📘 নবীজির যুদ্ধ জীবন পাঠ ও পর্যালোচনা > 📄 উতবা ইবনে আবী মুঈত ও নযর ইবনে হারেসের হত্যাকাণ্ড

📄 উতবা ইবনে আবী মুঈত ও নযর ইবনে হারেসের হত্যাকাণ্ড


মুতয়িম ইবনে আদীর মতো ভদ্রলোকের কৃতজ্ঞতা প্রকাশের পাশাপাশি উকবা ইবনে আবী মুঈত ও নাযার ইবনে হারেসের মতো পাষণ্ড ব্যক্তিদের অনিষ্ট থেকে মুক্তি পাওয়া প্রয়োজন ছিল। এরা উভয়ে ইসলামের বিরুদ্ধে যুদ্ধের আগুন জ্বালাতো। মুসলমানদের ওপর নানাবিধ নির্যাতন ও অত্যাচারের মূলে ছিল এরা। ইসলামের এই ক্রান্তিকালে তাদের মতো বিদ্বেষী ও পাষণ্ড ব্যক্তিদের মুক্তি দেওয়া ছিল ইসলাম ও مسلمانوں বিরুদ্ধে আরও শত্রুতা করার সুযোগ দেওয়ার নামান্তর। ২৮৮
তাই রসূল সা. মদীনা ফেরার পথে সাফরা নামক স্থানে পৌছে তাদের উভয়কে হত্যার নির্দেশ দেন। উকবা ইবনে আবী মুঈত নিজের প্রাণদণ্ডাদেশের কথা জানতে পেরে বলতে থাকে, আমার ধ্বংস হোক হে কুরায়েশ সম্প্রদায়! সবাইকে বাঁচিয়ে রেখে কেন শুধু আমাকেই হত্যা করা হচ্ছে?
রসূলুল্লাহ সা. জবাবে বলেন, আল্লাহ ও তার রসূলের সাথে তোমার শত্রুতা ও বিদ্বেষের কারণে তোমাকে হত্যা করা হচ্ছে। উত্তরে সে বলে, আমার সাথে সদয় আচরণ করাই কল্যাণকর হবে। আমার সাথে আমার গোত্রের অন্যদের মতোই আচরণ করা হোক। যদি তাদের হত্যা করা হয়, তাহলে আমাকেও তাদের সাথে হত্যা করা হোক। তাদের সাথে দয়ার আচরণ করা হলে আমার সাথেও অনুরূপ আচরণ করা হোক। যদি মুক্তিপণের বিনিময়ে তাদের মুক্ত করে দেওয়া হয়, তাহলে আমাকেও সেই সুযোগ দিন হে মুহাম্মাদ! আমার অবর্তমানে কে আমার সন্তানদের দেখাশোনা করবে? রসূলুল্লাহ সা. জবাবে বলেন, 'আগুন।' অতঃপর তিনি বলেন, 'হে আসেম, এগিয়ে গিয়ে তার মস্তক ছিন্ন করো।১২৮৯
আসেম রা. নির্দেশ পালন করেন। ২৯০
