📄 যুদ্ধলব্ধ সম্পদের ব্যাপারে মতবিরোধ
উবাদা ইবনে সামিত রা. বলেন, আমরা রসূলুল্লাহ সা.-এর সাথে বদরযুদ্ধে অংশগ্রহণ করেছিলাম। মুসলিম ও কাফের-বাহিনীর মধ্যে তুমুল যুদ্ধ শেষে আল্লাহ তাআলা কাফেরদের পরাজিত করেন। মুসলিম মুজাহিদদের একটি দল শত্রুনিধনে ব্যস্ত ছিলেন। একটি দল কাফেরদের বন্দী বানিয়ে নিয়ে যাচ্ছিলেন। আরেকটি দল রসূলুল্লাহ সা.-কে শত্রুদের অতর্কিত হামলা থেকে নিরাপদে রাখতে পাহারা দিচ্ছিলেন। ইতোমধ্যে রাতের অন্ধকার নেমে এলে মুসলিম বাহিনীর সদস্যরা সমবেত হন। যুদ্ধলব্ধ সম্পদ একত্রকারীরা বললেন, এসব আমরা একত্রিত করেছি। তাই এতে শুধু আমাদের অধিকার থাকবে। যারা শত্রুনিধনে ব্যস্ত ছিলেন তারা বললেন, এই সম্পদে তোমাদের হক আমাদের চেয়ে বেশি নয়; আমরা শত্রুদের তাড়িয়ে দিয়েছি এবং তাদের পরাজিত করেছি। আরেকদিকে, রসূলুল্লাহ সা.-এর পাহারায় নিয়োজিত মুজাহিদরা বললেন, এই সম্পদে আমাদের চেয়ে তোমাদের অধিকার বেশি নয়। আমরা রসূলুল্লাহ সা.-এর নিরাপত্তা নিশ্চিত করার দায়িত্বে নিয়োজিত ছিলাম, তাই সম্পদ জমা করতে পারিনি।
يَسْـَٔلُوْنَكَ عَنِ الْاَنْفَالِ قُلِ الْاَنْفَالُ لِلّٰهِ وَ الرَّسُوْلِ فَاتَّقُوا اللّٰهَ وَ اَصْلِحُوْا ذَاتَ بَيْنِكُمْ وَ اَطِيْعُوا اللّٰهَ وَ رَسُوْلَهٗۤ اِنْ كُنْتُمْ مُّؤْمِنِيْنَ
লোকেরা তোমাকে গনীমতের মাল সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করে; বলো, গনীমতের মাল আল্লাহ ও রসূলের জন্য। সুতরাং তোমরা আল্লাহকে ভয় করো এবং পরস্পরের মধ্যকার অবস্থা সংশোধন করে নাও। আর আল্লাহ ও তার রসূলের আনুগত্য করো, যদি তোমরা মুমিন হও। ২৬২
অতঃপর রসূলুল্লাহ সা. مسلمانوں মধ্যে তা বণ্টন করে দেন। ২৬৩
আরেক বর্ণনায় এসেছে, উবাদা ইবনে সামিত রা.-কে সূরা আনফাল অবতীর্ণ হওয়া সম্পর্কে প্রশ্ন করা হলে তিনি বলেন, এ আয়াত আমাদের, অর্থাৎ, বদরযুদ্ধে অংশগ্রহণকারীদের ব্যাপারে অবতীর্ণ হয়েছে; যখন আমরা যুদ্ধলব্ধ সম্পদের ব্যাপারে মতানৈক্যে লিপ্ত ছিলাম। এতে আমাদের মানবিক দুর্বলতা ফুটে ওঠে। তখন আল্লাহ তাআলা এ সূরা অবতীর্ণ করে যুদ্ধলব্ধ সম্পদ আমাদের অধিকার থেকে নিয়ে আল্লাহর রসূলের অধিকারে ন্যস্ত করেন। অতঃপর রসূলুল্লাহ সা. গণিমতের সম্পদ আমাদের মধ্যে সমানভাবে ভাগ করে দেন। ২৬৪
আল্লাহ তাআলা সূরা আনফাল-এ বদরযুদ্ধকে চিরস্মরণীয় করেছেন। এ সূরায় বদরযুদ্ধের প্রেক্ষাপট, বিভিন্ন ঘটনা ও ফলাফল বিস্তারিতভাবে আলোচনা করা হয়েছে। এই সূরায় আল্লাহ ঈমানদারদের মানসিক ব্যাধিসমূহের চিকিৎসা অত্যন্ত বিজ্ঞোচিতভাবে করেছেন। যুদ্ধলব্ধ সম্পদ যেহেতু যুদ্ধের আনুষাঙ্গিক একটি বিষয়, তাই এর বিধিবিধান দিয়ে এই সূরা শুরু করা হয় এবং এ কথা স্পষ্ট করা হয় যে, যুদ্ধলব্ধ এসব সম্পদ মূলত আল্লাহ ও তার রসূলের অধিকারভুক্ত। প্রকৃতপক্ষে, আল্লাহ তাআলা সবকিছুর অধিকারী এবং রসূলুল্লাহ সা. তার প্রতিনিধি। অতঃপর আল্লাহ তাআলা মুসলমানদের তিনটি বিষয়ে আদেশ দেন। তাকওয়া অবলম্বন করা, পারস্পরিক মনোমালিন্য দূর করা ও আল্লাহ এবং তার রসূলের আনুগত্য করা। জিহাদ বিষয়ে এ তিনটি বিধানও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কারণ, জিহাদের ভিত্তি যদি তাকওয়ার ওপর না হয়, তাহলে তা মোটেও জিহাদ বলে গণ্য হবে না। তদ্রূপ জিহাদের জন্য একতা ও সুসম্পর্ক আবশ্যক বিষয়। তাই সেখানে নিজেদের মধ্যে মতবিরোধের কোনো অবকাশ নেই। এমনিভাবে আল্লাহ তাআলার বিধিবিধানের আনুগত্য ও তার বাস্তবায়ন জিহাদের মৌলিক লক্ষ্য। এটা ছাড়া জিহাদের অস্তিত্ব কল্পনা করা যায় না। এই কারণেই আল্লাহ তাআলা স্পষ্ট করে দেন, ঈমানের নিদর্শন হচ্ছে আল্লাহ ও তার রসূলের আনুগত্য।
অতঃপর আল্লাহ তাআলা মুমিনদের মৌলিক গুণাবলি আলোচনা করেন। এসব গুণ জিহাদের ক্ষেত্রে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। প্রকৃতপক্ষে, সত্যিকার ঈমানই জিহাদের মূল ভিত্তি। মুমিনদের কাছে যখন আল্লাহ তাআলার বাণী তিলাওয়াত করা হয় তখন তাদের ঈমান ধীরে ধীরে বৃদ্ধি পায়।
