📘 নবীজির যুদ্ধ জীবন পাঠ ও পর্যালোচনা > 📄 অল্পবয়সি সাহাবীদের সেনাবাহিনীতে অন্তর্ভুক্ত না-করা

📄 অল্পবয়সি সাহাবীদের সেনাবাহিনীতে অন্তর্ভুক্ত না-করা


রসূলুল্লাহ সা. শায়খাইন নামক স্থানে সৈন্যদের কাতার বিন্যস্ত করছিলেন। এ সময় তিনি ১৪ কিংবা তার চেয়ে কম বয়সীদের ফিরিয়ে দেন। ফিরিয়ে দেওয়া সেসব সাহাবীর তালিকায় আবদুল্লাহ ইবনে ওমর, যায়েদ ইবনে সাবিত, উসামা ইবনে যায়েদ, বারা ইবনে আযেব, আবু সাঈদ খুদরী রা.-এর মতো বিখ্যাত সাহাবীরাও ছিলেন। মজার ব্যাপার হলো তারা সংখ্যায়ও ছিলেন প্রায় চৌদ্দ জন। ৪১০
তাদের বয়সী হযরত রাফি ইবনে খাদীজ রা.-কে রসূল যুদ্ধে যাওয়ার অনুমতি দেন। কারণ রসূল সা.-কে বলা হয়েছিল, তিনি একজন দক্ষ তীরন্দাজ। এটা দেখে হযরত সামুরা ইবনে জুনদুব রা. সৎ বাবা মিররী ইবনে সিনান রা.-এর কাছে যান। তিনি ছিলেন বিখ্যাত সাহাবী হযরত আবু সাঈদ খুদরী রা.-এর চাচা। কাঁদতে কাঁদতে তিনি বলেন, বাবা, রসূল সা. রাফি'কে যুদ্ধে যাওয়ার অনুমতি দিয়েছেন অথচ আমাকে ফিরিয়ে দিয়েছেন! আমি কিন্তু মল্লযুদ্ধে তাকে হারিয়ে দিতে পারি।
হযরত মিররী ইবনে সিনান রা. তাকে নিয়ে রসূলের কাছে এলেন। সবিস্তারে বললেন এই ঘটনা। রসূলুল্লাহ সা. কিশোর সাহাবীদ্বয়কে বললেন, তোমরা আমার সামনে মল্লযুদ্ধ করো তো দেখি! দুই কিশোর সামুরা এবং রাফি মল্লযুদ্ধ শুরু করেন। তবে বিজয়ী হন হযরত সামুরা রা.। রসূল সা. দু'জনকেই যুদ্ধে অংশগ্রহণের জন্য অনুমতি দিয়ে দিলেন।
এখানে রসূলুল্লাহ সা.-এর দূরদর্শিতা লক্ষণীয়। তিনি বিশেষ সামরিক যোগ্যতার কারণে হযরত রাফি এবং সামুরা রা.-কে অনুমতি প্রদান করেন। ৪৪১
অন্য অল্পবয়সীদের তিনি ফিরিয়ে দেন। ৪৪১
এটাও লক্ষণীয়-সেই যুগের মুসলমানরা ছিলেন মহানবী সা.-এর আদর্শে উজ্জীবিত এবং ঈমানী দৃঢ়তায় বলিয়ান। তাই তারা পার্থিব জীবন তুচ্ছজ্ঞান করে শাহাদাতের অমীয় সুধা পানের জন্য ছিলেন উদগ্রীব। এ কারণে যুবক-বৃদ্ধ সবাই যুদ্ধে অংশগ্রহণের জন্য উন্মুখ ছিলেন।

টিকাঃ
৪১০ আস সীরাতুন নববিয়্যাহ আসসহীহাহ ৩/৩৮৩।
৪৪১ আস সীরাতুন নববিয়্যাহ আসসহীহাহ ৩/৩৮৩।

📘 নবীজির যুদ্ধ জীবন পাঠ ও পর্যালোচনা > 📄 মক্কার কাফেরদের বিরুদ্ধে মুখোমুখি যুদ্ধে নবীজির পরিকল্পনা

