📘 নবীজির যুদ্ধ জীবন পাঠ ও পর্যালোচনা > 📄 ফেরেশতাদের মাধ্যমে আল্লাহর সাহায্য

📄 ফেরেশতাদের মাধ্যমে আল্লাহর সাহায্য


কুরআনের বাণী, হাদীসের ভাষ্য ও বদরী সাহাবীদের বর্ণনায় বদরযুদ্ধে আল্লাহ তাআলা কর্তৃক কাফেরদের অন্তর ভীতসন্ত্রস্তকরণের প্রমাণ পাওয়া যায়। আল্লাহ তাআলার বাণী:
إِذْ يُوحِي رَبُّكَ إِلَى الْمَلَئِكَةِ أَنِّي مَعَكُمْ فَثَبَّتُوا الَّذِينَ آمَنُوا سَأُلْقِي فِي قُلُوْبِ الَّذِينَ كَفَرُوا الرُّعْبَ فَاضْرِبُوا فَوْقَ الْأَعْنَاقِ وَاضْرِبُوا مِنْهُ كُلَّ بَنَانٍ
স্মরণ করো, যখন তোমার রব ফেরেশতাদের প্রতি ওহী প্রেরণ করেন যে, 'নিশ্চয় আমি তোমাদের সাথে আছি। সুতরাং যারা ঈমান এনেছে তোমরা তাদেরকে অবিচল রাখো। অচিরেই আমি ভীতি ঢেলে দেবো তাদের হৃদয়ে যারা কুফরী করেছে। অতএব তোমরা আঘাত করো ঘাড়ের ওপরে এবং আঘাত করো তাদের প্রত্যেক আঙুলের অগ্রভাগে। ২০৯
আল্লাহ তাআলা আরও বলেন:
وَلَقَدْ نَصَرَكُمُ اللَّهُ بِبَدْرٍ وَأَنْتُمْ أَذِلَّةٌ فَاتَّقُوا اللَّهَ لَعَلَّكُمْ تَشْكُرُونَ إِذْ تَقُولُ لِلْمُؤْمِنِينَ أَلَنْ يَكْفِيَكُمْ أَنْ يُمِدَّكُمْ رَبُّكُمْ بِثَلَاثَةِ آلَافٍ مِنَ الْمَلَائِكَةِ مُنْزَلِينَ بَلَى إِنْ تَصْبِرُوا وَتَتَّقُوا وَيَأْتُوكُمْ مِنْ فَوْرِهِمْ هُذَا يُمْدِدْكُمْ رَبُّكُمْ بِخَمْسَةِ آلَافٍ مِنَ الْمَلَائِكَةِ مُسَوَّمِينَ وَمَا جَعَلَهُ اللَّهُ إِلَّا بُشْرَى لَكُمْ وَلِتَطْمَئِنَّ قُلُوبُكُمْ بِهِ وَمَا النَّصْرُ إِلَّا مِنْ عِنْدِ اللَّهِ الْعَزِيزِ الْحَكِيمِ
আর নিশ্চয়ই আল্লাহ তোমাদেরকে বদরে সাহায্য করেছিলেন এবং তোমরা দুর্বল ছিলে; অতএব তোমরা আল্লাহকে ভয় কর, যেন তোমরা কৃতজ্ঞ হও। যখন মুমিনদেরকে বলেছিলেন, এটা কি তোমাদের পক্ষে যথেষ্ট নয় যে, তোমাদের রব তিন সহস্র ফেরেশতা প্রেরণ করে তোমাদের সাহায্য করবেন? বরং যদি তোমরা ধৈর্য ধারণ কর ও সংযমী হও এবং তারা যদি স্বেচ্ছায় তোমাদের ওপর নিপতিত হয় তাহলে তোমাদের রব পাঁচ সহস্র বিশিষ্ট ফেরেশতা দ্বারা তোমাদেরকে সাহায্য করবেন। আর আল্লাহ এই সাহায্য শুধু এ জন্যই করেছেন যেন তোমাদের জন্য সুসংবাদ হয় এবং তোমাদের অন্তরে শান্তি আসে। আর সাহায্য শুধু আল্লাহর পক্ষ হতেই হয়ে থাকে, যিনি পরাক্রান্ত, প্রজ্ঞাময়। ২১০
বুখারী, মুসলিম ও আহমাদ ইবনে হাম্বল প্রমুখ ইমামগণের বিশুদ্ধ বর্ণনায় বদরযুদ্ধে ফেরেশতাদের অংশগ্রহণ এবং কাফেরদের বিরুদ্ধে লড়াইয়ের বিবরণ পাওয়া যায়। ২১১