তৃতীয় গুণ: তারা কখনো আল্লাহ ছাড়া অন্যের ওপর ভরসা করবে না। কারও মুখাপেক্ষী হবে না। তারা একমাত্র আল্লাহর কাছেই আশ্রয় প্রার্থনা করবে। তার কাছ থেকে নিজেদের প্রয়োজন পূরণ করবে। তারা সবসময় আল্লাহ অভিমুখী থাকবে। তারা মনেপ্রাণে বিশ্বাস করবে যে, আল্লাহ তাআলা যা চাইবেন তা বাস্তবায়িত হবে এবং তিনি যা চাইবেন না তা কখনও বাস্তবায়িত হবে না। কারও সাহায্য-সহযোগিতা ছাড়াই আল্লাহ তাআলার ফয়সালা বাস্তবায়িত হবে। কেউ তার ফয়সালার বিরুদ্ধাচরণ করতে পারবে না এবং তিনি সবার হিসাব দ্রুত সম্পন্ন করে থাকেন।
চতুর্থ গুণ: তারা নির্দিষ্ট সময়ের প্রতি লক্ষ্য রেখে নামায আদায় করবে। পরিপূর্ণ পবিত্রতা অর্জন, কুরআনে কারীমের তিলাওয়াত, রুকু-সিজদা, তাশাহুদ ও আল্লাহর রসূলের প্রতি সালাত ও সালাম প্রেরণের মাধ্যমে সুন্নাত মোতাবেক পরিপূর্ণ নামায আদায় করবে।
পঞ্চম গুণ: আল্লাহর প্রদত্ত রিযিক থেকে তার পথে ব্যয় করবে। এর মধ্যে তাদের যাকাত আদায় ও অন্যান্য মানুষের অধিকার আদায়ের বিষয়গুলোও অন্তর্ভুক্ত। তাদের ওপর ওয়াজিব ও মুস্তাহাব নির্বিশেষে সব ধরনের হক তারা আদায় করবে। সকল সৃষ্টিজীব মহান স্রষ্টার তৈরি। সৃষ্টজীবের মধ্যে আল্লাহর কাছে সে-ই সেরা, যে অন্যান্য সৃষ্টিজীবের কল্যাণে কাজ করে।
এভাবে আল্লাহ তাআলা জানিয়ে দিয়েছেন, এসব গুণাবলির অধিকারীরাই প্রকৃত মুমিন আর এ কারণেই তারা জান্নাতের সুউচ্চ আসনে আসীন হবে। আল্লাহ তাআলা তাদের নেক আমলসমূহের প্রতিদান দেবেন ও মানবিক ত্রুটি ইত্যাদি ক্ষমার দৃষ্টিতে দেখবেন। সূরাটির ভূমিকায় জিহাদের জন্য প্রয়োজনীয় যাবতীয় গুণাবলি বর্ণনা করা হয়েছে। এমন সব অভ্যাস থেকে দূরে থাকতে বলা হয়েছে, যা লাঞ্ছনা ও পরাজয়ের কারণ হতে পারে। যেমন যুদ্ধলব্ধ সম্পদ ইত্যাদি নিয়ে মতবিরোধে লিপ্ত হওয়া বা আল্লাহ তাআলার কোনো নির্দেশ অমান্য করা। ২৬৫
আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন,
يَسْئَلُوْنَكَ عَنِ الْاَنْفَالِ قُلِ الْاَنْفَالُ لِلَّهِ وَ الرَّسُوْلِ فَاتَّقُوا اللَّهَ وَ أَصْلِحُوا ذَاتَ بَيْنِكُمْ وَ أَطِيْعُوا اللَّهَ وَ رَسُوْلَهُ إِنْ كُنْتُمْ مُّؤْمِنِيْنَ إِنَّمَا الْمُؤْمِنُوْنَ الَّذِيْنَ إِذَا ذُكِرَ اللهُ وَجِلَتْ قُلُوْبُهُمْ وَ إِذَا تُلِيَتْ عَلَيْهِمْ أَيْتُهُ زَادَتْهُمْ إِيْمَانًا وَعَلَى رَبِّهِمْ يَتَوَكَّلُوْنَ الَّذِيْنَ يُقِيْمُوْنَ الصَّلُوةَ وَمِمَّا رَزَقْتُمْ يُنْفِقُوْنَ أُولَئِكَ هُمُ الْمُؤْمِنُوْنَ حَقًّا لَهُمْ دَرَجْتُ عِنْدَ رَبِّهِمْ وَمَغْفِرَهُ وَرِزْقٌ كَرِيْمٌ
লোকেরা তোমাকে গনীমতের মাল সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করে; বল, গনীমতের মাল আল্লাহ ও রসূলের জন্য। সুতরাং তোমরা আল্লাহকে ভয় কর এবং পরস্পরের মধ্যকার অবস্থা সংশোধন করে নাও। আর আল্লাহ ও তার রসূলের আনুগত্য কর, যদি তোমরা মুমিন হও।
মুমিন তো তারাই আল্লাহর কথা আলোচিত হলেই যাদের অন্তর কেঁপে উঠে, আর তাদের কাছে যখন তার আয়াত পঠিত হয়, তখন তা তাদের ঈমান বৃদ্ধি করে আর তারা তাদের প্রতিপালকের উপর নির্ভর করে। তারা নামায কায়েম করে, আর আমি তাদেরকে যে জীবিকা দিয়েছি তাথেকে ব্যয় করে। এরাই সত্যিকারের ঈমানদার, এদের জন্য রয়েছে তাদের রবের সন্নিধানে উচ্চ পদসমূহ, আরও রয়েছে ক্ষমা ও সম্মানজনক জীবিকা। ২৬৬