নাযার ইবনে হারেস ছিল কুরায়েশদের সবচেয়ে কুটিল ও কুচক্রী সেনাদের অন্যতম। রসূলুল্লাহ সা.-কে নানাভাবে কষ্ট দেয়া ও তার সাথে শত্রুতা করাই ছিল তার কাজ। সে হীরায় কিছুকাল কাটিয়েছিল এবং সেখান থেকে পারস্যের রাজাদের কিছু কাহিনী শিখে এসেছিল। রুস্তম ও ইসফিন্দিয়ারের উপাখ্যানও সে জানতো। রসূলুল্লাহ সা. যখনই কোনো বৈঠকে বসে আল্লাহর বাণী শোনাতেন এবং তার জাতিকে পূর্বতন জাতিগুলো কীভাবে আল্লাহর রোষের শিকার হয়ে ধ্বংস হয়ে গিয়েছিল সেসব কথা উল্লেখ করে হুঁশিয়ার করতেন, তখন রসূলুল্লাহ সা. কথা শেষ করে উঠে যাওয়া মাত্রই সে বলতো, হে কুরায়েশ, আমি মুহাম্মাদের চেয়েও সুন্দর কাহিনী বলতে পারি। এসো আমি তোমাদেরকে তার কথার চেয়ে চটকদার কাহিনী শোনাই। অতঃপর সে তাদেরকে পারস্যের রাজাদের এবং রুস্তম ও ইসফিন্দিয়ারের উপাখ্যান শোনাতো। তারপর বলতো, মুহাম্মাদ আমার এসব কথার চেয়ে কি সুন্দর কথা বলতে পারে? ২৯১
আল্লাহ তাআলার ব্যাপারে কোনো জ্ঞান তার ছিল না। দম্ভভরে মিথ্যা শপথ করে সে বক্তব্য দিতো। সে মনে করতো, আল্লাহ তাআলার অবতীর্ণ কিতাবের চাইতে উত্তম আলোচনা করতে সে সক্ষম। সে দাবি করতো তার বক্তব্য রসূলুল্লাহ সা.-এর বক্তব্যের চাইতে উত্তম। এমন ব্যক্তি রসূলুল্লাহ সা.-এর সামনে যখন বন্দী হিসেবে উপনীত হয়, তখন রসূলুল্লাহ সা. তাকে তার উপযুক্ত শাস্তি দেওয়াই যথার্থ মনে করলেন। তাই তিনি তাকে ওইসব বন্দীদের অন্তর্ভুক্ত করলেন না, যাদের ব্যাপারে মুক্তিপণের সিদ্ধান্ত গৃহীহ হয়েছিল। ২৯২
তিনি তাকে হত্যার নির্দেশ দেন। আলী ইবনে আবী তালিব রা. তাকে হত্যা করেন। ২৯৩
এই দুই অপরাধীকে হত্যা করা হলে মুসলমানরা এটা ভালোভাবে বুঝে গিয়েছিলেন যে, এই ধরনের অবাধ্য ব্যক্তিদের সাথে নম্র আচরণের কোনো সুযোগ নেই। এরা অপরাধের হোতা ও পথভ্রষ্টকারী। তাদের সাথে সদাচরণের কোনো মানে হয় না। তারা নিজেদের কৃতকর্মের মাধ্যমে ক্ষমাপ্রাপ্তির কোনো সুযোগ বাকি রাখেনি। ২৯৪
ইসলাম ও مسلمانوں কুৎসা রটনা, তাদের বিরুদ্ধে বিদ্বেষের বীজ বপনে এদের নাম ছিল শীর্ষে। ২৯৫

