📘 নবীজির যুদ্ধ জীবন পাঠ ও পর্যালোচনা > 📄 আবু জেহেল ইবনে হিশাম আল-মাখযুমীর পতন

📄 আবু জেহেল ইবনে হিশাম আল-মাখযুমীর পতন


আবদুর রহমান ইবনে আউফ রা. বলেন, বদরযুদ্ধের দিন আমি ছিলাম যুদ্ধের সারিতে। আমার ডানে-বাঁয়ে দেখলাম দু'জন অল্পবয়সী আনসার কিশোর। আমি ভাবলাম—আমার পাশে শক্তিশালী দুজন যোদ্ধা থাকলে খুব ভালো হতো।
ইতোমধ্যে তাদের একজন আমাকে বললো, 'চাচাজান, আপনি কি আবু জেহেলকে চেনেন?' আমি বললাম, 'তোমরা তার কী করবে?' সে বললো, 'আমি শুনেছি সে রসূলুল্লাহ সা.-এর ব্যাপারে বিরূপ মন্তব্য করে। ওই সত্তার শপথ, যাঁর হাতে আমার প্রাণ! আমি যদি তাকে দেখতে পাই, তবে হয় আমি মারা যাবো অথবা সে মারা যাবে। আমি তার কথায় আশ্চর্য হলাম। দ্বিতীয়জন আমাকে খোঁচা দিয়ে ওই রকমই বললো। তৎক্ষণাৎ আমি আবু জেহেলকে দেখলাম, সে লোকজনের মাঝে ঘুরে বেড়াচ্ছে। তখন আমি বললাম, ওই তো সেই ব্যক্তি যার সম্পর্কে তোমরা আমাকে জিজ্ঞেস করেছিলে। তারা তৎক্ষণাৎ নিজের তরবারি নিয়ে তার দিকে ছুটে গেলো এবং তাকে আঘাত করে হত্যা করলো। অতঃপর রসূলুল্লাহ সা.-এর কাছে গিয়ে এই খবর জানালো। রসূলুল্লাহ সা. বললেন, তোমাদের মধ্যে কে তাকে হত্যা করেছে? তারা উভয়ে দাবি করলো, আমি তাকে হত্যা করেছি। রসূলুল্লাহ সা. বললেন, তোমাদের তরবারি তোমরা মুছে ফেলনি তো? তারা উভয়ে বললো, না। তখন রসূলুল্লাহ সা. তাদের উভয়ের তরবারি দেখলেন এবং বললেন, তোমরা উভয়ে তাকে হত্যা করেছো। অবশ্য তার নিকট হতে প্রাপ্ত মালামাল মুআয ইবনে আমর ইবনে জামূহের জন্য। তারা দু'জন হলো, মুআয ইবনে আফরা ও মুআয ইবনে আমর ইবনে জামূহ। ২০১
আনাস রা. বলেন, বদরের দিন রসূলুল্লাহ সা. বললেন, আবু জেহেলের কী অবস্থা, তোমরা কি একটু দেখে আসবে? এ কথা শুনে আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ রা. দেখতে গেলেন। তিনি দেখতে পেলেন, আফরার দুই ছেলে তাকে এমনভাবে আহত করেছে যে, সে মুমূর্ষু অবস্থায় পড়ে আছে। তখন তিনি তার দাড়ি ধরে বললেন, 'তুমি কি আবু জেহেল?' উত্তরে সে বললো, 'সেই লোকটির চেয়ে উত্তম আর কেউ আছে কি, যাকে তার গোত্রের লোকেরা হত্যা করলো অথবা বললো তোমরা যাকে হত্যা করেছো?' ২৩২
অন্য এক বর্ণনায় আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ রা. বলেন, আমি বদরের দিন আবু জেহেলকে আহত অবস্থায় দেখে তাকে বললাম, 'হে আল্লাহর শত্রু! শেষ পর্যন্ত আল্লাহ তাআলা তোমাকে লাঞ্ছিত করেছেন।' উত্তরে সে বললো, 'আমাকে কীভাবে লাঞ্ছিত করেছেন? তোমরা যাকে হত্যা করছো তার চেয়ে সম্মানিত আর কে আছে?' আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ রা. বলেন, 'আমার কাছে তরবারি ছিল এবং আমি তাকে হত্যা করতে অগ্রসর হলাম। দেখতে পেলাম তার ধারালো তরবারিটি তার হাতে মুষ্টিবদ্ধ। আমি তার হাতে আক্রমণ করলে তার হাত থেকে তরবারিটি পড়ে গেলো। অতঃপর আমি তার তরবারিটি হাতে নিয়ে তার শিরস্ত্রাণ খুলে ফেললাম। অতঃপর তার মুণ্ডুচ্ছেদ করি এবং রসূলুল্লাহ সা.