📘 নবীজির যুদ্ধ জীবন পাঠ ও পর্যালোচনা > 📄 যে কারণে যুদ্ধ

📄 যে কারণে যুদ্ধ


মুসলমানরা যখন বদর যুদ্ধে বিজয় লাভ করে, তার পরই বনু কায়নুকার ইহুদিদের সাথে রসূলুল্লাহ সা.-এর উপরোক্ত সংলাপ হয়। পূর্বেই তারা মুসলমানদের সাথে কৃত সন্ধিচুক্তি ভঙ্গ করার পরিকল্পনা করে রাখে। এ লক্ষ্যে তারা একটি সুযোগ খুঁজছিল। ইতোমধ্যে সেই সুযোগ তারা পেয়েও যায়।
মূল ঘটনা ছিল এই, জনৈক আরব মহিলা কিছু পণ্যদ্রব্য নিয়ে বনু কায়নুকা গোত্রের বাজারে বিক্রি করে। সেখানে সে এক স্বর্ণের দোকানের কাছে বসে। দোকানের লোকেরা মহিলার মুখ খুলতে বলে। কিন্তু মহিলা তা করতে অস্বীকার করে। অতঃপর স্বর্ণকার এই মহিলার পরিধানের কাপড়ের একটা কোণা ধরে তার পিঠের সাথে বেঁধে দেয়। মহিলা এটা টের পায়নি। ফলে সে উঠে দাঁড়ানো মাত্র উলঙ্গ হয়ে যায়। বাজারের লোকেরা তা দেখে হো হো করে হেসে ওঠে। মহিলা সঙ্গে সঙ্গে চিৎকার করে ওঠে। জনৈক মুসলমান স্বর্ণকারের ওপর আক্রমণ চালিয়ে তাকে হত্যা করে ফেলে। স্বর্ণকার ছিল ইহুদী। তাই ইহুদীরাও সংঘবদ্ধ হয়ে ওই মুসলমানকে হত্যা করে। নিহত মুসলমানের স্বজনরা مسلمانوں কাছে ফরিয়াদ জানালে মুসলমানরা ক্রুদ্ধ হয়ে ওঠে এবং বনু কায়নুকার সাথে مسلمانوں যুদ্ধ বেঁধে যায়। ৩৮৫
রসূলুল্লাহ সা. ঘটনা জানতে পেরে দ্বিতীয় হিজরির শাওয়ালের ১৫ তারিখে আনসার ও মুহাজিরদের একটি বাহিনী নিয়ে তাদের বিরুদ্ধে রওনা হন। ৩৮৬
মুসলিম বাহিনীর পতাকা ছিল হামযা ইবনে আবদুল মুত্তালিব রা.-এর হাতে। মদীনায় অস্থায়ী প্রশাসক হিসেবে নিযুক্ত করা হয় আবু লুবাবা ইবনে আবদুল মুনিযির উমরীকে।

টিকাঃ
৩৮৪ সূরা আলে ইমরান: ১২৩-১২৪।
৩৮৫ সীরাতে ইবনে হিশাম: ৩/৫৩।
৩৮৬ ওয়াকেদী প্রণীত মাগাযী: ১/১৭৬।

