📘 নবীজির যুদ্ধ জীবন পাঠ ও পর্যালোচনা > 📄 উহুদ অভিমুখে মুজাহিদদের যুদ্ধযাত্রা

📄 উহুদ অভিমুখে মুজাহিদদের যুদ্ধযাত্রা


রসূলুল্লাহ সা. যখন মদীনা হতে বের হওয়ার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেন, তখন থেকেই সবাইকে সতর্ক থাকার পরামর্শ দেন। সাহাবীরা সবাই সশস্ত্র হয়ে থাকতেন। রাতের বেলাও তারা পরিপূর্ণ সর্তকতা অবলম্বন করতেন। এমনকি ঘুমের সময়েও অস্ত্র পাশে রেখে ঘুমাতেন। তারা পালাক্রমে মদীনা পাহারা দিতেন। মদীনা পাহারা দেওয়ার জন্য পঞ্চাশজনের একটি বাহিনী তৈরি করা হয়েছিল মুহাম্মাদ ইবনে মাসলামা রা.-এর নেতৃত্বে। এদিকে সাআদ ইবনে মুআয, উসাইদ ইবনে হুযাইর ও সাআد ইবনে উবাদাহ রা.-সহ কয়েকজন সাহাবী পালাক্রমে নবীজিকে পাহারা দিচ্ছিলেন। জুমআর রাতে নবীজির নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পরিপূর্ণ যুদ্ধসাজে সজ্জিত হয়ে তারা মসজিদে নববীর দরজায় দাঁড়িয়েছিলেন। ৪২৬

