📘 নবীজির যুদ্ধ জীবন পাঠ ও পর্যালোচনা > 📄 আত্মিক প্রস্তুতি

📄 আত্মিক প্রস্তুতি


আল্লাহর পক্ষ থেকে যুদ্ধের অনুমতি আসার সাথে সাথেই রসূল সা. সাহাবীদেরকে যুদ্ধের প্রশিক্ষণ দিতে শুরু করেছেন। তাদের সাথে অংশগ্রহণ করেছেন প্রশিক্ষণ ও যুদ্ধ মহড়ায়। যুদ্ধের প্রশিক্ষণ ও মহড়াকে বড় ইবাদত, বিপুল সওয়াবের কাজ গণ্য করেছেন। আল্লাহ যেমন বলেছেন,
وَأَعِدُّوا لَهُمْ مَا اسْتَطَعْتُمْ مِنْ قُوَّةٍ وَمِنْ رِبَاطِ الْخَيْلِ تُرْهِبُونَ بِهِ عَدُوَّ اللَّهِ وَعَدُوَّكُمْ وَآخَرِينَ مِنْ دُونِهِمْ لَا تَعْلَمُونَهُمُ اللَّهُ يَعْلَمُهُمْ وَمَا تُنْفِقُوا مِنْ شَيْءٍ فِي سَبِيلِ اللَّهِ يُوَفَّ إِلَيْكُمْ وَأَنْتُمْ لَا تُظْلَمُونَ
তোমরা তাদের মোকাবেলার জন্য যথাসাধ্য শক্তি অশ্ববাহিনী প্রস্তুত রাখবে। এগুলো দিয়ে তোমরা সন্ত্রস্ত করবে আল্লাহর শত্রুকে, তোমাদের শত্রুকে এবং অন্যদেরকে যাদেরকে তোমরা জানো না, আল্লাহ তাদেরকে জানেন। আল্লাহর পথে তোমরা যা কিছু ব্যায় করবে তার পূর্ণ প্রতিদান তোমাদেরকে দেওয়া হবে এবং তোমাদের প্রতি জুলুম করা হবে না। ১৪
মুসলিম মুজাহিদ গঠনের ক্ষেত্রে রসূল সা. আত্মিক ও দৈহিক প্রশিক্ষণের দিকে সমানভাবে লক্ষ্য রেখেছিলেন。
রসূল সা. মুজাহিদদের আত্মিক শক্তি বাড়াতে চেষ্টা করেছেন। তিনি তাদের মনে এই বিশ্বাস বদ্ধমূল করে দিয়েছিলেন যে, মুসলমান আল্লাহর পথে জিহাদ করে বিজয়ী হয়, নয়তো জান্নাতে চলে যায়। এই দৃঢ় বিশ্বাসের কারণেই মুসলিম সৈন্যরা যুদ্ধের ময়দানে তাদের পরিপূর্ণ শক্তি নিয়োগ করতো। ১৫ রসূল সা. সাহাবায়ে কেরামকে বলেছিলেন, তার শপথ যার হাতে আমার প্রাণ যদি মুমিনদের মধ্যে এমন কিছু মানুষ না থাকতো, যারা আমার সাথে যুদ্ধে যেতে চায় কিন্তু আমি বাহন স্বল্পতার কারণে তাদের নিতে পারি না, তাহলে আমি আল্লার পথের কোনো যুদ্ধ থেকে পিছিয়ে থাকতাম না। আল্লাহর শপথ! আমি কামনা করি আমি আল্লাহর পথে নিহত হবো, আবার জীবিত হবো, আবার নিহত হবো, আবার জীবিত হবো, আবার নিহত হবো। ১৬
রসূল সা. আরও বলেন, জান্নাতে প্রবেশ করে কেউ দুনিয়াতে ফিরে আসতে চাইবে না। কারণ পৃথিবীতে তার পাওয়ার কিছুই থাকবে না। শুধু আল্লাহর পথে শহিদ হওয়া ব্যক্তি শাহাদাতের মর্যাদা প্রত্যক্ষ করার কারণে পৃথিবীতে বার বার ফিরে এসে আল্লাহর রাস্তায় শহিদ হতে চাইবে।১৭

টিকাঃ
১৪ সূরা আনফাল (আয়াত: ৬০)
১৫ দিরাসাহ ফিস সীরাহ (পৃ: ১৬১)
* বুখারী, কিতাবুল জিহাদি ওয়াস সিয়ার, বাবু তামাল্লিশ শাহাদাহ (৩/২৬৮) (হাদিস: ২৭৯৭)
১৭ বুখারী, কিতাবুল জিহাদ ওয়াস সিয়ার, বাবু তামানিল মুজাহিদ আন এরজিয়া ইলাদ দুনয়া (৩/২৭৪) (হাদিস: ২৮১৭)

📘 নবীজির যুদ্ধ জীবন পাঠ ও পর্যালোচনা > 📄 যুদ্ধ প্রশিক্ষণ

📄 যুদ্ধ প্রশিক্ষণ


রসূল সা. উম্মতের পুরুষ, নারী, শিশু, যুবক ও বৃদ্ধসহ কর্মক্ষম সব শক্তিকে যুদ্ধের জন্য প্রস্তুত করার চেষ্টা করেছিলেন। তরবারি চালনা, বর্শা নিক্ষেপ, তীর ছোঁড়া ঘোড় দৌড় সহ তৎকালীন সব যুদ্ধ কৌশলেই দক্ষতা অর্জনের উৎসাহ দিতেন তিনি। রসূল সা. একই সাথে তার বাহিনীকে আত্মিক ও দৈহিকভাবে শক্তিশালী করে তুলেছিলেন। তাদের মনে উদগত করেছিলেন বিজয় অথবা জান্নাত প্রাপ্তির আকাঙ্খা। রসূল সা. তীর চালনার কৌশল শিখে ভুলে যাওয়াকে অপরাধ সাব্যস্ত করেছিলেন। রসূল সা. বলেন, যে ব্যক্তি তীর চালনা শিখেছে এবং ছেড়ে দিয়েছে সে আমাদের অন্তর্ভুক্ত নয় অথবা সে অবাধ্য হয়েছে।১৮ এটা যুবক-বৃদ্ধসহ পুরো উম্মতের প্রতিই নির্দেশ যে, তারা যেন যুদ্ধের মহড়া বা চর্চার মাধ্যমে নিজেদের দক্ষতাকে শাণিত রাখে। লক্ষবস্তুর উপর আঘাত ও তীর ছোঁড়ার কৌশল ভুলে না যায়। ইসলাম মুসলমানদের পুরো জনসংখ্যার শক্তিকেই গুরুত্বপূর্ণ বিবেচনা করেছে এবং তাদেরকে দক্ষ ও সাহসী করে তুলতে চেয়েছ।
রসূল সা. সব অবস্থায় সব জায়গায় যুদ্ধ-প্রস্ততির ওপর গুরুত্বারোপ করতেন। যুদ্ধের সব কৌশল শিখতে বলতেন। রসূল সা.-এর একটি উক্তি আছে, তোমরা সাধ্যানুযায়ী শক্তি প্রস্তুত রাখো, জেনে রেখো! নিক্ষেপ শক্তি, নিক্ষেপ শক্তি, নিক্ষেপ শক্তি। ১৯

টিকাঃ
* মুসলিম, কিতাবুল ইমারাহ, বাবু ফাযলির রাময়ি ওয়াল হাসসি আলাইহি (৩/১০২৩) (হাদিস: ১৯১৯)
* মুসলিম, কিতাবুল ইমারাহ, বাবু ফাযলির রাময়ি ওয়াল হাসসি আলাইহি (হাদিস: ১৯১৭)

