📄 মুসলমানদের সাথে বদরে মুখোমুখি হওয়ার সিদ্ধান্ত
আবু সুফিয়ান তার কাফেলার ওপর আক্রমণের জন্য রসূল সা. ও সাহাবীদের মদিনা থেকে বের হওয়ার খবর পেলেন। সাথে সাথে তিনি কুরায়েশকে তাদের সম্পদ ও কাফেলা রক্ষার জন্য ছুটে আসার আহ্বান জানিয়ে আমর ইবনে যাম যাম গিফারীকে মক্কায় পাঠালেন এবং উপকূলবর্তী পথ ধরলেন। ১২০
শাম থেকে ফেরার পথে আবু সুফিয়ান খুব সতর্কতার সাথে مسلمانوں গতিবিধি সম্পর্কে খোঁজ খবর রাখছিলেন। চার দিকে গুপ্তচর ছড়িয়ে দেয়ার পাশাপাশি তিনি নিজেও সেই অঞ্চলের স্থানীয় অধিবাসীদের জিজ্ঞাসা করে মুসলমানদের খোঁজ রাখছিলেন। বদরের অধিবাসীদের তিনি জিজ্ঞাসা করলেন, তোমরা কি অচেনা কাউকে দেখেছো তোমাদের এলাকায়? তারা বললো, দুই ব্যক্তিকে দেখেছি।
আবু সুফিয়ান বললেন, আমাকে তাদের বাহনের মল দেখাও। বদরের অধিবাসীরা তাকে দুই সাহাবীর বাহনের মলের কাছে নিয়ে গেলো। আবু সুফিয়ান মল হাতে নিয়ে দেখলেন ভেতরে খেজুরের দানা। তিনি বললেন, খোদার কসম! এ তো ইয়াসরিবের উট। ১২১
এভাবে অনুসন্ধানি দলের বাহনের খাবার দেখে তিনি বুঝে ফেলেন মুসলমানরা তার কাফেলা আক্রমণের উদ্দেশে বের হয়েছে। সাথে সাথে তিনি আমর ইবনে যামযামকে কুরায়েশের কাছে পাঠান এবং উপকূলবর্তী পথ ধরে মক্কার দিকে এগিয়ে যান। ১২২
কাফেলা বিপদে পড়ার খবর শুনে কুরায়েশ নেতারা ক্রোধে ফুঁসে উঠলো। এটা ছিল তাদের ঔদ্ধত্য ও অহমিকার ওপর কঠিন একটি আঘাত। এক দিকে তাদের অর্থ সম্পদ বিপদের মুখে পড়তে যাচ্ছিলো অন্য দিকে আরব গোত্রগুলোর মধ্যে কুরায়েশের প্রভাব প্রতিপত্তির পতন ঘণ্টা বেজে উঠেছিল। ক্রোধে দিশেহারা কুরায়েশ তাদের পূর্ণ সামরিক শক্তি নিয়ে বের হলো। ১২৩
আমর ইবনে যামযাম গিফারী মক্কাবাসীকে উত্তেজিত করতে ও পরিস্থিতির গুরুত্ব বোঝাতে উটের আসন উল্টিয়ে, উটের নাক ফেড়ে, নিজের গায়ের জামা দুই দিক থেকে ছিড়ে মক্কায় প্রবেশ করেছিল। চিৎকার করে সে বলছিল হে কুরায়েশ! তোমাদের কাফেলা! তোমাদের কাফেলা! আবু সুফিয়ানের সাথে থাকা তোমাদের সম্পদের ওপর মুহাম্মাদ তার সঙ্গীদের নিয়ে হামলা করেছে। হয়তো তোমরা তোমাদের সম্পদ হারাতে যাচ্ছো। সাহায্য করো! সাহায্য করো!! ১২৪
আবু সুফিয়ান বিপদজনক এলাকা অতিক্রম করে যখন নিজেকে নিরাপদ অনুভব করলো, তখন জুহফায় অবস্থানরত কুরায়েশ নেতাদের কাছে খবর পাঠালো, কাফেলা রক্ষা পেয়েছে, আপনারা মক্কায় ফিরে আসুন।
কিন্তু মক্কায় ফেরা নিয়ে কুরায়েশের মধ্যে মতবিরোধ হয়ে গেলো। তাদের অধিকাংশই বদরের দিকে এগিয়ে গিয়ে মুসলমানদের একটা শিক্ষা দেয়ার পক্ষে ছিল। তাদের যুক্তি ছিল মুসলমানদের ওপর আক্রমণ করলে কুরায়েশের ব্যবসার পথ নিরাপদ হবে এবং অন্য গোত্রগুলোর ওপর কুরায়েশের প্রতাপ পূনঃপ্রতিষ্ঠিত হবে। বনু যোহরা গোত্র বিভক্ত হয়ে গেলো। বনু আদী পেছনে রয়ে গেলো। তাই বনু যোহরা মক্কায় ফিলে গেলো। তবে কুরায়েশের শক্তির বড় অংশ ও তাদের মিত্ররা এগিয়ে গিয়ে বদরে পৌছলো। ১২৫
তিন. সাহাবীদের সাথে নবীজির পরামর্শ
যখন নবীজি জানতে পারলেন ব্যবসায়িক কাফেলা চলে গেছে এবং মক্কার নেতারা নবী সা.-এর সাথে যুদ্ধ করার জন্য এগিয়ে এসেছে তখন তিনি পরামর্শের জন্য সাহাবীদের সমবেত করলেন। ১২৬