ড. মুহাম্মাদ আমীন মিসরী বলেন, উপরোক্ত আয়াতে বদরযুদ্ধে মুমিনদের কর্মকাণ্ডের বিবরণ ফুটে ওঠেনি; কিন্তু এখানে তাদের প্রতি ভৎসনাও রয়েছে। যা মুমিনদের নিজেদের মানসিক অবস্থার কথা চিন্তা করে রবের সামনে লজ্জিত হতে বাধ্য করে। এভাবেই আল্লাহ তাআলা মুমিনদের তার ঈমান ও পূর্ণ ঈমানের দূরত্ব সম্পর্কে অবগত করেন। যাতে সে পূর্ণ ঈমান অর্জনের চেষ্টা করতে পারে। চিন্তাশীল ব্যক্তিমাত্রই এখানকার ভৎসনা অনুধাবন করতে পারবে। যদিও এখানে ভৎসনা করা হয়েছে ভৎসনার পরিচিত পদ্ধতি ছাড়াই। মুমিনদের গুণাবলির বিবরণ এমনভাবে পেশ করা হয়েছে, যেন প্রত্যেক মুমিন ব্যক্তি এসব গুণে গুণান্বিত হওয়ার আগ্রহ পোষণ করে। আয়াতের শুরু অংশেই পরিপূর্ণ মুমিনের গুণাবলি সম্পর্কে আলোচনা করা হয়েছে। ইরশাদ হয়েছে, “মুমিন তো তারাই আল্লাহর কথা আলোচিত হলেই যাদের অন্তর কেঁপে উঠে, আর তাদের কাছে যখন তার আয়াত পঠিত হয়, তখন তা তাদের ঈমান বৃদ্ধি করে আর তারা তাদের প্রতিপালকের ওপর নির্ভর করে। তারা নামায কায়েম করে আর আমি তাদেরকে যে জীবিকা দিয়েছি তা থেকে ব্যয় করে। এরাই সত্যিকারের ঈমানদার, এদের জন্য রয়েছে তাদের রবের সন্নিধানে উচ্চ পদসমূহ, আরও রয়েছে ক্ষমা ও সম্মানজনক জীবিকা।”২৬৭
এসব আয়াতে বাহ্যিকভাবে ভৎসনা না করে কিছু বাস্তবতা তুলে ধরা হয়েছে। তবে এসব বাস্তবতার আলোচনাই যেন ছিল ভৎসনার চাইতেও বেশি। ফলে সাহাবায়ে কেরাম আল্লাহর নির্দেশনা ও বিধানের সামনে নিজেদের সমর্পণ করেন। পাশাপাশি গণিমতের মাল বণ্টনের নীতিমালাও বর্ণনা করা হয়। আল্লাহ তাআলা বলেন:
وَاعْلَمُوا أَنَّمَا غَنِمْتُمْ مِنْ شَيْءٍ فَأَنَّ لِلَّهِ خُمُسَهُ وَلِلرَّسُولِ وَلِذِي الْقُرْبَى وَالْيَتَامَى وَالْمَسَاكِينِ وَابْنِ السَّبِيلِ إِنْ كُنْتُمْ آمَنْتُمْ بِاللَّهِ وَمَا أَنْزَلْنَا عَلَى عَبْدِنَا يَوْمَ الْفُرْقَانِ يَوْمَ الْتَقَى الْجَمْعَانِ وَاللَّهُ عَلَى كُلِّ شَيْءٍ قَدِيرُه
তোমরা জেনে রেখো, যুদ্ধে যা তোমরা লাভ করো তার এক-পঞ্চমাংশ হচ্ছে আল্লাহ, তার রসূল, রসূলের আত্মীয়স্বজন, এতিম, মিসকীন ও মুসাফিরদের জন্য যদি তোমরা আল্লাহর ওপর আর চূড়ান্ত ফয়সালার দিন অর্থাৎ দু'পক্ষের (মুসলমান ও কাফের বাহিনীর) মিলিত হওয়ার দিন আমি যা আমার বান্দার ওপর অবতীর্ণ করেছিলাম তার উপর বিশ্বাস করে থাকো। আর আল্লাহ হলেন সকল বিষয়ের ওপর ক্ষমতাবান। ২৬৮
গণিমতের মাল বণ্টনের ক্ষেত্রে আল্লাহর এই নির্দেশনা তখন অবতীর্ণ হয়েছিল যখন সাহাবায়ে কেরাম একনিষ্ঠভাবে প্রজ্ঞাময় আল্লাহর বিধান পালন ও তার যে কোনো নির্দেশ মানার জন্য মানসিকভাবে প্রস্তুত হয়েছিলেন। এখানে স্পষ্টভাবে এই বিধান তুলে ধরা হয় যে, গণিমতের সম্পদের এক পঞ্চমাংশ আল্লাহ ও তার রসূলের জন্য নির্ধারিত। বাকি অংশসমূহ মুসলমানদের মধ্যে বণ্টন করে দেওয়া হবে। কিন্তু পরিশেষে সংরক্ষিত সেই এক-পঞ্চমাংশও তোমাদের কাছেই ফিরিয়ে দেওয়া হবে। কুরআনে কারীমের বর্ণিত খাতসমূহে তা পুনরায় বণ্টন করে দেওয়া হবে; যেমনটি এ সংক্রান্ত হাদীসসমূহে বিস্তারিত আলোচিত হয়েছে।
গণিমতবিষয়ক জিজ্ঞাসার জবাবে আল্লাহর পক্ষ থেকে তাৎক্ষণিক কোনো বিধান অবতীর্ণ করা হয়নি; বরং কিছুটা দেরি করা হয়েছিল। উদ্দেশ্য ছিল সাহাবায়ে কেরামকে মানসিকভাবে প্রস্তুত করা। ধর্মীয় বিধিবিধান অবতীর্ণ করার পূর্বে শ্রোতার মধ্যে এমন অবস্থা তৈরি করা উচিত; যেন আল্লাহ প্রদত্ত বিধান গ্রহণের জন্য সে প্রস্তুত থাকে। যেন শরীয়তের বিধান পরিপূর্ণভাবে মেনে নেওয়ার মানসিকতা তার মধ্যে থাকে। শুরুতেই আল্লাহ তাআলা মুসলমানদের অন্যের উদ্দেশ্যে ইবাদত করতে নিষেধ করেছেন। গণিমতের সম্পদ থেকেও তাদের নিরাশ করেছেন। যেন ইখলাসের সাথে তারা আল্লাহর ইবাদত করে। আল্লাহর সাহায্যপ্রাপ্তির অধিকারী হিসেবে নিজেদের তৈরি করতে পারে। অতঃপর তারা আল্লাহমুখী হলেন, জিহাদে অংশ নিলেন, তুমুল যুদ্ধ করলেন। ফলে আল্লাহ তাআলা তাদের বিশেষ পুরস্কারে ভূষিত করলেন। কল্পনার অধিক সম্মান দান করলেন। ২৬৯
এ মর্মে আবদুল্লাহ ইবনে আমর রা. বলেন, বদরযুদ্ধের দিন রসূলুল্লাহ সা. তিনশো পনেরোজন সাহাবী নিয়ে জিহাদে রওনা হন। বদরপ্রান্তরে পৌছে রসূলুল্লাহ সা. দোআ করেন : 'হে আল্লাহ, এরা পদাতিক অবস্থায় বেরিয়েছে আপনি তাদের বাহনের ব্যবস্থা করুন। এরা খালি গায়ে বেরিয়েছে আপনি তাদের পোশাকের ব্যবস্থা করুন। এরা ক্ষুধার্ত, আপনি তাদের পরিতৃপ্ত করুন।' অতঃপর আল্লাহ তাআলা বদরে বিজয় দেন। দেখা গেলো, যুদ্ধ থেকে ফেরার সময় প্রত্যেকের কাছেই এক-দুটি করে উট ছিল। প্রত্যেকেই পর্যাপ্ত পোশাকের অধিকারী হয়েছিলেন ও পরিতৃপ্ত ছিলেন। ২৭০