📘 নবীজির যুদ্ধ জীবন পাঠ ও পর্যালোচনা > 📄 জিহাদ ফি সাবিলিল্লার লক্ষ্য

📄 জিহাদ ফি সাবিলিল্লার লক্ষ্য


১. বিশ্বাসের স্বাধীনতা রক্ষা করা
আল্লাহ তাআলা বলেন,
وَقَاتِلُوهُمْ حَتَّى لَا تَكُونَ فِتْنَةٌ وَيَكُونَ الدِّينُ كُلُّهُ لِلَّهِ فَإِنِ انْتَهَوْا فَإِنَّ اللَّهَ بِمَا يَعْمَلُونَ بَصِيرٌ وَإِنْ تَوَلَّوْا فَاعْلَمُوا أَنَّ اللَّهَ مَوْلَاكُمْ نِعْمَ الْمَوْلَى وَنِعْمَ النَّصِيرُ
এবং তোমরা তাদের বিরুদ্ধে সংগ্রাম করতে থাকবে যতক্ষণ না ফেতনা দূরীভূত হয় এবং আল্লাহর দীন সামগ্রিকভাবে প্রতিষ্ঠিত হয় এবং যদি তারা বিরত হয় তবে তারা যা করে আল্লাহ তো তার সম্যক দ্রষ্টা। যদি তারা মুখ ফিরিয়ে নেয় তবে জেনে রাখো আল্লাহই তোমাদের অভিভাবক; কত উত্তম অভিভাবক এবং কত উত্তম সাহায্যকারী। ২০

২. ইসলামের প্রতীক ও ইবাদত রক্ষা করা
আল্লাহ তাআলা বলেন,
إِنَّ اللَّهَ يُدَافِعُ عَنِ الَّذِينَ آمَنُوا إِنَّ اللَّهَ لَا يُحِبُّ كُلَّ خَوَّانٍ كَفُورِ أُذِنَ لِلَّذِينَ يُقَاتَلُونَ بِأَنَّهُمْ ظُلِمُوا وَإِنَّ اللَّهَ عَلَى نَصْرِهِمْ لَقَدِيرُ الَّذِينَ أُخْرِجُوا مِنْ دِيَارِهِمْ بِغَيْرِ حَقَّ إِلَّا أَنْ يَقُولُوا رَبُّنَا اللَّهُ وَلَوْلَا دَفْعُ اللَّهِ النَّاسَ بَعْضَهُمْ بِبَعْضٍ لَهُدِّمَتْ صَوَامِعُ وَبِيَعٌ وَصَلَوَاتٌ وَمَسَاجِدُ يُذْكَرُ فِيهَا اسْمُ اللَّهِ كَثِيرًا وَلَيَنْصُرَنَّ اللَّهُ مَنْ يَنْصُرُهُ إِنَّ اللَّهَ لَقَوِيٌّ عَزِيزُ الَّذِينَ إِنْ مَكَّنَّاهُمْ فِي الْأَرْضِ أَقَامُوا الصَّلَاةَ وَآتَوُا الزَّكَاةَ وَأَمَرُوا بِالْمَعْرُوفِ وَنَهَوْا عَنِ الْمُنْكَرِ وَلِلَّهِ عَاقِبَةُ الْأُمُورِ
নিশ্চয় আল্লাহ মুমিনদেরকে রক্ষা করেন এবং কোনো বিশ্বাসঘাতক, অকৃতজ্ঞকে পছন্দ করেন না। যুদ্ধের অনুমতি দেয়া হল তাদেরকে, যাদেরকে আক্রমণ করা হচ্ছে। কারণ তাদের ওপর নির্যাতন করা হয়েছে। নিশ্চয় আল্লাহ তাদেরকে বিজয় দানে সক্ষম। যাদেরকে তাদের নিজ বাড়ী-ঘর থেকে অন্যায়ভাবে শুধু এ কারণে বের করে দেয়া হয়েছে যে, তারা বলে, আমাদের রব আল্লাহ আর আল্লাহ যদি মানবজাতির একদলকে অপর দল দ্বারা দমন না করতেন, তবে বিধ্বস্ত হয়ে যেত খৃস্টান সন্ন্যাসীদের আশ্রম, গির্জা, ইয়াহূদীদের উপাসনালয় ও মসজিদসমূহ- যেখানে আল্লাহর নাম অধিক স্মরণ করা হয়। আর আল্লাহ অবশ্যই তাকে সাহায্য করেন, যে তাকে সাহায্য করে। নিশ্চয় আল্লাহ শক্তিমান, পরাক্রমশালী। তারা এমন যাদেরকে আমি যমীনে ক্ষমতা দান করলে তারা সালাত কায়েম করবে, যাকাত দেবে এবং সৎকাজের আদেশ দেবে ও অসৎকাজ থেকে নিষেধ করবে; আর সব কাজের পরিণাম আল্লাহরই অধিকারে।

৩. পৃথিবী থেকে বিশৃংখলা নির্মূল করা
وَلَمَّا بَرَزُوا لِجَالُوتَ وَجُنُودِهِ قَالُوا رَبَّنَا أَفْرِغْ عَلَيْنَا صَبْرًا وَثَبِّتْ أَقْدَامَنَا وَانْصُرْنَا عَلَى الْقَوْمِ الْكَافِرِينَ فَهَزَمُوهُمْ بِإِذْنِ اللَّهِ وَقَتَلَ دَاوُودُ جَالُوتَ وَآتَاهُ اللهُ الْمُلْكَ وَالْحِكْمَةَ وَعَلَّمَهُ مِمَّا يَشَاءُ وَلَوْلَا دَفْعُ اللَّهِ النَّاسَ بَعْضَهُمْ بِبَعْضٍ لَفَسَدَتِ الْأَرْضُ وَلَكِنَّ اللَّهَ ذُو فَضْلٍ عَلَى الْعَالَمِينَ تِلْكَ آيَاتُ اللَّهِ نَتْلُوهَا عَلَيْكَ بِالْحَقِّ وَإِنَّكَ لَمِنَ الْمُرْسَلِينَ
আর যখন তারা জালুত ও তার সৈন্যবাহিনীর মুখোমুখি হলো, তখন তারা বললো, 'হে আমাদের রব, আমাদের ওপর ধৈর্য ঢেলে দিন, আমাদের পা স্থির রাখুন এবং আমাদেরকে কাফের জাতির বিরুদ্ধে সাহায্য করুন'। অতঃপর তারা আল্লাহর হুকুমে তাদেরকে পরাজিত করলো এবং দাউদ জালূতকে হত্যা করলো। আর আল্লাহ দাউদকে রাজত্ব ও প্রজ্ঞা দান করলেন এবং তাকে যা ইচ্ছা শিক্ষা দিলেন। আর আল্লাহ যদি মানুষের কতককে কতকের দ্বারা প্রতিহত না করতেন, তবে অবশ্যই যমীন ফাসাদপূর্ণ হয়ে যেতো। কিন্তু আল্লাহ বিশ্ববাসীর ওপর অনুগ্রহশীল। এগুলো আল্লাহর আয়াত, যা আমি তোমার ওপর যথাযথভাবে তিলাওয়াত করি। আর নিশ্চয় তুমি রসূলগণের অন্তর্ভুক্ত।২১
ইবনে কাসির তার তাফসিরে বলেন, 'আর আল্লাহ যদি মানুষের কতককে কতকের দ্বারা প্রতিহত না করতেন, তবে অবশ্যই যমীন ফাসাদপূর্ণ হয়ে যেত।' আল্লাহর এই কথার অর্থ হলো, যদি আল্লাহ এক জাতিকে অন্য জাতি দ্বারা প্রতিহত না করতেন যেমন আল্লাহ বনী ইসরাইলকে তালুতের যুদ্ধ ও দাউদের বীরত্বের মাধ্যমে রক্ষা করেছেন, না হয় তারা ধ্বংস হয়ে যেতো।২২

