📘 নবীজির যুদ্ধ জীবন পাঠ ও পর্যালোচনা > 📄 বদরযুদ্ধের ফলাফল

📄 বদরযুদ্ধের ফলাফল


১. বদরযুদ্ধের ফলাফল আলোচনা করতে গেলে কাফেরদের ওপর मुसलमानों प्रभाव বৃদ্ধির বিষয়টি চলে আসে। বদরযুদ্ধে মুসলমানদের বিজয়ে মদীনা মুনাওয়ারার চারপাশের লোকেরা ভীতসন্ত্রস্ত হয়ে পড়ে। মদীনার ওপর আক্রমণ বা মুসলমানদের কোনো ক্ষতি করার সাহস হারিয়ে ফেলে। মদীনায় রসূলুল্লাহ সা.-এর সম্মান ও প্রভাব বাড়তে থাকে। দিকে দিকে ইসলামের বাণী মহিমান্বিত হয়ে উঠতে থাকে। ইসলামের সফল বিপ্লব দেখে যারা ইসলামের বিরুদ্ধে শত্রুতার দুঃসাহস করতো, তাদের সংখ্যা কমতে থাকে। এদিকে, মদীনায় মুনাফিকি তথা দ্বিচারিতার ঘটনাও বৃদ্ধি পায়। একদিকে তারা রসূলুল্লাহ সা. ও সাহাবায়ে কেরামের সামনে নিজেকে মুসলমান দাবি করে مسلمانوں মধ্যে গণ্য হতে চাইতো। অন্যদিকে গোপনে কুফরি অবলম্বন করে কাফেরদের অন্তর্ভুক্ত হয়ে থাকতো। এরা পরিপূর্ণ মুসলমান ছিল না আবার প্রকাশ্যে শত্রুতা পোষণকারী কাফেরও ছিল না। আল্লাহ তাআলা তাদের ব্যাপারে বলেন:
مُذَبْذَبِينَ بَيْنَ ذَلِكَ لَا إِلَى هُؤُلَاءِ وَلَا إِلَى هُؤُلَاءِ وَمَنْ يُضْلِلِ اللَّهُ فَلَنْ تَجِدَ لَه سَبِيلًا
তারা এর মধ্যে দোদুল্যমান, না এদের দিকে আর না ওদের দিকে। আর আল্লাহ যাকে পথভ্রষ্ট করেন তুমি কখনো তার জন্য কোনো পথ পাবে না। ৩২৪
আল্লাহ তাআলা তাদের এ দোদুল্যমান অবস্থার চরম নিন্দা করেছেন এবং বিভিন্ন আয়াতে তাদের এই নিকৃষ্ট অবস্থান তুলে ধরেছেন। পাশাপাশি তিনি তাদেরকে কঠোর শাস্তির হুমকিও দিয়েছেন। এ মর্মে আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন,
إِنَّ الْمُنْفِقِينَ فِي الدَّرْكِ الْأَسْفَلِ مِنَ النَّارِ وَلَنْ تَجِدَ لَهُمْ نَصِيرًا
নিশ্চয় মুনাফেকরা জাহান্নামের সর্বনিম্ন স্তরে থাকবে। আর তুমি কখনও তাদের জন্য কোন সাহায্যকারী পাবে না। ৩২৫
এই যুদ্ধের ফলে আল্লাহ ও তার রসূলের প্রতি مسلمانوں বিশ্বাস আরো বেড়ে যায়। সবদিক থেকেই مسلمانوں শক্তি বৃদ্ধি পায়। কুরায়েশের কয়েকজন নেতা ইসলাম গ্রহণ করেন। যার ফলে মক্কায় অবস্থানরত দুর্বল مسلمانوں মনোবল বৃদ্ধি পায়। আল্লাহ তাআলার সাহায্যপ্রাপ্তির কারণে কৃতজ্ঞতায় তাদের অন্তর ভরে ওঠে। তাদের বিশ্বাস আরও বদ্ধমূল হয়। তাদের ভেতর দৃঢ়বিশ্বাস জন্মে যে, এই দুর্দিন একদিন কেটে যাবে।
