📄 হক-বাতিল নির্ণয়ের দিন
কুরআনে কারীমে বদরযুদ্ধকে 'ইয়াওমুল ফুরকান' তথা হক-বাতিল নির্ণয়ের দিন বলা হয়েছে। বদরযুদ্ধের এ নামকরণ তাৎপর্যপূর্ণ। আল্লাহ তাআলা বলেন :
وَاعْلَمُوا أَنَّمَا غَنِمْتُمْ مِنْ شَيْءٍ فَأَنَّ لِلَّهِ خُمُسَهُ وَلِلرَّسُولِ وَلِذِي الْقُرْبَى وَالْيَتَامَى وَالْمَسَاكِينِ وَابْنِ السَّبِيلِ إِنْ كُنْتُمْ آمَنْتُمْ بِاللَّهِ وَمَا أَنْزَلْنَا عَلَى عَبْدِنَا يَوْمَ الْفُرْقَانِ يَوْمَ الْتَقَى الْجَمْعَانِ وَاللَّهُ عَلَى كُلِّ شَيْءٍ قَدِيرُه
আর তোমরা জেনে রাখ, তোমরা যা কিছু গনীমতরূপে পেয়েছ, নিশ্চয় আল্লাহর জন্যই তার এক পঞ্চমাংশ ও রসূলের জন্য, নিকট আত্মীয়, ইয়াতীম, মিসকীন ও মুসাফিরের জন্য, যদি তোমরা ঈমান এনে থাকো আল্লাহর প্রতি এবং হক ও বাতিলের ফয়সালার দিন আমি আমার বান্দার ওপর যা নাযিল করেছি তার প্রতি, যেদিন দু'টি দল মুখোমুখি হয়েছে, আর আল্লাহ সব কিছুর উপর ক্ষমতাবান। ৩৪৯
উপরোক্ত আয়াতে বদরের দিনকে يَوْمَ الْفُرْقَانِ 'ইয়াওমুল ফুরকান' তথা হক- বাতিল নির্ণয়ের দিন বলে আখ্যায়িত করা হয়েছে। এ প্রেক্ষিতে সাইয়েদ কুতুব শহীদ বলেন, বদরযুদ্ধ শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত আল্লাহ তাআলার নির্দেশনা, তার তত্ত্বাবধান ও সাহায্যে সুসম্পন্ন হয়। এ যুদ্ধ ছিল হক-বাতিলের মধ্যে পার্থক্য নির্ণয়কারী। কিন্তু الْفُرْقَانِ শব্দের অর্থ শুধু তাই নয় যা সচরাচর তাফসীরকারকগণ বুঝে থাকেন; বরং এ শব্দের ভেতর আরো গভীর ভাব ও মর্ম বিদ্যমান রয়েছে।
প্রকৃত অর্থেই বদর যুদ্ধ ছিল হক-বাতিলের পার্থক্য নির্ণায়ক। বদর যুদ্ধ ওই হককে বাতিল থেকে আলাদাভাবে উপস্থাপন করেছিল, যার ভিত্তিতে প্রতিষ্ঠিত রয়েছে এ আসমান-জমিন ও এর সমুদয় সৃষ্টি। এর মাধ্যমে আল্লাহ তাআলার রুবুবিয়ত ও তার শ্রেষ্ঠত্ব প্রতিষ্ঠিত হয়। আকাশ-জমিনের সকল কিছুকে নিয়োজিত করা হয় আল্লাহর দাসত্বে; যার কোনো অংশীদারিত্ব নেই। যার ফয়সালা কেউ চ্যালেঞ্জ করতে সক্ষম নয়। শাশ্বত সত্যের সাথে ওই মিথ্যার পার্থক্য করে দেওয়া হয়, যা সে যুগে পুরো পৃথিবীকে আবৃত করে রেখেছিল। এই মিথ্যা সত্যকে ঢেকে রেখেছিল। শয়তান মানুষের ওপর রাজত্ব চালাচ্ছিলো। মানুষ ছিল প্রবৃত্তির পূজারী। বদরের পরে হক কোনটি আর বাতিল কোনটি তা মানুষের কাছে অস্পষ্ট থাকেনি।