৪. পরীক্ষা, শিক্ষা ও সংশোধন
আল্লাহ বলেন,
فَإِذَا لَقِيتُمُ الَّذِينَ كَفَرُوا فَضَرْبَ الرِّقَابِ حَتَّى إِذَا أَثْخَنْتُمُوهُمْ فَشُدُّوا الْوَثَاقَ فَإِمَّا مَنَّا بَعْدُ وَإِمَّا فِدَاءً حَتَّى تَضَعَ الْحَرْبُ أَوْزَارَهَا ذَلِكَ وَلَوْ يَشَاءُ اللهُ لَانْتَصَرَ مِنْهُمْ وَلَكِنْ لِيَبْلُوَ بَعْضَكُمْ بِبَعْضٍ وَالَّذِينَ قُتِلُوا فِي سَبِيلِ اللَّهِ فَلَنْ يُضِلَّ أَعْمَالَهُمْ سَيَهْدِيهِمْ وَيُصْلِحُ بَالَهُمْ وَيُدْخِلُهُمُ الْجَنَّةَ عَرَّفَهَا لَهُمْ
অতএব তোমরা যখন কাফেরদের সাথে যুদ্ধে অবতীর্ণ হও, তখন তাদের ঘাড়ে আঘাত কর। পরিশেষে তোমরা যখন তাদেরকে সম্পূর্ণরূপে পর্যুদস্ত করবে তখন তাদেরকে শক্তভাবে বেঁধে নাও। তারপর হয় অনুগ্রহ না হয় মুক্তিপণ আদায়, যতক্ষণ না যুদ্ধ তার অস্ত্র নমিয়ে ফেলে। এটাই বিধান। আর আল্লাহ ইচ্ছা করলে তাদের কাছ থেকে প্রতিশোধ গ্রহণ করতে পারতেন, কিন্তু তিনি তোমাদের একজনকে অন্যের দ্বারা পরীক্ষা করতে চান। আর যারা আল্লাহর পথে নিহত হয় তিনি কখনো তাদের আমলসমূহ বিনষ্ট করবেন না। অচিরেই তিনি তাদেরকে হেদায়াত দিবেন এবং তাদের অবস্থা সংশোধন করে দিবেন। আর তিনি তাদেরকে জান্নাতে প্রবেশ করাবেন, যার পরিচয় তিনি তাদেরকে দিয়েছেন।২৩
'কিন্তু তিনি তোমাদের একজনকে অন্যের দ্বারা পরীক্ষা করতে চান' এই আয়াতের ব্যখ্যায় ইবনে কাসির বলেন, অর্থাৎ কিন্তু তোমাদের জন্য জিহাদকে বিধিবদ্ধ করা হয়েছে তোমাদের পরীক্ষা করার জন্য।২৪ যেমন আল্লাহ অন্য আয়াতে জিহাদের বিধিবদ্ধ করার হেকমত বর্ণনা করতে গিয়ে বলেন,
أَمْ حَسِبْتُمْ أَنْ تَدْخُلُوا الْجَنَّةَ وَلَمَّا يَعْلَمِ اللَّهُ الَّذِينَ جَاهَدُوا مِنْكُمْ وَيَعْلَمَ الصَّابِرِينَ
তোমরা কি মনে কর যে, তোমরা জান্নাতে প্রবেশ করবে? অথচ আল্লাহ এখনো জানেননি তাদেরকে যারা তোমাদের মধ্য থেকে জিহাদ করেছে এবং জানেননি ধৈর্যশীলদেরকে। ২৫

৫. কাফেরদের ভীতিপ্রদর্শন এবং তাদের পরাজিত ও অপদস্থ করা
وَأَعِدُّوا لَهُمْ مَا اسْتَطَعْتُمْ مِنْ قُوَّةٍ وَمِنْ رِبَاطِ الْخَيْلِ تُرْهِبُونَ بِهِ عَدُوَّ اللَّهِ وَعَدُوَّكُمْ وَآخَرِينَ مِنْ دُونِهِمْ لَا تَعْلَمُونَهُمُ اللَّهُ يَعْلَمُهُمْ وَمَا تُنْفِقُوا مِنْ شَيْءٍ فِي سَبِيلِ اللَّهِ يُوَفَّ إِلَيْكُمْ وَأَنْتُمْ لَا تُظْلَمُونَ
তোমরা তাদের মোকাবেলার জন্য যথাসাধ্য শক্তি অশ্ববাহিনী প্রস্তুত রাখবে। এগুলো দিয়ে তোমরা সন্ত্রস্ত করবে আল্লাহর শত্রুকে, তোমাদের শত্রুকে এবং অন্যদেরকে যাদেরকে তোমরা জানো না, আল্লাহ তাদেরকে জানেন। আল্লাহর পথে তোমরা যা কিছু ব্যায় করবে তার পূর্ণ প্রতিদান তোমাদেরকে দেওয়া হবে এবং তোমাদের প্রতি জুলুম করা হবে না। ২৬
আল্লাহ আরও বলেন,
قَاتِلُوهُمْ يُعَذِّبْهُمُ اللَّهُ بِأَيْدِيكُمْ وَيُخْزِهِمْ وَيَنْصُرْكُمْ عَلَيْهِمْ وَيَشْفِ صُدُورَ قَوْمٍ مُؤْمِنِينَ وَيُذْهِبْ غَيْظَ قُلُوبِهِمْ وَيَتُوبُ اللَّهُ عَلَى مَنْ يَشَاءُ وَاللَّهُ عَلِيمٌ حَكِيمٌ
তোমরা তাদের সাথে লড়াই কর, আল্লাহ তোমাদের হাতে তাদেরকে আযাব দেবেন এবং তাদেরকে অপদস্থ করবেন, আর তোমাদেরকে তাদের বিরুদ্ধে সাহায্য করবেন এবং মুমিন কওমের অন্তরসমূহকে চিন্তামুক্ত করবেন। আর তাদের অন্তরসমূহের ক্রোধ দূর করবেন এবং আল্লাহ যাকে চান তার তাওবা কবুল করেন। আর আল্লাহ মহাজ্ঞানী, প্রজ্ঞাময়। ২৭
আল্লাহ আরও বলেন,
فَلَمْ تَقْتُلُوهُمْ وَلَكِنَّ اللَّهَ قَتَلَهُمْ وَمَا رَمَيْتَ إِذْ رَمَيْتَ وَلَكِنَّ اللَّهَ رَمَى وَلِيُبْلِيَ الْمُؤْمِنِينَ مِنْهُ بَلَاءً حَسَنًا إِنَّ اللَّهَ سَمِيعٌ عَلِيمٌ ذَلِكُمْ وَأَنَّ اللَّهَ مُوهِنُ كَيْدِ الْكَافِرِينَ
সুতরাং তোমরা তাদেরকে হত্যা করনি বরং আল্লাহই তাদেরকে হত্যা করেছেন। আর তুমি নিক্ষেপ করনি যখন তুমি নিক্ষেপ করেছিলে; বরং আল্লাহই নিক্ষেপ করেছেন এবং যাতে তিনি তাঁর পক্ষ থেকে মুমিনদেরকে পরীক্ষা করেন উত্তম পরীক্ষা। নিশ্চয় আল্লাহ সর্বশ্রোতা, সর্বজ্ঞ। এই হল ঘটনা এবং নিশ্চয় আল্লাহ কাফেরদের ষড়যন্ত্র দুর্বল করে দেন। ২৮

৬. মুনাফেকদের চিহ্নিত করা
আল্লাহ বলেন,
مَا كَانَ اللَّهُ لِيَذَرَ الْمُؤْمِنِينَ عَلَى مَا أَنْتُمْ عَلَيْهِ حَتَّى يَمِيزَ الْخَبِيثَ مِنَ الطَّيِّبِ وَمَا كَانَ اللَّهُ لِيُطْلِعَكُمْ عَلَى الْغَيْبِ وَلَكِنَّ اللَّهَ يَجْتَبِي مِنْ رُسُلِهِ مَنْ يَشَاءُ فَآمِنُوا بِاللَّهِ وَرُسُلِهِ وَإِنْ تُؤْمِنُوا وَتَتَّقُوا فَلَكُمْ أَجْرٌ عَظِيمٌ
আল্লাহ এমন নন যে, তিনি মুমিনদেরকে (এমন অবস্থায়) ছেড়ে দেবেন যার উপর তোমরা আছ। যতক্ষণ না তিনি পৃথক করবেন অপবিত্রকে পবিত্র থেকে। আর আল্লাহ এমন নন যে, তিনি তোমাদেরকে গায়েব সম্পর্কে জানাবেন। তবে আল্লাহ তাঁর রসূলদের মধ্য থেকে যাকে চান বেছে নেন। সুতরাং তোমরা আল্লাহ ও তাঁর রসূলের প্রতি ঈমান আনো। আর যদি তোমরা ঈমান আন এবং তাকওয়া অবলম্বন কর তবে তোমাদের জন্য রয়েছে মহাপ্রতিদান। ২৯
ইবনে কাসির বলেন, এমন কোনো পরীক্ষা থাকা অপরিহার্য যার মাধ্যমে বন্ধু ও শত্রু চেনা যাবে। নিষ্ঠাবান মুমিন এবং নাফরমান মুনাফেকের প্রকৃত চেহারা প্রকাশিত হবে। ওহুদ যুদ্ধের দিন আল্লাহ মুসলমানদের পরীক্ষা করেছেন। সত্যিকার ঈমানদারদের ঈমান, ধৈর্য, দৃঢ়তা ও আল্লাহ ও তার রসূলের প্রতি তাদের আনুগত্য প্রমাণিত হয়েছে এবং মুনাফেকদের মুখোশ ছিড়ে গেছে। তাদের অবাধ্যতা, জিহাদের প্রতি অনাগ্রহ এবং আল্লাহ ও তার রসূলের সাথে তাদের ধোঁকাবাজি সবার সামনে স্পষ্ট হয়ে গেছে। ৩০