টিকাঃ
৪২৬ আবু ফারিস প্রণীত গাযওয়ায়ে উহুদ : ৩৪-৩৫।

📘 নবীজির যুদ্ধ জীবন পাঠ ও পর্যালোচনা > 📄 মুনাফেক ইবনে উবাইয়ের দলত্যাগ

📄 মুনাফেক ইবনে উবাইয়ের দলত্যাগ


ক. জয়ের একটি বড় হাতিয়ার হচ্ছে, শত্রুবাহিনীর মুখোমুখি দাঁড়িয়ে সঠিক পরিকল্পনা গ্রহণ করতে পারা। তাই রসূলুল্লাহ সা. যুদ্ধযাত্রার জন্য রাতের শেষাংশকে নির্বাচন করেছিলেন। এ সময়টাতে আবহাওয়া তুলনামূলক প্রশান্তিময় হয়ে থাকে। এতে গোপনীয়তাও রক্ষা পায়। দীর্ঘ পথ অতিক্রম করে শত্রুবাহিনী যখন ক্লান্ত হয়ে গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন থাকবে, তখন তাদের যুদ্ধযাত্রার খবর কানে আসার কথা নয়। নিঃসন্দেহে ক্লান্তিকালীন ঘুম অত্যন্ত গভীর হয়। সেসময় বিকট শব্দ-চেঁচামেচিও অনেক ক্ষেত্রে শোনা যায় না।
ওয়াকিদী রহ. বলেন, রসূল সা. রাতের প্রথমাংশে ঘুমিয়ে মধ্যরাতে উঠলেন। এরপর উপযুক্ত রাস্তা খুঁজতে পথ প্রদর্শকের সঙ্গে পরামর্শে বসলেন। তিনি এমন পথের সন্ধান চাইলেন, যে পথে গেলে শত্রু বাহিনী টের পাবে না। তাই তিনি জানতে চান, কে আমাদের এমন গোপন পথে নিয়ে যেতে পারবে? হযরত আবু খায়সামা রা. বলেন, আল্লাহর রসূল! আমি পারবো। এরপর তিনি রিবয়ী ইবনে কাইযী নামে এক অন্ধ মুনাফেকের বাগানের ভেতর দিয়ে নিয়ে যান।
মুনাফেক রসূলুল্লাহ সা. ও ইসলামী-বাহিনীর আগমন টের পেয়ে তাদের মুখে বালু নিক্ষেপ করতে থাকে এবং বলতে থাকে, যদি তুমি রসূলুল্লাহ সা. হও, তাহলে আমার বাগানে প্রবেশ করা তোমার জন্য বৈধ নয়। অন্য এক বর্ণনায় এসেছে, সে নিজের হাতে এক মুষ্টি মাটি নিয়ে বলে, হে মুহাম্মাদ! যদি আমি সক্ষম হতাম, তাহলে এ মাটি তোমার মুখে নিক্ষেপ করতাম।
সাহাবীরা তাকে হত্যা করতে চাইলে রসূলুল্লাহ সা. নিষেধ করে বললেন, তোমরা তাকে হত্যা করো না। কারণ, তার দৃষ্টিশক্তি ও অন্তর্দৃষ্টি কোনোটিই নেই। কিন্তু রসূলুল্লাহ সা. নিষেধ করার আগেই বনু আশহাল গোত্রের সাআদ ইবনে যায়েদ তাকে বর্শা দিয়ে আঘাত করেন। ফলে সে মাথায় আঘাত পায়। ৪২৭
উপরোক্ত ঘটনা থেকে বোঝা যায় বৃহত্তর স্বার্থে ক্ষুদ্র স্বার্থ ছেড়ে দেওয়া বৈধ। বাগানের ফসল ও শস্য নষ্ট হওয়ার আশঙ্কা থাকা সত্ত্বেও রসূলুল্লাহ সা. রিবয়ী ইবনে কাইযীর বাগানে সেনাবাহিনীকে প্রবেশের অনুমতি দিয়েছিলেন। এর উদ্দেশ্য ছিল সেনাবাহিনীর অতিক্রমের পথ সংক্ষিপ্ত করা। সুতরাং বোঝা গেলো, দীনি স্বার্থ অন্য সব স্বার্থের ওপর প্রাধান্য দেওয়া উচিত। এখানে ব্যক্তিস্বার্থে বাগান রক্ষা আবশ্যক হলেও দীনি স্বার্থে বাগানের ক্ষতিসাধন করে সেখানে সেনা চলাচলের পথ করে দেওয়ার প্রয়োজনীয়তা দেখা দেয়। এসব ক্ষেত্রে গুরুত্ব বিবেচনা করে বৃহৎ স্বার্থে ক্ষুদ্র ক্ষতি স্বীকার করার নীতি প্রয়োগ করে ইসলামী শরীয়ত। ৪২৮
আমরা শরীয়তের নির্ধারিত পাঁচটি অধিকারের গুরুত্বের দিকে খেয়াল করলে বুঝতে পারি, শরীয়ত গুরুত্বের দিক থেকে এগুলোকে এভাবে স্তরবিন্যাস করেছে; ব্যক্তিসত্তাগত অধিকার, বুদ্ধিবৃত্তিক অধিকার, বংশগত অধিকার ও সম্পদগত অধিকার। কোনো ক্ষেত্রে দীনি বিষয়ের স্বার্থ ব্যক্তিগত স্বার্থের সাথে সাংঘর্ষিক হলে ধর্মীয় স্বার্থই প্রাধান্য পাবে। আবার ব্যক্তিগত স্বার্থ বুদ্ধিবৃত্তিক স্বার্থের ওপর প্রাধান্য পাবে। তদ্রূপ বংশগত বা মানবসত্তাগত স্বার্থ প্রাধান্য পাবে সম্পদগত স্বার্থের ওপর। প্রাধান্য দেওয়ার এ শরয়ী নীতিমালা আলিমগণের ঐকমত্য দ্বারা স্বীকৃত। ৪২৯
খ. মদীনা ও উহুদের মধ্যবর্তী শাওত নামক স্থানে পৌঁছার পর মুসলিম বাহিনীর প্রায় এক তৃতীয়াংশ লোক নিয়ে আবদুল্লাহ ইবনে উবাই আলাদা হয়ে গেলো। সে বললো, রসূলুল্লাহ সা. ওদের কথা শুনলেন, আমার কথা শুনলেন না। হে জনতা, আমি বুঝি না আমরা কিসের জন্য এতগুলো লোক প্রাণ দেবো?
সে তার গোত্রের মুনাফেক অনুসারীদের সাথে নিয়ে মুসলিম বাহিনী থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে গেলো। মূলত তার ইচ্ছা ছিল মুসলিম বাহিনীর মধ্যে একধরনের অস্থিরতা তৈরি করা। যাতে সাধারণ মুসলমানগণ বিভ্রান্তিতে নিপতিত হয়ে সাহস হারিয়ে ফেলে এবং শত্রুপক্ষের মনোবল বৃদ্ধি পায়। তার এ ধরনের আচরণ ছিল মুসলিম বাহিনীর সাথে চরম বিশ্বাসঘাতকতা। মূলত আল্লাহ তাআলা এমনটিই চেয়েছেন, যেন সত্যের পথের পথিকদের থেকে মিথ্যার সৈনিকরা বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। যাতে মুমিন ও মুনাফেকদের পরিচয় স্পষ্ট হয়ে যায়। ৪৩০
আল্লাহ তাআলা বলেন :
مَا كَانَ اللهُ لِيَذَرَ الْمُؤْمِنِينَ عَلَى مَا أَنْتُمْ عَلَيْهِ حَتَّى يَمِيزَ الْخَبِيْتَ مِنَ الطَّيِّبِ وَ مَا كَانَ اللَّهُ لِيُطْلِعَكُمْ عَلَى الْغَيْبِ
আল্লাহ এমন নন যে, তিনি মুমিনদেরকে (এমন অবস্থায়) ছেড়ে দেবেন যার উপর তোমরা আছো। যতক্ষণ না তিনি পৃথক করবেন অপবিত্রকে পবিত্র থেকে। আর আল্লাহ এমন নন যে, তিনি তোমাদেরকে গায়েব সম্পর্কে জানাবেন। ৪৩১
এই ঘটনায় তাদের কাপুরুষত্ব ও পলায়নপরতা সবার সামনে স্পষ্ট হয়ে যায়। তারা মানুষের কাছে ও নিজেদের কাছেও লজ্জিত হয়।

