📘 নবী (ﷺ) জীবনের টুকরো কথা 📄 ছোটদের প্রতি স্নেহ-মমতা

📄 ছোটদের প্রতি স্নেহ-মমতা


বিশ্ববাসীর আদর্শ প্রশিক্ষক প্রিয় নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ছোটদের প্রতি অকৃত্রিম স্নেহ ও মমতা প্রদর্শন করতেন। নবীজী সাল্লাল্লাহu আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর আদর স্নেহ পেলে ছোটরা তাদের দুঃখ কষ্ট ভুলে যেতো। তাদের শখের খেলা-ধুলা বন্ধ করেও তারা হযরত সাল্লাল্লাহu আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর সান্নিধ্যে কাটাতে ভালবাসতো। আদর-স্নেহের মধ্য দিয়ে প্রিয় নবী সাল্লাল্লাহu আলাইহি ওয়া সাল্লাম ছোটদের সৎ স্বভাব ও উন্নত নীতি-নৈতিকতার প্রশিক্ষণ দিতেন। আদরের সময় আদর আবার উপদেশ দানের সময় উপদেশ দানই ছিলো নবীজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর পদ্ধতি।

একজন বাপ হিসেবে নিজের ছেলে-মেয়েদের সাথে, একজন নানা হিসেবে নিজের নাতী-নাতনীর সাথে, একজন চাচা হিসেবে নিজের ভাতিজা-ভাতিজীদের সাথে এবং একজন মুনিব হিসেবে নিজের অধীনস্থ গোলাম ও চাকরদের সাথে যে আচার-আচরণ প্রদর্শন করেছেন, তা যুগ যুগ ধরে বাপ, দাদা, নানা, চাচা ও মুনিবদের জন্য উত্তম আদর্শ হয়ে আছে।

সাধারণতঃ মানুষ আত্মিক দিক থেকে ব্যাপক উন্নতি সাধন করলে সে ক্ষেত্রে ছেলেমেয়ে ও স্ত্রী-পরিজন থেকে সম্পর্কহীন হয়ে পড়ে। আবার কেউ দুনিয়ার প্রতি ঝুঁকে পড়লে সে ক্ষেত্রে পুত্র-পরিজনের মায়া-মমতায় ডুবে গিয়ে ধর্ম-কর্ম ভুলে যায়। কিন্তু প্রিয় নবী সাল্লাল্লাহu আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর জীবন ছিলো এর ব্যতিক্রম। হযরত সাল্লাল্লাহu আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর জীবন এমন উন্নত ও আদর্শিক জীবন, যে জীবনে একদিকে স্ত্রী ও পুত্র-পরিজনের প্রতি ছিলো অপরিসীম মায়া মমতা ও ভালবাসা। অপরদিকে পরকালের বিশ্বাস ও লক্ষ্য হেতু তাদের শিক্ষা-দীক্ষাসহ নিজ ধর্ম-কর্মের প্রতিও ছিলো যথেষ্ট সচেতনতা। এ ধরণের মধ্যম পন্থায় সুপ্রতিষ্ঠিত জীবনই হতে পারে মানুষের অনুকরণ ও অনুসরণযোগ্য।

প্রিয় নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর জীবনের সবচাইতে বড় বৈশিষ্ট হলো, তিনি নীতি নৈতিকতা ও রাজনৈতিক সংস্কার কাজের বৃহত্তর দায়িত্বে নিয়োজিত থাকার পরও নিজ সন্তান-সন্ততি ও উম্মতদের ছোট খাট বিষয়ের প্রতি অত্যন্ত তীক্ষ্ণ দৃষ্টি রেখেছেন। (সীরাতুন্নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম, ৬/১৬২)

