📄 মুশরিকদের বিরুদ্ধে মুসলমানদের চূড়ান্ত বিজয়
শেষ হয় বদরের মহাযুদ্ধ। মুশরিকদের ওপর বিজয়ী হয় মুসলিম বাহিনী। সত্তরজন মুশরিক সৈন্য নিহত হয়। সমপরিমাণ সৈন্য বন্দী হয় মুসলমানদের হাতে। এসব নিহত ও বন্দী সৈন্যদের অধিকাংশই ছিল কুরায়েশের বড় বড় নেতা। পক্ষান্তরে মুসলিম বাহিনীর চৌদ্দজন মুজাহিদ সেদিন শাহাদাতের মর্যাদা লাভ করেন। তাদের মধ্যে ছয়জন মুহাজির, আটজন আনসার ছিলেন। চূড়ান্ত বিজয়ের পর রসূলুল্লাহ সা. মদীনায় অবস্থানরত মুসলমানদের সুসংবাদ প্রদানের জন্য আবদুল্লাহ ইবনে রাওয়াহা ও যায়েদ ইবনে হারেসা রা.-কে পাঠান। ২২১
রসূলুল্লাহ সা. বদরপ্রান্তরে তিন দিন অবস্থান করেন। আনাস রা. বলেন, রসূলুল্লাহ সা. যখন কোনো গোত্রের বিরুদ্ধে যুদ্ধে বিজয়ী হতেন, যুদ্ধক্ষেত্রে তিনি তিন রাত অবস্থান করতেন। ২২২
এতে হয়তো নিম্নোক্ত হেকমতসমূহ নিহিত ছিল:
১. শত্রুদের পরিপূর্ণভাবে পরাস্ত করা: শত্রু যেন পুনরায় শক্তি সঞ্চয় করে পেছন থেকে অতর্কিত আক্রমণ চালাতে না পারে।
২. আল্লাহর তরে জীবন উৎসর্গকারী শহীদদের দাফন-কাফন: রসূল সা.-এর প্রায় সব যুদ্ধেই কিছু মুসলমান শাহাদাত বরণ করেছেন। বদরে মুসলিম বাহিনীর যারা শহীদ হন, তাদেরকে বদরপ্রান্তরেই দাফন করা হয়েছিল। তাদের জানাযার নামায বা বদরপ্রান্তরের বাইরে তাদের দাফনের বিষয়ে কোনো বর্ণনা পাওয়া যায় না। ২২৩
৩. যুদ্ধলব্ধ সম্পদ একত্রিতকরণ এবং তা যথাযথভাবে বণ্টনের জন্য দায়িত্বশীল নিয়োগ: বদরের দিন যুদ্ধলব্ধ সম্পদের ব্যবস্থাপনা ও তত্ত্বাবধানের দায়িত্ব পান বনু মাযেন গোত্রের আবদুল্লাহ ইবনে কাআব রা.। ২২৪
৪. সৈনিকদের বিশ্রাম: শারীরিক পরিশ্রমের পর সৈন্যদের কিছুটা বিশ্রামের পাশাপাশি আহতদের চিকিৎসাও জরুরি হয়ে পড়তো। একই সাথে আল্লাহ তাআলার পক্ষ থেকে বিশাল বিজয় ও সাহায্যের কৃতজ্ঞতা জ্ঞাপনেরও সুযোগ পাওয়া যেতো এই দিনগুলোতে। এ ছাড়া যুদ্ধক্ষেত্রে ব্যক্তিগত ও সম্মিলিত বিভিন্ন কাজ ও ঘটনা আলোচনা-পর্যালোচনা করা যেতো। তদ্রূপ বীরত্ব, সাহসী হামলা ও প্রতিকূল পরিস্থিতিতে অগ্রগামী বাহিনীর কৌশল ইত্যাদি নিয়েও আলোচনা হতো। বিভিন্ন ধরনের আক্রমণ, তার ফলাফল তা থেকে প্রাপ্ত শিক্ষা এবং শত্রুদের পরবর্তী কর্মকাণ্ডের প্রতি মনোযোগী থাকা, তাদের বিভিন্ন পদক্ষেপ পর্যালোচনা, সর্বোচ্চ নেতৃত্বের পক্ষ থেকে দিকনির্দেশনা ও তার ব্যবহারিক প্রয়োগ ইত্যাদি বিষয়ে আলোচনা-পর্যালোচনার সুযোগ রাখাও তিনদিন যুদ্ধক্ষেত্রে অবস্থানের কারণসমূহের অন্তর্ভুক্ত। এসব আলোচনা-পর্যালোচনা পরবর্তীতে কাজে লাগতো।
