📘 নবীজির যুদ্ধ জীবন পাঠ ও পর্যালোচনা > 📄 শিক্ষা ও তাৎপর্য

📄 শিক্ষা ও তাৎপর্য


১. বেলাল রা. যখন দেখলেন, তার নিপীড়ক উমাইয়া ইবনে খালফ আবদুর রহমান ইবনে আওফের হাতে বন্দী, তখন তিনি চিৎকার করে বললেন, 'যদি উমাইয়া বেঁচে যায়, তবে আমার বেঁচে থেকে লাভ নেই।'
কারণ, উমাইয়া ইবনে খালফ মক্কায় বেলাল রা.-এর ওপর অকথ্য নিপীড়ন চালিয়েছিল। বেলাল রা. ইসলামের এই শত্রুকে নিশ্চিহ্ন করে দিতে চেয়েছিলেন; যাতে পৃথিবীবাসী কাফেরদের দূরাচার থেকে রক্ষা পেতে পারে। তাদের নির্যাতন-নিপীড়নের শিকার মুসলমানরা যেন তার পরিণতি দেখে কিছুটা প্রশান্তি পেতে পারে। আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন,
قَاتِلُوهُمْ يُعَذِّبْهُمُ اللَّهُ بِأَيْدِيكُمْ وَيُخْزِهِمْ وَيَنْصُرْكُمْ عَلَيْهِمْ وَيَشْفِ صُدُورَ قَوْمٍ مُؤْمِنِينَ وَيُذْهِبْ غَيْظَ قُلُوبِهِمْ وَيَتُوبُ اللَّهُ عَلَى مَنْ يَشَاءُ وَاللَّهُ عَلِيمٌ حَكِيمٌ
যুদ্ধ করো ওদের সাথে। আল্লাহ তোমাদের হস্তে তাদের শাস্তি দেবেন। তাদের লাঞ্ছিত করবেন, তাদের বিরুদ্ধে তোমাদের জয়ী করবেন এবং মুসলমানদের অন্তরসমূহ শান্ত করবেন এবং তাদের মনের ক্ষোভ দূর করবেন। আর আল্লাহ যার প্রতি ইচ্ছা ক্ষমাশীল হবেন। আল্লাহ সর্বজ্ঞ প্রজ্ঞাময়। ২৩৯
২. উমাইয়া ইবনে খালফের এই নিকৃষ্ট মৃত্যুর মাঝে অহংকারী লোকদের জন্য একটি শিক্ষা রয়েছে। এতে এমন লোকদের পরিণতির উদাহরণ রয়েছে, যারা নিজেদের ক্ষমতার নেশায় মত্ত হয়ে অসহায়-দরিদ্র মানুষদের ওপর নির্যাতন করে। তাদের অধিকার নিয়ে ছিনিমিনি খেলে। আল্লাহ তাআলা মাঝে-মধ্যে মজলুম ব্যক্তিদেরকে তাদের ওপর প্রতিশোধ গ্রহণের সুযোগ দেন। যার দৃষ্টান্ত আমরা উমাইয়া ইবনে খালফসহ অন্যান্য কাফের নেতাদের ক্ষেত্রে দেখেছি। ২৪০ আল্লাহ তাআলা বলেন :
وَنُرِيدُ أَنْ نَمُنَّ عَلَى الَّذِينَ اسْتُضْعِفُوا فِي الْأَرْضِ وَنَجْعَلَهُمْ أَئِمَّةً وَنَجْعَلَهُمُ الْوَارِثِينَ
আর আমি চাইলাম সেই দেশে যাদেরকে দুর্বল করে রাখা হয়েছিল তাদের প্রতি অনুগ্রহ করতে এবং তাদেরকে নেতা বানাতে, আর তাদেরকে উত্তরাধিকারী বানাতে। ২৪১