কিছু সাহাবী মদিনায় ফেরার পক্ষে মত দিলেন। আর কিছু সাহাবী কুরায়েশের মুখোমুখি হওয়া নিয়ে তারা পুরোপুরি ভরসা পাচ্ছিলেন না কারণ মুসলমানরা যুদ্ধের জন্য প্রস্তুত হয়ে বের হন নি। তারা রসূল সা.-কে তাদের মত মানানোর চেষ্টা করলেন। কুরআনে তাদের এই অবস্থান এবং মুমিনদের সাধারণ অবস্থার বর্ণনা এসেছে। আল্লাহ তাআলা বলেন,
كَمَا أَخْرَجَكَ رَبُّكَ مِنْ بَيْتِكَ بِالْحَقِّ وَإِنَّ فَرِيقًا مِنَ الْمُؤْمِنِينَ لَكَارِهُونَ يُجَادِلُونَكَ فِي الْحَقِّ بَعْدَ مَا تَبَيَّنَ كَأَنَّمَا يُسَاقُونَ إِلَى الْمَوْتِ وَهُمْ يَنْظُرُونَ وَإِذْ يَعِدُكُمُ اللَّهُ إِحْدَى الطَّائِفَتَيْنِ أَنَّهَا لَكُمْ وَتَوَدُّونَ أَنَّ غَيْرَ ذَاتِ الشَّوْكَةِ تَكُونُ لَكُمْ وَيُرِيدُ اللَّهُ أَنْ يُحِقَّ الْحَقَّ بِكَلِمَاتِهِ وَيَقْطَعَ دَابِرَ الْكَافِرِينَ لِيُحِقَّ الْحَقَّ وَيُبْطِلَ الْبَاطِلَ وَلَوْ كَرِهَ الْمُجْرِمُونَ
যেভাবে তোমার রব তোমাকে নিজ ঘর থেকে বের করেছেন যথাযথভাবে এবং নিশ্চয় মুমিনদের একটি দল তা অপছন্দ করছিল। তারা তোমার সাথে সত্য সম্পর্কে বিতর্ক করছে তা স্পষ্ট হয়ে যাওয়ার পর। যেন তাদেরকে মৃত্যুর দিকে হাঁকিয়ে নেয়া হচ্ছে, আর তারা তা দেখছে। আর স্মরণ কর, যখন আল্লাহ তোমাদেরকে দু'দলের একটির ওয়াদা দিয়েছিলেন যে, নিশ্চয় তা তোমাদের জন্য হবে। আর তোমরা কামনা করছিলে যে, অস্ত্রহীন দলটি তোমাদের জন্য হবে এবং আল্লাহ চাচ্ছিলেন তাঁর কালেমাসমূহ দ্বারা সত্যকে সত্য প্রমাণ করবেন এবং কাফেরদের মূল কেটে দেবেন। যাতে তিনি সত্যকে সত্য প্রমাণিত করেন এবং বাতিলকে বাতিল করেন, যদিও অপরাধীরা তা অপছন্দ করে। ১২৭
মিকদাদ ইবনে আসওয়াদের মত ছিল অনন্য। আব্দুল্লাহ ইবনে মাসউদ রা. বলেন, আমি মিকদাদের এমন একটি কাজ দেখেছি, কাজটি আমি করতে পারলে আমার বেশি ভালো লাগতো। রসূল সা. যখন সবাইকে সমবেত করে কাফেরদের ওপর আক্রমণের আহ্বান জানাচ্ছিলেন, মিকদাদ বললেন, আমরা আপনাকে সেরকম বলবো না যেমন মুসা আ.-এর সম্প্রদায় বলেছিল,
قَالُوا يَا مُوسَى إِنَّا لَنْ نَدْخُلَهَا أَبَدًا مَا دَامُوا فِيهَا فَاذْهَبْ أَنْتَ وَرَبُّكَ فَقَاتِلَا إِنَّا هَاهُنَا قَاعِدُونَ
তারা বলল, 'হে মূসা, আমরা সেখানে কখনো প্রবেশ করব না, যতক্ষণ তারা সেখানে থাকে। সুতরাং, তুমি ও তোমার রব যাও এবং লড়াই কর। আমরা এখানেই বসে রইলাম'। ১২৮ বরং আমরা আপনার ডান দিকে থেকে, বাম দিকে থেকে, সামনে থেকে ও পেছনে থেকে যুদ্ধ করবো।
আমি দেখলাম, মিকদাদের কথা শুনে রসূল সা.-এর চেহারা আনন্দে উজ্জ্বল হয়ে উঠলো। ১২৯
আরেক বর্ণনায় আছে মিকদাদ রা. বলেছিলেন, আমরা আপনাকে সেরকম বলবো না যেমন বনী ইসরাইল মূসা আ.-কে বলেছিল, فَاذْهَبْ أَنْتَ وَرَبُّكَ فَقَاتِلَا إِنَّا هَاهُنَا قَاعِدُونَ তুমি ও তোমার রব যাও এবং লড়াই কর। আমরা এখানেই বসে রইলাম। ১৩০
আপনি এগিয়ে যান আমরা আপনার সাথে আছি। রসূল সা.-কে দেখে মনে হলো, যেন তিনি রসূল সা.-এর দুঃখ দূর করে দিলেন। ১৩১
এরপর রসূল সা. আবার বললেন, আমাকে পরামর্শ দাও হে লোকসকল! যেন তিনি আনসারদের মত জানতে চাচ্ছিলেন। কারণ তারাই ছিলেন সেনাবাহিনীর অধিকাংশ এবং উকবার দ্বিতীয় বায়াতের চুক্তি অনুযায়ী মদিনার বাইরে রসূল সা.-কে রক্ষা করার দায়িত্ব তাদের ওপর বর্তায় না।
আনসারদের পতাকাবাহী সা'দ ইবনে মুআয নবীজির উদ্দেশ্য বুঝতে পারলেন। তিনি দাঁড়িয়ে বললেন, আপনি বোধ হয় আমাদের কথা শুনতে চাচ্ছেন হে আল্লাহর রসূল!