বদরযুদ্ধ আল্লাহর একত্ব বা শাশ্বত সত্যকে মিথ্যা ও শিরকের সকল ধরন ও প্রকার থেকে আলাদা করে দেয়। জাহিলি যুগের রীতিনীতির অসারতা তুলে ধরে মানুষের সামনে। স্বেচ্ছাচারিতা ও মানবরচিত রীতিনীতির পূজা এবং আল্লাহ তাআলার পাঠানো বিধিবিধানের মধ্যকার পার্থক্যও নির্ণয় করে দিয়েছে বদর। সেদিন ওই শীরগুলো উঁচু হয়েছিল যা আল্লাহ ব্যতীত অন্য কারও সামনে মাথা নোয়াতো না। বদর ছিল শয়তানি শক্তির হাতে জিম্মি মানবজাতির মুক্তির দিন।
এ দিনটি ছিল ইসলামী বিপ্লবের ইতিহাসে অবিস্মরণীয়। ধৈর্য, আল্লাহর সিদ্ধান্তের ওপর সন্তুষ্টি, ভ্রাতৃত্ব ও ঐক্যের অনুপম দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছিল দিনটি। বদর ছিল নতুন এক বিপ্লব ও ইসলামী শক্তির নবযাত্রা। সৃষ্টিকে সৃষ্টির গোলামি থেকে মুক্ত করে এক আল্লাহর গোলামিতে ন্যাস্ত করার যে চেষ্টা চলছিল তার বেগ বহুগুণ বাড়িয়ে দেয় এই দিনটি। শয়তানি শক্তি ক্ষমতা হারানোর দিন এ বদর।
সাইয়েদ কুতুব শহীদ আরও বলেন, নিঃসন্দেহে বদরযুদ্ধ অন্য একটি দিক থেকেও ফয়সালাকারী হিসেবে বিবেচিত হয়। যার বিবরণ আল্লাহ তাআলা কুরআনে কারীমে এভাবে দিয়েছেন:
স্মরণ করো, যখন আল্লাহ তোমাদেরকে দু'টি দলের মধ্য হতে একটি সম্বন্ধে প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন যে, ওটা তোমাদের করতলগত হবে। তোমরা এই আশা করেছিলে যেন নিরস্ত্র দলটি তোমাদের আয়ত্তে এসে পড়ে, আর আল্লাহর ইচ্ছা ছিল এই যে, তিনি স্বীয় নির্দেশাবলী দ্বারা সত্যকে সত্যরূপে প্রতিষ্ঠা করেন এবং কাফেরদেরকে নির্মূল করেন। এটা এ জন্য যাতে সত্য সত্যরূপে এবং অসত্য অসত্যরূপে প্রতিভাত হয়ে যায়, যদিও এটা অপরাধীরা অপ্রীতিকরই মনে করে।৩৫১
বদরযুদ্ধে যারা অংশগ্রহণ করেন, তারা মূলত আবু সুফিয়ানের ব্যবসায়ী কাফেলার উদ্দেশে মদীনা থেকে বেরিয়েছিলেন। কিন্তু আল্লাহ তাআলা চাচ্ছিলেন, আবু সুফিয়ানের নিরস্ত্র কাফেলার নাগাল যেন মুসলমানরা না পায়; मुसलमानों মুকাবিলা যেন মুশরিক নেতা আবু জেহেলের নেতৃত্বাধীন সশস্ত্র বাহিনীর সাথে হয়। এরপর যুদ্ধ হয় এবং নিহত ও বন্দী হন কাফেরদের নেতারা। নিরাপদে ও সহজে মুসলমানরা গনীমতের অধিকারী হয়ে যাক, আল্লাহ তাআলা তা চাননি। আল্লাহর অভিপ্রায় ছিল সত্যকে সত্য হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করা। মিথ্যাকে মিথ্যা হিসেবে স্পষ্ট করা।
