📘 নবীজির যুদ্ধ জীবন পাঠ ও পর্যালোচনা > 📄 উমাইয়া ইবনে খালফের পতন

📄 উমাইয়া ইবনে খালফের পতন


আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ রা. বলেন, সাআদ ইবনে মুআয রা. উমরাহ আদায় করার জন্য মক্কায় যান। তিনি সাফওয়ানের পিতা উমাইয়া ইবনে খালফের বাড়িতে অতিথি হলেন। উমাইয়াহও সিরিয়ায় যাওয়ার পথে মদীনায় সাআদ রা.-এর বাড়িতে অবস্থান করতেন। উমাইয়া সাআদ রা.-কে বললেন, একটু অপেক্ষা করুন, দুপুরে মানুষের চলাফেরা কমে গেলে আপনি গিয়ে তাওয়াফ করে নেবেন।
সাআদ রা. তাওয়াফ করছিলেন। এমতাবস্থায় আবু জেহেল এসে উপস্থিত হলেন। সাআদকে দেখে তিনি জিজ্ঞেস করলেন, কাবায় তাওয়াফকারী লোকটি কে? সাআদ রা. বললেন, আমি সাআদ। আবু জেহেল বললো, তুমি নির্বিঘ্নে কাবার তাওয়াফ করছো? অথচ তোমরাই মুহাম্মাদ ও তার সাথিদেরকে আশ্রয় দিয়েছো? সাআদ রা. বললেন, হ্যাঁ। এভাবে দুজনের মধ্যে কথা কাটাকাটি হয়।
এ সময় উমাইয়া সাআদ রা.-কে বললেন, আবুল হাকামের সঙ্গে উচ্চৈঃস্বরে কথা বলো না। সে মক্কাবাসীদের নেতা। সাআদ রা. বললেন, আল্লাহর কসম! তুমি যদি আমাকে বায়তুল্লাহর তাওয়াফ করতে বাধা দাও, তবে আমিও সিরিয়ার সঙ্গে তোমাদের ব্যবসা-বাণিজ্যের পথ রুদ্ধ করে দেবো। উমাইয়া সাআদ রা.-কে বলতে লাগলেন, তোমার স্বর উঁচু করো না।
উমাইয়া সাআদকে নিবৃত করতে চাইলে সাআদ রা. ক্রোধান্বিত হয়ে বললেন, আমাকে ছেড়ে দাও। আমি মুহাম্মাদ সা.-কে বলতে শুনেছি, তারা তোমাকে হত্যা করবে। উমাইয়া বললেন, আমাকেই? তিনি বললেন, হ্যাঁ। উমাইয়া বললেন, আল্লাহর শপথ! মুহাম্মাদ কখনও মিথ্যা কথা বলেন না।
এরপর উমাইয়া তার স্ত্রীর কাছে ফিরে এসে বললেন, তুমি কি জানো, আমার ইয়াসরিবি ভাই আমাকে কী বলেছে? স্ত্রী জিজ্ঞেস করলেন, কী বলেছে? উমাইয়া বললেন, সে মুহাম্মাদকে বলতে শুনেছে যে, তারা আমাকে হত্যা করবে। তার স্ত্রী বললেন, আল্লাহর শপথ! মুহাম্মাদ মিথ্যা বলেন না।
মক্কার পৌত্তলিকরা বদরের উদ্দেশে রওয়ানা হলেন। এক ঘোষক ঘোষণা দিলে উমাইয়ার স্ত্রী তাকে স্মরণ করিয়ে দিলো, তোমার ইয়াসরিবি ভাই তোমাকে যে কথা বলেছিল সে কথা কি তোমার মনে নেই? তখন উমাইয়া বদরে না যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিলো। আবু জেহেল তাকে বললো, তুমি এখানকার একজন শীর্ষস্থানীয় নেতা। আমাদের সঙ্গে দুই একদিন পথ চলো। উমাইয়া তাদের সঙ্গে চললো।
চলতে চলতে সে বদরে পৌঁছে যায় এবং আল্লাহ তাআলার ইচ্ছায় সে বদরে নিহত হয়। ৩৬৬

