📄 ধর্মীয় কারণ
আল্লাহর পথে বাধা প্রদান, বাধা প্রদানের জন্য সম্পদ ব্যয়, ইসলামের দাওয়াতের কাজে বিঘ্নতা সৃষ্টিসহ কাফেরদের সবধরনের অপতৎপরতা সম্পর্কে আল্লাহ ওহীর মাধ্যমে রসূল সা.-কে জানিয়ে দিতেন। ইসলামী আদর্শের শ্রেষ্ঠত্ব ও ইসলামী রাষ্ট্রের ব্যর্থতা প্রমাণে তাদের পরিকল্পনার কথাও জানিয়ে দিতেন। যেমন আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন :
إِنَّ الَّذِينَ كَفَرُوا يُنْفِقُوْنَ أَمْوَالَهُمْ لِيَصُدُّوا عَنْ سَبِيلِ اللَّهِ فَسَيُنْفِقُوْنَهَا ثُمَّ تَكُوْنُ عَلَيْهِمْ حَسْرَةً ثُمَّ يُغْلَبُوْنَ وَ الَّذِينَ كَفَرُوا إِلَى جَهَنَّمَ يُحْشَرُوْنَ
নিশ্চয় যারা কুফরী করেছে, তারা নিজেদের সম্পদসমূহ ব্যয় করে আল্লাহর রাস্তা হতে বাধা প্রদান করার উদ্দেশ্যে। তারা তো তা ব্যয় করবে। অতঃপর এটি তাদের ওপর আক্ষেপের কারণ হবে এরপর তারা পরাজিত হবে। আর যারা কুফরী করেছে তাদেরকে জাহান্নামে সমবেত করা হবে। ৩৯৮
ইমাম তাবারী রহ. উপরোক্ত আয়াতের ব্যাখ্যায় বলেন, তারা তাদের সম্পদ মানুষকে ইসলাম গ্রহণে বাধা দেওয়ার জন্য খরচ করে। ইবনে কাসীর রহ. বলেছেন, এ আয়াতে আল্লাহ তাআলা সত্যপথের অনুসরণ থেকে মানুষকে বাধা দেওয়ার কাজে কাফেরদের সম্পদ ব্যয় সম্পর্কে আলোচনা করেছেন। ৩৯৯
ইমাম শাওকানী রহ. বলেন, সঠিক পথ থেকে মানুষকে ফিরিয়ে রাখা এবং রসূলের বিরুদ্ধে যুদ্ধের প্রস্তুতি নেওয়াই ছিল এই কাফেরদের সম্পদ ব্যায়ের উদ্দেশ্য। ৪০০
এই আয়াত থেকে বোঝা যায়, আল্লাহর পথে বাধা দেওয়া, সত্য ধর্ম গ্রহণ করা থেকে মানুষকে বিরত রাখা এবং রসূল ও ইসলামের বিরুদ্ধে কাফেররা তাদের সম্পদ ব্যয় করতো। ফলে ধর্মীয় দৃষ্টিকোণ থেকেও উহুদযুদ্ধ অনিবার্য হয়ে ওঠে। ৪০১
টিকাঃ
৩৯৮ সূরা আনফাল: ৩৬।
৩৯৯ তাফসীরে ইবনে কাসীর: ২/৩৪১।
৪০০ ফাতহুল কাদীর: ৩০৯।
৪০১ গাযওয়ায়ে উহুদ দিরাসাতুন দা'বিয়াতুন: ৭১।
📄 সামাজিক প্রেক্ষাপট
বদরযুদ্ধের পরাজয় এবং নেতৃবৃন্দের হত্যাকাণ্ড কুরায়েশদের জন্য ছিল অত্যন্ত লজ্জাজনক ঘটনা। যা তাদের সবসময় লাঞ্ছনা ও কষ্টের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছিল। তাই তারা তাদের সর্বস্ব ব্যয় করে এই লজ্জা থেকে মুক্তি পাওয়ার জন্য ছিল উদগ্রীব। বদর থেকে ফিরে প্রতিশোধ নেওয়ার জন্য সৈন্য সংগ্রহ ও ধনসম্পদ একত্রিত করার কাজে নেমে পড়ে।
ইবনে ইসহাক বলেন, বদর যুদ্ধ থেকে পরাজয়ের কলংক মাথায় নিয়ে কুরায়েশ কাফেররা যখন মক্কায় পৌঁছলো এবং আবু সুফিয়ান তার কাফেলা নিয়ে মক্কায় ফিরে গেলো তখন আবদুল্লাহ ইবনে আবু রাবীআ, ইবরিমা ইবনে আবু জেহেল ও সাফওয়ান ইবনে উমাইয়াসহ কুরায়েশদের একটি দল—যাদের পিতা, পুত্র কিংবা ভাই যুদ্ধে নিহত হয়েছিল, আবু সুফিয়ানের কাছে গেলো। আবু সুফিয়ানের ওই ব্যবসা-যাত্রায় সেবার যে মুনাফা অর্জিত হয় তা তখনো তার কাছেই ছিল। তারা বললো, হে কুরায়েশরা! মুহাম্মাদ তোমাদের বিরাট ক্ষতি সাধন করেছে এবং তোমাদের শ্রেষ্ঠ ব্যক্তিদের হত্যা করেছে। এবার এই কাফেলার যাবতীয় সম্পদ দিয়ে আমাদেরকে সাহায্য করো, তাহলে আশা করি আমরা আমাদের হারানো লোকদের উপযুক্ত প্রতিশোধ গ্রহণ করতে পারবো।