হককে হক এবং বাতিলকে বাতিল হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করার জন্য শুধু হকের সত্যতা ও বাতিলের অসারতা তুলে ধরাই যথেষ্ট নয়; বরং এর জন্য সত্যকে সত্য হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করা, ও মিথ্যাকে বাতিল হিসেবে প্রমাণিত করা এবং পৃথিবীপৃষ্ঠ থেকে মুছে ফেলা আবশ্যক। আর এটা তখনই সম্ভব যখন হকপন্থীরা বিজয়ী হবেন এবং মিথ্যার দোসররা পরাজিত হয়ে নিশ্চিহ্ন হয়ে যাবে। দীন ইসলাম কেবল কয়েকটি বিশ্বাসগত বিধান জানার নাম নয়; বরং এটি একটি বাস্তবমুখী ও কল্যাণধর্মী দীন।
নিঃসন্দেহে বদর প্রান্তরে হক হক হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়। মিথ্যা পরাজিত হয়। এটি ছিল হক-বাতিলের ফয়সালাকারী দিন। তাই কুরআনে বলা হয়েছে বদর যুদ্ধের মাধ্যমে আল্লাহ সত্যকে সত্যরূপে প্রতিষ্ঠিত করেছেন এবং অসত্যকে অসত্যরূপে প্রতিভাত করেছেন।
আল্লাহ সবকিছুতে সক্ষম ও শক্তিমান। বদরের দিন আল্লাহ তাআলার ক্ষমতার কিঞ্চিত প্রকাশ ঘটে। তার শক্তিকে কেউ চ্যালেঞ্জ করতে পারেনি। তার শক্তি সম্পর্কে সন্দেহ পোষণ করবে এমনও কেউ ছিল না। বদরের ঘটনাকে আল্লাহ তাআলার বিশেষ ক্ষমতার প্রকাশ ছাড়া অন্য কিছু বলে ব্যাখ্যা করা সম্ভব নয়। নিশ্চই আল্লাহ সবকিছুতে সক্ষম ও শক্তিমান।৩৫২
টিকাঃ
৩৪৯ সূরা আনফাল : ৪১।
তাফসীর ফি যিলালিল কুরআন: ৩/১৫২১-১৫২২।
৩৫১ সূরা আনফাল: ৭-৮।
৩৫২ তাফসীর ফি যিলালিল কুরআন: ৩/১৫২৩-১৫২৪।
📄 ঈমানের ভিত্তিতে শত্রুতা-মিত্রতা
বদর যুদ্ধ মুসলিম উম্মাহর জন্য শত্রুতা-মিত্রতার নীতিমালা প্রণয়ন করেছে। এতে সমন্বয় ঘটেছে আত্মিক ও বাহ্যিক তারবিয়াতের। ফলে হক-বাতিলের পার্থক্য নিরূপণ সহজ হয়েছে। ইসলাম ও কুফরের মধ্যকার সীমারেখা স্পষ্ট হয়েছে। সাহাবায়ে কেরাম এই নীতিমালা বাস্তবায়ন করে দেখান। জাহিলি যুগের অসার কোনো মূল্যবোধই তাদের সামনে বাধা হয়ে দাঁড়াতে পারেনি। আল্লাহর জন্য বাবা ছেলের ও ভাই ভাইয়ের মোকাবেলা করতে প্রস্তুত ছিলেন। শত্রুতা-মিত্রতার ক্ষেত্রে ইসলামী দৃষ্টিভঙ্গীকে প্রাধান্য দেওয়ার বেশ কিছু দৃষ্টান্ত সেদিন স্থাপিত হয়। যেমন:
১. এ যুদ্ধে আবু হুযায়ফা ইবনে উতবা ইবনে রাবিয়া রা. ছিলেন মুসলিম বাহিনীর সৈনিক। অথচ তার ভাই ওয়ালিদ ইবনে উতবা, পিতা উতবা ইবনে রাবিয়া ও চাচা শাইবা ইবনে রাবিয়া ছিলেন কাফেরদের দলভুক্ত। এরা সবাই যুদ্ধের শুরুতেই দ্বন্দ্বযুদ্ধে নিহত হন।
২. সিদ্দীকে আকবার হযরত আবু বকর রা. এ যুদ্ধে مسلمانوں দলভুক্ত থাকলেও তার ছেলে আবদুর রহমান ছিলেন মুশরিক বাহিনীর সৈনিক।