৫. রণাঙ্গনে মুশরিক বাহিনীর লাশের পরিচয় জানাও এ কয়দিন এখানে অবস্থানের কারণ হতে পারে। এতে কাফেরদের সামাজিক মর্যাদাভেদে কারা তাদের শেষ পরিণতি পর্যন্ত পৌঁছেছে, তা জানা যেতো। পাশাপাশি আহত অবস্থায় জীবন-মৃত্যুর সন্ধিক্ষণে উপনীত শত্রুদের সম্পর্কে অবগতি লাভ করা যেতো এবং সর্বোচ্চ নেতৃত্বের নির্দেশ অনুযায়ী তাদের ক্ষতি থেকে বেঁচে থাকার উদ্দেশ্যে তাদের হত্যার সুযোগ পাওয়া যেতো। পাশাপাশি কাফেরদের নিহত সৈন্যদের সৎকার করাও সম্ভব হতো। উম্মতের ফিরআউনখ্যাত আবু জেহেল, মুশরিক নেতা উমাইয়া ইবনে খালফসহ কাফেরদের অন্যান্য মৃতদেহগুলোকে বদরের পরিত্যক্ত কূপে নিক্ষেপ করার নির্দেশ দেন রসূল সা.। সে কূপের পাশে দাঁড়িয়ে তিনি বলেন: ২২৫
بِئْسَ عَشِيرَةُ النَّبِيِّ كُنْتُمْ لِنَبِيِّكُمْ كَذَّبْتُمُونِي وَصَدَّقَنِي النَّاسُ وَأَخْرَجْتُمُونِي وَآوَانِي النَّاسُ وَقَاتَلْتُمُونِي وَنَصَرَنِي النَّاسُ
'তোমরা নিজেদের নবীর কতই না নিকৃষ্ট প্রতিবেশী ছিলে! তোমরা আমাকে মিথ্যা প্রতিপন্ন করেছো, অথচ অন্য লোকেরা আমার সত্যায়ন করেছে। তোমরা আমাকে নিজের জন্মভূমি থেকে বের করে দিয়েছো, অথচ অন্যান্য মানুষেরা আমাকে আশ্রয় দিয়েছে। তোমরা আমার লোকদের হত্যা করেছো, অথচ অন্যান্য লোকেরা আমাকে সাহায্য করছে।' ২২৬
তাদের সেখানে নিক্ষেপ করা হলে তিনি বলেন, 'হে উতবা ইবনে রাবিয়া, হে শায়বা ইবনে রাবিয়া, হে অমুকের পুত্র অমুক, হে অমুকের পুত্র অমুক! আমাদের প্রতিপালক আমাদেরকে যে প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন আমরা তো তা সত্য পেয়েছি। তোমাদের প্রতিপালক তোমাদেরকে যে প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল, তোমরাও কি তা সত্য পেয়েছো?' ওমর রা. বললেন, 'হে আল্লাহর রসূল! আপনি নিষ্প্রাণ দেহগুলোর সঙ্গে কী কথা বলছেন?' রসূলুল্লাহ সা. বললেন, 'ওই মহান সত্তার শপথ, যাঁর হাতে মুহাম্মাদের প্রাণ। আমি যা বলছি তা তাদের চেয়ে তোমরা অধিক শুনতে পাচ্ছো না।'২২৭
কাতাদাহ রহ. বলেন, রসূলুল্লাহ সা.-এর কথার মাধ্যমে তাদেরকে লজ্জা দেওয়ার উদ্দেশ্যে কিছুক্ষণের জন্য তাদের দেহে আল্লাহ তাআলা প্রাণসঞ্চার করেছিলেন।
