📘 নবীজির যুদ্ধ জীবন পাঠ ও পর্যালোচনা > 📄 অর্থনৈতিক কারণ

📄 অর্থনৈতিক কারণ


কুরায়েশদের অর্থনীতি মূলত দুটি মৌসুমী বাণিজ্যের ওপর নির্ভরশীল ছিল। শীতকালীন ও গ্রীষ্মকালীন বাণিজ্য। শীতকালে তারা সিরিয়ার বিভিন্ন পণ্য নিয়ে ইয়েমেনে যেতো। আবার গ্রীষ্মকালে ইয়েমেনের পণ্য নিয়ে সিরিয়ায় গিয়ে ব্যবসা করতো। ফলে এ দু'টি বাণিজ্যের কোনোটি ক্ষতিগ্রস্থ হলে অপরটির ওপর নিদারুণ প্রভাব পড়তো। কারণ, মক্কাবাসীর সিরিয়ায় যাতায়াত মূলত ইয়েমেনের পণ্যসামগ্রীর ওপর নির্ভরশীল ছিল। মদীনার মুসলমানরা মক্কার কুরায়েশদের এ অর্থনৈতিক ব্যবস্থার ওপর চরমভাবে আঘাত হানতে সক্ষম হয়েছিল। তারা এক প্রকার অর্থনৈতিক অবরোধের মধ্যে পড়েছিল। এ ব্যাপারে আল্লাহ তাআলা বলেন: ৪০৪
لِإِيلَافِ قُرَيْشٍ * إِيلَافِهِمْ رِحْلَةَ الشَّتَاءِ وَالصَّيْفِ فَلْيَعْبُدُوا رَبَّ هَذَا الْبَيْتِ الَّذِي أَطْعَمَهُمْ مِّنْ جُوعٍ وَأَمَنَهُمْ مِّنْ خَوْفٍ
যেহেতু কুরায়েশ অভ্যস্ত, (অর্থাৎ) শীত ও গ্রীষ্মে তাদের বিদেশ সফরে অভ্যস্ত হওয়ার (কারণে) অতএব তারা যেন এ গ্রহের রবের ইবাদত করে, যিনি তাদেরকে ক্ষুধায় আহার্য দান করেছেন এবং ভয় হতে তাদেরকে নিরাপদ করেছেন।৪০৫
গাযওয়ায়ে উহুদ সংঘটিত হওয়ার অর্থনৈতিক কারণটি স্পষ্ট হয় সাফওয়ান ইবনে উমাইয়ার বক্তব্যে। তিনি বলেছিলেন, মুহাম্মাদ ও তার সঙ্গীরা আমাদের বাণিজ্য পথে বাধা দিয়েছে। মুহাম্মাদ ও তার সাথিদের সাথে আমাদের কী আচরণ করা উচিত, আমরা বুঝতে পারছি না। তারা উপকূলীয় এলাকায় সর্বক্ষণ অবস্থান করছে, যেখানে সাধারণ মানুষও তাদের সহযোগিতা করছে। আমরা কোথায় যাবো, বুঝতে পারছি না। যদি আমরা মক্কায় বসে বসে আমাদের মূলধন খেতে থাকি, তাহলে আমরা শেষ হয়ে যাবো। আমরা গ্রীষ্মকালে সিরিয়া ও শীতকালে হাবশায় ব্যবসা-যাত্রার মাধ্যমেই টিকে আছি। ৪০৬

টিকাঃ
৪০৪ গাযওয়ায়ে উহুদ দিরাসাতুন দাবিয়াতুন: ৭৪।
৪০৫ সূরা কুরাইশ।
৪০৬ মাগাযী, ওয়াকিদী প্রণীত: ১/১৯৫-১৯৬।

📘 নবীজির যুদ্ধ জীবন পাঠ ও পর্যালোচনা > 📄 রাজনৈতিক কারণ

📄 রাজনৈতিক কারণ


বদরযুদ্ধে শোচনীয় পরাজয়ে কুরায়েশরা হুমকির মুখে পড়ে যায়। আরবের অন্যান্য গোত্রের ওপর তাদের প্রভাব কমে যায়। নেতৃত্ব নড়বড়ে হয়ে পড়ে। এমতাবস্থায় নেতৃত্ব টিকিয়ে রাখার জন্য নিজেদের সর্বস্ব ব্যয় করে হলেও বদরযুদ্ধের কার্যকর প্রতিশোধ নিতে বদ্ধপরিকর হয়ে ওঠে তারা।
এটা মদীনার ইসলামী রাষ্ট্রের ওপর কুরায়েশের আক্রমণের অন্যতম প্রধান কারণ। ৪০৭