৩. মুসআব ইবনে উমায়ের রা. ছিলেন বদরযুদ্ধে मुसलमानों পতাকাবাহী। অন্যদিকে তার ভাই আবু আযীয ইবনে উমায়ের ছিলেন মুশরিক বাহিনীর সৈনিক। তিনি একজন আনসারী সাহাবীর হাতে বন্দী হলে মুসআব তাকে বলছিলেন, এর মা বেশ ধনী মহিলা। তুমি এর বিনিময়ে বিশাল অংকের মুক্তিপণ নেবে।
আবু আযীয এ কথা শুনে বলেন, হে আমার ভাই! আমার ব্যাপারে আপনি এই পরামর্শ দিচ্ছেন? জবাবে মুসআব ইবনে উমায়ের তাকে বলেন, তুমি নও; বরং এ আনসারী লোকটি আমার ভাই। এটি ছিল মিত্রতা, হৃদ্যতা, ভালোবাসা ও শত্রুতা পোষণের ইসলামী নীতির বাস্তবায়ন। দীনের খাতিরেই তারা মিত্রতা গড়েছেন ও শত্রুতা করেছেন। রক্তের সম্মন্ধকে গুরুত্ব দেন নি।°৫৩
৪. বদরযুদ্ধে মুসলমানদের শ্লোগান ছিল 'আহাদ আহাদ'। যার মাধ্যমে এ কথা বোঝানো হয়েছিল যে, ইসলামের এ যুদ্ধ শুধু আল্লাহ তাআলার রুবুবিয়ত প্রতিষ্ঠার প্রয়াস। এ যুদ্ধ গোত্রপ্রীতি বা কোনো জাতীয়তাবাদ প্রতিষ্ঠার জন্য নয়। এক আল্লাহর ওপর ঈমানই ছিল এই যুদ্ধে শত্রুতা-মিত্রতার ভিত্তি।
ঈমান রক্ষার জন্য প্রয়োজন তীক্ষ্ণ বুদ্ধিমত্তা, প্রবল ধী-শক্তি ও কার্যকর মেধা। তাই আমরা দেখতে পাই, রসূলুল্লাহ সা. যখন মদীনা মুনাওয়ারায় ফিরে আসেন, তখন মক্কায় অবস্থানরত সামর্থ্যবান প্রত্যেকেই মদীনায় চলে আসেন। ততদিনে শুধু তারাই মক্কা মুকাররামায় রয়ে গিয়েছিলেন যাদেরকে কাফেররা বন্দী করে রেখেছিল অথবা যারা ফিরতে অক্ষম ছিলেন। তাদের মধ্যে কয়েকজন বদরযুদ্ধে মুশরিক বাহিনীর সাথে অংশগ্রহণ করতে বাধ্য হন। এই তালিকায় আছেন, আবদুল্লাহ ইবনে সুহাইল ইবনে আমর, হারেস ইবনে জামআ ইবনে আসওয়াদ, আবু কায়েস ইবনে ফাকাহ, আবু কায়েস ইবনে ওয়ালিদ ইবনে মুগীরাহ, আলী ইবনে উমাইয়া ইবনে খালফ ও আস ইবনে মুনাব্বিহ।
এদের মধ্যে আবদুল্লাহ ইবনে সুহাইল রা. মুশরিক বাহিনী থেকে পালিয়ে রসূলুল্লাহ সা.-এর দরবারে উপস্থিত হন। তিনি বদরযুদ্ধে مسلمانوں পক্ষে কাজ করার সুযোগ লাভ করেন। ৩৫৪
আবদুল্লাহ ইবনে সুহাইল রা. ছাড়া অন্যান্যরা مسلمانوں সাথে যোগ দিতে পারেননি। তারা মুশরিক বাহিনীর সাথে থেকে مسلمانوں বিরুদ্ধে যুদ্ধ করেন এবং সবাই নিহত হন। ৩৫৫ তাদের ব্যাপারে আল্লাহ তাআলা বলেন:
إِنَّ الَّذِينَ تَوَفَّاهُمُ الْمَلَائِكَةُ ظَالِمِي أَنْفُسِهِمْ قَالُوا فِيمَ كُنْتُمْ قَالُوا كُنَّا مُسْتَضْعَفِينَ فِي الْأَرْضِ قَالُوا أَلَمْ تَكُنْ أَرْضُ اللَّهِ وَاسِعَةً فَتُهَاجِرُوا فِيهَا فَأُولَئِكَ مَأْوَاهُمْ جَهَنَّمُ وَسَاءَتْ مَصِيرًا
