📄 রসূলুল্লাহ সা.-এর গোয়েন্দা তৎপরতা
কুরায়েশের গতিবিধি ও সামরিক প্রস্তুতির সংবাদ সংগ্রহ করতেন আব্বাস ইবনে আবদুল মুত্তালিব। যখন কুরায়েশের এ বাহিনী মদীনা অভিমুখে রওনা করে আব্বাস রা. অতি দ্রুত রসূলুল্লাহ সা.-এর কাছে সংবাদ পাঠান। যেখানে কাফের-বাহিনীর বিস্তারিত বিবরণ দেওয়া ছিল। আব্বাসের বার্তাবাহক ছিলেন তৎপর ব্যক্তি। তিনি মক্কা থেকে মদীনার পাঁচশো কিলোমিটার পথ মাত্র তিনদিনে অতিক্রম করে এসে মসজিদে কুবায় রসূলুল্লাহ সা.-এর হাতে সেই চিঠিটি দেন। ৪১২
নবীজি তার চাচা আব্বাস রা.-এর মাধ্যমে কাফেরদের খবরাখবর সংগ্রহ করতেন। ইবনে আবদুল বার বলেন, আব্বাস রা. মক্কা থেকে রসূলের কাছে মুশরিকদের বিভিন্ন সংবাদ নিয়মিত পাঠাতেন এবং হিজরতে অক্ষম মুসলমানরা তার কারণে সাহস পেতেন। তিনি মদীনায় হিজরত করতে চাইলে রসূলুল্লাহ সা. তাকে এ মর্মে চিঠি লেখেন যে, 'মক্কায় অবস্থান আপনার জন্য অধিক কল্যাণকর। ৪১৩
হযরত আব্বাসের চিঠিতে রসূলুল্লাহ সা.-এর কাছে কাফের-বাহিনীর বিস্তারিত বিবরণ ছিল। সেই চিঠিতে তিনি লিখেছিলেন, 'কুরায়েশরা আপনাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করার জন্য বের হয়েছে। তাদের আক্রমণের বিরুদ্ধে যতটা প্রস্তুতি নেওয়া সম্ভব তা অতি দ্রুত সম্পন্ন করুন। তাদের বাহিনীতে ৩ হাজার সদস্য, ২০০ ঘোড়া, ৭০০ বর্মধারী ও ৩ হাজার উট রয়েছে। তারা পরিপূর্ণ রণসজ্জিত হয়ে রওনা হয়েছে। ৪১৪
আব্বাস রা.-এর চিঠিতে গুরুত্বপূর্ণ তিনটি বিষয় ছিল। যথা: শত্রুসংখ্যা, অস্ত্রের বিবরণ এবং তাদের মদীনামুখী যাত্রার খবর।
শুধু মক্কা থেকে পাওয়া গোয়েন্দা সংবাদের ওপর রসূলুল্লাহ সা. নির্ভর করেননি; বরং প্রতিনিয়ত কাফেরদের সম্পর্কে নতুন নতুন তথ্য সংগ্রহে সচেষ্ট ছিলেন। তার এসব পদক্ষেপে ইসলামবিদ্বেষীদের বিভিন্ন নতুন নতুন চক্রান্ত থেকে মুক্তি পাওয়ার জন্য গোয়েন্দা তৎপরতা চালানোর শিক্ষা রয়েছে। তিনি কুরায়েশ-বাহিনীর সংবাদ সংগ্রহের জন্য পাঠান হুবাব ইবনে মুনজির ইবনে জামুহ রা.