📘 নবীজির যুদ্ধ জীবন পাঠ ও পর্যালোচনা > 📄 রসূলুল্লাহ সা.-এর চাচা আব্বাসের মুক্তিপণ

📄 রসূলুল্লাহ সা.-এর চাচা আব্বাসের মুক্তিপণ


কুরায়েশ নেতারা নিজেদের যুদ্ধবন্দীদের মুক্তিপণ রসূলুল্লাহ সা.-এর কাছে পাঠান। আব্বাস রা. বলেন, হে আল্লাহর রসূল! আমিতো পূর্ব থেকেই মুসলমান। রসূলুল্লাহ সা. বলেন, আল্লাহ তাআলা আপনার ইসলাম সম্পর্কে অবগত আছেন। যদি আপনার দাবি সত্য হয়ে থাকে তাহলে আল্লাহ তাআলা আপনাকে এর প্রতিদান দেবেন। কিন্তু আমরা আপনার বাহ্যিক অবস্থা দেখে সিদ্ধান্ত নেবো। সে মতে আপনি শত্রুপক্ষের লোক। তাই আপনাকে নিজের ও আপনার দুই ভাতিজার মুক্তিপণ আদায় করতে হবে। আব্বাস বললেন, হে আল্লাহর রসূল! আমার কাছে কোনো সম্পদ নেই। রসূলুল্লাহ সা. বললেন, আপনি ও আপনার স্ত্রী উম্মুল ফযল মিলে যে সম্পদ মাটিতে পুঁতে রেখেছেন তা কোথায়? যে সম্পদ মাটিতে লুকিয়ে রেখে আসার সময় আপনি তাকে বলছিলেন, যদি আমি এই যাত্রায় মৃত্যুবরণ করি, তাহলে ফযল, আবদুল্লাহ ও কুসামের জন্য এই সম্পদ কাজে লাগাবে। আব্বাস বললেন, আল্লাহর শপথ হে আল্লাহর রসূল! আমি ভালোভাবেই জানি আপনি আল্লাহর রসূল। কেননা আমার প্রোথিত এ সম্পদ সম্পর্কে আমি ও উম্মুল ফযল ছাড়া অন্য কেউ জানে না। আপনি আমার কাছ থেকে যে বিশ উকিয়া মাল পেয়েছেন তা থেকে হিসাব করে রেখে দিন। রসূলুল্লাহ সা. বললেন, সেই সম্পদ তো আল্লাহ তাআলা তোমার পক্ষ থেকে আমাদের দিয়ে দিয়েছেন।' অতঃপর আব্বাস রা. নিজের, তার উভয় ভাতিজার এবং তার মিত্রের মুক্তিপণ আদায় করেন। এ ঘটনার প্রেক্ষিতে আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন:
يَـٰٓأَيُّهَا ٱلنَّبِيُّ قُل لِّمَن فِىٓ أَيْدِيكُم مِّنَ ٱلْأَسْرَىٰٓ إِن يَعْلَمِ ٱللَّهُ فِى قُلُوبِكُمْ خَيْرًا يُؤْتِكُمْ خَيْرًا مِّمَّآ أُخِذَ مِنكُمْ وَيَغْفِرْ لَكُمْ ۚ وَٱللَّهُ غَفُورٌ رَّحِيمٌ وَإِن يُرِيدُوا۟ خِيَانَتَكَ فَقَدْ خَانُوا ٱللَّهَ مِن قَبْلُ فَأَمْكَنَ مِنْهُمْ ۗ وَٱللَّهُ عَلِيمٌ حَكِيمٌ