রসূল সা. বললেন, হ্যাঁ।
তিনি বললেন, আমরা আপনার ওপর ঈমান এনেছি, আপনাকে সত্যায়ন করেছি, সাক্ষ্য দিয়েছি যে আপনার আনিত দীন সত্য এবং আমরা আপনার আনুগত্যের শপথ করেছি। আপনি আপনার লক্ষ্যে এগিয়ে যান হে আল্লাহর রসূল। আপনাকে যিনি সত্য দীন দিয়ে প্রেরণ করেছেন সেই রবের শপথ! যদি আপনি আমাদের নিয়ে এই সমুদ্রেও ঝাঁপিয়ে পড়েন, তবে আমরাও আপনার সাথে ঝাঁপিয়ে পড়বো। আমাদের একজনও পিছিয়ে থাকবে না। আপনি চাইলে কালই আমাদের নিয়ে শত্রুর মুখোমুখি হোন। আমরা যুদ্ধে ধৈর্যশীল। আক্রমণের মুখে সত্যবাদী। আল্লাহ হয়তো যুদ্ধের ময়দানে আমাদের পক্ষ থেকে এমন কিছুই দেখাবেন যা আপনার চোখ শীতল করবে। তাই আল্লাহ আল্লাহর বরকতের ওপর খুশি হন। ১৩২
সা'দ ইবনে মুআযের কথা শুনে রসূল সা. খুশি হলেন। সা'দে ভাষণ তাকে উদ্দীপ্ত করলো। তিনি বললেন, এগিয়ে যাও এবং সুসংবাদ গ্রহণ করো। নিশ্চই আল্লাহ আমাকে ওয়াদা দিয়েছেন কোনো একটি দলের। আল্লাহর শপথ! আমি তাদের মৃত্যু দেখতে পাচ্ছি। ১৩৩
সা'দের ভাষণ রসূল সা. ও সাহাবায়ে কেরামকে উদ্দীপ্ত ও উদ্বেলিত করেছিল। তাদের মনোবল অনেক বাড়িয়ে দিয়েছিল।
যুদ্ধের ব্যাপারে সাহাবীদের পরামর্শ শুনতে নবীজির আগ্রহ থেকে বোঝা যায় যুদ্ধের সময় পরামর্শের বিশেষ গুরুত্ব রয়েছে। কারণ যুদ্ধ একটি জাতির ভাগ্য নির্ধারণ করে; সাফল্যের স্বর্ণশিখরে তুলে দেয় অথবা নাম নিশানা মিটিয়ে দেয়। ১৩৪
চার. এগিয়ে যাওয়ার পথে শত্রু সম্পর্কে তথ্য সংগ্রহ
সাহাবীদের আনুগত্য, বীরত্ব এবং যুদ্ধের ব্যাপারে ঐক্যমত্য দেখে রসূল সা. সাহাবীদের সুশৃঙ্খল করার দিকে মনোযোগী হলেন। মুসআব ইবনে উমায়েরের হাতে সাদা পতাকা দিলেন। দু'টি কালো পতাকা দিলেন সা'দ ইবনে মুআয ও আলী ইবনে আবী তালিবের হাতে। সেনাদলের পেছনের অংশের নেতৃত্ব দিলেন কায়েস ইবনে আবী সা'সা'আকে। ১৩৫
টিকাঃ
১২০ মাওসুআতু নাযরাতিন নাঈম (১/২৮৭)
১২১ আস-সীরাতুন নাবাবিয়্যাহ লিইবনি হিশাম (২/২৩০)
১২২ গাযওয়াতু বাদারিল কুবরা লিআবী ফারিস (পৃঃ ৩৩-৩৪)
১২৩ মওসুআতু নাযরাতিন নাঈম (১/২৮৭)
১২৪ আস-সীরাতুন নাবাবিয়্যাহ লিইবনি হিশাম (২/২২১)
১২৫ মওসুআতু নাযরাতিন নাঈম (১/২৮৭)
১২৬ সহিহ বুখারী (হাদিস: ৩৯৫২)
১২৭ সূরা আনফাল (আয়াত:৫-৮)
১২৮ সূরা মায়েদা (আয়াত: ২৪)
১২৯ বুখারী, কিতাবুল মাগাযী (৭/২৮৭)
১৩০ সূরা মায়েদা (আয়াত: ২৪)
১৩১ বুখারী, কিতাবুত তাফসীর (৮/২৭৩)
১০২ মুসলিম (৩/১৪০৪) (হাদিস: ১৭৭৯)
১৩০ আল বিদায়া ওয়ান নিহায়া (৩/২৬২) (সহিহ সনদ) আল মুসনাদ (৫/২৫৯) (হাদিস: ৩৬৯৮)
১৩৪ গাযওয়াতু বাদারিল কুবরা লিআবী ফারিস (পৃঃ ৩৭)
১৩৫ যাদুল মাআদ (৩/১৭৬)
📄 বদরে হাক্কাব ইবনে মুনযিরের পরামর্শ