নিশ্চয় যারা নিজেদের প্রতি যুলুমকারী, ফেরেশতারা তাদের জান কবজ করার সময় বলে, তোমরা কী অবস্থায় ছিলে? তারা বলে, আমরা জমিনে দুর্বল ছিলাম। ফেরেশতারা বলে, আল্লাহর জমিন কি প্রশস্ত ছিল না যে, তোমরা তাতে হিজরত করতে? সুতরাং ওরাই তারা যাদের আশ্রয়স্থল জাহান্নাম। আর তা মন্দ প্রত্যাবর্তনস্থল। ৩৫৬
ইবনে আব্বাস রা. বলেন, মক্কার কেউ কেউ লুকিয়ে ইসলামধর্ম গ্রহণ করে মক্কায়ই অবস্থান করছিলেন। বদর যুদ্ধের দিন মুশরিকরা জোর করে তাদের যুদ্ধে নিয়ে যায়। যুদ্ধক্ষেত্রে যখন তারা নিহত হচ্ছিল তখন মুসলমানরা বলছিলেন, এরা তো আমাদের সঙ্গী, মুশরিকরা এদের জোর করে নিয়ে এসেছে। তাদের উক্তির পরিপ্রেক্ষিতে উপরোক্ত আয়াত নাযিল হয়। মুসলিম দলে যোগ দেবার পর্যাপ্ত সুযোগ থাকার পরও তারা সে চেষ্টা করেনি। উভয় সেনাবাহিনীর মাঝে সেদিন বিশেষ কোনো দূরত্ব ছিল না। চাইলেই তারা রসূলুল্লাহ সা.-এর কাছে উপস্থিত হতে পারতো, যেভাবে এসেছিলেন আবদুল্লাহ ইবনে সুহাইল। ৩৫৭
এটা সন্দেহাতীত যে, মুমিনের এমন কিছু গুণ থাকা আবশ্যক যার ফলে তার ঈমানের সত্যতা ও শক্তি বোঝা যায়। অন্যান্য কৃষ্টি-কালচারের চেয়ে ঈমানি চেতনাকে প্রাধান্য দেওয়া মুমিনের জন্য আবশ্যক। কেউ এটি অর্জন করতে পারলে সে কল্যাণকর কাজের সুযোগ পায়। তার কাজে ঈমানের নূর দেখা যায়। তার কথাবার্তা, হাসি-কান্না ও যাবতীয় পদক্ষেপ হয় ঈমানের আলোয় উদ্ভাসিত। এ কারণেই কাফেরদের দলভুক্ত मुसलमानों অজুহাত গ্রহণযোগ্য হয়নি। কেননা, তারা পূর্ণাঙ্গ ঈমানের অধিকারী ছিলেন না। তারা নিজেদের কর্মকাণ্ডে ঈমানের দ্যুতি দেখাতে পারেননি। ৩৫৮
এই ঈমানী দ্যুতির কারণেই সাহাবায়ে কেরাম দীনের ব্যাপারে শত্রুতা-মিত্রতার ক্ষেত্রে দৃষ্টান্ত দেখাতে পেরেছিলেন। নিজেদের গোত্র, বংশ, আত্মীয়তার বন্ধন ইত্যাদির চেয়ে আল্লাহ ও তার রসূলের ভালোবাসাকেই প্রাধান্য দিতে পেরেছেন। তাদের প্রশংসায় আল্লাহ তাআলা বলেন:
لَا تَجِدُ قَوْمًا يُؤْمِنُونَ بِاللَّهِ وَالْيَوْمِ الْآخِرِ يُوَادُّونَ مَنْ حَادَّ اللَّهَ وَرَسُولَهُ وَلَوْ كَانُوا آبَاءَهُمْ أَوْ أَبْنَاءَهُمْ أَوْ إِخْوَانَهُمْ أَوْ عَشِيرَتَهُمْ أُولَئِكَ كَتَبَ فِي قُلُوبِهِمُ الْإِيمَانَ وَأَيَّدَهُمْ بِرُوحٍ مِنْهُ وَيُدْخِلُهُمْ جَنَّاتٍ تَجْرِي مِنْ تَحْتِهَا الْأَنْهَارُ خَالِدِينَ فِيهَا رَضِيَ اللَّهُ عَنْهُمْ وَرَضُوا عَنْهُ أُولَئِكَ حِزْبُ اللَّهِ أَلَا إِنَّ حِزْبَ اللَّهِ هُمُ الْمُفْلِحُونَ