অন্যদিকে, مسلمانوں সামরিক দক্ষতা ও অভিজ্ঞতা অর্জিত হয়। যুদ্ধক্ষেত্রের নতুন অনেক কলা-কৌশল তারা রপ্ত করেন। আরব উপদ্বীপ ও পার্শ্ববর্তী বিভিন্ন অঞ্চলে মুসলমানদের সম্পর্কে আলোচনা তখন তুঙ্গে। শুধু কুরায়েশদের নয়; আরবের যেকোনো গোত্রকেই যুদ্ধক্ষেত্রে চ্যালেঞ্জ করার সক্ষমতা তাদের ছিল। সদ্য প্রতিষ্ঠিত ইসলামী রাষ্ট্র এ যুদ্ধের মাধ্যমে বিপুল পরিমাণ যুদ্ধলব্ধ সম্পদ অর্জন করে। যা দ্বারা مسلمانوں অর্থনৈতিক অবস্থার উন্নতি হয়। দীর্ঘ ঊনিশ মাসের অর্থনৈতিক খরার পর এটা তাদের জন্য চৈত্রের খরায় এক পশলা বৃষ্টির মতো ছিল। ৩২৬
২. বদর যুদ্ধের ফলে কুরায়েশ অবর্ণনীয় ক্ষতির মধ্যে পতিত হয়। আবু জেহেল ইবনে হিশাম, উমাইয়া ইবনে খালফ, উতবা ইবনে রাবিয়ার মতো নেতারা নিহত হওয়ায় তাদের মনোবল পুরোপুরি ভেঙ্গে যায়। অর্থনৈতিক ক্ষতির পাশাপাশি তাদের ক্ষমতা ও প্রভাব-প্রতিপত্তিতেও মারাত্মক ধ্বস নামে। ৩২৭
মক্কাবাসীর জন্য তাদের এই পরাজয়ের সংবাদ ছিল বিকট শব্দে বজ্রপাতের মতো। শুরুতে তাদের এ পরাজয়ের সংবাদ মক্কায় পৌঁছালে তারা কেউ তা বিশ্বাস করতে পারছিল না। ইবনে ইসহাক বলেন, মক্কায় হাইসুমান ইবনে আবদুল্লাহ খুজায়ী সর্বপ্রথম আসে। মক্কাবাসী তার কাছে রণাঙ্গনের পরিস্থিতি সম্পর্কে জিজ্ঞেস করে। সে একে একে কুরায়েশ নেতাদের নাম নিয়ে বলতে থাকে, উতবা ইবনে রাবিয়া, শায়বা ইবনে রাবিয়া, আবুল হাকাম ইবনে হিশাম, উমাইয়া ইবনে খালফ, জামআ ইবনে আসওয়াদ, নুবাইহ ইবনে হাজ্জাজ, মুনাব্বিহ ইবনে হাজ্জাজ ও আবুল বুখতারী ইবনে হিশামসহ অনেকেই মুসলমানদের হাতে নিহত হয়েছে। সাফওয়ান ইবনে উমাইয়া তার আশেপাশের লোকদের বলে, তোমরা তাকে আমার ব্যাপারে জিজ্ঞেস করো? মানুষেরা তাকে জিজ্ঞেস করে সাফওয়ান ইবনে উমাইয়ার কী অবস্থা? উত্তরে সে তাদের জানায়, সে এখন হাতিমে কাবায় অবস্থান করছে। তবে আমি তার পিতা ও ভাইদের সেখানে নিহত অবস্থায় দেখেছি। ৩২৮
আবু রাফে রসূলুল্লাহ সা.-এর আজাদকৃত দাস। বদরযুদ্ধের এ পরাজয়ে অভিশপ্ত কাফের নেতা আবু লাহাবের প্রতিক্রিয়া আলোচনা করতে গিয়ে তিনি বলেন, আমি আব্বাস ইবনে আবদুল মুত্তালিবের দাস ছিলাম। সে পরিবারে উম্মুল ফযল এবং আমি ইসলাম গ্রহণ করেছিলাম। আব্বাস গোত্রের ভয়ে ভীত ছিলেন। তিনি তাদের সাথে প্রকাশ্য বিরোধ এড়িয়ে চলতেন। তবে তিনি গোপনে ইসলাম গ্রহণ করেছিলেন। তার ধন-সম্পদ মক্কার নানা প্রান্তে ছড়ানো ছিল। আল্লাহর শত্রু আবু লাহাব বদরযুদ্ধে অংশগ্রহণ করেনি। নিজের পরিবর্তে সে আস ইবনে হিশাম ইবনে মুগীরাকে পাঠিয়েছিল। কুরায়েশদের পরাজয়ের সংবাদ মক্কায় পৌছালে আল্লাহ তাআলা তাকে লাঞ্ছনার চাদরে ঢেকে দেন। আর मुसलमानों সাহস বেড়ে যায়।