কুরায়েশের শক্তি সম্পর্কে তথ্য সংগ্রহের পর রসূল সা. এবং সাহাবায়ে কেরাম দ্রুত বদরের দিকে গেলেন। যেন তারা বদরের কূপের কাছে মুশরিকদের আগে পৌঁছতে পারেন এবং তার ওপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা থেকে তাদের বাঁধা দিতে পারেন। মুসলমানরা বদরের সবচেয়ে নিকটবর্তী কূপের পাশে অবতরণ করলেন। হাব্বাব ইবনে মুনযির সেখানে দাঁড়িয়ে গেলেন এবং বললেন, হে আল্লাহর রসূল! এই জায়গায় শিবির স্থাপন কি আল্লাহর ফয়সালা? আমাদের আগে বাড়া বা পেছনে হটার অনুমতি নেই এমন? নাকি আপনার সিদ্ধান্ত? রসূল সা. বললেন, এটা আমার সিদ্ধান্ত। তিনি বললেন, হে আল্লাহর রসূল! তাহলে এটা সঠিক জায়গা নয়। আপনি সবাইকে নিয়ে মুশরিকদের সবচেয়ে নিকটবর্তী কূপের দিকে এগিয়ে যান। আমরা সেখানে অবতরণ করবো এবং পেছনের সব কূপ নষ্ট করে দেবো। আমরা একটি হাউজ বানিয়ে তা পানি দিয়ে পূর্ণ করবো। এরপর আমরা যখন মুশরিকদের সাথে লড়াই করবো, তখন আমাদের কাছে পানি থাকবে তাদের কাছে পানি থাকবে না। রসূল সা. তার পরামর্শ গ্রহণ করলেন। তিনি বাহিনী নিয়ে শত্রুবাহিনীর সবচেয়ে নিকটবর্তী কূপের দিকে এগিয়ে গিয়ে সেখানে শিবির স্থাপন করলেন। তারপর একটি হাউজ বানালেন এবং বাকি সব কূপ নষ্ট করে দিলেন। ১৪৪
এই ঘটনাটি সাহাবীদের সাথে রসূল সা.-এর সারা জীবনের আচরণের একটি দৃষ্টান্ত। তাদের যে কেউ গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে মত দিতে পারতেন। সেনাপতির রেগে যাওয়ার আশংকা তারা করতেন না। তারপর সেই রাগের পরিণামে যা হয় যেমন মর্যাদা কমে যাওয়া, তার জীবন ও সম্পদের ক্ষতি হওয়া-এসবের তো প্রশ্নই আসে না।
মত প্রকাশের এই স্বাধীনতা মুসলিম সমাজকে সব বিচক্ষণ ও জ্ঞানীদের বুদ্ধিমত্তা থেকে উপকৃত হওয়ার সুযোগ করে দিয়েছিল। এ কারণেই তাদের সেনাপতি কমবয়স্ক হলেও তারা সফলতা পেতেন। কারণ তিনি শুধু নিজের মেধা দিয়েই ভাবতেন না। অথবা তার ওপর কর্তৃত্বকারী এমন কোনো গোষ্ঠীর দ্বারাও তিনি চালিত হতেন না; যারা সাধারণ مسلمانوں স্বার্থের ওপর নিজেদের গোষ্ঠীগত স্বার্থকে প্রধান্য দেবে। তিনি তার সেনাবাহিনীর সব সদস্যের মেধা ও বিচক্ষণতার সাহায্য নিয়েই চিন্তা করতেন। অনেক সময় সঠিক সিদ্ধান্ত পেতেন সর্বনিম্ন মর্যাদার একজন সাধারণ সৈনিকের কাছ থেকেও। কারণ তাদের সেনাবাহিনীতে সেনাপতির কাছে সাধারণ সৈনিকের মতামত পৌছতে কোনো বাঁধা ছিল না। ১৪৫
এখানে আমরা হাব্বাব ইবনে মুনযিরের মধ্যে নববী শিক্ষার প্রভাব দেখতে পাই। নবীজির সামনে নিজের মতামত পেশ করার ক্ষেত্রে তার কথার আদব লক্ষণীয়। মতামত জানতে চাওয়া ছাড়াই তিনি নিজের পরিকল্পনা পেশ করার জন্য এগিয়ে এসেছিলেন। কিন্তু তার প্রথম প্রশ্ন ছিল, হে আল্লাহর রসূল! এই জায়গায় শিবির স্থাপন কি আল্লাহর ফয়সালা? আমাদের আগে বাড়া বা পেছনে হটার অনুমতি নেই এমন? নাকি এটা আপনার সিদ্ধান্ত? এই প্রশ্ন থেকে বোঝা যায় তিনি যথাযথভাবেই বুঝতেন কখন কোন বিষয়ে সেনাপতির সামনে কথা বলা যাবে, কোন বিষয়ে চুপ থাকতে হবে। যদি ওহীর সিদ্ধান্তেই এই জায়গা নির্ধারিত হয়ে থাকে, তাহলে এই সিদ্ধান্ত মাথা পেতে নিয়ে জীবন উৎসর্গ করাই উত্তম। আর যদি মানুষের সিদ্ধান্ত হয়, তাহলে তার কাছে একটি নতুন পরিকল্পনা আছে।