আল্লাহ ও পরকালে বিশ্বাসী এমন কোনো সম্প্রদায় তুমি পাবে না যারা আল্লাহ ও তাঁর রসূলের বিরোধিতাকারীদেরকে ভালোবাসে; হোক না এই বিরোধীরা তাদের পিতা অথবা পুত্র অথবা তাদের ভাই অথবা তাদের জ্ঞাতি গোষ্ঠী। আল্লাহ এদের অন্তরে ঈমান বদ্ধমূল করে দিয়েছেন, আর নিজের পক্ষ থেকে রূহ দিয়ে তাদেরকে শক্তিশালী করেছেন। তাদেরকে তিনি দাখিল করবেন জান্নাতে যার তলদেশ দিয়ে বয়ে চলেছে নদী-নালা, তাতে তারা চিরকাল থাকবে। আল্লাহ তাদের প্রতি সন্তুষ্ট আর তারাও তাঁর প্রতি সন্তুষ্ট। এরাই আল্লাহর দল; জেনে রেখো, আল্লাহর দলই সাফল্যমন্ডিত।
টিকাঃ
°৫৩ মুঈনুস সীরাহ: ২১৩।
৩৫৪ মুঈনুস সীরাহ: ২১৭।
৩৫৫ সীরাতে ইবনে হিশাম: ২/২৫৩।
৩৫৬ সূরা নিসা: ৯৭।
৩৫৭ মুঈনুস সীরাহ: ২১৭।
৩৫৮ মুঈনুস সীরাহ: ২১৮।
📄 বদরে প্রকাশিত রসূলুল্লাহ সা.-এর মুজিযা
বদর দিবসে রসূলুল্লাহ সা.-এর বেশ কয়েকটি মুজিযা দেখা গিয়েছিল। একটি ছিল রসূল সা.-এর অদৃশ্যের সংবাদ প্রদান। নিঃসন্দেহে অদৃশ্যের জ্ঞান আল্লাহর জন্য বিশেষায়িত। কুরআনে কারীমে একাধিক আয়াতে আল্লাহ তাআলা অদৃশ্যের জ্ঞানকে শুধু নিজের জন্যে নির্দিষ্ট করেছেন। যেমন:
قُلْ لَا يَعْلَمُ مَنْ فِي السَّمَاوَاتِ وَالْأَرْضِ الْغَيْبَ إِلَّا اللَّهُ وَمَا يَشْعُرُونَ أَيَّانَ يُبْعَثُونَ
বলো, আকাশ ও পৃথিবীতে যারা আছে তারা কেউই অদৃশ্য বিষয়ের জ্ঞান রাখে না আল্লাহ ছাড়া, আর তারা জানে না কখন তাদেরকে জীবিত করে উঠানো হবে।
আল্লাহ তাআলা আরও বলেন,
وَعِنْدَهُ مَفَاتِحُ الْغَيْبِ لَا يَعْلَمُهَا إِلَّا هُوَ وَيَعْلَمُ مَا فِي الْبَرِّ وَالْبَحْرِ وَمَا تَسْقُطُ مِنْ وَرَقَةٍ إِلَّا يَعْلَمُهَا وَلَا حَبَّةٍ فِي ظُلُمَاتِ الْأَرْضِ وَلَا رَطْبٍ وَلَا يَابِسٍ إِلَّا فِي كِتَابٍ مُبِينٍ
আর তাঁর কাছে রয়েছে গায়েবের চাবিসমূহ, তিনি ছাড়া এ বিষয়ে কেউ জানে না এবং তিনি অবগত রয়েছেন স্থলে ও সমুদ্রে যা কিছু আছে। আর কোনো পাতা ঝরে না, কিন্তু তিনি তা জানেন এবং জমিনের অন্ধকারে কোনো দানা পড়ে না, না কোনো ভেজা এবং না কোনো শুষ্ক কিছু; কিন্তু রয়েছে সুস্পষ্ট কিতাবে।
আল্লাহর প্রেরিত নবী ও রসূলগণ গায়েবী ইলম তথা অদৃশ্যের জ্ঞান রাখেন না। আল্লাহ তাআলা আরো বলেন:
قُلْ لَا أَقُولُ لَكُمْ عِنْدِي خَزَائِنُ اللَّهِ وَلَا أَعْلَمُ الْغَيْبَ وَلَا أَقُولُ لَكُمْ إِنِّي مَلَكَ إِنْ أَتَّبِعُ إِلَّا مَا يُوحَى إِلَيَّ قُلْ هَلْ يَسْتَوِي الْأَعْمَى وَالْبَصِيرُ أَفَلَا تَتَفَكَّرُونَ