আবু রাফে আরো বলেন, আমি ছিলাম একজন দুর্বল মানুষ। জমজম কূপের পাদদেশে বসে আমি পাথর দিয়ে পাত্র তৈরি করতাম। আব্বাসের স্ত্রী উম্মুল ফযল আমার কাছে বসেছিলেন। مسلمانوں বিজয়সংবাদে আমরা ছিলাম উৎফুল্ল। ইতোমধ্যে দুরাচার আবু লাহাব ভারি পায়ে হেঁটে আমাদের পাশে আসে এবং আমার পেছনে পাথরের ওপর বসে পড়ে। ইতোমধ্যে মানুষেরা চেঁচিয়ে ওঠে, আবু সুফিয়ান ইবনে হারেস ইবনে আবদুল মুত্তালিব এসেছেন। আবু লাহাব তাকে বলে, আমার কাছে আসো। তোমার কাছে নিঃসন্দেহে সঠিক তথ্য থাকবে। অতঃপর তিনি তার কাছে এসে বসেন এবং মানুষেরা তাদের আশেপাশে জড়ো হয়। আবু লাহাব তাকে বলতে লাগলো, হে ভাতিজা! ঘটনা কী? বলো তো! উত্তরে তিনি বলেন, 'আল্লাহর শপথ! ভয়াবহ যুদ্ধে আমরা পরাজিত হয়েছি। তারা যাদের ইচ্ছা হত্যা করেছে এবং যাদের ইচ্ছে বন্দী করেছে। কিন্তু আল্লাহর শপথ, আমি এই পরাজয়ে আমাদের গোত্রকে দোষ দিতে পারছি না। আমাদের যুদ্ধ মূলত সাদা পোশাক পরিহিত এমন মানুষদের সাথে হয়েছিল যারা আকাশ ও জমিনের মাঝে ধূসর বর্ণের অশ্বে আরোহী ছিল। আল্লাহর শপথ, তারা কাউকে আস্ত ছাড়েনি।
আবু রাফে বলেন, অতঃপর আমি তাঁবুর রশি ধরে চিৎকার করে উঠলাম, আল্লাহর শপথ, নিঃসন্দেহে তারা ফেরেশতা ছিলেন। একথা শুনে আবু লাহাব আমাকে সজোরে চড় মেরে আমার ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ে। সে আমাকে উপরে উঠিয়ে মাটিতে আছাড় মারে। আমি ছিলাম অত্যন্ত দুর্বল। সে আমাকে কাবু করে আমার ওপর বসে আঘাত করতে থাকে। তা দেখে উম্মুল ফযল তাঁবুর একটি স্তম্ভ উঠিয়ে তার মাথায় সজোরে প্রহার করেন এবং তাকে বলতে থাকেন, এ ক্রীতদাসের মনিব তথা আব্বাসের অনুপস্থিতিতে আপনি তাকে দুর্বল ভাবছেন? উম্মুল ফযলের আঘাতে সে মাথায় মারাত্মক আঘাত পায়। অতঃপর লাঞ্ছিত হয়ে সেখান থেকে ফিরে যায়। এরপর সাত দিন অতিবাহিত হতে না হতেই সে প্লেগাক্রান্ত হয়ে মারা যায়। ৩২৯
উম্মুল ফযল বিনতে হারেস ছিলেন আব্বাস ইবনে আবদুল মুত্তালিবের স্ত্রী ও উম্মুল মুমিনীন মাইমুনার বোন। তিনি ছিলেন খালেদ ইবনে ওয়ালিদের খালা। তিনি খাদীজার পর প্রথম ইসলাম গ্রহণকারী নারী। ৩৩০