টিকাঃ
৪০৭ গাযওয়ায়ে উহুদ দিরাসাতুন দাবিয়াতুন: ৭৫।

📘 নবীজির যুদ্ধ জীবন পাঠ ও পর্যালোচনা > 📄 মদীনা অভিমুখে কুরায়শদের যুদ্ধযাত্রা

📄 মদীনা অভিমুখে কুরায়শদের যুদ্ধযাত্রা


তৃতীয় হিজরীর শাওয়াল মাস শুরু হতে আর মাত্র সাত দিন বাকি। এমন সময় এক শনিবারে কুরায়েশদের যুদ্ধপ্রস্তুতি শেষ হয়। ৪০৮ সেবার জন্য দাস-দাসী ও নারীসহ এ বাহিনীর লোকসংখ্যা ছিল তিন হাজার। জাগরণী গানের গায়িকাদেরও সঙ্গে নেওয়া হয়। নিজেদের সমমনা গোত্রের লোকদের অন্তর্ভুক্ত করা হয়। যুদ্ধাস্ত্রে সজ্জিত হয়ে বনু কিনানা ও তিহামাকে সঙ্গে নিয়ে রওনা করে কুরায়েশ বাহিনী।
সেনাপতি আবু সুফিয়ান স্বীয় স্ত্রী হিন্দ বিনতে উতবা, ইকরিমা ইবনে আবু জেহেল, উম্মে হাকিম বিনতে হারেস, হারেস ইবনে হিশাম ফাতিমা বিনতে ওয়ালীদ, সাফওয়ান ইবনে উমাইয়া বারযা বিনতে মাস'উদ এবং আমর ইবনুল আস বারিতা বিনতে মুনাব্বিহকে সঙ্গে নিলো। অতঃপর তারা মদীনা অভিমুখে অগ্রসর হলো। মদীনার সম্মুখস্থ উপত্যকার মুখে অবস্থিত খাল থেকে নির্গত দুইটি ঝর্নার কিনারে বাতনুস সুবখার পাহাড়ের কাছে গিয়ে তাঁবু স্থাপন করলো তারা। ৪০৯
আবু উয্যাহ আমর ইবনে আবদুল্লাহ আল জুমাহি, আমর ইবনুল আস, হুবাইরা মাখযূমী ও ইবনে জবারী প্রমুখ যুদ্ধে আক্রমণ ও যুদ্ধ পরিকল্পনা করে। ৪১০
মুশরিকদের যুদ্ধ প্রস্তুতিতে ব্যায় হয় প্রায় ৫০ হাজার স্বর্ণমুদ্রা। ৪১১

টিকাঃ
৪০৮ আল বিদায়া ওয়ান নিহায়া: ৪/১১।
৪০৯ গাযওয়ায়ে উহুদ দিরাসাতুন দাবিয়াতুন: ৬৮।
৪১০ আবু ফারিস প্রণীত গাযওয়ায়ে উহুদ: ১৭।
৪১১ আবু ফারিস প্রণীত গাযওয়ায়ে উহুদ: ১৬।