📘 নবীজির যুদ্ধ জীবন পাঠ ও পর্যালোচনা > 📄 অবরোধ আরোপ

📄 অবরোধ আরোপ


তাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ পরিচালনার পূর্বেই তাদের সাথে কৃত সন্ধি চুক্তি ভঙ্গের নির্দেশনা দিয়ে আল্লাহ তাআলা বলেন:
وَاِمَّا تَخَافَنَّ مِنْ قَوْمٍ خِيَانَةً فَانْبِذْ اِلَيْهِمْ عَلٰى سَوَاءٍ اِنَّ اللّٰهَ لَا يُحِبُّ الْخَائِنِينَ
আর যদি তুমি কোন সম্প্রদায়ের চুক্তি ভঙ্গের আশঙ্কা করো তাহলে তাদের চুক্তি তাদের দিকে নিক্ষেপ করো যাতে সমান সমান অবস্থা বিরাজিত হয়। আল্লাহ নিশ্চয়ই খেয়ানতকারীদের পছন্দ করেন না। ৩৮৭
ইহুদিরা নবীজির আগমনের সংবাদ পেয়ে দুর্গে সমবেত হয়। রসূলুল্লাহ সা. তাদের ১৫ দিন অবরুদ্ধ করে রাখেন। ইবনে হিশাম এমনটাই উল্লেখ করেছেন। ৩৮৮
রসূলুল্লাহ সা. অভিনব পন্থায় তাদের বাইরে যাওয়া-আসা ও খাদ্যদ্রব্য সরবরাহের সকল পথ রুদ্ধ করে রাখেন। ধারাবাহিক অবরোধের ফলে মানসিকভাবে ভেঙে পড়ে বনু কায়নুকার লোকেরা। এক পর্যায়ে তারা রসূলুল্লাহ সা.-এর সিদ্ধান্ত মেনে বেরিয়ে আসতে বাধ্য হয়। আর এতেই মক্কার মুশরিকদের চাইতে বেশি শক্তিমত্তার দম্ভ দেখানো বনু কায়নুকার পরাজয় নিশ্চিত হয়। তাদের পিঠমোড়া করে বেঁধে উপস্থিত করা হয় রসূলুল্লাহ সা.-এর সামনে। মুনযির ইবনে কুদামাহ সালামী আউসীকে তাদের তদারকির জন্য নিযুক্ত করা হয়। ৩৮৯

টিকাঃ
৩৮৭ সূরা আনফাল: ৫৮।
৩৮৮ সীরাতে ইবনে হিশাম: ৩/৫৫।
৩৮৯ তারিখে ইসলাম, হুমাইদী প্রণীত: ৫/৩২।