বলো, আমি তোমাদেরকে বলি না আমার কাছে আল্লাহর ধন-ভান্ডার আছে, আর আমি অদৃশ্যের খবরও জানি না। আর আমি তোমাদেরকে এ কথাও বলি না যে, আমি ফেরেশতা, আমার প্রতি যা অবতীর্ণ করা হয় তাছাড়া (অন্য কিছুর) আমি অনুসরণ করি না। বলো, অন্ধ আর চোখওয়ালা কি সমান, তোমরা কি চিন্তা করে দেখো না?৩৬২
অদৃশ্যের জ্ঞান কেবল আল্লাহ তাআলারই আছে। অন্য কাউকে এ জ্ঞান দেওয়া হয়নি। পাশাপাশি বিভিন্ন আয়াতে এ কথাও তুলে ধরা হয়েছে যে, আল্লাহ তাআলা নিজের ইচ্ছা অনুযায়ী তার প্রেরিত নবী-রসূলের কাউকে নির্দিষ্ট পরিমাণ গায়েবী ইলম ওহীর মাধ্যমে জানিয়ে থাকেন। আল্লাহর প্রেরিত নবী-রসূলের জন্য তা মুজিযা। এটা তাদের নবুওয়াতের সত্যতার প্রমাণও বটে। এ ব্যাপারে কুরআনে কারীমে এসেছে:
مَا كَانَ اللَّهُ لِيَذَرَ الْمُؤْمِنِينَ عَلَى مَا أَنْتُمْ عَلَيْهِ حَتَّى يَمِيزَ الْخَبِيثَ مِنَ الطَّيِّبِ وَمَا كَانَ اللَّهُ لِيُطْلِعَكُمْ عَلَى الْغَيْبِ وَلَكِنَّ اللَّهَ يَجْتَبِي مِنْ رُسُلِهِ مَنْ يَشَاءُ فَآمِنُوا بِاللَّهِ وَرُسُلِهِ وَإِنْ تُؤْمِنُوا وَتَتَّقُوا فَلَكُمْ أَجْرٌ عَظِيمٌ
অসৎকে সৎ থেকে পৃথক না করা পর্যন্ত তোমরা যে অবস্থায় আছো, আল্লাহ মুমিনদেরকে সে অবস্থায় ছেড়ে দিতে পারেন না এবং আল্লাহ তোমাদেরকে গায়েবের বিধান জ্ঞাত করেন না, তবে আল্লাহ তার রসূলগণের মধ্যে যাকে ইচ্ছে বেছে নেন, কাজেই তোমরা আল্লাহ এবং তার রসূলগণের প্রতি ঈমান আনো। যদি তোমরা ঈমান আনো আর তাকওয়া অবলম্বন করো, তাহলে তোমাদের জন্য আছে মহাপুরস্কার। ৩৬৩
অন্য এক আয়াতে আল্লাহ তাআলা বলেন:
عَالِمُ الْغَيْبِ فَلَا يُظْهِرُ عَلَى غَيْبِهِ أَحَدًا إِلَّا مَنِ ارْتَضَى مِنْ رَسُولٍ فَإِنَّهُ يَسْلُكُ مِنْ بَيْنِ يَدَيْهِ وَمِنْ خَلْفِهِ رَصَدًا
একমাত্র তিনিই অদৃশ্যের জ্ঞানী, তিনি তাঁর অদৃশ্যের জ্ঞান কারো কাছে প্রকাশ করেন না। তবে তাঁর মনোনীত রসূল ছাড়া। আর তিনি তখন তার আগে-পিছে পাহারাদার নিযুক্ত করবেন।৩৬৪
সুতরাং বোঝা গেলো, অদৃশ্যের যেসব বিষয় রসূলুল্লাহ সা. বলেছিলেন তা আল্লাহ তাআলা তাকে ওহীর মাধ্যমে জানিয়েছিলেন। সেটা তার নবুওয়াত ও রিসালাতের সত্যতারও প্রমাণ। বদর যুদ্ধের আগে আল্লাহর পক্ষ থেকে ওহীর মাধ্যমে পাওয়া অদৃশ্যের বিভিন্ন সংবাদ রসূলুল্লাহ সা. সাহাবীদের বলেন।৩৬৫
টিকাঃ
৩৬২ সূরা আনআম: ৫০।
৩৮০ সূরা আলে ইমরান: ১৭৯।
৩৬৪ সূরা জিন: ২৬-২৭।