-কে। তিনি কৌশলে তাদের দলের অভ্যন্তরে ঢুকে যান। তারপর ফিরে আসেন তাদের সংখ্যা ও প্রস্তুতি সম্পর্কে সম্যক ধারণা নিয়ে। রসূলুল্লাহ সা. তাকে জিজ্ঞেস করলেন, 'তুমি কী দেখেছো?' তিনি বলেন, 'আল্লাহর রসূল! আমি তাদের সংখ্যা অনুমান করেছি প্রায় ৩ হাজার, হয়তো সামান্য কিছু কম- বেশি হতে পারে। তাদের ঘোড়ার সংখ্যা প্রায় ২০০ এবং তাদের বর্মের সংখ্যা হবে প্রায় ৭০০।' রসূলুল্লাহ সা. জিজ্ঞেস করলেন, 'তুমি কি তাদের মধ্যে কোনো নারী দেখেছো?' তিনি বললেন, হ্যাঁ, আমি তাদের মধ্যে বিভিন্ন বাদ্যযন্ত্রসহ নারীদের উপস্থিতি দেখেছি। তখন রসূলুল্লাহ সা. বললেন, 'তারা হয়তো বদরযুদ্ধে নিহতদের স্মরণে শোকগাঁথা গাইবে। এ ব্যাপারে আমি আগেই জেনেছি। তুমি মুজাহিদদের মাঝে এ নিয়ে আলোচনা করো না। আল্লাহই আমাদের জন্য যথেষ্ট। হে আল্লাহ, আমরা আপনার সাহায্যে চলি এবং আপনার সাহায্যেই আক্রমণ করি। '৪১৫
একইভাবে তিনি ফুযালার দুই ছেলে আনাস ও মুনাসকে কুরায়েশদের সংবাদ সংগ্রহের জন্য পাঠিয়েছিলেন। তারা গিয়ে দেখতে পান কুরায়েশ বাহিনী মদীনার কাছাকাছি চলে এসেছে। তারা নবীজিকে এ সংবাদ জানান। ৪১৬
রসূলুল্লাহ সা. যাবতীয় তথ্য সংগ্রহের পর সেসব তথ্য নেতৃত্বস্থানীয়দের মধ্যেই সীমাবদ্ধ রাখার ইচ্ছা করলেন যেন সাধারণ সৈন্যদের মধ্যে মানসিক দুর্বলতা তৈরি না হয়। এ কারণেই উবাই ইবনে কাআব যখন ইবনে আব্বাসের চিঠি পড়ছিলেন রসূলুল্লাহ সা. তাকে তা গোপন রাখতে বলেন। তিনি মদীনায় গিয়ে আনসার ও মুহাজির নেতৃবৃন্দের সাথে পরিস্থিতি নিয়ে আলোচনা করেন। তিনি আনসার গোত্রের নেতা সাআদ ইবনে রাবীকে আব্বাস রা.-এর চিঠি সম্পর্কে জানান। তিনি তা শুনে বলেন, আল্লাহর শপথ! আমি আশা করছি কল্যাণকর কিছুই হবে।
রসূলুল্লাহ সা. তাকেও এই ব্যাপারটি গোপন রাখার নির্দেশ দেন। রসূলুল্লাহ সা. বের হয়ে গেলে তার স্ত্রী তাকে জিজ্ঞেস করলেন, রসূলুল্লাহ সা. আপনাকে কী বলেছেন? তিনি তার স্ত্রীর কাছে ব্যাপারটি চেপে যেতে চাইলে তিনি বললেন, রসূলুল্লাহ সা. আপনাকে যা বলেছেন আমি তা শুনেছি। অতঃপর তার স্ত্রী যা শুনেছেন সব বলে দেন। এতে সাআদ আতঙ্কিত হয়ে পড়েন এবং রসূলুল্লাহ সা.-এর কাছে গিয়ে বলেন, আমি ভয় করছি, হয়তো সে সংবাদ প্রচার করতে থাকবে আর আপনি ভাববেন নিষেধ করা সত্ত্বেও আমি তা প্রচার করছি। রসূলুল্লাহ সা. তখন তাকে তার স্ত্রীর ব্যাপারটিকে গুরুত্ব না দেওয়ার পরামর্শ দেন। ৪১৭