ইবনে আব্বাস রা. বলেন, বদরযুদ্ধে জনৈক মুস মুজাহিদ অগ্রগামী মুশরিক সেনার পিছু ধাওয়া করছিলেন। হঠাৎ তিনি সে মুশরিক সৈনিকের ওপর চাবুকের আঘাত শুনতে পেলেন এবং তার পাশাপাশি একজন অশ্বারোহীর শব্দও শুনলেন-যিনি বলছিলেন: 'হাইজুম২১২ এগিয়ে যাও'। সাথে সাথে ওই মুশরিক সৈনিক মাটিতে গড়িয়ে পড়ে। তিনি তার ওপর ঝুঁকে দেখলেন, তার নাক ও মুখমণ্ডল আহত এবং সেখান থেকে রক্ত বেরোচ্ছে। যেন কেউ তাকে বিষাক্ত চাবুক দিয়ে আঘাত করেছে। ফলে তার চেহারা বিবর্ণ হয়ে গেছে। ওই আনসারী সাহাবী রসূলুল্লাহ সা.-কে ঘটনাটি শোনালে রসূলুল্লাহ সা. তাকে বলেন, 'ঠিকই বলেছো তুমি। ইনি ছিলেন তৃতীয় আকাশ থেকে অবতরণকারী ফেরেশতা।'২১৩
ইবনে আব্বাস রা. থেকে আরেকটি হাদীসে বর্ণিত হয়েছে, রসূলুল্লাহ সা. বদরযুদ্ধের দিন বলেছিলেন, 'এই হলেন জিবরীল! তিনি অস্ত্রেশস্ত্রে সজ্জিত হয়ে নিজের ঘোড়ার লাগাম টেনে দাঁড়িয়ে আছেন। ২১৪
আলী ইবনে আবী তালিব রা.-এর বর্ণনায় এসেছে: আনসারী গোত্রের জনৈক সাহাবী বদরযুদ্ধের দিন আব্বাসকে গ্রেফতার করে আনেন। আব্বাস বলছিলেন, 'আল্লাহর শপথ, সে আমাকে গ্রেফতার করেনি। আমাকে অনিন্দ্য সুন্দর চেহারার এক লোক গ্রেফতার করেছেন-যার মাথার দু'দিকে কোনো চুল ছিল না এবং তিনি ছিলেন ধূসর বর্ণের ঘোড়ায় আরোহী। আমি উপস্থিত লোকদের মাঝে তাকে দেখছি না।' আনসারী সাহাবী বললেন, 'হে আল্লাহর রসূল! তাকে আমিই গ্রেফতার করেছি।'
জবাবে রসূলুল্লাহ সা. বলেন, 'চুপ থাকো, অবশ্যই আল্লাহ তাআলা তোমাকে একজন সম্মানিত ফেরেশতার মাধ্যমে সাহায্য করেছেন।' ২১৫
আবু দাউদ মাযিনীর বর্ণনায় এসেছে, তিনি বলেন, বদরের দিন আমি একজন মুশরিককে হত্যার উদ্দেশ্যে তার পিছু ধাওয়া করছিলাম। কিন্তু আমি তার ওপর আক্রমণের পূর্বেই সে নিহত হয়ে মাটিতে লুটিয়ে পড়ে। তার মস্তক ঘাড় হতে বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। আমি বুঝতে পারলাম, অন্য কেউ তাকে হত্যা করেছে। ২১৬
নিশ্চই বদরে আল্লাহ তাআলা কর্তৃক ফেরেশতা দ্বারা মুমিনদের সাহায্যের বিষয়টি অনস্বীকার্য। এই সাহায্যের উদ্দেশ্য ছিল মুসলমানদের বিজয়ের বাহ্যিক উপকরণ তৈরি করা। তাদের আগমনের সংবাদে মুসলমানদের মনোবল বেড়ে গেছে। ফলে রণাঙ্গনে তারা আরও দৃঢ়পদ হয়েছেন। বীরবিক্রমে যুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়েছেন। পরে ফেরেশতাদের সরাসরি যুদ্ধে অংশগ্রহণ এবং চোখের সামনে তাদের আক্রমণরত অবস্থায় দেখতে পেয়ে নিঃসন্দেহে তাদের মনোবল আরও বহুগুণ বেড়ে গিয়েছিল। কুরআন-হাদীসের ভাষ্যে আমরা এর প্রমাণ দেখতে পাই। ২ ১৭
কেউ যদি প্রশ্ন করে, যেখানে জিবরীল আ.-এর মতো একজন ফেরেশতাই কাফেরদের বিরুদ্ধে যথেষ্ট, সেখানে বিপুলসংখ্যক ফেরেশতাকে মুসলমানদের সাহায্যে রণাঙ্গনে নামানোর কারণ কী?