টিকাঃ
২৮৮ মুহাম্মাদ আহমাদ বাশমীল, গাযওয়াতু বদর আলকুবরা ১৬২। ঈষৎ সংক্ষেপিত।
২৮৯ মাজমাউয যাওয়ায়িদ: ৬/৮৯।
২৯০ আত তারবিয়াতুল কিয়াদিয়া: ৩/৬০।
২৯১ সীরাতে ইবনে হিশাম: ১/৪৩৯-৪৪০।
২৯২ আত তারবিয়াতুল কিয়াদিয়া: ৩/৫৭।
২৯৩ সীরাতে ইবনে হিশাম ২/২৫৫।
২৯৪ আত তারবিয়াতুল কিয়াদিয়া: ৩/৬০।
২৯৫ আল বিদায়া ওয়ান নিহায়া: ৩/৩০৬।

📘 নবীজির যুদ্ধ জীবন পাঠ ও পর্যালোচনা > 📄 যুদ্ধবন্দীদের সাথে সদাচরণের উপদেশ ও মুক্তিপণ আদায়

📄 যুদ্ধবন্দীদের সাথে সদাচরণের উপদেশ ও মুক্তিপণ আদায়


মদীনা মুনাওয়ারায় ফিরে এসে রসূলুল্লাহ সা. সাহাবায়ে কেরামের মধ্যে যুদ্ধবন্দীদের বণ্টন করে দেন। এদের ব্যাপারে নির্দেশনা দিতে গিয়ে তিনি বলেন, তোমরা এদের সাথে ভালো আচরণ করো। ২৯৬
তার এই উপদেশ ছিল কুরআনে কারীমের সে আয়াতের বাস্তবরূপ :
وَ يُطْعِمُوْنَ الطَّعَامَ عَلَى حُبِّهِ مِسْكِيْنًا وَيَتِيْمًا وَأَسِيرًا
তারা খাদ্যের প্রতি আসক্তি থাকা সত্ত্বেও মিসকীন, এতিম ও বন্দীকে খাদ্য দান করে। ২৯৭
মুসআব ইবনে উমায়ের রা.-এর ভাই আবু আযীয ইবনে উমায়ের নিজের চোখে দেখা অবস্থার বর্ণনা দিতে গিয়ে বলেন, আমি বদরযুদ্ধের বন্দীদের অন্তর্ভুক্ত ছিলাম। রসূলুল্লাহ সা. সাহাবীদের নির্দেশ দিয়েছিলেন, 'তোমরা যুদ্ধবন্দীদের সাথে ভালো আচরণ করো। আমি আনসারদের একটি দলের সাথে ছিলাম। রসূলুল্লাহ সা.-এর নির্দেশের কারণে তারা নিজেরা সকাল-বিকাল খেজুর খেয়ে কাটাতেন; কিন্তু আমাকে যবের রুটি খেতে দিতেন। ২৯৮
আবুল আস ইবনে রাবী বলেন, আমি আনসারদের একটি দলের কাছে বন্দী অবস্থায় ছিলাম। আল্লাহ তাআলা তাদের সদাচরণের প্রতিদান দান করুন। সকাল-সন্ধ্যা যখনই তারা খেতেন, আমাকে রুটি খেতে দিতেন। অথচ নিজেরা খেজুর খেতেন। মদীনায় সাধারণত খেজুরই সহজলভ্য ছিল। রুটি খুব কম তৈরি করা হতো। তাদের কারও অংশে রুটির টুকরো চলে এলে তারা তা আমাকে দিয়ে দিতেন। ওয়ালিদ ইবনে মুগীরাও বদরযুদ্ধের বন্দীদের অন্তর্ভুক্ত ছিলেন। তিনিও এ ধরনের বর্ণনা দিয়েছেন। তিনি এ-ও বলেন, যাদের কাছে আমি বন্দী অবস্থায় ছিলাম, তারা নিজেরা পায়ে হেঁটে আমাকে বাহনে আরোহন করিয়েছেন। ২৯৯
মুসলমানদের চরিত্র মাধুরি এমনই ছিল। কুরআনে কারীমে মুমিনদের এমন গুণাবলির কথাই এসেছে। রসূলের মুখে শোনা কুরআনের শিক্ষার আলোকেই সাহাবায়ে কেরাম রা.-এর মধ্যে এমন গুণাবলি জন্ম নিয়েছিল। সাহাবায়ে কেরামের আচরণ দেখে যুদ্ধবন্দী কুরায়েশ নেতাদের কয়েকজন ইসলামের প্রতি আকৃষ্ট হন। যেমন, আবু আযীয ইবনে উমায়ের যুদ্ধবন্দীদের ব্যাপারে রসূলুল্লাহ সা.-এর নির্দেশের পরিপূর্ণ বাস্তবায়ন দেখে মদীনা মুনাওয়ারা পৌঁছার পরপরই ইসলাম গ্রহণ করেন। সায়েব ইবনে উবায়েদও নিজের মুক্তিপণ আদায় করে ইসলামের সুশীতল ছায়াতলে আশ্রয় নেন। ৩০০
যেসব যুদ্ধবন্দী মুক্তি পেয়েছিল, তারা নিজেদের আবাসস্থলে ফিরে গেলেও তাদের অনেকের মনে প্রভাব বিস্তার করে রেখেছিল ইসলামের বাণী। আর তাই তারা রসূলুল্লাহ সা.-এর উন্নত চরিত্র ও হৃদ্যতাপূর্ণ আচরণের কথা আলোচনা করতো। তার প্রশংসায় পঞ্চমুখ থাকতো। ৩০১
যুদ্ধবন্দীদের সাথে এমন হসতাপূর্ণ আচরণ ইসলামী জীবনব্যবস্থার সৌন্দর্যের একটি দৃষ্টান্ত। ইসলামের শত্রুরাও সাহাবায়ে কেরামের উত্তম চরিত্র ও আচরণের কারণে প্রভাবিত হয়ে পড়ছিল। ৩০২