নিশ্চই কুরায়েশদের লাশের সাথে রসূলুল্লাহ সা.-এর এসব কথোপকথন একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় শিক্ষা দেয়। সেটা হচ্ছে, তারা যদিও তখন ভিন্ন জগতের বাসিন্দা ছিল। যাকে বলে বারযাখী জগত। সেখানে তারা জীবিতদের কথাবার্তা শুনতে পাচ্ছিল। কিন্তু জবাব দিতে পারছিল না। কথা বলতে পারছিল না। এই জগতকে মুসলমানরা সত্য বলে বিশ্বাস করে। কবরের শান্তি ও শাস্তির বিষয়টি বিশুদ্ধ হাদীস দ্বারা প্রমাণিত। একবার রসূলুল্লাহ সা. দুটি কবরের পাশ দিয়ে অতিক্রম করছিলেন। এমন সময় তিনি বললেন:
إِنَّهُمَا لَيُعَذِّبَانِ وَمَا يُعَذِّبَانِ فِي كَبِيرٍ أَمَّا أَحَدُهُمَا فَكَانَ لَا يَسْتَتِرُ مِنَ الْبَوْلِ وَأَمَّا الْآخَرُ فَكَانَ يَمْشِي بِالنَّمِيمَةِ
এদের শাস্তি দেয়া হচ্ছে। কোনো গুরুতর অপরাধের জন্য তাদের শাস্তি দেয়া হচ্ছে না। তাদের একজন পেশাব হতে সতর্ক থাকতো না। আর অপরজন চোগলখোরি করে বেড়াতো। ২২৮
নবীজির ভাষ্য দ্বারা প্রাপ্ত অদৃশ্য জগতের এসব বাস্তবতার ওপর ঈমান রাখা আবশ্যক। এ বিষয়টি নিশ্চিত করতে গিয়ে কুরআনে কারীমে ফিরাউন গোত্রের ওপর শাস্তির আলোচনায় এসেছে:
النَّارُ يُعْرَضُونَ عَلَيْهَا غُدُوًّا وَعَشِيًّا وَيَوْمَ تَقُومُ السَّاعَةُ أَدْخِلُوا آلَ فِرْعَوْنَ أَشَدَّ الْعَذَابِ
সকাল-সন্ধ্যায় তাদেরকে উপস্থিত করা হয় আগুনের সম্মুখে এবং যেদিন কেয়ামত সংঘটিত হবে সেদিন বলা হবে : ফিরাউন সম্প্রদায়কে নিক্ষেপ করো কঠিনতম শাস্তিতে। ২২৯
অন্যদিকে আল্লাহর পথে শহীদ হওয়া মুমিনদের কবরের নেয়ামতসমূহের আলোচনায় ইরশাদ হচ্ছে:
وَلَا تَحْسَبَنَّ الَّذِينَ قُتِلُوا فِي سَبِيلِ اللَّهِ أَمْوَاتًا بَلْ أَحْيَاءٌ عِنْدَ رَبِّهِمْ يُرْزَقُونَ
আর যারা আল্লাহর পথে জীবন দিয়েছে, তাদেরকে তুমি মৃত মনে করো না, বরং তারা তাদের রবের নিকট জীবিত; তাদেরকে রিযিক দেয়া হয়। ২৩০
টিকাঃ
২২১ আল মুসতাফাদ মিন কাসাসিল কুরআন: ২/১৩৩।
২২২ সহীহ আসসীরাতুন নববিয়্যাহ: ২৫০।
২২৩ নাদরাতুন নায়ীম: ১/২৯১।
২২৪ সাদেক উরজুন, মুহাম্মাদুর রসূলুল্লাহ: ৩/৪৫৩।
২২৫ মুসলিম (৩/১৪০৪) (হাদিস: ১৭৭৯)
২২৬ আল বিদায়া ওয়ান নিহায়া (৩/২৬২) (সহিহ সনদ) আল মুসনাদ (৫/২৫৯) (হাদিস: ৩৬৯৮)
২২৭ সহীহ বুখারী: ৩৯৮৬। সহীহ মুসলিম: ২৮৭৩, ২৮৭৪।
২২৮ সহীহ বুখারী: ২১৮।
২২৯ সুরা মুমিন: ৪৬।
২৩০ সূরা আলে ইমরান: ১৬৯।