📄 যুদ্ধ প্রশিক্ষণ
রসূল সা. উম্মতের পুরুষ, নারী, শিশু, যুবক ও বৃদ্ধসহ কর্মক্ষম সব শক্তিকে যুদ্ধের জন্য প্রস্তুত করার চেষ্টা করেছিলেন। তরবারি চালনা, বর্শা নিক্ষেপ, তীর ছোঁড়া ঘোড় দৌড় সহ তৎকালীন সব যুদ্ধ কৌশলেই দক্ষতা অর্জনের উৎসাহ দিতেন তিনি। রসূল সা. একই সাথে তার বাহিনীকে আত্মিক ও দৈহিকভাবে শক্তিশালী করে তুলেছিলেন। তাদের মনে উদগত করেছিলেন বিজয় অথবা জান্নাত প্রাপ্তির আকাঙ্খা। রসূল সা. তীর চালনার কৌশল শিখে ভুলে যাওয়াকে অপরাধ সাব্যস্ত করেছিলেন। রসূল সা. বলেন, যে ব্যক্তি তীর চালনা শিখেছে এবং ছেড়ে দিয়েছে সে আমাদের অন্তর্ভুক্ত নয় অথবা সে অবাধ্য হয়েছে।১৮ এটা যুবক-বৃদ্ধসহ পুরো উম্মতের প্রতিই নির্দেশ যে, তারা যেন যুদ্ধের মহড়া বা চর্চার মাধ্যমে নিজেদের দক্ষতাকে শাণিত রাখে। লক্ষবস্তুর উপর আঘাত ও তীর ছোঁড়ার কৌশল ভুলে না যায়। ইসলাম মুসলমানদের পুরো জনসংখ্যার শক্তিকেই গুরুত্বপূর্ণ বিবেচনা করেছে এবং তাদেরকে দক্ষ ও সাহসী করে তুলতে চেয়েছ।
রসূল সা. সব অবস্থায় সব জায়গায় যুদ্ধ-প্রস্ততির ওপর গুরুত্বারোপ করতেন। যুদ্ধের সব কৌশল শিখতে বলতেন। রসূল সা.-এর একটি উক্তি আছে, তোমরা সাধ্যানুযায়ী শক্তি প্রস্তুত রাখো, জেনে রেখো! নিক্ষেপ শক্তি, নিক্ষেপ শক্তি, নিক্ষেপ শক্তি। ১৯
টিকাঃ
* মুসলিম, কিতাবুল ইমারাহ, বাবু ফাযলির রাময়ি ওয়াল হাসসি আলাইহি (৩/১০২৩) (হাদিস: ১৯১৯)
* মুসলিম, কিতাবুল ইমারাহ, বাবু ফাযলির রাময়ি ওয়াল হাসসি আলাইহি (হাদিস: ১৯১৭)
📄 জিহাদ ফি সাবিলিল্লার লক্ষ্য
১. বিশ্বাসের স্বাধীনতা রক্ষা করা
আল্লাহ তাআলা বলেন,
وَقَاتِلُوهُمْ حَتَّى لَا تَكُونَ فِتْنَةٌ وَيَكُونَ الدِّينُ كُلُّهُ لِلَّهِ فَإِنِ انْتَهَوْا فَإِنَّ اللَّهَ بِمَا يَعْمَلُونَ بَصِيرٌ وَإِنْ تَوَلَّوْا فَاعْلَمُوا أَنَّ اللَّهَ مَوْلَاكُمْ نِعْمَ الْمَوْلَى وَنِعْمَ النَّصِيرُ
এবং তোমরা তাদের বিরুদ্ধে সংগ্রাম করতে থাকবে যতক্ষণ না ফেতনা দূরীভূত হয় এবং আল্লাহর দীন সামগ্রিকভাবে প্রতিষ্ঠিত হয় এবং যদি তারা বিরত হয় তবে তারা যা করে আল্লাহ তো তার সম্যক দ্রষ্টা। যদি তারা মুখ ফিরিয়ে নেয় তবে জেনে রাখো আল্লাহই তোমাদের অভিভাবক; কত উত্তম অভিভাবক এবং কত উত্তম সাহায্যকারী। ২০
২. ইসলামের প্রতীক ও ইবাদত রক্ষা করা
আল্লাহ তাআলা বলেন,
إِنَّ اللَّهَ يُدَافِعُ عَنِ الَّذِينَ آمَنُوا إِنَّ اللَّهَ لَا يُحِبُّ كُلَّ خَوَّانٍ كَفُورِ أُذِنَ لِلَّذِينَ يُقَاتَلُونَ بِأَنَّهُمْ ظُلِمُوا وَإِنَّ اللَّهَ عَلَى نَصْرِهِمْ لَقَدِيرُ الَّذِينَ أُخْرِجُوا مِنْ دِيَارِهِمْ بِغَيْرِ حَقَّ إِلَّا أَنْ يَقُولُوا رَبُّنَا اللَّهُ وَلَوْلَا دَفْعُ اللَّهِ النَّاسَ بَعْضَهُمْ بِبَعْضٍ لَهُدِّمَتْ صَوَامِعُ وَبِيَعٌ وَصَلَوَاتٌ وَمَسَاجِدُ يُذْكَرُ فِيهَا اسْمُ اللَّهِ كَثِيرًا وَلَيَنْصُرَنَّ اللَّهُ مَنْ يَنْصُرُهُ إِنَّ اللَّهَ لَقَوِيٌّ عَزِيزُ الَّذِينَ إِنْ مَكَّنَّاهُمْ فِي الْأَرْضِ أَقَامُوا الصَّلَاةَ وَآتَوُا الزَّكَاةَ وَأَمَرُوا بِالْمَعْرُوفِ وَنَهَوْا عَنِ الْمُنْكَرِ وَلِلَّهِ عَاقِبَةُ الْأُمُورِ
নিশ্চয় আল্লাহ মুমিনদেরকে রক্ষা করেন এবং কোনো বিশ্বাসঘাতক, অকৃতজ্ঞকে পছন্দ করেন না। যুদ্ধের অনুমতি দেয়া হল তাদেরকে, যাদেরকে আক্রমণ করা হচ্ছে। কারণ তাদের ওপর নির্যাতন করা হয়েছে। নিশ্চয় আল্লাহ তাদেরকে বিজয় দানে সক্ষম। যাদেরকে তাদের নিজ বাড়ী-ঘর থেকে অন্যায়ভাবে শুধু এ কারণে বের করে দেয়া হয়েছে যে, তারা বলে, আমাদের রব আল্লাহ আর আল্লাহ যদি মানবজাতির একদলকে অপর দল দ্বারা দমন না করতেন, তবে বিধ্বস্ত হয়ে যেত খৃস্টান সন্ন্যাসীদের আশ্রম, গির্জা, ইয়াহূদীদের উপাসনালয় ও মসজিদসমূহ- যেখানে আল্লাহর নাম অধিক স্মরণ করা হয়। আর আল্লাহ অবশ্যই তাকে সাহায্য করেন, যে তাকে সাহায্য করে। নিশ্চয় আল্লাহ শক্তিমান, পরাক্রমশালী। তারা এমন যাদেরকে আমি যমীনে ক্ষমতা দান করলে তারা সালাত কায়েম করবে, যাকাত দেবে এবং সৎকাজের আদেশ দেবে ও অসৎকাজ থেকে নিষেধ করবে; আর সব কাজের পরিণাম আল্লাহরই অধিকারে।
৩. পৃথিবী থেকে বিশৃংখলা নির্মূল করা
وَلَمَّا بَرَزُوا لِجَالُوتَ وَجُنُودِهِ قَالُوا رَبَّنَا أَفْرِغْ عَلَيْنَا صَبْرًا وَثَبِّتْ أَقْدَامَنَا وَانْصُرْنَا عَلَى الْقَوْمِ الْكَافِرِينَ فَهَزَمُوهُمْ بِإِذْنِ اللَّهِ وَقَتَلَ دَاوُودُ جَالُوتَ وَآتَاهُ اللهُ الْمُلْكَ وَالْحِكْمَةَ وَعَلَّمَهُ مِمَّا يَشَاءُ وَلَوْلَا دَفْعُ اللَّهِ النَّاسَ بَعْضَهُمْ بِبَعْضٍ لَفَسَدَتِ الْأَرْضُ وَلَكِنَّ اللَّهَ ذُو فَضْلٍ عَلَى الْعَالَمِينَ تِلْكَ آيَاتُ اللَّهِ نَتْلُوهَا عَلَيْكَ بِالْحَقِّ وَإِنَّكَ لَمِنَ الْمُرْسَلِينَ
আর যখন তারা জালুত ও তার সৈন্যবাহিনীর মুখোমুখি হলো, তখন তারা বললো, 'হে আমাদের রব, আমাদের ওপর ধৈর্য ঢেলে দিন, আমাদের পা স্থির রাখুন এবং আমাদেরকে কাফের জাতির বিরুদ্ধে সাহায্য করুন'। অতঃপর তারা আল্লাহর হুকুমে তাদেরকে পরাজিত করলো এবং দাউদ জালূতকে হত্যা করলো। আর আল্লাহ দাউদকে রাজত্ব ও প্রজ্ঞা দান করলেন এবং তাকে যা ইচ্ছা শিক্ষা দিলেন। আর আল্লাহ যদি মানুষের কতককে কতকের দ্বারা প্রতিহত না করতেন, তবে অবশ্যই যমীন ফাসাদপূর্ণ হয়ে যেতো। কিন্তু আল্লাহ বিশ্ববাসীর ওপর অনুগ্রহশীল। এগুলো আল্লাহর আয়াত, যা আমি তোমার ওপর যথাযথভাবে তিলাওয়াত করি। আর নিশ্চয় তুমি রসূলগণের অন্তর্ভুক্ত।২১
ইবনে কাসির তার তাফসিরে বলেন, 'আর আল্লাহ যদি মানুষের কতককে কতকের দ্বারা প্রতিহত না করতেন, তবে অবশ্যই যমীন ফাসাদপূর্ণ হয়ে যেত।' আল্লাহর এই কথার অর্থ হলো, যদি আল্লাহ এক জাতিকে অন্য জাতি দ্বারা প্রতিহত না করতেন যেমন আল্লাহ বনী ইসরাইলকে তালুতের যুদ্ধ ও দাউদের বীরত্বের মাধ্যমে রক্ষা করেছেন, না হয় তারা ধ্বংস হয়ে যেতো।২২
৪. পরীক্ষা, শিক্ষা ও সংশোধন
আল্লাহ বলেন,
فَإِذَا لَقِيتُمُ الَّذِينَ كَفَرُوا فَضَرْبَ الرِّقَابِ حَتَّى إِذَا أَثْخَنْتُمُوهُمْ فَشُدُّوا الْوَثَاقَ فَإِمَّا مَنَّا بَعْدُ وَإِمَّا فِدَاءً حَتَّى تَضَعَ الْحَرْبُ أَوْزَارَهَا ذَلِكَ وَلَوْ يَشَاءُ اللهُ لَانْتَصَرَ مِنْهُمْ وَلَكِنْ لِيَبْلُوَ بَعْضَكُمْ بِبَعْضٍ وَالَّذِينَ قُتِلُوا فِي سَبِيلِ اللَّهِ فَلَنْ يُضِلَّ أَعْمَالَهُمْ سَيَهْدِيهِمْ وَيُصْلِحُ بَالَهُمْ وَيُدْخِلُهُمُ الْجَنَّةَ عَرَّفَهَا لَهُمْ
অতএব তোমরা যখন কাফেরদের সাথে যুদ্ধে অবতীর্ণ হও, তখন তাদের ঘাড়ে আঘাত কর। পরিশেষে তোমরা যখন তাদেরকে সম্পূর্ণরূপে পর্যুদস্ত করবে তখন তাদেরকে শক্তভাবে বেঁধে নাও। তারপর হয় অনুগ্রহ না হয় মুক্তিপণ আদায়, যতক্ষণ না যুদ্ধ তার অস্ত্র নমিয়ে ফেলে। এটাই বিধান। আর আল্লাহ ইচ্ছা করলে তাদের কাছ থেকে প্রতিশোধ গ্রহণ করতে পারতেন, কিন্তু তিনি তোমাদের একজনকে অন্যের দ্বারা পরীক্ষা করতে চান। আর যারা আল্লাহর পথে নিহত হয় তিনি কখনো তাদের আমলসমূহ বিনষ্ট করবেন না। অচিরেই তিনি তাদেরকে হেদায়াত দিবেন এবং তাদের অবস্থা সংশোধন করে দিবেন। আর তিনি তাদেরকে জান্নাতে প্রবেশ করাবেন, যার পরিচয় তিনি তাদেরকে দিয়েছেন।২৩
'কিন্তু তিনি তোমাদের একজনকে অন্যের দ্বারা পরীক্ষা করতে চান' এই আয়াতের ব্যখ্যায় ইবনে কাসির বলেন, অর্থাৎ কিন্তু তোমাদের জন্য জিহাদকে বিধিবদ্ধ করা হয়েছে তোমাদের পরীক্ষা করার জন্য।২৪ যেমন আল্লাহ অন্য আয়াতে জিহাদের বিধিবদ্ধ করার হেকমত বর্ণনা করতে গিয়ে বলেন,