📘 নবীজির যুদ্ধ জীবন পাঠ ও পর্যালোচনা > 📄 বানু কায়নুকার ইহুদিদের যাত্রা

📄 বানু কায়নুকার ইহুদিদের যাত্রা


মুনাফেক নেতা আবদুল্লাহ ইবনে উবাই ইবনে সালুল তাদের মুক্তির ব্যাপারে তদবির করতে লাগলেন। একবার তিনি তাদের পাশ দিয়ে যাওয়ার সময় مسلمانوں বলেন, তাদের ছেড়ে দাও। মুনযির জবাবে বলেন, তুমি কি এমন বন্দীদের ছেড়ে দিতে বলছো যাদের বন্দী করে রেখেছেন স্বয়ং রসূলুল্লাহ সা.? আল্লাহর শপথ! যে তাদের মুক্ত করতে আসবে, আমি তার মস্তক উড়িয়ে দেবো। ৩৯০
এভাবে আল্লাহর সাহায্যে রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাদেরকে নতজানু করলে আবদুল্লাহ ইবনে উবাই তার কাছে এসে বললেন, হে মুহাম্মাদ, আমার মিত্রদের সাথে সহৃদয় আচরণ করুন। রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তার এ কথায় কোনো উত্তর দিলেন না। তিনি আবার বললো, হে মুহাম্মাদ, আমার মিত্রদের সাথে সদয় আচরণ করুণ। রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মুখ ফিরিয়ে নিলেন। এবার সে রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের বর্মের পকেটে হাত ঢুকিয়ে দিলে তিনি বললেন, 'আমাকে ছাড়ো।' এই সময় রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এত ক্রুদ্ধ হন যে, তাঁর মুখমণ্ডল রক্তিম হয়ে যায়। অতঃপর তিনি তাকে বললেন, 'আরে! আমাকে ছাড়ো তো।' সে বললো, না, আপনি আগে চারশো নাঙ্গামাথা ও তিনশো বর্মধারী যোদ্ধার সাথে সদয় আচরণের নিশ্চয়তা দিন। তারা আমাকে শত্রুর মোকাবিলায় রক্ষা করেছে। আর আপনি কিনা একদিনেই তাদেরকে নিশ্চিহ্ন করে দিতে চাচ্ছেন। আমি তাদের ছাড়া এক মুহূর্তও নিরাপদ নই। রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, আচ্ছা, বেশ। ওদেরকে তোমার মর্জির ওপর ছেড়ে দিলাম।
তারপর রসূলুল্লাহ সা. তাদের মুক্তি দিয়ে নির্বাসনের আদেশ দিলেন। মুসলমানরা বনু কায়নুকার যাবতীয় সম্পদ গণিমত হিসেবে নিয়ে নেয়। এর ব্যবস্থাপনার দায়িত্ব দেওয়া হয় মুহাম্মাদ ইবনে মাসলামা রা.-কে। ৩৯১
ইহুদিদের নির্বাসনের আদেশ পরিবর্তনের জন্য আবারো উঠেপড়ে লাগলেন ইবনে উবাই। রসূলুল্লাহ সা.-এর সাথে সাক্ষাত করার জন্য তার কক্ষের সামনে গেলে দ্বাররক্ষী উয়াইম ইবনে সায়িদাহ আনসারী তাকে বাধা দেন। রসূলুল্লাহ সা.-এর অনুমতি ছাড়া তিনি ইবনে উবাইকে ভেতরে প্রবেশ করতে দেবেন না বলে জানালে তিনি উগ্র আচরণ করেন। উয়াইম ধাক্কা দিলে ইবনে উবাই দেয়ালের সাথে আঘাত পান। তার চেহারা রক্তাক্ত হয়ে যায়। ৩৯২
এই ঘটনাটি রসূলুল্লাহ সা.-এর রাজনৈতিক প্রজ্ঞার একটি প্রকৃষ্ট উদাহরণ। যেখানে তিনি ইবনে উবাইয়ের আহ্বানে সাড়া দিয়েছিলেন; যা তার হেদায়াত লাভের কারণ হতে পারতো। হয়তো রসূলুল্লাহ সা. তার আহ্বানে সাড়া না দিলে তার নেতৃত্বাধীন লোকেরা তার আহ্বানে ইসলামের বিরুদ্ধে যুদ্ধের প্রস্তুতি নিতেন।
আরেকটি বিষয়ও ভাবনার ছিল। তা হলো, আনসারদের অনেকেই তখন সদ্য ইসলাম গ্রহণকারী ছিলেন। ইবনে উবাইয়ের প্ররোচনায় প্ররোচিত হওয়ার আশঙ্কা তাদের ক্ষেত্রে ছিল প্রবল। ৩৯৩
তাই তার সাথে সদয় আচরণ করে রসূলুল্লাহ সা. সাধারণ আনসারী مسلمانوں ভুল বুঝে ফেতনায় নিপতিত হওয়া থেকে রক্ষা করেন। রসূলুল্লাহ সা.-এর এ কৌশল বেশ সফলতা লাভ করে। ধীরে ধীরে ইবনে উবাইয়ের সহমর্মী ও আত্মীয়স্বজনদের সামনে তার অন্যায়গুলো স্পষ্ট হতে থাকে। এমনকি একপর্যায়ে তিনি তার ছেলে আব্দুল্লাহর কাছেও বিরাগভাজন ব্যক্তিতে পরিণত হন। তারাই পরবর্তী সময়ে তাকে বিভিন্ন কুকর্মে বাঁধা দিতো। তাকে হত্যা করতেও প্রস্তুত ছিল কেউ কেউ। ৩৯৪

টিকাঃ
৩৯০ তারিখে ইসলাম, হুমাইদী প্রণীত: ৫/৩৩।
৩৯১ আল ইয়াহুদু ফিস সুন্নাতিল মুতাহহারাহ: ১/২৮১।
৩৯২ আত তারীখুল ইসলামি, হুমাইদী প্রণীত: ৫/৩০।
'আত তারীখুল ইসলামি, হুমাইদী প্রণীত: ৫/৩২।
৩৯৪ আবু ফারিস প্রণীত আসসুরা মাআল ইয়াহুদ: ১/১৪৮।