এ দ্বারা বুঝা যায়, স্ত্রীদের কাছ থেকেও সামরিক ও রাষ্ট্রীয় বিভিন্ন পরিকল্পনা গোপন রাখা সেনাকর্মকর্তা ও উচ্চপদস্থ নেতৃবৃন্দের জন্য জরুরি। এ ধরনের স্পর্শকাতর গোপন বিষয়সমূহ সম্পর্কে অত্যন্ত সচেতনতা অবলম্বন করা চাই। কেননা, রাষ্ট্রীয় এ ধরনের গুরুত্বপূর্ণ বিষয় জনসম্মুখে প্রকাশ হয়ে যাওয়া জাতির জন্য অত্যন্ত ক্ষতির কারণ হতে পারে।
অতীত ও বর্তমান বিভিন্ন জাতি ও গোষ্ঠীর ভয়ংকর নির্মম পরাজয়ের পেছনে বহু ক্ষেত্রেই নেতাদের বিশ্বাসঘাতক স্ত্রীদের মাধ্যমে রাষ্ট্রীয় ও সামরিক বিভিন্ন তথ্য শত্রুদের হাতে পাচার হয়ে যাওয়ার ইতিহাস রয়েছে। অনেক সময় বন্ধুবেশি শত্রু বা নিকটাত্মীয়দের বিশ্বাসঘাতকতায় এ ধরনের তথ্যসমূহ শত্রুদের হাতে চলে যাওয়ার দৃষ্টান্তও রয়েছে ভুরি ভুরি। ৪১৮
টিকাঃ
৪১২ আর রাহিকুল মাখতুম: ২৫০।
৪১৩ আল ইসতিয়াব ফি মারিফাতিল আসহাব ২/৮১২।
৪১৪ মাগাযী, ওয়াকিদী প্রণীত: ১/২০৪।
৪১৫ মাগাযী, ওয়াকিদী প্রণীত: ১/২০৭-২০৮।
৪১৬ আবু শাহবা প্রণীত আসসীরাতুন নববিয়াহ: ২/১৮৭।
৪১৭ আস সীরাতুল হালাবিয়া: ২/৪৮৯।
৪১৮ আবু ফারিস প্রণীত গাযওয়ায়ে উহুদ: ২২।
📄 সাহাবীদের পরামর্শ
মক্কার মুশরিক বাহিনীর বিস্তারিত বিবরণ সংগ্রহ করে রসূল সা. সাহাবীদের নিয়ে পরামর্শে বসলেন। তারা কি মদিনায় অবস্থান করে কাফেরদের আক্রমণ প্রতিহত করবেন নাকি মদিনা থেকে বের হয়ে তাদের ওপর আক্রমণ করবেন। রসূল সা. মদিনায় অবস্থানের পক্ষে ছিলেন। তিনি বলেন, 'আমরা একটি নিরাপদ সুরক্ষিত স্থানে অবস্থান করছি। তোমরা চাইলে মদীনায়ই অবস্থান করতে পারো। কুরায়েশরা যদি উহুদে বসে থাকে তাহলে তারা বসে থাকুক। তারা মদিনার ওপর আক্রমণ করলে আমরা তাদের সাথে যুদ্ধ করতে পারবো। আবদুল্লাহ ইবনে উবাইয়েরও মত ছিল মদীনার বাইরে গিয়ে যুদ্ধ করার বিপক্ষে। ৪১৯
কিন্তু मुसलमानों মধ্যে যারা বদর যুদ্ধে অংশ নিতে পারেননি তারা বললেন, হে আল্লাহর রসূল, শত্রুর মুকাবিলার জন্য আমাদেরকে মদীনার বাইরে নিয়ে চলুন। ওরা যেন মনে না করে যে, আমরা দুর্বল কিংবা কাপুরুষ হয়ে গেছি।
ইবনে কাসীর রহ. বলেন, অধিকাংশ সাহাবী মদীনা থেকে বের হয়ে শত্রুদের মুখোমুখি হতে চাইছিলেন। তারা আবেগের বশবর্তী হয়ে নবীজির কথা ও তার মতামত এড়িয়ে যান। যদি তারা তার মতামত মেনে নিতেন, অবশ্যই তাদের জন্য তা কল্যাণকর হতো; কিন্তু ভাগ্যের লিখন অখণ্ডনীয়। যারা বের হতে চেয়েছিলেন তাদের বেশিরভাগ ছিলেন এমন সাহাবী, যারা বদরযুদ্ধে অংশগ্রহণ করতে পারেননি। তারা বদরযুদ্ধে অংশগ্রহণকারীদের অনন্য ফযিলতের কথা জানতেন। ৪২০