বদরযুদ্ধে মুশরিকদের পরাজয় এবং হতাহতদের সংখ্যাধিক্য তাদের দুঃখ- বেদনায় ভারাক্রান্ত করে তোলে। আবু লাহাব কিছুদিনের মধ্যেই অসুস্থ হয়ে মারা যায়। আবু সুফিয়ানের এক ছেলে বন্দী হয়, অন্য একজন রণাঙ্গনে নিহত হয়। মক্কার প্রতিটি ঘর শোকাচ্ছন্ন হয়ে পড়ে। কারও স্বজন যুদ্ধক্ষেত্রে নিহত হয়েছে, কারও স্বজন مسلمانوں হাতে বন্দী। এমন পরিস্থিতিতে কাফেরদের মধ্যে জ্বলে ওঠে প্রতিশোধের আগুন। এমনকি তাদের কেউ কেউ তো পরাজয়ের প্রতিশোধ নেওয়া পর্যন্ত গোসল না করার শপথ করে বসে। ৩৩১
মুসলমানদের বিরুদ্ধে পুনরায় যুদ্ধ করে প্রতিশোধ নিতে মক্কাবাসী উদগ্রীব হয়ে ওঠে। এর ফলশ্রুতিতেই সংঘটিত হয়েছিল উহুদযুদ্ধ। ৩৩২
৩. এদিকে ইহুদিরা বদর প্রান্তরে মুসলমানদের বিজয়ে বেশ দুঃখ পায়। مسلمانوں নতুন শক্তি হিসেবে আবির্ভূত হওয়া, ইসলামের প্রভাব-প্রতিপত্তি বৃদ্ধি পাওয়া ও ইহুদিদের তুলনায় তাদের আধিপত্য বেড়ে যাওয়া এবং রসূলের মর্যাদা তাদের ভীষণ পীড়া দেয়। তাই তারা মদীনায় আগমনের পরপর রসূল সা.-এর সাথে কৃত সন্ধি ভঙ্গ করতে দৃঢ়প্রতিজ্ঞ হয়ে ওঠে এবং তাদের গোপন শত্রুতাপূর্ণ মানসিকতা প্রকাশ করতে শুরু করে। বিদ্বেষ ছড়াতে ব্যস্ত হয়ে ওঠে। যে কোনো মূল্যে مسلمانوں মূলোৎপাটনের নীল নকশা আঁকতে থাকে তারা। ৩৩০
নবী সা. ও مسلمانوں সাথে তাদের শত্রুতা উত্তরোত্তর বৃদ্ধি পায়। রসূলুল্লাহ সা. ইহুদিদের এসব নেতিবাচক কর্মকাণ্ড সম্পর্কে অনবগত ছিলেন না। অত্যন্ত সর্তকতা ও কুশলতার সাথে তিনি তা পর্যবেক্ষণ করে যাচ্ছিলেন। শেষ পর্যন্ত ইহুদিরা مسلمانوں চারিত্রিক ও পারিবারিক নানা বিষয় নিয়ে কুৎসা রটাতে আরম্ভ করে। مسلمانوں সাথে প্রকাশ্য বিরোধে জড়ায়। এমতাবস্থায় ইহুদিদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করা এবং তাদের মদীনা মুনাওয়ারা থেকে নির্বাসিত করা আবশ্যক হয়ে পড়ে। ৩৩৪

টিকাঃ
৩২৪ সূরা নিসা: ১৪৩।
৩২৫ সূরা নিসা: ১৪৫।
৩২৬ আত তারীখুস সিয়াসি ওয়াল আসকারী: ২৭৪-২৫।
৩২৭ আত তারীখুস সিয়াসি ওয়াল আসকারী: ৩৮৫-৩৮৬।
৩২৮ সীরাতে ইবনে হিশাম: ২/২৫৭।
৩২৯ সীরাতে ইবনে হিশাম ২/২৫৮।
৩৩০ আল মারআতু ফিল আহদিন নববী: ১৬২।
৩৩১ আবু সুফিয়ান এই মর্মে শপথ করেছিল, তাদের সরদারদের হত্যার প্রতিশোধ নেওয়া পর্যন্ত গোসল করবে না।
৩৩২ আবু শাহবা প্রণীত আসসীরাতুন নববিয়্যাহ: ২/১৭১।
৩৩০ আত তারীখুস সিয়াসি ওয়াল আসকারী: ২৭৪।
৩৩৪ আবু শাহবা প্রণীত আসসীরাতুন নববিয়‍্যাহ: ২/১৭১।

📘 নবীজির যুদ্ধ জীবন পাঠ ও পর্যালোচনা > 📄 কুরায়েশের শয়তানখ্যাত উমায়ের ইবনে ওয়াহাবের ইসলাম গ্রহণ

📄 কুরায়েশের শয়তানখ্যাত উমায়ের ইবনে ওয়াহাবের ইসলাম গ্রহণ