হে নবী, তোমাদের হাতে যে সব যুদ্ধবন্দী আছে, তাদেরকে বল, যদি আল্লাহ তোমাদের অন্তরসমূহে কোন কল্যাণ আছে বলে জানেন, তাহলে তোমাদের থেকে যা নেয়া হয়েছে, তার চেয়ে উত্তম কিছু দেবেন এবং তোমাদেরকে ক্ষমা করবেন, আর আল্লাহ ক্ষমাশীল, পরম দয়ালু। আর যদি তারা তোমার সাথে বিশ্বাসঘাতকতা করার ইচ্ছা করে, তাহলে তারা তো পূর্বে আল্লাহর সাথেও বিশ্বাসঘাতকতা করেছে। অতঃপর তিনি তাদের উপর (তোমাকে) শক্তিশালী করেছেন। আর আল্লাহ মহাজ্ঞানী, প্রজ্ঞাবান। ৩০০
আব্বাস রা. বলেন, অতঃপর আল্লাহ তাআলা ইসলাম গ্রহণের পর আমাকে মুক্তিপণ হিসেবে আদায় করা বিশ উকিয়ার পরিবর্তে বিশজন গোলাম দান করেন। প্রতিটি গোলামের কাছেই এমন সম্পদ ছিল, যার মাধ্যমে তারা ব্যবসা করতো। আশা করি, আল্লাহ তাআলা আমাকে ক্ষমা করবেন। ৩০৪
পবিত্র কুরআনের এই আয়াত যদিও আব্বাস রা.-এর ব্যাপারে নাযিল হয়েছিল, কিন্তু এর বিধান সকল বন্দীদের জন্যই প্রযোজ্য ছিল। কেননা, বিশেষ শব্দের মাধ্যমে বর্ণিত বিধানের ক্ষেত্রেও কুরআনে কারীমে ব্যাপক অর্থ উদ্দেশ্য হয়ে থাকে। ৩০৫
আনসারদের কেউ কেউ রসূলুল্লাহ সা.-এর কাছে তাদের ভাগিনা আব্বাসকে মুক্তিপণ ছাড়াই মুক্তি দেওয়ার অনুমতি চাইলে রসূলুল্লাহ সা. তাদের বলেন, আল্লাহর শপথ, তোমরা তার মুক্তিপণ থেকে এক মুদ্রাও হ্রাস করবে না। ৩০৬
আনসারগণ নবীজির মর্যাদার প্রতি কতটা লক্ষ্য রাখতেন দেখুন! তারা এক্ষেত্রে অনুমতি প্রার্থনা করতে গিয়ে 'রসূলুল্লাহ সা.-এর চাচা' বলে উল্লেখ না করে 'নিজেদের ভাগিনা' ৩০৭ হওয়ার কথা উল্লেখ করেছেন। কারণ, 'রসূলের চাচা' বললে মনে হতো, যেন তারা রসূলুল্লাহ সা.-এর ওপর অনুগ্রহ করতে চাচ্ছেন। এই কথা থেকে তাদের বুদ্ধিমত্তা ও সুরুচি প্রকাশ পায়। রসূলুল্লাহ সা. তাদের এ আবদারে সাড়া দেননি যেন দীনের মধ্যে কোনো ধরনের স্বজনপ্রীতি জায়গা করে নিতে না পারে। ৩০৮
রসূলুল্লাহ সা.-এর এই আচরণ থেকে অন্যান্য যুদ্ধবন্দী ও মুসলমানরা কোনো অবস্থাতেই স্বজনপ্রীতি না করার শিক্ষা পায়। রসূল সা. বরং উল্টোটা করেন। নিজের চাচার মুক্তিপণ আরো বাড়িয়ে দেন। ৩০৯
আব্বাস নিজের ও নিজের ভাতিজার মুক্তিপণ আদায় করে ফিরে আসেন মক্কায়। তিনি নিজের ইসলাম গ্রহণের বিষয়টি লুকিয়ে রেখে অত্যন্ত সুকৌশলে পবিত্র মক্কা নগরীতে ইসলামী সাম্রাজ্য প্রতিষ্ঠার ভিত্তি স্থাপনে ব্রত থাকেন। যার সফলতা দেখা দেয় মক্কা বিজয়ের মাধ্যমে। এর পূর্বেও কয়েকবার তিনি ইসলাম গ্রহণের ঘোষণা দিয়েছিলেন। ৩১০