অত্যাধিক মায়া মমতা সত্ত্বেও প্রিয় নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম সন্তানদের চারিত্রিক শিক্ষার ক্ষেত্রে কোনরূপ অবহেলা ও নম্রতা প্রদর্শন করেননি। তেমনি ছোট বড় নির্বিশেষে সকলকে ন্যায় নীতির মান দণ্ডে বিচার ও শাস্তি প্রয়োগ করার ব্যাপারেও তিনি অত্যন্ত কঠোর ছিলেন। একবার মাখযূম গোত্রের ফাতিমা নাম্নী এক মহিলা চুরির অপরাধে অপরাধী হলে তার আত্মীয় স্বজনরা হযরত উসামা (রাযি.)-এর মাধ্যমে নবীজী সাল্লাল্লাহu আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর দরবারে সুপারিশ করালো। নবীজী সাল্লাল্লাহu আলাইহি ওয়া সাল্লাম তার জবাবে বললেন, আমি আল্লাহপাকের শপথ করে বলছি, যদি এ ফাতিমার পরিবর্তে আমার কলিজার টুকরা ফাতিমাও চুরির অপরাধে অপরাধী হতো, তবে তার হাত কাটার নির্দেশ দিতেও আমি কোনরূপ কুণ্ঠাবোধ করতাম না।

হযরত সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম নিজ সন্তানদেরকে একথা পরিস্কার ভাবে বলে কঠোরভাবে হুঁশিয়ার করে দিয়েছিলেন যে, আমি আদর্শিক ও নীতিগত দিক থেকে কারো প্রতি সামান্যতমও নম্রতা প্রদর্শন করতে পারবো না। সুতরাং তোমরা আমার মায়া-মমতা ও দয়া অনুকম্পা দেখে ভুল ধারণার শিকার হবে না।

📘 নবী (ﷺ) জীবনের টুকরো কথা 📄 বড়দের প্রতি সদাচরণ

📄 বড়দের প্রতি সদাচরণ


প্রিয় নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর অতুলনীয় জীবনাদর্শে বড়দের প্রতি শ্রদ্ধাবোধ, উন্নত ও মনোরম আচরণের এক বেনযীর দৃষ্টান্ত খুঁজে পাওয়া যায়। বড়দের প্রতি যথাযথ সদাচরণের এহেন দৃষ্টান্ত দ্বিতীয় আর নেই। একজন মানুষ মর্যাদার সর্বোচ্চ শিখরে আরোহণ করার পরও নিজের তুলনায় শুধু বয়সে বড় হওয়ার কারণে তার প্রতি চূড়ান্ত শ্রদ্ধা নিবেদনের দৃষ্টান্ত কেবল নবী আদর্শেই খুঁজে পাওয়া সম্ভব। এ ক্ষেত্রে হযরত সাল্লাল্লাহu আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর কাছে মাতা-পিতা, চাচা-চাচী, মামা-মামীসহ সকলেই ছিলেন সমান শ্রদ্ধার পাত্র। প্রিয় নবী সাল্লাল্লাহu আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর পারিবারিক জীবন পর্যালোচনা করলে আমরা তা যথার্থ ভাবে অনুধাবন করতে পারি।

জন্মের পূর্বেই নবীজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর পিতা ইন্তেকাল করলেন। শৈশবকালে তিনি স্নেহময়ী মাতাকে হারালেন। কিন্তু জন্ম থেকে শুরু করে জীবনের শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত তিনি তাদের ভুলতে পারেননি। যখনই স্মরণ হতো দু'হাত তুলে আল্লাহ পাকের দরবারে তাদের জন্য তিনি দু'আ করতেন। মাতৃ-পিতৃহীন ইয়াতীম নবী চাচা আবু তালিবের তত্ত্বাবধানে লালিত-পালিত হলেন। চাচাকে কোন কাজ করতে দেখলে দৌড়ে গিয়ে নবীজী সাল্লাল্লাহu আলাইহি ওয়া সাল্লাম সে কাজটি করে দিতেন। সম্ভব না হলেও অন্ততঃ সহযোগিতা করতেন। আবু তালিবের মক্কার দোকানে তিনি উল্লেখযোগ্য ভাবে সহযোগিতা করতেন।