উরওয়া ইবনে যুবায়ের বলেন, বদরযুদ্ধে পরাজিত হওয়ার কিছুদিন পর উমায়ের ইবনে ওয়াহাব জুমাহী হাতিমে কাবায় সাফওয়ান ইবনে উমাইয়ার সাথে বসা ছিলেন। উমায়ের ছিলেন কুরায়েশদের এমন এক নেতা, যিনি যে কোনো পরিস্থিতিতে রসূলুল্লাহ সা. ও সাহাবায়ে কেরামকে কষ্ট দেওয়ার সুযোগ হাতছাড়া করতেন না। উমায়েরের ছেলে ওয়াহাব ইবনে উমায়ের বদরযুদ্ধে বন্দী হন। এদিকে, সাফওয়ান ইবনে উমাইয়া ও উমায়ের ইবনে ওয়াহাব বদরের ক্ষয়ক্ষতি ও সেখানে নিহত নেতৃবৃন্দকে নিয়ে আলোচনা করছিলেন। এক পর্যায়ে সাফওয়ান বলে ওঠে, আল্লাহর শপথ, এমন দিনের পর জীবনের আর কোনো সার্থকতা খুঁজে পাচ্ছি না। উমায়ের বললেন, তুমি সত্য বলেছো। কিন্তু আল্লাহর শপথ! যদি আমার ওপর ঋণের বোঝা না থাকতো এবং আমার সন্তান-সন্ততিদের চিন্তা না থাকতো, তাহলে আমি নিঃসন্দেহে যে কোনো ভাবে মুহাম্মাদকে হত্যা করতাম (নাউযুবিল্লাহ)। তার কাছে পৌছার জন্য আমার একটি উপলক্ষও আছে। সেটি হলো আমার ছেলে বর্তমানে তার হাতে বন্দী। সাফওয়ান ইবনে উমাইয়া তার এ কথার সুযোগ গ্রহণ করে। সে তাৎক্ষণিক বলে উঠে, আমি তোমার ঋণের দায়িত্ব গ্রহণ করছি। আর তোমার পরিজন ও সন্তান-সন্ততিদের দায়িত্বও আমি গ্রহণ করতে রাজি আছি। আমার যতদিন সামর্থ্য থাকবে তারা আমার পরিজনদের সাথে অবস্থান করবে। তাদেরকে আমি কখনো বঞ্চিত করবো না। উমায়ের তাকে বলেন, তুমি এ বিষয়টি লুকিয়ে রাখবে এবং কারও কাছে তা প্রকাশ করবে না। সাফওয়ান বললো, ঠিক আছে।
উরওয়া ইবনে যুবায়ের বলেন, অতঃপর উমায়ের নিজের তরবারি প্রস্তুত করে তাতে বিষ মিশিয়ে মদীনায় পৌঁছে। ওমর রা. مسلمانوں মজলিসে বসে বদরযুদ্ধে मुसलमानों প্রতি আল্লাহর অনুগ্রহ ও শত্রুদের লাঞ্ছিত হওয়ার ব্যাপারে আলোচনা করছিলেন। ইতোমধ্যে ওমর রা. দেখেন, উমায়ের ইবনে ওয়াহাব তরবারি নিয়ে মসজিদের দরজায় বাহন থেকে নামছে। তাকে দেখেই তিনি বললেন, আল্লাহর শপথ, নিঃসন্দেহে আল্লাহর শত্রু উমায়ের ইবনে ওয়াহাব কোনো কূটচাল নিয়ে এসেছে। সে বদর প্রান্তরে শত্রুদের কাছে আমাদের সংখ্যা কম বলে আমাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধে উসকানি দিয়েছিল।
ওমর ইবনুল খাত্তাব রা. নবীজির কাছে এসে বললেন, হে আল্লাহর রসূল! আল্লাহর শত্রু উমায়ের ইবনে ওয়াহাব তরবারি নিয়ে এসেছে। রসূলুল্লাহ সা. বললেন, তাকে আমার কাছে পাঠিয়ে দাও। ওমর রা. তার তরবারির খাপ ধরে তাকে নবীজির কাছে নিয়ে আসেন। তিনি সেখানে বসা আনসারদের বলছিলেন, তোমরা রসূলুল্লাহ সা.-এর কাছাকাছি থাকো। তার আশেপাশে সতর্কভাবে বসো। যেন এই দুরাচার রসূলুল্লাহ সা.-এর কোনো ক্ষতি করতে না পারে। কেননা, তাকে বিশ্বাস করা যায় না।
