহর কাছে দোআ করছো না কেন? এরপর তারা উভয়ে একটি নির্জন জায়গায় গেলেন এবং সাআদ রা. দোআ করলেন, হে আমার প্রতিপালক! আমি শত্রুদের সাথে মুখোমুখী হলে যেন সাহসী কোনো যোদ্ধার সাথে আমার মোকাবেলা হয়। আমি যেন অত্যন্ত শক্তিমত্তার সাথে তার সাথে যুদ্ধে লিপ্ত হতে পারি এবং সেও আমার বিরুদ্ধে যুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়ে। এরপর তার ওপর আমাকে বিজয়ী করুন আমি যেন তাকে হত্যা করতে পারি এবং তার সম্পদ নিয়ে নিতে পারি।
তার দোআ শুনে আবদুল্লাহ ইবনে জাহাশ রা. বললেন, 'আমিন'। এরপর আবদুল্লাহ ইবনে জাহাশ রা. দোআ করতে লাগলেন, হে আল্লাহ! রণাঙ্গনে কোনো সাহসী যোদ্ধার সাথে আমার মোকাবিলার সুযোগ করে দিন। যেন আমি আপনার দীনের জন্য তার ওপর আক্রমণ করতে পারি এবং সেও আমার ওপর আক্রমণ করে। সে যেন আমাকে কাবু করে ফেলে এবং আমাকে হত্যা করে আমার নাক, কান কেটে ফেলে। পরে যখন আমি কেয়ামতের দিন আপনার দরবারে উপস্থিত হবো, তখন যেন আপনি আমাকে প্রশ্ন করেন, তোমার নাক, কান কেন কেটে নেওয়া হয়েছে? আমি যেন উত্তরে বলতে পারি, আমি আমার নাক ও কান আপনার ও আপনার রসূলের পথে কাটিয়ে এসেছি। তখন আপনি উত্তরে বলবেন, তুমি সত্য বলেছো।
ওই দিনের দোআর এই বিবরণ সাআদ ইবনে আবী ওয়াক্কাস তার ছেলের সামনে বর্ণনা করে বলেন, হে আমার ছেলে! আবদুল্লাহ ইবনে জাহাশের দোআ আমার দোআর চেয়ে বহুগুণে উত্তম ছিল। সেদিন আমি দেখেছিলাম তার নাক ও কান কাফেররা কেটে নিয়ে একটি সুতোয় গেঁথে রেখেছে।
এই বর্ণনা থেকে বোঝা যায়, কাফেরদের হাতে নিহত হওয়া বা আল্লাহর জন্য জীবন উৎসর্গের দোআ করা জায়েয। ৪৮৬
ঞ. হানযালা রা.-এর শাহাদাতের হৃদয়বিদারক ঘটনা
শত্রুদের বিরুদ্ধে মুসলমানদের মোকাবিলা আরম্ভ হলে যুদ্ধের এক পর্যায়ে হানযালা রা. আবু সুফিয়ানের ঘোড়াকে আঘাত করেন। আবু সুফিয়ান মাটিতে পড়ে যায়। হানযালা রা. হুংকার দিয়ে তাকে হত্যার উদ্দেশ্যে তরবারি চালাবেন এমন সময় শাদ্দাদ ইবনে আসওয়اد নামক এক কুরায়েש যোদ্ধা হানযালার ওপর বর্শা নিয়ে আক্রমণ করে এবং বর্শাটি তার শরীরে ঢুকিয়ে দেয়। হানযালা বর্শাবিদ্ধ অবস্থায়ই তাকে আক্রমণ করার জন্য তার দিকে এগিয়ে যান। এ সময় সে দ্বিতীয় আঘাত করে তাকে হত্যা করে ফেলে। রসূলুল্লাহ সা. সাহাবীদের বলেন, 'তোমাদের বন্ধু হানযালাকে ফেরেশতারা রুপার পাত্রে গোসল করাচ্ছেন। তার স্ত্রীর কাছে জিজ্ঞাসা করো ঘটনা কী?' তার স্ত্রীর কাছ থেকে জানা যায়, তার ওপর গোসল ফরয ছিল। জিহাদের ডাক শোনার পর আর গোসল করার অবকাশ পাননি। তৎক্ষণাৎ রণাঙ্গনে চলে গিয়েছিলেন। এই কথা শুনে রসূলুল্লাহ সা. বললেন, 'এ জন্য ফেরেশতারা তাকে আলাদা করে গোসল দিচ্ছেন। ৪৮৭
ওয়াকেদী রহ. বর্ণনা করেন, হানযালার সাথে জামিলা বিনতে আবদুল্লাহ ইবনে উবাইয়ের বিয়ে হয়। বিয়ের পরদিনই সংঘটিত হয় গাযওয়ায়ে উহুদ। তিনি রসূলুল্লাহ সা.-এর কাছে এসে রাতে তার সাথে থাকার অনুমতি চাইলে রসূলুল্লাহ সা. তাকে অনুমতি দেন। ফজরের নামাযের পর তিনি রসূলুল্লাহ সা.- এর সাথে মিলিত হতে চাইলে তার স্ত্রী তাকে আরও কিছুক্ষণ কাছে পেতে চান। তখন তিনি কিছু সময় স্ত্রীর কাছে অবস্থান করেন। এ সময় জামিলা তার গোত্রের চারজন লোককে সাক্ষী বানিয়ে রাখেন যে, আমার স্বামী আমার সাথে অবস্থান করেছিল। পরবর্তীতে তার স্ত্রীকে জিজ্ঞেস করা হয়, আপনি কেনো সাক্ষী রেখেছিলেন? জামিলা বলেন, আমি স্বপ্নে দেখেছিলাম, আকাশ বিদীর্ণ হলো আর হানজালা সেই ফাটল দিয়ে প্রবেশ করলো। এরপর ফাটলটি মিলিয়ে গেলো। আমি বুঝতে পারলাম, এটা হানযালার শাহাদাতের দিকে ইশারা। এ কারণে আমি প্রমাণ রাখতে চাইলাম যে, হানযালা আমার সাথে থেকেছেন।
স্বামী-স্ত্রীর এ মিলনেই আবদুল্লাহ ইবনে হানযালা জন্ম নেন। পরবর্তীকালে তিনি সাআদ ইবনে কায়েসের সাথে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হলে তার ঔরসে জন্ম নেন মুহাম্মাদ ইবনে সাবিত। ৪৮৮
হানযালা রা.-এর শাহাদাতের ঘটনা দ্বারা আমরা যে শিক্ষা পাই:
১. অচিরেই হানযালা রা. শাহাদাতবরণ করবেন, এটা জামিলা তার স্বপ্নে দেখে নিজেই ব্যাখ্যা করেছিলেন। এমন পরিস্থিতিতে তার থেকে দূরে থাকার চেষ্টা করাই ছিল স্বাভাবিক। যেন তিনি তার দ্বারা গর্ভবতী না হয়ে পড়েন এবং পরবর্তী বিয়ের প্রস্তাবের ক্ষেত্রে কম আকর্ষণীয় না হন। কিন্তু জামিলা স্বামীর কাছে এই আশায় গিয়েছিলেন, হয়তো আল্লাহ তাকে এমন একজনের ঔরস থেকে একটি সন্তান দান করবেন, যিনি অচিরেই শাহাদাতের অমীয় সুধা পান করবেন। এতে তিনি হতে পারবেন একজন সৌভাগ্যবান মা।