গণিমত বণ্টনে রসূলুল্লাহ সা.-এর ইনসাফ ছিল অতুলনীয়। তিনি এমন ব্যক্তিদের জন্যও অংশ রেখেছিলেন, যারা রসূলুল্লাহ সা.-এর আদেশে বিভিন্ন দায়িত্বে নিয়োজিত থাকায় যুদ্ধে অংশগ্রহণ করতে পারেননি। রসূলুল্লাহ সা. তাদেরকে যুদ্ধের ফযিলতের অংশীদার ঘোষণার পাশাপাশি সম্পদের অংশও দেন। তাদের জন্য যুদ্ধলব্ধ সম্পদের অংশ নির্ধারণ করা হয় যুদ্ধে অংশগ্রহণকারীদের মতোই। ২৭১
রসূলুল্লাহ সা. তাদের যুদ্ধে অংশগ্রহণ করতে না পারার যৌক্তিক কারণগুলো বিবেচনায় নেন। কারণ, আল্লাহ তাআলা তার বান্দাদের সামর্থ্যের বাইরে কোনো কিছু চাপিয়ে দেন না। তিনি বলেন:
لَا يُكَلِّفُ اللَّهُ نَفْسًا إِلَّا وُسْعَهَا
আল্লাহ কোনো ব্যক্তিকে তার সামর্থ্যের বাইরে দায়িত্ব দেন না। ২৭২
যুদ্ধে বা অন্য কোনো সময়ই রসূলুল্লাহ সা. সাহাবায়ে কেরামের ওপর তাদের সামর্থ্যের অতিরিক্ত কোনো কাজ চাপিয়ে দিতেন না। বদরযুদ্ধে সাহাবায়ে কেরামের কেউ কেউ জরুরি প্রয়োজনে যুদ্ধে অংশগ্রহণ করা থেকে বিরত থাকলে রসূলুল্লাহ সা. তাদের ওজর গ্রহণ করেন। ওই সময় ওসমান ইবনে আফফান রা.-এর স্ত্রী রুকাইয়া রা. ছিলেন খুবই অসুস্থ। তার সেবায় নিয়োজিত থাকার জন্য রসূলুল্লাহ সা. ওসমান রা.-কে যুদ্ধে অংশগ্রহণ না করার অনুমতি দেন।
সহীহ বুখারীতে এসেছে: আবদুল্লাহ ইবনে ওমর রা. ওসমান রা.-এর বদরযুদ্ধে অংশগ্রহণ না করার কারণ সম্পর্কে বলেন, আর তিনি বদরযুদ্ধে এ জন্য অনুপস্থিত ছিলেন যে, রসূলুল্লাহ সা.-এর মেয়ে তার স্ত্রী ছিলেন খুবই অসুস্থ। রসূলুল্লাহ সা. তাকে বললেন, তুমি বদরে অংশগ্রহণকারী ব্যক্তির সমপরিমাণ সাওয়াব ও গণিমতের অংশ পাবে। ২৭১
এছাড়াও রসূলুল্লাহ সা. আবু উমামা রা.-কে তার মায়ের সেবায় নিয়োজিত থাকার অনুমতি দেন। কারণ তার মায়ের সেবার প্রয়োজন ছিল। আবু উমামা রা. থেকে বর্ণিত, রসূলুল্লাহ সা. مسلمانوں বদর অভিমুখে যুদ্ধযাত্রার নির্দেশ দিলে আবু উমামা রসূলুল্লাহ সা.-এর সাথে যুদ্ধযাত্রায় শামিল হওয়ার সংকল্প করেন। তার মামা আবু বুরদা ইবনে নিয়ার তাকে বলেন, হে ভাগিনা, তুমি এখানে থেকে তোমার মায়ের সেবা শুশ্রূষা করো। উত্তরে তিনি তার মামাকে বলেন, আপনি আপনার বোনের প্রতি লক্ষ্য রাখুন। রসূলুল্লাহ সা.-এর সামনে এই সমস্যা উত্থাপিত হলে রসূলুল্লাহ সা. আবু উমামাকে তার মায়ের সেবায় নিয়োজিত থাকার আদেশ দেন। বদরযুদ্ধ শেষে মদিনায় ফিরে রসূলুল্লাহ সা. দেখেন, তার মা মৃত্যুর কোলে শায়িত। রসূলুল্লাহ সা. তার জানাযার নামায আদায় করেন। ২৭৪
রসূলের অনুপম সদাচরণের পাশাপাশি সৈন্যদের মানসিক ও পারিবারিক অবস্থা বিবেচনা করা নিঃসন্দেহে তাদের ও সেনাপ্রধানের মধ্যকার গভীর সম্পর্কের প্রমাণ। পরস্পরের মাঝে হৃদ্যতা ছিল অতুলনীয়। ওপরে আলোচ্য ব্যক্তিগণ ছাড়াও নিম্নোক্ত কয়েকজন সাহাবীকে জরুরি প্রয়োজনে ও রাস্তায় আপতিত বিপদাপদের কারণে যুদ্ধে অংশগ্রহণ না করার অনুমতি দেওয়া হয়েছিল। তারা হলেন:
১. আবু লুবাবা রা.। রসূলুল্লাহ সা. তাকে মদীনায় নিজের স্থলাভিষিক্ত হিসেবে রেখে যান।
২. আসেম ইবনে আদি রা.। মদীনার উঁচু এলাকার দরিদ্র ব্যক্তিদের বিশেষ প্রয়োজনে তাকে সেখানে পাঠানো হয়।
৩. আল-হারেস ইবনে হাতেম রা.। তাকে রসূলুল্লাহ সা. বিশেষ প্রয়োজনে বনু আমর ইবনে আউফের কাছে পাঠিয়েছিলেন।
৪. আল-হারেস ইবনে সাম্মাহ রা.। যুদ্ধযাত্রাকালে দুর্ঘটনার শিকার হয়ে হাড় ভেঙে যায় তার। তাই রসূলুল্লাহ সা. তাকে ফেরত পাঠান।
৫. খাওয়াত ইবনে জুবাইর রা.। যুদ্ধ যাত্রাকালে পায়ের গোছায় পাথরের আঘাতে তিনি আহত হন। সাফরা নামক জায়গা থেকে রসূলুল্লাহ সা. তাকে ফেরত পাঠান। ২৭৫
অনুরূপভাবে রসূলুল্লাহ সা. বদরযুদ্ধে শাহাদাতপ্রাপ্তদের উত্তরাধিকারী ও নিকটাত্মীয়দের যুদ্ধলব্ধ সম্পদ থেকে অংশ দেন। শহীদদের সম্মানিত করা এবং তাদের সন্তান ও পরিবারের দিকে বিশেষ দৃষ্টি দিয়ে চৌদ্দশো বছর পূর্বেই ইসলাম দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে। ২৭৬