রসূলুল্লাহ সা. যখন দেখলেন উমর তার তরবারির খাপ ধরে আছেন, তিনি তাকে বললেন, হে উমর, তাকে ছেড়ে দাও। হে উমায়ের, এদিকে আসো। উমায়ের রসূলুল্লাহ সা.-এর কাছে গিয়ে তাকে প্রাচীন যুগের রীতি অনুযায়ী 'সুপ্রভাত' বলে অভিবাদন জানায়। উত্তরে রসূলুল্লাহ সা. বলেন, হে উমায়ের, আল্লাহ তাআলা এখন আমাদের প্রাচীন অভিবাদনের চাইতে উত্তম অভিবাদনপদ্ধতি দিয়েছেন। তিনি আমাদের জান্নাতীদের মতো সালামের মাধ্যমে সম্ভাষণ জানাতে নির্দেশনা দিয়েছেন।'৩৩৫
উত্তরে উমায়ের বলেন, ব্যাপারটি আমার জানা নেই।
রসূলুল্লাহ সা. বললেন, উমায়ের! তুমি কেন এসেছো?
উমায়ের বললেন, আপনাদের কাছে আমার একজন যুদ্ধবন্দী রয়েছে। তার ব্যাপারে কথা বলতে এসেছি। আপনি তার প্রতি দয়া করুন।
রসূলুল্লাহ সা. বললেন, তোমার কাঁধে ঝুলন্ত তরবারি কেন?
উমায়ের বললেন, আল্লাহ এ তরবারি ধ্বংস করুন। এ তরবারি আমাদের কোনো কাজে এসেছে কি?
রসূলুল্লাহ সা. বললেন, তুমি কেন এসেছো, সত্যি করে বলো।
উমায়ের বললেন, আমি সত্যি সত্যি শুধু আমার যুদ্ধবন্দীর ব্যাপারে কথা বলতে এসেছি।
রসূলুল্লাহ সা. বললেন, না, তুমি এবং সাফওয়ান হাতিমে কাবায় বসে বদরের যুদ্ধ নিয়ে আলোচনা করেছো। তুমি তাকে বলেছো, যদি আমার ঋণের বোঝা না থাকতো এবং আমার অনুপস্থিতিতে সন্তানদের কী হবে এই চিন্তা না থাকতো, তাহলে আমি মুহাম্মাদকে হত্যার উদ্দেশ্যে বেরিয়ে পড়তাম। তখন সাফওয়ান আমাকে হত্যার পরিবর্তে তোমার ঋণ পরিশোধ ও পরিজনদের দায়িত্ব গ্রহণ করতে সম্মত হয়। কিন্তু আল্লাহ তাআলা তোমার এ পরিকল্পনা বাস্তবায়নে প্রতিবন্ধকতা তৈরি করে রেখেছেন।
উমায়ের বললেন, আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি আপনি আল্লাহর রসূল। আপনি আমাদের কাছে যেসব আসমানী প্রত্যাদেশের সংবাদ দিতেন আমরা তা অবিশ্বাস করতাম। কিন্তু আমার ও সাফওয়ানের মাঝে যে পরামর্শ হয়েছিল সেখানে অন্য কেউ উপস্থিত ছিল না। আল্লাহর শপথ! আমি বিশ্বাস করি এসবের সংবাদ একমাত্র আল্লাহ তাআলা আপনাকে দিতে পারেন। সকল প্রশংসা আল্লাহর জন্য যিনি আমাকে ইসলাম গ্রহণের পথ দেখিয়েছেন এবং আমাকে এই স্থানে নিয়ে এসেছেন। অতঃপর তিনি ইসলামের সুশীতল ছায়ায় আশ্রয় নেন।
