📘 নবী (ﷺ) জীবনের টুকরো কথা 📄 গান-বাজনা পরিহার

📄 গান-বাজনা পরিহার


জীবনের শুরু থেকে নবুওওত লাভের পূর্ব পর্যন্ত মহান আল্লাহ প্রিয় নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে যাবতীয় নিন্দনীয় কর্মকাণ্ড থেকে সম্পূর্ণ রূপে সংরক্ষিত রেখেছেন। বিশেষতঃ যৌবন বয়সে মানব প্রকৃতিতে যে সব কামনা-বাসনার সৃষ্টি হয়ে থাকে, নবীজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তা থেকেও ছিলেন সম্পূর্ণ রূপে পবিত্র। তৎকালীন সময়ে গান-বাজনার ব্যাপক ছড়াছড়ি সত্ত্বেও নবীজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম একটি দিনও ওসব আসরে যোগদান করেননি। সাময়িকভাবে কখনো সামান্য মনোভাব সৃষ্টি হলেও মহান আল্লাহ বিশেষ তত্ত্বাবধানে হযরত সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে তা থেকে হিফাযত করছেন।

হযরত আলী (রাযি.) থেকে একটি বর্ণনা রয়েছে, তিনি বলেছেন, আমি প্রিয় নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম থেকে শুনেছি, হযরত সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ইরশাদ করেন, যৌবনকালে জাহিলী যুগের গর্হিত ও নিন্দনীয় কার্যকলাপে অংশগ্রহণের কোন ইচ্ছাও আমার মনে সৃষ্টি হয়নি। তবে দু'বার আমার মনে (সঙ্গী-সাথী ও পারিপার্শ্বিকতার প্রভাবে) সামান্য ইচ্ছা সৃষ্টি হলেও মহান আল্লাহ আমাকে তা থেকে বাঁচিয়ে রেখেছেন।

হযরত সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন, একবার আমি বকরী চড়াতে মাঠে গেলাম এবং আমার এক সাথীকে বললাম, ভাই! তুমি আমার বকরীগুলোর প্রতি লক্ষ্য রেখো, আমি মক্কা গিয়ে কিছু কিচ্ছা-কাহিনী শুনে আসি। একথা বলে আমি রওয়ানা করেছিলাম, ইতিমধ্যে এক জায়গায় গানের আওয়ায শুনতে পেলাম। লোকদের জিজ্ঞাসা করলাম, তারা জবাব দিলো, ঐ বাড়ীতে অমুকের বিবাহ অনুষ্ঠিত হচ্ছে কিনা, তাই তারা গান-বাজনা করে আনন্দ-উল্লাস করছে। তখন আমার মনে একটা ভাব সৃষ্টি হলো, আমি চিন্তা করলাম, এখানে বসেই কিছুক্ষণ গান শুনবো। আমি সে মতে এক জায়গায় বসে গেলাম। কিন্তু সাথে সাথে মহান আল্লাহ আমার কানে মোহর মেরে দিলেন। আমি তখন আর কিছুই শুনতে পেলাম না। আমার চোখে ঘুম নেমে এলো আমি শুয়ে ঘুমিয়ে পড়লাম। হযরত সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন, আমি মহান আল্লাহর শপথ করে বলছি, আমার চোখে আল্লাহপাক এমন ঘুম দিলেন যে, এক ঘুমে রাত্র শেষ হয়ে যখন সকাল হলো তখন আমার চোখে সূর্যের কিরণ পড়ায় আমি জেগে উঠলাম। সকালে উঠে আমি যখন আমার সে সাথীর কাছে মাঠে ফিরে গেলাম তখন সে আমাকে জিজ্ঞাসা করলো, বলো তুমি কি শুনে এলে? আমি তাকে পুরো বিষয়টি বিস্তারিত ভাবে বললাম।

পরের দিনও আমার মনে সে একই ইচ্ছা জাগলো, এবারও আমি শহরের পথ ধরে রওয়ানা হলাম, কিন্তু মহান আল্লাহ এবারও আমার চোখে ঘুম দিয়ে দিলেন এবং আমি গান শুনা থেকে বেঁচে গেলাম। এরপর থেকে আর কোনদিন আমার মনে এ জাতীয় কোন ধ্যান-ধারণা বা ইচ্ছার সৃষ্টি হয়নি। (খাসায়েসে কুবরা ১/৮৮)