📘 নবীজির যুদ্ধ জীবন পাঠ ও পর্যালোচনা > 📄 উবাদা ইবনে সামিতের দায়মুক্তি

📄 উবাদা ইবনে সামিতের দায়মুক্তি


এরপর উবাদা ইবনে সামিত রা. রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের দরবারে হাজির হলেন। বনু কায়নুকার সাথে তারও মৈত্রী সম্পর্ক ছিল। কিন্তু তার কোনো পরোয়া না করে তাদেরকে রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের ইচ্ছার ওপর ছেড়ে দিলেন এবং তাদের সাথে তার কৃত চুক্তির দায়দায়িত্ব থেকে তিনি আল্লাহ ও রসূলের সামনে নিজেকে মুক্ত বলে ঘোষণা করলেন। তিনি বললেন, ইয়া রসূলাল্লাহ, আমার মিত্র ও বন্ধু শুধুমাত্র আল্লাহ, রসূল ও মুমিনগণ। এসব কাফিরের মৈত্রী থেকে আমি সম্পূর্ণ মুক্ত। ৩৯৫
মদীনা থেকে বনু কায়নুকার বহিষ্কারাদেশ চূড়ান্ত হলে রসূলুল্লাহ সা. উবাদা ইবনে সামিত রা.-কে তাদের নির্বাসন প্রক্রিয়াটি তত্ত্বাবধান করার নির্দেশ দেন। বনু কায়নুকার লোকেরা তাকে বললো, আপনি আমাদের সাথে বন্ধুত্বের চুক্তিতে আবদ্ধ হওয়া সত্ত্বেও এ ধরনের আচরণ করছেন? জবাবে তিনি বলেন, যখন থেকে তোমরা مسلمانوں বিরুদ্ধে যুদ্ধের প্রস্তুতি গ্রহণ করছিলে, তখন আমি রসূলুল্লাহ সা.-এর দরবারে গিয়ে বলেছিলাম, হে আল্লাহর রসূল! আমি তাদের ও তাদের মিত্রদের সাথে নিজের মৈত্রী-চুক্তি বাতিল ঘোষণা করছি।
মৈত্রী চুক্তির ক্ষেত্রে ইবনে উবাই ও উবাদা ইবনে সামিত ছিলেন সমপর্যায়ের। ইবনে উবাই উবাদা ইবনে সামিত রা. কে বনু কায়নুকার কিছু পরীক্ষিত বন্ধুত্বের ঘটনা স্মরণ করিয়ে বললো, তাদের মিত্রতা আপনি কীভাবে ছিন্ন করছেন? এটা আপনার উচিত হয়নি। উবাদা ইবনে সামিত জবাবে বললেন, হে আবুল হুবাব, শত্রুতা-মিত্রতার নীতিমালায় পরিবর্তন এসেছে। পুরনো যাবতীয় চুক্তি বাতিল করেছে ইসলাম। আপনি এমন বিষয়ে বাড়াবাড়ি করছেন, যার করুণ পরিণতি অতিসত্বর দেখতে পাবেন। বনু কায়নুকা রসূলুল্লাহ সা.-কে বললো, আমাদের কিছু ঋণ আছে। আমরা তা আদায় করতে আগ্রহী। নবীজি সা. তাদের সেই ঋণ পরিশোধের সুযোগ দেন। উবাদা ইবনে সামিত রা. তাদের নির্বাসনের যাবতীয় প্রক্রিয়া শেষ করতে চাইলে তারা আরও কিছু সময় চায়। তিনি বললেন, তোমাদের তিন দিন সময় দেওয়া হয়েছিল। এর বেশি এক মুহূর্তও সময় দেওয়া হবে না। আর এটি রসূলুল্লাহ সা.-এর বিধান। আমার ক্ষেত্রে হলে এই সুযোগও পেতে না। এরপর তিনি তাদের পেছনে পেছনে যান এবং তাদের সিরিয়ার আজরাআত নামক স্থানে পৌঁছে দেন। ৩৯৬
এভাবেই চরম অপমানিত হয়ে মদীনা থেকে বহিষ্কৃত হয় মদীনার ক্ষমতাধর রণপটু গোত্র বনু কায়নুকা। জনসংখ্যায় তারা ছিল বিপুল। তাদের ছিল বিপুল পরিমাণ সামরিক সরঞ্জাম। নির্বাসনের সময় যাবতীয় অস্ত্রশস্ত্র ও সহায়-সম্পত্তি مسلمانوں গণিমত হিসেবে ছেড়ে যেতে বাধ্য হয় তারা। চরম শিক্ষা পায় ইহুদি জাতি। مسلمانوں ব্যাপারে ভয় ঢুকে যায় তাদের ভেতর। ৩৯৭

টিকাঃ
৩৯৫ আল ইয়াহুদু ফিস সুন্নাতিল মুতাহহারাহ: ১/২৮২-২৮৩।
৩৯৬ আল ইয়াহুদু ফিস সুন্নাতিল মুতাহহারাহ: ১/২৮৪-২৮৫।
৩৯৭ আবু ফারিস প্রণীত আসসুরা মাআল ইয়াহুদ: ১/১৪৯।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00