৩৬৫ নাদরাতুন নায়ীম: ১/৪৫৩।
📄 উমাইয়া ইবনে খালফের পতন
আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ রা. বলেন, সাআদ ইবনে মুআয রা. উমরাহ আদায় করার জন্য মক্কায় যান। তিনি সাফওয়ানের পিতা উমাইয়া ইবনে খালফের বাড়িতে অতিথি হলেন। উমাইয়াহও সিরিয়ায় যাওয়ার পথে মদীনায় সাআদ রা.-এর বাড়িতে অবস্থান করতেন। উমাইয়া সাআদ রা.-কে বললেন, একটু অপেক্ষা করুন, দুপুরে মানুষের চলাফেরা কমে গেলে আপনি গিয়ে তাওয়াফ করে নেবেন।
সাআদ রা. তাওয়াফ করছিলেন। এমতাবস্থায় আবু জেহেল এসে উপস্থিত হলেন। সাআদকে দেখে তিনি জিজ্ঞেস করলেন, কাবায় তাওয়াফকারী লোকটি কে? সাআদ রা. বললেন, আমি সাআদ। আবু জেহেল বললো, তুমি নির্বিঘ্নে কাবার তাওয়াফ করছো? অথচ তোমরাই মুহাম্মাদ ও তার সাথিদেরকে আশ্রয় দিয়েছো? সাআদ রা. বললেন, হ্যাঁ। এভাবে দুজনের মধ্যে কথা কাটাকাটি হয়।
এ সময় উমাইয়া সাআদ রা.-কে বললেন, আবুল হাকামের সঙ্গে উচ্চৈঃস্বরে কথা বলো না। সে মক্কাবাসীদের নেতা। সাআদ রা. বললেন, আল্লাহর কসম! তুমি যদি আমাকে বায়তুল্লাহর তাওয়াফ করতে বাধা দাও, তবে আমিও সিরিয়ার সঙ্গে তোমাদের ব্যবসা-বাণিজ্যের পথ রুদ্ধ করে দেবো। উমাইয়া সাআদ রা.-কে বলতে লাগলেন, তোমার স্বর উঁচু করো না।
উমাইয়া সাআদকে নিবৃত করতে চাইলে সাআদ রা. ক্রোধান্বিত হয়ে বললেন, আমাকে ছেড়ে দাও। আমি মুহাম্মাদ সা.-কে বলতে শুনেছি, তারা তোমাকে হত্যা করবে। উমাইয়া বললেন, আমাকেই? তিনি বললেন, হ্যাঁ। উমাইয়া বললেন, আল্লাহর শপথ! মুহাম্মাদ কখনও মিথ্যা কথা বলেন না।
এরপর উমাইয়া তার স্ত্রীর কাছে ফিরে এসে বললেন, তুমি কি জানো, আমার ইয়াসরিবি ভাই আমাকে কী বলেছে? স্ত্রী জিজ্ঞেস করলেন, কী বলেছে? উমাইয়া বললেন, সে মুহাম্মাদকে বলতে শুনেছে যে, তারা আমাকে হত্যা করবে। তার স্ত্রী বললেন, আল্লাহর শপথ! মুহাম্মাদ মিথ্যা বলেন না।
মক্কার পৌত্তলিকরা বদরের উদ্দেশে রওয়ানা হলেন। এক ঘোষক ঘোষণা দিলে উমাইয়ার স্ত্রী তাকে স্মরণ করিয়ে দিলো, তোমার ইয়াসরিবি ভাই তোমাকে যে কথা বলেছিল সে কথা কি তোমার মনে নেই? তখন উমাইয়া বদরে না যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিলো। আবু জেহেল তাকে বললো, তুমি এখানকার একজন শীর্ষস্থানীয় নেতা। আমাদের সঙ্গে দুই একদিন পথ চলো। উমাইয়া তাদের সঙ্গে চললো।
চলতে চলতে সে বদরে পৌঁছে যায় এবং আল্লাহ তাআলার ইচ্ছায় সে বদরে নিহত হয়। ৩৬৬
টিকাঃ
৩৬৬ সহীহ বুখারী: ৩৬৩২।