এর জবাবে অধ্যাপক আবদুল কারীম যায়দান বলেন, সত্য-মিথ্যার লড়াই এক চিরন্তন বাস্তবতা। প্রতি যুগেই সত্যবাদীদের সাথে যুদ্ধ বাধে মিথ্যার তল্পিবাহকদের। যদিও শেষাবধি আল্লাহ তাআলার নীতি অনুযায়ী সত্যপন্থীদের বিজয়ই নিশ্চিত। এ প্রতিদ্বন্দ্বিতা সংঘটিত হয় দুটি শক্তির মধ্যে। একদিকে সত্যান্বেষীরা, আরেকদিকে বাতিলপন্থীরা। হকের পথে অটল থেকে আল্লাহ তাআলার আদেশ-নিষেধের বাস্তবায়নের জন্য কাজ করলে তার পক্ষ থেকে সাহায্য ও সহযোগিতা আসে; যা বিভিন্নভাবে হকপন্থীরা পায়। তবে বিজয়ের সুফল তারাই ঘরে তুলতে পারবে যারা বাহ্যিক যাবতীয় উপকরণের সাহায্য নিতে সক্ষম হবে।
বদরযুদ্ধে মুসলমানদের ইখলাস তথা নিষ্ঠাপূর্ণ ঈমানের বদৌলতে আল্লাহর পক্ষ থেকে ফেরেশতাদের মাধ্যমে সাহায্য এসেছিল এবং তারা বিজয়ী হয়েছিলেন। কিন্তু ঈমানদারদের সরাসরি যুদ্ধে অংশগ্রহণ, শাহাদাতের অমীয়সুধা পান, যুদ্ধক্ষেত্রে অবিচলতা, আল্লাহর ওপর পরিপূর্ণ বিশ্বাস ও আস্থা, উপযোগী রণকৌশল ইত্যাদি বাহ্যিক উপকরণ অবলম্বন করাও জরুরি। এসবের মাধ্যমেই আল্লাহ তাআলা বিজয়ের ফয়সালা নিশ্চিত করেছিলেন। ইসলাম তার অনুসারীদের কাফেরদের বিরুদ্ধে সরাসরি যুদ্ধে অংশগ্রহণ ও বাতিলপন্থীদের মূলোৎপাটনের জন্য প্রস্তুতি গ্রহণের নির্দেশনা দেয়। সফলতা ও আল্লাহ তাআলার পক্ষ থেকে সাহায্যপ্রাপ্তির জন্য ঈমানী শক্তির পাশাপাশি বাহ্যিক যুদ্ধসরঞ্জাম সংগ্রহের গুরুত্বও এর মাধ্যমে আমরা অনুধাবন করতে পারি। যদ্দরুন আল্লাহ তাআলার ইচ্ছায় বাতিল শক্তি উপযুক্ত শাস্তি পায় এবং নিশ্চিহ্ন হয়ে যায়। ২১৮
আল্লাহ তাআলা বলেন:
قَاتِلُوهُمْ يُعَذِّبْهُمُ اللَّهُ بِأَيْدِيكُمْ وَيُخْزِهِمْ وَيَنْصُرْكُمْ عَلَيْهِمْ وَيَشْفِ صُدُورَ قَوْمٍ مُؤْمِنِينَ وَيُذهِبْ غَيْظَ قُلُوبِهِمْ وَيَتُوبُ اللَّهُ عَلَى مَنْ يَشَاءُ وَاللَّهُ عَلِيمٌ حَكِيمٌ
তোমরা তাদের সাথে যুদ্ধ করো। আল্লাহ তোমাদের হাতে তাদেরকে শাস্তি প্রদান করবেন এবং তাদেরকে লাঞ্ছিত করবেন, আর তোমাদেরকে তাদের ওপর বিজয়ী করবেন এবং মুমিনের অন্তরসমূহকে প্রশান্ত ও ঠাণ্ডা করবেন। আর তাদের অন্তরসমূহের ক্ষোভ দূর করে দিবেন এবং যার প্রতি ইচ্ছা, আল্লাহ করুণা প্রদর্শন করবেন। আল্লাহ মহাজ্ঞানী, প্রজ্ঞাময়। ২১৯