📘 নবীজির যুদ্ধ জীবন পাঠ ও পর্যালোচনা > 📄 রসূলুল্লাহ সা.-এর গোয়েন্দা তৎপরতা

📄 রসূলুল্লাহ সা.-এর গোয়েন্দা তৎপরতা


কুরায়েশের গতিবিধি ও সামরিক প্রস্তুতির সংবাদ সংগ্রহ করতেন আব্বাস ইবনে আবদুল মুত্তালিব। যখন কুরায়েশের এ বাহিনী মদীনা অভিমুখে রওনা করে আব্বাস রা. অতি দ্রুত রসূলুল্লাহ সা.-এর কাছে সংবাদ পাঠান। যেখানে কাফের-বাহিনীর বিস্তারিত বিবরণ দেওয়া ছিল। আব্বাসের বার্তাবাহক ছিলেন তৎপর ব্যক্তি। তিনি মক্কা থেকে মদীনার পাঁচশো কিলোমিটার পথ মাত্র তিনদিনে অতিক্রম করে এসে মসজিদে কুবায় রসূলুল্লাহ সা.-এর হাতে সেই চিঠিটি দেন। ৪১২
নবীজি তার চাচা আব্বাস রা.-এর মাধ্যমে কাফেরদের খবরাখবর সংগ্রহ করতেন। ইবনে আবদুল বার বলেন, আব্বাস রা. মক্কা থেকে রসূলের কাছে মুশরিকদের বিভিন্ন সংবাদ নিয়মিত পাঠাতেন এবং হিজরতে অক্ষম মুসলমানরা তার কারণে সাহস পেতেন। তিনি মদীনায় হিজরত করতে চাইলে রসূলুল্লাহ সা. তাকে এ মর্মে চিঠি লেখেন যে, 'মক্কায় অবস্থান আপনার জন্য অধিক কল্যাণকর। ৪১৩
হযরত আব্বাসের চিঠিতে রসূলুল্লাহ সা.-এর কাছে কাফের-বাহিনীর বিস্তারিত বিবরণ ছিল। সেই চিঠিতে তিনি লিখেছিলেন, 'কুরায়েশরা আপনাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করার জন্য বের হয়েছে। তাদের আক্রমণের বিরুদ্ধে যতটা প্রস্তুতি নেওয়া সম্ভব তা অতি দ্রুত সম্পন্ন করুন। তাদের বাহিনীতে ৩ হাজার সদস্য, ২০০ ঘোড়া, ৭০০ বর্মধারী ও ৩ হাজার উট রয়েছে। তারা পরিপূর্ণ রণসজ্জিত হয়ে রওনা হয়েছে। ৪১৪
আব্বাস রা.-এর চিঠিতে গুরুত্বপূর্ণ তিনটি বিষয় ছিল। যথা: শত্রুসংখ্যা, অস্ত্রের বিবরণ এবং তাদের মদীনামুখী যাত্রার খবর।
শুধু মক্কা থেকে পাওয়া গোয়েন্দা সংবাদের ওপর রসূলুল্লাহ সা. নির্ভর করেননি; বরং প্রতিনিয়ত কাফেরদের সম্পর্কে নতুন নতুন তথ্য সংগ্রহে সচেষ্ট ছিলেন। তার এসব পদক্ষেপে ইসলামবিদ্বেষীদের বিভিন্ন নতুন নতুন চক্রান্ত থেকে মুক্তি পাওয়ার জন্য গোয়েন্দা তৎপরতা চালানোর শিক্ষা রয়েছে। তিনি কুরায়েশ-বাহিনীর সংবাদ সংগ্রহের জন্য পাঠান হুবাব ইবনে মুনজির ইবনে জামুহ রা.-কে। তিনি কৌশলে তাদের দলের অভ্যন্তরে ঢুকে যান। তারপর ফিরে আসেন তাদের সংখ্যা ও প্রস্তুতি সম্পর্কে সম্যক ধারণা নিয়ে। রসূলুল্লাহ সা. তাকে জিজ্ঞেস করলেন, 'তুমি কী দেখেছো?' তিনি বলেন, 'আল্লাহর রসূল! আমি তাদের সংখ্যা অনুমান করেছি প্রায় ৩ হাজার, হয়তো সামান্য কিছু কম- বেশি হতে পারে। তাদের ঘোড়ার সংখ্যা প্রায় ২০০ এবং তাদের বর্মের সংখ্যা হবে প্রায় ৭০০।' রসূলুল্লাহ সা. জিজ্ঞেস করলেন, 'তুমি কি তাদের মধ্যে কোনো নারী দেখেছো?' তিনি বললেন, হ্যাঁ, আমি তাদের মধ্যে বিভিন্ন বাদ্যযন্ত্রসহ নারীদের উপস্থিতি দেখেছি। তখন রসূলুল্লাহ সা. বললেন, 'তারা হয়তো বদরযুদ্ধে নিহতদের স্মরণে শোকগাঁথা গাইবে। এ ব্যাপারে আমি আগেই জেনেছি। তুমি মুজাহিদদের মাঝে এ নিয়ে আলোচনা করো না। আল্লাহই আমাদের জন্য যথেষ্ট। হে আল্লাহ, আমরা আপনার সাহায্যে চলি এবং আপনার সাহায্যেই আক্রমণ করি। '৪১৫