টিকাঃ
২৯৬ প্রাগুক্ত: ৩/৩০৭।
২৯৭ সূরা দাহর: ৮।
২৯৮ মাজমাউজ যাওয়ায়িদ: ৬/৮৬।
২৯৯ ওয়াকেদী প্রণীত মাগাযী: ১/১১৯।
৩০০ সাদেক উরজুন, মুহাম্মাদুর রসূলুল্লাহ ৩/৪৭৪।
৩০১ সাদেক উরজুন, মুহাম্মাদুর রসূলুল্লাহ: ৩/৪৭৪।
৩০২ আত তারীখুল ইসলামী: ৪/১৭৫।

📘 নবীজির যুদ্ধ জীবন পাঠ ও পর্যালোচনা > 📄 রসূলুল্লাহ সা.-এর চাচা আব্বাসের মুক্তিপণ

📄 রসূলুল্লাহ সা.-এর চাচা আব্বাসের মুক্তিপণ


কুরায়েশ নেতারা নিজেদের যুদ্ধবন্দীদের মুক্তিপণ রসূলুল্লাহ সা.-এর কাছে পাঠান। আব্বাস রা. বলেন, হে আল্লাহর রসূল! আমিতো পূর্ব থেকেই মুসলমান। রসূলুল্লাহ সা. বলেন, আল্লাহ তাআলা আপনার ইসলাম সম্পর্কে অবগত আছেন। যদি আপনার দাবি সত্য হয়ে থাকে তাহলে আল্লাহ তাআলা আপনাকে এর প্রতিদান দেবেন। কিন্তু আমরা আপনার বাহ্যিক অবস্থা দেখে সিদ্ধান্ত নেবো। সে মতে আপনি শত্রুপক্ষের লোক। তাই আপনাকে নিজের ও আপনার দুই ভাতিজার মুক্তিপণ আদায় করতে হবে। আব্বাস বললেন, হে আল্লাহর রসূল! আমার কাছে কোনো সম্পদ নেই। রসূলুল্লাহ সা. বললেন, আপনি ও আপনার স্ত্রী উম্মুল ফযল মিলে যে সম্পদ মাটিতে পুঁতে রেখেছেন তা কোথায়? যে সম্পদ মাটিতে লুকিয়ে রেখে আসার সময় আপনি তাকে বলছিলেন, যদি আমি এই যাত্রায় মৃত্যুবরণ করি, তাহলে ফযল, আবদুল্লাহ ও কুসামের জন্য এই সম্পদ কাজে লাগাবে। আব্বাস বললেন, আল্লাহর শপথ হে আল্লাহর রসূল! আমি ভালোভাবেই জানি আপনি আল্লাহর রসূল। কেননা আমার প্রোথিত এ সম্পদ সম্পর্কে আমি ও উম্মুল ফযল ছাড়া অন্য কেউ জানে না। আপনি আমার কাছ থেকে যে বিশ উকিয়া মাল পেয়েছেন তা থেকে হিসাব করে রেখে দিন। রসূলুল্লাহ সা. বললেন, সেই সম্পদ তো আল্লাহ তাআলা তোমার পক্ষ থেকে আমাদের দিয়ে দিয়েছেন।' অতঃপর আব্বাস রা. নিজের, তার উভয় ভাতিজার এবং তার মিত্রের মুক্তিপণ আদায় করেন। এ ঘটনার প্রেক্ষিতে আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন:
يَـٰٓأَيُّهَا ٱلنَّبِيُّ قُل لِّمَن فِىٓ أَيْدِيكُم مِّنَ ٱلْأَسْرَىٰٓ إِن يَعْلَمِ ٱللَّهُ فِى قُلُوبِكُمْ خَيْرًا يُؤْتِكُمْ خَيْرًا مِّمَّآ أُخِذَ مِنكُمْ وَيَغْفِرْ لَكُمْ ۚ وَٱللَّهُ غَفُورٌ رَّحِيمٌ وَإِن يُرِيدُوا۟ خِيَانَتَكَ فَقَدْ خَانُوا ٱللَّهَ مِن قَبْلُ فَأَمْكَنَ مِنْهُمْ ۗ وَٱللَّهُ عَلِيمٌ حَكِيمٌ