টিকাঃ
৩৬৬ সহীহ বুখারী: ৩৬৩২।

📘 নবীজির যুদ্ধ জীবন পাঠ ও পর্যালোচনা > 📄 ধর্মদ্রোহীদের পতনস্থল

📄 ধর্মদ্রোহীদের পতনস্থল


আনাস ইবনে মালেক রা. বলেন, একবার আমরা ওমর রা.-এর সাথে মক্কা ও মদীনার মধ্যবর্তী স্থানে যাচ্ছিলাম। পথে আমরা চাঁদ দেখার চেষ্টা করছিলাম। আমি অত্যন্ত প্রখর দৃষ্টির অধিকারী ছিলাম তাই আমি চাঁদ দেখতে পেয়েছিলাম। আমি ছাড়া অন্য কেউ চাঁদ দেখতে পাচ্ছিলো না। আমি ওমর রা.-কে বললাম, আপনি কি চাঁদ দেখছেন না? তিনি তা দেখছিলেন না। আমাকে বলছিলেন, - আমি বিছানায় শুয়ে শুয়ে চাঁদ দেখে নেবো। অতঃপর তিনি আমাদের বদরযুদ্ধে অংশগ্রহণকারীদের ব্যাপারে শোনাতে লাগলেন। তিনি বলছিলেন, রসূলুল্লাহ সা. বদরযুদ্ধের একদিন পূর্বে বদরে নিহত কাফেরদের ব্যাপারে আমাদেরকে জানিয়েছিলেন। তাদের কে কোথায় মারা যাবে, তাও তিনি জানান। রসূলুল্লাহ সা. আমাদের বলেছিলেন, এটি অমুকের মৃত্যুস্থান হবে ইনশাআল্লাহ। উমর বলেন, আল্লাহর শপথ! রসূলুল্লাহ সা. যে জায়গা দেখিয়েছিলেন কাফেরদের নিহতরা প্রত্যেকেই সেই চিহ্নিত স্থানে মারাই যায়। ৩৬৭

টিকাঃ
৩৬৭ সহীহ মুসলিম: ২৮৭৩।

📘 নবীজির যুদ্ধ জীবন পাঠ ও পর্যালোচনা > 📄 আব্বাস ইবনে আবদুল মুত্তালিবের প্রার্থিত সম্পদ