হাব্বাব ইবনে মুনযির আনুগত্যের মর্ম যথার্থভাবেই বুঝেছিলেন। তিনি জানতেন সর্বশ্রেষ্ঠ মহামানবের সাথে বিতর্ক, বাদানুবাদ অথবা তার সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে যাওয়ার সাথে পরামর্শ দেয়া বা নিজের মত ও ভাবনা পেশ করার পার্থক্য কী। একজন সাধারণ সৈনিক বা তার নিম্নপদস্থ একজন সেনাপতির কথা মেনে তার পরামর্শ অনুযায়ী নতুন জায়গায় শিবির স্থাপন করার এই ঘটনায় নববী নেতৃত্বের অনন্য বৈশিষ্ট্য প্রতিভাত হয়।
টিকাঃ
১৪০ সীরাতে ইবনে হিশাম (২/২২৮)
১৪১ মারওয়িয়াতি গাযওয়াতি বাদার, আহমদ বাওযীর (পৃ: ১০০)
১৪২ মুসলিম, কিতাবুল ইমারাহ (৩/১৫১০) (হাদিস: ১৯০১)
১৪৩ শরহুন নববী লিসহিহি মুসলিম (১৩/৪৫)
১৪৪ মারওয়িয়াতি গাযওয়াতি বাদর (পৃঃ ১৫৬) হাব্বাবের ঘটনা শক্তিশালী হয়ে এর অবস্থান হাসান পর্যন্ত পৌছে।
১৪৫ আত-তারীখুল ইসলামী লিলহুমায়দী (৪/১১০)
📄 কুরআনে মুশরিকদের বের হওয়ার বিবরণ
আল্লাহ বলেন,
وَلَا تَكُونُوا كَالَّذِينَ خَرَجُوا مِنْ دِيَارِهِمْ بَطَرًا وَرِئَاءَ النَّاسِ وَيَصُدُّونَ عَنْ سَبِيلِ اللَّهِ وَاللَّهُ بِمَا يَعْمَلُونَ مُحِيطٌ .
তোমরা তাদের মতো হয়ো না যারা দম্ভভরে ও লোক দেখানোর জন্য নিজেদের ঘর থেকে বের হয়েছিল এবং মানুষকে আল্লাহর পথ থেকে নিবৃত করে। তারা যা করে আল্লাহ তা ঘিরে আছেন।"১৪৬
এ আয়াতে আল্লাহ মু'মিনদের নিষেধ করেছেন কাফেরদের সাদৃশ্য অবলম্বন করতে; যারা তাদের বাড়ি ঘর থেকে দম্ভ প্রকাশ ও লোক দেখানোর জন্য বের হয়েছে। আল্লাহ এই আয়াতে কাফেরদের তিনটি বৈশিষ্ট্যের কথা উল্লেখ করেছেন। এক. দম্ভ দুই. লৌকিকতা তিন. আল্লাহর পথ থেকে মানুষকে নিবৃত করা। আমরা দেখতে পাই আল্লাহ তাআলা তাদের দম্ভের কথা বলার সময় ইসম বা বিশেষ্যপদ ব্যবহার করেছেন যা স্থিতি ও স্থায়িত্ব বোঝায়। আর তাদের আল্লাহর পথ থেকে বাঁধা দেয়ার কথা বলার সময় ফে'ল বা ক্রিয়াপদ ব্যবহার করেছেন যা নতুনত্ব ও সংঘটিত হওয়া বোঝায়।১৪৭
এই আয়াতের ব্যখ্যায় কুরতুবী তার তাফসীরে বলেছেন, আবু জেহেল এবং তার সাথে যারা তাদের ব্যবসায়িক কাফেলাকে সাহায্য করার জন্য বের হয়েছিল, তারা গায়িকা, বাদক এবং দাসী নিয়ে বের হয়েছিল। যখন তারা জুহফায় অবতরণ করলো, তখন আবু জেহেলের বন্ধু খুফাফ আল কিনানী কিছু উপহার উপঢৌকনসহ নিজের চাচাতো ভাইকে তার কাছে পাঠালো। সাথে এই বার্তাও পাঠালো যে, যদি তুমি চাও তাহলে আমি তোমাকে সৈন্য দিয়ে সাহায্য করতে পারি অথবা তুমি চাইলে আমার গোত্রের কয়েকজন লোক নিয়ে আমি নিজেই তোমার সাহায্যের জন্য রওয়ানা হবো। আবু জেহেল উত্তরে বললো, যদি আমরা আল্লাহর বিরুদ্ধে যুদ্ধে অবতীর্ণ হয়ে থাকি যেমন মুহাম্মাদ দাবি করে, তাহলে আল্লাহর কসম! আল্লাহর বিরুদ্ধে লড়াই করার শক্তি আমাদের নেই। আর যদি মানুষের বিরুদ্ধে যুদ্ধে অবতীর্ণ হয়ে থাকি, তাহলে মানুষের সাথে লড়াই করার শক্তি আমাদের আছে। আল্লাহর কসম! বদরে অবতরণ না করে আমরা ফিরবো না। আমরা সেখানে মদ পান করবো। দাসদাসীরা বাদ্য বাজাবে, গান গাইবে। বদর আরবের অন্যতম মেলা ও বাজার। আরবরা আমাদের সৈন্য মহড়ার সংবাদ জানতে পারবে। আমাদের প্রতাপ এবং ভয় তাদের মনে চিরদিনের মতো গেঁথে যাবে।