রসূল সা. উপস্থিত সাহাবায়ে কেরামকে লক্ষ্য করে বলেন, তোমরা তোমাদের এই ভাইকে দীন শেখাও। কুরআন শেখাও। আর তার বন্দীকে ছেড়ে দাও।
উমায়ের বলেন, হে আল্লাহর রসূল! আমি আল্লাহর দীনের আলো নির্বাপিত করতে সচেষ্ট ছিলাম। আল্লাহর মনোনীত দীনে দীক্ষিত ব্যক্তিদের চরম নির্যাতন করতাম। আমি আশা করছি, আপনি আমাকে অনুমতি দিলে মক্কায় গিয়ে সেখানকার অধিবাসীদের আল্লাহ ও তার রসূলের ধর্মের দিকে আহ্বান করবো। হয়তো আল্লাহ তাআলা তাদের ইসলাম গ্রহণের সৌভাগ্য দেবেন। অন্যথায় আমি তাদের ইতোপূর্বে আপনার অনুসারীদের ওপর কৃত নির্যাতনের মতোই নির্যাতন করবো। অতঃপর উমায়ের মক্কায় ফিরে আসেন।
এদিকে, উমায়ের ইবনে ওয়াহাব রসূলুল্লাহ সা.-কে হত্যার উদ্দেশ্যে মদীনায় গেলে সাফওয়ান ইবনে উমাইয়া অচিরেই মক্কাবাসীকে একটি সুসংবাদ দেবেন বলে প্রচার করতে থাকেন। মদীনা থেকে আগত প্রতিটি কাফেলাকে তিনি সেখানকার অবস্থা সম্পর্কে জিজ্ঞেস করতেন। শেষ পর্যন্ত সেই কাঙ্ক্ষিত ব্যক্তি ফিরে আসেন। উমায়ের এসে তাকে নিরাশ করেন এবং বলেন, আমি ইসলাম গ্রহণ করেছি। এ কথা শুনে সাফওয়ান ইবনে উমাইয়া শপথ করে, সে ভবিষ্যতে কখনও উমায়েরের সাথে কথা বলবে না। তার কোনো কাজে সাহায্য করবে না। ৩৩৬
এ ঘটনা থেকে প্রাপ্ত শিক্ষা ও তাৎপর্য হলো:
১. মক্কার মুশরিকরা مسلمانوں মূলোৎপাটনে ছিল বদ্ধপরিকর। সাফওয়ান ইবনে উমাইয়া ও উমায়ের ইবনে ওয়াহাবের পারস্পরিক কথাবার্তা থেকে বোঝা যায়, মক্কার মুশরিক নেতারা শুধু ধর্মীয় দাওয়াতের ক্ষেত্রে প্রতিবন্ধকতা তৈরি করা বা তাদের বাধা প্রদান করতেই সচেষ্ট ছিল না; বরং তারা ইসলামের ধারক-বাহকদের অতর্কিত হামলা করে হত্যার পরিকল্পনাও করতো। এসবের জন্য তারা ঐক্যবদ্ধভাবে প্রচেষ্টা চালিয়ে যেতো। কাঙ্খিত লক্ষ্য অর্জনে তারা ভাড়াটে সন্ত্রাসীদেরও ব্যবহার করতো। ৩০৭
ধনাঢ্য ব্যক্তিরা দরিদ্রদের অসহায়ত্ব ও প্রয়োজনীয়তার সুযোগ গ্রহণ করতো। ঝুঁকিপূর্ণ এসব পরিকল্পনা বাস্তবায়নের পরিবর্তে তাদের নগদ টাকা-পয়সারও লোভ দেখাতো। সাফওয়ান ইবনে উমাইয়াকে এই ঘটনায় উমায়ের ইবনে ওয়াহাবের ঋণগ্রস্ত হওয়া ও পারিবারিক অভাব-অনটনের সুযোগ গ্রহণ করতে দেখা যায়। ৩০৮