-এর দরবারে উপস্থিত তার হত্যার সংবাদ দেই। তিনি আমাকে বলেন, ওই আল্লাহর শপথ যিনি ছাড়া কোনো মাবুদ নেই?' উত্তরে আমি বললাম, 'ওই আল্লাহর শপথ যিনি ছাড়া কোনো মাবুদ নেই।' অতঃপর রসূলুল্লাহ সা. বলেন, 'তুমি আবার যাও এবং নিশ্চিত হয়ে এসো।' আমি অত্যন্ত দ্রুতগতিতে বেরিয়ে পড়লাম এবং পুনরায় দ্রুততার সাথে রসূলুল্লাহ সা.-এর দরবারে সহাস্যে প্রবেশ করে তার মৃত্যুর খবর নিশ্চিত করলাম। রসূলুল্লাহ সা. বলেন, 'চলো আমার সাথে।' আমি রসূলুল্লাহ সা.-এর সাথে তার মৃতদেহের কাছে গেলাম এবং তাকে দেখালাম। তার মৃতদেহ দেখে রসূলুল্লাহ সা. বললেন, 'এ হচ্ছে এই উম্মতের ফেরআউন। '২৩৩
আনসারী দুই তরুণ যখন জানলো যে, আবু জেহেল রসূলুল্লাহ সা.-কে গালাগাল করে, তখন তারা তাকে হত্যা করতে উদ্বুদ্ধ হয়। আনসার তরুণদের মধ্যে রসূলুল্লাহ সা.-এর ভালোবাসা কত গভীর ছিল, তা এই ঘটনা থেকে বোঝা যায়। রসূল সা.-এর কোনোরূপ কষ্ট তারা সইতে পারতো না।
মৃত্যুর প্রাক্কালে আবু জেহেলের সাথে আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ রা.-এর উপরোক্ত কথাবার্তা বেশ তাৎপর্যবহ। কারণ, মক্কায় সে তাকে বেশি কষ্ট দিয়েছিল। আল্লাহ তাআলার ফয়সালা এমনই। ২৩৪
ইবনে ইসহাকের এক বর্ণনায় এসেছে, আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ রা. শেষ মুহূর্তে আবু জেহেলের মুণ্ডুচ্ছেদ করতে চাইলে সে বলে ওঠে, ‘হে রাখাল! তুমি তো খুব উঁচু স্থানে উঠে গেছো’ ২৩৫
দুজন আনসারী তরুণ দ্বারা মারাত্মক আহত হওয়া সত্ত্বেও আল্লাহ তাআলা আবু জেহেলকে দ্রুত মৃত্যু দান করেননি; বরং তাকে ভূপাতিত করে আহত অবস্থায় বাঁচিয়ে রেখেছিলেন। সে চূড়ান্ত মৃত্যুর কাছাকাছি পৌঁছে যাওয়া সত্ত্বেও তার মস্তিষ্ক ছিল সচল। যেন মৃত্যুর দুয়ারে দাঁড়িয়ে সে স্পষ্ট দেখতে পায় মক্কায় যে দুর্বল অসহায় ব্যক্তিটিকে সে নিপীড়ন করেছিল, তার হাতেই আজ তার জীবনাবসান হতে যাচ্ছে। আবু জেহেলের বুকে তিনি সেদিন চেপে বসেছিলেন। পায়ের নিচে ফেলে তাকে পিষ্ট করেছিলেন। তার দাড়ি ধরে ঝাঁকি দিয়েছিলেন। কঠোর বাক্যবাণে জর্জরিত করেছিলেন ইসলামের এই চরম শত্রুকে। তাকে হত্যার উদ্দেশ্যে তরবারি বের করে আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ রা. তাকে জানিয়ে দেন আল্লাহর বাহিনীর বিজয় হয়েছে। চরম অপদস্থতায় চূড়ান্ত পরাজয় ঘটেছে খবিস কাফেরদের। ২৩৬