এরপর তারা বদরে শিবিরস্থাপন করে এবং যা ঘটার ছিল তাই ঘটে। তারা ধ্বংস হয়ে যায়। ১৪৮
টিকাঃ
১৪৬ সূরা আনফাল (আয়াত: ৪৭)
১৪৭ হাদীসুল কুরআন আন গাযাওয়াতির রসূল (১/৬৫, ৬৬)
১৪৮ তাফসীরে কুরতুবী (৮/২৫)
📄 বদরে আসার পর মুশরিকদের অবস্থা
আল্লাহ তাআলা বলেন,
إِنْ تَسْتَفْتِحُوا فَقَدْ جَاءَكُمُ الْفَتْحُ وَإِنْ تَنْتَهُوا فَهُوَ خَيْرٌ لَكُمْ وَإِنْ تَعُودُوا نَعُدْ وَلَنْ تُغْنِيَ عَنْكُمْ فِئَتُكُمْ شَيْئًا وَلَوْ كَثُرَتْ وَأَنَّ اللَّهَ مَعَ الْمُؤْمِنِينَ
তোমরা মিমাংসা চেয়েছিলে, তা তো তোমাদের কাছে এসেছে; যদি তোমরা বিরত হও তবে তা তোমাদের জন্য কল্যাণকর; যদি তোমরা আবার করো তাহলে আমি তোমাদের আবার শাস্তি দেবো এবং তোমাদের দল সংখ্যায় অধিক হলেও তোমাদের কোনো কাজে আসবে না, এবং নিশ্চই আল্লাহ মু'মিনদের সাথে আছেন। ১৪৯
ইমাম আহমদ আব্দুল্লাহ ইবনে সা'লাবা থেকে বর্ণনা করেন, আবু জেহেল যখন বদরে মুসলমানদের মুখোমুখী হলো, সে বলেছিল, হে আল্লাহ আমাদের মধ্যে যে আত্মীয়তার বন্ধন ছিন্ন করেছে এবং আমাদের কাছে নতুন জিনিস উপস্থিত করেছে, আজ তাকে ধ্বংস করো। আবু জেহেলই ওপরের আয়াতে উল্লেখিত 'মিমাংসা'র জন্য দোআ করেছিল। ১৫০
যখন মক্কার সেনাদল বদরে পৌঁছলো, তখন তাদের মধ্যে বিরোধ দেখা দিলো। তাদের ঐক্য নড়বড়ে হয়ে গেলো। ইবনে আব্বাস বলেন, যখন মুসলমানরা শিবির স্থাপন করলেন এবং মুশরিকরাও এগিয়ে এলো, তখন রসূল সা. লাল উটে বসা উতবা ইবনে রাবীআর দিকে তাকিয়ে বললেন, যদি কুরায়েশের কারো মধ্যে কল্যাণ থাকে তাহলে এই লাল উটে বসা ব্যক্তির মধ্যে আছে। যদি কুরায়েশ তার অনুসরণ করে তাহলে সঠিক পথ পাবে। উতবা কাফেরদের বলছিলেন, লোকসকল! এই লোকদের ব্যাপারে আমার সিদ্ধান্ত মেনে নাও। যদি তোমরা তাই করো যা করতে উদ্যত হয়েছো, তাহলে এর প্রভাব তোমাদের অন্তরে থেকে যাবে। তোমরা এই যুদ্ধের পর পরস্পরের দিকে তাকিয়ে নিজেদের ভাই ও বাবার হত্যাকারীকে দেখতে পাবে। তাই তোমরা সব দায় আমার ওপর চাপিয়ে ফিরে চলো। আবু জেহেল তাকে বললো, আল্লাহর কসম! তুমি কাপুরুষ! মুহাম্মাদ ও তার সঙ্গীদের দেখে ভয়ে কাবু হয়ে গেছো। যদি আমরা মুখোমুখী হই, তাহলে মুহাম্মাদ ও তার সঙ্গীদের হত্যা করা পশুহত্যার চেয়ে কঠিন হবে না। উতবা বললো, তুমি অচিরেই জানতে পারবে কে কাপুরুষ এবং কে তার কওমের জন্য বেশি ক্ষতিকর। আমি এমন একটি দলকে দেখতে পাচ্ছি যারা তোমাদের ওপর তীব্র আঘাত হানবে। তোমরা কি দেখতে পাচ্ছো না তাদের মাথাগুলো বিষধর সাপের মতো আর চেহারাগুলো তরবারির মতো... ১৫১
হাকিম ইবনে হিযাম তখনও ইসলাম গ্রহণ করেননি। বদরে তিনি মুশরিকদের বাহিনীতে ছিলেন। তিনি বলেন, আমরা মক্কা থেকে বের হলাম এবং ওই ময়দানে শিবির স্থাপন করলাম, যে ময়দানের কথা আল্লাহ উল্লেখ করেছেন। আমি উতবা ইবনে রাবীআর কাছে গিয়ে বললাম, হে আবু ওলীদ তুমি কি আজকের মতো মর্যাদা নিয়ে মক্কায় ফিরতে চাও?