📄 মক্কার কাফেরদের বিরুদ্ধে মুখোমুখি যুদ্ধে নবীজির পরিকল্পনা


ক. রসূলুল্লাহ সা. মক্কার কাফেরদের বিরুদ্ধে গাযওয়ায়ে উহুদে মুখোমুখি যুদ্ধের ব্যাপারে বিশেষ পরিকল্পনা করেন। এক্ষেত্রে তিনি সঠিক অবস্থানের পাশাপাশি যুদ্ধের জন্য নির্বাচন করেছিলেন উপযুক্ত ব্যক্তিদের। এদের মধ্যে পঞ্চাশজন তীরন্দাজকে বিশেষভাবে নির্বাচিত করে তাদের ওপর বিশেষ দায়িত্ব অর্পণ করেছিলেন। অবশিষ্ট সৈন্যবাহিনীকে তিনি তিনটি ভাগে বিন্যস্ত করে প্রত্যেক দলের মধ্য থেকে একজন পতাকাবাহী মনোনীত করেন।
১. মুহাজিরদের পতাকাবাহী ছিলেন মুসআব ইবনে উমায়ের।
২. আনসারদের আউস গোত্রের পতাকাবাহী ছিলেন উসাইদ ইবনে হুযাইর রা.।
৩. আনসারদের খাজরাজ গোত্রের পতাকাবাহী ছিলেন হুবাব ইবনে মুনযির রা.।

খ. রসূলুল্লাহ সা. রণাঙ্গনে সহযোদ্ধাদের বিভিন্ন দিক-নির্দেশনা দিতেন। শত্রুবাহিনীর বিরুদ্ধে যুদ্ধে উৎসাহিত করতেন এবং দৃঢ়তার সাথে শত্রুদের মোকাবিলা করতে প্রেরণা যোগাতেন।
ওয়াকেদী রহ. বর্ণনা করেন, এরপর রসূলুল্লাহ সা. সবার সামনে ভাষণ দেন : 'হে লোক সকল, আল্লাহ তাআলা আমাকে ওহীর মাধ্যমে যেসব বিষয় শিখিয়েছেন, আমি তোমাদের সেসব বিষয়ে উপদেশ দিচ্ছি। আমি তোমাদেরকে আল্লাহর আদেশ মেনে চলার এবং নিষিদ্ধ কাজসমূহ থেকে বিরত থাকার উপদেশ দিচ্ছি। আজ তোমরা এমন এক স্থানে উপনীত, যেখান থেকে তোমরা অনেক সাওয়াব উপার্জন করতে পারো। আর সাওয়াবের অংশীদার ওই ব্যক্তি হবে, যে তার দায়িত্ব যথাযথ পালন করবে এবং নিজেকে ধৈর্য ও বিশ্বাসের সাথে অবিচল রাখবে। কেননা, শত্রুর মুখোমুখি যুদ্ধে অবতীর্ণ হওয়া নিঃসন্দেহে কঠিন কাজ। আল্লাহর সাহায্য ছাড়া এ পরীক্ষায় টিকে থাকা সম্ভব নয়। নিশ্চয়ই আল্লাহ ওই ব্যক্তির সাহায্য করবেন, যে তার অনুসরণ করবে এবং শয়তান এমন ব্যক্তির সাহায্য করবে, যে আল্লাহর আদেশ অমান্য করবে। তাই তোমরা যুদ্ধের ময়দানে ধৈর্যের সাথে তোমাদের কাজ চালিয়ে যাবে এবং সে ক্ষেত্রে আল্লাহ তাআলার প্রতিশ্রুত বিষয়ের অপেক্ষা করবে। আমি যে বিষয়ের উপদেশ দিলাম, তা মেনে চলবে। আমি তোমাদের কল্যাণ কামনা করি। পারস্পরিক মনোমালিন্য ও বিভেদ অক্ষমতা ও দুর্বলতা বাড়িয়ে দেয়। এটা আল্লাহ তাআলা পছন্দ করেন না। এসব আল্লাহ তাআলার সাহায্য ও সফলতা পাওয়ার পথে প্রতিবন্ধক।৪৪২
এই ভাষণের উল্লেখযোগ্য দিকগুলো হচ্ছে:
১. রণাঙ্গনে উদ্যম ও পরিশ্রমের সাথে কাজ করতে হবে।
২. মুখোমুখী যুদ্ধে শত্রুর বিরুদ্ধে ধৈর্যধারণ করতে হবে।
৩. সফলতা পেতে চাইলে পারস্পরিক মনোমালিন্য ও মতবিরোধ ভুলে যেতে হবে।৪৩৩
নবীজির এই ভাষণে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ কিছু নির্দেশনা রয়েছে। রণকৌশল ও রণসরঞ্জামে ঋদ্ধ যে কোনো দল এমন একটি দলের কাছে পরাস্ত হয়ে যেতে পারে, যারা মৃত্যুভয়ে ভীত না হয়ে জীবনের চাইতে মৃত্যুকে প্রাধান্য দিয়ে শত্রুর বিরুদ্ধে নিজেদের সর্বস্ব উজাড় করে দিতে পারে। আর এই মানসিকতা শুধুই জিহাদের প্রতি ভালোবাসা তৈরি করা এবং শাহাদাতের জন্য উৎসাহিত করার মাধ্যমে সম্ভব হতে পারে।