أَمْ حَسِبْتُمْ أَنْ تَدْخُلُوا الْجَنَّةَ وَلَمَّا يَعْلَمِ اللَّهُ الَّذِينَ جَاهَدُوا مِنْكُمْ وَيَعْلَمَ الصَّابِرِينَ
তোমরা কি মনে কর যে, তোমরা জান্নাতে প্রবেশ করবে? অথচ আল্লাহ এখনো জানেননি তাদেরকে যারা তোমাদের মধ্য থেকে জিহাদ করেছে এবং জানেননি ধৈর্যশীলদেরকে। ২৫
৫. কাফেরদের ভীতিপ্রদর্শন এবং তাদের পরাজিত ও অপদস্থ করা
وَأَعِدُّوا لَهُمْ مَا اسْتَطَعْتُمْ مِنْ قُوَّةٍ وَمِنْ رِبَاطِ الْخَيْلِ تُرْهِبُونَ بِهِ عَدُوَّ اللَّهِ وَعَدُوَّكُمْ وَآخَرِينَ مِنْ دُونِهِمْ لَا تَعْلَمُونَهُمُ اللَّهُ يَعْلَمُهُمْ وَمَا تُنْفِقُوا مِنْ شَيْءٍ فِي سَبِيلِ اللَّهِ يُوَفَّ إِلَيْكُمْ وَأَنْتُمْ لَا تُظْلَمُونَ
তোমরা তাদের মোকাবেলার জন্য যথাসাধ্য শক্তি অশ্ববাহিনী প্রস্তুত রাখবে। এগুলো দিয়ে তোমরা সন্ত্রস্ত করবে আল্লাহর শত্রুকে, তোমাদের শত্রুকে এবং অন্যদেরকে যাদেরকে তোমরা জানো না, আল্লাহ তাদেরকে জানেন। আল্লাহর পথে তোমরা যা কিছু ব্যায় করবে তার পূর্ণ প্রতিদান তোমাদেরকে দেওয়া হবে এবং তোমাদের প্রতি জুলুম করা হবে না। ২৬
আল্লাহ আরও বলেন,
قَاتِلُوهُمْ يُعَذِّبْهُمُ اللَّهُ بِأَيْدِيكُمْ وَيُخْزِهِمْ وَيَنْصُرْكُمْ عَلَيْهِمْ وَيَشْفِ صُدُورَ قَوْمٍ مُؤْمِنِينَ وَيُذْهِبْ غَيْظَ قُلُوبِهِمْ وَيَتُوبُ اللَّهُ عَلَى مَنْ يَشَاءُ وَاللَّهُ عَلِيمٌ حَكِيمٌ
তোমরা তাদের সাথে লড়াই কর, আল্লাহ তোমাদের হাতে তাদেরকে আযাব দেবেন এবং তাদেরকে অপদস্থ করবেন, আর তোমাদেরকে তাদের বিরুদ্ধে সাহায্য করবেন এবং মুমিন কওমের অন্তরসমূহকে চিন্তামুক্ত করবেন। আর তাদের অন্তরসমূহের ক্রোধ দূর করবেন এবং আল্লাহ যাকে চান তার তাওবা কবুল করেন। আর আল্লাহ মহাজ্ঞানী, প্রজ্ঞাময়। ২৭
আল্লাহ আরও বলেন,
فَلَمْ تَقْتُلُوهُمْ وَلَكِنَّ اللَّهَ قَتَلَهُمْ وَمَا رَمَيْتَ إِذْ رَمَيْتَ وَلَكِنَّ اللَّهَ رَمَى وَلِيُبْلِيَ الْمُؤْمِنِينَ مِنْهُ بَلَاءً حَسَنًا إِنَّ اللَّهَ سَمِيعٌ عَلِيمٌ ذَلِكُمْ وَأَنَّ اللَّهَ مُوهِنُ كَيْدِ الْكَافِرِينَ
সুতরাং তোমরা তাদেরকে হত্যা করনি বরং আল্লাহই তাদেরকে হত্যা করেছেন। আর তুমি নিক্ষেপ করনি যখন তুমি নিক্ষেপ করেছিলে; বরং আল্লাহই নিক্ষেপ করেছেন এবং যাতে তিনি তাঁর পক্ষ থেকে মুমিনদেরকে পরীক্ষা করেন উত্তম পরীক্ষা। নিশ্চয় আল্লাহ সর্বশ্রোতা, সর্বজ্ঞ। এই হল ঘটনা এবং নিশ্চয় আল্লাহ কাফেরদের ষড়যন্ত্র দুর্বল করে দেন। ২৮
৬. মুনাফেকদের চিহ্নিত করা
আল্লাহ বলেন,
مَا كَانَ اللَّهُ لِيَذَرَ الْمُؤْمِنِينَ عَلَى مَا أَنْتُمْ عَلَيْهِ حَتَّى يَمِيزَ الْخَبِيثَ مِنَ الطَّيِّبِ وَمَا كَانَ اللَّهُ لِيُطْلِعَكُمْ عَلَى الْغَيْبِ وَلَكِنَّ اللَّهَ يَجْتَبِي مِنْ رُسُلِهِ مَنْ يَشَاءُ فَآمِنُوا بِاللَّهِ وَرُسُلِهِ وَإِنْ تُؤْمِنُوا وَتَتَّقُوا فَلَكُمْ أَجْرٌ عَظِيمٌ
আল্লাহ এমন নন যে, তিনি মুমিনদেরকে (এমন অবস্থায়) ছেড়ে দেবেন যার উপর তোমরা আছ। যতক্ষণ না তিনি পৃথক করবেন অপবিত্রকে পবিত্র থেকে। আর আল্লাহ এমন নন যে, তিনি তোমাদেরকে গায়েব সম্পর্কে জানাবেন। তবে আল্লাহ তাঁর রসূলদের মধ্য থেকে যাকে চান বেছে নেন। সুতরাং তোমরা আল্লাহ ও তাঁর রসূলের প্রতি ঈমান আনো। আর যদি তোমরা ঈমান আন এবং তাকওয়া অবলম্বন কর তবে তোমাদের জন্য রয়েছে মহাপ্রতিদান। ২৯
ইবনে কাসির বলেন, এমন কোনো পরীক্ষা থাকা অপরিহার্য যার মাধ্যমে বন্ধু ও শত্রু চেনা যাবে। নিষ্ঠাবান মুমিন এবং নাফরমান মুনাফেকের প্রকৃত চেহারা প্রকাশিত হবে। ওহুদ যুদ্ধের দিন আল্লাহ মুসলমানদের পরীক্ষা করেছেন। সত্যিকার ঈমানদারদের ঈমান, ধৈর্য, দৃঢ়তা ও আল্লাহ ও তার রসূলের প্রতি তাদের আনুগত্য প্রমাণিত হয়েছে এবং মুনাফেকদের মুখোশ ছিড়ে গেছে। তাদের অবাধ্যতা, জিহাদের প্রতি অনাগ্রহ এবং আল্লাহ ও তার রসূলের সাথে তাদের ধোঁকাবাজি সবার সামনে স্পষ্ট হয়ে গেছে। ৩০
৭. পৃথিবীতে আল্লাহর বিধান ও ইসলামী শাসনব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করা
পৃথিবীতে আল্লাহর বিধান প্রতিষ্ঠা করা জিহাদের অন্যতম লক্ষ্য। আল্লাহ তাআলা বলেন,
إِنَّا أَنْزَلْنَا إِلَيْكَ الْكِتَابَ بِالْحَقِّ لِتَحْكُمَ بَيْنَ النَّاسِ بِمَا أَرَاكَ اللَّهُ وَلَا تَكُنْ لِلْخَائِنِينَ خَصِيمًا
নিশ্চয় আমি তোমার প্রতি যথাযথভাবে কিতাব নাযিল করেছি, যাতে তুমি মানুষের মধ্যে ফয়সালা কর সে অনুযায়ী যা আল্লাহ তোমাকে দেখিয়েছেন। আর তুমি খেয়ানতকারীদের পক্ষে বিতর্ককারী হয়ো না। ৩১
৮. কাফেরদের শত্রুতা প্রতিহত করা
জিহাদের আরেকটি লক্ষ্য কাফেরদের শত্রুতা প্রতিহত করা। এটা কয়েক ধরণের হতে পারে,
ক. অমুসলিম শাসিত দেশে মুসলমানদের ওপর কাফেরদের জুলুম
যদি কোনো অমুসলিম শাসিত দেশে অমুসলিমরা সংখ্যালঘু মুসলমানদের উপর জুলুম করে এবং ওই দেশে বসবাসকারী মুসলমানদের অন্য কোনো দেশে হিজরত করে নিরাপদে ধর্ম পালন করার এমন সুযোগ বা সামর্থ্যও না থাকে, তাহলে ইসলামী রাষ্ট্রের দায়িত্ব ওই অমুসলিম শাসিত দেশটির সাথে যুদ্ধ করে মুসলমানদেরকে তাদের জুলুম থেকে মুক্ত করা। ৩২ আল্লাহ বলেন,
فَلْيُقَاتِلْ فِي سَبِيلِ اللَّهِ الَّذِينَ يَشْرُونَ الْحَيَاةَ الدُّنْيَا بِالْآخِرَةِ وَمَنْ يُقَاتِلْ في سَبِيلِ اللَّهِ فَيُقْتَلْ أَوْ يَغْلِبُ فَسَوْفَ نُؤْتِيهِ أَجْرًا عَظِيمًا وَمَا لَكُمْ لَا تُقَاتِلُونَ فِي سَبِيلِ اللَّهِ وَالْمُسْتَضْعَفِينَ مِنَ الرِّجَالِ وَالنِّسَاءِ وَالْوِلْدَانِ الَّذِينَ يَقُولُونَ رَبَّنَا أَخْرِجْنَا مِنْ هَذِهِ الْقَرْيَةِ الظَّالِمِ أَهْلُهَا وَاجْعَلْ لَنَا مِنْ لَدُنْكَ وَلِيًّا وَاجْعَلْ لَنَا مِنْ لَدُنْكَ نَصِيرًا
সুতরাং যারা আখেরাতের বিনিময়ে দুনিয়ার জীবন বিক্রয় করে তারা যেন আল্লাহর রাস্তায় লড়াই করে। আর যে আল্লাহর রাস্তায় লড়াই করবে অতঃপর সে নিহত হোক কিংবা বিজয়ী, অচিরেই আমি তাকে দেব মহা পুরস্কার। আর তোমাদের কী হল যে, তোমরা আল্লাহর রাস্তায় লড়াই করছ না! অথচ দুর্বল পুরুষ, নারী ও শিশুরা বলছে, ‘হে আমাদের রব, আমাদেরকে বের করুন এ জনপদ থেকে যার অধিবাসীরা যালিম এবং আমাদের জন্য আপনার পক্ষ থেকে একজন অভিভাবক নির্ধারণ করুন। আর নির্ধারণ করুন আপনার পক্ষ থেকে একজন সাহায্যকারী। ৩৩
খ. মুসলিম দেশের ওপর কাফেরদের জুলুম
আল্লাহ তাআলা বলেন,
وَقَاتِلُوا فِي سَبِيلِ اللَّهِ الَّذِينَ يُقَاتِلُونَكُمْ وَلَا تَعْتَدُوا إِنَّ اللَّهَ لَا يُحِبُّ الْمُعْتَدِينَ وَاقْتُلُوهُمْ حَيْثُ ثَقِفْتُمُوهُمْ وَأَخْرِجُوهُمْ مِنْ حَيْثُ أَخْرَجُوكُمْ وَالْفِتْنَةُ أَشَدُّ مِنَ الْقَتْلِ وَلَا تُقَاتِلُوهُمْ عِنْدَ الْمَسْجِدِ الْحَرَامِ حَتَّى يُقَاتِلُوكُمْ فِيهِ فَإِنْ قَاتَلُوكُمْ فَاقْتُلُوهُمْ كَذَلِكَ جَزَاءُ الْكَافِرِينَ فَإِنِ انْتَهَوْا فَإِنَّ اللَّهَ غَفُورٌ رَحِيمٌ
আর তোমরা আল্লাহর রাস্তায় তাদের বিরুদ্ধে লড়াই কর, যারা তোমাদের বিরুদ্ধে লড়াই করে এবং সীমালঙ্ঘন করো না। নিশ্চয় আল্লাহ সীমালঙ্ঘনকারীদেরকে পছন্দ করেন না। আর তাদেরকে হত্যা কর যেখানে তাদেরকে পাও এবং তাদেরকে বের করে দাও যেখান থেকে তারা তোমাদেরকে বের করেছিল। আর ফেতনা হত্যার চেয়ে কঠিনতর এবং তোমরা মাসজিদুল হারামের নিকট তাদের বিরুদ্ধে লড়াই কোরো না, যতক্ষণ না তারা তোমাদের বিরুদ্ধে সেখানে লড়াই করে। অতঃপর তারা যদি তোমাদের বিরুদ্ধে লড়াই করে, তবে তাদেরকে হত্যা কর। এটাই কাফেরদের প্রতিদান। তবে যদি তারা বিরত হয়, তবে নিশ্চয় আল্লাহ ক্ষমাশীল, পরম দয়ালু। ৩৪