নিঃসন্দেহে বদরযুদ্ধে ফেরেশতাদের অবতরণ ও মুমিনদের পক্ষাবলম্বন করে যুদ্ধে অংশগ্রহণ ছিল এক বিশাল ব্যাপার। তাদের উপস্থিতি মুসলিম বাহিনীকে দৃঢ়পদ করেছিল। কেননা, তারা নিশ্চিন্তে যুদ্ধ করতে পারছিলেন। তাদের মনে এই বিশ্বাস দৃঢ় হয়ে গিয়েছিল যে, যুদ্ধক্ষেত্রে তারা একাকী নন। সাহাবায়ে কেরাম আল্লাহর পক্ষ থেকে সাহায্যপ্রাপ্তির সব শর্ত পূরণ করেছিলেন। ফলে তারা গায়েবি সাহায্যের উপযুক্ত বিবেচিত হন। আর এই সাহায্যপ্রাপ্তির সংবাদ তাদের নিশ্চিন্ত মনে সাহসিকতার সাথে শত্রুদের বিরুদ্ধে লড়াই করার সাহস জোগায়। অথচ শত্রুদের তুলনায় তারা ছিলেন খুবই নগণ্য। সৈন্যসংখ্যার দিক থেকে মুশরিক বাহিনী ছিল তাদের চেয়ে তিনগুণ বেশি। প্রায় নিরস্ত্র মুসলিম বাহিনীর বিপরীতে মুশরিক বাহিনী ছিল পর্যাপ্ত অস্ত্রশস্ত্রে সজ্জিত।
ফেরেশতাদের অবতরণ কাফেরদের মনোবল ভেঙে চুরমার করে দেয়। অদৃশ্য এ শক্তির অংশগ্রহণের বিষয়টি আলোচিত হলে ব্যাপক সংখ্যাধিক্য ও পর্যাপ্ত সামরিক শক্তির অধিকারী হওয়া সত্ত্বেও মুশরিকদের সাহসিকতায় চিড় ধরে। তাদের মনোবল ভেঙে যায়। কারণ মুসলমানদের পক্ষে আসমান থেকে আগত গায়েবি সাহায্যের পরিমাণ ও সংখ্যা তাদের জানা ছিল না। রসূলুল্লাহ সা.-এর যুগ থেকে শুরু হয়ে খিলাফতে রাশিদা ও তৎপরবর্তী কয়েক প্রজন্ম পর্যন্ত মুশরিকদের মনে বিরাজমান ছিল মুসলমানদের অজ্ঞাত শক্তির ভয়। নানা যুদ্ধ-বিগ্রহে এই ভীতি শত্রুর মনোবল ভেঙে দেওয়ায় ভূমিকা রেখেছে। ২২০

টিকাঃ
২০৯ সুরা আনফাল: ১২।
২১০ সুরা আলে ইমরান: ১২৩-১২৬।
২১১ নাদরাতুন নায়ীম: ১/২৯১।
২১২ ফেরেশতার বাহনের নাম।
২১৩ সহীহ মুসলিম: ১৭৬৩।
২১৪ সহীহ বুখারী: ৩৯৯৫।
২১৫ সহীহ আসসীরাতুন নববিয়্যাহ: ২৪৭।
২১৬ সহীহ আসসীরাতুন নববি‍্যাহ: ২৪৭।
২ ১৭ আল মুসতাফাদ মিন কাসাসিল কুরআন: ২/১৩১-১৩২।
২ ১৮ আল মুসতাফাদ মিন কাসাসিল কুরআন: ২/১৩১-১৩২।
২১৯ সুরা তাওবাহ: ১৪-১৫।
২২০ হুমাইদী প্রণীত আত তারীখুল ইসলামী ৪/১৪৫।

📘 নবীজির যুদ্ধ জীবন পাঠ ও পর্যালোচনা > 📄 মুশরিকদের বিরুদ্ধে মুসলমানদের চূড়ান্ত বিজয়

📄 মুশরিকদের বিরুদ্ধে মুসলমানদের চূড়ান্ত বিজয়