জামিলার এই আশা পূরণ হয়েছিল। তিনি হানযালা থেকে গর্ভবতী হন এবং তার পুত্রের নাম রাখা হয় আবদুল্লাহ। আবদুল্লাহ রা.ও ছিলেন একজন মর্যাদাবান সাহাবী। তিনি গর্বভরে বলতেন, আমি 'ইবনু গাসীলিল মালাইকা' তথা এমন ব্যক্তির সন্তান, যাঁকে শাহাদাতের পর ফেরেশতারা গোসল দিয়েছিলেন।
২. আলোচ্য ঘটনা থেকে বোঝা যায়, হানযালা রা. শত্রুদের বিরুদ্ধে যুদ্ধে লিপ্ত হওয়ার কী অদম্য আগ্রহ পোষণ করতেন। জিহাদে দ্রুত অংশগ্রহণের জন্য ফরজ গোসল করারও সুযোগ পাননি তিনি।
৩. আলোচ্য ঘটনায় আমরা তার বীরত্ব ও সাহসিকতার দেখা পাই; তিনি একাই মুশরিকদের সেনাপতি আবু সুফিয়ানের ওপর আক্রমণ করেন। সাধারণত যে কোনো যুদ্ধেই সেনাপতিরা দেহরক্ষীদের দ্বারা পরিবেষ্টিত থাকে। এমন পরিস্থিতিতেই পদাতিক হানযালা অশ্বারোহী আবু সুফিয়ানের ওপর আক্রমণ করেন।
৪. আল্লাহ তাআলা তাকে এমন অনুপম মর্যাদা দান করেছিলেন যে, ফেরেশতারা তাকে অত্যন্ত বিশুদ্ধ পানি দ্বারা রুপার পাত্রে গোসল দিয়েছিলেন।
৫. হানযালা রা.-কে ফেরেশতা কর্তৃক গোসলদানের সংবাদ দেন রসূল সা.। এটি ছিল তার একটি মুজিযা। তিনি ফেরেশতা কর্তৃক গোসলদানের দৃশ্য দেখেছিলেন, যা সাহাবীরা দেখেননি। ৪৮৯
৬. ফেরেশতা কর্তৃক গোসলদানের মাধ্যমে বোঝা যায়, শহীদরা যদি গোসল ফরজ অবস্থায় শাহাদাতবরণ করেন, তাহলে তাকে গোসল দেওয়া জরুরি। ৪৯০
ট. আবদুল্লাহ ইবনে আমর ইবনে হারামের শাহাদাত
আবদুল্লাহ ইবনে আমর ইবনে হারাম রা. গাযওয়ায়ে উহুদে অংশগ্রহণের জন্য খুব আগ্রহী ছিলেন। নিজের ছেলে জাবেরকে বলেছিলেন, জাবের, এ যুদ্ধের ফলাফল আসা পর্যন্ত তুমি মদীনায় থাকবে। আল্লাহর শপথ! আমার মেয়েরা অসহায় হয়ে যাওয়ার ভয় যদি না থাকতো, তাহলে আমি চাইতাম আমার পূর্বেই আমার সামনে তুমি শহীদ হও। ৪৯১
আবদুল্লাহ ছেলেকে আরও বলেন, আমার আশা রসূলুল্লাহ সা.-এর সাহাবীদের মধ্যে আমি প্রথম শহীদ হবো। রসূলুল্লাহ সা.-এর পর আমি মনে করি তুমিই আমার সবচেয়ে প্রিয়। আমার যেসব ঋণ আছে, তা তুমি আদায় করে দিও এবং তোমার বোনদের সাথে উত্তম আচরণ কোরো। ৪৯২
আবদুল্লাহ ইবনে আমর ইবনে হারাম রা. مسلمانوں সঙ্গে গাযওয়ায়ে উহুদে অংশ নেন এবং আল্লাহর পথে শহীদ হন। জাবের তার বাবার শাহাদাতের বর্ণনা দিতে গিয়ে বলেন, আমার পিতা আবদুল্লাহ উহুদের দিন শাহাদাতবরণ করলে আমি বারবার তার মুখমণ্ডল থেকে কাপড় সরিয়ে তাকে দেখছিলাম এবং কান্নাকাটি করছিলাম। রসূলুল্লাহ সা.-এর সাহাবীরা আমাকে কান্নাকাটি করতে নিষেধ করেন। কিন্তু রসূলুল্লাহ সা. আমাকে নিষেধ করলেন না। আমার ফুফুও তার মৃতদেহ দেখে কান্নাকাটি করছিলেন। রসূলুল্লাহ সা. বলেন, তুমি কাঁদো বা না-ই কাঁদো তোমরা তাকে তুলে নেয়া পর্যন্ত ফেরেশতারা তাঁদের ডানা দিয়ে তার ওপর ছায়া বিস্তার করে রাখবেন। ৪৯৩
জাবের ইবনে আবদুল্লাহ বলেন, উহুদের যুদ্ধের দিন আবদুল্লাহ ইবনে আমর ইবনে হারাম রা. শহীদ হলে রসূলুল্লাহ সা. বলেন, হে জাবের! মহামহিম আল্লাহ তোমার পিতাকে যা বলেছেন তা কি আমি তোমাকে অবহিত করবো না? আমি বললাম, হ্যাঁ। তিনি বলেন, আল্লাহ তাআলা যার সাথেই কথা বলেছেন, পর্দার অন্তরাল থেকে বলেছেন, কিন্তু তোমার পিতার সাথে সামনাসামনি কথা বলেছেন। তিনি বলেছেন, হে আমার বান্দা! তুমি আকাঙ্ক্ষা করো, আমি তোমাকে দেবো। তিনি বললেন, হে আমার রব! আমাকে জীবিত করুন আমি পুনরায় আপনার রাস্তায় শহীদ হবো। আল্লাহ বলেন, আমার পক্ষ থেকে পূর্বেই এটা সাব্যস্ত হয়ে গেছে যে, এখানে আসার পর কেউ আর প্রত্যাবর্তন করবে না। তিনি বললেন, হে আল্লাহ! আমার পক্ষ থেকে পৃথিবীর মানুষদের এই সুসংবাদ পৌঁছে দিন। ৪৯৪
তখন মহান আল্লাহ এ আয়াত নাযিল করেন:
وَ لَا تَحْسَبَنَّ الَّذِينَ قُتِلُوا فِي سَبِيلِ اللَّهِ أَمْوَاتًا بَلْ أَحْيَاءُ عِنْدَ رَبِّهِمْ يُرْزَقُوْنَ
আর যারা আল্লাহর পথে জীবন দিয়েছে, তাদেরকে তুমি মৃত মনে করো না, বরং তারা তাদের রবের নিকট জীবিত। তাদেরকে রিযিক দেয়া হয়। ৪৯৫