📄 আব্বাস ইবনে আবদুল মুত্তালিবের প্রার্থিত সম্পদ


রসূলের আরও একটি মু'জিযা হলো, রসূলুল্লাহ সা. আব্বাস ইবনে আবদুল মুত্তালিবের কাছে মুক্তিপণ চাইলে তিনি বলেছিলেন, হে আল্লাহর রসূল! আমার কাছে কোনো অর্থ নেই। রসূলুল্লাহ সা. তাকে বলেন, তুমি এবং তোমার স্ত্রী উম্মুল ফযল মিলে যে সম্পদ মাটিতে পুঁতে রেখেছো, ওই সম্পদ কোথায়? তুমি যুদ্ধযাত্রার পূর্বে তাকে বলেছিলে, যদি আমি এই যুদ্ধে মারা যাই তাহলে এ সম্পদ আমার পুত্র ফযল, আবদুল্লাহ ও কুসামের জন্য ব্যয় করবে।
রসূলুল্লাহ সা.-এর এই কথা শুনে আব্বাস বললেন, আল্লাহর কসম হে আল্লাহর রসূল! আমি একথা বিশ্বাস করছি যে আপনি আল্লাহর রসূল। আমার সম্পদের কথা আমি ও উম্মুল ফজল ছাড়া অন্য কেউ জানে না।
বদরযুদ্ধের পর উমায়ের ইবনে ওয়াহাব জুমাহী তার ছেলের মুক্তিপণের ব্যাপারে আলোচনার ভান করে রসূল সা.-কে হত্যার উদ্দেশ্যে এলে তিনি তাকে তার ও সাফওয়ান ইবনে উমাইয়ার মধ্যকার আলাপ সম্পর্কে স্পষ্ট তথ্য দেন। অত্যন্ত গোপনীয় এসব তথ্য শুনে তিনি চমকে গিয়েছিলেন। ফলে তিনি ইসলামের সুশীতল ছায়ায় আশ্রয় নেন। ৩৬৮
ইবনুল কায়্যিম রহ. যাদুল মাআদ গ্রন্থে লিখেন, বদরযুদ্ধের দিন উক্কাশা ইবনে মুহসিনের তরবারি ভেঙে যায়। রসূলুল্লাহ সা. তাকে কাঠের একটি ছুরি দিয়ে বলেন, তুমি ভালো করে এটা ধরো।
উক্কাশা কাঠের তরবারিটি ধরে দেখেন সেটা খুবই ধারালো তরবারির মতো দেখাচ্ছে। এ তরবারি তার কাছে সারাজীবন ছিল এবং তিনি এটা নিয়েই যুদ্ধে অংশ নিতেন। আর এই তরবারি নিয়েই আবু বকর সিদ্দীক রা.-এর যুগে মুরতাদদের বিরুদ্ধে লড়াই করতে করতে তিনি শাহাদাত লাভ করেন। ৩৬৯
রিফাআ ইবনে রাফে রা. বলেন, বদরযুদ্ধের দিন আমি চোখে তীরবিদ্ধ হই। রসূলুল্লাহ সা. তার পবিত্র থুথু আমার চোখে লাগিয়ে দেন এবং আমার জন্য দোআ করেন। এরপর তীরের আঘাতের বিন্দুমাত্র কষ্টও আর ছিল না। ৩৭০
ড. আবু শাহবা বলেন, এটা মনে করার সুযোগ নেই যে, পবিত্র কুরআনের পর রসূলুল্লাহ সা.-এর নবুওয়াতের প্রমাণ হিসেবে অন্য কোনো অলৌকিক ঘটনার প্রয়োজন নেই। কেননা, রসূলুল্লাহ সা.-এর এসব মুজিযা ছিল অত্যন্ত প্রভাব বিস্তারকারী। অনেকেই এমন মুজিযা দেখে ঈমান আনতেন। অনেকের ঈমানি শক্তি বৃদ্ধি পেতো। এসব মুজিযা দেখে তারা নিশ্চিত হতেন যে, রসূলুল্লাহ সা. নিঃসন্দেহে আল্লাহর প্রেরিত রসূল। তার কাছে ওহী আসে আল্লাহর পক্ষ থেকে। কেননা, এমন অদৃশ্যের বিষয় ওহী ছাড়া পাওয়া যেতে পারে না। কোনো ব্যক্তির হাতে ধরা কাঠের টুকরো যদি ধারালো তরবারিতে রূপান্তরিত হয়, নিশ্চয় তার ঈমানের ভিত সুদৃঢ় হবে! সব যুগের মানবজাতির জন্য তিনি অনন্য কীর্তি রেখে যেতে প্রয়াস পাবেন। ৩৭১

টিকাঃ
৩৬৮ আবু শাহবা প্রণীত আসসীরাতুন নববিয়‍্যাহ ২/১৭৮।
৩৬৯ যাদুল মাআদ: ৩/১৮৬।
৩৭০ যাদুল মাআদ: ৩/১৮৬।
৩৭১ আবু শাহবা প্রণীত আসসীরাতুন নববিয়‍্যাহ ২/১৭৮।

📘 নবীজির যুদ্ধ জীবন পাঠ ও পর্যালোচনা > 📄 মুশরিকদের কাছ থেকে সহযোগিতা নেওয়ার বিধান