টিকাঃ
২০১ সহীহ বুখারী: ৩১৪১।
২৩২ সহীহ বুখারী: ৩৯৬৩।
২৩৩ সহীহ আসসীরাতুন নববিয়‍্যাহ: ২৪২।
২৩৪ আত তারীখুল ইসলামী: ৪/১৫৮-১৬০।
২৩৫ সীরাতে ইবনে হিশাম: ২/২৪৮।
২৩৬ সাদেক উরজুন, মুহাম্মাদুর রসূলুল্লাহ: ৩/৪৩১-৪৩২।

📘 নবীজির যুদ্ধ জীবন পাঠ ও পর্যালোচনা > 📄 উমাইয়া ইবনে খালফের পতন

📄 উমাইয়া ইবনে খালফের পতন


আবদুর রহমান ইবনে আউফ রা. বলেন, আমি উমাইয়া ইবনে খালফের সঙ্গে এ মর্মে একটা চুক্তিনামা করলাম যে, সে মক্কায় আমার মাল-সামান হেফাজত করবে আর আমি মদীনায় তার মাল-সামান হেফাজত করবো। যখন আমি চুক্তিনামায় আমার নামের শেষে ‘রহমান’ শব্দটি উল্লেখ করলাম তখন সে বললো, আমি কোনো রহমানকে চিনি না। জাহিলী যুগে তোমার যে নাম ছিল সেটা লিখো। তখন আমি তাতে ‘আবদে আমর’ লিখে দিলাম। বদর যুদ্ধের দিন যখন লোকজন বেখেয়াল হলো, তখন আমি উমাইয়াকে রক্ষা করার জন্য একটি পাহাড়ের দিকে গেলাম। বেলাল রা. তাকে দেখে ফেললেন। তিনি দৌড়ে গিয়ে আনসারদের এক মজলিসে বললেন, ওই যে দেখো উমাইয়া ইবনে খালফ। যদি উমাইয়া বেঁচে যায়, তবে আমার বেঁচে থেকে লাভ নেই। তখন আনসারদের একদল তার সাথে আমাদের পেছনে পেছনে ছুটলেন। যখন আমার আশঙ্কা হলো যে, তারা আমাদের নিকট এসে পড়বেন, তখন আমি উমাইয়ার ছেলেকে তাদের জন্য পেছনে রেখে এলাম, যাতে তাদের দৃষ্টি তার ওপর পড়ে। তারা তাকে হত্যা করলেন। তারপরও তারা ক্ষান্ত হলেন না, তারা আমাদের পিছু ধাওয়া করলেন। উমাইয়া ছিল স্থূলকায়। যখন আনসাররা আমাদের কাছে পৌঁছে গেলেন, তখন আমি তাকে বললাম, বসে পড়ো। সে বসে পড়লো। আমি তাকে বাঁচানোর জন্য আমার শরীর দিয়ে তাকে আড়াল করে রাখলাম। কিন্তু তারা আমার নীচ দিয়ে তরবারি ঢুকিয়ে তাকে হত্যা করে ফেললো। তাদের একজনের তরবারির আঘাত আমার পায়েও লাগলো। রাবী বলেন, আবদুর রহমান ইবনে আউফ রা. তার পায়ের সে আঘাত আমাদেরকে দেখাতেন। ২৩৭