টিকাঃ
২৬২ সূরা আনফাল : আয়াত ১।
২৬৩ মুসনাদে ইমাম আহমাদ: ৫/৩২৪।
২৬৪ মুসনাদে ইমাম আহমাদ: ৫/৩২২।
২৬৫ আল অঅসাসু ফিত তাফসীর: ৪/২১১৩-২১১৪।
২৬৬ সুরা আনফাল: আয়াত ১-৪।
২৬৭ সুরা আনফাল: আয়াত ২-৪।
২৬৮ সূরা আনফাল: আয়াত ৪১।
২৬৯ 'সুয়ার ওয়া ইবার মিনাল জিহাদিন নববী ফিল মাদীনাহ: ৬১-৬২।
২৭০ সুনানে আবু দাউদ: ৫/৫২৫।
২৭১ মুঈনুস সীরাহ: ২১৪।
২৭২ সুরা বাকারা: আয়াত ২৮৬।
২৭৩ সহীহ বুখারী: ৩৬৯৯।
২৭৪ মাজমাউজ জাওয়ায়িদ: ৩/৩১।
২৭৫ সীরাতে ইবনে হিশাম: ২/২৫৫-২৫৬।
২৭৬ আত তারবিয়াতুল কিয়াদিয়াহ: ৩/৫৩।
📄 যুদ্ধবন্দীদের ঘটনা
আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস রা. বলেন, যুদ্ধবন্দীদের আটক করা হলে রসূলুল্লাহ সা. এদের সম্পর্কে আবু বকর ও ওমর রা.-এর সাথে পরামর্শ করলেন। আবু বকর রা.-এর মতামত জানতে চাইলে তিনি বললেন, হে আল্লাহর রসূল! তারা তো আমাদের চাচাতো ভাই ও স্বগোত্রীয়। আমি মনে করি, তাদের কাছ থেকে আপনি মুক্তিপণ গ্রহণ করলে ভালো হবে। এতে কাফেরদের বিরুদ্ধে আনাদের শক্তি বাড়বে। ভবিষ্যতে তারা ইসলামের সুশীতল ছায়ায়ও আশ্রয় নিতে পারে।
ওমর ইবনুল খাত্তাব রা.-এর মতামত জানতে চাইলে তিনি বলেন, আল্লাহর শপথ! হে আল্লাহর রসূল! আবু বকর রা. যা সঠিক মনে করছেন আমি তা সঠিক মনে করছি না। আমি মনে করি, আপনি তাদেরকে আমাদের হাতে তুলে দেবেন; আমরা তাদের হত্যা করবো। আকিলকে আলীর হাতে দিন। তিনি তার মস্তক ছিন্ন করবেন। আমার বংশের অমুককে আমার হাতে দিন। আমি তাকে হত্যা করবো। কারণ, তারা কাফেরদের নেতৃস্থানীয় লোক।
পরে আবু বকর রা. যা বলেছেন রসূলুল্লাহ সা. সেটাই পছন্দ করলেন এবং ওমর রা.-এর পরামর্শ তিনি পছন্দ করলেন না। ওমর রা. বলেন, পর দিন আমি রসূলুল্লাহ সা.-এর নিকট এসে দেখি, রসূলুল্লাহ সা. এবং আবু বকর রা. উভয়েই বসে কাঁদছেন। আমি বললাম, হে আল্লাহর রসূল! আপনি এবং আপনার সাথি কেন কাঁদছেন? শুনে আমার কান্না এলে আমিও কাঁদবো। আর যদি আমার কান্না না আসে, তবে যেহেতু আপনারা কাঁদছেন আমি কান্নার ভান করবো।
রসূলুল্লাহ সা. বললেন, মুক্তিপণ গ্রহণের কারণে তোমার সাথিদের ওপর আসন্ন বিপদের কথা স্মরণ করে আমি কাঁদছি। আমাকে দেখানো হয়েছে তাদের শাস্তি এই গাছের চেয়েও নিকটে। গাছটি ছিল রসূল সা.-এর অদূরে। অতঃপর আল্লাহ তাআলা সূরা আনফালের ৬৭ থেকে ৬৯ পর্যন্ত আয়াত অবতীর্ণ করেন।
আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ রা.-এর অন্য বর্ণনায় এসেছে: বদরযুদ্ধের দিন রসূলুল্লাহ সা. যুদ্ধবন্দীদের ব্যাপারে পরামর্শ চাইলে আবু বকর রা. আরজ করেন, হে আল্লাহর রসূল! এরা তো আমাদেরই গোত্রের লোক এবং আমাদের আত্মীয়স্বজন। এদেরকে কিছুটা সুযোগ দিয়ে বাঁচিয়ে রাখুন। হয়তো আল্লাহ তাআলা তাদের তাওবা করার তওফিক দেবেন। ওমর রা. তার প্রস্তাবে বলেন, হে আল্লাহর রসূল! এরা আপনাকে দেশান্তরী করেছে, আপনাকে মিথ্যা প্রতিপন্ন করেছে। আপনি তাদের হত্যা করুন। আবদুল্লাহ ইবনে রাওয়াহা বলছিলেন, হে আল্লাহর রসূল! তাদেরকে ঘন জঙ্গলে প্রবেশ করিয়ে সেখানে আগুন জ্বালিয়ে ধ্বংস করে দিন। আব্বাস এ কথা শুনে তাকে বললেন, এতে তো অত্মীয়তার বন্ধন ছিন্ন করা হয়।
রসূলুল্লাহ সা. সেখানে প্রবেশ করেন কিন্তু তাদের কথার কোনো উত্তর দেন নি। কেউ কেউ বলতে থাকেন রসূলুল্লাহ সা. আবু বকর রা.-এর মতামত গ্রহণ করবেন। আবার কেউ ভাবতে থাকেন তিনি ওমর রা.-এর মতামত গ্রহণ করবেন। আবার কেউ ভাবছিলেন রসূলুল্লাহ সা. আবদুল্লাহ ইবনে রাওয়াহা রা.-এর মতামত গ্রহণ করবেন। অতঃপর রসূলুল্লাহ সা. বাইরে বেরিয়ে আসেন এবং ইরশাদ করেন, 'নিশ্চয়ই আল্লাহ তাআলা কিছু মানুষকে এতোটাই কোমল হৃদয়ের অধিকারী করেছেন যে, তা দুধের চেয়েও কোমল। আবার কিছু কিছু মানুষকে এতোটাই কঠোর হৃদয়ের অধিকারী করেছেন যে, তা পাথরের চেয়েও কঠিন। হে আবু বকর, তোমার উদাহরণ ইবরাহীম আ.; তিনি বলেছিলেন:
فَمَنْ تَبِعَنِي فَإِنَّه مِنِّى وَمَنْ عَصَانِي فَإِنَّكَ غَفُورٌ رَّحِيمٌ