এ ছিলো মহান শিক্ষক নবীজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর যৌবনের তারুণ্য দীপ্ত সময়ে তদানীন্তন সমাজে ব্যাপক ভাবে প্রচলিত গান বাজনা থেকে বেঁচে থাকার অবস্থা। কারণ তিনিই তো হবেন সে নবী যিনি সারা দুনিয়ার মানুষের উত্তম চরিত্র গঠন ও তাদেরকে সভ্যতা-ভব্যতার প্রশিক্ষণ দিয়ে আদর্শ মানুষে পরিণত করার মহান দায়িত্বে নিয়োজিত থাকবেন। সুতরাং সে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর প্রকৃতি ও স্বভাব এমনি স্বচ্ছ ও পবিত্র হওয়াই তো বাঞ্ছনীয়।

📘 নবী (ﷺ) জীবনের টুকরো কথা 📄 শান্তি প্রচেষ্টা

📄 শান্তি প্রচেষ্টা


আগামী দিনের শ্রেষ্ঠ নবী আজকের যুবক হযরত মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ভ্রান্ত ও নিন্দনীয় কাজ থেকে সর্বদা কঠোর ভাবে বিরত থেকেছেন। পক্ষান্তরে জনকল্যাণকর শান্তিমূলক ভাল কাজে ভূমিকা রাখার কোন সুযোগই তিনি হাত ছাড়া করেননি, বরং বিভিন্ন ক্ষেত্রে চিন্তা-ভাবনা করে জন-মানব কল্যাণের পথ উদ্ভাবন করতেন। যুদ্ধাংদেহী মনোভাবের অনিষ্টকর কুয়াশায় আচ্ছাদিত আরব বাসীদের মাঝে যুদ্ধ বিগ্রহ লেগেই থাকতো। ইতোমধ্যে কুরাইশদের মাঝে একটি বড় ধরণের যুদ্ধ (হরবে ফিজার) সংঘটিত হলে চিন্তাশীলদের মাঝে এক নতুন চিন্তা-ভাবনার সূচনা হলো। তারা কোন মুক্তির পথ উদ্ভাবনের কথা ভাবতে লাগলো।

প্রিয় নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তখন তাদের মধ্যকার নেতৃস্থানীয়দের সাথে নিয়ে একটি শান্তি আলোচনার ডাক দিলেন। এজন্য তিনি একটি সাধারণ সভা আহবান করলেন। অতঃপর বেশ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ ধারাসহ একটি সংগঠন প্রতিষ্ঠা করা হলো। যার নাম দেয়া হলো "হিলফুল ফুযূল"। শান্তি চুক্তির ভিত্তিতে প্রতিষ্ঠিত এ সংগঠনের বিশেষ বিশেষ ধারাগুলো ছিলো— (১) আমরা দেশের অশান্তি দূর করার জন্য যথা সাধ্য চেষ্টা চালিয়ে যাবো। (২) বিদেশী লোকদের জান-মাল ও মান-সম্ভ্রম রক্ষার ক্ষেত্রে আমরা চেষ্টায় কোন রূপ ত্রুটি করবো না। (৩) দরিদ্র ও অসহায় লোকদের সার্বিক ভাবে সহায়তা দান করতে আমরা কোন রূপ কুণ্ঠিত হবো না। (৪) অত্যাচারী এবং তার অত্যাচারকে দমিত ও ব্যাহত করতে এবং দুর্বল দেশবাসীকে অত্যাচারীর কবল থেকে রক্ষা করতে আমরা প্রাণপণ চেষ্টা চালিয়ে যাবো।

তখনকার আত্ম-কলহ ও বিদ্বেষপূর্ণ আরবে শান্তি ও নিরাপত্তার পরিবেশ সৃষ্টির ক্ষেত্রে এ ছিলো এক গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ। এ শান্তি চুক্তি ও জনকল্যাণকর প্রতিজ্ঞায় প্রতিজ্ঞাবদ্ধ হওয়ার পর প্রিয় নবী সাল্লাল্লাহu আলাইহি ওয়া সাল্লাম কস্মিনকালেও তার ব্যতিক্রম কিছু করেননি। কিন্তু আরবের কুরাইশ সম্প্রদায় তাদের স্বভাব সুলভ ভাবে এ প্রতিজ্ঞার উপরও টিকে থাকেনি বরং তারা তা ভঙ্গ করেছিলো।