ফকীহরা লিখেছেন, যদি কাফেররা কোনো মুসলিম দেশের সাথে বাড়াবাড়ি করে তাহলে তাদের বিরুদ্ধে প্রতিরক্ষা যুদ্ধ ফরজ হয়ে যায়। কারণ কাফেররা মুসলিম দেশ অধিকার করে নিলে মুসলমানদের ওপর অত্যাচার করে, কুফুরি আইন জারি করে এবং সেই দেশের অধিবাসীদেরকে বাধ্য করে তাদের আনুগত্য স্বীকার করে নিতে। এভাবে মুসলিম দেশটি কাফের দেশে পরিণত হয়।
একজন হানাফী আলেম বলেন, এর সারমর্ম হলো, কোনো মুসলিম দেশ কাফেরদের আক্রমণের আশংকার মধ্যে থাকলে ওই দেশের নেতা ও জনসাধারণের ওপর দেশকে শত্রুর হাত থেকে রক্ষা করার জন্য যুদ্ধ করা ফরজ। যদি তারা না পারে তাহলে নিজেদের রক্ষার সামর্থ্য অর্জন করার আগ পর্যন্ত তাদেরকে সাহায্য করা নিকটবর্তী মুসলিম দেশের ওপর ফরজ। ৩৫
গ. অমুসলিম শাসিত দেশে অমুসলিম জনগণের ওপর জুলুম
কোনো অমুসলিম শাসিত দেশে অমুসলিম জনগণের ওপর জুলুম হলে মুসলমানদের কর্তব্য সেই অমুসলিম শাসকের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করে তার জুলুম থেকে জনগণকে রক্ষা করা। কারণ আল্লাহ তাআলা তার বান্দাদের ওপর জুলুম হারাম করেছেন। পৃথিবীতে ন্যায় বিচার প্রতিষ্ঠা করা সব মানুষের কর্তব্য। মুসলমানরা যদি জালিমের জুলুম থেকে মজলুমদের রক্ষা না করে, তাহলে তারা গুনাহগার হবে। কারণ জিহাদের নির্দেশ এসেছে হকের প্রতিষ্ঠা ও বাতিলের ধ্বংস সাধনের জন্য, ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা ও জুলুমের মুলোৎপাটন করার জন্য। আল্লাহ তাআলা বলেন,
يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا كُونُوا قَوَّامِينَ لِلَّهِ شُهَدَاءَ بِالْقِسْطِ وَلَا يَجْرِمَنَّكُمْ شَنَآنُ قَوْمٍ عَلَى أَلَّا تَعْدِلُوا اعْدِلُوا هُوَ أَقْرَبُ لِلتَّقْوَى وَاتَّقُوا اللَّهَ إِنَّ اللَّهَ خَبِيرٌ بِمَا تَعْمَلُونَ
হে মুমিনগণ, তোমরা আল্লাহর জন্য ন্যায়ের সাথে সাক্ষদানকারী হিসেবে সদা দন্ডায়মান হও। কোনো জাতির প্রতি শত্রুতা যেন তোমাদেরকে প্ররোচিত না করে যে, তোমরা ইনসাফ করবে না। তোমরা ইনসাফ কর, তা তাকওয়ার নিকটতর এবং আল্লাহকে ভয় কর। নিশ্চয় তোমরা যা কর, আল্লাহ সে বিষয়ে সবিশেষ অবহিত। ৩৬
ঘ. ইসলাম প্রচারে বাঁধা দেওয়া
আল্লাহর বার্তা সব মানুষের কাছে পৌঁছে দেওয়া মুসলমানদের ওপর ফরজ। আল্লাহ তাআলা বলেন,
وَلْتَكُنْ مِنْكُمْ أُمَّةٌ يَدْعُونَ إِلَى الْخَيْرِ وَيَأْمُرُونَ بِالْمَعْرُوفِ وَيَنْهَوْنَ عَنِ الْمُنْكَرِ وَأُولَئِكَ هُمُ الْمُفْلِحُونَ
আর যেন তোমাদের মধ্য থেকে এমন একটি দল হয়, যারা কল্যাণের প্রতি আহবান করবে, ভাল কাজের আদেশ দেবে এবং মন্দ কাজ থেকে নিষেধ করবে। আর তারাই সফলকাম। ৩৭
আল্লাহর শত্রুরা মানুষের কাছে আল্লাহর দাওয়াত পৌছতে বাঁধা দেয়। ইসলাম প্রচারকদের জনসাধারণের কাছে যেতে দেয় না। আল্লাহ ও তার বান্দাদের মধ্যে নানা বাঁধা বিঘ্নের দেয়াল নির্মাণ করে। তাই ইসলাম প্রচারে বাঁধাদানকারীদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করাও মুসলমানদের ওপর ওয়াজিব। ৩৮ আল্লাহ বলেছেন,
الَّذِينَ كَفَرُوا وَصَدُّوا عَنْ سَبِيلِ اللَّهِ أَضَلَّ أَعْمَالَهُمْ وَالَّذِينَ آمَنُوا وَعَمِلُوا الصَّالِحَاتِ وَآمَنُوا بِمَا نُزِّلَ عَلَى مُحَمَّدٍ وَهُوَ الْحَقُّ مِنْ رَبِّهِمْ كَفَرَ عَنْهُمْ سَيِّئَاتِهِمْ وَأَصْلَحَ بَالَهُمْ ذَلِكَ بِأَنَّ الَّذِينَ كَفَرُوا اتَّبَعُوا الْبَاطِلَ وَأَنَّ الَّذِينَ آمَنُوا اتَّبَعُوا الْحَقَّ مِنْ رَبِّهِمْ كَذَلِكَ يَضْرِبُ اللَّهُ لِلنَّاسِ أَمْثَالَهُمْ فَإِذَا لَقِيتُمُ الَّذِينَ كَفَرُوا فَضَرْبَ الرِّقَابِ حَتَّى إِذَا أَثْخَنْتُمُوهُمْ فَشُدُّوا الْوَثَاقَ فَإِمَّا مَنَّا بَعْدُ وَإِمَّا فِدَاءً حَتَّى تَضَعَ الْحَرْبُ أَوْزَارَهَا ذَلِكَ وَلَوْ يَشَاءُ اللَّهُ لَانْتَصَرَ مِنْهُمْ وَلَكِنْ لِيَبْلُوَ بَعْضَكُمْ بِبَعْضٍ وَالَّذِينَ قُتِلُوا فِي سَبِيلِ اللَّهِ فَلَنْ يُضِلَّ أَعْمَالَهُمْ
যারা কুফরী করেছে এবং অপরকে আল্লাহর পথ থেকে নিবৃত্ত করেছে, তিনি তাদের আমলসমূহ ব্যর্থ করে দিয়েছেন। আর যারা ঈমান এনেছে, সৎকর্ম করেছে এবং মুহাম্মাদের প্রতি যা নাযিল করা হয়েছে তাতে বিশ্বাস স্থাপন করেছে 'আর তা তাদের রবের পক্ষ হতে (প্রেরিত) সত্য, তিনি তাদের থেকে তাদের মন্দ কাজগুলো দূর করে দেবেন এবং তিনি তাদের অবস্থা সংশোধন করে দেবেন। তা এজন্য যে, যারা কুফরী করে তারা বাতিলের অনুসরণ করে, আর যারা ঈমান আনে তারা তাদের রবের প্রেরিত হকের অনুসরণ করে। এভাবেই আল্লাহ মানুষের জন্য তাদের দৃষ্টান্তসমূহ বর্ণনা করেন। অতএব তোমরা যখন কাফেরদের সাথে যুদ্ধে অবতীর্ণ হও, তখন তাদের ঘাড়ে আঘাত কর। পরিশেষে তোমরা যখন তাদেরকে সম্পূর্ণভাবে পর্যুদস্ত করবে তখন তাদেরকে শক্তভাবে বেঁধে নাও। তারপর হয় অনুগ্রহ না হয় মুক্তিপণ আদায়, যতক্ষণ না যুদ্ধ তার অস্ত্র নামিয়ে ফেলে। এটাই বিধান। আর আল্লাহ ইচ্ছা করলে তাদের কাছ থেকে প্রতিশোধ গ্রহণ করতে পারতেন, কিন্তু তিনি তোমাদের একজনকে অন্যের দ্বারা পরীক্ষা করতে চান। আর যারা আল্লাহর পথে নিহত হয় তিনি কখনো তাদের আমলসমূহ বিনষ্ট করবেন না। ৩৯
টিকাঃ
২০ সূরা আনফাল (আয়াত: ৩৯, ৪০)
২১ সূরা বাকারা (আয়াত: ৫০-৫২)
২২ তাফসীরে ইবনে কাসীর (১/২৬২)
২৩ সূরা মুহাম্মাদ (আয়াত: ৪-৬)
২৪ তাফসীরে ইবনে কাসীর (১/২৬২)
২৫ সূরা আলে ইমরান (আয়াত: ১৪২)
২৬ সূরা আনফাল (আয়াত: ৬০)
২৭ সূরা তওবা (আয়াত: ১৪, ১৫)
২৮ সূরা আনফাল (আয়াত: ১৭, ১৮)
২৯ সূরা আলে ইমরান (আয়াত: ১৭৯)
৩০ তাফসীরে ইবনে কাসীর (১/৩৭)
৩১ সূরা নিসা (আয়াত: ১০৫)
৩২ তাফসীরে ইবনে কাসীর (১/৩৭১)
৩৩ সূরা নিসা (আয়াত: ৭৪, ৭৫)
৩৪ সূরা বাকারা (আয়াত: ১৯০-১৯২)
৩৫ হাশিয়াতু ইবনে আবেদীন (৪/৪২১)
৩৬ সূরা মায়েদা (আয়াত: ৮)
৩৭ সূরা আলে ইমরান (আয়াত: ১০৪)
৩৮ ফিকহুত তামকীন ফিল কুরআনিল কারীম লিসসাল-াবী (পৃ: ৪৮৮)
৩৯ সূরা মুহাম্মাদ (আয়াত: ১-৪)
📄 বদরপূর্ব গুরুত্বপূর্ণ যুদ্ধগুলো
মদিনায় বেশিরভাগ মুসলমানের হিজরত ও রসূল সা.-এর নেতৃত্ব প্রতিষ্ঠিত হওয়ার পর মুসলমানদের জন্য অপরিহার্য ছিল ইসলামের শত্রুদের প্রতিক্রিয়া সম্পর্কে সজাগ থাকা এবং যে দাওয়াতের জন্য রসূল সা. ও তার সঙ্গীরা মক্কায় নির্যাতিত হয়েছিলেন এবং শেষ পর্যন্ত হিজরত করতে বাধ্য হয়েছিলেন, সেই দাওয়াতকে চূড়ান্ত লক্ষ্যে পৌঁছানোর চেষ্টা এগিয়ে নেওয়া।
রসূল সা. এর হিজরতের পর থেকে কুরায়েশদের বিভিন্ন কাজ ও আচরণও মুসলমানদের সচেতন হতে বাধ্য করেছিল। মক্কার নেতারা ইসলামের জন্য কোনো আশ্রয়ই ছাড়তে রাজি ছিল না। নবীজি ও সাহাবীরা মক্কা ছেড়ে গেলেও তারা তাদেরকে মদিনায়ও নিরাপদে থাকতে দিতে প্রস্তুত ছিল না। মদিনায় মুসলমানদের উপস্থিতিকে তারা নিজেদের নেতৃত্বের জন্য হুমকি হিসেবে বিবেচনা করতো। তারা যথাযথভাবেই বুঝতে পেরেছিল ইসলাম টিকে থাকা মানে জাহেলিয়াতের বিলুপ্তি, তাদের বাপ দাদাদের রীতি রেওয়াজের বিলুপ্তি, তাই মুসলমানদের সাথে তাদের লড়াই অনেকটা অবশ্যম্ভাবি ছিল।