সুতরাং যে আমার অনুসরণ করেছে, নিশ্চয় সে আমার দলভুক্ত, আর যে আমার অবাধ্য হয়েছে, তবে নিশ্চয় আপনি ক্ষমাশীল, পরম দয়ালু। ২৭৭
এবং তোমার দৃষ্টান্ত হচ্ছে হযরত ঈসা আ.; যিনি বলেছিলেন:
إِنْ تُعَذِّبْهُمْ فَإِنَّهُمْ عِبَادُكَ وَإِنْ تَغْفِرْ لَهُمْ فَإِنَّكَ أَنْتَ الْعَزِيزُ الْحَكِيمُ
যদি আপনি তাদেরকে শাস্তি প্রদান করেন তবে তারা আপনারই বান্দা, আর তাদেরকে যদি ক্ষমা করেন, তবে নিশ্চয় আপনি পরাক্রমশালী, প্রজ্ঞাময়। ২৭৮
হে উমর, তোমার উদাহরণ নুহ আ.; যিনি বলছিলেন:
رَّبِّ لَا تَذَرْ عَلَى الْأَرْضِ مِنَ الْكَافِرِينَ دَيَّارٌ
হে আমার রব! জমিনের ওপর কোনো কাফেরকে অবশিষ্ট রাখবেন না। ২৭৯
এবং তোমার দৃষ্টান্ত হচ্ছে মুসা আ.; যিনি বলছিলেন :
رَبَّنَا اطْمِسْ عَلَى أَمْوَالِهِمْ وَاشْدُدْ عَلَى قُلُوبِهِمْ فَلَا يُؤْمِنُوْا حَتَّى يَرَوُا الْعَذَابَ الْأَلِيمَ
হে আমাদের রব, তাদের ধন-সম্পদ নিশ্চিহ্ন করে দিন, তাদের অন্তরসমূহকে কঠোর করে দিন। ফলে তারা ঈমান আনবে না, যতক্ষণ না যন্ত্রণাদায়ক আযাব দেখবে। ২৮০
অতঃপর রসূলুল্লাহ সা. বলেন, তোমরা অভাবগ্রস্ত; তাই তাদের মুক্তিপণ ব্যতীত ছেড়ে দেওয়া বা হত্যা করার সিদ্ধান্ত তোমাদের জন্য সঠিক হবে না। আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ বলেন, আমি বললাম, হে আল্লাহর রসূল! সুহাইল ইবনে বাইদার ব্যাপারে ছাড় দেওয়া হোক। আমি তার ইসলাম গ্রহণের আলোচনা শুনেছি। আমার কথা শুনে রসূলুল্লাহ সা. চুপ করে থাকেন। আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ রা. বলেন, সেদিন আমি সবচেয়ে বেশি আশংকা করছিলাম, হয়তো আল্লাহ আমার ওপর অসন্তুষ্ট হয়ে আকাশ থেকে আমার ওপর পাথর বর্ষণ করবেন। এক সময় রসূলুল্লাহ সা. বললেন, হ্যাঁ, সে এ বিধান থেকে মুক্ত থাকবে। এ কথা শুনে আমি আশ্বস্ত হই। তখন আল্লাহ তাআলা এ আয়াত অবতীর্ণ করেন, ২৮১
مَا كَانَ لِنَبِيَّ أَنْ يَكُونَ لَهُ أَسْرَى حَتَّى يُثْخِنَ فِي الْأَرْضِ
কোনো নবীর জন্য সঙ্গত নয় যে, তার নিকট যুদ্ধবন্দী থাকবে (এবং পণের বিনিময়ে তিনি তাদেরকে মুক্ত করবেন) যতক্ষণ না তিনি জমিনে (তাদের) রক্ত প্রবাহিত করেন। ২৮২
উপরোক্ত আয়াত থেকে একটি মূলনীতি বোঝা যায়। তা হলো, যতই প্রয়োজন হোক, শত্রুর প্রতি নম্রতা দেখানো উচিত নয়। এর ফলে শত্রু তাদের ওপর প্রভাবশালী হয়ে যেতে পারে। ২৮৩
সাহাবায়ে কেরাম মুশরিকদের বন্দী বানাতে শুরু করলে সাআদ ইবনে মুআয রা. এতে কিছুটা মনক্ষুণ্ণ হন। রসূলুল্লাহ সা. তার চেহারায় এমন ভাব প্রত্যক্ষ করে তাকে বলেন, সঙ্গীদের কর্মকাণ্ডে হয়তো তুমি বিরক্ত হচ্ছ। উত্তরে তিনি বলেন, হে আল্লাহর রসূল! ঠিকই বলেছেন। কাফের-বাহিনীর বিরুদ্ধে এটি আল্লাহ তাআলার দেওয়া সর্বপ্রথম সুযোগ। তাই তাদের বাঁচিয়ে রাখার চেয়ে মেরে ফেলাই ভালো হতো বলে আমি মনে করি। ২৮৪
বন্দীদের সাথে রসূলুল্লাহ সা.-এর আচরণ ছিল অত্যন্ত দয়াপূর্ণ, ন্যায়নিষ্ঠ ও ইসলামী দাওয়াতের চাহিদার অনুরূপ। রসূলুল্লাহ সা. বন্দীদের সাথে বিভিন্ন ধরনের আচরণ করেছিলেন। তাদের কাউকে তিনি হত্যা করেছিলেন, কাউকে মুক্তিপণের বিনিময়ে মুক্ত করে দিয়েছিলেন, কাউকে দয়াপরবশ হয়ে এমনিতেই মুক্তি দান করেছিলেন আবার তাদের মধ্যে কয়েকজনকে मुसलमानों দশজন করে শিশুকে শিক্ষাদানের পরিবর্তে মুক্তি দেওয়া হয়েছিল।
ক. মুতয়িম ইবনে আদী'র সুপারিশে রসূল সা. কর্তৃক মুক্তির আশাবাদ
যুবায়ের ইবনে মুতইম রা. সূত্রে বর্ণিত, নবী সা. বদরের যুদ্ধবন্দীদের ব্যাপারে বলেন:
لو كان مطعم بن عدي حيا ثم كلمني في هؤلاء النتنى لأطلقتهم له
মুতয়িম ইবনে আদী জীবিত থাকলে এবং সে এসব নীচ কয়েদীদের মুক্তির জন্য সুপারিশ করলে আমি তার জন্য এদেরকে ছেড়ে দিতাম। ২৮৫