ইবনে ইসহাক বলেন, যেসব মুসলমান মদীনার বাইরে গিয়ে কুরায়েশদের সাথে লড়াই করতে আগ্রহী ছিলেন, তারা রসূলুল্লাহ সা.-এর কাছে তাদের ইচ্ছার কথা প্রকাশ করতে লাগলেন। ইতোমধ্যে রসূলুল্লাহ সা. নিজ ঘরে প্রবেশ করলেন এবং যুদ্ধের সাজে সজ্জিত হলেন। তখন লোকেরা একে অপরের নিন্দা করতে শুরু করে। তারা বলতে থাকে, রসূলুল্লাহ সা. একধরনের মতামত পোষণ করেছিলেন আর তোমরা আরেক ধরনের মতামত প্রকাশ করেছো। তারা হামযা রা.-কে বললেন, আপনি নবীজির কাছে গিয়ে বলুন, হে আল্লাহর রসূল! আমরা আপনার আদেশের অনুগত। হামযা রা. গিয়ে রসূলুল্লাহ সা.-কে বললেন, হে আল্লাহর রসূল! লোকেরা একে অপরের নিন্দা করছে এবং তারা এ সিদ্ধান্তে পৌঁছেছে যে, তারা আপনার মতামত অনুযায়ী মদিনায় অবস্থান করবে। রসূলুল্লাহ সা. বলেন, 'না, তা হয় না, যুদ্ধের পোশাক পরার পর যুদ্ধ না করে তা খুলে ফেলা কোনো নবীর পক্ষে শোভা পায় না। ৪২১
মদীনার বাইরে মুখোমুখি লড়াইয়ে আগ্রহীদের দৃষ্টিভঙ্গি ছিল :
১. যেহেতু আকাবার দ্বিতীয় বায়আতে আনসাররা রসূলুল্লাহ সা.-এর সাহায্যের অঙ্গীকার করেছিলেন, তাই তারা মনে করলেন, মদীনার ভেতরে অবস্থান করতে চাওয়া ওই অঙ্গীকার পূরণে অবহেলার নামান্তর।
২. মুহাজিরদের একটি অংশ ভেবেছিলেন, মদীনার বাইরে গিয়ে শত্রুদের মোকাবিলা করলে তা আনসারদের জন্য অধিক উপযোগী হবে। এতে তাদের ফসল ও ঘরবাড়ি শত্রুর ধ্বংসাত্মক কাণ্ড থেকে রেহাই পাবে।
৩. যাঁরা বদরযুদ্ধে অংশগ্রহণ করতে পারেননি। তারা বদরযুদ্ধের অংশগ্রহণকারীদের অনন্য ফযিলতের কথা জানতেন। শহীদ হতে তারা ভীষণ ইচ্ছুক ছিলেন।
৪. কেউ কেউ ভেবেছিলেন, কুরায়েশরা মদীনা অবরোধের সুযোগ পেলে তারা দীর্ঘদিন মদিনা অবরোধ করে রাখতে পারে। এতে অবরুদ্ধ মদিনাবাসী দীর্ঘ সংকটময় পরিস্থিতির সম্মুখিন হতে পারে। ৪২২
আবার মদীনায় অবস্থান করে যুদ্ধে আগ্রহীদের দৃষ্টিভঙ্গি ছিল অন্যরকম। তারা ভেবেছিলেন:
১. মুশরিক বাহিনী সবাই যেহেতু এক গোত্রের নয়, তাই দীর্ঘ কালক্ষেপণে হয়তো তাদের পারস্পরিক দ্বন্দ্ব বৃদ্ধি পাবে এবং এক পর্যায়ে নিজেরাই ফিরে যাবে।