টিকাঃ
৩০৩ সূরা আনফাল: ৭০-৭২।
৩০৪ মুসনাদে আহমদে (৩৩১০) এই বিবরণ প্রায় এভাবেই বর্ণিত হয়েছে।
৩০৫ হাদীসুল কুরআনিল কারীম আন গাযাওয়াতির রসূল: ১/১৩২।
৩০৬ ফাতহুল বারী: ৭/৩২১।
৩০৭ কেননা, হজরত আব্বাসের নানী, আবদুল মুত্তালিবের স্ত্রী ছিলেন মদিনার বনু নাজ্জার বংশোদ্ভূত।
৩০৮ সুবুলুর রাশাদ: ৪/১৩৫।
৩০৯ আবু শাহবা প্রণীত আসসীরাতুন নববিয়্যাহ ২/১৭৬।
৩১০ আত তারবিয়াতুল কিয়াদিয়া: ৩/৬৮।

📘 নবীজির যুদ্ধ জীবন পাঠ ও পর্যালোচনা > 📄 যায়নাবের স্বামী আবুল আস ইবনে রাবীর মুক্তিপণ

📄 যায়নাবের স্বামী আবুল আস ইবনে রাবীর মুক্তিপণ


উম্মুল মুমিনীন আয়েশা রা. থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, মক্কাবাসীরা যখন তাদের বন্দীদের মুক্তিপণের অর্থ পাঠায় তখন যায়নাব রা. আবুল আসের মুক্তিপণ এবং সাথে তার গলার হার পাঠান। মা খাদীজা রা. আবুল আসের সাথে বিয়ের সময় হারটি তাকে উপহার দিয়েছিলেন। আয়েশা রা. বলেন, হারটি দেখে খাদীজার কথা রসূল সা.-এর মনে পড়ে যায়। তিনি আবেগাপ্লুত হয়ে সাহাবীদের বললেন, যদি তোমরা ভালো মনে করো তাহলে যায়নাবের বন্দীকে ছেড়ে দাও এবং তার প্রেরিত মুক্তিপণও তাকে ফেরত দিয়ে দাও। সাহাবীরা এক বাক্যে রাজি হয়ে গেলেন। আবুল আসের কাছ থেকে রসূল সা. প্রতিশ্রুতি নিলেন যে, সে যায়নাবকে তার কাছে পাঠিয়ে দেবে। তাকে নিয়ে আসার জন্য নবীজি যায়েদ ইবনে হারেসা রা. এবং একজন আনসারীকে পাঠান। তিনি তাদেরকে বলেন, তোমরা ইয়াজিজ উপত্যকায় অবস্থান করবে। যায়নাব তোমাদের সাথে ওই স্থানে এসে একত্র হলে তোমরা তাকে নিয়ে চলে আসবে। ৩১১