উপরোক্ত হাদীস থেকে রসূল সা.-এর কৃতজ্ঞতাবোধ প্রকাশ পায়। মুতয়িম ইবনে আদী কিছু ক্ষেত্রে অত্যন্ত প্রশংসাযাগ্য কাজ করেছিলেন। তায়েফ থেকে প্রত্যাবর্তনের পর রসূলুল্লাহ সা. তার আশ্রয়ে মক্কা মুকাররমায় প্রবেশ করেন। বনু হাশিম ও মুসলমানরা যখন অবরুদ্ধ ছিলেন, তখন তিনি কুরায়েশদের অবরোধ চুক্তির বিরুদ্ধে সবচেয়ে কঠোর অবস্থান নেন।২৮৬ রসূলুল্লাহ সা.-এর এই আচরণ কাফেরদের সদাচরণেরও কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করতে শেখায়। ২৮৭
টিকাঃ
২৭৭ সূরা ইবরাহীম ৩৬।
২৭৮ সূরা মায়িদা: আয়াত ১১৮।
২৭৯ সূরা নূহ: আয়াত ২৬।
২৮০ সূরা ইউনুস: ৮৮।
২৮১ মুসনাদে আহমাদ: ১/৩৮৩; তাফসীরে ইবনে কাসীর: ২/৩২৫।
২৮২ সূরা আনফাল : ৬৭।
২৮৩ মুঈনুস সীরাহ: ২০৯।
২৮৪ আত-তারবিয়াতিল জিহাদিয়াহ: ১/১৪১।
২৮৫ সুনানে আবু দাউদ: ২৬৮৯।
২৮৬ মুঈনুস সীরাহ: ২০৮।
২৮৭ আত তারবিয়াতুল কিয়াদিয়া: ৩/৫৪।
📄 উতবা ইবনে আবী মুঈত ও নযর ইবনে হারেসের হত্যাকাণ্ড
মুতয়িম ইবনে আদীর মতো ভদ্রলোকের কৃতজ্ঞতা প্রকাশের পাশাপাশি উকবা ইবনে আবী মুঈত ও নাযার ইবনে হারেসের মতো পাষণ্ড ব্যক্তিদের অনিষ্ট থেকে মুক্তি পাওয়া প্রয়োজন ছিল। এরা উভয়ে ইসলামের বিরুদ্ধে যুদ্ধের আগুন জ্বালাতো। মুসলমানদের ওপর নানাবিধ নির্যাতন ও অত্যাচারের মূলে ছিল এরা। ইসলামের এই ক্রান্তিকালে তাদের মতো বিদ্বেষী ও পাষণ্ড ব্যক্তিদের মুক্তি দেওয়া ছিল ইসলাম ও مسلمانوں বিরুদ্ধে আরও শত্রুতা করার সুযোগ দেওয়ার নামান্তর। ২৮৮
তাই রসূল সা. মদীনা ফেরার পথে সাফরা নামক স্থানে পৌছে তাদের উভয়কে হত্যার নির্দেশ দেন। উকবা ইবনে আবী মুঈত নিজের প্রাণদণ্ডাদেশের কথা জানতে পেরে বলতে থাকে, আমার ধ্বংস হোক হে কুরায়েশ সম্প্রদায়! সবাইকে বাঁচিয়ে রেখে কেন শুধু আমাকেই হত্যা করা হচ্ছে?
রসূলুল্লাহ সা. জবাবে বলেন, আল্লাহ ও তার রসূলের সাথে তোমার শত্রুতা ও বিদ্বেষের কারণে তোমাকে হত্যা করা হচ্ছে। উত্তরে সে বলে, আমার সাথে সদয় আচরণ করাই কল্যাণকর হবে। আমার সাথে আমার গোত্রের অন্যদের মতোই আচরণ করা হোক। যদি তাদের হত্যা করা হয়, তাহলে আমাকেও তাদের সাথে হত্যা করা হোক। তাদের সাথে দয়ার আচরণ করা হলে আমার সাথেও অনুরূপ আচরণ করা হোক। যদি মুক্তিপণের বিনিময়ে তাদের মুক্ত করে দেওয়া হয়, তাহলে আমাকেও সেই সুযোগ দিন হে মুহাম্মাদ! আমার অবর্তমানে কে আমার সন্তানদের দেখাশোনা করবে? রসূলুল্লাহ সা. জবাবে বলেন, 'আগুন।' অতঃপর তিনি বলেন, 'হে আসেম, এগিয়ে গিয়ে তার মস্তক ছিন্ন করো।১২৮৯
আসেম রা. নির্দেশ পালন করেন। ২৯০
নাযার ইবনে হারেস ছিল কুরায়েশদের সবচেয়ে কুটিল ও কুচক্রী সেনাদের অন্যতম। রসূলুল্লাহ সা.-কে নানাভাবে কষ্ট দেয়া ও তার সাথে শত্রুতা করাই ছিল তার কাজ। সে হীরায় কিছুকাল কাটিয়েছিল এবং সেখান থেকে পারস্যের রাজাদের কিছু কাহিনী শিখে এসেছিল। রুস্তম ও ইসফিন্দিয়ারের উপাখ্যানও সে জানতো। রসূলুল্লাহ সা. যখনই কোনো বৈঠকে বসে আল্লাহর বাণী শোনাতেন এবং তার জাতিকে পূর্বতন জাতিগুলো কীভাবে আল্লাহর রোষের শিকার হয়ে ধ্বংস হয়ে গিয়েছিল সেসব কথা উল্লেখ করে হুঁশিয়ার করতেন, তখন রসূলুল্লাহ সা. কথা শেষ করে উঠে যাওয়া মাত্রই সে বলতো, হে কুরায়েশ, আমি মুহাম্মাদের চেয়েও সুন্দর কাহিনী বলতে পারি। এসো আমি তোমাদেরকে তার কথার চেয়ে চটকদার কাহিনী শোনাই। অতঃপর সে তাদেরকে পারস্যের রাজাদের এবং রুস্তম ও ইসফিন্দিয়ারের উপাখ্যান শোনাতো। তারপর বলতো, মুহাম্মাদ আমার এসব কথার চেয়ে কি সুন্দর কথা বলতে পারে? ২৯১
আল্লাহ তাআলার ব্যাপারে কোনো জ্ঞান তার ছিল না। দম্ভভরে মিথ্যা শপথ করে সে বক্তব্য দিতো। সে মনে করতো, আল্লাহ তাআলার অবতীর্ণ কিতাবের চাইতে উত্তম আলোচনা করতে সে সক্ষম। সে দাবি করতো তার বক্তব্য রসূলুল্লাহ সা.-এর বক্তব্যের চাইতে উত্তম। এমন ব্যক্তি রসূলুল্লাহ সা.-এর সামনে যখন বন্দী হিসেবে উপনীত হয়, তখন রসূলুল্লাহ সা. তাকে তার উপযুক্ত শাস্তি দেওয়াই যথার্থ মনে করলেন। তাই তিনি তাকে ওইসব বন্দীদের অন্তর্ভুক্ত করলেন না, যাদের ব্যাপারে মুক্তিপণের সিদ্ধান্ত গৃহীহ হয়েছিল। ২৯২
তিনি তাকে হত্যার নির্দেশ দেন। আলী ইবনে আবী তালিব রা. তাকে হত্যা করেন। ২৯৩