📄 মুশরিকদের কাছ থেকে সহযোগিতা নেওয়ার বিধান


বদরযুদ্ধের শুরুর দিকে একজন পৌত্তলিক মুসলিম বাহিনীতে যোগদানের ব্যাপারে রসূলুল্লাহ সা.-এর অনুমতি চায়। সে নবীজির সকাশে আরজি জানায়, আমি আপনাদের সাথে যুদ্ধে অংশগ্রহণ করতে চাই। রসূলুল্লাহ সা. বলেন, তুমি ফিরে যাও। আমি মুশরিকদের কাছ থেকে সাহায্য নেবো না। ৩৭২
হাদীসটি দ্বারা প্রমাণিত হয়, শরীয়তের মূলনীতি অনুযায়ী সাধারণ পরিস্থিতিতে মুশরিকদের কাছ থেকে সাহায্য নেওয়া অবৈধ। কিন্তু কিছু শর্তসাপেক্ষে অমুসলিমদের কাছ থেকে সাহায্য নেওয়া বৈধ। যেমন, অমুসলিমদের কাছ থেকে সাহায্য নেওয়ার বিশেষ কোনো উপকারী দিক থাকলে। এ ক্ষেত্রে দেখতে হবে, অমুসলিমের কাছ থেকে সাহায্য গ্রহণের ফলে যেন ইসলামী দাওয়াত বা ইসলামী মূল্যবোধের ওপর কোনো কুপ্রভাব না পড়ে। সে যেন সহযোগিতা নেওয়ার উপযুক্ত হয়। এছাড়া এই সহযোগিতা হতে হবে ইসলামী নেতৃত্বের অধীনে। কোনো পরিস্থিতিতেই কোনো মুশরিককে নেতৃত্বের আসনে বসানো যাবে না। অমুসলিমদের কাছ থেকে সাহায্য নেওয়ার ফলে যেন মুসলমানদের মধ্যে সন্দেহের উদ্রেক না হয়। অধিক প্রয়োজন দেখা দিলেই কেবল তাদের সহযোগিতা নেওয়া যেতে পারে। না-হলে তাদের কাছ থেকে সহযোগিতা নেওয়া অবৈধ।
এই মূলনীতির আলোকেই রসূলুল্লাহ সা. কুরায়েশ ব্যবসায়ী কাফেলার উদ্দেশে যাত্রা করা মুসলিম বাহিনীতে কোনো কাফেরকে অন্তর্ভুক্ত করেননি। কেননা, সেখানে তাদের অন্তর্ভুক্ত করার বিশেষ কোনো প্রয়োজন ছিল না। অন্যদিকে উপরোক্ত শর্তসমূহের আলোকে মদীনা অভিমুখে হিজরতের সময় অর্থের বিনিময়ে রসূলুল্লাহ সা. ও আবু বকর সিদ্দীক রা. পথপ্রদর্শক হিসেবে কাফের আবদুল্লাহ ইবনে আরিকাতকে নিযুক্ত করেছিলেন।
নবীজির চাচা আবু তালিবের সাহায্য-সহযোগিতা গ্রহণের ক্ষেত্রেও উপরোক্ত নীতিমালা অনুসরণ করা হয়। অনুরূপভাবে রসূলুল্লাহ সা. তায়েফ থেকে ফেরার সময় মুতয়িম ইবনে আদির নিরাপত্তা-প্রস্তাব গ্রহণ করেন। সাহাবায়ে কেরামও বিভিন্ন ক্ষেত্রে কাফেরদের নির্যাতন থেকে বাঁচতে অন্য কোনো কাফিরের নিরাপত্তা গ্রহণ করেছিলেন। ৩৭৩
সামগ্রিকভাবে উক্ত নীতিমালা অনুসরণ করতে হলে অত্যন্ত বিচক্ষণতা ও ঈমানী চেতনা অপরিহার্য।

টিকাঃ
৩৭২ উমরী প্রণীত আসসীরাতুন নববিয়‍্যাহ আস সহীহাহ: ১/৩৫৫।
৩৭৩ 'আল মুসতাফাদ মিন কাসাসিল কুরআন: ২/১৪৪-১৪৫।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00