মক্কার নেতারা রসূল সা.-কে মদিনায় পৌঁছতে না দেওয়ার সব রকম চেষ্টাই করেছিল। মদিনায় ইসলামের ওপর আঘাত হানতে এবং মদিনা থেকে মুসলমানদের উৎখাত করতে তারা চেষ্টার ত্রুটি করে নি। ৪০ তাদের এসব শত্রুতামূলক কার্যকলাপ অব্যাহতভাবে চলছিল রসূল সা. হিজরত করার পরও। এর প্রমাণ স্পষ্টভাবে পাওয়া যায়, বুখারির বর্ণিত এই হাদিসটিতে, আব্দুল্লাহ ইবনে মাসউদ সা'দ ইবনে মুআয থেকে বর্ণনা করেন, সা'দ ইবনে মুআয ও উমাইয়া ইবনে খালাফের মধ্যে বন্ধুত্ব ছিল। উমাইয়া মদিনায় গেলে সা'দের বাড়িতে অবস্থান করতো, সা'দ মক্কায় গেলে উমাইয়ার বাড়িতে অবস্থান করতেন। রসূল সা.-এর হিজরতের পর সা'দ ওমরার উদ্দেশে মক্কায় গিয়ে আগের মতোই উমাইয়ার বাড়িতে উঠেছিলেন। তিনি উমাইয়াকে বললেন, আমার জন্য একটি নিরিবিলি সময় দেখো, আমি তাওয়াফ করবো।
উমাইয়া সা'দকে নিয়ে মধ্যাহ্নের কাছাকাছি সময়ে বের হলেন, পথে আবু জেহেলের সাথে তাদের দেখা হয়ে গেলো। আবু জেহেল উমাইয়াকে জিজ্ঞাসা করলো, আবু সাফওয়ান! তোমার সাথে এই ব্যক্তি কে? উমাইয়া বললো, সে সা'দ।
আবু জেহেল বললো, তুমি মক্কায় নিরাপদে ঘুরে বেড়াচ্ছো! অথচ তোমরা ধর্মত্যাগীদের আশ্রয় দিয়েছো, তাকে সাহায্যের অঙ্গীকার করেছো! আল্লাহর শপথ! যদি তুমি আবু সাফওয়ানের আশ্রয়ে না থাকতে তাহলে তুমি নিরাপদে তোমার পরিবারের কাছে ফিরে যেতে পারতে না।
সা'দ উচ্চৈস্বরে জবাব দিলেন, তুমি যদি কাবার তওয়াফ থেকে আমাকে বাঁধা দাও তাহলে আমি তোমাকে বাঁধা দেবো আরও কঠিন জায়গায়; মদিনার ওপর দিয়ে তোমাদের যাতায়াত পথে... ৮১
বায়হাকির একটি বর্ণনায় আছে, খোদার কসম! যদি তুমি আমাকে কাবার তওয়াফ করতে বাঁধা দাও, আমি তোমাদের শামের ব্যবসা বন্ধ করে দেবো। ৮২
এই ঘটনা থেকে বোঝা যায়, আবু জেহেল সা'দ ইবনে মুআযকে কুরায়েশের শত্রু বিবেচনা করছিল এবং তিনি মক্কার একজন বড় সর্দারের নিরাপত্তায় না এলে সে তাকে হত্যা করতো। এটা ছিল মদিনাবাসীর প্রতি মক্কার নেতাদের নতুন ধরণের আচরণ। মদিনায় ইসলামী রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার আগের আরচরণ থেকে তা ছিল পুরোপুরি আলাদা। রসূল সা.-এর হিজরতের আগে মদিনার অধিবাসীদের কারো নিরাপত্তা নিয়ে মক্কায় প্রবেশ করতে হতো না। বরং কুরায়েশ এর আগে মদিনার অধিবাসীদের সাথে কোনো ধরণের যুদ্ধাবস্থা সৃষ্টি হওয়ার কথা চিন্তা করতেও অপছন্দ করতো। তারা বলেছিল, আল্লাহর শপথ! আরবের গোত্রগুলোর মধ্যে তোমাদের সাথে যুদ্ধাবস্থা তৈরি হওয়াকেই আমরা সবচে বেশি অপছন্দ করি। ৮৩
এই ঘটনা থেকে আরও বোঝা যায়, কুরায়েশের ব্যবসায়িক কাফেলাগুলো এই ঘটনা ঘটার আগ পর্যন্ত মদিনার রাস্তা ধরে নিরাপদেই শামে যাচ্ছিলো। ইসলামী রাষ্ট্র তাদের কোনো ক্ষতি করে নি। অর্থাৎ ইসলামী রাষ্ট্র তখন পর্যন্ত মক্কার ওপর অর্থনৈতিক অবরোধ আরোপ করে নি এবং মক্কাবাসীর সাথে শত্রুর মতো আচরণও করছিল না। মুসলমানরা তাদের কোনো কাফেলাকে আটক করে নি বা তাদের অন্য কোনো ক্ষতিও করে নি। এর অর্থ হলো মক্কার শাসক গোষ্ঠীই শত্রুতার সূচনা করেছে এবং মদিনার ইসলামী রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করেছে। মুসলমানদের শত্রু গণ্য করে নিরাপত্তা নেওয়া ছাড়া মক্কায় প্রবেশ নিষিদ্ধ করেছে।
মক্কার নেতারাই যে মদিনার ইসলামী রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করেছিল এর আরেকটি প্রমাণ হলো সুনানে আবু দাউদের এই হাদিস, আব্দুর রহমান ইবনে কা'ব ইবনে মালেক রসূল সা.-এর একজন সাহাবী থেকে বর্ণনা করেন, রসূল সা.-এর হিজরতের পর বদর যুদ্ধের আগে কুরায়েশের কাফেররা ইবনে উবাই এবং মদিনার মুশরিকদের কাছে লিখলো, তোমরা আমাদের একজনকে আশ্রয় দিয়েছো, আমরা আল্লাহর নামে শপথ করেছি যে, হয় তোমরা তার বিরুদ্ধে যুদ্ধ করে তাকে মদিনা থেকে বের করে দেবে অথবা আমরা আমাদের সেনাবাহিনী নিয়ে তোমাদের ওপর আক্রমণ চালাবো; তোমাদের যোদ্ধাদের হত্যা করবো এবং তোমাদের নারীদের ভোগ করবো।
এই পত্র পেয়ে আব্দুল্লাহ ইবনে উবাই এবং অন্য মুশরিকরা রসূল সা.-এর সাথে যুদ্ধ করার জন্য একত্র হলো।
রসূল সা. এই খবর পেয়ে দ্রুত ঘটনাস্থলে গেলেন এবং তাদের উদ্দেশে বললেন, কুরায়েশরা হুমকি দিয়ে তাদের উদ্দেশ্য হাসিল করে নিয়েছে। তারা তোমাদের ততটুকুই বিভ্রান্ত করতে পেরেছে যতটুকু তোমরা নিজেরা নিজেদের বিভ্রান্ত করেছো। তোমরা তোমাদের সন্তান ও ভাইদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করতে চাও!
নবীজির বক্তব্য শুনে তারা ছত্রভঙ্গ হয়ে গেলো।
এই ঘটনায় আমরা রসূল সা.-এর নেতৃত্বের বিস্ময়কর শক্তির দেখা পাই। তিনি একটি বড় ফেতনাকে অঙ্কুরেই নির্মূল করতে সক্ষম হয়েছিলেন। তিনি তাদের গোত্রীয় সম্মানবোধের জায়গায় আঘাত করেছেন। রসূল সা. মানব মনের প্রকৃতি বুঝতেন। তিনি তাদের প্রকৃতি অনুযায়ী তাদের উদ্দেশে কথা বলেছিলেন। তাই রসূল সা.-এর বক্তৃতা মদিনার মুশরিকদের মনে প্রভাব বিস্তার করতে সক্ষম হয়েছিল। মদিনার মুসলিম সমাজ ধ্বংস ও তার ভিত্তিমূল নড়বড়ে করে দেওয়ার মুশরিকী চক্রান্ত নস্যাৎ করে দেওয়ার জন্য সেই মুহূর্তে এমন নেতৃত্বগুণের বড় প্রয়োজন ছিল। এভাবে কুরায়েশরা যখন মদিনার ইসলামী রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করলো এবং আল্লাহর পক্ষ থেকেও যুদ্ধের অনুমতি দেওয়া হলো, তখন স্বাভাবিক ভাবেই মদিনা রাষ্ট্র কুরায়েশদের সাথে শত্রুর মতোই আচরণ শুরু করলো। রসূল সা. মদিনার রাষ্ট্রকে শক্তিশালী করার জন্য এবং কুরায়েশদের যুদ্ধ ঘোষণার জবাব দেওয়ার জন্য সাহাবীদের নেতৃত্বে বিভিন্ন সৈন্যদল পাঠান। তিনি নিজেও কয়েকটি যুদ্ধে নেতৃত্ব দেন। এগুলোই বদরপূর্ব সময়ের সারিয়া ও গাযওয়া।
নিচে আমরা গুরুত্বপূর্ণ সারিয়া ও গাযওয়াগুলো সম্পর্কে আলোচনা করবো。
১. গাযওয়াতুল আবওয়া
গাযওয়াতুল আবওয়া ছিল প্রথম গাযওয়া অর্থাৎ রসূল সা.-এর নেতৃত্বে সাহাবীদের প্রথম যুদ্ধ। এই গাযওয়া গাযওয়াতু ওদ্দান নামেও পরিচিত। এই দুইটি জায়গা কাছাকছি। মাঝে ছয় বা আট মাইলের মতো দূরত্ব। এই সফরে কিনানা গোত্রের বনু যামরার সাথে সন্ধি হয়, কোনো যুদ্ধ হয় নি। গাযওয়াটি সংঘটিত হয়েছিল দ্বিতীয় হিজরীর সফর মাসে। মুসলিম বাহিনীর সৈন্য সংখ্যা ছিল পদাতিক ও আরোহী মিলিয়ে দুই শত।
২. সারিয়াতু উবায়দা ইবনুল হারেস
এটা রসূল সা.-এর পাঠানো প্রথম সৈন্যদল। সেই বাহিনীতে ছিলেন সত্তর জনের মতো মুহাজির সাহাবী। কুরায়েশ বাহিনীতে ছিল দুইশত পদাতিক ও আরোহী সৈন্য। কুরায়েশদের বাহিনীর নেতৃত্বে ছিল আবু সুফিয়ান ইবনে হারব। রাবেগ উপত্যকার কূপের কাছে দুই দলের মধ্যে বিক্ষিপ্ত সংঘর্ষ হয়। সা'দ ইবনে আবী ওয়ক্কাস শত্রু বাহিনীর দিকে তীর নিক্ষেপ করেন। এটিই ছিল কাফেরদের দিকে মুসলমানদের নিক্ষিপ্ত প্রথম তীর। এই সারিয়াটি পাঠানো হয় আবওয়া থেকে ফেরার পর।
৩. সারিয়াতু হামযা ইবনে আব্দুল মুত্তালিব
ইবনে ইসহাক বলেন, রসূল সা. গাযওয়াতুল আবওয়ার পর মদিনায় ফিরে হামযা ইবনে আবদিল মুত্তালিবকে ঈসের সমুদ্র উপকূলবর্তী এলাকায় পাঠান। সাথে দেন তিন শত আরোহী মুহাজির সাহাবীর একটি সৈন্যদল। তারা উপকূলে আবু জেহেল ইবনে হিশামের নেতৃত্বে তিন শত মক্কাবাসীর একটি দলের মুখোমুখি হন। মাজদী ইবনে আমর জুহানী তাদের মাঝখানে বাঁধা হয়ে দাঁড়ান, তিনি দুই দলের সাথেই চুক্তিবদ্ধ ছিলেন। তাই যুদ্ধ হতে পারে নি। দুই বাহিনী দুই দিকে চলে যায়।৫০
৪. গাযওয়াতু বুওয়াত ৫১
রসূল সা.-এর নেতৃত্বে এই গাযওয়াটি হয় দ্বিতীয় হিজরীর রবিউল আওয়াল মাসে। তিনি দুই শত সাহাবীর একটি দল নিয়ে বের হন। তাঁর উদ্দেশ্য ছিল উমাইয়া ইবনে খালাফ ও একশত কুরায়েশের একটি দলের ওপর আক্রমণ করা। তারা আড়াই হাজার উট নিয়ে যাচ্ছিলো। তাদের দেখা না পেয়ে রসূল সা. মদিনায় ফিরে আসেন।
৫. গাযওয়াতুল উশায়রা