একবার চাচা আবু তালিব অসুস্থ হয়ে পড়লে নবীজী সাল্লাল্লাহu আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাঁকে দেখতে গেলেন। আবু তালিব হযরত সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম কে বললেন, তুমি শুধু আমাকে দেখতে আর আমার খোঁজ খবর নিতে এলে? যে আল্লাহ তোমাকে তার রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম হিসেবে পাঠিয়েছেন তাঁর কাছে আমার জন্য একটু দু'আ কর না কেন? একথা শুনে প্রিয় নবী সাল্লাল্লাহu আলাইহি ওয়া সাল্লাম আপন শ্রদ্ধেয় চাচার জন্য আল্লাহ পাকের দরবারে দু'হাত উঁচিয়ে প্রার্থনা করলেন। সাথে সাথে আবু তালিব সুস্থ হয়ে উঠে বসলেন এবং বললেন, মুহাম্মদ! (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) প্রভু স্বয়ং তোমার কথা মানেন। নবীজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম সুযোগ পেয়ে বললেন, চাচাজান! আপনিও যদি আমার কথা মেনে নেন তবে আল্লাহপাক আপনার কথাও মেনে নিবেন। (সীরাতুন্নবী সা. প্রথম খণ্ড)

সীরাতে ইবনে হিশামের এক বর্ণনা মতে আবু তালিব ইন্তিকালের পূর্বে কালেমা পড়ে মুসলমান হয়েছিলেন। আল্লামা শিবলী (রহ.) আবু তালিবের ইসলাম গ্রহণের বর্ণনাটিকে অগ্রাধিকার দিয়েছেন। অবশ্য কারো কারো মতে এ ব্যাপারে কোন মন্তব্য না করাই ভাল। (আখলাকে রাসূলে আকরাম সা. পৃ. ৪৭)

আপন দুধ মাতা-পিতার প্রতি ছিলো প্রিয় নবী সাল্লাল্লাহu আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর অগাধ ভক্তি ও শ্রদ্ধা। প্রকৃত পিতা মাতার মতই তিনি তাদেরকে শ্রদ্ধা প্রদর্শন করতেন এবং তাদের হক ও অধিকার স্বীকার করতেন। একবার প্রিয় নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর দুধ মাতা হযরত হালীমা সা'দিয়া (রাযি.) নবীজী সাল্লাল্লাহu আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর সাথে সাক্ষাৎ করতে এলে হযরত সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ভক্তির আতিশয্যে আমার আম্মা! আমার আম্মা! বলতে বলতে তার কাছে গেলেন।

হযরত হালীমা (রাযি.)-এর স্বামী হযরত হারেস (রাযি.) একবার প্রিয় নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর সাথে সাক্ষাৎ করতে এলে হযরত সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম নিজের গায়ের চাদর মুবারক খুলে তার জন্য যমীনে বিছিয়ে দিলেন। অতঃপর হযরত হারেস (রাযি.) কিয়ামত সম্পর্কে জানতে চাইলে হযরত সাল্লাল্লাহu আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন, আব্বাজান! যেদিন কিয়ামত সংঘটিত হবে সেদিন আমি আপনার হাত ধরে বলে দিব এই দেখুন আব্বা—আজ কিয়ামত কায়েম হয়ে গেছে। হযরত হারেস (রাযি.) এ ঘটনাটি খুব আগ্রহ ও গর্বের সাথে বর্ণনা করতেন। তিনি বলতেন, আমার ছেলে কিয়ামতের দিন যখন আমার হাত ধরবে বলে জানিয়েছে সেমতে আমার দৃঢ় বিশ্বাস সে আমাকে সেদিন জান্নাতে না নিয়ে ছাড়বে না।