গাযওয়ায়ে উহুদের আগে আবদুল্লাহ ইবনে আমর তার দেখা একটি স্বপ্নের বর্ণনা দিতে গিয়ে বলেন, আমি স্বপ্নে মুবাশ্বির ইবনে আবদুল মুনযিরকে দেখলাম। তিনি আমাকে বলছিলেন, তুমি অচিরেই আমাদের এখানে আসবে। আমি তাকে জিজ্ঞেস করলাম, তুমি কোথায় আছো? তিনি বললেন, আমরা জান্নাতে অবস্থান করছি। যেখানে আমরা নিজেদের ইচ্ছেমতো পানাহার করতে পারি এবং আসা-যাওয়া করতে পারি। আমি তাকে জিজ্ঞেস করলাম, তুমি তো বদরযুদ্ধে শহীদ হয়েছিলে। তিনি উত্তরে বলেন, অবশ্যই; কিন্তু এখানে আমাদের পুনরায় জীবন দান করা হয়েছে।
জাবের রা. এ স্বপ্নের কথাটি নবীজিকে জানালে তিনি বললেন, হে জাবিরের পিতা! নিঃসন্দেহে এটি শাহাদাতের মর্যাদা। ৪৯৬
আল্লাহ আপন অনুগ্রহে তার এই স্বপ্নটি বাস্তবায়ন করেন।
ঠ. খায়সামা আবু সাআদ রা.-এর শাহাদাত
খায়সামার ছেলে সাআদ রসূলুল্লাহ সা.-এর সাথে বদরযুদ্ধে অংশগ্রহণ করে শহীদ হন। খায়সামা বলেন, অনেক আগ্রহ সত্ত্বেও আমি বদরযুদ্ধে অংশগ্রহণ করতে পারিনি। আমি তাতে অংশগ্রহণের জন্য আমার ছেলের সাথে লটারি করি। লটারিতে তার নাম আসায় সে অংশগ্রহণ করে। বদরে সে শাহাদাতের সৌভাগ্য অর্জন করে। গত সন্ধ্যায় আমি আমার ছেলেকে স্বপ্নে অত্যন্ত ভালো অবস্থায় দেখতে পাই। আমি দেখলাম, সে জান্নাতের বাগান এবং ঝরনাসমূহে আনন্দে ঘুরে বেড়াচ্ছে। সে আমাকে বলছে, আপনি আমার কাছে চলে আসুন। আমাদের সাথে জান্নাতের সঙ্গী হোন। নিশ্চয়ই আল্লাহ তাআলা সত্য প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন।
স্বপ্নটি নবীজির সামনে উত্থাপন করে তিনি বললেন, ইয়া রসূলাল্লাহ! আমি আমার ছেলের সাথে জান্নাতের সঙ্গী হতে ইচ্ছুক। আমার অনেক বয়স হয়েছে। শক্তি-সামর্থ্য হ্রাস পেয়েছে। আমার প্রতিপালকের সাথে আমার সাক্ষাতের আকাঙ্ক্ষা প্রবল। ইয়া রসূলাল্লাহ! আপনি আল্লাহর দরবারে আমার শাহাদাতের জন্য দোআ করুন। রসূলুল্লাহ সা. তার অভিরুচি অনুযায়ী দোআ করলে আল্লাহ তা কবুল করেন। তিনি উহুদ যুদ্ধে শহীদ হন। ৪৯৭
ড. ওয়াহাব মুযানী ও তার ভাতিজার শাহাদাত
মুযাইনা গোত্রের পার্বত্যাঞ্চল থেকে নিজেদের ছাগলের পাল নিয়ে ওয়াহাব ইবনে কাবুস মুযানী ও তার ভাতিজা হারেস ইবনে উকবা ইবনে কাবুস মুযানী মদীনায় এসে দেখতে পান, মদীনা প্রায় জনশূন্য। তারা উভয়েই এ সম্পর্কে জিজ্ঞেস করে জানতে পারেন, রসূলুল্লাহ সা. মুশরিকদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করার জন্য উহুদ পাহাড়ের দিকে রওনা হয়েছেন। তারা রসূলুল্লাহ সা.-এর সাথে মিলিত হওয়ার জন্য উহুদ পাহাড়ের দিকে ছুটে যান। রসূলুল্লাহ সা.-এর সাথে তাদের এমন সময়ে সাক্ষাত ঘটে যখন মুসলমানরা বিজয়ের দিকে এগিয়ে যাচ্ছিলো। তারা উভয়ে যুদ্ধে অংশগ্রহণ করেন এবং গণিমতের সম্পদ একত্রিত করার কাজে লেগে যান। কিছুক্ষণের মধ্যেই যুদ্ধের চিত্র পাল্টে যায়। খালেদ ইবনে ওয়ালিদ-এর নেতৃত্বে কাফেরদের অশ্বারোহী বাহিনী مسلمانوں ওপর পেছন দিক থেকে আক্রমণ করে। যুদ্ধের ভয়াবহ সে পরিস্থিতিতে চাচা-ভাতিজা উভয়ে বীরত্বের সাথে লড়াই চালিয়ে যান।
শত্রুদের একটি দল যুদ্ধের জন্য সামনে এগিয়ে এলে রসূলুল্লাহ সা. বলেন, 'কে এই দলের মোকাবেলা করতে পারবে'? ওয়াহাব ইবনে কাবুস রা. বললেন, হে আল্লাহর রসূল! আমি পারবো। এ কথা বলে তিনি দক্ষতার সাথে তীর নিক্ষেপ করে দলটিকে তাড়িয়ে দিতে সক্ষম হন। তারপর ফিরে আসেন রসূলুল্লাহ সা.-এর কাছে। একটু পর শত্রুদের আরেকটি দল যুদ্ধের জন্য সামনে এগিয়ে এলে রসূলুল্লাহ সা. বলেন, 'কে এই দলের মোকাবেলা করবে'? ওয়াহাব ইবনে কাবুস রা. আবারও উত্তরে বলেন, হে আল্লাহর রসূল! আমি এদের মোকাবেলা করবো। তিনি দক্ষতার সাথে তীরন্দাজি করে এই দলটিকেও পিছু হটতে বাধ্য করেন। তারপর ফিরে আসেন রসূলুল্লাহ সা.-এর কাছে। একটু পর শত্রুদের আরেকটি দল সামনে এগিয়ে এলে রসূলুল্লাহ সা. বলেন, 'কে এই দলের মোকাবেলা করবে?' ওয়াহাব ইবনে কাবুস রা. আবারও উত্তরে বলেন, হে আল্লাহর রসূল! আমি এদের মোকাবেলা করবো। রসূলুল্লাহ সা. বলেন, 'যাও, এবং জান্নাতের সুসংবাদ নাও।'
রসূলুল্লাহ সা.-এর এ বাণী শুনে তিনি দাঁড়িয়ে বললেন, আল্লাহর শপথ! আমি নিজ প্রতিশ্রুতি পূরণ করা পর্যন্ত বিশ্রাম নেব না। এরপর তিনি শত্রুসেনাদের ভেতর প্রবেশ করেন এবং বীরদর্পে লড়াই চালিয়ে যান। রসূলুল্লাহ সা. মুসলমানদের রণদক্ষতা প্রত্যক্ষ করছিলেন। ইতোমধ্যে ওয়াহাব ইবনে মুযানী শত্রুসেনাদের ভেতরে প্রবেশ করেন এবং তাদের অতিক্রম করে শেষ প্রান্তে চলে যান। রসূলুল্লাহ সা. তার জন্য দোআ করেন: 'হে আল্লাহ, তাকে রহম করুন'।