৩. আনসার সাহাবীদের সাহায্যে বেলাল রা. আবদুর রহমান ইবনে আউফ রা.-এর বন্দীকে ছিনিয়ে নেন। তারপরও আবদুর রহমান ইবনে আউফ তার সাথে বিরূপ আচরণ করেননি। বরং তিনি বলছিলেন, আল্লাহ বেলালের ওপর রহম করুন। তার কারণে আমার বর্মগুলোও হাতছাড়া হয়েছে আর আমার বন্দীও হাতছাড়া হয়েছে। ২৪২ তার এমন আচরণের মাঝে আমরা সাহাবায়ে কেরামের পারস্পরিক ঈমানি ভ্রাতৃত্ববোধের উপমা দেখতে পাই। ২৪৩
৪. উমাইয়া ইবনে খালফের স্ত্রী উম্মে সাফওয়ান ইসলাম গ্রহণের পর একবার মক্কায় হুবাব ইবনে মুনজির রা.-কে দেখছিলেন। তাকে বলা হলো, এই ব্যক্তি বদরযুদ্ধের দিন আপনার ছেলে আলী ইবনে উমাইয়ার পা কেটে দিয়েছিল। উত্তরে তিনি বলেন, 'কাফের অবস্থায় যারা মরেছে তাদের নিয়ে আলোচনা করে কোনো লাভ নেই। আল্লাহ তাআলা আমার ছেলেকে তার আঘাতের মাধ্যমে লাঞ্ছিত করেছেন আর আমার ছেলেকে আঘাতের মাধ্যমে তাকে সম্মানিত করেছেন। আমার ছেলে আলী যখন মক্কা থেকে বেরিয়েছিল তখন তার অন্তঃকরণে ইসলাম প্রবেশ করেছিল। কিন্তু দুর্ভাগ্য-সে অন্য দীনের ওপর মারা গেছে। ২৪৪
উম্মে সাফওয়ানের এই কথাগুলো তার ঈমানি শক্তি ও পরিপূর্ণ বিশ্বাসের প্রতিধ্বনি। 'আল ওয়ালা ওয়াল বারা'র চমৎকার দৃষ্টান্ত দেখিয়েছেন তিনি। নিজের গোত্রের না-হওয়া সত্ত্বেও মুসলমানদের প্রতিই ছিল তার ভালোবাসা আর কাফের হওয়ার কারণে নিজের ছেলের প্রতি জন্মেছিল তার অনিহা।
আলী ইবনে উমাইয়ার ব্যাপারে তার মা উম্মে সাফওয়ানের ভাষ্য- 'আমার ছেলে আলী যখন মক্কা থেকে বেরিয়েছিল তখন তার অন্তঃকরণে ইসলাম প্রবেশ করেছিল। কিন্তু দুর্ভাগ্য-সে অন্য দীনের ওপর মারা গেছে।' এর মর্ম হচ্ছে, যাদেরকে মক্কা নগরীতে মুসলমান হিসেবে সন্দেহ করা হতো এবং জোর করে বদরযুদ্ধে কাফেরদের সঙ্গে আনা হয়েছিলো, আলী ইবনে উমাইয়া ছিল এমন ব্যক্তিদের অন্তর্ভুক্ত। উভয় বাহিনী মুখোমুখি হলে مسلمانوں স্বল্পতা দেখে তারা বিভ্রান্ত হয়ে যায়। তারা বলে, এদেরকে এদের ধর্ম প্রতারিত করেছে। ২৪৫ তাদের ব্যাপারে পবিত্র কুরআনে কারীমে এসেছে:
إِذْ يَقُولُ الْمُنَافِقُونَ وَالَّذِينَ فِي قُلُوبِهِمْ مَرَضٌ غَرَّ هَؤُلَاءِ دِينُهُمْ وَمَنْ يَتَوَكَّلْ عَلَى اللَّهِ فَإِنَّ اللَّهَ عَزِيزٌ حَكِيمٌ
যখন মুনাফেকরা ও যাদের অন্তরে ব্যাধি রয়েছে তারা বলছিল, 'এদেরকে এদের ধর্ম ধোকায় ফেলেছে' এবং যে আল্লাহর উপর তাওয়াক্কুল করে তবে তো আল্লাহ নিশ্চই পরাক্রমশালী, প্রজ্ঞাবান। ২৪৬