এই দুই অপরাধীকে হত্যা করা হলে মুসলমানরা এটা ভালোভাবে বুঝে গিয়েছিলেন যে, এই ধরনের অবাধ্য ব্যক্তিদের সাথে নম্র আচরণের কোনো সুযোগ নেই। এরা অপরাধের হোতা ও পথভ্রষ্টকারী। তাদের সাথে সদাচরণের কোনো মানে হয় না। তারা নিজেদের কৃতকর্মের মাধ্যমে ক্ষমাপ্রাপ্তির কোনো সুযোগ বাকি রাখেনি। ২৯৪
ইসলাম ও مسلمانوں কুৎসা রটনা, তাদের বিরুদ্ধে বিদ্বেষের বীজ বপনে এদের নাম ছিল শীর্ষে। ২৯৫
টিকাঃ
২৮৮ মুহাম্মাদ আহমাদ বাশমীল, গাযওয়াতু বদর আলকুবরা ১৬২। ঈষৎ সংক্ষেপিত।
২৮৯ মাজমাউয যাওয়ায়িদ: ৬/৮৯।
২৯০ আত তারবিয়াতুল কিয়াদিয়া: ৩/৬০।
২৯১ সীরাতে ইবনে হিশাম: ১/৪৩৯-৪৪০।
২৯২ আত তারবিয়াতুল কিয়াদিয়া: ৩/৫৭।
২৯৩ সীরাতে ইবনে হিশাম ২/২৫৫।
২৯৪ আত তারবিয়াতুল কিয়াদিয়া: ৩/৬০।
২৯৫ আল বিদায়া ওয়ান নিহায়া: ৩/৩০৬।
📄 যুদ্ধবন্দীদের সাথে সদাচরণের উপদেশ ও মুক্তিপণ আদায়
মদীনা মুনাওয়ারায় ফিরে এসে রসূলুল্লাহ সা. সাহাবায়ে কেরামের মধ্যে যুদ্ধবন্দীদের বণ্টন করে দেন। এদের ব্যাপারে নির্দেশনা দিতে গিয়ে তিনি বলেন, তোমরা এদের সাথে ভালো আচরণ করো। ২৯৬
তার এই উপদেশ ছিল কুরআনে কারীমের সে আয়াতের বাস্তবরূপ :
وَ يُطْعِمُوْنَ الطَّعَامَ عَلَى حُبِّهِ مِسْكِيْنًا وَيَتِيْمًا وَأَسِيرًا
তারা খাদ্যের প্রতি আসক্তি থাকা সত্ত্বেও মিসকীন, এতিম ও বন্দীকে খাদ্য দান করে। ২৯৭
মুসআব ইবনে উমায়ের রা.-এর ভাই আবু আযীয ইবনে উমায়ের নিজের চোখে দেখা অবস্থার বর্ণনা দিতে গিয়ে বলেন, আমি বদরযুদ্ধের বন্দীদের অন্তর্ভুক্ত ছিলাম। রসূলুল্লাহ সা. সাহাবীদের নির্দেশ দিয়েছিলেন, 'তোমরা যুদ্ধবন্দীদের সাথে ভালো আচরণ করো। আমি আনসারদের একটি দলের সাথে ছিলাম। রসূলুল্লাহ সা.-এর নির্দেশের কারণে তারা নিজেরা সকাল-বিকাল খেজুর খেয়ে কাটাতেন; কিন্তু আমাকে যবের রুটি খেতে দিতেন। ২৯৮
আবুল আস ইবনে রাবী বলেন, আমি আনসারদের একটি দলের কাছে বন্দী অবস্থায় ছিলাম। আল্লাহ তাআলা তাদের সদাচরণের প্রতিদান দান করুন। সকাল-সন্ধ্যা যখনই তারা খেতেন, আমাকে রুটি খেতে দিতেন। অথচ নিজেরা খেজুর খেতেন। মদীনায় সাধারণত খেজুরই সহজলভ্য ছিল। রুটি খুব কম তৈরি করা হতো। তাদের কারও অংশে রুটির টুকরো চলে এলে তারা তা আমাকে দিয়ে দিতেন। ওয়ালিদ ইবনে মুগীরাও বদরযুদ্ধের বন্দীদের অন্তর্ভুক্ত ছিলেন। তিনিও এ ধরনের বর্ণনা দিয়েছেন। তিনি এ-ও বলেন, যাদের কাছে আমি বন্দী অবস্থায় ছিলাম, তারা নিজেরা পায়ে হেঁটে আমাকে বাহনে আরোহন করিয়েছেন। ২৯৯
মুসলমানদের চরিত্র মাধুরি এমনই ছিল। কুরআনে কারীমে মুমিনদের এমন গুণাবলির কথাই এসেছে। রসূলের মুখে শোনা কুরআনের শিক্ষার আলোকেই সাহাবায়ে কেরাম রা.-এর মধ্যে এমন গুণাবলি জন্ম নিয়েছিল। সাহাবায়ে কেরামের আচরণ দেখে যুদ্ধবন্দী কুরায়েশ নেতাদের কয়েকজন ইসলামের প্রতি আকৃষ্ট হন। যেমন, আবু আযীয ইবনে উমায়ের যুদ্ধবন্দীদের ব্যাপারে রসূলুল্লাহ সা.-এর নির্দেশের পরিপূর্ণ বাস্তবায়ন দেখে মদীনা মুনাওয়ারা পৌঁছার পরপরই ইসলাম গ্রহণ করেন। সায়েব ইবনে উবায়েদও নিজের মুক্তিপণ আদায় করে ইসলামের সুশীতল ছায়াতলে আশ্রয় নেন। ৩০০
যেসব যুদ্ধবন্দী মুক্তি পেয়েছিল, তারা নিজেদের আবাসস্থলে ফিরে গেলেও তাদের অনেকের মনে প্রভাব বিস্তার করে রেখেছিল ইসলামের বাণী। আর তাই তারা রসূলুল্লাহ সা.-এর উন্নত চরিত্র ও হৃদ্যতাপূর্ণ আচরণের কথা আলোচনা করতো। তার প্রশংসায় পঞ্চমুখ থাকতো। ৩০১
যুদ্ধবন্দীদের সাথে এমন হসতাপূর্ণ আচরণ ইসলামী জীবনব্যবস্থার সৌন্দর্যের একটি দৃষ্টান্ত। ইসলামের শত্রুরাও সাহাবায়ে কেরামের উত্তম চরিত্র ও আচরণের কারণে প্রভাবিত হয়ে পড়ছিল। ৩০২
টিকাঃ
২৯৬ প্রাগুক্ত: ৩/৩০৭।
২৯৭ সূরা দাহর: ৮।
২৯৮ মাজমাউজ যাওয়ায়িদ: ৬/৮৬।
২৯৯ ওয়াকেদী প্রণীত মাগাযী: ১/১১৯।
৩০০ সাদেক উরজুন, মুহাম্মাদুর রসূলুল্লাহ ৩/৪৭৪।
৩০১ সাদেক উরজুন, মুহাম্মাদুর রসূলুল্লাহ: ৩/৪৭৪।
৩০২ আত তারীখুল ইসলামী: ৪/১৭৫।