ওয়াহাব ইবনে মুযানী শত্রুসেনাদের শেষ প্রান্ত থেকে আবার কাফেরদের ভেতরে ঢোকার জন্য পেছনে ফেরেন। কাফেররা তাকে হত্যা করার জন্য ওৎ পেতে ছিল। যখনই তিনি সামনের দিকে এগোলেন, তখনই সবাই সম্মিলিতভাবে বর্শা ও তরবারি নিয়ে তার ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ে এবং তাকে হত্যা করে ফেলে।
তিনি বিশটির বেশি তরবারির ভয়াবহ আঘাত পান। অত্যন্ত বীভৎসভাবে বিকৃত করা হয় তার শরীরকে। কিছুক্ষণ পর তার ভাতিজা হারেস ইবনে ওকবা রণাঙ্গনে ঝাঁপিয়ে পড়েন এবং বীরত্বের সাথে যুদ্ধ করতে করতে শহীদ হয়ে যান। ওমর ইবনুল খাত্তাব রা. বলেন, নিশ্চয়ই আমি আমার নিজের জন্য এমন শাহাদাত কামনা করি। ৪৯৮
বেলাল ইবনে হারেস মুযানী বলেন, সাআদ ইবনে আবী ওয়াক্কাসের সাথে আমরা কাদেসিয়ার যুদ্ধে অংশগ্রহণ করেছিলাম। আল্লাহর অনুগ্রহে আমরা বিজয় লাভ করি। যুদ্ধলব্ধ সম্পদ যোদ্ধাদের মধ্যে বণ্টনের সময় মুযাইনা গোত্রের কাবুস শাখার এক তরুণ গণিমতের সম্পদ থেকে বঞ্চিত হয়। সাআদ ইবনে আবী ওয়াক্কাস রা. ঘুম থেকে উঠলে আমি তার কাছে গেলাম। তিনি আমাকে জিজ্ঞেস করলেন, বেলাল? আমি বললাম, হ্যাঁ, আমি বেলাল।
সাআদ আমাকে স্বাগত জানিয়ে জিজ্ঞেস করলেন, তোমার সাথে এই তরুণ কে? আমি বললাম, সে আমার গোত্রের আলে কাবুস শাখার। সাআদ রা. তাকে জিজ্ঞেস করলেন, উহুদযুদ্ধে শাহাদাতবরণ করা মুযানী গোত্রের সাহাবীর সাথে তোমাদের কি আত্মীয়তার সম্পর্ক আছে? সে উত্তরে বললো, আমি তার ভাতিজা।
সাআদ ইবনে আবী ওয়াক্কাস বলেন, স্বাগতম, আল্লাহ তোমার চোখ শীতল করুন। আমি উহুদযুদ্ধের দিনে তোমার বংশের সেই সাহাবীর যে বীরত্ব দেখেছিলাম, আজ পর্যন্ত তেমন আর দেখিনি। আমরা সেদিন শত্রুসেনাদের আক্রমণের আওতায় ছিলাম। তারা আমাদের ঘিরে ফেলেছিল। আমাদের মধ্যখানে ছিলেন রসূলুল্লাহ সা.। শত্রুসেনারা চারদিক থেকে আমাদের ওপর আক্রমণ করছিল। রসূলুল্লাহ সা. লোকদের বললেন, 'শত্রু সেনাদের এ দলকে প্রতিহত করতে তোমাদের মধ্যে কে প্রস্তুত আছো'? এভাবে যখনই কাফের যোদ্ধাদের নতুন নতুন দল রসূলুল্লাহ সা.-এর ওপর আক্রমণের জন্য আসছিল তখন রসূলুল্লাহ সা. এভাবে তাদের প্রতিহত করার জন্য আহ্বান করছিলেন। প্রতিবারই সেই সাহাবী বলছিলেন, হে আল্লাহর রসূল! আমি তাদের প্রতিহত করতে প্রস্তুত।
শেষবার যখন সেই সাহাবী দাঁড়ালেন, আমার মনে পড়ে রসূলুল্লাহ সা. তখন বলছিলেন, 'জান্নাতের সুসংবাদ গ্রহণ করো।'
সাআদ ইবনে আবী ওয়াক্কাস রা. বলেন, অতঃপর আমি তার পেছনে গেলাম। আল্লাহ তাআলা জানেন, আমিও তার মতো শাহাদাত কামনা করছিলাম। আমরা শত্রুসেনাদের মধ্যে প্রবেশ করলাম এবং শেষ পর্যন্ত পৌছে ফিরে আসার সময় দুশমন তাকে ভয়ানকভাবে আক্রমণ করে শহীদ করে ফেলে। আল্লাহ তাআলা তার ওপর রহম করুন। আল্লাহর কসম! তার মতো শাহাদাতের মর্যাদা অর্জনের প্রবল আকাঙ্ক্ষা আমারও ছিল। কিন্তু আমি সেখানে শহীদ হতে পারলাম না।
সাআদ ইবনে আবী ওয়াক্কাস ওই যুবকের জন্য নির্ধারিত অংশ সংগ্রহ করলেন। তাকে তার চাইতে আরও কিছু বেশি দান করলেন। এরপর বললেন, তুমি যদি চাও তাহলে আমাদের এখানে আমাদের সাথে থাকতে পারো, আর যদি চাও তাহলে তুমি তোমার বাড়িতে ফিরে যেতে পারো। বেলাল বলেন, সে ফিরে যেতে চায়। এরপর আমরা চলে এলাম।
সাআদ ইবনে আবী ওয়াক্কাস রা. বলেন, রসূলুল্লাহ সা. ওয়াহাব ইবনে মুযীরের শাহাদাতের পর তার মৃতদেহের কাছে দাঁড়িয়ে বলেছিলেন, 'হে আল্লাহ! আপনি তার ওপর সন্তুষ্ট হোন। নিশ্চয়ই আমি তার ওপর সন্তুষ্ট।' তীব্র ব্যথার কারণে রসূল সা.-এর দাঁড়িয়ে থাকতে কষ্ট হচ্ছিলো। তবুও তাকে কবরস্থ করা পর্যন্ত দাঁড়িয়ে থাকেন।
সবুজ ডোরাকাটা একটি চাদর ছিল ওয়াহাব ইবনে মুযানী রা.-এর মৃতদেহের ওপর। রসূলুল্লাহ সা. সেই চাদর দিয়ে তার মাথার অংশ ঢেকে দেন। তাকে লম্বালম্বিভাবে কবরে নামানো হয়। তার কাফনের কাপড়টি তার পায়ের গোছার অর্ধেক পর্যন্ত পৌঁছেছিল। রসূলুল্লাহ সা. তার শরীরের বাকি অংশ ঘাস দিয়ে ঢেকে দেওয়ার নির্দেশ দেন। আমরা কবরের মধ্যেই তার পায়ের অংশ ঘাস দিয়ে ঢেকে দিই। এরপর রসূলুল্লাহ সা. সেখান থেকে চলে যান। ওয়াহাব মুযীরের মতো আল্লাহর দরবারে উপস্থিত হওয়ার প্রবল আকাঙ্ক্ষা ছিল আমার। ৪৯৯