২. উভয় বাহিনীর মধ্যে যারা প্রতিরোধ করে এবং নিজেদের পরিবার- পরিজনের মাঝে অবস্থান করে, স্বাভাবিকভাবেই তারা নিজেদের পরিবার ও স্বজনদের রক্ষার জন্য হলেও বেশ বীরত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে থাকে।
৩. নিজেদের এলাকায় থেকে যুদ্ধ করার ক্ষেত্রে স্ত্রী-সন্তানরাও বিভিন্ন কাজে সাহায্য করতে পারে। এতে যোদ্ধাসংখ্যা বৃদ্ধি পায়।
৪. নিজেদের এলাকায় থেকে যুদ্ধ করলে পাথরসহ স্থানীয় বিভিন্ন অস্ত্র শত্রুর বিরুদ্ধে ব্যবহার করা সম্ভব হয়। ৪২৩
আলোচ্য ঘটনা থেকে বোঝা যায়, প্রিয়নবী সা. তার সাহাবীদের দীক্ষাদানে স্পষ্ট মতামত ব্যক্ত করার স্বাধীনতা দিতেন। এমনকি রসূলুল্লাহ সা.-এর মতের বিরুদ্ধে হলেও তারা নির্ভয়ে নিজেদের মত প্রকাশ করার অধিকার রাখতেন। তিনি তাদের সাথে এমন বিষয়ে পরামর্শ করতেন, যেগুলোর কোনো বিধান অবতীর্ণ হয়নি। ফলে সাহাবীদের মাঝেও উম্মতের সাধারণ বিষয় নিয়ে চিন্তা ভাবনা করার অভ্যাস তৈরি হতো। পরামর্শের ক্ষেত্রে স্বাধীন মত ব্যক্ত করার সুযোগ না থাকলে উপকার পাওয়া যায় না। রসূল সা.-এর অনন্য বৈশিষ্ট্য ছিল এমন যে, তিনি পরবর্তী সময়ে কারো অভিমত ভুল প্রমাণিত হলেও তাকে তিরস্কার করতেন না।
কুরআনে কারীমে আল্লাহ নিজেই রসূল সা.-কে পরামর্শ করার নির্দেশ দিয়েছেন। রসূল সা. চাইতেন তার উপস্থিতিতে উম্মাহ যেন পরামর্শ করে কাজ করতে অভ্যস্ত হয়ে ওঠে। আল্লাহ বলেন:
فَبِمَا رَحْمَةٍ مِّنَ اللهِ لِنْتَ لَهُمْ وَ لَوْ كُنْتَ فَظًّا غَلِيظَ الْقَلْبِ لَا نُفَضُّوا مِنْ حَوْلِكَ فَاعْفُ عَنْهُمْ وَ اسْتَغْفِرْ لَهُمْ وَ شَاوِرْهُمْ فِي الْأَمْرِ فَإِذَا عَزَمْتَ فَتَوَكَّلْ عَلَى اللَّهِ إِنَّ اللَّهَ يُحِبُّ الْمُتَوَكَّلِينَ
আল্লাহর পক্ষ থেকে রহমতের কারণে তুমি তাদের জন্য নম্র হয়েছিলে। আর যদি তুমি কঠোর স্বভাবের, কঠিন হৃদয়সম্পন্ন হতে, তবে তারা তোমার আশপাশ থেকে সরে পড়তো। সুতরাং তাদেরকে ক্ষমা কর এবং তাদের জন্য ক্ষমা প্রার্থনা কর। আর কাজে-কর্মে তাদের সাথে পরামর্শ কর। অতঃপর যখন সংকল্প করবে তখন আল্লাহর ওপর তাওয়াক্কুল করবে। নিশ্চয় আল্লাহ তাওয়াক্কুলকারীদের ভালোবাসেন। ৪২৪