একইভাবে তিনি ফুযালার দুই ছেলে আনাস ও মুনাসকে কুরায়েশদের সংবাদ সংগ্রহের জন্য পাঠিয়েছিলেন। তারা গিয়ে দেখতে পান কুরায়েশ বাহিনী মদীনার কাছাকাছি চলে এসেছে। তারা নবীজিকে এ সংবাদ জানান। ৪১৬
রসূলুল্লাহ সা. যাবতীয় তথ্য সংগ্রহের পর সেসব তথ্য নেতৃত্বস্থানীয়দের মধ্যেই সীমাবদ্ধ রাখার ইচ্ছা করলেন যেন সাধারণ সৈন্যদের মধ্যে মানসিক দুর্বলতা তৈরি না হয়। এ কারণেই উবাই ইবনে কাআব যখন ইবনে আব্বাসের চিঠি পড়ছিলেন রসূলুল্লাহ সা. তাকে তা গোপন রাখতে বলেন। তিনি মদীনায় গিয়ে আনসার ও মুহাজির নেতৃবৃন্দের সাথে পরিস্থিতি নিয়ে আলোচনা করেন। তিনি আনসার গোত্রের নেতা সাআদ ইবনে রাবীকে আব্বাস রা.-এর চিঠি সম্পর্কে জানান। তিনি তা শুনে বলেন, আল্লাহর শপথ! আমি আশা করছি কল্যাণকর কিছুই হবে।
রসূলুল্লাহ সা. তাকেও এই ব্যাপারটি গোপন রাখার নির্দেশ দেন। রসূলুল্লাহ সা. বের হয়ে গেলে তার স্ত্রী তাকে জিজ্ঞেস করলেন, রসূলুল্লাহ সা. আপনাকে কী বলেছেন? তিনি তার স্ত্রীর কাছে ব্যাপারটি চেপে যেতে চাইলে তিনি বললেন, রসূলুল্লাহ সা. আপনাকে যা বলেছেন আমি তা শুনেছি। অতঃপর তার স্ত্রী যা শুনেছেন সব বলে দেন। এতে সাআদ আতঙ্কিত হয়ে পড়েন এবং রসূলুল্লাহ সা.-এর কাছে গিয়ে বলেন, আমি ভয় করছি, হয়তো সে সংবাদ প্রচার করতে থাকবে আর আপনি ভাববেন নিষেধ করা সত্ত্বেও আমি তা প্রচার করছি। রসূলুল্লাহ সা. তখন তাকে তার স্ত্রীর ব্যাপারটিকে গুরুত্ব না দেওয়ার পরামর্শ দেন। ৪১৭
এ দ্বারা বুঝা যায়, স্ত্রীদের কাছ থেকেও সামরিক ও রাষ্ট্রীয় বিভিন্ন পরিকল্পনা গোপন রাখা সেনাকর্মকর্তা ও উচ্চপদস্থ নেতৃবৃন্দের জন্য জরুরি। এ ধরনের স্পর্শকাতর গোপন বিষয়সমূহ সম্পর্কে অত্যন্ত সচেতনতা অবলম্বন করা চাই। কেননা, রাষ্ট্রীয় এ ধরনের গুরুত্বপূর্ণ বিষয় জনসম্মুখে প্রকাশ হয়ে যাওয়া জাতির জন্য অত্যন্ত ক্ষতির কারণ হতে পারে।
অতীত ও বর্তমান বিভিন্ন জাতি ও গোষ্ঠীর ভয়ংকর নির্মম পরাজয়ের পেছনে বহু ক্ষেত্রেই নেতাদের বিশ্বাসঘাতক স্ত্রীদের মাধ্যমে রাষ্ট্রীয় ও সামরিক বিভিন্ন তথ্য শত্রুদের হাতে পাচার হয়ে যাওয়ার ইতিহাস রয়েছে। অনেক সময় বন্ধুবেশি শত্রু বা নিকটাত্মীয়দের বিশ্বাসঘাতকতায় এ ধরনের তথ্যসমূহ শত্রুদের হাতে চলে যাওয়ার দৃষ্টান্তও রয়েছে ভুরি ভুরি। ৪১৮

টিকাঃ
৪১২ আর রাহিকুল মাখতুম: ২৫০।
৪১৩ আল ইসতিয়াব ফি মারিফাতিল আসহাব ২/৮১২।
৪১৪ মাগাযী, ওয়াকিদী প্রণীত: ১/২০৪।
৪১৫ মাগাযী, ওয়াকিদী প্রণীত: ১/২০৭-২০৮।
৪১৬ আবু শাহবা প্রণীত আসসীরাতুন নববিয়াহ: ২/১৮৭।
৪১৭ আস সীরাতুল হালাবিয়া: ২/৪৮৯।
৪১৮ আবু ফারিস প্রণীত গাযওয়ায়ে উহুদ: ২২।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00