এটাই ঈমানদারের চেতনা। ঈমান তাকে এভাবেই শক্তি যোগায়। ওয়াহাব মুযানী ও তার ভাতিজা মদীনায় নিজেদের ছাগলের পাল রেখে মুসলমানদের দলে অংশগ্রহণ করেন। শহীদ হওয়ার অদম্য আকাঙ্ক্ষা পোষণ করায় আল্লাহ তাআলা তাদের শাহাদাতের সম্মান দান করেন। তার এই কীর্তি মনে রেখেছেন সাহাবীরা। সাআদ ইবনে আবী ওয়াক্কাস রা. এই ঘটনার প্রায় তেরো বছর পর তার স্মৃতিচারণ করছিলেন। মুযাইনা গোত্রের কোনো একজন মানুষের নাম শুনেই সেদিনের স্মৃতি তার মনে পড়ে যায়। তখনও তিনি তার মতো শাহাদাতের প্রত্যাশী ছিলেন।
ঢ. আমর ইবনে জামুহ রা.-এর শাহাদাত
আমর ইবনে জামুহ রা. ছিলেন একজন খোঁড়া লোক। তার সিংহের মতো শক্তিশালী চারটি ছেলে ছিল। তারা রসূলুল্লাহ সা.-এর সাথে বিভিন্ন রণাঙ্গণে লড়াই করতে যেতেন। উহুদ যুদ্ধের দিন তারা তাদের পিতা আমরকে আটকে রাখতে চাইলেন। বললেন, আল্লাহ আপনাকে যুদ্ধে যাওয়ার দায়িত্ব থেকে অব্যাহতি দিয়েছেন। আমর রসূলুল্লাহ সা.-এর কাছে গিয়ে বললেন, আমার ছেলেরা আমাকে এই যুদ্ধে আপনার সাথে যেতে দিতে চায় না। আল্লাহর কসম, এই খোঁড়া পা নিয়েই আমি জান্নাতে প্রবেশ করতে চাই। রসূলুল্লাহ সা. বললেন, 'তোমার ছেলেরা ঠিকই বলেছে। আল্লাহ তোমাকে জিহাদের দায়িত্ব থেকে অব্যাহতি দিয়েছেন।' পক্ষান্তরে তার ছেলেদেরকে তিনি বললেন, 'তোমাদের পিতাকে যুদ্ধে যেতে বাধা না দিলেও পারো। এমনও তো হতে পারে, আল্লাহ তার ভাগ্যে শাহাদাত নির্ধারিত রেখেছেন।' অতঃপর আমর উহুদে যুদ্ধ করে শহীদ হন।
আরেক রেওয়ায়াতে এসেছে: আমর ইবনে জামুহ রা. রসূলুল্লাহ সা.-এর দরবারে উপস্থিত হয়ে বলেন, হে আল্লাহর রসূল! যদি আমি আল্লাহর রাস্তায় যুদ্ধ করে শাহাদাতবরণ করি, তাহলে কি জান্নাতে আমার পা সুস্থ থাকবে? রসূলুল্লাহ সা. বলেন, হ্যাঁ। অতঃপর আমর ইবনে জামুহ তার ভাতিজা ও তার মুক্ত দাসদের সাথে নিয়ে যুদ্ধে অংশগ্রহণ করে শাহাদাত বরণ করেন। যুদ্ধ শেষে রসূলুল্লাহ সা. তাদের মৃতদেহের কাছে যান এবং সবাইকে একই কবরে দাফন করেন। ৫০০
এই ঘটনা থেকে প্রমাণিত হয়, আল্লাহ তাআলা যাদের অসুস্থতা বা অন্য কোনো কারণে যুদ্ধে অংশগ্রহণ না করার সুযোগ দিয়েছেন, যদি তারা চায় তাহলে যুদ্ধে অংশগ্রহণ করতে পারে। যদিও অংশগ্রহণ করা তাদের জন্য জরুরি নয়। আমরা দেখতে পেলাম, উহুদযুদ্ধে আমর ইবনে জামুহ খোঁড়া হওয়া সত্ত্বেও যুদ্ধে অংশগ্রহণ করেছেন। আলোচ্য ঘটনায় আমরা আমর ইবনে জামুহের বীরত্ব ও শাহাদাতের মর্যাদালাভের অদম্য স্পৃহার ব্যাপারটিও দেখতে পাই। আল্লাহ তাআলা তার মনোবাসনা পুরন করেছেন।
ণ. আবু হুযায়ফা ইয়ামান ও সাবিত ইবনে কায়সের শাহাদাত
গাযওয়ায়ে উহুদে রওয়ানার সময় রসূলুল্লাহ সা. হুযায়ফা-এর পিতা হুসাইল ইবনে জাবের ওরফে ইয়ামান ও সাবিত ইবনে কায়সকে শিশু ও নারীদের সাথে দুর্গে রেখে গিয়েছিলেন। তারা উভয়ে ছিলেন অত্যন্ত বৃদ্ধ। তারা একে অপরকে উদ্দেশ্য করে বললেন, তোমার ধ্বংস হোক! তুমি কোন জিনিসের অপেক্ষা করছো? আল্লাহর শপথ! আমরা কবরের দিকে এগিয়ে যাচ্ছি, আমাদের মৃত্যু অতি নিকটে, কেন আমরা তরবারি নিয়ে রসূলুল্লাহ সা.-এর সাথে যুদ্ধে অংশগ্রহণ করছি না? হয়তো এর মাধ্যমে আমরা শাহাদাতের মর্যাদা লাভ করতে পারবো।
এ কথা বলে উভয়ে তরবারি হাতে নিলেন। মিলিত হলেন মুসলিম বাহিনীর সাথে। মুসলমানরা তাদের আগমনের বিষয়টি জানতেন না। সাবিত ইবনে কায়স যুদ্ধ করতে করতে মুশরিকদের হাতে শহীদ হন। কিন্তু হুসাইল ইবনে জাবের শহীদ হন বিভ্রান্তির শিকার হয়ে मुसलमानों তরবারির আঘাতে। যুদ্ধক্ষেত্রে তাকে मुसलमानों হাতে আক্রান্ত হতে দেখে ছেলে হুযায়ফা রা. চিৎকার করে বলেন, উনি আমার পিতা! মুসলমানরা বলেন, আল্লাহর শপথ! আমরা তাকে চিনতে পারিনি। আর বাস্তবেই তারা তাকে চিনতে পারেননি। হুযায়ফা তখন তাদের বললেন, আল্লাহ তাআলা তোমাদের সবাইকে ক্ষমা করে দিন। তিনি পরম দয়ালু। ৫০১
রসূলুল্লাহ সা. নিজের পক্ষ থেকে তার রক্তপণ আদায় করে দিতে চাইলে হুযায়ফা রা. তা मुसलमानों জন্য দান করে দেন। এতে তার মর্যাদা আরও বেড়ে যায় নবীজির কাছে। ৫০১