আবু তালিবের ইন্তেকালের পর তাঁর স্ত্রী হযরত ফাতিমা বিনতে আসাদ (রাযি.) আবু তালিবের মতই প্রিয় নবী সাল্লাল্লাহu আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর সাথে সদাচরণ করতেন। তিনি ইন্তেকালের পর হযরত সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম নিজ চাচীর কবর নিজেই খনন করলেন। অতঃপর সে কবরে প্রথমে নিজে শুয়ে পড়লেন। এর পর আপন জামা দ্বারা তাকে কাফন পরিয়ে কবরে রাখলেন। (জযবুল কুলুব/২১৪)

📘 নবী (ﷺ) জীবনের টুকরো কথা 📄 ইয়াতীম অসহায়দের প্রতি দয়া

📄 ইয়াতীম অসহায়দের প্রতি দয়া


রহমতে আলম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ইয়াতীম, দুঃস্থ ও অসহায়দের প্রতি অপরিসীম দয়া, অনুকম্পা ও অনুগ্রহ প্রদর্শন করতেন। অনেক দুঃস্থ অনাথের মুখে তিনি হাসি ফুটিয়েছেন।

সপ্তম হিজরীতে প্রিয় নবী সাল্লাল্লাহu আলাইহি ওয়া সাল্লাম উমরা সম্পাদন করে মদীনা ফিরার পথে একটি হৃদয় বিদারক দৃশ্যের অবতারণা ঘটলো। নির্মমভাবে শাহাদাত বরণকারী হযরত হামযা (রাযি.)-এর ইয়াতীম কন্যা উমামা নিজের নানা বাড়ী মক্কাতেই ছিলো। শিশু উমামার নযর প্রিয় নবী সাল্লাল্লাহu আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর উপর পড়তেই সে চাচা! চাচা!! বলে দৌড়ে নবীজী সাল্লাল্লাহu আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর কাছে চলে এলো। হযরত সাল্লাল্লাহu আলাইহি ওয়া সাল্লাম সম্পর্কে যদিও শিশু উমামার চাচাতো ভাই হতেন, কিন্তু সে ইজ্জত ও সম্মানার্থে নবীজী সাল্লাল্লাহu আলাইহি ওয়া সাল্লাম কে চাচা বলে ডাকলো।

সেখানে হযরত সাল্লাল্লাহu আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর কাছে হযরত আলী (রাযি.) উপস্থিত ছিলেন। তিনি উমামাকে আপন কোলে তুলে নিলেন। উমামাকে দেখে হযরত আলী (রাযি.)-এর ভাই হযরত জা'ফর এবং হযরত সাল্লাল্লাহu আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর আযাদকৃত গোলাম হযরত যায়েদ (রাযি.) হযরত আলী (রাযি.)-এর কাছে এলেন। এবার তিন জনেই হযরত উমামা (রাযি.) কে নেয়ার জন্য ঠাণ্ডা ঝগড়া শুরু করে দিলেন। প্রিয় নবী সাল্লাল্লাহu আলাইহি ওয়া সাল্লাম এক পাশে দাঁড়িয়ে এ দৃশ্য অবলোকন করছিলেন আর তাঁর দু'চোখ বেয়ে অশ্রুধারা প্রবাহিত হচ্ছিলো। কারণ তখন হযরত সাল্লাল্লাহu আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর স্মরণ হলো চাচা হযরত হামযা (রাযি.)-এর নির্মম শাহাদাতের কথা।

হযরত সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম নিজের চাচাতো বোন উমামার প্রতি এ অনুকম্পা প্রদর্শনের জন্য তিন জনের উপরই খুশি হলেন। অতঃপর হযরত আলী (রাযি.) কে লক্ষ্য করে বললেন, হে আলী (রাযি.)! আমি তোমার থেকে আর তুমি আমার থেকে। হযরত যায়েদ (রাযি.) কে লক্ষ্য করে বললেন, হে যায়েদ! তুমি আমার ভাই এবং আমার দোস্ত। হযরত জা'ফর (রাযি.) কে লক্ষ্য করে বললেন, হে জা'ফর তুমি আকৃতি এবং প্রকৃতির দিক থেকে আমার মতই। অতঃপর উমামাকে হযরত জা'ফর (রাযি.)-এর স্ত্রী হযরত আসমা (রাযি.)-এর হাতে সোপর্দ করে দিলেন। যিনি হযরত উমামার (রাযি.) খালা ছিলেন। হযরত সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন, খালা মায়ের মতই হয়ে থাকেন। (ইবনে কাসীর : ৪/২০৩)