হে নবী, তোমাদের হাতে যে সব যুদ্ধবন্দী আছে, তাদেরকে বল, যদি আল্লাহ তোমাদের অন্তরসমূহে কোন কল্যাণ আছে বলে জানেন, তাহলে তোমাদের থেকে যা নেয়া হয়েছে, তার চেয়ে উত্তম কিছু দেবেন এবং তোমাদেরকে ক্ষমা করবেন, আর আল্লাহ ক্ষমাশীল, পরম দয়ালু। আর যদি তারা তোমার সাথে বিশ্বাসঘাতকতা করার ইচ্ছা করে, তাহলে তারা তো পূর্বে আল্লাহর সাথেও বিশ্বাসঘাতকতা করেছে। অতঃপর তিনি তাদের উপর (তোমাকে) শক্তিশালী করেছেন। আর আল্লাহ মহাজ্ঞানী, প্রজ্ঞাবান। ৩০০
আব্বাস রা. বলেন, অতঃপর আল্লাহ তাআলা ইসলাম গ্রহণের পর আমাকে মুক্তিপণ হিসেবে আদায় করা বিশ উকিয়ার পরিবর্তে বিশজন গোলাম দান করেন। প্রতিটি গোলামের কাছেই এমন সম্পদ ছিল, যার মাধ্যমে তারা ব্যবসা করতো। আশা করি, আল্লাহ তাআলা আমাকে ক্ষমা করবেন। ৩০৪
পবিত্র কুরআনের এই আয়াত যদিও আব্বাস রা.-এর ব্যাপারে নাযিল হয়েছিল, কিন্তু এর বিধান সকল বন্দীদের জন্যই প্রযোজ্য ছিল। কেননা, বিশেষ শব্দের মাধ্যমে বর্ণিত বিধানের ক্ষেত্রেও কুরআনে কারীমে ব্যাপক অর্থ উদ্দেশ্য হয়ে থাকে। ৩০৫
আনসারদের কেউ কেউ রসূলুল্লাহ সা.-এর কাছে তাদের ভাগিনা আব্বাসকে মুক্তিপণ ছাড়াই মুক্তি দেওয়ার অনুমতি চাইলে রসূলুল্লাহ সা. তাদের বলেন, আল্লাহর শপথ, তোমরা তার মুক্তিপণ থেকে এক মুদ্রাও হ্রাস করবে না। ৩০৬
আনসারগণ নবীজির মর্যাদার প্রতি কতটা লক্ষ্য রাখতেন দেখুন! তারা এক্ষেত্রে অনুমতি প্রার্থনা করতে গিয়ে 'রসূলুল্লাহ সা.-এর চাচা' বলে উল্লেখ না করে 'নিজেদের ভাগিনা' ৩০৭ হওয়ার কথা উল্লেখ করেছেন। কারণ, 'রসূলের চাচা' বললে মনে হতো, যেন তারা রসূলুল্লাহ সা.-এর ওপর অনুগ্রহ করতে চাচ্ছেন। এই কথা থেকে তাদের বুদ্ধিমত্তা ও সুরুচি প্রকাশ পায়। রসূলুল্লাহ সা. তাদের এ আবদারে সাড়া দেননি যেন দীনের মধ্যে কোনো ধরনের স্বজনপ্রীতি জায়গা করে নিতে না পারে। ৩০৮
রসূলুল্লাহ সা.-এর এই আচরণ থেকে অন্যান্য যুদ্ধবন্দী ও মুসলমানরা কোনো অবস্থাতেই স্বজনপ্রীতি না করার শিক্ষা পায়। রসূল সা. বরং উল্টোটা করেন। নিজের চাচার মুক্তিপণ আরো বাড়িয়ে দেন। ৩০৯
আব্বাস নিজের ও নিজের ভাতিজার মুক্তিপণ আদায় করে ফিরে আসেন মক্কায়। তিনি নিজের ইসলাম গ্রহণের বিষয়টি লুকিয়ে রেখে অত্যন্ত সুকৌশলে পবিত্র মক্কা নগরীতে ইসলামী সাম্রাজ্য প্রতিষ্ঠার ভিত্তি স্থাপনে ব্রত থাকেন। যার সফলতা দেখা দেয় মক্কা বিজয়ের মাধ্যমে। এর পূর্বেও কয়েকবার তিনি ইসলাম গ্রহণের ঘোষণা দিয়েছিলেন। ৩১০