বয়স্ক লোকদের অন্তরে ঈমানী চেতনা কতটা প্রবল ছিল আলোচ্য ঘটনায় তা প্রতিভাত হয়। আল্লাহ তাআলা তাদের জিহাদে অংশগ্রহণ না করার সুযোগ দিয়েছিলেন। কিন্তু তারা শাহাদাতের পিয়াসী ছিলেন। এ লক্ষ্যে ঝাঁপিয়ে পড়েন রণাঙ্গনে। আলোচ্য ঘটনায় আমরা হুযায়ফা রা.-এর উন্নত মানসিকতারও পরিচয় পাই। তিনি مسلمانوں জন্য তার পিতার রক্তপণ দান করে দিয়েছিলেন এবং مسلمانوں বিভ্রান্তির কারণে তাদের পাপমোচনের জন্য আল্লাহর দরবারে দোআ করেছিলেন।
আলোচ্য ঘটনা দ্বারা এ বিধানও প্রমাণিত হয় যে, যুদ্ধের ময়দানে যদি কোনো মুসলমানকে মুসলিম বাহিনী কর্তৃক ভুলক্রমে হত্যা করা হয় তাহলে তার রক্তপণ রাষ্ট্রীয় কোষাগার থেকে আদায় করে দেওয়া আবশ্যক। কেননা, রসূলুল্লাহ সা. ইয়ামানের রক্তপণ আদায় করে দিতে চেয়েছিলেন যদিও হুযায়ফা তা নিতে অস্বীকৃতি জানিয়েছিলেন এবং মুসলিম ভাইদের ক্ষমা করে দিয়েছিলেন। ৫০২
ত. শেষ পরিণতির ভিত্তিতেই পরিণাম
এই নশ্বর পৃথিবী থেকে বিদায় নেওয়ার মুহূর্তে যে বিশ্বাস লালন করে, সে অনুপাতেই তার পরিণতি ঘটে। গাযওয়ায়ে উহুদের নিম্নোক্ত দুটি ঘটনা দ্বারা এই মূলনীতিটি প্রমাণিত। এখান থেকে আমরা শিক্ষা গ্রহণ করতে পারি। ৫০০
১. উসাইরিম-এর শাহাদাত
আবু হুরায়রা রা. একদিন বললেন, তোমরা আমাকে বলে দাও, কে সেই ব্যক্তি যে জান্নাতে প্রবেশ করবে অথচ কখনও নামায পড়েনি? লোকেরা জবাব দিতে না পেরে জিজ্ঞাসা করলো, কে সেই ভাগ্যবান ব্যক্তি? তিনি বললেন, বনু আবদুল আশহালের উসাইরিম আমর ইবনে সাবিত ইবনে ওয়াকাশ। হুসাইন ইবনে আবদুর রহমান বলেন, আমি মাহমুদ ইবনে আসাদকে জিজ্ঞেস করলাম, উসাইরিম কী রকম লোক ছিল? তিনি বললেন, সে আগে ইসলাম গ্রহণ করতে অস্বীকার করতো। কিন্তু রসূলুল্লাহ সা. যেদিন উহুদ অভিমুখে যুদ্ধযাত্রা করেন সেদিন সে ইসলামের সত্যতা উপলব্ধি করে ও ইসলাম গ্রহণ করে। তারপর নিজের তরবারী নিয়ে ছুটতে থাকে এবং রণাঙ্গনে পৌঁছে যায়। সে লড়াই করতে থাকে এবং এক সময় মারাত্মকভাবে আহত হয়। বনু আবদুল আশহালের লোকেরা রণাঙ্গনে তাদের লোকদের লাশ খুঁজতে গিয়ে তাকে দেখতে পায়। তারা তাকে চিনতে পেরে পরস্পর বলাবলি করতে থাকে, উসাইরিম এখানে এলো কীভাবে? সেতো ইসলামকে অস্বীকার করতো। তখন সবাই তাকে জিজ্ঞেস করলো, হে আমর, তুমি কেন এখানে লড়াই করতে এলে? স্বগোত্রের টানে, না ইসলামের আকর্ষণে? সে বললো, ইসলামের আকর্ষণে। আল্লাহ ও তার রসূলের ওপর আমি ঈমান এনেছি এবং মুসলমান হয়েছি। তারপর তরবারী নিয়ে রসূলুল্লাহ সা.-এর নিকট এসেছি এবং লড়াই করে আহত হয়েছি। এর কিছুক্ষণ পরই উসাইরিম তাদের চোখের সামনে মারা গেলো। রসূলুল্লাহ সা. তার ঘটনা শুনে বললেন, সে জান্নাতী। ৫০৪
রসূলুল্লাহ সা.-কে প্রশ্ন করা হলো, উসাইরিম তো এক ওয়াক্ত নামাযও পড়েনি; সে কীভাবে জান্নাতে প্রবেশ করবে? নবীজি সা. বলেন, 'সে কম আমল করে অধিক পুরস্কার পেয়েছে। ১৫০৫
২. মুখাইরীক-এর উপাখ্যান
উহুদ যুদ্ধে নিহত ব্যক্তিদের মধ্যে একজন ছিল বনু সালাবা গোত্রের নাম মুখাইরীক। উহুদ যুদ্ধের দিন সে তার স্বগোত্রীয় ইহুদীদেরকে বললো, হে ইহুদীরা! তোমরা নিশ্চিতভাবেই জানো যে, মুহাম্মাদ সা.-কে সাহায্য করা তোমাদের কর্তব্য। ইহুদীরা বললো, আজ তো শনিবার। সে বললো, তোমাদের জন্য শনিবারের অজুহাত যুক্তিযুক্ত নয়। অতঃপর সে তরবারী ও সাজসরঞ্জাম নিয়ে যুদ্ধযাত্রা করলো। সে বলে গিয়েছিল, 'আমি যদি মারা যাই তাহলে আমার সমস্ত সম্পত্তি মুহাম্মাদের। তিনি ওই সম্পত্তি যেভাবে খুশি ব্যবহার করবেন।'
সে উহুদে এসে مسلمانوں পক্ষে লড়াই করে নিহত হয়। রসূলুল্লাহ সা. বলেন, মুখাইরীক ইহুদিদের মধ্যে সর্বোত্তম ব্যক্তি। ৫০৬
অবশ্য তার ইসলাম গ্রহণের বিষয়ে মতভিন্নতা লক্ষ করা যায়। ইমাম যাহাবী রহ. আত-তাজরীদ-গ্রন্থে এবং হাফেজ ইবনে হাজার আসকালানী রহ. আল ইসাবাহ গ্রন্থে তার ব্যাপারে আলোচনা করতে গিয়ে ওয়াকেদীর সূত্রে লিখেন, তিনি ইসলাম গ্রহণের পর মারা যান। ৫০৭
সুহাইলী রহ. আর রাওজুল উনফ গ্রন্থে লিখেন, তিনি মুসলমান ছিলেন। ইবনে ইসহাকের বর্ণনায় এসেছে: রসূলুল্লাহ সা. তার ব্যাপারে মন্তব্য করেন, 'মুখাইরিক ইহুদিদের সর্বোত্তম ব্যক্তি' এ আলোচনার পর তিনি মন্তব্য করেন, মুখাইরিক মূলত মুসলমান ছিলেন। কোনো মুসলমানের ব্যাপারে যদিও এ কথা বলা বৈধ নয় যে, সে খ্রিষ্টান বা ইহুদিদের মধ্যে শ্রেষ্ঠতম। এর ব্যাখ্যা করতে গিয়ে তিনি বলেন, মূলত এখানে যা বলা হয়েছে তার অর্থ হবে, ইহুদিদের তুলনায় শ্রেষ্ঠ।