শেষ হয় বদরের মহাযুদ্ধ। মুশরিকদের ওপর বিজয়ী হয় মুসলিম বাহিনী। সত্তরজন মুশরিক সৈন্য নিহত হয়। সমপরিমাণ সৈন্য বন্দী হয় মুসলমানদের হাতে। এসব নিহত ও বন্দী সৈন্যদের অধিকাংশই ছিল কুরায়েশের বড় বড় নেতা। পক্ষান্তরে মুসলিম বাহিনীর চৌদ্দজন মুজাহিদ সেদিন শাহাদাতের মর্যাদা লাভ করেন। তাদের মধ্যে ছয়জন মুহাজির, আটজন আনসার ছিলেন। চূড়ান্ত বিজয়ের পর রসূলুল্লাহ সা. মদীনায় অবস্থানরত মুসলমানদের সুসংবাদ প্রদানের জন্য আবদুল্লাহ ইবনে রাওয়াহা ও যায়েদ ইবনে হারেসা রা.-কে পাঠান। ২২১
রসূলুল্লাহ সা. বদরপ্রান্তরে তিন দিন অবস্থান করেন। আনাস রা. বলেন, রসূলুল্লাহ সা. যখন কোনো গোত্রের বিরুদ্ধে যুদ্ধে বিজয়ী হতেন, যুদ্ধক্ষেত্রে তিনি তিন রাত অবস্থান করতেন। ২২২
এতে হয়তো নিম্নোক্ত হেকমতসমূহ নিহিত ছিল:
১. শত্রুদের পরিপূর্ণভাবে পরাস্ত করা: শত্রু যেন পুনরায় শক্তি সঞ্চয় করে পেছন থেকে অতর্কিত আক্রমণ চালাতে না পারে।
২. আল্লাহর তরে জীবন উৎসর্গকারী শহীদদের দাফন-কাফন: রসূল সা.-এর প্রায় সব যুদ্ধেই কিছু মুসলমান শাহাদাত বরণ করেছেন। বদরে মুসলিম বাহিনীর যারা শহীদ হন, তাদেরকে বদরপ্রান্তরেই দাফন করা হয়েছিল। তাদের জানাযার নামায বা বদরপ্রান্তরের বাইরে তাদের দাফনের বিষয়ে কোনো বর্ণনা পাওয়া যায় না। ২২৩
৩. যুদ্ধলব্ধ সম্পদ একত্রিতকরণ এবং তা যথাযথভাবে বণ্টনের জন্য দায়িত্বশীল নিয়োগ: বদরের দিন যুদ্ধলব্ধ সম্পদের ব্যবস্থাপনা ও তত্ত্বাবধানের দায়িত্ব পান বনু মাযেন গোত্রের আবদুল্লাহ ইবনে কাআব রা.। ২২৪
৪. সৈনিকদের বিশ্রাম: শারীরিক পরিশ্রমের পর সৈন্যদের কিছুটা বিশ্রামের পাশাপাশি আহতদের চিকিৎসাও জরুরি হয়ে পড়তো। একই সাথে আল্লাহ তাআলার পক্ষ থেকে বিশাল বিজয় ও সাহায্যের কৃতজ্ঞতা জ্ঞাপনেরও সুযোগ পাওয়া যেতো এই দিনগুলোতে। এ ছাড়া যুদ্ধক্ষেত্রে ব্যক্তিগত ও সম্মিলিত বিভিন্ন কাজ ও ঘটনা আলোচনা-পর্যালোচনা করা যেতো। তদ্রূপ বীরত্ব, সাহসী হামলা ও প্রতিকূল পরিস্থিতিতে অগ্রগামী বাহিনীর কৌশল ইত্যাদি নিয়েও আলোচনা হতো। বিভিন্ন ধরনের আক্রমণ, তার ফলাফল তা থেকে প্রাপ্ত শিক্ষা এবং শত্রুদের পরবর্তী কর্মকাণ্ডের প্রতি মনোযোগী থাকা, তাদের বিভিন্ন পদক্ষেপ পর্যালোচনা, সর্বোচ্চ নেতৃত্বের পক্ষ থেকে দিকনির্দেশনা ও তার ব্যবহারিক প্রয়োগ ইত্যাদি বিষয়ে আলোচনা-পর্যালোচনার সুযোগ রাখাও তিনদিন যুদ্ধক্ষেত্রে অবস্থানের কারণসমূহের অন্তর্ভুক্ত। এসব আলোচনা-পর্যালোচনা পরবর্তীতে কাজে লাগতো।