৭. পৃথিবীতে আল্লাহর বিধান ও ইসলামী শাসনব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করা
পৃথিবীতে আল্লাহর বিধান প্রতিষ্ঠা করা জিহাদের অন্যতম লক্ষ্য। আল্লাহ তাআলা বলেন,
إِنَّا أَنْزَلْنَا إِلَيْكَ الْكِتَابَ بِالْحَقِّ لِتَحْكُمَ بَيْنَ النَّاسِ بِمَا أَرَاكَ اللَّهُ وَلَا تَكُنْ لِلْخَائِنِينَ خَصِيمًا
নিশ্চয় আমি তোমার প্রতি যথাযথভাবে কিতাব নাযিল করেছি, যাতে তুমি মানুষের মধ্যে ফয়সালা কর সে অনুযায়ী যা আল্লাহ তোমাকে দেখিয়েছেন। আর তুমি খেয়ানতকারীদের পক্ষে বিতর্ককারী হয়ো না। ৩১

৮. কাফেরদের শত্রুতা প্রতিহত করা
জিহাদের আরেকটি লক্ষ্য কাফেরদের শত্রুতা প্রতিহত করা। এটা কয়েক ধরণের হতে পারে,
ক. অমুসলিম শাসিত দেশে মুসলমানদের ওপর কাফেরদের জুলুম
যদি কোনো অমুসলিম শাসিত দেশে অমুসলিমরা সংখ্যালঘু মুসলমানদের উপর জুলুম করে এবং ওই দেশে বসবাসকারী মুসলমানদের অন্য কোনো দেশে হিজরত করে নিরাপদে ধর্ম পালন করার এমন সুযোগ বা সামর্থ্যও না থাকে, তাহলে ইসলামী রাষ্ট্রের দায়িত্ব ওই অমুসলিম শাসিত দেশটির সাথে যুদ্ধ করে মুসলমানদেরকে তাদের জুলুম থেকে মুক্ত করা। ৩২ আল্লাহ বলেন,
فَلْيُقَاتِلْ فِي سَبِيلِ اللَّهِ الَّذِينَ يَشْرُونَ الْحَيَاةَ الدُّنْيَا بِالْآخِرَةِ وَمَنْ يُقَاتِلْ في سَبِيلِ اللَّهِ فَيُقْتَلْ أَوْ يَغْلِبُ فَسَوْفَ نُؤْتِيهِ أَجْرًا عَظِيمًا وَمَا لَكُمْ لَا تُقَاتِلُونَ فِي سَبِيلِ اللَّهِ وَالْمُسْتَضْعَفِينَ مِنَ الرِّجَالِ وَالنِّسَاءِ وَالْوِلْدَانِ الَّذِينَ يَقُولُونَ رَبَّنَا أَخْرِجْنَا مِنْ هَذِهِ الْقَرْيَةِ الظَّالِمِ أَهْلُهَا وَاجْعَلْ لَنَا مِنْ لَدُنْكَ وَلِيًّا وَاجْعَلْ لَنَا مِنْ لَدُنْكَ نَصِيرًا
সুতরাং যারা আখেরাতের বিনিময়ে দুনিয়ার জীবন বিক্রয় করে তারা যেন আল্লাহর রাস্তায় লড়াই করে। আর যে আল্লাহর রাস্তায় লড়াই করবে অতঃপর সে নিহত হোক কিংবা বিজয়ী, অচিরেই আমি তাকে দেব মহা পুরস্কার। আর তোমাদের কী হল যে, তোমরা আল্লাহর রাস্তায় লড়াই করছ না! অথচ দুর্বল পুরুষ, নারী ও শিশুরা বলছে, ‘হে আমাদের রব, আমাদেরকে বের করুন এ জনপদ থেকে যার অধিবাসীরা যালিম এবং আমাদের জন্য আপনার পক্ষ থেকে একজন অভিভাবক নির্ধারণ করুন। আর নির্ধারণ করুন আপনার পক্ষ থেকে একজন সাহায্যকারী। ৩৩

খ. মুসলিম দেশের ওপর কাফেরদের জুলুম
আল্লাহ তাআলা বলেন,
وَقَاتِلُوا فِي سَبِيلِ اللَّهِ الَّذِينَ يُقَاتِلُونَكُمْ وَلَا تَعْتَدُوا إِنَّ اللَّهَ لَا يُحِبُّ الْمُعْتَدِينَ وَاقْتُلُوهُمْ حَيْثُ ثَقِفْتُمُوهُمْ وَأَخْرِجُوهُمْ مِنْ حَيْثُ أَخْرَجُوكُمْ وَالْفِتْنَةُ أَشَدُّ مِنَ الْقَتْلِ وَلَا تُقَاتِلُوهُمْ عِنْدَ الْمَسْجِدِ الْحَرَامِ حَتَّى يُقَاتِلُوكُمْ فِيهِ فَإِنْ قَاتَلُوكُمْ فَاقْتُلُوهُمْ كَذَلِكَ جَزَاءُ الْكَافِرِينَ فَإِنِ انْتَهَوْا فَإِنَّ اللَّهَ غَفُورٌ رَحِيمٌ
আর তোমরা আল্লাহর রাস্তায় তাদের বিরুদ্ধে লড়াই কর, যারা তোমাদের বিরুদ্ধে লড়াই করে এবং সীমালঙ্ঘন করো না। নিশ্চয় আল্লাহ সীমালঙ্ঘনকারীদেরকে পছন্দ করেন না। আর তাদেরকে হত্যা কর যেখানে তাদেরকে পাও এবং তাদেরকে বের করে দাও যেখান থেকে তারা তোমাদেরকে বের করেছিল। আর ফেতনা হত্যার চেয়ে কঠিনতর এবং তোমরা মাসজিদুল হারামের নিকট তাদের বিরুদ্ধে লড়াই কোরো না, যতক্ষণ না তারা তোমাদের বিরুদ্ধে সেখানে লড়াই করে। অতঃপর তারা যদি তোমাদের বিরুদ্ধে লড়াই করে, তবে তাদেরকে হত্যা কর। এটাই কাফেরদের প্রতিদান। তবে যদি তারা বিরত হয়, তবে নিশ্চয় আল্লাহ ক্ষমাশীল, পরম দয়ালু। ৩৪
ফকীহরা লিখেছেন, যদি কাফেররা কোনো মুসলিম দেশের সাথে বাড়াবাড়ি করে তাহলে তাদের বিরুদ্ধে প্রতিরক্ষা যুদ্ধ ফরজ হয়ে যায়। কারণ কাফেররা মুসলিম দেশ অধিকার করে নিলে মুসলমানদের ওপর অত্যাচার করে, কুফুরি আইন জারি করে এবং সেই দেশের অধিবাসীদেরকে বাধ্য করে তাদের আনুগত্য স্বীকার করে নিতে। এভাবে মুসলিম দেশটি কাফের দেশে পরিণত হয়।
একজন হানাফী আলেম বলেন, এর সারমর্ম হলো, কোনো মুসলিম দেশ কাফেরদের আক্রমণের আশংকার মধ্যে থাকলে ওই দেশের নেতা ও জনসাধারণের ওপর দেশকে শত্রুর হাত থেকে রক্ষা করার জন্য যুদ্ধ করা ফরজ। যদি তারা না পারে তাহলে নিজেদের রক্ষার সামর্থ্য অর্জন করার আগ পর্যন্ত তাদেরকে সাহায্য করা নিকটবর্তী মুসলিম দেশের ওপর ফরজ। ৩৫