আবুল আস কখনও ইসলামের পথে প্রতিবন্ধক হয়ে দাঁড়াননি। নিজের কোনো কথা বা কাজে রসূলুল্লাহ সা. বা তার কোনো সাহাবীর কষ্টের কারণ হননি। ব্যবসায়িক ব্যস্ততা ও রসূল সা.-থেকে লজ্জাশীল হওয়ার কারণে তিনি অন্য কুরায়েশদের মতো ইসলামের পথে প্রতিবন্ধক হওয়া থেকে বেঁচে ছিলেন। বদরযুদ্ধে রসূলুল্লাহ সা.-এর এই জামাতা এমন যুদ্ধবন্দীদের অন্তর্ভুক্ত ছিলেন, যারা যুদ্ধক্ষেত্রে বিশেষ কোনো পরামর্শ দেননি বা বিশেষ কোনো ভূমিকা রাখেননি। কুরায়েশরা নিজেদের বন্দীদের মুক্তিপণ পাঠানো শুরু করলে যায়নাবও তার জন্য মুক্তিপণ পাঠান। খাদীজা তার আদরের কন্যাকে বিবাহ উপলক্ষে যে হার দিয়েছিলেন তাও মুক্তিপণের মধ্যে ছিল। রসূলুল্লাহ সা. তার প্রিয় মেয়ের হার মুক্তিপণের তালিকায় দেখতে পেয়ে আবেগাপ্লুত হন। এ হারটি ছিল তার কাছে পিতৃত্ব, স্ত্রী, পরিবার, ভালোবাসা ও মমতার স্মৃতিচিহ্ন।
রসূলুল্লাহ সা. ছিলেন একজন বাবা। এমন বাবা যার ভালোবাসা ও স্নেহের কোনো তুলনা হয় না। পারিবারিক এই স্মৃতিচিহ্ন যেন রসূলের হৃদয়কে দলিত- মথিত করে তুলছিল। সর্বোচ্চ সম্মানিত অবস্থানে থেকেও তিনি স্মৃতিচিহ্নটি রক্ষায় সাহাবায়ে কেরামের কাছে নিজের আকাঙ্খার কথা পেশ করেন। তিনি এমনভাবে নিজের নিবেদনটি পেশ করেন যেন তারা এটি ফিরিয়ে দিতে আগ্রহী হয় এবং গণিমতের ক্ষেত্রে তাদের হকও নষ্ট না হয়। রসূলুল্লাহ সা. তার নিবেদনে বলেন, যদি তোমরা ভালো মনে করো তাহলে যায়নাবের বন্দীকে ছেড়ে দাও এবং তার প্রেরিত মুক্তিপণও তাকে ফেরত দিয়ে দাও।
এরকম কোমলভাবে তিনি মনের আকাঙ্খা প্রকাশ করেন। যেন তারা আন্তরিকতা ও পরিপূর্ণ সন্তুষ্টির সাথে খুশি মনে তার প্রস্তাবে রাজি হয়। ৩১২
মেয়ের প্রতি বাবার ভালোবাসা প্রদর্শন ছাড়াও এক্ষেত্রে রসূল সা.-এর আরেকটি উদ্দেশ্য ছিল। নবীজির এই জামাতা ছিলেন অত্যন্ত ধীশক্তিসম্পন্ন ও প্রজ্ঞার অধিকারী। তবুও তিনি কাফের অবস্থায় জীবনযাপন করছিলেন। রসূল সা. উত্তম আচরণের মাধ্যমে তাকে ইসলাম গ্রহণে উদ্বুদ্ধ করছিলেন। শেষ পর্যন্ত আবুল আস ইবনে রাবী ষষ্ঠ হিজরিতে ইসলামের সুশীতল ছায়াতলে আশ্রয় নেন। ৩১৩