অন্য এক বর্ণনায় আবদুর রহমান ইবনে আউফ বলেন, মক্কায় অবস্থানকালে উমাইয়া ইবনে খালফের সাথে আমার সম্পর্ক ছিল বেশ ঘনিষ্ঠ। ইসলাম গ্রহণ করে আমি আমার নাম পরিবর্তন করে আবদুর রহমান নাম রাখি। মক্কায় অবস্থানকালে সে আমাকে বারবার বলতো, হে আবদে আমর, তুমি কি তোমার পিতা-মাতার নির্বাচিত নামটি অপছন্দ করছো? আমি বলতাম, হ্যাঁ। উত্তরে সে আমাকে বলতো, আমি কোনো 'রহমান'-কে চিনি না। তুমি আমার জন্য এমন কোনো নাম নির্বাচন করে দাও, যা বলে আমি তোমাকে ডাকতে পারি। কেননা, তোমার নতুন নির্বাচিত নাম নিয়ে আমি তোমাকে ডাকবো না। আবার 'আবদে আমর' বলে ডাকলে তুমি সাড়া দিও না।
আবদুর রহমান ইবনে আউফ রা. বলেন, সে যখনই আমাকে আমার পুরাতন নামে ডাকতো আমি জবাব দিতাম না। এভাবে কিছুদিন গেলে আমি তাকে বললাম, হে আবু আলী, তুমি তোমার ইচ্ছামতো আমার জন্য কোনো নাম নির্বাচন করে নাও। উত্তরে সে আমাকে বললো, তাহলে তুমি 'আবদুল ইলাহ'। আমি এতে ইতিবাচক সাড়া দেই। পরে সে যখন আমার কাছে আসত, তখন এ নামে ডাকত। আমিও তার জবাব দিতাম।
বদরের দিন আমি তার কাছ দিয়ে যাচ্ছিলাম। সে তখন তার ছেলে আলী ইবনে উমাইয়ার সাথে দাঁড়ানো। আমার হাতে ছিল কাফেরদের কাছ থেকে ছিনিয়ে নেওয়া কয়েকটি বর্ম। আমাকে দেখে 'আবদে আমর' বলে ডাকলে আমি তার ডাকে সাড়া দিলাম না। অতঃপর সে আমাকে 'আবদুল ইলাহ' বলে ডাকলে আমি তার দিকে তাকাই। সে আমাকে বলতে লাগলো, আমাকে কি তোমার প্রয়োজন নেই? আমি কি তোমার জন্য এসব বর্ম থেকে লাভজনক নই? আমি বললাম, আল্লাহর শপথ, অবশ্যই। অতঃপর আমি আমার হাতের বর্মগুলো ফেলে দিলাম এবং তাকে ও তার ছেলেকে নিয়ে নিরাপদ গন্তব্যের উদ্দেশ্যে বেরিয়ে পড়লাম। তখনও সে বলছিল, আমি আজকের মতো বিভীষিকাময় সময় কখনও দেখিনি। তোমার কি দুধের প্রতি কোনো আকর্ষণ নেই?
ইবনে হিশাম বলেন, সে মূলত এখানে দুধ দ্বারা একথা বোঝাতে চাচ্ছিলো যে, আমাকে নিরাপদ আশ্রয় দিলে তাকে আমি দুগ্ধবতী উষ্ট্রীর মাধ্যমে মুক্তিপণ আদায় করবো। ২৩৮