টিকাঃ
৪২৭ সীরাতে ইবনে হিশাম: ৩/৭৩।
৪২৮ জাওয়াবিতুল মাসলাহা: ২৩।
৪২৯ আল মারাসিদুল আম্মাহ লিশ মারইয়াহ: ১৬৬।
৪৩০ গাযওয়ায়ে উহুদ দিরাসাতুন দাবিয়াতুন: ৮৪।
৪৩১ সূরা আলে ইমরান: ১৭৯।

📘 নবীজির যুদ্ধ জীবন পাঠ ও পর্যালোচনা > 📄 আবদুল্লাহ ইবনে আমরের ভূমিকা

📄 আবদুল্লাহ ইবনে আমরের ভূমিকা


আবদুল্লাহ ইবনে আমর ইবনে হারাম রা. তদের পিছু পিছু গেলেন এবং বললেন, আমি তোমাদেরকে অনুরোধ করছি তোমরা তোমাদের মুসলমান ভাইদেরকে এবং আল্লাহর নবীকে উপস্থিত শত্রুর হামলার মুখে ফেলে যেও না। তারা বললো, যুদ্ধ হবে মনে করলে তোমাদের রেখে যেতাম না। আমাদের মনে হচ্ছে যুদ্ধ হবে না।
তারা যখন কিছুতেই রণাঙ্গনে ফিরে আসতে রাজি হলো না তখন আবদুল্লাহ বললেন, হে আল্লাহর দুশমনরা! আল্লাহ তোমাদেরকে দূরেই সরিয়ে দিন। আল্লাহ তার রসূলকে তোমাদের মুখাপেক্ষী রাখবেন না। আল্লাহই তার জন্য যথেষ্ট। "৪৩২
এসব দলত্যাগী মুনাফেকদের ব্যাপারেই আল্লাহ তাআলা বলেন,
وَمَا أَصَابَكُمْ يَوْمَ الْتَقَى الْجَمْعُنِ فَبِإِذْنِ اللَّهِ وَ لِيَعْلَمَ الْمُؤْمِنِينَ وَ لِيَعْلَمَ الَّذِينَ نَافَقُوْا وَ قِيلَ لَهُمْ تَعَالَوْا قَاتِلُوا فِي سَبِيلِ اللَّهِ أَوِ ادْفَعُوْا قَالُوْا لَوْ نَعْلَمُ قِتَالًا لَّا تَبَعْنُكُمْ هُمْ لِلْكُفْرِ يَوْمَئِذٍ أَقْرَبُ مِنْهُمْ لِلْإِيْمَانِ يَقُوْلُوْنَ بِأَفْوَاهِهِمْ مَّا لَيْسَ فِي قُلُوبِهِمْ وَاللَّهُ أَعْلَمُ بِمَا يَكْتُمُوْنَ
আর তোমাদের উপর যে বিপদ এসেছিল দুই দল মুখোমুখি হওয়ার দিন তা আল্লাহর অনুমতিক্রমে এবং যাতে তিনি মুমিনদেরকে জেনে নেন। আর যাতে তিনি জেনে নেন মুনাফেকদেরকে। আর তাদেরকে বলা হয়েছিল, এসো, আল্লাহর পথে লড়াই কর অথবা প্রতিরোধ কর। তারা বলেছিল, যদি আমরা লড়াই হবে জানতাম তবে অবশ্যই তোমাদেরকে অনুসরণ করতাম। সেদিন তারা কুফরির বেশি কাছাকাছি ছিল তাদের ঈমানের তুলনায়। তারা তাদের মুখে বলে, যা তাদের অন্তরসমূহে নেই। আর তারা যা গোপন করে সে সম্পর্কে আল্লাহ অধিক অবগত। ৪৩৩