গ. অমুসলিম শাসিত দেশে অমুসলিম জনগণের ওপর জুলুম
কোনো অমুসলিম শাসিত দেশে অমুসলিম জনগণের ওপর জুলুম হলে মুসলমানদের কর্তব্য সেই অমুসলিম শাসকের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করে তার জুলুম থেকে জনগণকে রক্ষা করা। কারণ আল্লাহ তাআলা তার বান্দাদের ওপর জুলুম হারাম করেছেন। পৃথিবীতে ন্যায় বিচার প্রতিষ্ঠা করা সব মানুষের কর্তব্য। মুসলমানরা যদি জালিমের জুলুম থেকে মজলুমদের রক্ষা না করে, তাহলে তারা গুনাহগার হবে। কারণ জিহাদের নির্দেশ এসেছে হকের প্রতিষ্ঠা ও বাতিলের ধ্বংস সাধনের জন্য, ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা ও জুলুমের মুলোৎপাটন করার জন্য। আল্লাহ তাআলা বলেন,
يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا كُونُوا قَوَّامِينَ لِلَّهِ شُهَدَاءَ بِالْقِسْطِ وَلَا يَجْرِمَنَّكُمْ شَنَآنُ قَوْمٍ عَلَى أَلَّا تَعْدِلُوا اعْدِلُوا هُوَ أَقْرَبُ لِلتَّقْوَى وَاتَّقُوا اللَّهَ إِنَّ اللَّهَ خَبِيرٌ بِمَا تَعْمَلُونَ
হে মুমিনগণ, তোমরা আল্লাহর জন্য ন্যায়ের সাথে সাক্ষদানকারী হিসেবে সদা দন্ডায়মান হও। কোনো জাতির প্রতি শত্রুতা যেন তোমাদেরকে প্ররোচিত না করে যে, তোমরা ইনসাফ করবে না। তোমরা ইনসাফ কর, তা তাকওয়ার নিকটতর এবং আল্লাহকে ভয় কর। নিশ্চয় তোমরা যা কর, আল্লাহ সে বিষয়ে সবিশেষ অবহিত। ৩৬

ঘ. ইসলাম প্রচারে বাঁধা দেওয়া
আল্লাহর বার্তা সব মানুষের কাছে পৌঁছে দেওয়া মুসলমানদের ওপর ফরজ। আল্লাহ তাআলা বলেন,
وَلْتَكُنْ مِنْكُمْ أُمَّةٌ يَدْعُونَ إِلَى الْخَيْرِ وَيَأْمُرُونَ بِالْمَعْرُوفِ وَيَنْهَوْنَ عَنِ الْمُنْكَرِ وَأُولَئِكَ هُمُ الْمُفْلِحُونَ
আর যেন তোমাদের মধ্য থেকে এমন একটি দল হয়, যারা কল্যাণের প্রতি আহবান করবে, ভাল কাজের আদেশ দেবে এবং মন্দ কাজ থেকে নিষেধ করবে। আর তারাই সফলকাম। ৩৭
আল্লাহর শত্রুরা মানুষের কাছে আল্লাহর দাওয়াত পৌছতে বাঁধা দেয়। ইসলাম প্রচারকদের জনসাধারণের কাছে যেতে দেয় না। আল্লাহ ও তার বান্দাদের মধ্যে নানা বাঁধা বিঘ্নের দেয়াল নির্মাণ করে। তাই ইসলাম প্রচারে বাঁধাদানকারীদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করাও মুসলমানদের ওপর ওয়াজিব। ৩৮ আল্লাহ বলেছেন,
الَّذِينَ كَفَرُوا وَصَدُّوا عَنْ سَبِيلِ اللَّهِ أَضَلَّ أَعْمَالَهُمْ وَالَّذِينَ آمَنُوا وَعَمِلُوا الصَّالِحَاتِ وَآمَنُوا بِمَا نُزِّلَ عَلَى مُحَمَّدٍ وَهُوَ الْحَقُّ مِنْ رَبِّهِمْ كَفَرَ عَنْهُمْ سَيِّئَاتِهِمْ وَأَصْلَحَ بَالَهُمْ ذَلِكَ بِأَنَّ الَّذِينَ كَفَرُوا اتَّبَعُوا الْبَاطِلَ وَأَنَّ الَّذِينَ آمَنُوا اتَّبَعُوا الْحَقَّ مِنْ رَبِّهِمْ كَذَلِكَ يَضْرِبُ اللَّهُ لِلنَّاسِ أَمْثَالَهُمْ فَإِذَا لَقِيتُمُ الَّذِينَ كَفَرُوا فَضَرْبَ الرِّقَابِ حَتَّى إِذَا أَثْخَنْتُمُوهُمْ فَشُدُّوا الْوَثَاقَ فَإِمَّا مَنَّا بَعْدُ وَإِمَّا فِدَاءً حَتَّى تَضَعَ الْحَرْبُ أَوْزَارَهَا ذَلِكَ وَلَوْ يَشَاءُ اللَّهُ لَانْتَصَرَ مِنْهُمْ وَلَكِنْ لِيَبْلُوَ بَعْضَكُمْ بِبَعْضٍ وَالَّذِينَ قُتِلُوا فِي سَبِيلِ اللَّهِ فَلَنْ يُضِلَّ أَعْمَالَهُمْ
যারা কুফরী করেছে এবং অপরকে আল্লাহর পথ থেকে নিবৃত্ত করেছে, তিনি তাদের আমলসমূহ ব্যর্থ করে দিয়েছেন। আর যারা ঈমান এনেছে, সৎকর্ম করেছে এবং মুহাম্মাদের প্রতি যা নাযিল করা হয়েছে তাতে বিশ্বাস স্থাপন করেছে 'আর তা তাদের রবের পক্ষ হতে (প্রেরিত) সত্য, তিনি তাদের থেকে তাদের মন্দ কাজগুলো দূর করে দেবেন এবং তিনি তাদের অবস্থা সংশোধন করে দেবেন। তা এজন্য যে, যারা কুফরী করে তারা বাতিলের অনুসরণ করে, আর যারা ঈমান আনে তারা তাদের রবের প্রেরিত হকের অনুসরণ করে। এভাবেই আল্লাহ মানুষের জন্য তাদের দৃষ্টান্তসমূহ বর্ণনা করেন। অতএব তোমরা যখন কাফেরদের সাথে যুদ্ধে অবতীর্ণ হও, তখন তাদের ঘাড়ে আঘাত কর। পরিশেষে তোমরা যখন তাদেরকে সম্পূর্ণভাবে পর্যুদস্ত করবে তখন তাদেরকে শক্তভাবে বেঁধে নাও। তারপর হয় অনুগ্রহ না হয় মুক্তিপণ আদায়, যতক্ষণ না যুদ্ধ তার অস্ত্র নামিয়ে ফেলে। এটাই বিধান। আর আল্লাহ ইচ্ছা করলে তাদের কাছ থেকে প্রতিশোধ গ্রহণ করতে পারতেন, কিন্তু তিনি তোমাদের একজনকে অন্যের দ্বারা পরীক্ষা করতে চান। আর যারা আল্লাহর পথে নিহত হয় তিনি কখনো তাদের আমলসমূহ বিনষ্ট করবেন না। ৩৯