সে বললো, আমি কী করবো? আমি বললাম তোমরা মুহাম্মাদের কাছে ইবনে হাযরামির রক্তের বদলাই তো চাও। ১৫২ সে তোমাদের মিত্র ছিল। তুমি তার রক্তপণ আদায় করার দায়িত্ব নাও এবং বাহিনী নিয়ে ফিরে চলো। উতবা বললো, তুমি সবাইকে রাজি করাও, আমি তার রক্তপণের দায়িত্ব নিতে প্রস্তুত। তুমি ইবনুল হানযালিয়্যা অর্থাৎ আবু জেহেলের কাছে যাও।১৫৩ তাকে বলো, তুমি কি তোমার চাচাতো ভাইয়ের সাথে যুদ্ধ বাদ দিয়ে সঙ্গীদের নিয়ে মক্কায় ফিরতে চাও?
আমি তার কাছে গেলাম। তিনি বড় একটি দলের মাঝে বসে ছিলেন। ইবনুল হাযরামী'১৪ তার পাশে দাঁড়িয়ে ছিল এবং সে বলছিল, আমি আবদে শামসের সাথে আমার চুক্তি ভঙ্গ করলাম এবং বনী মখযুমের সাথে চুক্তিবদ্ধ হলাম। আমি তাকে বললাম, তোমাকে উতবা ইবনে রাবীআ বলেছে, তুমি কি তোমার চাচাতো ভাইয়ের সাথে যুদ্ধ বাদ দিয়ে সঙ্গীদের নিয়ে মক্কায় ফিরতে চাও? সে বললো, উতবা কি দূত হিসেবে পাঠানোর জন্য তোমাকে ছাড়া আর কাউকে পেলো না? আমি বললাম, না, আর আমিও অন্য কারো দূত হতে প্রস্তুত নই।
হাকীম বলেন, এরপর আমি দ্রুত উতবার কাছে গেলাম। যেন কোনো সংবাদ আমি হারিয়ে না ফেলি। ১৫৫
উতবা ইবনে রাবীআ মনে করতেন মুহাম্মাদের সাথে যুদ্ধের কোনো যুক্তি নেই। মুহাম্মাদকে তার অবস্থায় ছেড়ে দেয়ার আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেছিলেন, যদি তার দাওয়াত সত্য হয় তাহলে তার সম্মান হবে কুরায়েশেরই সম্মান, তার সম্রাজ্য হবে কুরায়েশেরই সম্রাজ্য। কুরায়েশই হবে তার কারণে সবচেয়ে বেশি সৌভাগ্যবান। আর যদি সে মিথ্যাবাদী হয়, তাহলে আরবের গোত্রগুলোর সাথে অচিরেই তার যুদ্ধ বাধবে এবং সে নিঃশেষ হয়ে যাবে।
কিন্তু জাহেলিয়াতের অহমিকা কখনোই হককে স্পন্দনশীল রাখতে চায় না। কারণ সে জানে, হকের বিজয় মানে জাহেলিয়াতের বিলুপ্তি এবং জাহেলিয়াতের জায়গায় হকের অস্তিত্বলাভ। ১৫৬
উমায়ের ইবনে ওহাব জামহীকে কুরায়েশ পাঠিয়েছিল মুহাম্মাদের সঙ্গীদের সংখ্যা অনুমান করতে। সে সেনাবাহিনীর চারপাশে ঘুরে তাদের কাছে ফিরে এসে বললো, তিনশ'র কিছু বেশি বা কম সৈন্য আছে ওই বাহিনীতে। কিন্তু আমাকে আরও কিছু সময় দাও আমি দেখি তাদের পেছনে কোনো সহযোগী দল বা গোপন বাহিনী আছে কি না। সে উপত্যকার দিকে বহুদূর পর্যন্ত গিয়েও কিছু দেখতে পেলো না। ফিরে এসে সে বললো, আমি কোনো সাহায্যকারী বাহিনী বা গোপন বাহিনীর আলামত দেখিনি। তবে আমি দেখেছি হে কুরায়েশ! এই বাহিনী বিপদ ও মৃত্যু বহন করছে। ইয়াসরিবের পানিবাহী উটগুলো মৃত্যু বহন করে এনেছে। তারা এমন একটি দল যাদের কাছে তাদের তরবারি ছাড়া আশ্রয় নেয়ার কোনো জায়গা নেই। আল্লাহর কসম! তাদের একেকজন তোমাদের একজনকে হত্যা না করে নিহত হবে না। যদি তারা তোমাদের অনেককে মেরে ফেলে, এর পর বেঁচে থাকার আর কী আনন্দ বাকি থাকবে! তাই কী করতে যাচ্ছো ভেবে সিদ্ধান্ত নাও। ১৫৭