টিকাঃ
৩১১ সুনানে আবু দাউদ: ২৬৯২।
৩১২ সাদেক উরজুন, মুহাম্মাদুর রসূলুল্লাহ: ৩/৪৮০-৪৮৭।
৩১৩ 'আত তারীখুল ইসলামী: ৪/১৮৩।

📘 নবীজির যুদ্ধ জীবন পাঠ ও পর্যালোচনা > 📄 রসূলের হৃদ্যতা ও কঠোরতার মাঝে আমর ইবনে আবদুল্লাহ

📄 রসূলের হৃদ্যতা ও কঠোরতার মাঝে আমর ইবনে আবদুল্লাহ


আবু ইযযা আমর ইবনে আবদুল্লাহ ছিল অভাবী লোক, অনেকগুলো কন্যা সন্তানের পিতা। সে আবেদন করলো, ইয়া রসূলাল্লাহ! আপনি নিশ্চয়ই অবগত আছেন যে, আমার কোনো সহায়-সম্পদ নেই, আমি অভাবী ও অনেকগুলো সন্তানের পিতা। তাই আমার ওপর অনুগ্রহ করুন। রসূলুল্লাহ সা. তার প্রতি অনুগ্রহ দেখালেন ও এই মর্মে প্রতিশ্রুতি নিলেন যে, সে মুসলমানদের বিরুদ্ধে কাউকে সাহায্য করবে না। আবু ইয্যা নবীজির এ অনুগ্রহের কথা স্মরণ করে তার প্রশংসায় বলেন:
من مبلغ عني الرسول محمدا بأنك حق والمليك حميد وأنت امرؤ تدعو إلى الحق والهدى عليك من الله العظيم شهيد وأنت امرؤ بوئت فينا مباءة لها درجات سهلة وصعود فإنك من حاربته لمحارب شقي ومن سالمته لسعيد
ﻭﻟﻜﻦ ﺇﺫﺍ ﺫﻛﺮﺕ ﺑﺪﺭﺍ ﻭﺃﻫﻠﻪ ﺗﺄﻭﺏ ﻣﺎ ﺑﻲ ﺣﺴﺮﺓ ﻭﻗﻌﻮﺩ
এমন ব্যক্তি কে আছে, যে আমার পক্ষ থেকে আল্লাহর রসূল মুহাম্মাদকে এ বার্তাটি পৌঁছে দেবে যে, আপনি সত্য এবং আল্লাহর প্রশংসার অধিকারী।
আপনি সত্য ও হিদায়াতের দিকে আহ্বান করেন। আপনার সত্যতার ওপর মহান আল্লাহর পক্ষ থেকে সাক্ষী রয়েছে।
আপনি আমাদের মধ্যে এমন উচ্চ মর্যাদা লাভ করেছেন, যার স্তরসমূহ অতিক্রম করা যেমন সহজ, তেমন কঠিন।
আপনার সাথে যারা যুদ্ধ করে, তারা দুর্ভাগা আর যাদের সাথে আপনার সন্ধি হয়, তারা সৌভাগ্যবান।
কিন্তু আমি যখন বদর যুদ্ধ ও তাতে অংশগ্রহণকারীদের কথা স্মরণ করি, তখন হতাশা ও অনুশোচনায় আমি মুহ্যমান হয়ে পড়ি।
ইবনে কাসীর রহ. বলেন, এই আবু ইয্যা রসূলুল্লাহ সা.-এর সাথে কৃত ওয়াদা ভঙ্গ করে। মুশরিকরা তার জ্ঞান বুদ্ধি নিয়ে উপহাস করতো। ফলে সে পুনরায় তাদের সাথে যোগ দেয়। সে মুশরিকদের পক্ষে উহুদের যুদ্ধে অংশগ্রহণ করে পুনরায় বন্দী হয়। এবারও সে রসূলুল্লাহ সা.-এর একটু অনুগ্রহ প্রার্থনা করে। কিন্তু রসূলুল্লাহ সা. বললেন, তোমাকে এবার ছাড়া হবে না। তুমি তো অনুগ্রহের কথা ভুলে গিয়ে বলবে, আমি মুহাম্মাদকে দুবার ধোঁকা দিয়েছি। তখন তাকে হত্যা করা হয়। ৩১৪
আবু ইয্যা রসূলুল্লাহ সা.-এর কাছে নিজের দারিদ্র্য ও মেয়েদের তত্ত্বাবধানের কথা বললে রসূলুল্লাহ সা. তার প্রতি দয়াদ্র হয়ে তাকে ক্ষমা করে দিয়েছিলেন এবং মুক্তিপণ ছাড়া শুধু একটি প্রতিশ্রুতি নিয়ে তাকে মুক্ত করে দিয়েছিলেন। কিন্তু যখন সে নিজের প্রতিশ্রুতি রক্ষা না করে মুসলমানদের বিরুদ্ধে আবার যুদ্ধ করতে এসে বন্দী হয়, তখন রসূলুল্লাহ সা. আর বিশ্বাস না করে তাকে হত্যার নির্দেশ দেন।

টিকাঃ
৩১৪ আল বিদায়া ওয়ান নিহায়া: ৩/৩১৩।

📘 নবীজির যুদ্ধ জীবন পাঠ ও পর্যালোচনা > 📄 সুহাইল ইবনে আমরের বন্দীদশা ও সাওয়াদার কথোপকথন