টিকাঃ
৪৩২ সহীহ আসসীরাতুন নববিয়‍্যাহ: ২৭৭।
৪৩৩ সূরা আলে ইমরান: ১৬৬-১৬৭।

📘 নবীজির যুদ্ধ জীবন পাঠ ও পর্যালোচনা > 📄 বানু সালামা ও বানু হারেসা

📄 বানু সালামা ও বানু হারেসা


মুনাফেক আবদুল্লাহ ইবনে উবাই নিজের দল নিয়ে মুসলিম বাহিনী থেকে সরে যায়। এতে বনু সালামা ও বনু হারেসা গোত্রের লোকজনও প্রভাবিত হয়। তারাও ফিরে যেতে চায়। কিন্তু আল্লাহ তাআলা তাদের মনোবল বাড়িয়ে দেন। ফলে এই অপরাধ থেকে তারা রক্ষা পায়।
إِذْ هَمَّتْ طَائِفَتْنِ مِنْكُمْ أَنْ تَفْشَلَا وَ اللَّهُ وَلِيُّهُمَا وَ عَلَى اللَّهِ فَلْيَتَوَكَّلِ الْمُؤْمِنُوْنَ
যখন তোমাদের মধ্য থেকে দু'দল পিছু হটার ইচ্ছা করল, অথচ আল্লাহ তাদের উভয়ের অভিভাবক। আর আল্লাহর উপরই যেন মুমিনগণ তাওয়াক্কুল করে। ৪০৮
জাবের ইবনে আবদুল্লাহ বলেন, কুরআনে কারীমের উপরোক্ত আয়াত আমাদের বনু সালামা ও বনু হারেসার ব্যাপারে অবতীর্ণ হয়। আয়াতের শেষাংশ অর্থাৎ 'আল্লাহ উভয় গোত্রের অভিভাবক।' এই অংশটুকু না হলে হয়তো এই আয়াতটি অবতীর্ণ হওয়াকে আমরা পছন্দ করতাম না। ৪০৯
মুনাফেকরা এভাবে দলত্যাগ করার ফলে মুসলমানদের দুটি গোত্রে মানসিকভাবে প্রভাবিত হয়। তারাও মদিনায় ফিরে যাওয়ার কথা ভাবতে থাকে। কিন্তু আল্লাহ তাআলা তাদের মনোবল বাড়িয়ে দেন। ফলে তারা مسلمانوں সাথে থেকে যান। মুনাফেকদের এভাবে পৃষ্ঠ প্রদর্শনের পর তাদের ব্যাপারে কী করা হবে তা নিয়ে সাহাবীদের মধ্যে দুইরকম মতামত দেখা যায়। এক দল মত দেন হঠাৎ এভাবে মুসলিম বাহিনীর মধ্যে সংঘাতের পরিস্থিতি তৈরি করা ও তাদের বিপর্যস্ত অবস্থায় ফেলার দায়ে তাদের হত্যা করা উচিত। অন্য একদল মত দেন তাদের হত্যা করা উচিত নয়। ৪১০
এই দুই দলের বিরোধ নিরসনে আল্লাহ তাআলা বলেন:
فَمَا لَكُمْ فِي الْمُنْفِقِينَ فِئَتَيْنِ وَ اللهُ أَرْكَسَهُمْ بِمَا كَسَبُوا أَتُرِيدُوْنَ أَنْ تَهْدُوْا مَنْ أَضَلَّ اللَّهُ وَمَنْ يُضْلِلِ اللَّهُ فَلَنْ تَجِدَ لَهُ سَبِيلًا
মুনাফেকদের ব্যাপারে তোমাদের কী হলো যে, তোমরা দু' দল হয়ে গেলে? অথচ তারা যা কামাই করেছে তার জন্য তাদেরকে আল্লাহ পূর্বাবস্থায় ফিরিয়ে দিয়েছেন। আল্লাহ যাকে পথভ্রষ্ট করেছেন তোমরা কি তাকে হেদায়াত করতে চাও? আর আল্লাহ যাকে পথভ্রষ্ট করেন তুমি কখনো তার জন্য কোন পথ পাবে না। ৪১১

টিকাঃ
৪০৮ সুরা আলে ইমরান: ১২২।
৪০৯ সহীহ বুখারী: ৪০৫১।
৪১০ 'আস সীরাতুন নববিয়‍্যাহ আসসহীহাহ ৩/৩৮২।
৪১১ সূরা নিসা: ৮৮।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00