নবুওওত প্রাপ্তির পর একবার "হিলফুল ফুযূল” সম্পর্কে কথা উঠলে নবীজী সাল্লাল্লাহu আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন, নবুওওত ও ইসলামের আগমনের পরে আজো যদি কেউ আমাকে এ জাতীয় শান্তি প্রতিষ্ঠায় আলোচনার জন্য আহবান করে, তবে আমি অবশ্যই সে আহবানে সাড়া দিব। অর্থাৎ মুসলিম অমুসলিম নির্বিশেষে সকল ভাল ও মঙ্গলজনক কাজে সহায়তা প্রদর্শনই ইসলামের নীতি ও মৌলিক উদ্দেশ্য বিধায় আমি তার উপর অবিচল থাকবো। (ইবনে সা'দ, ১/৮২)

এতো গেল প্রিয় নবী সাল্লাল্লাহu আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর নবুওওত পূর্ব যৌবন বয়সের অতুলনীয় আদর্শের কিঞ্চিৎ নমুনা। নবুওওত লাভের পরও নবীজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম নিজ আদর্শ ও উন্নত গুণাবলীর আঁধার ছিলেন। পূর্বের উন্নত গুণাবলীর সাথে এবারে নতুন ভাবে আদর্শিক সংযোগ সৃষ্টি হলো। প্রিয় নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর নবুওওত পরবর্তী তেইশ বছরের জীবন ছিলো সারা দুনিয়ার যাবতীয় উত্তম গুণাবলী, সৎ-স্বভাব ও ন্যায়পরায়ণতার একমাত্র উৎস। কেউ সততা ও ন্যায় পরায়ণতার দাবীদার হতে হলে তাকে প্রিয় নবী সাল্লাল্লাহu আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর জীবনাদর্শ থেকে শিক্ষা গ্রহণ ছাড়া দ্বিতীয় আর কোন পথ নেই।

📘 নবী (ﷺ) জীবনের টুকরো কথা 📄 ছোটদের প্রতি স্নেহ-মমতা

📄 ছোটদের প্রতি স্নেহ-মমতা


বিশ্ববাসীর আদর্শ প্রশিক্ষক প্রিয় নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ছোটদের প্রতি অকৃত্রিম স্নেহ ও মমতা প্রদর্শন করতেন। নবীজী সাল্লাল্লাহu আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর আদর স্নেহ পেলে ছোটরা তাদের দুঃখ কষ্ট ভুলে যেতো। তাদের শখের খেলা-ধুলা বন্ধ করেও তারা হযরত সাল্লাল্লাহu আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর সান্নিধ্যে কাটাতে ভালবাসতো। আদর-স্নেহের মধ্য দিয়ে প্রিয় নবী সাল্লাল্লাহu আলাইহি ওয়া সাল্লাম ছোটদের সৎ স্বভাব ও উন্নত নীতি-নৈতিকতার প্রশিক্ষণ দিতেন। আদরের সময় আদর আবার উপদেশ দানের সময় উপদেশ দানই ছিলো নবীজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর পদ্ধতি।

একজন বাপ হিসেবে নিজের ছেলে-মেয়েদের সাথে, একজন নানা হিসেবে নিজের নাতী-নাতনীর সাথে, একজন চাচা হিসেবে নিজের ভাতিজা-ভাতিজীদের সাথে এবং একজন মুনিব হিসেবে নিজের অধীনস্থ গোলাম ও চাকরদের সাথে যে আচার-আচরণ প্রদর্শন করেছেন, তা যুগ যুগ ধরে বাপ, দাদা, নানা, চাচা ও মুনিবদের জন্য উত্তম আদর্শ হয়ে আছে।