রসূল সা. কুরায়েশদের সাথে যুদ্ধ করার জন্য বের হন। মদিনায় তাঁর স্থলাভিষিক্ত বানিয়ে যান আবু সালামা ইবনে আবদুল আসাদকে। এই গাযওয়াকে গাযওয়াতু উশায়রা বলা হয়। রসূল সা. জুমাদাল উলা পুরো মাস এবং জুমাদাল উখরার কয়েক দিন উশায়রা এলাকায় অবস্থান করেন। তিনি সেখানে বনী মুদলিজ এবং তাদের মিত্র বনী যামরার সাথে চুক্তি করেন। তারপর মদিনায় ফিরে আসেন। কুরায়েশের দেখা তিনি পান নি।
রসূল সা. যে দলটিকে আক্রমণ করতে বের হয়েছিলেন, তারা এর কিছুদিন আগেই শামের দিকে চলে গিয়েছিল। তাই তিনি তাদেরকে পান নি। পরে এই দলটি সমুদ্র উপকূলবর্তী পথ ধরে ফিরে আসে এবং কুরায়েশের কাছে খবর পৌছে যে তারা বিপদে আছে। কুরায়েশরা এই কাফেলাকে রক্ষা করতে বের হলে রসূল সা.-এর মুখোমুখি হয়ে যায়। তখনই বদরের বড় যুদ্ধ সংঘটিত হয়। ৫২
৬. সারিয়াতু সা'দ ইবনে আবী ওয়াক্কাস
গাযওয়াতুল উশায়রার পরে রসূল সা. সা'দ ইবনে আবী ওয়াক্কাস রা.-কে আশি জন সৈন্যের একটি বাহিনী দিয়ে পাঠান। তিনি হিজাযের খাররার নামক স্থান পর্যন্ত যান। কিন্তু কোনো বাহিনীর মুখোমুখী না হয়ে ফিরে আসেন। ৫৪
৭. বদরের প্রথম গাযওয়া
কুরায ইবনে জাবের ফিহরী মদিনার চারণভূমিতে আক্রমণ করে কিছু উট ও বকরি নিয়ে যায়। রসূল সা. তার খোঁজে বের হয়ে বদরের পার্শবর্তী সাফওয়ান উপত্যকা পর্যন্ত যান। কুরায ইবনে জাবের পালিয়ে যায়। রসূল সা. তাকে ধরতে না পেরে মদিনায় ফিরে আসেন। ৫৫
৮. আবদুল্লাহ ইবনে জাহাশ আল আসাদীর সারিয়া
নবী সা. রজব মাসের শেষ দিন আব্দুল্লাহ ইবনে জাহাশকে আট সৈন্যের একটি মুহাজির দল দিয়ে মক্কার দক্ষিণে নাখলা উপত্যকায় পাঠান। উদ্দেশ্য ছিল কুরায়েশের গতিবিধি লক্ষ্য করা ও তাদের খবরাখবর জানা। কিন্তু তারা কুরায়েশের একটি ব্যবসায়িক কাফেলার মুখোমুখী হয়ে যায়। মুসলমানরা তাদের উপর আক্রমণ করে তাদের নেতা আমর ইবনে হাযরামিকে হত্যা করে এবং তাদের দু'জন ব্যক্তিকে বন্দী করে। বন্দী দু'জন হলো, ওসমান ইবনে আবদিল্লাহ এবং হাকাম ইবনে কায়সান।
মুসলমানরা বন্দী ও গণিমত নিয়ে মদিনায় ফিরে এলে এ ব্যাপারে আয়াত অবতীর্ণ হওয়া পর্যন্ত রসূল সা. এ ব্যপারে সিদ্ধান্ত গ্রহণ স্থগিত রাখেন। এ ব্যাপারে কুরআনের এই আয়াত অবতীর্ণ হয়,
يَسْأَلُونَكَ عَنِ الشَّهْرِ الْحَرَامِ قِتَالٍ فِيهِ قُلْ قِتَالُ فِيهِ كَبِيرٌ وَصَدُّ عَنْ سَبِيلِ اللَّهِ وَكُفْرُ بِهِ وَالْمَسْجِدِ الْحَرَامِ وَإِخْرَاجُ أَهْلِهِ مِنْهُ أَكْبَرُ عِنْدَ اللَّهِ وَالْفِتْنَةُ أَكْبَرُ مِنَ الْقَتْلِ وَلَا يَزَالُونَ يُقَاتِلُونَكُمْ حَتَّى يَرُدُّوكُمْ عَنْ دِينِكُمْ إِنِ اسْتَطَاعُوا وَمَنْ يَرْتَدِدْ مِنْكُمْ عَنْ دِينِهِ فَيَمُتْ وَهُوَ كَافِرُ فَأُولَئِكَ حَبِطَتْ أَعْمَالُهُمْ فِي الدُّنْيَا وَالْآخِرَةِ وَأُولَئِكَ أَصْحَابُ النَّارِ هُمْ فِيهَا خَالِدُونَ
তারা তোমাকে হারাম মাস সম্পর্কে, তাতে লড়াই করা বিষয়ে জিজ্ঞাসা করে। বলো, 'তাতে লড়াই করা বড় পাপ; কিন্তু আল্লাহর পথে বাধা প্রদান, তাঁর সাথে কুফরী করা, মাসজিদুল হারাম থেকে বাধা দেয়া এবং তার অধিবাসীদেরকে তা থেকে বের করে দেয়া আল্লাহর নিকট অধিক বড় পাপ। আর ফেতনা হত্যার চেয়েও বড়'। আর তারা তোমাদের সাথে লড়াই করতে থাকবে, যতক্ষণ না তোমাদেরকে তোমাদের দীন থেকে ফিরিয়ে দেয়, তারা যদি পারে। আর যে তোমাদের মধ্য থেকে তাঁর দীন থেকে ফিরে যাবে, অতঃপর কাফের অবস্থায় মৃত্যু বরণ করবে, বস্তুত এদের আমলসমূহ দুনিয়া ও আখেরাতে বিনষ্ট হয়ে যাবে এবং তারাই আগুনের অধিবাসী। তারা সেখানে স্থায়ী হবে। ৫৬
এই আয়াত অবতীর্ণ হলে রসূল সা. সম্পদ ও বন্দীদের গ্রহণ করলেন। এই সারিয়ায় মুসলমানরা প্রথম গণিমত লাভ করেন। আমর ইবনুল হাযরামী মুসলমানদের হাতে নিহত প্রথম ব্যক্তি এবং ওসমান ইবনে আব্দুল্লাহ ও হাকাম ইবনে কায়সান মুসলমানদের প্রথম যুদ্ধবন্দী। ৫৭
টিকাঃ
৪০ মারওয়িয়াতি গাযওয়াতি বদর, আহমদ বাওযীর (পৃ: ৭৯)
৮১ সহিহ বুখারী (হাদিস: ৩৯৫০)
৮২ দালায়িলুন নবুয়্যাহ লিল বায়হাকি (৩/২৫)
৮৩ সীরাতে ইবনে হিশাম (আর-রওযুল উনফ ২/১৯২)
এই এলাকায় মহামারির প্রকোপ থাকার কারণে এমন নাম ছিলো।
ওদ্দান: আবওয়ার কাছাকাছি একটি গ্রাম
জায়গুন্নাবী সা. লি মাহমুদ শীত খাত্তাব (পৃঃ ৫৪)
তাবাকাতে ইবনে সা'দ (২/৭)
হাদিসুল কুরআন আন গাযাওয়াতির রসূল, ড. মুহাম্মাদ বকর আলে ইবাদ (১/৪০)
৫০ সীরাতে ইবনে হিশাম (২/৫৯৫)
৫১ বুওয়াত রিযওয়ীর পাশে ঝর্ণার কাছে জুহাইনার একটি পাহাড়ের নাম।
৫২ নাফসুল মাসদার (২/১১)
৫৩ হিজাযের একটি এলাকার নাম। এটি জুহফার কাছে অবস্থিত। (মারাসিদুল ইত্তিলা' ১/৪৫৫)
৫৪ সীরাতে ইবনে হিশাম (২/৬০০)
৫৫ সীরাতে ইবনে হিশাম (২/৬০১)
৫৬ সূরা বাকারা (আয়াত: ২১৭)
৫৭ হাদীসু কুরআনিল কারীম আন গাযাওয়াতির রসূল (১/৩৪)
📄 কিছু সংশ্লিষ্ট বিষয়
১. জিহাদ বিধিবদ্ধ হওয়ার সময়কাল
শায়েখ ড. আবু শুহবার মত হলো, জিহাদ বিধিবদ্ধ হয়েছিল দ্বিতীয় হিজরীর প্রথম দিকে। প্রথম হিজরীতে রসূল সা. ও সাহাবীরা মসজিদ নির্মাণ, মুহাজির সাহাবীদের থাকার ব্যবস্থা, উপার্জনের ব্যবস্থা, মুহাজির ও আনসারদের মধ্যে ভ্রাতৃত্ব তৈরি করে দেওয়া এবং ইহুদি ও মদিনার অন্য অধিবাসীদের সাথে চুক্তি করা ইত্যাদি দীনি ও জাগতিকভাবে নিজেদের অবস্থাকে সুশৃঙ্খল ও তুলনামূলক নিরাপদ করার কাজে ব্যস্ত ছিলেন। ৫৮
উসতায সালেহ আহমদ শামীর মত হলো, জিহাদের অনুমতি দেওয়া হয়েছিল প্রথম হিজরীর শেষ দিকে। ৫৯
২. গাযওয়া ও সারিয়ার মধ্যে পার্থক্য
সীরাতের কিতাবগুলোতে সাধারণত গাযওয়া বলা হয় রসূল সা.-এর নেতৃত্বে মুসলিম সৈন্যবাহিনীর অভিযানে বের হওয়াকে; যুদ্ধ হোক বা না হোক, শত্রু বড় হোক বা ছোট হোক, তারা সংখ্যায় বেশী হোক বা কম হোক।
সারিয়া বা বা'স বলা হয় সাহাবীদের নেতৃত্বে রসূল সা. এর পাঠানো সৈন্যদলকে; যুদ্ধ হোক বা না হোক, যুদ্ধের জন্য পাঠানো হোক বা শত্রুর গতিবিধি নজরে রাখার জন্য পাঠানো হোক। সারিয়ার সৈন্য সংখ্যা সাধারণত কম হতো। কারণ তাদের কাজ ছিল শুধু শত্রুর সাথে বিক্ষিপ্ত সংঘর্ষে জড়ানো, তাদের ভয় দেখানো ও বিভ্রান্ত করা।
রসূল সা. মদিনায় হিজরতের পর থেকে ওফাত পর্যন্ত মাত্র দশ বছর সময়ের মধ্যে সাতাশটি যুদ্ধে নিজে নেতৃত্ব দিয়েছিলেন। সারিয়া ও বা'স পাঠিয়েছিলেন সাত্রিশটি।৬০
৩. মদিনার অধিবাসীদের সংখ্যা এবং সারিয়াগুলোর সাথে এর সম্পর্ক
প্রথম হিজরিতে মুহাজির ও আনসারদের মধ্যে ভাতৃত্ব প্রতিষ্ঠার পর রসূল সা. মদিনার মুসলিম জনসংখ্যা গণনার নির্দেশ দেন। রসূল সা. বলেছিলেন, যারা ইসলাম গ্রহণ করেছে তাদের নাম লিখে আমাকে দাও। সবার নাম লেখার পর দেখা গেলো, যুদ্ধ করতে সক্ষম এমন মুসলমানের সংখ্যা দেড় হাজার। সাহাবীরা আশ্চর্য হয়ে বললেন, তাহলে আমরা ভয় পাচ্ছি কেনো! আমাদের সংখ্যা এখন দেড় হাজার!
এই পরিসংখ্যান চালানোর আগে সাহাবীরা অস্ত্র না নিয়ে ঘুমাতেন না। রসূল সা. গুপ্তহত্যার স্বীকার হওয়ার ভয়ে সাহাবীদের রাতে একা বের হতে নিষেধ করেছিলেন।৬১ কিন্তু এই শুমারির পর মুসলমানরা সাহসী হয়ে ওঠেন। তাদের মনোবল অনেক বেড়ে যায়। মুসলমানরা মুশরিকদের বিরুদ্ধে বিভিন্ন গাযওয়া ও সারিয়ায় বের হওয়া শুরু করে এই শুমারির পর। এটি ছিল মদিনার নতুন রাষ্ট্রের রাষ্ট্রীয় গঠন ও উন্নয়নমূলক একটি কাজ। ৬২
৪. রসূল সা.-কে প্রহরা
সাহাবীরা রসূল সা. কে পাহারা দিতেন। উম্মুল মুমিনীন আয়েশা রা. বলেন, এক রাতে রসূল সা.-এর ঘুম আসছিল না। তিনি বললেন, আমার কোনো সাহাবী যদি আজ রাতে আমাকে পাহারা দিতো!