টিকাঃ
২০ সূরা আনফাল (আয়াত: ৩৯, ৪০)
২১ সূরা বাকারা (আয়াত: ৫০-৫২)
২২ তাফসীরে ইবনে কাসীর (১/২৬২)
২৩ সূরা মুহাম্মাদ (আয়াত: ৪-৬)
২৪ তাফসীরে ইবনে কাসীর (১/২৬২)
২৫ সূরা আলে ইমরান (আয়াত: ১৪২)
২৬ সূরা আনফাল (আয়াত: ৬০)
২৭ সূরা তওবা (আয়াত: ১৪, ১৫)
২৮ সূরা আনফাল (আয়াত: ১৭, ১৮)
২৯ সূরা আলে ইমরান (আয়াত: ১৭৯)
৩০ তাফসীরে ইবনে কাসীর (১/৩৭)
৩১ সূরা নিসা (আয়াত: ১০৫)
৩২ তাফসীরে ইবনে কাসীর (১/৩৭১)
৩৩ সূরা নিসা (আয়াত: ৭৪, ৭৫)
৩৪ সূরা বাকারা (আয়াত: ১৯০-১৯২)
৩৫ হাশিয়াতু ইবনে আবেদীন (৪/৪২১)
৩৬ সূরা মায়েদা (আয়াত: ৮)
৩৭ সূরা আলে ইমরান (আয়াত: ১০৪)
৩৮ ফিকহুত তামকীন ফিল কুরআনিল কারীম লিসসাল-াবী (পৃ: ৪৮৮)
৩৯ সূরা মুহাম্মাদ (আয়াত: ১-৪)

📘 নবীজির যুদ্ধ জীবন পাঠ ও পর্যালোচনা > 📄 বদরপূর্ব গুরুত্বপূর্ণ যুদ্ধগুলো

📄 বদরপূর্ব গুরুত্বপূর্ণ যুদ্ধগুলো


মদিনায় বেশিরভাগ মুসলমানের হিজরত ও রসূল সা.-এর নেতৃত্ব প্রতিষ্ঠিত হওয়ার পর মুসলমানদের জন্য অপরিহার্য ছিল ইসলামের শত্রুদের প্রতিক্রিয়া সম্পর্কে সজাগ থাকা এবং যে দাওয়াতের জন্য রসূল সা. ও তার সঙ্গীরা মক্কায় নির্যাতিত হয়েছিলেন এবং শেষ পর্যন্ত হিজরত করতে বাধ্য হয়েছিলেন, সেই দাওয়াতকে চূড়ান্ত লক্ষ্যে পৌঁছানোর চেষ্টা এগিয়ে নেওয়া।
রসূল সা. এর হিজরতের পর থেকে কুরায়েশদের বিভিন্ন কাজ ও আচরণও মুসলমানদের সচেতন হতে বাধ্য করেছিল। মক্কার নেতারা ইসলামের জন্য কোনো আশ্রয়ই ছাড়তে রাজি ছিল না। নবীজি ও সাহাবীরা মক্কা ছেড়ে গেলেও তারা তাদেরকে মদিনায়ও নিরাপদে থাকতে দিতে প্রস্তুত ছিল না। মদিনায় মুসলমানদের উপস্থিতিকে তারা নিজেদের নেতৃত্বের জন্য হুমকি হিসেবে বিবেচনা করতো। তারা যথাযথভাবেই বুঝতে পেরেছিল ইসলাম টিকে থাকা মানে জাহেলিয়াতের বিলুপ্তি, তাদের বাপ দাদাদের রীতি রেওয়াজের বিলুপ্তি, তাই মুসলমানদের সাথে তাদের লড়াই অনেকটা অবশ্যম্ভাবি ছিল।
মক্কার নেতারা রসূল সা.-কে মদিনায় পৌঁছতে না দেওয়ার সব রকম চেষ্টাই করেছিল। মদিনায় ইসলামের ওপর আঘাত হানতে এবং মদিনা থেকে মুসলমানদের উৎখাত করতে তারা চেষ্টার ত্রুটি করে নি। ৪০ তাদের এসব শত্রুতামূলক কার্যকলাপ অব্যাহতভাবে চলছিল রসূল সা. হিজরত করার পরও। এর প্রমাণ স্পষ্টভাবে পাওয়া যায়, বুখারির বর্ণিত এই হাদিসটিতে, আব্দুল্লাহ ইবনে মাসউদ সা'দ ইবনে মুআয থেকে বর্ণনা করেন, সা'দ ইবনে মুআয ও উমাইয়া ইবনে খালাফের মধ্যে বন্ধুত্ব ছিল। উমাইয়া মদিনায় গেলে সা'দের বাড়িতে অবস্থান করতো, সা'দ মক্কায় গেলে উমাইয়ার বাড়িতে অবস্থান করতেন। রসূল সা.-এর হিজরতের পর সা'দ ওমরার উদ্দেশে মক্কায় গিয়ে আগের মতোই উমাইয়ার বাড়িতে উঠেছিলেন। তিনি উমাইয়াকে বললেন, আমার জন্য একটি নিরিবিলি সময় দেখো, আমি তাওয়াফ করবো।
উমাইয়া সা'দকে নিয়ে মধ্যাহ্নের কাছাকাছি সময়ে বের হলেন, পথে আবু জেহেলের সাথে তাদের দেখা হয়ে গেলো। আবু জেহেল উমাইয়াকে জিজ্ঞাসা করলো, আবু সাফওয়ান! তোমার সাথে এই ব্যক্তি কে? উমাইয়া বললো, সে সা'দ।
আবু জেহেল বললো, তুমি মক্কায় নিরাপদে ঘুরে বেড়াচ্ছো! অথচ তোমরা ধর্মত্যাগীদের আশ্রয় দিয়েছো, তাকে সাহায্যের অঙ্গীকার করেছো! আল্লাহর শপথ! যদি তুমি আবু সাফওয়ানের আশ্রয়ে না থাকতে তাহলে তুমি নিরাপদে তোমার পরিবারের কাছে ফিরে যেতে পারতে না।
সা'দ উচ্চৈস্বরে জবাব দিলেন, তুমি যদি কাবার তওয়াফ থেকে আমাকে বাঁধা দাও তাহলে আমি তোমাকে বাঁধা দেবো আরও কঠিন জায়গায়; মদিনার ওপর দিয়ে তোমাদের যাতায়াত পথে... ৮১
বায়হাকির একটি বর্ণনায় আছে, খোদার কসম! যদি তুমি আমাকে কাবার তওয়াফ করতে বাঁধা দাও, আমি তোমাদের শামের ব্যবসা বন্ধ করে দেবো। ৮২
এই ঘটনা থেকে বোঝা যায়, আবু জেহেল সা'দ ইবনে মুআযকে কুরায়েশের শত্রু বিবেচনা করছিল এবং তিনি মক্কার একজন বড় সর্দারের নিরাপত্তায় না এলে সে তাকে হত্যা করতো। এটা ছিল মদিনাবাসীর প্রতি মক্কার নেতাদের নতুন ধরণের আচরণ। মদিনায় ইসলামী রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার আগের আরচরণ থেকে তা ছিল পুরোপুরি আলাদা। রসূল সা.-এর হিজরতের আগে মদিনার অধিবাসীদের কারো নিরাপত্তা নিয়ে মক্কায় প্রবেশ করতে হতো না। বরং কুরায়েশ এর আগে মদিনার অধিবাসীদের সাথে কোনো ধরণের যুদ্ধাবস্থা সৃষ্টি হওয়ার কথা চিন্তা করতেও অপছন্দ করতো। তারা বলেছিল, আল্লাহর শপথ! আরবের গোত্রগুলোর মধ্যে তোমাদের সাথে যুদ্ধাবস্থা তৈরি হওয়াকেই আমরা সবচে বেশি অপছন্দ করি। ৮৩
এই ঘটনা থেকে আরও বোঝা যায়, কুরায়েশের ব্যবসায়িক কাফেলাগুলো এই ঘটনা ঘটার আগ পর্যন্ত মদিনার রাস্তা ধরে নিরাপদেই শামে যাচ্ছিলো। ইসলামী রাষ্ট্র তাদের কোনো ক্ষতি করে নি। অর্থাৎ ইসলামী রাষ্ট্র তখন পর্যন্ত মক্কার ওপর অর্থনৈতিক অবরোধ আরোপ করে নি এবং মক্কাবাসীর সাথে শত্রুর মতো আচরণও করছিল না। মুসলমানরা তাদের কোনো কাফেলাকে আটক করে নি বা তাদের অন্য কোনো ক্ষতিও করে নি। এর অর্থ হলো মক্কার শাসক গোষ্ঠীই শত্রুতার সূচনা করেছে এবং মদিনার ইসলামী রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করেছে। মুসলমানদের শত্রু গণ্য করে নিরাপত্তা নেওয়া ছাড়া মক্কায় প্রবেশ নিষিদ্ধ করেছে।
মক্কার নেতারাই যে মদিনার ইসলামী রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করেছিল এর আরেকটি প্রমাণ হলো সুনানে আবু দাউদের এই হাদিস, আব্দুর রহমান ইবনে কা'ব ইবনে মালেক রসূল সা.-এর একজন সাহাবী থেকে বর্ণনা করেন, রসূল সা.-এর হিজরতের পর বদর যুদ্ধের আগে কুরায়েশের কাফেররা ইবনে উবাই এবং মদিনার মুশরিকদের কাছে লিখলো, তোমরা আমাদের একজনকে আশ্রয় দিয়েছো, আমরা আল্লাহর নামে শপথ করেছি যে, হয় তোমরা তার বিরুদ্ধে যুদ্ধ করে তাকে মদিনা থেকে বের করে দেবে অথবা আমরা আমাদের সেনাবাহিনী নিয়ে তোমাদের ওপর আক্রমণ চালাবো; তোমাদের যোদ্ধাদের হত্যা করবো এবং তোমাদের নারীদের ভোগ করবো।
এই পত্র পেয়ে আব্দুল্লাহ ইবনে উবাই এবং অন্য মুশরিকরা রসূল সা.-এর সাথে যুদ্ধ করার জন্য একত্র হলো।
রসূল সা. এই খবর পেয়ে দ্রুত ঘটনাস্থলে গেলেন এবং তাদের উদ্দেশে বললেন, কুরায়েশরা হুমকি দিয়ে তাদের উদ্দেশ্য হাসিল করে নিয়েছে। তারা তোমাদের ততটুকুই বিভ্রান্ত করতে পেরেছে যতটুকু তোমরা নিজেরা নিজেদের বিভ্রান্ত করেছো। তোমরা তোমাদের সন্তান ও ভাইদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করতে চাও!
নবীজির বক্তব্য শুনে তারা ছত্রভঙ্গ হয়ে গেলো।
এই ঘটনায় আমরা রসূল সা.-এর নেতৃত্বের বিস্ময়কর শক্তির দেখা পাই। তিনি একটি বড় ফেতনাকে অঙ্কুরেই নির্মূল করতে সক্ষম হয়েছিলেন। তিনি তাদের গোত্রীয় সম্মানবোধের জায়গায় আঘাত করেছেন। রসূল সা. মানব মনের প্রকৃতি বুঝতেন। তিনি তাদের প্রকৃতি অনুযায়ী তাদের উদ্দেশে কথা বলেছিলেন। তাই রসূল সা.-এর বক্তৃতা মদিনার মুশরিকদের মনে প্রভাব বিস্তার করতে সক্ষম হয়েছিল। মদিনার মুসলিম সমাজ ধ্বংস ও তার ভিত্তিমূল নড়বড়ে করে দেওয়ার মুশরিকী চক্রান্ত নস্যাৎ করে দেওয়ার জন্য সেই মুহূর্তে এমন নেতৃত্বগুণের বড় প্রয়োজন ছিল। এভাবে কুরায়েশরা যখন মদিনার ইসলামী রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করলো এবং আল্লাহর পক্ষ থেকেও যুদ্ধের অনুমতি দেওয়া হলো, তখন স্বাভাবিক ভাবেই মদিনা রাষ্ট্র কুরায়েশদের সাথে শত্রুর মতোই আচরণ শুরু করলো। রসূল সা. মদিনার রাষ্ট্রকে শক্তিশালী করার জন্য এবং কুরায়েশদের যুদ্ধ ঘোষণার জবাব দেওয়ার জন্য সাহাবীদের নেতৃত্বে বিভিন্ন সৈন্যদল পাঠান। তিনি নিজেও কয়েকটি যুদ্ধে নেতৃত্ব দেন। এগুলোই বদরপূর্ব সময়ের সারিয়া ও গাযওয়া।
নিচে আমরা গুরুত্বপূর্ণ সারিয়া ও গাযওয়াগুলো সম্পর্কে আলোচনা করবো。
১. গাযওয়াতুল আবওয়া
গাযওয়াতুল আবওয়া ছিল প্রথম গাযওয়া অর্থাৎ রসূল সা.-এর নেতৃত্বে সাহাবীদের প্রথম যুদ্ধ। এই গাযওয়া গাযওয়াতু ওদ্দান নামেও পরিচিত। এই দুইটি জায়গা কাছাকছি। মাঝে ছয় বা আট মাইলের মতো দূরত্ব। এই সফরে কিনানা গোত্রের বনু যামরার সাথে সন্ধি হয়, কোনো যুদ্ধ হয় নি। গাযওয়াটি সংঘটিত হয়েছিল দ্বিতীয় হিজরীর সফর মাসে। মুসলিম বাহিনীর সৈন্য সংখ্যা ছিল পদাতিক ও আরোহী মিলিয়ে দুই শত।