৫. রণাঙ্গনে মুশরিক বাহিনীর লাশের পরিচয় জানাও এ কয়দিন এখানে অবস্থানের কারণ হতে পারে। এতে কাফেরদের সামাজিক মর্যাদাভেদে কারা তাদের শেষ পরিণতি পর্যন্ত পৌঁছেছে, তা জানা যেতো। পাশাপাশি আহত অবস্থায় জীবন-মৃত্যুর সন্ধিক্ষণে উপনীত শত্রুদের সম্পর্কে অবগতি লাভ করা যেতো এবং সর্বোচ্চ নেতৃত্বের নির্দেশ অনুযায়ী তাদের ক্ষতি থেকে বেঁচে থাকার উদ্দেশ্যে তাদের হত্যার সুযোগ পাওয়া যেতো। পাশাপাশি কাফেরদের নিহত সৈন্যদের সৎকার করাও সম্ভব হতো। উম্মতের ফিরআউনখ্যাত আবু জেহেল, মুশরিক নেতা উমাইয়া ইবনে খালফসহ কাফেরদের অন্যান্য মৃতদেহগুলোকে বদরের পরিত্যক্ত কূপে নিক্ষেপ করার নির্দেশ দেন রসূল সা.। সে কূপের পাশে দাঁড়িয়ে তিনি বলেন: ২২৫
بِئْسَ عَشِيرَةُ النَّبِيِّ كُنْتُمْ لِنَبِيِّكُمْ كَذَّبْتُمُونِي وَصَدَّقَنِي النَّاسُ وَأَخْرَجْتُمُونِي وَآوَانِي النَّاسُ وَقَاتَلْتُمُونِي وَنَصَرَنِي النَّاسُ
'তোমরা নিজেদের নবীর কতই না নিকৃষ্ট প্রতিবেশী ছিলে! তোমরা আমাকে মিথ্যা প্রতিপন্ন করেছো, অথচ অন্য লোকেরা আমার সত্যায়ন করেছে। তোমরা আমাকে নিজের জন্মভূমি থেকে বের করে দিয়েছো, অথচ অন্যান্য মানুষেরা আমাকে আশ্রয় দিয়েছে। তোমরা আমার লোকদের হত্যা করেছো, অথচ অন্যান্য লোকেরা আমাকে সাহায্য করছে।' ২২৬
তাদের সেখানে নিক্ষেপ করা হলে তিনি বলেন, 'হে উতবা ইবনে রাবিয়া, হে শায়বা ইবনে রাবিয়া, হে অমুকের পুত্র অমুক, হে অমুকের পুত্র অমুক! আমাদের প্রতিপালক আমাদেরকে যে প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন আমরা তো তা সত্য পেয়েছি। তোমাদের প্রতিপালক তোমাদেরকে যে প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল, তোমরাও কি তা সত্য পেয়েছো?' ওমর রা. বললেন, 'হে আল্লাহর রসূল! আপনি নিষ্প্রাণ দেহগুলোর সঙ্গে কী কথা বলছেন?' রসূলুল্লাহ সা. বললেন, 'ওই মহান সত্তার শপথ, যাঁর হাতে মুহাম্মাদের প্রাণ। আমি যা বলছি তা তাদের চেয়ে তোমরা অধিক শুনতে পাচ্ছো না।'২২৭
কাতাদাহ রহ. বলেন, রসূলুল্লাহ সা.-এর কথার মাধ্যমে তাদেরকে লজ্জা দেওয়ার উদ্দেশ্যে কিছুক্ষণের জন্য তাদের দেহে আল্লাহ তাআলা প্রাণসঞ্চার করেছিলেন।