হযরত আনাস (রাযি.) প্রিয় নবী সাল্লাল্লাহu আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর খাস খাদেম ছিলেন। শৈশবে তাঁর মা তাঁকে হযরত সাল্লাল্লাহu আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর হাতে সোপর্দ করেছিলেন। হযরত আনাস (রাযি.) বর্ণনা করেন, প্রিয় নবী সাল্লাল্লাহu আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর কাজ করতে গিয়ে কখনো আমাকে গোস্যার শিকার হতে হয়নি। শুধু একবার হযরত সাল্লাল্লাহu আলাইহি ওয়া সাল্লাম আমাকে কোন কাজে পাঠিয়েছিলেন। আমি শিশুসুলভ অভ্যাস হেতু কাজের কথা ভুলে ছোট ছোট ছেলেদের সাথে খেলাধুলায় লিপ্ত হয়ে পড়েছিলাম। আমার দেরী দেখে হযরত সাল্লাল্লাহu আলাইহি ওয়া সাল্লাম আমাকে খুঁজতে বেরোলেন এবং আমাকে খেলায় রত অবস্থায় দেখে ধরে বললেন, 'তোমাকে কাজে পাঠিয়েছি আর তুমি খেলায় লিপ্ত হয়ে পড়েছো? মনে চায় হাতের মেসওয়াক দিয়ে তোমাকে খুব মারতে।" এটিই ছিলো প্রিয় নবী সাল্লাল্লাহu আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর চূড়ান্ত পর্যায়ের গোস্যার বহিঃপ্রকাশ।

হযরত আনাস (রাযি.) বলেন, এছাড়া আর কোন দিন হযরত সাল্লাল্লাহu আলাইহি ওয়া সাল্লাম আমাকে কিছুই বলেননি। এমনকি একথাও বলেননি যে, এটি করলে কেন? কিংবা এমনটি করলে না কেন?

একবার ঈদের মাঠে যাওয়ার পথে একটি ইয়াতীম শিশুকে পথে বসে কাঁদতে দেখে নবীজী সাল্লাল্লাহu আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাকে আদর করে তার দুঃখের কথা জিজ্ঞাসা করলেন। সব শুনে নবীজী সাল্লাল্লাহu আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাকে নিজের বাড়ী নিয়ে গেলেন এবং গোসল করিয়ে সুন্দর জামা কাপড় পরিয়ে তাকে ঈদগাহে নিয়ে গেলেন। ক্রন্দনরত শিশুটির মুখে এবার আনন্দের হাসি ফুটে উঠলো। এভাবেই তিনি সদা-সর্বদা ইয়াতীম অসহায়দের প্রতি স্নেহ-মমতা ও দয়া-অনুকম্পা প্রদর্শন করেছেন। পিতৃস্নেহে সিক্ত করে তাদের ব্যাথা বেদনা ভুলিয়ে দিতে চেষ্টা করেছেন।

📘 নবী (ﷺ) জীবনের টুকরো কথা 📄 অসুস্থের সেবা

📄 অসুস্থের সেবা


প্রিয় নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম অসুস্থের খোঁজ-খবর নেয়া এবং তাদের সেবা করার প্রতি যথেষ্ট গুরুত্ব আরোপ করেছেন। তিনি নিজেও এ বিষয়টিকে অত্যন্ত সচেতনতার সাথে লক্ষ্য রেখেছেন। অসুস্থ ব্যক্তির সেবা করাকে তিনি এক মুসলমানের প্রতি অপর মুসলমানের হক ও অধিকার বলে বর্ণনা করেছেন। শুধু মুসলমানই নয় বরং জাতি ধর্ম নির্বিশেষে সকলের সেবা করার ব্যাপারে নবীজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম অত্যন্ত উদার ছিলেন। এমনকি অনেক সময় হযরত সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম অসুস্থ মুনাফিকের সেবা করার জন্যও স্বশরীরে উপস্থিত হয়ে যেতেন এবং সেবা করতেন।