ড. আবদুল্লাহ শাকারী তার আল ইয়াহুদু ফিস সুন্নাতিল মুতাহহারাহ গ্রন্থে এ ব্যাপারে বিস্তারিত আলোকপাত করেছেন। তিনি বলেন, মুখাইরিক ইসলাম গ্রহণ করেছিলেন এবং এই ভিত্তিতেই مسلمانوں সঙ্গী হয়ে মুশরিকদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করতে এবং সব সম্পদ দান করে দিতে অনুপ্রাণিত হয়েছিলেন। তিনি ছিলেন বেশ ধনাঢ্য লোক। সম্পদের প্রতি ইহুদিদের প্রচণ্ড আসক্তি থাকা সত্ত্বেও তিনি তার যাবতীয় সম্পদ রসূল সা.-কে দিয়ে দিতে বলেছিলেন। এ থেকে বোঝা যায় তিনি ইসলাম গ্রহণ করেছিলেন। ৫০৮
থ. নিয়তের ওপর আমল নির্ভরশীল
কুজমান নামের এক ব্যক্তি मुसलमानों সাথে গাযওয়ায়ে উহুদে অংশ নেয়। তার বীরত্বের অনেক সুনাম ছিল। রসূলুল্লাহ সা.-এর সামনে তার আলোচনা করা হলে তিনি বলে ওঠেন, এই ব্যক্তি জাহান্নামী। গাযওয়ায়ে উহুদে অংশগ্রহণ না করে পেছনে থেকে গেলে বনু যুফারের নারীরা তাকে ভৎসনা করে। এরপর রসূল সা. যখন সেনাবাহিনীর কাতারগুলো সারিবদ্ধ করছিলেন তখন সে সেখানে পৌছে।
গাযওয়ায়ে উহুদে مسلمانوں পক্ষ থেকে প্রথম তীর নিক্ষেপ করে সে। এরপর সে مسلمانوں পক্ষ হয়ে শত্রুদের বিরুদ্ধে তির বর্ষণ করতে থাকে। এক পর্যায়ে সে উটের মতো আওয়াজ করে তাদের ওপর তরবারি দ্বারা প্রবল আক্রমণ চালাতে থাকে। এভাবে সে সাত কিংবা মতান্তরে নয়জন শত্রুসেনাকে হত্যা করে। নিজেও মারাত্মক আহত হয়। কাতাদা ইবনে নুমান উচ্চৈস্বরে তাকে বললেন, হে আবু গায়দাক! তোমার শাহাদাত শুভ হোক। সাধারণ মুসলমানরাও তার বীরত্বের কথা বলাবলি করছিল। জবাবে সে বলে, আমাকে তোমরা কীসের সুসংবাদ দিচ্ছো? আল্লাহর শপথ! আমি আমার গোত্রের যুদ্ধে লিপ্ত হয়েছি। আমার গোত্র অংশগ্রহণ না করলে আমি এতে অংশ নিতাম না।
রসূলুল্লাহ সা.-এর কাছে তার এসব কথা জানানো হলে তিনি বলেন, নিঃসন্দেহে সে জাহান্নামী। আল্লাহ তাআলা মাঝে মধ্যে তার দীনকে পাপী লোক দ্বারা শক্তিশালী করে থাকেন। ৫০৯
আলোচ্য ঘটনা দ্বারা বোঝা যায়, জিহাদের মতো গুরুত্বপূর্ণ ইবাদাতেও নিয়তের গুরুত্ব অপরিসীম। গোত্রের বাহাদুরি বা নিজ শক্তি প্রদর্শনে যুদ্ধ করলে আল্লাহর সন্তুষ্টি ও সাওয়াব অর্জিত হয় না।
টিকাঃ
১৪৭০ সহীহ বুখারী: ৪০৭২।
১৪৭১ সহীহ আসসীরাতুন নববিয়্যাহ: ২৮৩।
৪৭২ সহীহ আসসীরাতুন নববিয়্যাহ: ২৮৩।
৪৭৩ সহীহ আসসীরাতুন নববিয়্যাহ: ২৮৫।
৪৮৪ সীরাতে ইবনে হিশাম: ৩/১৮৫।
৪৮৫ সুনানে ইবনে মাজাহ: ১৫৯১।
৪৭৬ মুসতাদরাকে হাকিম: ৩/১৯৬।
৪৭৭ সহীহ মুসলিম: ২১৩২।
৪৭৮ সহীহ বুখারী: ৪০৭২।
৪৭৯ সাদিক উরজুন প্রণীত মুহাম্মাদুর রসূলুল্লাহ: ৩/৬০৩।
৪৮০ সাদিক উরজুন প্রণীত মুহাম্মাদুর রসূলুল্লাহ ৩/৬০২।
৪৮১ সহীহ বুখারী: ১২৮৬।
৪৮২ সহীহ বুখারী: ১২৭৫।
৪৮৩ সূরা আহজাব: ২৩।
৪৮৪ মুসতাদরাক: ৩/২০০।
৪৮৫ সহীহ আসসীরাতুন নববিয়্যাহ: ২৯৪।
৪৮৬ যাদুল মাআদ: ৩/২১২।
৪৮৭ সহীহ আসসীরাতুন নববিয়্যাহ : ২৮৯।
৪৮৮ মাগাযী, ওয়াকিদী প্রণীত: ১/২৭৩।
৪৮৯ আত তারীখুল ইসলামি, হুমাইদী প্রণীত : ৫/১২০-১৩০।
৪৯০ যাদুল মাআদ: ৩/২১৪।
৪৯১ সহীহ বুখারী: ৪০৯৭।
৪৯২ সহীহ বুখারী: ১৩৫১।
৪৯৩ সহীহ বুখারী: ১২৪৪।
৪৯৪ ইবনে মাজাহ: ২৮০০।
৪৯৫ সূরা আলে ইমরান: ১৬৯।
৪৯৬ যাদুল মাআদ: ৩/২০৯।
৪৯৭ মাগাযী, ওয়াকিদী প্রণীত: ১/২৭০-২৭১।
৪৯৮ ওয়াকেদী প্রণীত মাগাযী ১/২৭৫।
৪৯৯ ওয়াকেদী প্রণীত মাগাযী: ১/২৭৫।
৫০০ সীরাতে ইবনে হিশাম: ৩/১০১।
৫০১ সীরাতে ইবনে হিশাম: ৩/৯৮।
৫০২ যাদুল মাআদ: ৩/২১৮।
৫০৩ আবু ফারিস প্রণীত গাযওয়ায়ে উহুদ: ১১৭।
৫০৪ সীরাতে ইবনে হিশাম: ৩/৮৩-৮৪।
১৫০৫ গাযওয়ায়ে উহুদ দিরাসাতুন দাবিয়াহ: ১০৫।
৫০৬ সীরাতে ইবনে হিশাম: ৩/১১৯।
৫০৭ তাজরিদু আসমাইস সাহাবাহ: ৩/৭০।
৫০৮ আল ইয়াহুদু ফিস সুন্নাতিল মুতাহহারাহ: ১/৩০৬।
৫০৯ আল বিদায়া ওয়ান নিহায়া: ৪/২৫।
📄 নবীজির মুজিযা
ক. কাতাদা ইবনে নোমানের চোখের উপাখ্যান
গাযওয়ায়ে উহুদে শত্রুসেনাদের আক্রমণে কাতাদা ইবনে নোমান রা.-এর চোখে মারাত্মক আঘাত লাগে। চোখ বেরিয়ে গালের ওপর ঝুলে গড়ে। রসূলুল্লাহ সা. নিজের পবিত্র হাতে তার চোখ কোটরে প্রবেশ করিয়ে দেন এবং তার জন্য প্রার্থনা করেন। তখন কাতাদা রা.-এর সেই চোখটি অন্য চোখের চাইতে অধিক তীক্ষ্ণ ও সতেজ হয়ে যায়। পরবর্তীকালে তিনি চোখ ওঠার ব্যাধিতে আক্রান্ত হলেও রসূলুল্লাহ সা.-এর হাতের স্পর্শ পাওয়া সেই চোখটি কখনও ব্যাধিগ্রস্থ হতো না। ৫১০