নিশ্চই কুরায়েশদের লাশের সাথে রসূলুল্লাহ সা.-এর এসব কথোপকথন একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় শিক্ষা দেয়। সেটা হচ্ছে, তারা যদিও তখন ভিন্ন জগতের বাসিন্দা ছিল। যাকে বলে বারযাখী জগত। সেখানে তারা জীবিতদের কথাবার্তা শুনতে পাচ্ছিল। কিন্তু জবাব দিতে পারছিল না। কথা বলতে পারছিল না। এই জগতকে মুসলমানরা সত্য বলে বিশ্বাস করে। কবরের শান্তি ও শাস্তির বিষয়টি বিশুদ্ধ হাদীস দ্বারা প্রমাণিত। একবার রসূলুল্লাহ সা. দুটি কবরের পাশ দিয়ে অতিক্রম করছিলেন। এমন সময় তিনি বললেন:
إِنَّهُمَا لَيُعَذِّبَانِ وَمَا يُعَذِّبَانِ فِي كَبِيرٍ أَمَّا أَحَدُهُمَا فَكَانَ لَا يَسْتَتِرُ مِنَ الْبَوْلِ وَأَمَّا الْآخَرُ فَكَانَ يَمْشِي بِالنَّمِيمَةِ
এদের শাস্তি দেয়া হচ্ছে। কোনো গুরুতর অপরাধের জন্য তাদের শাস্তি দেয়া হচ্ছে না। তাদের একজন পেশাব হতে সতর্ক থাকতো না। আর অপরজন চোগলখোরি করে বেড়াতো। ২২৮
নবীজির ভাষ্য দ্বারা প্রাপ্ত অদৃশ্য জগতের এসব বাস্তবতার ওপর ঈমান রাখা আবশ্যক। এ বিষয়টি নিশ্চিত করতে গিয়ে কুরআনে কারীমে ফিরাউন গোত্রের ওপর শাস্তির আলোচনায় এসেছে:
النَّارُ يُعْرَضُونَ عَلَيْهَا غُدُوًّا وَعَشِيًّا وَيَوْمَ تَقُومُ السَّاعَةُ أَدْخِلُوا آلَ فِرْعَوْنَ أَشَدَّ الْعَذَابِ
সকাল-সন্ধ্যায় তাদেরকে উপস্থিত করা হয় আগুনের সম্মুখে এবং যেদিন কেয়ামত সংঘটিত হবে সেদিন বলা হবে : ফিরাউন সম্প্রদায়কে নিক্ষেপ করো কঠিনতম শাস্তিতে। ২২৯
অন্যদিকে আল্লাহর পথে শহীদ হওয়া মুমিনদের কবরের নেয়ামতসমূহের আলোচনায় ইরশাদ হচ্ছে:
وَلَا تَحْسَبَنَّ الَّذِينَ قُتِلُوا فِي سَبِيلِ اللَّهِ أَمْوَاتًا بَلْ أَحْيَاءٌ عِنْدَ رَبِّهِمْ يُرْزَقُونَ
আর যারা আল্লাহর পথে জীবন দিয়েছে, তাদেরকে তুমি মৃত মনে করো না, বরং তারা তাদের রবের নিকট জীবিত; তাদেরকে রিযিক দেয়া হয়। ২৩০

টিকাঃ
২২১ আল মুসতাফাদ মিন কাসাসিল কুরআন: ২/১৩৩।
২২২ সহীহ আসসীরাতুন নববিয়‍্যাহ: ২৫০।
২২৩ নাদরাতুন নায়ীম: ১/২৯১।
২২৪ সাদেক উরজুন, মুহাম্মাদুর রসূলুল্লাহ: ৩/৪৫৩।
২২৫ মুসলিম (৩/১৪০৪) (হাদিস: ১৭৭৯)
২২৬ আল বিদায়া ওয়ান নিহায়া (৩/২৬২) (সহিহ সনদ) আল মুসনাদ (৫/২৫৯) (হাদিস: ৩৬৯৮)
২২৭ সহীহ বুখারী: ৩৯৮৬। সহীহ মুসলিম: ২৮৭৩, ২৮৭৪।
২২৮ সহীহ বুখারী: ২১৮।
২২৯ সুরা মুমিন: ৪৬।
২৩০ সূরা আলে ইমরান: ১৬৯।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00