কুরায়েশের আরেক নেতা উমাইয়া ইবনে খালাফ প্রথমে মৃত্যুভয়ে মক্কা থেকে বের হতেই রাজি ছিল না। আবু জেহেল তার কাছে গিয়ে বললো, হে আবু সাফওয়ান! যখন মানুষ দেখবে তুমি পিছিয়ে পড়েছো অথচ তুমি কওমের নেতা তখন তারাও তোমার সাথে পেছনে রয়ে যাবে। আবু জেহেল তাকে পীড়াপীড়ি করতেই থাকলো। অবশেষে সে বলে উঠলো, তুমি যখন আমাকে বাধ্য করেছো, তাহলে আল্লাহর কসম! আমি মক্কার সবচেয়ে উন্নত উট ক্রয় করবো। তারপর উমাইয়া ঘরে গিয়ে বললো, হে উম্মে সাফওয়ান! আমার যাত্রার জিনিসপত্র তৈরি করো। উম্মে সাফওয়ান বললো, তুমি ভুলে গেছো তোমার ইয়াসরাবী বন্ধু কী বলেছিল? তিনি মনে করিয়ে দিতে চাচ্ছিলেন যে সা'দ বলেছিলেন, আমি রসূল সা.-কে বলতে শুনেছি তারা তোমাকে হত্যা করবে। ১৫৮ সে বললো, আমি তাদের সাথে অল্প কিছু দূর যাবো। যাত্রাপথে উমাইয়া প্রতিটি মনযিলেই উট বেঁধে রাখতো। কিন্তু তার আর ফেরা হয়নি। সে বদরে পৌঁছে যায় এবং নিহত হয়। ১৫৯
আরেকটি বর্ণনায় আছে আবু জেহেল উকবা ইবনে মুআইতকে উমাইয়ার পেছনে লাগিয়ে দিয়েছিল। উকবা তার সামনে একটি ধূপদানি এনে রাখলো এবং বললো, তুমি তো নারী। তখন উমাইয়া বললো, আল্লাহ তোমাকে কুৎসিত বানাক! ১৬০
সুতরাং মক্কার সেনাবাহিনীর মনোবল ছিল ভেতর থেকে নড়বড়ে। যদিও প্রকাশ্যে তাদেরকে খুব শক্তিশালী এবং দৃঢ় মনে হচ্ছিলো। কিন্তু তাদের ভেতরে বাসা বেঁধেছিল ভীতি ও সংশয়। ১৬১
আতেকা বিনতে আব্দুল মুত্তালিবের স্বপ্নও মক্কাবাসীর মনোবল দুর্বল করে দিয়েছিল। তিনি স্বপ্নে দেখেছিলেন, এক ব্যক্তি কুরায়েশকে আহ্বান জানালো এবং আবু কুবাইস পর্বতশীর্ষ থেকে একটি পাথর নিক্ষেপ করলো। সেই পাথরটি টুকরো টুকরো হয়ে কুরায়েশের প্রত্যেকটি ঘরে ঢুকে গেলো। এই স্বপ্নটি আব্বাস ও আবু জেহেলের মধ্যে দ্বন্দ্ব উস্কে দিয়েছিল। এর মধ্যেই যামযাম এলো এবং তাদেরকে কাফেলার সংবাদ দিলো। তখন মক্কার মানুষ এটাকেই স্বপ্নের তাবীর ধরে নিলো। ১৬২
যখন কুরায়েশ জাহফায় অবতরণ করলো, তখন জুহাইম ইবনে সালত ইবনে আবদে মানাফও একটি স্বপ্ন দেখেছিল। সে দেখলো, এক ঘোড়সওয়ার এগিয়ে এসে থেমে গেলো। তার সাথে একটি উট। সে বললো, উতবা ইবনে রাবীআ, শাইবা ইবনে রাবীআ, আবুল হাকাম ইবনে হিশাম, উমাইয়া ইবনে খালাফ নিহত হবে এবং কুরায়েশের আরও অনেক সম্ভ্রান্ত ব্যক্তির নাম উল্লেখ করে সে বললো, তারা সবাই নিহত হবে। তারপর সে উটের গলায় আঘাত করলো। তারপর উটটিকে বাহিনীর ভেতরে পাঠিয়ে দিলো। বাহিনীর সব তাবুতেই তার রক্তের ছিটা লাগলো। এই স্বপ্নের সংবাদ আবু জেহেলের কাছে পৌঁছলে সে বললো, এ তো বনী মুত্তালিব গোত্রের আরেকজন নবী। যদি আমাদের মোকাবেলা হয়, আগামীকালই সে জানতে পারবে কে নিহত হবে। ১৬৩
এই স্বপ্নও কুরায়েশের মনোবল দুর্বল করার ক্ষেত্রে ভূমিকা রেখেছিল।
টিকাঃ
১৪৯ সূরা আনফাল (আয়াত: ১৯)
১৫০ আল মুসনাদ (৫/৪৩১)
১৫১ মাজমাউয যাওয়ায়েদ (৬/৭৬) তিনি বলেছেন, বাযযার এটি বর্ণনা করেছেন এবং এর রাবীগণ সিকা
১৪২ আব্দুল্লাহ ইবনে জাহাশের সারিয়্যার ঘটনায় তার বর্ণনা গেছে।
১৫৩ আবু জেহেলের অপর নাম। হানযালিয়্যা বনু তামীমের আসমা ইবনে মাখরাবা।
১৫৪ এখানে উদ্দেশ্য আমের; পূর্ববর্ণিত আমরের ভাই।
১৫৫ সীরাতে ইবনে হিশাম (২/২৩৪, ২৩৫)
১৫৬ মারওয়িয়াতি গাযওয়াতি বদর (পৃ: ১৫৫)
১৫৭ ফাতহুল বারী (৭/২৩৮)
১৫৮ ফাতহুল বারী (৭/২৩৮)
১৫৯ মারওয়িয়াতু গাযওয়াতি বাদার (পৃ: ১৩৬)
১৬০ মারওয়িয়াতু গাযওয়াতি বাদার (পৃ: ১৩৭)
১৬১ মারওয়িয়াতু গাযওয়াতি বাদার (পৃ: ১৩৮)
১৬২ আল মুজতামাউল মাদানী ফি আসরি নাবাবীয়্যাহ লিলউমরী (পৃ: ৪১)
১৬৩ সীরাতে ইবনে হিশাম (২/২৩০)