টিকাঃ
৩০৩ সূরা আনফাল: ৭০-৭২।
৩০৪ মুসনাদে আহমদে (৩৩১০) এই বিবরণ প্রায় এভাবেই বর্ণিত হয়েছে।
৩০৫ হাদীসুল কুরআনিল কারীম আন গাযাওয়াতির রসূল: ১/১৩২।
৩০৬ ফাতহুল বারী: ৭/৩২১।
৩০৭ কেননা, হজরত আব্বাসের নানী, আবদুল মুত্তালিবের স্ত্রী ছিলেন মদিনার বনু নাজ্জার বংশোদ্ভূত।
৩০৮ সুবুলুর রাশাদ: ৪/১৩৫।
৩০৯ আবু শাহবা প্রণীত আসসীরাতুন নববিয়্যাহ ২/১৭৬।
৩১০ আত তারবিয়াতুল কিয়াদিয়া: ৩/৬৮।

📘 নবীজির যুদ্ধ জীবন পাঠ ও পর্যালোচনা > 📄 যায়নাবের স্বামী আবুল আস ইবনে রাবীর মুক্তিপণ

📄 যায়নাবের স্বামী আবুল আস ইবনে রাবীর মুক্তিপণ


উম্মুল মুমিনীন আয়েশা রা. থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, মক্কাবাসীরা যখন তাদের বন্দীদের মুক্তিপণের অর্থ পাঠায় তখন যায়নাব রা. আবুল আসের মুক্তিপণ এবং সাথে তার গলার হার পাঠান। মা খাদীজা রা. আবুল আসের সাথে বিয়ের সময় হারটি তাকে উপহার দিয়েছিলেন। আয়েশা রা. বলেন, হারটি দেখে খাদীজার কথা রসূল সা.-এর মনে পড়ে যায়। তিনি আবেগাপ্লুত হয়ে সাহাবীদের বললেন, যদি তোমরা ভালো মনে করো তাহলে যায়নাবের বন্দীকে ছেড়ে দাও এবং তার প্রেরিত মুক্তিপণও তাকে ফেরত দিয়ে দাও। সাহাবীরা এক বাক্যে রাজি হয়ে গেলেন। আবুল আসের কাছ থেকে রসূল সা. প্রতিশ্রুতি নিলেন যে, সে যায়নাবকে তার কাছে পাঠিয়ে দেবে। তাকে নিয়ে আসার জন্য নবীজি যায়েদ ইবনে হারেসা রা. এবং একজন আনসারীকে পাঠান। তিনি তাদেরকে বলেন, তোমরা ইয়াজিজ উপত্যকায় অবস্থান করবে। যায়নাব তোমাদের সাথে ওই স্থানে এসে একত্র হলে তোমরা তাকে নিয়ে চলে আসবে। ৩১১
আবুল আস কখনও ইসলামের পথে প্রতিবন্ধক হয়ে দাঁড়াননি। নিজের কোনো কথা বা কাজে রসূলুল্লাহ সা. বা তার কোনো সাহাবীর কষ্টের কারণ হননি। ব্যবসায়িক ব্যস্ততা ও রসূল সা.-থেকে লজ্জাশীল হওয়ার কারণে তিনি অন্য কুরায়েশদের মতো ইসলামের পথে প্রতিবন্ধক হওয়া থেকে বেঁচে ছিলেন। বদরযুদ্ধে রসূলুল্লাহ সা.