📘 নবীজির যুদ্ধ জীবন পাঠ ও পর্যালোচনা > 📄 সুহাইল ইবনে আমরের বন্দীদশা ও সাওয়াদার কথোপকথন

📄 সুহাইল ইবনে আমরের বন্দীদশা ও সাওয়াদার কথোপকথন


আবদুর রহমান ইবনে আসআদ ইবনে যুরারা রা. বলেন, বদরের যুদ্ধবন্দীদের যখন মদীনা মুনাওয়ারায় আনা হয়, তখন উম্মুল মুমিনীন সাওদা বিনতে যামআ রা. আফরা পরিবারে আউফ ও মুয়াউয়িজ ইবনে আফরার জন্য শোকপালনের মজলিসে বসে ছিলেন। তখনও পর্দার বিধান অবতীর্ণ হয়নি। সাওদা রা. বলেন, আমি যুদ্ধবন্দীদের আনার খবর পেয়ে ঘরে ফিরে এলাম। রসূলুল্লাহ সা. সেখানে অবস্থান করছিলেন। আমি আবু ইয়াযীদ সুহাইল ইবনে আমরকে কাঁধের সাথে হাত বাঁধা অবস্থায় কক্ষের এক কোণে পড়ে থাকতে দেখলাম। তাকে এ অবস্থায় দেখে অনিচ্ছাকৃতভাবেই যেন আমার মুখ থেকে বেরিয়ে এলো, হে আবু ইয়াযীদ! এভাবে বন্দী না হয়ে কেন তুমি সম্মানের সাথে মৃত্যুবরণ করলে না? সাথে সাথে আমি রসূলুল্লাহ সা.-এর কণ্ঠ শুনতে পেলাম। তিনি বললেন, হে সাওদা, তুমি কি তাকে আল্লাহ ও তার রসূলের বিরুদ্ধে উস্কে দিচ্ছো? আমি বললাম, ওই সত্তার শপথ, যিনি আপনাকে সত্য ধর্ম দিয়ে পাঠিয়েছেন! আবু ইয়াযীদকে এ অবস্থায় দেখে অনিচ্ছাকৃতভাবেই আমার মুখ থেকে একথা বের হয়েছে। ৩১৫
সুহাইল ইবনে আমরের মুক্তিপণ-সংক্রান্ত আলোচনার জন্য মিকরায ইবনে হাফস ইবনে আখইয়াফ আসেন। সুহাইলকে মুক্তি দেওয়ার সিদ্ধান্ত হলে সাহাবীরা বলেন, আমাদের পাওনা আমাদের দিয়ে দাও। মিকরায বললেন, তোমরা তার স্থলে আমাকে বন্দী করো এবং তাকে ছেড়ে দাও। সে গিয়ে তোমাদের মুক্তিপণ পাঠিয়ে দেবে। তার কথামতো মুসলমানরা সুহাইলকে ছেড়ে দিলেন এবং মিকরাযকে বন্দী করে রাখলেন।
একটি বর্ণনায় এসেছে, ওমর রা. রসূলুল্লাহ সা.-কে বলেন, আমাকে অনুমতি দিন, আমি সুহাইলের সামনের উপর-নীচের দুটো করে চারটা দাত উপড়ে ফেলি। এতে তার জিহ্বা ঝুলে থাকবে। ফলে আর কখনও কোথাও দাঁড়িয়ে আপনার বিরুদ্ধে ভাষণ দিতে পারবে না। রসূলুল্লাহ সা. বললেন, আমি তার মুখ বিকৃত করবো না। তাহলে আল্লাহ আমার মুখ বিকৃত করে দেবেন যদিও আমি নবী। ৩১৬
তারপর রসূল সা. বলেন, ভবিষ্যতে হয়ত এমন অবস্থা হবে যে তার ভাষণের নিন্দা তুমি করবে না।
ইবনে কাসীর বলেন, রসূলুল্লাহ সা.-এর ভবিষ্যদ্বাণীটি ছিল রসূলুল্লাহ সা.-এর মৃত্যু পরবর্তী সময়ে সুহাইল ইবনে আমরের কর্মকাণ্ড সম্পর্কে। যখন আরবের মানুষ গণহারে ধমত্যাগ করছিল এবং মদীনার আশেপাশে বিদ্রোহের আগুন জ্বলে উঠেছিল, তখন সুহাইল ইবনে আমর মক্কার মানুষকে ইসলামের ওপর অটল থাকতে উৎসাহ দিয়ে এক বক্তব্যে বলেন, হে কুরায়েশ সম্প্রদায়, এমনটি যেন না হয় যে, তোমরা সবার পরে ইসলাম গ্রহণ করে সবার আগে ধর্মত্যাগী হয়ে যাবে। ৩১৭
যে কেউ আমাদের মধ্যে ধর্মীয় ব্যাপারে সন্দেহ তৈরি করতে চাইবে, আমরা তাকে হত্যা করবো। ৩১৮
রসূলুল্লাহ সা. সুহাইল ইবনে আমরের দাঁত ভেঙ্গে দেওয়ার অনুমতি দিতে অস্বীকৃতি জানান। তিনি এতে মানুষের সৃষ্টিগত আকৃতি পরিবর্তন করে দেওয়া হয় বলে জানান। শত্রুকে হাতের নাগালে পেয়েও তার সাথে এ ধরনের সদাচরণ রসূলুল্লাহ সা.-এর উম্মতের জন্য একটি উত্তম আদর্শ। ৩১৯