টিকাঃ
২৩৭ সহীহ বুখারী: ২৩০১।
২৩৮ সহীহ আসসীরাতুন নববিয়্যাহ : ২৪২।

📘 নবীজির যুদ্ধ জীবন পাঠ ও পর্যালোচনা > 📄 শিক্ষা ও তাৎপর্য

📄 শিক্ষা ও তাৎপর্য


১. বেলাল রা. যখন দেখলেন, তার নিপীড়ক উমাইয়া ইবনে খালফ আবদুর রহমান ইবনে আওফের হাতে বন্দী, তখন তিনি চিৎকার করে বললেন, 'যদি উমাইয়া বেঁচে যায়, তবে আমার বেঁচে থেকে লাভ নেই।'
কারণ, উমাইয়া ইবনে খালফ মক্কায় বেলাল রা.-এর ওপর অকথ্য নিপীড়ন চালিয়েছিল। বেলাল রা. ইসলামের এই শত্রুকে নিশ্চিহ্ন করে দিতে চেয়েছিলেন; যাতে পৃথিবীবাসী কাফেরদের দূরাচার থেকে রক্ষা পেতে পারে। তাদের নির্যাতন-নিপীড়নের শিকার মুসলমানরা যেন তার পরিণতি দেখে কিছুটা প্রশান্তি পেতে পারে। আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন,
قَاتِلُوهُمْ يُعَذِّبْهُمُ اللَّهُ بِأَيْدِيكُمْ وَيُخْزِهِمْ وَيَنْصُرْكُمْ عَلَيْهِمْ وَيَشْفِ صُدُورَ قَوْمٍ مُؤْمِنِينَ وَيُذْهِبْ غَيْظَ قُلُوبِهِمْ وَيَتُوبُ اللَّهُ عَلَى مَنْ يَشَاءُ وَاللَّهُ عَلِيمٌ حَكِيمٌ
যুদ্ধ করো ওদের সাথে। আল্লাহ তোমাদের হস্তে তাদের শাস্তি দেবেন। তাদের লাঞ্ছিত করবেন, তাদের বিরুদ্ধে তোমাদের জয়ী করবেন এবং মুসলমানদের অন্তরসমূহ শান্ত করবেন এবং তাদের মনের ক্ষোভ দূর করবেন। আর আল্লাহ যার প্রতি ইচ্ছা ক্ষমাশীল হবেন। আল্লাহ সর্বজ্ঞ প্রজ্ঞাময়। ২৩৯
২. উমাইয়া ইবনে খালফের এই নিকৃষ্ট মৃত্যুর মাঝে অহংকারী লোকদের জন্য একটি শিক্ষা রয়েছে। এতে এমন লোকদের পরিণতির উদাহরণ রয়েছে, যারা নিজেদের ক্ষমতার নেশায় মত্ত হয়ে অসহায়-দরিদ্র মানুষদের ওপর নির্যাতন করে। তাদের অধিকার নিয়ে ছিনিমিনি খেলে। আল্লাহ তাআলা মাঝে-মধ্যে মজলুম ব্যক্তিদেরকে তাদের ওপর প্রতিশোধ গ্রহণের সুযোগ দেন। যার দৃষ্টান্ত আমরা উমাইয়া ইবনে খালফসহ অন্যান্য কাফের নেতাদের ক্ষেত্রে দেখেছি। ২৪০ আল্লাহ তাআলা বলেন :
وَنُرِيدُ أَنْ نَمُنَّ عَلَى الَّذِينَ اسْتُضْعِفُوا فِي الْأَرْضِ وَنَجْعَلَهُمْ أَئِمَّةً وَنَجْعَلَهُمُ الْوَارِثِينَ
আর আমি চাইলাম সেই দেশে যাদেরকে দুর্বল করে রাখা হয়েছিল তাদের প্রতি অনুগ্রহ করতে এবং তাদেরকে নেতা বানাতে, আর তাদেরকে উত্তরাধিকারী বানাতে। ২৪১