গ. নবীজি সা. উহুদ পাহাড়ের গুরুত্ব অনুভব করেন। তিনি পাহাড়ের পাদদেশে পৌছে উহুদ পাহাড়কে পেছনে রেখে সেনাবাহিনী বিন্যাস করেন মদীনামুখী করে। পঞ্চাশজন তীরন্দাজকে উহুদ পাহাড়ের বিপরীতমুখী আইনাইন নামক পাহাড়ে মোতায়েন করেন। আবদুল্লাহ ইবনে যুবায়ের রা.-কে তীরন্দাজ বাহিনীর প্রধান নিযুক্ত করে তাদের বলেন, 'তোমরা আমাদেরকে তাদের ওপর বিজয় লাভ করতে দেখো অথবা তাদেরকে আমাদের ওপর বিজয় লাভ করতে দেখো, তোমরা এই জায়গা থেকে নড়বে না। '৪৪৪
রসূলুল্লাহ সা. তীরন্দাজ-বাহিনীর নেতা আবদুল্লাহ ইবনে যুবায়ের রা.-কে বলেন, 'তোমরা তীর ছুড়ে তাদের ঘোড়াগুলোকে আমাদের থেকে দূরে রাখবে। যেন অশ্বারোহীরা তীরের আক্রমণ ভেদ করে আমাদের ওপর আক্রমণ করতে না পারে। তোমরা সর্বাবস্থায় নিজেদের স্থানে স্থির থাকবে। যদি দেখো আমরা বিজয়ী হয়ে তাদের অভ্যন্তরে প্রবেশ করেছি; তবুও তোমরা এখানেই অবস্থান করবে। যদি দেখো তারা আমাদের হত্যা করে ফেলছে; তবুও তোমরা আমাদের সাহায্যে এগিয়ে আসবে না। তোমরা যতক্ষণ নিজেদের স্থানে অবস্থান করবে, ততক্ষণ পর্যন্ত ইনশাআল্লাহ আমরা বিজয়ী থাকবো।'
মুসলমানরা পার্বত্যাঞ্চলে অবস্থান করে অপেক্ষাকৃত সমতল ভূমি শত্রুবাহিনীর জন্য রেখে দেয়। যেন তারা উহুদ পাহাড়ের মুখোমুখি হয়ে যুদ্ধে লিপ্ত হয়। অন্যদিকে তীরন্দাজ বাহিনীর মূল লক্ষ্য পেছন দিক হতে শত্রুপক্ষের অতর্কিত আক্রমণ থেকে মুসলমানদের নিরাপদে রাখা।৪৪৫

ঘ. সেনাবাহিনী বিন্যাস ও সারি সাজানো
রসূলুল্লাহ সা. রণাঙ্গনের মুজাহিদদের নামাযের কাতারের মতো সারিবদ্ধ করে দাঁড় করান। তিনি কাতারের মাঝ দিয়ে পায়ে হেঁটে তাদের সারিগুলো সোজা করে দেন। যুদ্ধের সারি প্রস্তুতের সময় রসূল সা. কাউকে বলতেন, 'তুমি সামান্য অগ্রসর হও।' আবার কাউকে বলতেন, 'একটু পেছনে সরো।' সারিবদ্ধ করার সময় তিনি কাতারের প্রথমাংশে এমন লোকদের দাঁড় করান যারা ছিল অপেক্ষাকৃত শক্তিশালী। যেন তারা পেছনের লোকদের জন্য রাস্তা তৈরি করতে পারে। রসূলুল্লাহ সা. বিচক্ষণতার সাথে বাহিনী সাজান।

ঙ. সেনাপতির অনুমতি ছাড়া যুদ্ধ
ইমাম তাবারী রহ. বলেন, এভাবে রসূলুল্লাহ সা. উহুদ পাহাড়কে পেছনে রেখে মুসলিম বাহিনীকে সুবিন্যস্ত করেন এবং তাদের বলেন, 'আমার আদেশ না পাওয়া পর্যন্ত তোমরা যুদ্ধে লিপ্ত হবে না।'৪৪৬

টিকাঃ
৪৪২ মাগাযী, ওয়াকিদী প্রণীত: ১/২২১-২২২।
৪৩৩ আল কিয়াদাতুল আসকারীয়া: ৪৬৯।
৪৪৪ সহীহ বুখারী: ৪০৪৩।
৪৪৫ আস সীরাতুল হালাবিয়া: ২/৪৯৬।
৪৪৬ তারীখে তাবারী: ২/৫০৭।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00