📘 নবীজির যুদ্ধ জীবন পাঠ ও পর্যালোচনা > 📄 হুযায়ফা ইবনুল ইয়ামান ও উসাইদ ইবনে হুযাইর

📄 হুযায়ফা ইবনুল ইয়ামান ও উসাইদ ইবনে হুযাইর


ক. হুযায়ফা ইবনুল ইয়ামান ও তার পিতা
হুযায়ফা রা. বলেন, আমি ও আমার পিতা বদরযুদ্ধে অংশগ্রহণ করতে পারিনি। কেননা, আমরা রসূলুল্লাহর সাথে সাক্ষাতের উদ্দেশ্যে যাত্রা করেছিলাম। চলার পথে মক্কার মুশরিকরা আমাদের গ্রেপ্তার করে এবং বলতে থাকে, তোমরা মুহাম্মাদের সাথে সাক্ষাতের উদ্দেশ্যে যাত্রা করছো। আমরা তাদের আশ্বস্ত করলাম, আমরা তার সাথে সাক্ষাতের উদ্দেশ্যে নয়; বরং মদীনার উদ্দেশে যাত্রা করছি। তারা আমাদের কাছ থেকে মদীনায় পৌঁছে রসূলুল্লাহ সা.-এর পক্ষ হয়ে যুদ্ধে অংশগ্রহণ না করার অঙ্গীকার নেয়।
আমরা মুশরিকদের আসার আগে রসূলুল্লাহ সা.-এর দরবারে উপস্থিত হই এবং আমাদের ও তাদের মধ্যকার সংলাপের বিষয়টি জানাই। অঙ্গীকারের ব্যাপারে রসূলুল্লাহ সা.-এর কাছে পরামর্শ চাইলে তিনি বলেন, আমরা তাদের বিরুদ্ধে আল্লাহর কাছে সাহায্য চাইবো এবং তাদের সাথে কৃত প্রতিশ্রুতি পূরণ করবো। অতঃপর আমরা মদীনায় ফিরে যাই। তাই আমাদের বদরযুদ্ধে অংশগ্রহণ করা হয়নি। ৩৭৪
এটি ছিল কারও সাথে কৃত প্রতিশ্রুতি পূরণের এক অনন্য উদাহরণ। প্রতিশ্রুতি পূরণকে অত্যন্ত গুরুত্ব দিতেন রসূলুল্লাহ সা.। প্রতিশ্রুতি রক্ষা করতে গিয়ে ক্ষতির সম্মুখীন হলেও প্রতিশ্রুতি পূরণে জোর দিতেন। যেমনটি আমরা উপরোক্ত ঘটনায় দেখতে পাই।

খ. উসাইদ ইবনে হুযাইর
যুদ্ধ শেষে রসূলুল্লাহ সা. মদীনার দিকে রওনা হয়ে 'রাওহা' নামক প্রান্তরে এসে পৌঁছেন। নবীজি সা.-কে অভ্যর্থনা জানাতে আসে আরবের বিভিন্ন গোত্রের প্রতিনিধিরা। উসাইদ ইবনে হুযাইর সেখানে রসূলুল্লাহ সা.-এর সাথে সাক্ষাৎ করে বলেন, ইয়া রসূলাল্লাহ! সকল প্রশংসা এমন সত্তার যিনি আপনাকে বিজয়ী করেছেন এবং আপনার চক্ষু শীতল করেছেন। আল্লাহর শপথ হে আল্লাহর রসূল! আমি বদরযুদ্ধে এ জন্য অংশগ্রহণ করতে পারিনি যে, আমি ভেবেছিলাম আপনি হয়তো মুশরিকদের ব্যবসায়ী কাফেলার উদ্দেশে যাত্রা করছেন। আমি মোটেও কল্পনা করতে পারিনি যে, আপনি মুশরিক-বাহিনীর বিরুদ্ধে যুদ্ধ করবেন। যদি এমনটি জানতাম তাহলে আমি অবশ্যই যুদ্ধে অংশ নিতাম। নবীজি সা. বললেন, তুমি সত্য বলছো। ৩৭৫