তখনই আমরা অস্ত্রের আওয়াজ শুনলাম। রসূল সা. বললেন, কে ওখানে? সাহাবী বললেন, আমি সা'দ হে আল্লাহর রসূল! আমি আপনাকে পাহারা দিতে এসেছি।
রসূল সা. নিশ্চিন্ত মনে ঘুমিয়ে পড়লেন। এক সময় আমরা তার নাক ডাকার আওয়াজ পেলাম। ৬৩
এটা ছিল বদরের বড় যুদ্ধের আগে। আয়েশা রা.-এর এই হাদিস থেকে বোঝা যায় পাহারার ব্যবস্থা করা বৈধ, প্রয়োজনের সময় সতর্কতামূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করা উচিত এবং জীবন সংকটাপন্ন হওয়ার আশংকা থাকলে শাসককে পাহারা দেওয়া নাগরিকদের কর্তব্য।
রসূল সা. আল্লাহর উপর ভরসা থাকা সত্ত্বেও প্রহরার ব্যবস্থা করেছিলেন এ ব্যাপারে আদর্শ রেখে যাওয়ার জন্য। ৬৪
৫. বনী যামরার সাথে চুক্তি
আল্লাহর নামে শুরু করছি। এই চুক্তিনামা আল্লাহর রসূল মুহাম্মাদের পক্ষ থেকে বনু বকর ইবনে আবদে মানাত ইবনে কিনানার জন্য। তাদের জীবন ও সম্পদের নিরাপত্তা দেয়া হলো। যদি তারা আল্লাহর দীনের বিরুদ্ধে যুদ্ধ না করে তাহলে তাদের ওপর কেউ আক্রমণ করলে তারা সাহায্য পাবে যতদিন সমুদ্রের ফেনা শুকিয়ে না যায়। নবী যখন তাদেরকে সাহায্যের জন্য ডাকবেন তারা সাড়া দেবে। পরিবর্তে তারা আল্লাহ ও তার রসূলের পক্ষ থেকে নিরাপত্তা পাবে। তাদের সৎ ও বিশ্বস্ত ব্যক্তিরা সাহায্য পাবে। ৬৫
নবী সা. গাযওয়াতুল আবওয়াতে বের হয়ে এই চুক্তি করার সুযোগ পেয়ে যান। বনু যামরার নেতার সাথে এটি ছিল একটি সামরিক মৈত্রী চুক্তি। মদিনার নতুন মুসলিম রাষ্ট্র ও কুরায়েশের মধ্যে তখন যে কোনো সময় যুদ্ধ বেঁধে যাওয়ার আশংকা ছিল, এমন পরিস্থিতিতে বনু যামরার এলাকার অবস্থান ছিল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তাই রসূল সা. এই চুক্তির মাধ্যমে তাদের নিরপেক্ষতা নিশ্চিত করেন। বদরের বড় যুদ্ধ পর্যন্ত রসূল সা.-এর কর্ম কৌশল ছিল মুহাজির সাহাবীদের ছোটো ছোটো দল পাঠিয়ে কুরায়েশের কাফেলাগুলোকে অস্থির করে রাখা। এই কাফেলাগুলো কোনো বড় বাহিনী নিয়ে সফর করতো না। কারণ কুরায়েশরা পথে কোনো আক্রমণের আশংকা করতো না। ৬৬
বনু যামরার এলাকা ছিল মদিনার কাছে এবং মদিনাই ছিল তাদের বাজার ও রিজিকের উৎস; তাই নতুন ইসলামী রাষ্ট্রের সাথে চুক্তি করা ছাড়া তাদের উপায় ছিল না। হাদিস থেকে বোঝা যায় চুক্তিটি ছিল শত্রুতা না করার অর্থাৎ মদিনা- মক্কার সম্ভাব্য যুদ্ধে নিরপেক্ষ থাকার চুক্তি। ৬৭
এই চুক্তি প্রমাণ করে যে, রাজনৈতিক প্রয়োজনে মুসলমানরা যে কোনো জনগোষ্ঠীর সাথে সামরিক, অর্থনৈতিক ও ব্যবসায়িক চুক্তি করতে পারে এবং শরিয়তে রাজনৈতিক মৈত্রীর বৈধতা রয়েছে। কোনো বিদ্যমান বিপদ বা সাম্ভাব্য বিপদ মোকাবেলার জন্যও চুক্তি হতে পারে। ৬৮ তবে মৈত্রী হতে হবে বিপদ মোকাবেলা অথবা যৌথ স্বার্থে এবং মৈত্রীর একটি স্পষ্ট শরয়ী উদ্দেশ্য থাকবে। মুসলমানদের এই চুক্তিতে মত ও সমর্থন থাকতে হবে। তাই এই যুগের জোর করে চাপিয়ে দেওয়া চুক্তিগুলো শরিয়ত সম্মত নয়। উম্মতের নেতাদের উচিত রসূল সা.- এর 'ক্ষতি না করা ও ক্ষতির শিকার না হওয়া'র নীতির মর্ম বোঝা ও উপলব্ধি করা। কারো ক্ষতি করা যেমন বৈধ নয়, নিজে ক্ষতির শিকার হওয়াও বৈধ নয়। ৬৯
শায়েখ মুস্তাফা যুরকা বলেন, 'কারো ক্ষতি না করা ও নিজে ক্ষতির শিকার না হওয়া শরিয়তের একটি গুরুত্বপূর্ণ মূলনীতি। এর পক্ষে কুরআন ও হাদিসের দলিল রয়েছে। এই মূলনীতি অনুযায়ী ব্যাপক ক্ষতি বা অনেক মানুষের ক্ষতি যেমন নিষিদ্ধ, ব্যক্তি বিশেষের ক্ষতিও নিষিদ্ধ। বিপদে পড়ার আগে বিপদ ঠেকানোর চেষ্টা করা এবং বিপদে পড়ার পরে বিপদ কাটিয়ে ওঠা ও এর পুনরাবৃত্তি রোধের চেষ্টাও এই মূলনীতির অন্তর্ভুক্ত। এই মূলনীতিটি নিরুপায় অবস্থায় দু'টি খারাপের মধ্যে অপেক্ষাকৃত কম খারাপটিকে গ্রহণ করার আবশ্যকীয়তা সাব্যস্ত করে, কারণ এতে বিপদ কিছুটা কমে। ৭০
বনু যামরার সাথে মুসলমানদের চুক্তি হলো অন্য রাষ্ট্রের সাথে মুসলিম রাষ্ট্রের প্রতিরক্ষা চুক্তি বৈধ হওয়ার দলিল। যদি সেই চুক্তি মুসলমানদের স্বার্থে হয় এবং ওই চুক্তির কারণে মুসলমানদের কোনো ক্ষতি হওয়ার সম্ভাবনা না থাকে। এই চুক্তি থেকে প্রতীয়মান হয় মিত্র কাফের দেশের উপর অন্য কোনো কাফের দেশ জুলুম করলে মিত্র দেশের আহ্বানে সাড়া দিয়ে জালেম কাফের দেশের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করা মুসলিম দেশের কর্তব্য। একইভাবে মুসলিম দেশ কোনো কাফের দেশের দ্বারা আক্রান্ত হলে কাফের মিত্র দেশের কাছে সামরিক রসদ ও ইসলামী পতাকার নিচে কাফের শত্রুদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করার জন্য কাফের সৈন্য গ্রহণ করাও বৈধ।
রসূল সা. বনু যামরার সাথে কৃত চুক্তিনামায় উল্লেখ করেছিলেন যে তারা আল্লাহর দীনের ব্যাপারে যুদ্ধ করবে না এবং তাদের ওপর কেউ বাড়াবাড়ি করলে বা বাড়াবাড়ির চেষ্টা করলে তাদেরকে তাদের শত্রুর বিরুদ্ধে সাহায্য করা হবে। এই ধারাটির মাধ্যমে ইসলামী দাওয়াতের পথ থেকে সম্ভাব্য বাঁধা অপসারণ করা হয়। ইসলামের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করা অথবা ইসলামী দাওয়াতের পথে কোনো ভাবে বাঁধা হয়ে দাঁড়ানো বনু যামরার জন্য নিষিদ্ধ হয়ে যায়।
এই চুক্তি ছিল সমকালীন পরিস্থিতি ও বাস্তবতায় মুসলমানদের একটি গুরুত্বপূর্ণ সামরিক ও রাজনৈতিক অর্জন।
৬. আল্লাহর রাস্তায় তীর নিক্ষেপকারী প্রথম ব্যক্তি।
সারিয়াতু উবায়দা ইবনুল হারেসে প্রথম কাফেরদের সাথে মুসলমানদের লড়াই হয়েছিল। মুসলমান ও কাফের দুই দলই পরস্পরের দিকে তীর ছোড়ে। যুদ্ধটি ছিল খুবই ক্ষণস্থায়ী। মুসলমানদের পক্ষ থেকে তীর ছোঁড়েন সা'দ ইবনে আবী ওয়াক্কাস রা.। এটিই ছিল আল্লাহর রাস্তায় ছোড়া মুসলমানদের প্রথম তীর।
দুই দলই পিছু হটছিল। মুসলমানদের পশ্চাদপসরণ ছিল শক্তিশালী ও সংগঠিত। সাদ ইবনে আবী ওয়াক্কাস নিরাপদ ও সংগঠিত প্রস্থানের জন্যই তীর ছুঁড়েছিলেন। মুসলিম বাহিনী নিরাপদে মদিনায় ফিরেছিল এবং এর পেছনে বড় ভূমিকা ও কৃতিত্ব ছিল সা'দ ইবনে আবী ওয়াক্কাসের।
উতবা ইবনে গাযওয়ান এবং মিকদাদ ইবনে আসওয়াদ রা. সেদিন মুসলমানদের দিকে পালিয়ে এসেছিলেন। তারা দু'জন আগেই ইসলাম গ্রহণ করেছিলেন। এই সারিয়ায় সা'দ এর তীর ছোড়া ছিল মুসলমানদের সামরিক উন্নতির প্রমাণ। এই সারিয়াটি আরও প্রমাণ করে আকাবায়ে সানিয়ার ঐক্যমত অনুযায়ী বদরের আগের যুদ্ধগুলোতে শুধু মুহাজির সাহাবীদের পাঠানোর সিদ্ধান্ত যথাযথ ছিল। ৭৬
৭. জুহাইনার সাথে চুক্তি
'তাদের জীবন ও সম্পদের নিরাপত্তা দেয়া হলো। যারা তাদের ওপর অত্যাচার করবে বা তাদের সাথে যুদ্ধ করবে তাদের বিরুদ্ধে তারা সাহায্য পাবে; দীন ও আভ্যন্তরিন বিরোধের ক্ষেত্রে নয়। তাদের মরূবাসী বিশ্বস্ত ও উত্তম ব্যক্তিদের জন্য তাই প্রজোয্য যা তাদের উপস্থিত ব্যক্তিদের জন্য প্রজোয্য। ৭৭
এই চুক্তির প্রভাব প্রকাশ পেয়েছিল যখন মাজদী ইবনে আমর জুহানী হামযা ইবনে আব্দুল মুত্তালিবের সারিয়া ও কুরায়েশের আবু জাহেলের নেতৃত্বাধীন ৩০০ আরোহী কাফেরের মাঝে শান্তি স্থাপন করেছিলেন। তারা মুখোমুখি হয়েছিল ঈসের পাশে জুহায়নাদের প্রভাবাধীন এলাকায়। দুই দল যুদ্ধের জন্য কাতারবন্দীও হয়ে গিয়েছিল। কিন্তু যুদ্ধ শুরু হওয়ার আগেই বনু জুহাইনার একজন নেতা মাজদী ইবনে আমর তাদের মাঝে এসে দাঁড়ান এবং দুই দলের মধ্যে শান্তি স্থাপন করতে সক্ষম হয়। মাজদী ও তার গোত্র দুই দলেরই মিত্র ছিল। তাই মুসলিম ও কাফের কোনো দলই তার বিরোধিতা করেনি। যুদ্ধ ছাড়াই নিজেদের এলাকার দিকে চলে যায়। ৭৯
এই মৈত্রী চুক্তি থেকে বোঝা যায়, ইসলামী রাষ্ট্রের পক্ষ থেকে প্রতিবেশী গোত্রগুলোর সাথে মৈত্রী স্থাপনই ছিল প্রথম প্রদক্ষেপ, সামরিক পদক্ষেপ পরে নেয়া হয়েছে। উপকূলবর্তী এলাকায় কুরায়েশের বিরুদ্ধে সারিয়া পাঠানোর আগেই উপকূলবর্তী অঞ্চলের অধিবাসী জুহায়নার সাথে মৈত্রী চুক্তি করা হয়েছিল। তাই তারা যুদ্ধ ঠেকানোর জন্য মুসলমান ও কাফেরদের মধ্যে মধ্যস্ততা করে।
বনু জুহায়নার সাথে মুসলমানদের এই চুক্তি থেকে আরও বোঝা যায়, অন্য কোনো দেশ একইসাথে মুসলিম দেশ এবং তাদের শত্রু দেশের সাথে চুক্তিবদ্ধ থাকতে পারে; যদি সেই চুক্তিতে মুসলমানদের বিরুদ্ধে তাদের শত্রুদের সাহায্য করার মতো কোনো বিষয় না থাকে এবং অন্য কোনো দেশের মধ্যস্থতায় সাড়া দিয়ে প্রস্তুতি নেওয়ার পরও শত্রুদের সাথে যুদ্ধ না করা মুসলিম রাষ্ট্রের জন্য বৈধ। যদি এতে মুসলমানদের কোনো ক্ষতি না হয়।৮০
মূর্তিপূজকদের উপর হামযা রা.-এর সারিয়া অভিযানটির প্রভাব ছিল সুদূরপ্রসারী। এই অভিযানের কারণে কুরায়েশের মধ্যে ভীতি ছড়িয়ে পড়ে। তাদের অস্তিত্ব কেঁপে ওঠে। চারপাশের ঘনায়িত বিপদ সম্পর্কে সচেতন হয়ে ওঠে তারা। তারা বুঝতে পারে, তাদের ব্যবসা-বাণিজ্য অর্থাৎ সামগ্রিক অর্থনীতি হুমকির মুখে পড়েছে। ৮১