টিকাঃ
২৩৯ সূরা তাওবাহ: আয়াত ১৪-১৫।
২৪০ আত তারীখুল ইসলামী: ৪/১৫২-১৫৩।
২৪১ সুরা কাসাস: আয়াত ৫।
২৪২ সীরাতে ইবনে হিশাম: ২/২৪৪।
২৪৩ আত তারীখুল ইসলামী: ৪/১৫৩।
২৪৪ আত তারীখুল ইসলামী: ৪/১৫৪।
২৪৫ তাফসীরে তাবারী: ১০/২১।
২৪৬ সূরা আনফাল : আয়াত ৪৯।

📘 নবীজির যুদ্ধ জীবন পাঠ ও পর্যালোচনা > 📄 যুবায়েরের হাতে উবায়দা ইবনে সাঈদের পতন

📄 যুবায়েরের হাতে উবায়দা ইবনে সাঈদের পতন


যুবায়ের রা. বলেছেন, বদর যুদ্ধের দিন আমি উবায়দা ইবনে সাঈদ ইবনে আসকে এমন বর্মাবৃত অবস্থায় দেখলাম যে, তার দু'চোখ ব্যতীত আর কিছুই দেখা যাচ্ছিলো না। তাকে আবু যাতিল কারিশ বলে ডাকা হতো। সে বললো, আমি আবু যাতিল কারিশ। আমি বর্শা দিয়ে তার ওপর হামলা করলাম এবং তার চোখ ফুঁড়ে দিলাম। সে তৎক্ষণাৎ মারা গেলো। হিশام বলেন, আমাকে জানানো হয়েছে, যুবায়ের রা. বলেছেন, উবায়দা ইবনে সাঈদ ইবনে আসের লাশের ওপর পা রেখে বেশ বল প্রয়োগ করে তার চোখ থেকে আমি বর্শাটি টেনে বের করলাম। এতে বর্শার উভয় প্রান্ত বাঁকা হয়ে যায়।
উরওয়াহ বলেন, রসূলুল্লাহ সা. যুবায়েরের নিকট বর্শাটি চাইলে তিনি তা তাকে দেন। রসূলুল্লাহ সা.-এর মৃত্যুর পর তিনি তা নিয়ে যান এবং পরে আবু বকর রা. তা চাইলে তিনি তাকে বর্শাটি দেন। আবু বকরের মৃত্যুর পর ওমর রা. চাইলে তিনি তাকে বর্শাটি দেন। উমরের মৃত্যুর পর যুবায়ের রা. পুনরায় বর্শাটি নিয়ে যান। এরপর ওসমান রা. বর্শাখানা চাইলে তিনি ওসমানকে তা দেন। ওসমান রা.-এর শাহাদাতের পর তা আলী রা.-এর লোকজনের হাতে চলে যায়। পরবর্তীতে আবদুল্লাহ ইবনে যুবায়ের রা. তাদের থেকে বর্শাটি চেয়ে নিয়ে যান। শহীদ হওয়া পর্যন্ত বর্শাটি তার কাছেই ছিল। ২৪৭
উপরোক্ত ঘটনা থেকে তীরন্দাজিতে যুবায়ের ইবনুল আওয়াম রা.-এর দক্ষতার প্রমাণ পাওয়া যায়। তিনি বেশ দক্ষতার সাথে প্রায় অসম্ভব লক্ষ্য ভেদ করেছিলেন। পরিপূর্ণ সশস্ত্র একজন ব্যক্তিকে এভাবে হত্যা করা বেশ দুরূহ ব্যাপার। এ ঘটনা থেকে তার শারীরিক শক্তিরও প্রমাণ পাওয়া যায়।২৪৮