টিকাঃ
৩৭৪ মুসতাদরাকে হাকিম: ৩/২০১-২০২।
৩৭৫ আল বিদায়া ওয়ান নিহায়া: ৩/৩০৫।

📘 নবীজির যুদ্ধ জীবন পাঠ ও পর্যালোচনা > 📄 বদরের কাব্যযুদ্ধ

📄 বদরের কাব্যযুদ্ধ


হাসসান ইবনে সাবিত রা. আবৃত্তি করেছেন :
مَا نَخْشَى بِحَمْدِ اللهِ قَوْمًا وَإِنْ كَثُرُوا وَأَجْمَعَتِ الزُّحُوفُ إِذَا مَا أَلَبُوا جَمْعًا عَلَيْنَا كَفَانَا حَدُهُمْ رَبُّ رَؤُوفُ سَمَوْنَا يَوْمَ بَدْرٍ بِالْعَوَالِي سِرَاعًا مَا تَضَعْضَعْنَا الْحُتُوفُ
মহান আল্লাহর বিশেষ কৃপায় কোনো গোত্রকে আমরা ভয় করি না, যদিও তারা আমাদের চেয়ে অধিক সংখ্যক হয়। কোনো গোত্র আমাদের বিরুদ্ধে কাউকে ক্ষেপিয়ে তুললে তাদের শত্রুতা ও বিদ্বেষের পরিবর্তে আল্লাহর অনুগ্রহই আমাদের জন্য যথেষ্ট। বদরের দিন আমরা তীর-বর্শা নিয়ে রণাঙ্গনে বীরদর্পে লড়েছিলাম। মৃত্যুর ভয় আমাদের দুর্বল করতে সক্ষম হয়নি। ৩৭৬
কাআব ইবনে মালেক রা. আবৃত্তি করেছেন :
لَمَّا حَامَتْ فَوَارِسُكُمْ بِبَدْرٍ وَلاَ صَبَرُوا بِهِ عِنْدَ اللِقَاءِ وَرَدْنَاهُ بِنُورِ اللهِ يَجْلُو دُجَى الظَّلْمَاءِ عَنَّا وَالْغِطَاء رَسُولُ اللهِ يَقْدُمُنَا بِأَمْرٍ مِنْ أَمْرِ اللهِ أَحْكَمَ بِالقَضَاءِ فَمَا ظَفِرَتْ فَوَارِسُكُمْ بِبَدْرٍ وَمَا رَجَعُوا إِلَيْكُمْ بِالسَّوَاءِ فَلاَ تَعْجَلْ أَبَا سُفْيَانَ وَارْقُبْ جِيَادَ الخَيْلِ تَطْلُعُ مِنْ كَدَاءِ بِنَصْرِ اللهِ رُوحُ القُدْسِ فِيْهَا وَمِيْكَالُ فَيَا طِيْبَ الْمَلَاءِ
বদর যুদ্ধে তোমাদের ঘোড়সাওয়াররা তোমাদেরকে মোটেই রক্ষা করতে পারেনি। আর প্রতিদ্বন্দ্বিতার সময় তারা দৃঢ়ভাবে টিকে থাকতে পারেনি।
আমরা আল্লাহর নূর নিয়ে সেখানে উপস্থিত হই—যা অন্ধকার ও আবরণ দূর করে আমাদের আলোকিত করে দেয়।
তিনি আল্লাহর রসূল সা.—যিনি আল্লাহর একটি বিশেষ নির্দেশের দিকে আমাদের নিয়ে যাচ্ছিলেন। আল্লাহর চূড়ান্ত ফয়সালায় তা দৃঢ়তা লাভ করে।
এ কারণে বদরে তোমাদের অশ্বারোহী বাহিনী জয়ীও হতে পারেনি এবং তোমাদের কাছে সহি-সালামতে ফিরেও আসতে পারেনি। সুতরাং হে আবু সুফিয়ান! তাড়াহুড়া করো না। বরং কুদা উপত্যকা হতে উত্তম ঘোড়া বেরিয়ে আসার অপেক্ষা করো।
যে দলের সাথে থাকবে আল্লাহর সাহায্য। থাকবে রূহুল কুদস জিবরীল ও মীকাইল ফেরেশতা। কতই না উত্তম হবে সেই দল! ৩৭৭
রসূলুল্লাহ সা. মুসলমানদের উদ্দীপ্ত করতে ও কাফেরদের প্রভাবিত করার লক্ষ্যে মুসলিম কবিদের এ ধরনের কবিতা আবৃত্তি করতে উৎসাহ দিতেন। কবিতা আবৃত্তি ও কাব্যচর্চাকে আরবসমাজে যুদ্ধের অন্যতম অনুসঙ্গ মনে করতো। কোনো জাতির উত্থান-পতনের লক্ষণ দেখা যেতো তাদের কবিতায়। যুদ্ধের দাবানল জ্বালিয়ে দিতে বা সন্ধির পরিস্থিতি সৃষ্টি করতে কবিতা দারুণ ভূমিকা পালন করতো। ৩৭৮
মক্কার মুশরিকদের বিরুদ্ধে এই কাব্য যুদ্ধ আরম্ভ হয় হিজরতের পরপরই। কিন্তু গাযওয়ায়ে বদরের পূর্বে ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র বাহিনীর সাথে যুদ্ধের সময় তা হালকা ঢেউয়ের মতো মনে হলেও বদরযুদ্ধের পর তা তুফানের রূপ লাভ করে। মুসলিম-মুশরিক উভয় বাহিনীর কাব্যযুদ্ধ চলতো মক্কা-মদীনার পার্শ্ববর্তী অঞ্চল হয়ে যাতায়াতকারী ব্যবসায়ী কাফেলাগুলোর মাধ্যমে। তারা এ ধরনের কাব্য উভয় দলের কাছে পৌঁছে দিতো এবং বিপরীত পক্ষ সাথে সাথে এসবের জবাব রচনা করতো। যুদ্ধে বিজয়ের পর বিজয়ী দলের আনন্দ উদ্যাপনের স্তৃতিকাব্যের পাশাপাশি পরাজিত বাহিনীর শোককাব্য ছড়িয়ে পড়তো দিকে দিকে। মুসলিম কবিদের মধ্যে শীর্ষে ছিলেন কাআব ইবনে মালেক ও আবদুল্লাহ ইবনে রাওয়াহা রা.। আর কবিতার মাধ্যমে কাফেরদের আঘাত করার ক্ষেত্রে অগ্রগামী ছিলেন হাসসান ইবনে সাবিত রা.। ৩৭৯

টিকাঃ
৩৭৬ সীরাতে ইবনে হিশাম: ৩/২৬।
৩৭৭ সীরাতে ইবনে হিশাম: ৩/৩০।
৩৭৮ আত তারীখুল ইসলামী: ৪/১৯৯।
৩৭৯ আল মানহাজিল হারাকি লিস সীরাতিন নববিয়্যাহ: ৩৫৪-৩৫৫।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00