আবু সুফিয়ান বললো, আমি সর্বপ্রথম তোমাদের ডাকে সাড়া দিচ্ছি। ৪০২
তখনই জুবায়ের ইবনে মুতয়িম তার একজন হাবশী ক্রীতদাসকে (তীরন্দাজিতে দক্ষ) বললো, তুমি যদি আমার চাচা তুয়াইমা ইবনে আদির হত্যার প্রতিশোধ হিসেবে মুহাম্মাদের চাচা হামযাকে হত্যা করতে পারো, তাহলে তোমাকে মুক্ত করে দেওয়া হবে। ৪০৩
টিকাঃ
৪০২ সীরাতে ইবনে হিশাম: ৩/৬৮।
৪০০ সীরাতে ইবনে হিশাম: ৩/৭৯।
📄 অর্থনৈতিক কারণ
কুরায়েশদের অর্থনীতি মূলত দুটি মৌসুমী বাণিজ্যের ওপর নির্ভরশীল ছিল। শীতকালীন ও গ্রীষ্মকালীন বাণিজ্য। শীতকালে তারা সিরিয়ার বিভিন্ন পণ্য নিয়ে ইয়েমেনে যেতো। আবার গ্রীষ্মকালে ইয়েমেনের পণ্য নিয়ে সিরিয়ায় গিয়ে ব্যবসা করতো। ফলে এ দু'টি বাণিজ্যের কোনোটি ক্ষতিগ্রস্থ হলে অপরটির ওপর নিদারুণ প্রভাব পড়তো। কারণ, মক্কাবাসীর সিরিয়ায় যাতায়াত মূলত ইয়েমেনের পণ্যসামগ্রীর ওপর নির্ভরশীল ছিল। মদীনার মুসলমানরা মক্কার কুরায়েশদের এ অর্থনৈতিক ব্যবস্থার ওপর চরমভাবে আঘাত হানতে সক্ষম হয়েছিল। তারা এক প্রকার অর্থনৈতিক অবরোধের মধ্যে পড়েছিল। এ ব্যাপারে আল্লাহ তাআলা বলেন: ৪০৪
لِإِيلَافِ قُرَيْشٍ * إِيلَافِهِمْ رِحْلَةَ الشَّتَاءِ وَالصَّيْفِ فَلْيَعْبُدُوا رَبَّ هَذَا الْبَيْتِ الَّذِي أَطْعَمَهُمْ مِّنْ جُوعٍ وَأَمَنَهُمْ مِّنْ خَوْفٍ
যেহেতু কুরায়েশ অভ্যস্ত, (অর্থাৎ) শীত ও গ্রীষ্মে তাদের বিদেশ সফরে অভ্যস্ত হওয়ার (কারণে) অতএব তারা যেন এ গ্রহের রবের ইবাদত করে, যিনি তাদেরকে ক্ষুধায় আহার্য দান করেছেন এবং ভয় হতে তাদেরকে নিরাপদ করেছেন।৪০৫
গাযওয়ায়ে উহুদ সংঘটিত হওয়ার অর্থনৈতিক কারণটি স্পষ্ট হয় সাফওয়ান ইবনে উমাইয়ার বক্তব্যে। তিনি বলেছিলেন, মুহাম্মাদ ও তার সঙ্গীরা আমাদের বাণিজ্য পথে বাধা দিয়েছে। মুহাম্মাদ ও তার সাথিদের সাথে আমাদের কী আচরণ করা উচিত, আমরা বুঝতে পারছি না। তারা উপকূলীয় এলাকায় সর্বক্ষণ অবস্থান করছে, যেখানে সাধারণ মানুষও তাদের সহযোগিতা করছে। আমরা কোথায় যাবো, বুঝতে পারছি না। যদি আমরা মক্কায় বসে বসে আমাদের মূলধন খেতে থাকি, তাহলে আমরা শেষ হয়ে যাবো। আমরা গ্রীষ্মকালে সিরিয়া ও শীতকালে হাবশায় ব্যবসা-যাত্রার মাধ্যমেই টিকে আছি। ৪০৬
টিকাঃ
৪০৪ গাযওয়ায়ে উহুদ দিরাসাতুন দাবিয়াতুন: ৭৪।
৪০৫ সূরা কুরাইশ।
৪০৬ মাগাযী, ওয়াকিদী প্রণীত: ১/১৯৫-১৯৬।
📄 রাজনৈতিক কারণ
বদরযুদ্ধে শোচনীয় পরাজয়ে কুরায়েশরা হুমকির মুখে পড়ে যায়। আরবের অন্যান্য গোত্রের ওপর তাদের প্রভাব কমে যায়। নেতৃত্ব নড়বড়ে হয়ে পড়ে। এমতাবস্থায় নেতৃত্ব টিকিয়ে রাখার জন্য নিজেদের সর্বস্ব ব্যয় করে হলেও বদরযুদ্ধের কার্যকর প্রতিশোধ নিতে বদ্ধপরিকর হয়ে ওঠে তারা।
এটা মদীনার ইসলামী রাষ্ট্রের ওপর কুরায়েশের আক্রমণের অন্যতম প্রধান কারণ। ৪০৭
টিকাঃ
৪০৭ গাযওয়ায়ে উহুদ দিরাসাতুন দাবিয়াতুন: ৭৫।