আবু জেহেল মক্কায় ফিরে বললো, হে কুরায়েশ সম্প্রদায়! মুহাম্মাদ ইয়াসরিবে বসতি স্থাপন করেছে এবং সে তার অনেকগুলো বাহিনী পাঠিয়েছে। সে চায় তোমাদের সম্পদ কেড়ে নিতে। তাই পথ চলতে সতর্ক থেকো। সে ক্রুদ্ধ সিংহের মতো তোমাদের অপেক্ষা করছে। তোমরা তাকে উটের নখে থাকা কীটের মতো তাড়িয়ে দিয়েছো, এতে সে দারুণ ক্রুদ্ধ। আল্লাহর শপথ! সে জাদুকর। আমি তাকে বা তার সঙ্গীদের যখনই দেখেছি তাদের সাথে শয়তানও দেখেছি। নিশ্চই তোমরা কায়লার সন্তানদের৮২ শত্রুতা সম্পর্কে জানো। সে একজন শত্রু সে শত্রুদের সাহায্য নিচ্ছে। ৮৩
৮. আব্দুল্লাহ ইবনে জাহাশের সারিয়ার কিছু শিক্ষণীয় বিষয়
আব্দুল্লাহ ইবনে জাহাশের সারিয়া অভিযানের কিছু গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব এবং এতে কিছু শিক্ষা ও জ্ঞাতব্য বিষয় রয়েছে,
ক. এই সারিয়ার ঘটনাবলীর বর্ণনায় এসেছে যে, সারিয়াটি রওয়ানা হওয়ার আগে রসূল সা. আমিরে সারিয়ার হাতে একটি চিঠি দিয়ে বলেছিলেন দুই দিন সফর করার আগে যেন তিনি চিঠিটি না পড়েন। এতে প্রতিফলিত হয়েছিল যুদ্ধ-পরিকল্পনা গোপন রাখার কৌশল। চিঠিটিতে গন্তব্যের কথা বলা হয়েছিল। রসূল সা. চেয়েছিলেন, সাহাবীদের গন্তব্য যেন শত্রুর কাছে গোপন থাকে এবং মুসলিম সৈন্যবাহিনী শত্রুর কৌশল থেকে নিরাপদ থাকে। মদিনায় বিপুল সংখ্যক ইহুদি ও মুশরিকর বসবাস ছিল, তাই সেনাবাহিনীর গন্তব্য সম্পর্কে মদিনায় জানাজানি হলে সম্ভাবনা ছিল তাদের কেউ মক্কা বাসীকে মুসলিম বাহিনীর অবস্থান বা গতিবিধি জানিয়ে দেবে। রসূল সা.-এর পাঠানো বাহিনীকেও জানতে দিলেন না তিনি তাদের কোন দিকে পাঠাচ্ছেন। অভিযানের লক্ষ্য বা গন্তব্য প্রকাশ হয়ে পড়ার সম্ভাবনা আর রইলো না। ৮৪
নববী শিক্ষার প্রভাবও এখানে লক্ষণীয়। রসূল সা.-এর নির্দেশ তাদের সবাই মেনে নিয়েছেন এবং চলেছেন শত্রুর ঘাঁটির দিকে। সেই ঘাঁটি অতিক্রম করে তারা এগিয়ে গেছেন এবং শত্রু তাদের পেছনে রয়ে গেছে। এটা ছিল সাহাবীদের ঈমানী শক্তি ও আল্লাহর পথে আত্মোৎসর্গের মানসিকতার প্রমাণবহ। ৮৫
খ. এই অভিযানের পর কাফেররা চেয়েছিল সাহাবীদের সম্মানিত মাসে হত্যা করার কথা প্রচার করে সুবিধা নিতে। তারা মুসলমানদের বিরুদ্ধে একটি আক্রমণাত্মক প্রচার যুদ্ধ শুরু করেছিল। ইবরাহিমী ধর্মের যে শিক্ষাগুলো তখনও জাহেলি সমাজে রয়ে গিয়েছিল তার একটি ছিল হারাম মাসগুলোতে যুদ্ধ নিষিদ্ধ হওয়া। আব্দুল্লাহ ইবনে জাহাশের বাহিনী এক কাফেরকে হত্যা ও দু'জনকে বন্দী করার পর কুরায়েশ সুযোগ পেয়ে তুমুল প্রচারণা চালাতে শুরু করলো যে, মুহাম্মাদ ও তার সঙ্গীরা সীমালঙ্ঘনকারী, তারা সম্মানিত মাসের সম্মান রক্ষা করে না। ৮৬ তারা বললো, মুহাম্মাদ ও তার সঙ্গীরা সম্মানিত মাসকে হত্যার জন্য হালাল করে নিয়েছে, তাতে রক্ত প্রবাহিত করেছে, সম্পদ লুণ্ঠন করেছে, বন্দী করেছে। ৮৭
কুরায়েশ তাদের এই কৌশলে প্রথম দিকে সফলতা পেয়েছিল। তারা তাদের প্রচারের পক্ষে সমর্থন পাচ্ছিলো। এমন কি মদিনার মুসলমানদের মনেও এর প্রভাব পড়েছিল। মুসলমানরা নিজেদের মধ্যে এ নিয়ে তর্ক বিতর্ক করতে লাগলেন। পবিত্র মাসে যুদ্ধের জন্য আব্দুল্লাহ ইবনে জাহাশের বাহিনীকে দায়ী করে তাদের নিন্দা করলেন। ইহুদিরাও বিশৃঙ্খলা সৃষ্টির চেষ্টা চালাতে লাগলো। তারা বললো, কুরায়েশ ও মুসলমানদের মধ্যে এবার যুদ্ধ হবেই। বরং সম্মানিত মাসের সম্মান বিনষ্ট করার পরিণতি হিসেবে মুসলমানদের সাথে পুরো আরবের যুদ্ধ হবে। এবং তারা আওড়াতে লাগলো, আমর ইবনুল হাযরামী তাকে হত্যা করেছে ওয়াকিদ ইবনে আবদিল্লাহ। 'আমর আমারাতিল হারব' অর্থাৎ যুদ্ধকে স্থায়িত্ব দিয়েছে, 'হাযরামী হাযারাতিল হারব' অর্থাৎ হাযরামি যুদ্ধ উপস্থিত করেছে এবং 'ওয়াকিদ ওয়াকাদাতিল হারব' অর্থাৎ ওয়াকিদ যুদ্ধের আগুন জ্বালিয়েছে। ইহুদিদের এসব কথা বার্তা ছিল তাদের মনে লুকিয়ে রাখা ইসলাম ও মুসলমানদের প্রতি বিদ্বেষের বহিঃপ্রকাশ।৮৯
যখন আব্দুল্লাহ ইবনে জাহাশ ও তার সঙ্গীরা ভাবতে লাগলেন তরা ধ্বংস হয়ে গেছেন, তখন আল্লাহর পক্ষ থেকে স্পষ্ট উত্তর এলো। কাফেরদের সম্মানিত মাসের সম্মান বিনষ্ট করার প্রচারণা এবং এটা দিয়ে তাদের নিজেদের অপরাধ ঢাকতে চাওয়ার প্রচেষ্টার উত্তরে কুরআন অত্যন্ত স্পষ্ট ভাষায় তাদের সব কুযুক্তি বাতিল করে দিলো। পবিত্র মাসে যুদ্ধের নিন্দার উত্তরে আল্লাহ বললেন, আল্লাহর রাস্তা থেকে বাঁধা দেওয়া, তাকে অস্বীকার করা সম্মানিত মাসে এবং হারামে যুদ্ধ করার চেয়ে বড় পাপ। হারামের অধিবাসীদের বের করে দেওয়া সম্মানিত মাসে যুদ্ধ করার চেয়ে বড় পাপ। মানুষকে তার দীনের ব্যাপারে কষ্টে ফেলা পবিত্র মাসে হত্যা করার চেয়ে বড় পাপ। কুরায়েশরা এই বড় বড় পাপগুলো করে এখন ভুলে গেছে এবং সেগুলোকে তুচ্ছ মনে করছে। মাসের সম্মান ছাড়া আর কিছুই যেন তাদের মনে নেই।
কুরায়েশ এই ঘটনাকে ইসলাম ও মদিনা রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে যুদ্ধ উস্কে দেওয়ার হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করছিল। মূর্তিপূজক গোত্রগুলোকে রসূল সা. ও সাহাবীদের বিরুদ্ধে ক্ষেপিয়ে তুলছিল। ইসলামের প্রতি বৈরী মনোভাব সৃষ্টি করছিল পুরো আরবে। তাদের আগ্রাসী প্রচারণার মুখে এমন কি রসূল সা.ও চিন্তিত হয়ে পড়লেন। কুরআনের আয়াত অবতীর্ণ হওয়ার আগে পবিত্র মাসে যুদ্ধ করার জন্য আব্দুল্লাহ ইবনে জাহাশ ও তার সঙ্গীদের তিরস্কারও করেছিলেন রসূল সা.।১০
আল্লাহ রাব্বুল আলামীন কুরায়েশের উদ্দেশ্যমূলক সব দাবি প্রত্যাখ্যান করে আয়াত অবতীর্ণ করলেন। বললেন, যদিও সম্মানিত মাসে যুদ্ধ বৈধ নয় কিন্তু আল্লাহর কাছে তাদের কোনো সম্মান নেই যারা সম্মান বিনষ্টের সূচনা করেছে এবং আল্লাহর পথে যেতে মানুষকে বাঁধা দিয়েছে।১১
গ. সৈন্যদের নিরাপত্তার গুরুত্ব
কুরায়েশের কয়েকজন যখন আব্দুল্লাহ ইবনে জাহাশের সারিয়া-অভিযানের যুদ্ধবন্দীদের রক্তপণ দিয়ে ছাড়িয়ে নিতে এলো, তখন সা'দ ইবনে আবী ওয়াক্কাস ও উতবা ইবনে গাযওয়ান তাদের হারানো উট খুঁজতে মদিনার বাইরে অবস্থান করছিলেন। রসূল সা. তাদের না ফেরা পর্যন্ত ফিদিয়া গ্রহণ করলেন না। বললেন, আমার আশংকা হয়, ফেরার পথে তোমরা সা'দ ও উতবাকে পেয়ে যাবে। তারা ফিরে এলে রসূল সা. ফিদিয়া গ্রহণ করলেন।
বন্দীদের মধ্য থেকে হাকাম ইবনে কায়সান ইসলাম গ্রহণ করেন। ১৯২ ওসমান ইবনে আব্দিল্লাহ ইবনে মুগীরা কাফের অবস্থায় মক্কায় ফিরে যান। ৩
এই ঘটনা থেকে বোঝা যায় একজন সেনাপতি বা নেতার উচিত নিজের সৈন্যদের নিরাপত্তাকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেয়া। কারণ তারাই আল্লাহর দীনের সাহায্যে, ইসলাম প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে জীবন বিলিয়ে দেয়।
আধুনিক সমর-বিজ্ঞান বলে, একজন সৈন্য যখন অনুভব করে, তার নেতা তার নিরাপত্তা ও সুস্থতাকে গুরুত্ব দেন, তখন সে সর্বোচ্চ ত্যাগের জন্য ঝাঁপিয়ে পড়তে কুণ্ঠাবোধ করে না। ১৯৪
ঘ. যুদ্ধে সামরিক সক্ষমতার সাক্ষর
সরিয়ায়ে আব্দিল্লাহ ইবনে জাহাশ তার লক্ষ্য পূরণ করেছিল। এই বাহিনী বুঝিয়ে দিয়েছিল মুসলমানরা এখন কুরায়েশ প্রভাবিত এলাকায় কুরায়েশের ওপর আক্রমণ করতে সক্ষম। এই আক্রমণ কুরায়েশকে হতবুদ্ধি করে দেয়। মুসলমানরা তাদের নাকের ডগায় এসে তাদের একজনকে হত্যা ও দু'জনকে বন্দী করে নিরাপদে মদিনায় ফিরে যাওয়ার আগ পর্যন্ত কুরায়েশরা এই বাহিনীর আগমন বা গতিবিধি সম্পর্কে কিছুই জানতে পারে নি। তাদের গোয়েন্দারা মুসলিম সেনাবাহিনীর গতিবিধি ও গন্তব্যের খবর জানতে ব্যর্থ হয়েছিল। এটা ছিল রসূল সা.-এর সমর-কৌশলের সফলতা। সেনাবাহিনীর গন্তব্য ও দিক নির্দেশনা সম্বলিত চিঠি দু'দিন পর খোলার নির্দেশ দিয়ে রসূল সা. এটাই চেয়েছিলেন। কুরায়েশের গোয়েন্দারা সেনাবাহিনীকে পর্যবেক্ষণ করে, তাদের কথা বার্তা শুনে গন্তব্য অনুমান করতে ব্যর্থ হয়েছিল, কারণ সেনাপতিসহ বাহিনীর কেউ জানতো না তারা কোথায় যাবে। এটি সমর-কৌশলের একটি গুরুত্বপূর্ণ নীতি।
এই সারিয়া অভিযানের ঘটনা সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণ করে, নবী সা.-এর সারিয়াগুলো সমরাস্ত্রে সজ্জিত থাকতো এবং যে কোনো পরিস্থিতি মোকাবেলা করার সামর্থ্য তাদের থাকতো।
সারিয়ায়ে আব্দুল্লাহ ইবনে জাহাশ ছিল মুসলমানদের সামরিক দক্ষতার পাশাপাশি উন্নত মনোবলেরও প্রমাণ। আব্দুল্লাহ ইবনে জাহাশ কোনো প্রশ্ন বা দ্বিধা ছাড়াই রসূল সা.-এর চিঠি না খোলার নির্দেশ এবং পরবর্তীতে চিঠিতে দেয়া নির্দেশ পালন করেছিলেন। এটা ছিল রসূল সা.-এর তরবিয়তের প্রভাব। চিঠি পড়েই সাথে সাথে নির্দেশ পালনের জন্য তৈরি হয়ে সৈন্যদের উদ্দীপ্ত করার জন্য তিনি বলেছিলেন, তোমাদের মধ্যে যারা আল্লাহর পথে শহিদ হতে চাও, তারা আমার সাথে চলো, অন্যরা মদিনায় ফিরে যাও। আমি রসূল সা.-এর নির্দেশ অনুযায়ী এগিয়ে যচ্ছি।
৯. সারিয়া অভিযানের উদ্দেশ্য