২. সারিয়াতু উবায়দা ইবনুল হারেস
এটা রসূল সা.-এর পাঠানো প্রথম সৈন্যদল। সেই বাহিনীতে ছিলেন সত্তর জনের মতো মুহাজির সাহাবী। কুরায়েশ বাহিনীতে ছিল দুইশত পদাতিক ও আরোহী সৈন্য। কুরায়েশদের বাহিনীর নেতৃত্বে ছিল আবু সুফিয়ান ইবনে হারব। রাবেগ উপত্যকার কূপের কাছে দুই দলের মধ্যে বিক্ষিপ্ত সংঘর্ষ হয়। সা'দ ইবনে আবী ওয়ক্কাস শত্রু বাহিনীর দিকে তীর নিক্ষেপ করেন। এটিই ছিল কাফেরদের দিকে মুসলমানদের নিক্ষিপ্ত প্রথম তীর। এই সারিয়াটি পাঠানো হয় আবওয়া থেকে ফেরার পর।

৩. সারিয়াতু হামযা ইবনে আব্দুল মুত্তালিব
ইবনে ইসহাক বলেন, রসূল সা. গাযওয়াতুল আবওয়ার পর মদিনায় ফিরে হামযা ইবনে আবদিল মুত্তালিবকে ঈসের সমুদ্র উপকূলবর্তী এলাকায় পাঠান। সাথে দেন তিন শত আরোহী মুহাজির সাহাবীর একটি সৈন্যদল। তারা উপকূলে আবু জেহেল ইবনে হিশামের নেতৃত্বে তিন শত মক্কাবাসীর একটি দলের মুখোমুখি হন। মাজদী ইবনে আমর জুহানী তাদের মাঝখানে বাঁধা হয়ে দাঁড়ান, তিনি দুই দলের সাথেই চুক্তিবদ্ধ ছিলেন। তাই যুদ্ধ হতে পারে নি। দুই বাহিনী দুই দিকে চলে যায়।৫০

৪. গাযওয়াতু বুওয়াত ৫১
রসূল সা.-এর নেতৃত্বে এই গাযওয়াটি হয় দ্বিতীয় হিজরীর রবিউল আওয়াল মাসে। তিনি দুই শত সাহাবীর একটি দল নিয়ে বের হন। তাঁর উদ্দেশ্য ছিল উমাইয়া ইবনে খালাফ ও একশত কুরায়েশের একটি দলের ওপর আক্রমণ করা। তারা আড়াই হাজার উট নিয়ে যাচ্ছিলো। তাদের দেখা না পেয়ে রসূল সা. মদিনায় ফিরে আসেন।