টিকাঃ
২৪৭ সহীহ বুখারী: ৩৯৯৮।
২৪৮ আত তারীখুল ইসলামী: ৪/১৬৩।

📘 নবীজির যুদ্ধ জীবন পাঠ ও পর্যালোচনা > 📄 আসওয়াদ মাখযুমীর পতন

📄 আসওয়াদ মাখযুমীর পতন


ইবন ইসহাক বলেন, আসওয়াদ ইবনে আবদুল আসাদ মাখযুমী ছিল কুরায়েশদের মধ্যে চরম অসৎ ও ওগুা স্বভাবের লোক। সে তার ঘৃণ্য তৎপরতা শুরু করে দিলো। সে ঘোষণা করলো, 'মুসলমানদের জলাধার থেকে আমি পানি পান করবো কিংবা তা ভেঙ্গে ফেলবো। এ কাজ করতে গিয়ে আমার মৃত্যু ঘটলেও পরোয়া করি না।' তিনি ময়দানে নামলে হামযা ইবনে আবদুল মুত্তালিব রা. তার মুখোমুখি হলেন। দুইজনের আক্রমণ ও পাল্টা আক্রমণ চলাকালে হামযা আসওয়াদের পায়ে তরবারির আঘাত করলেন। তার পা কেটে বিচ্ছিন্ন হয়ে গেলো। এ সময় সে চৌবাচ্চার কাছেই ছিল। সে চিৎ হয়ে পড়ে গেল এবং তার পা থেকে ফিনকি দিযে রক্ত ছুটতে লাগলো। সে পুনরায় হামাগুড়ি দিয়ে চৌবাচ্চার দিকে এগুলো এবং নিজের প্রতিজ্ঞা রক্ষা করার উদ্দেশ্যে চৌবাচ্চার সীমানার ভেতরে ঢুকে পড়লো। হামযা তার পিছু ধেয়ে গেলেন এবং চৌবাচ্চার সীমানার ভেতরেই তাকে হত্যা করলেন।২৪৯
উমাইয়া ইবনে খালফ আবদুর রহমান ইবনে আউফ রা.-কে জিজ্ঞেস করেছিলেন, তোমাদের মধ্যে যে নিজের বুকে ময়ূরের পেখম লাগিয়ে ঘুরছে ওই ব্যক্তি কে? জবাবে আবদুর রহমান ইবনে আউফ বলেছিলেন, 'তিনি হামযা।' উমাইয়া বললেন, ওই ব্যক্তি অত্যন্ত ভয়ংকরভাবে আমাদের বাহিনীকে লণ্ডভণ্ড করেছে।২৫০
এটা কাফেরদের সর্বোচ্চ নেতৃত্ব থেকে প্রাপ্ত স্বীকারোক্তি। উমাইয়া ইবনে খালফের এ স্বীকারোক্তি থেকে বোঝা যায়, হামযা রা. শত্রুবাহিনীর ব্যাপক ধ্বংস সাধন করেছিলেন এবং তাদের লণ্ডভণ্ড করে দিয়েছিলেন।২৫১
রণাঙ্গনে হামযা রা.-এর হাতে নিহত হওয়া কাফেরদের মধ্যে প্রথম ব্যক্তি ছিলেন উপরোল্লিখিত আসওয়াদ মাখযূমী। এই হতভাগা দাম্ভিক ব্যক্তিটি মুসলমানদের চ্যালেঞ্জ করে এগিয়ে যাচ্ছিলো। কিন্তু আল্লাহর সিংহ হামযা তাকে রুখে দেন। তাকে পৌঁছে দেন মৃত্যুর দুয়ারে। ইসলামবিদ্বেষীরা এ থেকে চরম শিক্ষা নিতে পারে।২৫২

টিকাঃ
২৪৯ সীরাতে ইবনে হিশাম: ২/২৩৭।
২৫০ আত তারীখুল ইসলামী: ৪/১৫১।
২৫১ আত তারীখুল ইসলামী: ৪/১৫২।
২৫২ আত তারীখুল ইসলামী: ৪/১২১।

📘 নবীজির যুদ্ধ জীবন পাঠ ও পর্যালোচনা > 📄 শাহাদাত বরণ করলেন যাঁরা

📄 শাহাদাত বরণ করলেন যাঁরা


ক. হারেসা ইবনে সুরাকা রা.-এর শাহাদাত
আনাস রা. বলেন, বদরের যুদ্ধে হারেসা রা. শহীদ হন। তখন তিনি নাবালক ছিলেন। তার মা নবী সা.-এর কাছে এসে বললো, হে আল্লাহর রসূল! আমার অন্তরে হারেসার স্থান সম্পর্কে আপনি তো জানেন। সে যদি জান্নাতী হয়; আমি সওয়াব লাভের আশায় ধৈর্য ধারণ করবো। যদি অন্য কিছু হয়, তবে দেখবেন আমি কী করি। রসূলুল্লাহ সা. বললেন, তোমার জন্য আফসোস! অথবা তুমি কি নির্বোধ হয়ে গেলে! জান্নাত মাত্র একটাই না কি? জান্নাতের সংখ্যা অনেক। আর সে আছে জান্নাতুল ফিরদাউসে। ২৫৩
অন্য বর্ণনা মতে, রসূলুল্লাহ সা. বলেন, 'হে উম্মে হারেসা, নিশ্চয় জান্নাতের ভেতর অনেকগুলো জান্নাত রয়েছে। তন্মধ্যে তোমার ছেলে সর্বোচ্চ জান্নাতে অবস্থান করছে। ২৫৪