৩. আনসার সাহাবীদের সাহায্যে বেলাল রা. আবদুর রহমান ইবনে আউফ রা.-এর বন্দীকে ছিনিয়ে নেন। তারপরও আবদুর রহমান ইবনে আউফ তার সাথে বিরূপ আচরণ করেননি। বরং তিনি বলছিলেন, আল্লাহ বেলালের ওপর রহম করুন। তার কারণে আমার বর্মগুলোও হাতছাড়া হয়েছে আর আমার বন্দীও হাতছাড়া হয়েছে। ২৪২ তার এমন আচরণের মাঝে আমরা সাহাবায়ে কেরামের পারস্পরিক ঈমানি ভ্রাতৃত্ববোধের উপমা দেখতে পাই। ২৪৩
৪. উমাইয়া ইবনে খালফের স্ত্রী উম্মে সাফওয়ান ইসলাম গ্রহণের পর একবার মক্কায় হুবাব ইবনে মুনজির রা.-কে দেখছিলেন। তাকে বলা হলো, এই ব্যক্তি বদরযুদ্ধের দিন আপনার ছেলে আলী ইবনে উমাইয়ার পা কেটে দিয়েছিল। উত্তরে তিনি বলেন, 'কাফের অবস্থায় যারা মরেছে তাদের নিয়ে আলোচনা করে কোনো লাভ নেই। আল্লাহ তাআলা আমার ছেলেকে তার আঘাতের মাধ্যমে লাঞ্ছিত করেছেন আর আমার ছেলেকে আঘাতের মাধ্যমে তাকে সম্মানিত করেছেন। আমার ছেলে আলী যখন মক্কা থেকে বেরিয়েছিল তখন তার অন্তঃকরণে ইসলাম প্রবেশ করেছিল। কিন্তু দুর্ভাগ্য-সে অন্য দীনের ওপর মারা গেছে। ২৪৪
উম্মে সাফওয়ানের এই কথাগুলো তার ঈমানি শক্তি ও পরিপূর্ণ বিশ্বাসের প্রতিধ্বনি। 'আল ওয়ালা ওয়াল বারা'র চমৎকার দৃষ্টান্ত দেখিয়েছেন তিনি। নিজের গোত্রের না-হওয়া সত্ত্বেও মুসলমানদের প্রতিই ছিল তার ভালোবাসা আর কাফের হওয়ার কারণে নিজের ছেলের প্রতি জন্মেছিল তার অনিহা।
আলী ইবনে উমাইয়ার ব্যাপারে তার মা উম্মে সাফওয়ানের ভাষ্য- 'আমার ছেলে আলী যখন মক্কা থেকে বেরিয়েছিল তখন তার অন্তঃকরণে ইসলাম প্রবেশ করেছিল। কিন্তু দুর্ভাগ্য-সে অন্য দীনের ওপর মারা গেছে।' এর মর্ম হচ্ছে, যাদেরকে মক্কা নগরীতে মুসলমান হিসেবে সন্দেহ করা হতো এবং জোর করে বদরযুদ্ধে কাফেরদের সঙ্গে আনা হয়েছিলো, আলী ইবনে উমাইয়া ছিল এমন ব্যক্তিদের অন্তর্ভুক্ত। উভয় বাহিনী মুখোমুখি হলে مسلمانوں স্বল্পতা দেখে তারা বিভ্রান্ত হয়ে যায়। তারা বলে, এদেরকে এদের ধর্ম প্রতারিত করেছে। ২৪৫ তাদের ব্যাপারে পবিত্র কুরআনে কারীমে এসেছে:
إِذْ يَقُولُ الْمُنَافِقُونَ وَالَّذِينَ فِي قُلُوبِهِمْ مَرَضٌ غَرَّ هَؤُلَاءِ دِينُهُمْ وَمَنْ يَتَوَكَّلْ عَلَى اللَّهِ فَإِنَّ اللَّهَ عَزِيزٌ حَكِيمٌ
যখন মুনাফেকরা ও যাদের অন্তরে ব্যাধি রয়েছে তারা বলছিল, 'এদেরকে এদের ধর্ম ধোকায় ফেলেছে' এবং যে আল্লাহর উপর তাওয়াক্কুল করে তবে তো আল্লাহ নিশ্চই পরাক্রমশালী, প্রজ্ঞাবান। ২৪৬