২. সামাজিক নিরাপত্তা ও শান্তি প্রতিষ্ঠায় সাহাবায়ে কেরামের সচেতনতা ও দূরদর্শিতা ছিল অতুলনীয়। উমায়ের ইবনে ওয়াহাবের আগমনে ওমর রা. অত্যন্ত সতর্ক হয়ে উঠেন। তিনি স্পষ্টই বলেছিলেন, এ দুরাচারী ব্যক্তি নিঃসন্দেহে কোনো বদ মতলব নিয়ে এসেছে। ইতোপূর্বে মক্কায় তার নিপীড়নের কথা মনে করেই তিনি তা অনুধাবন করতে পেরেছিলেন। বদরযুদ্ধে मुसलमानों বিরুদ্ধে উসকানিদাতাদের মধ্যে উমায়ের ছিলেন অন্যতম। তিনি মক্কাবাসীকে সাহাবায়ে কেরাম ও মুসলিম বাহিনীর সৈন্যসংখ্যা সম্পর্কে ভুল তথ্য দিয়েছিলেন। এসব বিবেচনায় রেখেই ওমর রা. রসূলুল্লাহ সা.-এর নিরাপত্তাবিধান করতে তৎপর হন। উমায়েরের তরবারির খাপ টেনে ধরেন। যেন সে কোনোভাবেই রসূলুল্লাহ সা.-এর ওপর অতর্কিতে আক্রমণ করে বসতে না পারে। শুধু তাই নয়; উমর এক্ষেত্রে রসূলুল্লাহ সা.-এর নিরাপত্তা রক্ষায় সাহাবায়ে কেরামের একটি দলকে প্রস্তুত থাকতেও নির্দেশ দেন।
৩. রসূলুল্লাহ সা. উমায়ের ইবনে ওয়াহাবের জাহেলী যুগের সম্ভাষণমূলক 'সুপ্রভাত' বাক্যটি ফিরিয়ে দিয়েছিলেন। প্রাচীন যুগে এ ধরনের অভিবাদনের প্রচলন থাকলেও রসূলুল্লাহ সা.-এর কোনো উত্তর দেননি। তিনি তাকে জানিয়ে দেন, তারা এখন আর প্রাচীন যুগের রীতিনীতি অনুযায়ী কাউকে সম্ভাষণ বা অভিবাদন জানান না। তাদের সম্ভাষণ এখন জান্নাতীদের সম্ভাষণ, অর্থাৎ 'সালাম'।
৪. রসূলুল্লাহ সা. উমায়েরের সাথে সদয় আচরণ করেন। তার দিকে ক্ষমার হাত বাড়িয়ে দেন। অথচ উমায়ের রসূলুল্লাহ সা.-কে হত্যা করতে গিয়েছিলেন। ৩৩৯ শুধু তাই নয়, তিনি ইসলাম গ্রহণ করলে রসূলুল্লাহ সা. তার ছেলেকে মুক্ত করে দেন। তাকে দীন ও কুরআন শেখানোর জন্য সাহাবীদের নির্দেশ দেন। ৩৪০
৫. উমায়ের রা. মক্কাবাসীর সামনে নিজের ইসলাম গ্রহণের কথা প্রকাশ করার সংকল্প করলে রসূলুল্লাহ সা. তাকে অনুমতি দেন। অতঃপর অনুমতি পেয়ে তিনি মক্কায় গিয়ে ইসলাম গ্রহণের ঘোষণা দেন। বলিষ্ঠ কণ্ঠে মক্কাবাসীকে নিজের ইসলাম গ্রহণের সংবাদ জানান। তাদের চ্যালেঞ্জ করেন। মক্কার বহু মানুষ তার হাতে ইসলাম গ্রহণ করে। ওমর রা. তাকে এক হাজার মানুষের সমকক্ষ মনে করতেন। উমায়ের ওই চারজনের একজন যাদের মাধ্যমে ওমর ইবনুল খাত্তাব রা. আমর ইবনুল আসকে সাহায্য করেছিলেন। সেই চারজনের প্রত্যেককেই এক হাজার মানুষের সমকক্ষ মনে করা হতো। ৩৪১

টিকাঃ
৩৩৫ সহীহ আসসীরাতুন নববিয়‍্যাহ: ২৯।
৩৩৬ সহীহ আসসীরাতুন নববিয়‍্যাহ: ২৬০।
৩০৭ আত তারীখুস সিয়াসি ওয়াল আসকারী: ২৫৮।
৩০৮ সুয়ার ওয়া ইবার মিনাল জিহাদিন নববী ফিল মাদিনাহ: ৮০।
৩৩৯ ফিকহুস সীরাহ লিলবুতী: ২১৪।
৩৪০ সহীহ আসসীরাতুন নববিয়‍্যাহ: ২৬০।
৩৪১ আত তারবিয়াতুল কিয়াদিয়‍্যাহ ৩/৭৩।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00