কাতাদা ইবনে নোমান-এর পুত্র একবার খলিফাতুল মুসলিমিন উমর ইবনে আবদুল আযীয রহ-এর কাছে যান। পরিচয় জানতে চাইলে তিনি নিজের পরিচয় দেন এই কবিতা বলে:
أنا ابن الذي سالت على الخد عينه فردت بكف المصطفى أحسن الرد فعادت كما كانت لأول أمرها فيا حُسْنَها عينا ويا حُسْنُ ما خد
আমি সেই ব্যক্তির পুত্র যার চোখ ঝুলে তার গালের ওপর পড়েছিল। এরপর মুস্তাফা সা. নিজ হাতে সুন্দরভাবে সেটি যথাস্থানে পুনঃস্থাপন করেছিলেন। এরপর সেটি হয়ে গেলো তেমন যেমনটি ছিল ইতোপূর্বে। কী চমৎকার ওই চোখ! কী চমৎকার ওই গণ্ডদেশ। তখন উমর ইবনে আবদুল আযীয রহ. বলেন,
تِلْكَ الْمَكَارِمُ لا قَعْبَانِ مِنْ لَبَنٍ شِيبًا بِمَاءٍ فَعَادَا بَعْدُ أَبْوَالا
সেইসব কীর্তি দুই পেয়ালা পানি মিশ্রিত দুধ নয় যে পরে মূত্রে পরিণত হবে। তারপর তিনি তাদের অভ্যর্থনা জানান এবং তাকে মূল্যবান উপঢৌকন প্রদান করেন। ৫১১
খ. উবাই ইবনে খালাফের মৃত্যু
উবাই ইবনে খালাফ মক্কায় রসূলুল্লাহ সা.-এর সাথে দেখা হলে বলতেন, হে মুহাম্মাদ, আমার একটা ঘোড়া আছে। তার নাম 'আওজ'। তাকে আমি প্রতিদিন এক ফারাক (৪০ কেজি) ভুট্টা খাওয়াই। এই ঘোড়ায় চড়েই আমি তোমাকে হত্যা করবো। রসূলুল্লাহ সা. জবাব দিতেন, 'বরং আল্লাহ চাইলে আমিই তোমাকে হত্যা করবো।'
উহুদের দিন রসূলুল্লাহ সা. যখন পর্বতের ঘাঁটিতে বিশ্রাম নিচ্ছিলেন তখন উবাই ইবনে খালাফ সেখানে পৌঁছলো। সে বললো, হে মুহাম্মাদ, এ যাত্রা তুমি বাঁচবে না। মুসলমানরা বললেন, ইয়া রসূলাল্লাহ, এ লোকটিকে সহানুভূতি দেখানো কি আমাদের কারো জন্য ঠিক হবে? রসূলুল্লাহ সা. বললেন, 'ওকে আসতে দাও।' সে রসূলুল্লাহ সা.-এর কাছে গেলে তিনি হারেস ইবনে সিম্মারের কাছ থেকে বর্শা নিলেন। কোনো কোনো বর্ণনানুসারে, বর্শা হাতে নেয়ার পর রসূলুল্লাহ সা. এমনভাবে ঘোরালেন যে, আমরা ছত্রভঙ্গ হয়ে দূরে সটকে পড়লাম। অতঃপর রসূলুল্লাহ সা. তার দিকে এগিয়ে গেলেন এবং তার ঘাড়ের ওপর বর্শার আঘাত হানলেন। আঘাত খেয়ে উবাই ইবনে খালাফ ঘোড়ার পিঠ থেকে ছিটকে পড়লো এবং মাটিতে গড়াগড়ি খেলো।
রসূলুল্লাহ সা.-এর আঘাতে উবাইয়ের কাঁধে যে জখমটি হয়েছিল, সেটা তেমন গুরুতর জখম না হলেও তা থেকে রক্ত ঝরছিল। ওই অবস্থাতেই সে কুরায়েশদের কাছে ফিরে গিয়ে বললো, আল্লাহর কসম, মুহাম্মাদ আমাকে খুন করেছে। কুরায়েশরা বললো, আসলে তুমি অতিমাত্রায় ঘাবড়ে গেছো। তোমার কোনো ভয় নেই। সে বললো, মক্কায় থাকাকালেই মুহাম্মাদ আমাকে বলেছিল, তোমাকে আমিই হত্যা করবো। এখন আমার আশংকা হয়, সে যদি আমার দিকে শুধু থুথুও নিক্ষেপ করতো তা হলেও আমি মরে যেতাম। কুরায়েশরা তাকে নিয়ে মক্কা অভিমুখে রওনা হলো। পথিমধ্যে সারেফ নামক স্থানে আল্লাহর এই দুשমনের জীবনলীলা সাঙ্গ হয়। ৫১২
আলোচ্য ঘটনায় নবীজির বীরত্বের একটি দৃষ্টান্ত পাওয়া যায়। উবাই ইবনে খালাফ পরিপূর্ণ অস্ত্রসজ্জিত হয়ে বর্ম পরিধান করে রসূলুল্লাহ সা.-এর সামনে উপস্থিত হয়েছিল। তবুও রসূলুল্লাহ সা. তার শিরস্ত্রাণ ও বর্মের মধ্যবর্তী স্থান কাঁধে আঘাত করতে সক্ষম হন যা আল্লাহর রসূলের সামরিক যোগ্যতার প্রমাণ বহন করে। এ ঘটনা রসূলুল্লাহ সা.-এর একটি মু'জিযা। রসূলুল্লাহ সা. উবাই ইবনে খালাফকে অতীতে সতর্ক করেছিলেন যে, তিনি তাকে হত্যা করবেন। সেটি বাস্তবায়িত হয়েছিল। শুধু তাই নয়, উবাই ইবনে খালাফের বক্তব্য থেকে বোঝা যায়, মুশরিকরাও রসূলুল্লাহ সা.-কে সত্যবাদী হিসেবে জানতো। তাদের বিশ্বাস ছিল, রসূলুল্লাহ সা. যা বলেন, তা অবশ্যই কার্যকর হয়। তবুও তাদের অবাধ্যতা ও প্রবৃত্তিপূজা তাদেরকে ইসলাম থেকে দূরে সরিয়ে রাখতো। ৫১৩
হাসসান ইবনে সাবেত এই ঘটনাটিকে কবিতায় বলেছেন,
সে তার পিতার কাছ থেকে পেয়েছে ভ্রান্তির উত্তরাধিকার
উবাই সেদিন রসূল সা.-এর সাথে দ্বন্দ্ব যুদ্ধে লিপ্ত হলো
তুমি এলে তার দিকে বড় বর্শা হাতে নিয়ে
তাকে হুমকি দিলে অথচ তুমি তার সম্পর্কে কিছুই জানো না
টিকাঃ
৫১০ আত তারীখুল ইসলামী: ৫/১৬৯।
৫১১ আল বিদায়া ওয়ান নিহায়া: ৪/৩৫।
৫১২ সীরাতে ইবনে হিশাম: ৩/৯৩-৯৪।
৫১০ 'আত তারীখুল ইসলামী: ৫/১৬৯।