৫. গাযওয়াতুল উশায়রা
রসূল সা. কুরায়েশদের সাথে যুদ্ধ করার জন্য বের হন। মদিনায় তাঁর স্থলাভিষিক্ত বানিয়ে যান আবু সালামা ইবনে আবদুল আসাদকে। এই গাযওয়াকে গাযওয়াতু উশায়রা বলা হয়। রসূল সা. জুমাদাল উলা পুরো মাস এবং জুমাদাল উখরার কয়েক দিন উশায়রা এলাকায় অবস্থান করেন। তিনি সেখানে বনী মুদলিজ এবং তাদের মিত্র বনী যামরার সাথে চুক্তি করেন। তারপর মদিনায় ফিরে আসেন। কুরায়েশের দেখা তিনি পান নি।
রসূল সা. যে দলটিকে আক্রমণ করতে বের হয়েছিলেন, তারা এর কিছুদিন আগেই শামের দিকে চলে গিয়েছিল। তাই তিনি তাদেরকে পান নি। পরে এই দলটি সমুদ্র উপকূলবর্তী পথ ধরে ফিরে আসে এবং কুরায়েশের কাছে খবর পৌছে যে তারা বিপদে আছে। কুরায়েশরা এই কাফেলাকে রক্ষা করতে বের হলে রসূল সা.-এর মুখোমুখি হয়ে যায়। তখনই বদরের বড় যুদ্ধ সংঘটিত হয়। ৫২

৬. সারিয়াতু সা'দ ইবনে আবী ওয়াক্কাস
গাযওয়াতুল উশায়রার পরে রসূল সা. সা'দ ইবনে আবী ওয়াক্কাস রা.-কে আশি জন সৈন্যের একটি বাহিনী দিয়ে পাঠান। তিনি হিজাযের খাররার নামক স্থান পর্যন্ত যান। কিন্তু কোনো বাহিনীর মুখোমুখী না হয়ে ফিরে আসেন। ৫৪

৭. বদরের প্রথম গাযওয়া
কুরায ইবনে জাবের ফিহরী মদিনার চারণভূমিতে আক্রমণ করে কিছু উট ও বকরি নিয়ে যায়। রসূল সা. তার খোঁজে বের হয়ে বদরের পার্শবর্তী সাফওয়ান উপত্যকা পর্যন্ত যান। কুরায ইবনে জাবের পালিয়ে যায়। রসূল সা. তাকে ধরতে না পেরে মদিনায় ফিরে আসেন। ৫৫

৮. আবদুল্লাহ ইবনে জাহাশ আল আসাদীর সারিয়া
নবী সা. রজব মাসের শেষ দিন আব্দুল্লাহ ইবনে জাহাশকে আট সৈন্যের একটি মুহাজির দল দিয়ে মক্কার দক্ষিণে নাখলা উপত্যকায় পাঠান। উদ্দেশ্য ছিল কুরায়েশের গতিবিধি লক্ষ্য করা ও তাদের খবরাখবর জানা। কিন্তু তারা কুরায়েশের একটি ব্যবসায়িক কাফেলার মুখোমুখী হয়ে যায়। মুসলমানরা তাদের উপর আক্রমণ করে তাদের নেতা আমর ইবনে হাযরামিকে হত্যা করে এবং তাদের দু'জন ব্যক্তিকে বন্দী করে। বন্দী দু'জন হলো, ওসমান ইবনে আবদিল্লাহ এবং হাকাম ইবনে কায়সান।
মুসলমানরা বন্দী ও গণিমত নিয়ে মদিনায় ফিরে এলে এ ব্যাপারে আয়াত অবতীর্ণ হওয়া পর্যন্ত রসূল সা. এ ব্যপারে সিদ্ধান্ত গ্রহণ স্থগিত রাখেন। এ ব্যাপারে কুরআনের এই আয়াত অবতীর্ণ হয়,
يَسْأَلُونَكَ عَنِ الشَّهْرِ الْحَرَامِ قِتَالٍ فِيهِ قُلْ قِتَالُ فِيهِ كَبِيرٌ وَصَدُّ عَنْ سَبِيلِ اللَّهِ وَكُفْرُ بِهِ وَالْمَسْجِدِ الْحَرَامِ وَإِخْرَاجُ أَهْلِهِ مِنْهُ أَكْبَرُ عِنْدَ اللَّهِ وَالْفِتْنَةُ أَكْبَرُ مِنَ الْقَتْلِ وَلَا يَزَالُونَ يُقَاتِلُونَكُمْ حَتَّى يَرُدُّوكُمْ عَنْ دِينِكُمْ إِنِ اسْتَطَاعُوا وَمَنْ يَرْتَدِدْ مِنْكُمْ عَنْ دِينِهِ فَيَمُتْ وَهُوَ كَافِرُ فَأُولَئِكَ حَبِطَتْ أَعْمَالُهُمْ فِي الدُّنْيَا وَالْآخِرَةِ وَأُولَئِكَ أَصْحَابُ النَّارِ هُمْ فِيهَا خَالِدُونَ
তারা তোমাকে হারাম মাস সম্পর্কে, তাতে লড়াই করা বিষয়ে জিজ্ঞাসা করে। বলো, 'তাতে লড়াই করা বড় পাপ; কিন্তু আল্লাহর পথে বাধা প্রদান, তাঁর সাথে কুফরী করা, মাসজিদুল হারাম থেকে বাধা দেয়া এবং তার অধিবাসীদেরকে তা থেকে বের করে দেয়া আল্লাহর নিকট অধিক বড় পাপ। আর ফেতনা হত্যার চেয়েও বড়'। আর তারা তোমাদের সাথে লড়াই করতে থাকবে, যতক্ষণ না তোমাদেরকে তোমাদের দীন থেকে ফিরিয়ে দেয়, তারা যদি পারে। আর যে তোমাদের মধ্য থেকে তাঁর দীন থেকে ফিরে যাবে, অতঃপর কাফের অবস্থায় মৃত্যু বরণ করবে, বস্তুত এদের আমলসমূহ দুনিয়া ও আখেরাতে বিনষ্ট হয়ে যাবে এবং তারাই আগুনের অধিবাসী। তারা সেখানে স্থায়ী হবে। ৫৬
এই আয়াত অবতীর্ণ হলে রসূল সা. সম্পদ ও বন্দীদের গ্রহণ করলেন। এই সারিয়ায় মুসলমানরা প্রথম গণিমত লাভ করেন। আমর ইবনুল হাযরামী মুসলমানদের হাতে নিহত প্রথম ব্যক্তি এবং ওসমান ইবনে আব্দুল্লাহ ও হাকাম ইবনে কায়সান মুসলমানদের প্রথম যুদ্ধবন্দী। ৫৭

টিকাঃ
৪০ মারওয়িয়াতি গাযওয়াতি বদর, আহমদ বাওযীর (পৃ: ৭৯)
৮১ সহিহ বুখারী (হাদিস: ৩৯৫০)
৮২ দালায়িলুন নবুয়‍্যাহ লিল বায়হাকি (৩/২৫)
৮৩ সীরাতে ইবনে হিশাম (আর-রওযুল উনফ ২/১৯২)
এই এলাকায় মহামারির প্রকোপ থাকার কারণে এমন নাম ছিলো।
ওদ্দান: আবওয়ার কাছাকাছি একটি গ্রাম
জায়গুন্নাবী সা. লি মাহমুদ শীত খাত্তাব (পৃঃ ৫৪)
তাবাকাতে ইবনে সা'দ (২/৭)
হাদিসুল কুরআন আন গাযাওয়াতির রসূল, ড. মুহাম্মাদ বকর আলে ইবাদ (১/৪০)
৫০ সীরাতে ইবনে হিশাম (২/৫৯৫)
৫১ বুওয়াত রিযওয়ীর পাশে ঝর্ণার কাছে জুহাইনার একটি পাহাড়ের নাম।
৫২ নাফসুল মাসদার (২/১১)
৫৩ হিজাযের একটি এলাকার নাম। এটি জুহফার কাছে অবস্থিত। (মারাসিদুল ইত্তিলা' ১/৪৫৫)
৫৪ সীরাতে ইবনে হিশাম (২/৬০০)
৫৫ সীরাতে ইবনে হিশাম (২/৬০১)
৫৬ সূরা বাকারা (আয়াত: ২১৭)
৫৭ হাদীসু কুরআনিল কারীম আন গাযাওয়াতির রসূল (১/৩৪)

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00