টিকাঃ
২৩৯ সূরা তাওবাহ: আয়াত ১৪-১৫।
২৪০ আত তারীখুল ইসলামী: ৪/১৫২-১৫৩।
২৪১ সুরা কাসাস: আয়াত ৫।
২৪২ সীরাতে ইবনে হিশাম: ২/২৪৪।
২৪৩ আত তারীখুল ইসলামী: ৪/১৫৩।
২৪৪ আত তারীখুল ইসলামী: ৪/১৫৪।
২৪৫ তাফসীরে তাবারী: ১০/২১।
২৪৬ সূরা আনফাল : আয়াত ৪৯।

📘 নবীজির যুদ্ধ জীবন পাঠ ও পর্যালোচনা > 📄 যুবায়েরের হাতে উবায়দা ইবনে সাঈদের পতন

📄 যুবায়েরের হাতে উবায়দা ইবনে সাঈদের পতন


যুবায়ের রা. বলেছেন, বদর যুদ্ধের দিন আমি উবায়দা ইবনে সাঈদ ইবনে আসকে এমন বর্মাবৃত অবস্থায় দেখলাম যে, তার দু'চোখ ব্যতীত আর কিছুই দেখা যাচ্ছিলো না। তাকে আবু যাতিল কারিশ বলে ডাকা হতো। সে বললো, আমি আবু যাতিল কারিশ। আমি বর্শা দিয়ে তার ওপর হামলা করলাম এবং তার চোখ ফুঁড়ে দিলাম। সে তৎক্ষণাৎ মারা গেলো। হিশام বলেন, আমাকে জানানো হয়েছে, যুবায়ের রা. বলেছেন, উবায়দা ইবনে সাঈদ ইবনে আসের লাশের ওপর পা রেখে বেশ বল প্রয়োগ করে তার চোখ থেকে আমি বর্শাটি টেনে বের করলাম। এতে বর্শার উভয় প্রান্ত বাঁকা হয়ে যায়।
উরওয়াহ বলেন, রসূলুল্লাহ সা. যুবায়েরের নিকট বর্শাটি চাইলে তিনি তা তাকে দেন। রসূলুল্লাহ সা.-এর মৃত্যুর পর তিনি তা নিয়ে যান এবং পরে আবু বকর রা. তা চাইলে তিনি তাকে বর্শাটি দেন। আবু বকরের মৃত্যুর পর ওমর রা. চাইলে তিনি তাকে বর্শাটি দেন। উমরের মৃত্যুর পর যুবায়ের রা. পুনরায় বর্শাটি নিয়ে যান। এরপর ওসমান রা. বর্শাখানা চাইলে তিনি ওসমানকে তা দেন। ওসমান রা.-এর শাহাদাতের পর তা আলী রা.-এর লোকজনের হাতে চলে যায়। পরবর্তীতে আবদুল্লাহ ইবনে যুবায়ের রা. তাদের থেকে বর্শাটি চেয়ে নিয়ে যান। শহীদ হওয়া পর্যন্ত বর্শাটি তার কাছেই ছিল। ২৪৭
উপরোক্ত ঘটনা থেকে তীরন্দাজিতে যুবায়ের ইবনুল আওয়াম রা.-এর দক্ষতার প্রমাণ পাওয়া যায়। তিনি বেশ দক্ষতার সাথে প্রায় অসম্ভব লক্ষ্য ভেদ করেছিলেন। পরিপূর্ণ সশস্ত্র একজন ব্যক্তিকে এভাবে হত্যা করা বেশ দুরূহ ব্যাপার। এ ঘটনা থেকে তার শারীরিক শক্তিরও প্রমাণ পাওয়া যায়।২৪৮

টিকাঃ
২৪৭ সহীহ বুখারী: ৩৯৯৮।
২৪৮ আত তারীখুল ইসলামী: ৪/১৬৩।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00