-এর এই জামাতা এমন যুদ্ধবন্দীদের অন্তর্ভুক্ত ছিলেন, যারা যুদ্ধক্ষেত্রে বিশেষ কোনো পরামর্শ দেননি বা বিশেষ কোনো ভূমিকা রাখেননি। কুরায়েশরা নিজেদের বন্দীদের মুক্তিপণ পাঠানো শুরু করলে যায়নাবও তার জন্য মুক্তিপণ পাঠান। খাদীজা তার আদরের কন্যাকে বিবাহ উপলক্ষে যে হার দিয়েছিলেন তাও মুক্তিপণের মধ্যে ছিল। রসূলুল্লাহ সা. তার প্রিয় মেয়ের হার মুক্তিপণের তালিকায় দেখতে পেয়ে আবেগাপ্লুত হন। এ হারটি ছিল তার কাছে পিতৃত্ব, স্ত্রী, পরিবার, ভালোবাসা ও মমতার স্মৃতিচিহ্ন।
রসূলুল্লাহ সা. ছিলেন একজন বাবা। এমন বাবা যার ভালোবাসা ও স্নেহের কোনো তুলনা হয় না। পারিবারিক এই স্মৃতিচিহ্ন যেন রসূলের হৃদয়কে দলিত- মথিত করে তুলছিল। সর্বোচ্চ সম্মানিত অবস্থানে থেকেও তিনি স্মৃতিচিহ্নটি রক্ষায় সাহাবায়ে কেরামের কাছে নিজের আকাঙ্খার কথা পেশ করেন। তিনি এমনভাবে নিজের নিবেদনটি পেশ করেন যেন তারা এটি ফিরিয়ে দিতে আগ্রহী হয় এবং গণিমতের ক্ষেত্রে তাদের হকও নষ্ট না হয়। রসূলুল্লাহ সা. তার নিবেদনে বলেন, যদি তোমরা ভালো মনে করো তাহলে যায়নাবের বন্দীকে ছেড়ে দাও এবং তার প্রেরিত মুক্তিপণও তাকে ফেরত দিয়ে দাও।
এরকম কোমলভাবে তিনি মনের আকাঙ্খা প্রকাশ করেন। যেন তারা আন্তরিকতা ও পরিপূর্ণ সন্তুষ্টির সাথে খুশি মনে তার প্রস্তাবে রাজি হয়। ৩১২
মেয়ের প্রতি বাবার ভালোবাসা প্রদর্শন ছাড়াও এক্ষেত্রে রসূল সা.-এর আরেকটি উদ্দেশ্য ছিল। নবীজির এই জামাতা ছিলেন অত্যন্ত ধীশক্তিসম্পন্ন ও প্রজ্ঞার অধিকারী। তবুও তিনি কাফের অবস্থায় জীবনযাপন করছিলেন। রসূল সা. উত্তম আচরণের মাধ্যমে তাকে ইসলাম গ্রহণে উদ্বুদ্ধ করছিলেন। শেষ পর্যন্ত আবুল আস ইবনে রাবী ষষ্ঠ হিজরিতে ইসলামের সুশীতল ছায়াতলে আশ্রয় নেন। ৩১৩

টিকাঃ
৩১১ সুনানে আবু দাউদ: ২৬৯২।
৩১২ সাদেক উরজুন, মুহাম্মাদুর রসূলুল্লাহ: ৩/৪৮০-৪৮৭।
৩১৩ 'আত তারীখুল ইসলামী: ৪/১৮৩।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00