সাহাবায়ে কেরামও এ ক্ষেত্রে পরিপূর্ণ রাজনৈতিক প্রজ্ঞার পরিচয় দিয়েছিলেন। তারা মত প্রকাশের স্বাধীনতা সত্ত্বেও নেতৃত্বের প্রতি ছিলেন অত্যন্ত শ্রদ্ধাশীল। তাই নিজেদের মতামত ব্যক্ত করার পর যখন ভাবলেন, তারা রসূলুল্লাহ সা.-কে এ ব্যাপারে এক প্রকার বাধ্য করছেন, তখন তার কাছে অনুতপ্ত হলেন এবং তার মতই মেনে নেওয়ার ঘোষণা দিলেন। কিন্তু এ ক্ষেত্রে রসূলুল্লাহ সা.-ও প্রজ্ঞা ও নেতৃত্বগুণের আরও একটি মহৎ দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন। নিজের প্রথম কথায় তিনি ফিরে যাননি; বরং পরামর্শসভায় গৃহীত সিদ্ধান্তের ওপর আমলের কথা জানিয়ে বললেন, কোনো বিষয়ে সিদ্ধান্তের পর ফিরে আসা নেতৃত্বের প্রতি অবিশ্বাস তৈরি করে। ৪২৫
টিকাঃ
৪১৯ গাযওয়ায়ে উহুদ দিরাসাতুন দাবিয়াতুন: ৮২।
৪২০ আল বিদায়া ওয়ান নিহায়া: ৪/১৪।
৪২১ সীরাতে ইবনে হিশাম: ৩/৭১।
৪২২ আহমাদ ইজজুদ্দিন প্রণীত গাযওয়ায়ে উহুদ: ৫১-৫২।
৪২৩ আল কিয়াদাতুল আসকারীয়া: ৩৭৪।
৪২৪ সূরা আলে ইমরান: ১৫৯।
৪২৫ আস সীরাতুন নববিয়্যাহ আসসহীহাহ : ২/৩৮০।
📄 উহুদ অভিমুখে মুজাহিদদের যুদ্ধযাত্রা
রসূলুল্লাহ সা. যখন মদীনা হতে বের হওয়ার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেন, তখন থেকেই সবাইকে সতর্ক থাকার পরামর্শ দেন। সাহাবীরা সবাই সশস্ত্র হয়ে থাকতেন। রাতের বেলাও তারা পরিপূর্ণ সর্তকতা অবলম্বন করতেন। এমনকি ঘুমের সময়েও অস্ত্র পাশে রেখে ঘুমাতেন। তারা পালাক্রমে মদীনা পাহারা দিতেন। মদীনা পাহারা দেওয়ার জন্য পঞ্চাশজনের একটি বাহিনী তৈরি করা হয়েছিল মুহাম্মাদ ইবনে মাসলামা রা.-এর নেতৃত্বে। এদিকে সাআদ ইবনে মুআয, উসাইদ ইবনে হুযাইর ও সাআد ইবনে উবাদাহ রা.-সহ কয়েকজন সাহাবী পালাক্রমে নবীজিকে পাহারা দিচ্ছিলেন। জুমআর রাতে নবীজির নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পরিপূর্ণ যুদ্ধসাজে সজ্জিত হয়ে তারা মসজিদে নববীর দরজায় দাঁড়িয়েছিলেন। ৪২৬
টিকাঃ
৪২৬ আবু ফারিস প্রণীত গাযওয়ায়ে উহুদ : ৩৪-৩৫।
📄 মুনাফেক ইবনে উবাইয়ের দলত্যাগ
ক. জয়ের একটি বড় হাতিয়ার হচ্ছে, শত্রুবাহিনীর মুখোমুখি দাঁড়িয়ে সঠিক পরিকল্পনা গ্রহণ করতে পারা। তাই রসূলুল্লাহ সা. যুদ্ধযাত্রার জন্য রাতের শেষাংশকে নির্বাচন করেছিলেন। এ সময়টাতে আবহাওয়া তুলনামূলক প্রশান্তিময় হয়ে থাকে। এতে গোপনীয়তাও রক্ষা পায়। দীর্ঘ পথ অতিক্রম করে শত্রুবাহিনী যখন ক্লান্ত হয়ে গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন থাকবে, তখন তাদের যুদ্ধযাত্রার খবর কানে আসার কথা নয়। নিঃসন্দেহে ক্লান্তিকালীন ঘুম অত্যন্ত গভীর হয়। সেসময় বিকট শব্দ-চেঁচামেচিও অনেক ক্ষেত্রে শোনা যায় না।