খ. আউফ ইবনে হারেস রা.-এর শাহাদাত
ইবনে ইসহাক বলেন, আসেম ইবনে আমর ইবনে কাতাদা আমার কাছে বর্ণনা করেছেন, আউফ ইবনে হারেস (তিনি আফরা রা.-এর ছেলে ২৫৫) জিজ্ঞেস করলেন, হে আল্লাহর রসূল! আল্লাহ তাআলা তার বান্দার কোন কাজে আনন্দিত হন। উত্তরে রসূলুল্লাহ সা. বলেন, যখন কোনো বান্দা বর্মহীন অবস্থায় শত্রুর ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ে, তখন আল্লাহ আনন্দিত হন। এ কথা শুনে আউফ ইবনে হারেস রা. নিজের বর্ম খুলে ফেললেন এবং খোলা তরবারি নিয়ে শত্রুর ওপর ঝাঁপিয়ে পড়লেন এবং শহীদ হয়ে গেলেন। ২৫৬
এই ঘটনায় আখেরাতের নেয়ামতের প্রতি সাহাবায়ে কেরামের আগ্রহ, আল্লাহ তাআলার সন্তুষ্টি অর্জন ও তার সান্নিধ্য লাভের আগ্রহের অনুপম চিত্র আমরা দেখতে পাই। ইসলামের শিক্ষা তাদের চিন্তা-ভাবনাকে পাল্টে দিয়েছিল। তাদের সম্পৃক্ত করে দিয়েছিল আখেরাতের সাথে। ইতোপূর্বে যারা নারী ও কবিদের মুখে মুখে নিজেদের বীরত্বগাথা শুনতে আগ্রহী হয়ে যুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়তেন, তখন তারা একমাত্র আল্লাহর সন্তুষ্টির উদ্দেশ্যে নিজেদের উৎসর্গ করছিলেন। ২৫৭

গ. সাআদ ইবনে খায়সামা রা. ও তার পিতার শাহাদাত
ইবনে হাজার আসকালানী রহ. মুসা ইবনে উকবা ও ইবনে শিহাবের সূত্রে বর্ণনা করেন, বদরের দিন সাআদ ও তার পিতা খায়সামা যুদ্ধে অংশগ্রহণের জন্য লটারি করেন। লটারিতে সাআদের নাম আসে। তার পিতা তাকে বলেন, হে আমার ছেলে! তুমি এই যুদ্ধে অংশগ্রহণ করো না; বরং আমাকে অংশগ্রহণ করতে দাও। উত্তরে সাআদ বলেন, হে আমার পিতা! যদি জান্নাতের বিনিময় ছাড়া অন্য কিছুর ব্যাপার হতো তাহলে অবশ্যই আমি আপনাকে প্রাধান্য দিতাম। অতঃপর সাআদ বদরযুদ্ধে অংশগ্রহণ করে শহীদ হন। পরে উহুদযুদ্ধে তার পিতা খায়সামাও শাহাদাতের মর্যাদা লাভ করেন। ২৫৮
আলোচ্য ঘটনায় সাহাবায়ে কেরামের আল্লাহর পথে শহীদ হওয়ার আগ্রহের অনুপম দৃষ্টান্ত আমরা দেখতে পাই। সাআদ ও তার পিতা উভয়ে একত্রে বদরযুদ্ধে অংশগ্রহণ করতে পারছিলেন না। কারণ, ঘরের লোকদের দেখাশোনার জন্য তাদের কোনো একজনের ঘরে থাকা আবশ্যক ছিল। অথচ কেউ যুদ্ধে অংশগ্রহণ করার মর্যাদা থেকে নিজেকে দূরে রাখতে প্রস্তুত ছিলেন না। শেষ পর্যন্ত লটারি করতে হয়। যুদ্ধে অংশগ্রহণের সৌভাগ্য সাআদের ভাগ্যে আসে। পিতার প্রতি শ্রদ্ধা ও ভালোবাসা থাকা সত্ত্বেও জান্নাতপ্রাপ্তির আগ্রহ থেকে তাকে উত্তর দিয়েছিলেন, হে আমার পিতা, যদি জান্নাত ছাড়া অন্য কিছুর ব্যাপার হতো, তাহলে আমি অবশ্যই আপনাকে প্রাধান্য দিতাম। ২৫৯