রসূল সা.-এর সারিয়া ও গাযওয়া অভিযানগুলোর দিকে বিশ্লেষণী দৃষ্টিতে তাকালে আমরা এসব অভিযানের অনেকগুলো লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য অনুধাবন করতে পারি। কিছু শিক্ষণীয় বিষয়ও উপলব্ধি করতে পারি।
বদরের আগে পাঠানো সারিয়া ও গাযওয়াগুলোর দিকে তাকালে আমরা দেখতে পাই, এই অভিযানগুলোতে শুধু মুহাজির সাহাবীরাই অংশগ্রহণ করেছিলেন। আনসাররা এসব যুদ্ধে অংশগ্রহণ করেন নি। ইবনে সা'দ রহ. লিখেছেন, এই বাহিনীগুলোর সব সৈন্যই ছিলেন মুহাজির। বদর যুদ্ধের আগে রসূল সা. একজন আনসারকেও যুদ্ধে পাঠান নি। বদরেই প্রথমবারের মতো আনসাররা ইসলামের জন্য যুদ্ধ করেন। এটা ছিল রসূল সা.-এর একটি সুচিন্তিত সিদ্ধান্ত। নবীজি চেয়েছিলেন আনসারদের মনে মুহাজির সাহাবীদের প্রয়োজনীয়তার অনুভূতি জাগিয়ে তুলতে। যেন আনসারীরা কোনো ভাবেই মুহাজিরদের বোঝা মনে না করেন।
বদরপূর্ব এই যুদ্ধগুলোর লক্ষ্য ছিল কুরায়েশের অর্থনীতি দুর্বল করে দেওয়া এবং তাদেরকে কার্যত অবরুদ্ধ করে ফেলা, মুসলমানদের কাছ থেকে কেড়ে নেওয়া সম্পদ পুনরুদ্ধার করা, কুরায়েশকে সামরিকভাবে দুর্বল করা, সাহাবীদের যুদ্ধের বাস্তবিক প্রশিক্ষণ দেয়া, কুরায়েশের কর্মকাণ্ড পর্যবেক্ষণ করা, মদিনার অধিবাসী ও প্রতিবেশী শত্রুদের সন্ত্রস্ত করা এবং শত্রুর সক্ষমতা ও সামর্থ্য যাচাই করা ইত্যাদি।৯৭
এই অভিযানগুলো রসূল সা.-এর লক্ষ্য অনেকাংশে পূরণ করেছিল। এগুলোর কিছু প্রভাব নীচে আলোচনা করা হলো।
ক. শত্রুদের মধ্যে ভীতি সঞ্চার
এই সারিয়া ও গাযওয়াগুলো ইসলামের শত্রুদের বুঝিয়ে দিয়েছিল মুসলমানরা যথেষ্ট শক্তিশালী এবং তাদের বিরুদ্ধে যে কোনো পদক্ষেপের জবাব দেওয়ার ক্ষমতা মুসলমানদের রয়েছে। যে রাষ্ট্রের সেনাবাহিনী দিনে ও রাতে বিভিন্ন দিকে যাত্রা করছে, সেই রাষ্ট্রে আক্রমণ বা সেই রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে কোনো ধরণের চক্রান্ত করার আগে শত্রু দশ বার ভাববে এটাই স্বাভাবিক। প্রতিবেশী ইহুদি ও মূর্তিপূজক গোত্রগুলোকে সন্ত্রস্ত করে রাখা ছিল অত্যন্ত প্রয়োজনীয়। যেন তারা মুসলমানদের শত্রুদের সাথে কোনো ধরণের যোগসাজস বা চক্রান্ত করার সাহস না পায়।
এই সারিয়া ও গাযওয়াগুলো খুব অল্প সময়কালের মধ্যে পাঠানো হয়েছিল। একটি দল ফিরে আসার পরপরই আরেকটি দল পাঠানো হতো। এতে কুরায়েশের অর্থনীতি পর্যুদস্ত হয়ে পড়েছিল। মুসলমানরা সাধারণত সেই কাফেলাগুলোকেই হামলার লক্ষ্যবস্তু বানাতেন যারা দুর্বল প্রহরায় বেশি মালামাল বহন করতো। এই হামলাগুলোর কারণে মক্কার ব্যবসায়ীদের পাশাপাশি সম্পদশালী নেতাদেরকেও আতংকগ্রস্থ করে তুলেছিল। ১৮
খ. আরব গোত্রগুলোর সাথে মৈত্রি গড়ে তোলা
রসূল সা. জুহায়না, তার মিত্র এবং ওই অঞ্চলের আরও কিছু গোত্রের সাথে মৈত্রী চুক্তি করেছিলেন যেন কুরায়েশ ও মুসলমানদের বিরোধে তারা নিষ্ক্রিয় থাকে। তারা যেন কুরায়েশের পক্ষে চলে না যায়।
এই গোত্রগুলো কুরায়েশের দিকে ঝুঁকে পড়ার প্রবল আশংকা ছিল। কারণ দীর্ঘ কাল থেকে তারা ছিল পরস্পরের সহযোগী। তাদের মধ্যকার ঐতিহাসিক সমঝোতাকে কুরআনে ঈলাফ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। কুরায়েশ শামের ব্যবসা যাত্রার পথ নিরাপদ রাখার জন্য এই মৈত্রী গড়ে তুলেছিল। १०० কয়েকটি গোত্রের সাথে রসূল সা.-এর চুক্তির পর কুরায়েশের ব্যবসা যাত্রা আর নিরাপদ রইলো না। মুসলমানরা সেই অঞ্চলের নেতৃত্বের ভূমিকায় অবতীর্ণ হলো। ১০১
রসূল সা. ব্যবসা যাত্রার পথ থেকে বেদুইনদেরও উৎখাত করলেন। বেদুইনরা ব্যবসায়িক কাফেলাগুলোর জন্য হুমকি হয়ে দাঁড়ানোর ক্ষমতা রাখতো। সেই পথ অতিক্রমকারী কাফেলাগুলো তাদেরকে ভেট না দিয়ে যেতে পারতো না। মদিনায় ইসলামী রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠিত হলে তাদের ভেট বন্ধ হয়ে গেলো। সেই সময় তারা ইসলামী রাষ্ট্রে আক্রমণ চালানোর চেষ্টা করেছিল। কুরায ফাহরীর মদিনা থেকে উট ছিনতাই করে পালানো ছিল এরকম একটি আক্রমণ। রসূল সা. তার পেছনে ধাওয়া করে প্রায় দেড়শ কিলোমিটার দূরে বদরের নিকটবর্তী সাফওয়ান এলাকা পর্যন্ত গিয়েছিলেন। সীরাতলেখকরা এই ধাওয়াকে বদরের ছোট গাযওয়া হিসেবে উল্লেখ করেন। এই গাযওয়া ছিল বেদুইনদের জন্য একটি বার্তা। এরপর বেদুইনরা আর মদিনায় আক্রমণ চালানোর সাহস পায় নি। মুসলমানরা ডাকাতদের ভেট দেয়নি বরং পিছু হটতে বাধ্য করেছে। শেষ পর্যন্ত বেদুইন গোত্রগুলো মুসলমানদের সাথে সমঝোতায় আসে এবং তাদের দিক থেকেও মুসলমানরা নিরাপদ হয়ে যায়। ১০২
গ. ইসলামী বিজয় অভিযানের সাথে ছোট যুদ্ধগুলোর সম্পর্ক
সারায়া ও বুউস পাঠানোর ধারা চলমান ছিল এবং এগুলো ছিল মুসলিম সৈন্যদের জন্য বাস্তবিক প্রেক্ষাপটে সামরিক প্রশিক্ষণ। ধারাবাহিক সারিয়া অভিযানগুলো ছিল মুসলমানদের অফুরন্ত প্রাণশক্তি ও কর্মোদ্যমের প্রমাণ। রসূল সা.-এর নেতৃত্বে মদিনার ইসলামী রাষ্ট্র যেন হয়ে উঠেছিল মৌমাছির চাকের মতো এর সেনাবাহিনী কখনো ক্লান্ত হতো না, ঝিমিয়ে পড়তো না। এই সারিয়া, বা'স ও গাযওয়াগুলোতে সেনাপতি বা সাধারণ সৈন্য হিসেবে অংশগ্রহণের জন্য সাহাবীরা আকুল ছিলেন। তারাই ছিলেন পরবর্তীতে বড় বড় বিজয় অভিযান ও ইসলামী সাম্রজ্য প্রতিষ্ঠার প্রধান কারিগর। রসূল সা. যুদ্ধ, শান্তি, নিরাপত্তা ও আশংকার সময়েও সাহাবীদের এসব বড় বড় বিজয়ের সুসংবাদ শোনাতেন।
আমরা যদি এই সারিয়াগুলোর নেতা ও সৈন্যদের নামগুলোর দিকে ভালোভাবে লক্ষ্য করি তাহলে দেখতে পাবো, পরবর্তীকালে এদের বেশিরভাগই ইসলামের ইতিহাসেও বড় বড় কীর্তির সাক্ষর রেখেছেন। যেমন, সিরিয়া বিজয় করেছিলেন আমিনুল উম্মাহ উবায়দা ইবনুল জাররাহ। কাদেসিয়ার যুদ্ধজয়ী সেনাপতি ও মাদায়েন বিজেতা ছিলেন সা'দ ইবনে আবী ওয়াক্কাস রা.। আল্লাহর নাঙ্গা তরবারি খালেদ ইবনে ওয়ালিদ রোমীয়দের ইয়ারমুকে পরাজিত করেছিলেন। আমর ইবনুল আস মিশর বিজয় করেছিলেন। আল্লাহ তাদের ওপর সন্তুষ্ট হয়েছেন তাদেরকেও সন্তুষ্ট করেছেন। খালেদ ও আমর রা. আরও পরে ইসলাম গ্রহণ করেছিলেন। ইসলাম গ্রহণের পর রসূল সা.-এর পাঠানো বিভিন্ন সারিয়ায় তারা নেতৃত্ব দেন। রসূল সা.-এর জীবনকালের সারিয়া ও গাযওয়াগুলোই ছিল এই সমর নেতাদের প্রশিক্ষণের ভিত্তি বা প্রথম পাঠ যারা পরবর্তীকালে ইসলামের বিজয় অভিযান পৃথিবীর পূর্বে ও পশ্চিমে পৌঁছে দেন।
টিকাঃ
৫৮ আসসীরাতুন নাবাবীয়্যাহ লিআবী শুহবা (১/৮৫, ৮৬)
৫৯ মাঈনুস সীরাহ (পৃ: ১৭৫)
৬০ ফি যিলালিস সীরাহ, গাযওয়াতু বদর, আবু ফারেস (পৃঃ ১২)
৬১ আর রওযুল উনফ (৫/৪৩)
৬২ দিরাসাত ফি আহদিন নবুয়্যাহ লিশ শুজা' (পৃঃ১৬৩)
৬৩ সহিহ বুখারী, কিতাবুত তামান্নী (৩/২১৯)
৬৪ বেলায়াতুশ শুরতা ফিল ইসলাম, ড. ওমর মুহাম্মাদ আল হামদানী
৬৫ আল-ওসায়িকুস সিয়াসিয়্যাহ, মুহাম্মাদ হামীদুল-াহ (পৃঃ ২২০) (হাদিস: ১৫৯)
৬৬ নাশআতুদ দওলাতিল ইসলামিয়্যাহ, ড. আওনুশ শরীফ (পৃ:৪৩)
৬৭ আল মাদখালুল ফিকহী ফি সিয়াসাতিশ শারইয়্যাহ, ড. মুহাম্মাদ খায়ের হায়কাল (১/৪৭৯)
৬৮ ঐ (পৃ ১২৪)
৬৯ এটা একটি মূল নীতি যার আসল রসূল সা.-এর হদিস, বর্ণনা করেছেন ইবনে মাজা (২/৩৯) (হাদিস: ১৮৯৬) হাদিসটি সহিহ
৭০ আল মাদখালুল ফিকহী, শায়েখ যুরকা (পৃঃ ৯৭২)
৭৬ ঐ (পৃ: ৯২)
৭৭ মাজমুআতু ওসায়িকিস সিয়াসিয়্যাহ, মুহাম্মাদ হামীদুল-াহ (পৃঃ২৬)
৭৯ তাবাকাতে ইবনে সা'দ (২/৬)
আস-সারায়া ওয়াল বুউস (পৃঃ৮৫)
আস-সারায়া ওয়াল বুউসুন নাবাবিয়্যাহ (পৃঃ৮৬)
৮০ আল জিহাদু ওয়াল কিতালু ফিস সিয়াসাতিশ শারইয়্যাহ (১/৪৭৮, ৪৭৯)
৮১ আস সারায়া ওয়াল বুউসুন নাবাবিয়্যাহ (পৃ: ৮৬)
৮২ আওস ও খাযরাজকে ব্যাঙ্গার্থে বলা হতো। কায়লা তাদের মা; তাদেরকে তার দিকে সম্পর্কিত করা হতো।
৮৩ সীরাতে ইবনে হিশাম (১/২১৮, ২১৯)
৮৪ আত-তারীখুল ইসলামী মাওয়াফিক ও ইবার (৪/৭১)
৮৫ আত-তারীখুল ইসলামী মাওয়াফিক ও ইবার (৪/৭১)
৮৬ মাক্কাতু ওয়াল মাদিনাতু ফিল জাহিলিয়্যাতি ওয়া আহদির রসূল, শরীফ আহমদ (পৃঃ ৪৪৫)
৮৭ সুনানে বায়হাকি (৫৯/৯)
৮৮ মাক্কাতু ওয়াল মাদীনাতু ফিল জাহিলিয়্যাতি ওয়া আহদির রসুল (পৃঃ ৪৪৫)
৮৯ আত তারীখুল ইসলামী (৪/৭২)
৯০ দাওলাতুর রসূল মিনাত তাকওয়ীন ইলাত তামকীন (পৃঃ ৫৩৩)
৯১ আস-সারায়া ওয়াল বুউসুন নাবাবিয়্যাহ (পৃ: ১০০)
৯২ আস-সারায়া ওয়াল বুউসুন নাবাবিয়্যাহ (পৃ: ১০০)
৯৩ আস-সারায়া ওয়াল বুউসুন নাবাবিয়্যাহ (পৃ: ১০০)
৯৪ গাযওয়াতু বাদারিল কুবরা, মুহাম্মাদ আবু ফারেস (পৃ:২৩)
৯৫ আর রসূলুল কায়েদ (পৃঃ ৯৪)
৯৭ দাওলাতুল ইসলাম মিনাত তাকওয়ীন ইলাত তামকীন (পৃঃ ৫৩২)
৯৮ দাওলাতুল ইসলাম মিনাত তাকওয়ীন ইলাত তামকীন (পৃঃ ৫৩২)
৯৯ সূরা কুরায়শ (আয়াত: ১-৪)
১০০ আল মুজতামাউল মাদানী, ড. আকরাম যিয়া ওমরী (পৃঃ ২৭)
১০১ দিরাসাত ফিস সীরাহ (পৃঃ ১৯)
১০২ দিরাসাতুন ফি আহদিন নাবাবিয়্যাহ, ড. আব্দুর রহমান শুজা' (পৃ:১৩১)