ওয়াকিদী রহ. বলেন, রসূল সা. রাতের প্রথমাংশে ঘুমিয়ে মধ্যরাতে উঠলেন। এরপর উপযুক্ত রাস্তা খুঁজতে পথ প্রদর্শকের সঙ্গে পরামর্শে বসলেন। তিনি এমন পথের সন্ধান চাইলেন, যে পথে গেলে শত্রু বাহিনী টের পাবে না। তাই তিনি জানতে চান, কে আমাদের এমন গোপন পথে নিয়ে যেতে পারবে? হযরত আবু খায়সামা রা. বলেন, আল্লাহর রসূল! আমি পারবো। এরপর তিনি রিবয়ী ইবনে কাইযী নামে এক অন্ধ মুনাফেকের বাগানের ভেতর দিয়ে নিয়ে যান।
মুনাফেক রসূলুল্লাহ সা. ও ইসলামী-বাহিনীর আগমন টের পেয়ে তাদের মুখে বালু নিক্ষেপ করতে থাকে এবং বলতে থাকে, যদি তুমি রসূলুল্লাহ সা. হও, তাহলে আমার বাগানে প্রবেশ করা তোমার জন্য বৈধ নয়। অন্য এক বর্ণনায় এসেছে, সে নিজের হাতে এক মুষ্টি মাটি নিয়ে বলে, হে মুহাম্মাদ! যদি আমি সক্ষম হতাম, তাহলে এ মাটি তোমার মুখে নিক্ষেপ করতাম।
সাহাবীরা তাকে হত্যা করতে চাইলে রসূলুল্লাহ সা. নিষেধ করে বললেন, তোমরা তাকে হত্যা করো না। কারণ, তার দৃষ্টিশক্তি ও অন্তর্দৃষ্টি কোনোটিই নেই। কিন্তু রসূলুল্লাহ সা. নিষেধ করার আগেই বনু আশহাল গোত্রের সাআদ ইবনে যায়েদ তাকে বর্শা দিয়ে আঘাত করেন। ফলে সে মাথায় আঘাত পায়। ৪২৭
উপরোক্ত ঘটনা থেকে বোঝা যায় বৃহত্তর স্বার্থে ক্ষুদ্র স্বার্থ ছেড়ে দেওয়া বৈধ। বাগানের ফসল ও শস্য নষ্ট হওয়ার আশঙ্কা থাকা সত্ত্বেও রসূলুল্লাহ সা. রিবয়ী ইবনে কাইযীর বাগানে সেনাবাহিনীকে প্রবেশের অনুমতি দিয়েছিলেন। এর উদ্দেশ্য ছিল সেনাবাহিনীর অতিক্রমের পথ সংক্ষিপ্ত করা। সুতরাং বোঝা গেলো, দীনি স্বার্থ অন্য সব স্বার্থের ওপর প্রাধান্য দেওয়া উচিত। এখানে ব্যক্তিস্বার্থে বাগান রক্ষা আবশ্যক হলেও দীনি স্বার্থে বাগানের ক্ষতিসাধন করে সেখানে সেনা চলাচলের পথ করে দেওয়ার প্রয়োজনীয়তা দেখা দেয়। এসব ক্ষেত্রে গুরুত্ব বিবেচনা করে বৃহৎ স্বার্থে ক্ষুদ্র ক্ষতি স্বীকার করার নীতি প্রয়োগ করে ইসলামী শরীয়ত। ৪২৮