ঘ. আবু হুযায়ফা রা.-এর জন্য নবীজির দোআ
উম্মুল মুমিনীন আয়েশা রা. বলেন, বদরযুদ্ধে নিহত মুশরিকদের লাশ বদরের কূপে ফেলে দেওয়ার সময় উতবা ইবনে রাবিয়ার মৃতদেহও নিক্ষেপ করার জন্য টেনে আনা হচ্ছিলো। তখন রসূলুল্লাহ সা. তার ছেলে আবু হুযায়ফা রা.-এর চেহারায় কিছুটা বিরূপভাব দেখতে পান। রসূলুল্লাহ সা. তাকে উদ্দেশ্য করে বললেন, হে আবু হুযায়ফা! হয়তো তোমার পিতার এ অবস্থা তোমাকে কষ্ট দিচ্ছে। জবাবে তিনি বলেন, 'হে আল্লাহর রসূল! আল্লাহর শপথ! আল্লাহ ও তার রসূলের ব্যাপারে আমার কোনো সন্দেহ নেই। তবে আমি আমার পিতাকে অত্যন্ত বুদ্ধিমান, জ্ঞানী ও মেধাবী মনে করতাম। আমি ভাবতাম মৃত্যুর আগে তিনি ইসলাম গ্রহণ করবেন। কিন্তু আজ তার এই পরিণতি দেখে আমার আফসোস হচ্ছে।' আবু হুযায়ফার জবাব শুনে রসূলুল্লাহ সা. তার জন্য কল্যাণের দোআ করলেন। ২৬০

ঙ. উমায়ের ইবনে আবী ওয়াক্কাস রা.
রসূলুল্লাহ সা. যখন বদর প্রান্তরের উদ্দেশে রওনা হলেন এবং মুসলিম বাহিনীর সদস্যরা যখন তার সামনে উপস্থিত হলো, তখন রসূলুল্লাহ সা. উমায়ের ইবনে আবী ওয়াক্কাস রা.-কে অল্পবয়সী দেখতে পেয়ে তাকে সঙ্গে নিতে বারণ করলেন। এতে তিনি কাঁদতে থাকলে রসূলুল্লাহ সা. তাকে যুদ্ধে যাওয়ার অনুমতি দেন এবং নিজ হাতে তার তরবারির খাপ বেঁধে দেন।
উমায়ের রা. রসূলুল্লাহ সা.-এর দৃষ্টি এড়িয়ে সেনাবাহিনীর মধ্যে লুকিয়ে থাকার চেষ্টা করেছিলেন। তার ভাই সাআদ ইবনে আবী ওয়াক্কাস রা. বলেন, রসূলুল্লাহ সা.-এর অনুমতি পাওয়ার আগে উমায়েরকে লুকানোর চেষ্টা করতে দেখে জিজ্ঞাসা করলাম, হে আমার ভাই! তুমি কেন এমন করছো? উত্তরে তিনি বলেন, আমার আশঙ্কা হচ্ছে, রসূলুল্লাহ সা. আমাকে দেখতে পেলে স্বল্পবয়সী হওয়ার কারণে যুদ্ধযাত্রা থেকে ফিরিয়ে দেবেন। অথচ আমি আল্লাহর পথে যুদ্ধ করতে চাই। হতে পারে আল্লাহ তাআলা আমাকে শাহাদাতের মর্যাদা দান করবেন।'২৬১
অবশেষে উমায়ের রা. বদরযুদ্ধে শহীদ হন।

টিকাঃ
২৫৩ সহীহ বুখারী: ৩৯৮২।
২৫৪ আল আসাসু ফিস সুন্নাহ: ১/৪৭৫।
২৫৫ আফরা বিনতে উবায়েদ ইবনে সালাবা নাজ্জারিয়াহ সাত ছেলে বদরযুদ্ধে অংশগ্রহণ করেন।
২৫৬ সহীহ আসসীরাতুন নববিয়্যাহ: ২৪৫।
২৫৭ আত তারবিয়াতিল কিয়াদিয়‍্যাহ: ২/৩১।
২৫৮ আল ইসাবাহ: ২/২৩-২৪।
২৫৯ আত তারীখুল ইসলামী: ৪/৮৭।
২৬০ সহীহ আসসীরাতুন নববিয়্যাহ: ২৫১-২৫২।
২৬১ সীরাতে ইবনে হিশাম: ২/২২৩।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00