হযরত সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ইরশাদ করেন, যখন তোমরা কোন অসুস্থ ব্যক্তির খোঁজ-খবর নেয়ার জন্য তার কাছে যাবে, তখন তার হাত এবং কপালে নিজের হাত রাখবে এবং তাকে সান্ত্বনা দিবে। তার সুস্থতার জন্য মহান আল্লাহর দরবারে দু'আ করবে। (সীরাতুন্নবী (সা.) ২১৬) প্রিয় নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর একজন খাদেম ছিলো ইয়াহুদী। সে অসুস্থ হয়ে পড়লে নবীজী সাল্লাল্লাহu আলাইহি ওয়া সাল্লাম তার খোঁজ-খবর নিতে সে ইয়াহুদী খাদেমের বাড়ী গেলেন। দীর্ঘ সময় তার মাথার কাছে বসে তাকে সান্ত্বনা দিলেন। প্রিয় নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর এ আশ্চর্য ব্যবহারে খাদেমটি দারুণ ভাবে প্রভাবিত হয়ে ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করে নিলো।

মদীনার খযরজ গোত্র প্রধান হযরত সা'দ ইবনে উবাদা (রাযি.) একবার অসুস্থ হয়ে পড়লে নবীজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাঁকে দেখার জন্য তাঁর বাড়ীতে গেলেন। হযরত সা'দ (রাযি.)-এর অবস্থা এতই শোচনীয় ছিলো যে, রহমতের নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাঁকে দেখে কেঁদে উঠলেন। তাঁর মোবারক চক্ষুদয় অশ্রুশিক্ত হয়ে উঠলো। হযরত সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাঁর আরোগ্যের জন্য আল্লাহর দরবারে দু'আ করলেন। ফলে আল্লাহ তা'আলা হযরত সা'দ (রাযি.) কে সুস্থতা দান করেন।

সাহাবী হযরত জাবির (রাযি.) একবার অসুস্থ হয়ে দীর্ঘ দিন বিছানায় পড়ে থাকেন। এ সময়ে বেশ কয়েক বার নবীজী সাল্লাল্লাহu আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাঁর বাড়ী যান। তার খোঁজ খবর নেন। হযরত জাবির (রাযি.)-এর বাড়ী বেশ দূরে থাকার পরেও নবীজী সাল্লাল্লাহu আলাইহি ওয়া সাল্লাম প্রতিবারই পায়ে হেঁটে তাঁর বাড়ীতে গিয়ে তাঁর অবস্থা সম্পর্কে খোঁজ-খবর নেন।

একদিন হযরত সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম গিয়ে দেখতে পেলেন, রোগের তীব্রতায় হযরত জাবির (রাযি.) বেহুশ হয়ে পড়ে আছেন। হযরত সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তখন নিজ হাতে তার চেহারায় পানি ছিটিয়ে দেন। হযরত সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর বরকতপূর্ণ পানির ছিটায় হযরত জাবিরের (রাযি.) জ্ঞান ফিরে আসে। এরপর আস্তে আস্তে তিনি সুস্থ হয়ে উঠেন।

এমনি আরো অসংখ্য ঘটনা রয়েছে যা থেকে প্রিয় নবী সাল্লাল্লাহu আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর রোগাক্রান্ত ব্যক্তিদের সেবা শুশ্রূষার প্রমাণ পাওয়া যায়। হযরত সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম অপরের দুঃখে দুঃখিত হতেন। তা বিদূরিত করার সম্ভাব্য সব রকম চেষ্টা ও ব্যবস্থা গ্রহণ করতেন। আর এজন্যই তো তিনি "রাহমাতুল্লিল আলামীন"।

ফন্ট সাইজ
15px
17px