টিকাঃ
৩১৫ আসসীরাতুন নববিয়‍্যাহ: ২/২০০।
৩১৬ আল বিদায়া ওয়ান নিহায়া: ৩/৩১১।
৩১৭ আল বিদায়া ওয়ান নিহায়া: ৩/৩১১।
৩১৮ আত তারীখুল ইসলামী: ৪/১৮১।
৩১৯ সাদেক উরজুন, মুহাম্মাদুর রসূলুল্লাহ ৩/৪৭৪।

📘 নবীজির যুদ্ধ জীবন পাঠ ও পর্যালোচনা > 📄 মুক্তিপণের পরিবর্তে শিক্ষা প্রদান

📄 মুক্তিপণের পরিবর্তে শিক্ষা প্রদান


আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস রা. বলেন, বদরের দিন কিছু যুদ্ধবন্দীর মুক্তিপণ আদায়ের সামর্থ্য ছিল না। রসূলুল্লাহ সা. নির্ধারণ করেন, তারা আনসারদের শিশুদের পড়তে ও লিখতে শেখাবে-এটাই তাদের মুক্তিপণ। ৩২০
অতঃপর যুদ্ধবন্দীরা মদীনার শিশুদের লেখাপড়া শেখাতে আরম্ভ করে। কোনো বন্দী ১০ জন শিশুকে শিক্ষা প্রদান করলে তাকে মুক্ত করে দেওয়া হতো। ৩২১
তৎকালীন সময়ে রসূলুল্লাহ সা.-এর প্রচুর অর্থের প্রয়োজন ছিল। তবুও শিক্ষাদানকে যুদ্ধবন্দীদের মুক্তিপণ হিসেবে নির্ধারণ করেন। এ থেকে ইসলামে শিক্ষার গুরুত্ব অনুধাবন করা যায়। কুরআনে কারীমের প্রথম ওহীও শিক্ষার ব্যাপারেই অবতীর্ণ হয়েছিল। আল্লাহ তাআলা বলেন :
اقْرَأْ بِاسْمِ رَبِّكَ الَّذِي خَلَقَ خَلَقَ الْإِنْسَانَ مِنْ عَلَقٍ اِقْرَأْ وَ رَبُّكَ الْأَكْرَمُ الَّذِي عَلَّمَ بِالْقَلَمِ
পড়ো তোমার রবের নামে, যিনি সৃষ্টি করেছেন। সৃষ্টি করেছেন মানুষকে জমাট-বাঁধা রক্তপিণ্ড হতে। পড়, আর তোমার রব মহামহিম। যিনি কলমের সাহায্যে শিক্ষা দিয়েছেন। ৩২২
পবিত্র কুরআনের অনেক আয়াত ও অসংখ্য হাদীসে শিক্ষার প্রতি مسلمانوں উদ্বুদ্ধ করা হয়েছে। শিক্ষিতদের মর্যাদা বর্ণনা করা হয়েছে।
আনসারী শিশুদের পড়ালেখা শেখানোর মাধ্যমে রসূল সা. মদিনার নিরক্ষরতা দূর করতে ও জ্ঞানের আলো ছড়িয়ে দিতে প্রথম উদ্যোগ নিলেন; যা ইসলামকে শক্তিশালী করে।

টিকাঃ
৩২০ সহীহ আসসীরাতুন নববিয়‍্যাহ: ২৬১।
৩২১ আত তারবিয়াতুল কিয়াদিয়া: ৩/৭৪।
৩২২ সূরা আলাক ১-৪।

📘 নবীজির যুদ্ধ জীবন পাঠ ও পর্যালোচনা > 📄 যুদ্ধবন্দীদের বিধান

📄 যুদ্ধবন্দীদের বিধান


মুসলিম রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ নেতাই যুদ্ধবন্দীদের ব্যাপারে সিদ্ধান্ত নেবেন। এক্ষেত্রে ইসলাম তাকে চার ধরনের সিদ্ধান্ত থেকে কোনো একটি বেছে নেওয়ার সুযোগ দিয়েছে। যথা:
১. হত্যা: রসূলুল্লাহ সা. উকবা ইবনে আবী মুঈত ও নাযার ইবনে হারেসকে হত্যার নির্দেশ দেন।
২. দয়া: মুক্তিপণ ব্যতীত তাদের মুক্ত করে দেওয়া। যেমন রসূলুল্লাহ সা. আবু ইয্যাকে মুক্তিপণ ছাড়াই মুক্ত করে দিয়েছিলেন।
৩. মুক্তিপণ: মুক্তিপণের বিনিময়ে কাউকে মুক্ত করে দেওয়া। যেমন, রসূল সা. তার চাচা আব্বাস, নওফেল ইবনে হারেস ও আকিল ইবনে আবু তালিবকে মুক্তিপণের বিনিময়ে ছেড়ে দিয়েছিলেন।
৪. দাস বানিয়ে রাখা: যেমন, সাআদ ইবনে মুআয কুরাইজা গোত্র সম্পর্কে সিদ্ধান্ত দিতে গিয়ে তাদের যুদ্ধে সক্ষম ব্যক্তিদের হত্যা করা, শিশু ও নারীদের যুদ্ধবন্দী বানিয়ে নেওয়ার নির্দেশনা দিয়েছিলেন এবং তাদের ধনসম্পদ বণ্টন করে নেওয়ার প্রস্তাব দিয়েছিলেন। ৩২৩

টিকাঃ
৩২৩ আবু ফারিস প্রণীত গাযওয়াতু বদর আলকুবরা: ১০১।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00