আমরা শরীয়তের নির্ধারিত পাঁচটি অধিকারের গুরুত্বের দিকে খেয়াল করলে বুঝতে পারি, শরীয়ত গুরুত্বের দিক থেকে এগুলোকে এভাবে স্তরবিন্যাস করেছে; ব্যক্তিসত্তাগত অধিকার, বুদ্ধিবৃত্তিক অধিকার, বংশগত অধিকার ও সম্পদগত অধিকার। কোনো ক্ষেত্রে দীনি বিষয়ের স্বার্থ ব্যক্তিগত স্বার্থের সাথে সাংঘর্ষিক হলে ধর্মীয় স্বার্থই প্রাধান্য পাবে। আবার ব্যক্তিগত স্বার্থ বুদ্ধিবৃত্তিক স্বার্থের ওপর প্রাধান্য পাবে। তদ্রূপ বংশগত বা মানবসত্তাগত স্বার্থ প্রাধান্য পাবে সম্পদগত স্বার্থের ওপর। প্রাধান্য দেওয়ার এ শরয়ী নীতিমালা আলিমগণের ঐকমত্য দ্বারা স্বীকৃত। ৪২৯
খ. মদীনা ও উহুদের মধ্যবর্তী শাওত নামক স্থানে পৌঁছার পর মুসলিম বাহিনীর প্রায় এক তৃতীয়াংশ লোক নিয়ে আবদুল্লাহ ইবনে উবাই আলাদা হয়ে গেলো। সে বললো, রসূলুল্লাহ সা. ওদের কথা শুনলেন, আমার কথা শুনলেন না। হে জনতা, আমি বুঝি না আমরা কিসের জন্য এতগুলো লোক প্রাণ দেবো?
সে তার গোত্রের মুনাফেক অনুসারীদের সাথে নিয়ে মুসলিম বাহিনী থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে গেলো। মূলত তার ইচ্ছা ছিল মুসলিম বাহিনীর মধ্যে একধরনের অস্থিরতা তৈরি করা। যাতে সাধারণ মুসলমানগণ বিভ্রান্তিতে নিপতিত হয়ে সাহস হারিয়ে ফেলে এবং শত্রুপক্ষের মনোবল বৃদ্ধি পায়। তার এ ধরনের আচরণ ছিল মুসলিম বাহিনীর সাথে চরম বিশ্বাসঘাতকতা। মূলত আল্লাহ তাআলা এমনটিই চেয়েছেন, যেন সত্যের পথের পথিকদের থেকে মিথ্যার সৈনিকরা বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। যাতে মুমিন ও মুনাফেকদের পরিচয় স্পষ্ট হয়ে যায়। ৪৩০
আল্লাহ তাআলা বলেন :
مَا كَانَ اللهُ لِيَذَرَ الْمُؤْمِنِينَ عَلَى مَا أَنْتُمْ عَلَيْهِ حَتَّى يَمِيزَ الْخَبِيْتَ مِنَ الطَّيِّبِ وَ مَا كَانَ اللَّهُ لِيُطْلِعَكُمْ عَلَى الْغَيْبِ
আল্লাহ এমন নন যে, তিনি মুমিনদেরকে (এমন অবস্থায়) ছেড়ে দেবেন যার উপর তোমরা আছো। যতক্ষণ না তিনি পৃথক করবেন অপবিত্রকে পবিত্র থেকে। আর আল্লাহ এমন নন যে, তিনি তোমাদেরকে গায়েব সম্পর্কে জানাবেন। ৪৩১
এই ঘটনায় তাদের কাপুরুষত্ব ও পলায়নপরতা সবার সামনে স্পষ্ট হয়ে যায়। তারা মানুষের কাছে ও নিজেদের কাছেও লজ্জিত হয়।
টিকাঃ
৪২৭ সীরাতে ইবনে হিশাম: ৩/৭৩।
৪২৮ জাওয়াবিতুল মাসলাহা: ২৩।
৪২৯ আল মারাসিদুল আম্মাহ লিশ মারইয়াহ: ১৬৬।
৪৩০ গাযওয়ায়ে উহুদ দিরাসাতুন দাবিয়াতুন: ৮৪।
৪৩১ সূরা আলে ইমরান: ১৭৯।