📄 সুহাইল ইবনে আমরের বন্দীদশা ও সাওয়াদার কথোপকথন


আবদুর রহমান ইবনে আসআদ ইবনে যুরারা রা. বলেন, বদরের যুদ্ধবন্দীদের যখন মদীনা মুনাওয়ারায় আনা হয়, তখন উম্মুল মুমিনীন সাওদা বিনতে যামআ রা. আফরা পরিবারে আউফ ও মুয়াউয়িজ ইবনে আফরার জন্য শোকপালনের মজলিসে বসে ছিলেন। তখনও পর্দার বিধান অবতীর্ণ হয়নি। সাওদা রা. বলেন, আমি যুদ্ধবন্দীদের আনার খবর পেয়ে ঘরে ফিরে এলাম। রসূলুল্লাহ সা. সেখানে অবস্থান করছিলেন। আমি আবু ইয়াযীদ সুহাইল ইবনে আমরকে কাঁধের সাথে হাত বাঁধা অবস্থায় কক্ষের এক কোণে পড়ে থাকতে দেখলাম। তাকে এ অবস্থায় দেখে অনিচ্ছাকৃতভাবেই যেন আমার মুখ থেকে বেরিয়ে এলো, হে আবু ইয়াযীদ! এভাবে বন্দী না হয়ে কেন তুমি সম্মানের সাথে মৃত্যুবরণ করলে না? সাথে সাথে আমি রসূলুল্লাহ সা.-এর কণ্ঠ শুনতে পেলাম। তিনি বললেন, হে সাওদা, তুমি কি তাকে আল্লাহ ও তার রসূলের বিরুদ্ধে উস্কে দিচ্ছো? আমি বললাম, ওই সত্তার শপথ, যিনি আপনাকে সত্য ধর্ম দিয়ে পাঠিয়েছেন! আবু ইয়াযীদকে এ অবস্থায় দেখে অনিচ্ছাকৃতভাবেই আমার মুখ থেকে একথা বের হয়েছে। ৩১৫
সুহাইল ইবনে আমরের মুক্তিপণ-সংক্রান্ত আলোচনার জন্য মিকরায ইবনে হাফস ইবনে আখইয়াফ আসেন। সুহাইলকে মুক্তি দেওয়ার সিদ্ধান্ত হলে সাহাবীরা বলেন, আমাদের পাওনা আমাদের দিয়ে দাও। মিকরায বললেন, তোমরা তার স্থলে আমাকে বন্দী করো এবং তাকে ছেড়ে দাও। সে গিয়ে তোমাদের মুক্তিপণ পাঠিয়ে দেবে। তার কথামতো মুসলমানরা সুহাইলকে ছেড়ে দিলেন এবং মিকরাযকে বন্দী করে রাখলেন।
একটি বর্ণনায় এসেছে, ওমর রা. রসূলুল্লাহ সা.-কে বলেন, আমাকে অনুমতি দিন, আমি সুহাইলের সামনের উপর-নীচের দুটো করে চারটা দাত উপড়ে ফেলি। এতে তার জিহ্বা ঝুলে থাকবে। ফলে আর কখনও কোথাও দাঁড়িয়ে আপনার বিরুদ্ধে ভাষণ দিতে পারবে না। রসূলুল্লাহ সা. বললেন, আমি তার মুখ বিকৃত করবো না। তাহলে আল্লাহ আমার মুখ বিকৃত করে দেবেন যদিও আমি নবী। ৩১৬
তারপর রসূল সা. বলেন, ভবিষ্যতে হয়ত এমন অবস্থা হবে যে তার ভাষণের নিন্দা তুমি করবে না।
ইবনে কাসীর বলেন, রসূলুল্লাহ সা.-এর ভবিষ্যদ্বাণীটি ছিল রসূলুল্লাহ সা.-এর মৃত্যু পরবর্তী সময়ে সুহাইল ইবনে আমরের কর্মকাণ্ড সম্পর্কে। যখন আরবের মানুষ গণহারে ধমত্যাগ করছিল এবং মদীনার আশেপাশে বিদ্রোহের আগুন জ্বলে উঠেছিল, তখন সুহাইল ইবনে আমর মক্কার মানুষকে ইসলামের ওপর অটল থাকতে উৎসাহ দিয়ে এক বক্তব্যে বলেন, হে কুরায়েশ সম্প্রদায়, এমনটি যেন না হয় যে, তোমরা সবার পরে ইসলাম গ্রহণ করে সবার আগে ধর্মত্যাগী হয়ে যাবে। ৩১৭
যে কেউ আমাদের মধ্যে ধর্মীয় ব্যাপারে সন্দেহ তৈরি করতে চাইবে, আমরা তাকে হত্যা করবো। ৩১৮
রসূলুল্লাহ সা. সুহাইল ইবনে আমরের দাঁত ভেঙ্গে দেওয়ার অনুমতি দিতে অস্বীকৃতি জানান। তিনি এতে মানুষের সৃষ্টিগত আকৃতি পরিবর্তন করে দেওয়া হয় বলে জানান। শত্রুকে হাতের নাগালে পেয়েও তার সাথে এ ধরনের সদাচরণ রসূলুল্লাহ সা.-এর উম্মতের জন্য একটি উত্তম আদর্শ। ৩১৯

টিকাঃ
৩১৫ আসসীরাতুন নববিয়‍্যাহ: ২/২০০।
৩১৬ আল বিদায়া ওয়ান নিহায়া: ৩/৩১১।
৩১৭ আল বিদায়া ওয়ান নিহায়া: ৩/৩১১।
৩১৮ আত তারীখুল ইসলামী: ৪/১৮১।
৩১৯ সাদেক উরজুন, মুহাম্মাদুর রসূলুল্লাহ ৩/৪৭৪।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00