সাধারণতঃ মানুষ আত্মিক দিক থেকে ব্যাপক উন্নতি সাধন করলে সে ক্ষেত্রে ছেলেমেয়ে ও স্ত্রী-পরিজন থেকে সম্পর্কহীন হয়ে পড়ে। আবার কেউ দুনিয়ার প্রতি ঝুঁকে পড়লে সে ক্ষেত্রে পুত্র-পরিজনের মায়া-মমতায় ডুবে গিয়ে ধর্ম-কর্ম ভুলে যায়। কিন্তু প্রিয় নবী সাল্লাল্লাহu আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর জীবন ছিলো এর ব্যতিক্রম। হযরত সাল্লাল্লাহu আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর জীবন এমন উন্নত ও আদর্শিক জীবন, যে জীবনে একদিকে স্ত্রী ও পুত্র-পরিজনের প্রতি ছিলো অপরিসীম মায়া মমতা ও ভালবাসা। অপরদিকে পরকালের বিশ্বাস ও লক্ষ্য হেতু তাদের শিক্ষা-দীক্ষাসহ নিজ ধর্ম-কর্মের প্রতিও ছিলো যথেষ্ট সচেতনতা। এ ধরণের মধ্যম পন্থায় সুপ্রতিষ্ঠিত জীবনই হতে পারে মানুষের অনুকরণ ও অনুসরণযোগ্য।

প্রিয় নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর জীবনের সবচাইতে বড় বৈশিষ্ট হলো, তিনি নীতি নৈতিকতা ও রাজনৈতিক সংস্কার কাজের বৃহত্তর দায়িত্বে নিয়োজিত থাকার পরও নিজ সন্তান-সন্ততি ও উম্মতদের ছোট খাট বিষয়ের প্রতি অত্যন্ত তীক্ষ্ণ দৃষ্টি রেখেছেন। (সীরাতুন্নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম, ৬/১৬২)

অত্যাধিক মায়া মমতা সত্ত্বেও প্রিয় নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম সন্তানদের চারিত্রিক শিক্ষার ক্ষেত্রে কোনরূপ অবহেলা ও নম্রতা প্রদর্শন করেননি। তেমনি ছোট বড় নির্বিশেষে সকলকে ন্যায় নীতির মান দণ্ডে বিচার ও শাস্তি প্রয়োগ করার ব্যাপারেও তিনি অত্যন্ত কঠোর ছিলেন। একবার মাখযূম গোত্রের ফাতিমা নাম্নী এক মহিলা চুরির অপরাধে অপরাধী হলে তার আত্মীয় স্বজনরা হযরত উসামা (রাযি.)-এর মাধ্যমে নবীজী সাল্লাল্লাহu আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর দরবারে সুপারিশ করালো। নবীজী সাল্লাল্লাহu আলাইহি ওয়া সাল্লাম তার জবাবে বললেন, আমি আল্লাহপাকের শপথ করে বলছি, যদি এ ফাতিমার পরিবর্তে আমার কলিজার টুকরা ফাতিমাও চুরির অপরাধে অপরাধী হতো, তবে তার হাত কাটার নির্দেশ দিতেও আমি কোনরূপ কুণ্ঠাবোধ করতাম না।

হযরত সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম নিজ সন্তানদেরকে একথা পরিস্কার ভাবে বলে কঠোরভাবে হুঁশিয়ার করে দিয়েছিলেন যে, আমি আদর্শিক ও নীতিগত দিক থেকে কারো প্রতি সামান্যতমও নম্রতা প্রদর্শন করতে পারবো না। সুতরাং তোমরা আমার মায়া-মমতা ও দয়া অনুকম্পা দেখে ভুল ধারণার শিকার হবে না।

📘 নবী (ﷺ) জীবনের টুকরো কথা 📄 বড়দের প্রতি সদাচরণ

📄 বড়দের প্রতি সদাচরণ


প্রিয় নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর অতুলনীয় জীবনাদর্শে বড়দের প্রতি শ্রদ্ধাবোধ, উন্নত ও মনোরম আচরণের এক বেনযীর দৃষ্টান্ত খুঁজে পাওয়া যায়। বড়দের প্রতি যথাযথ সদাচরণের এহেন দৃষ্টান্ত দ্বিতীয় আর নেই। একজন মানুষ মর্যাদার সর্বোচ্চ শিখরে আরোহণ করার পরও নিজের তুলনায় শুধু বয়সে বড় হওয়ার কারণে তার প্রতি চূড়ান্ত শ্রদ্ধা নিবেদনের দৃষ্টান্ত কেবল নবী আদর্শেই খুঁজে পাওয়া সম্ভব। এ ক্ষেত্রে হযরত সাল্লাল্লাহu আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর কাছে মাতা-পিতা, চাচা-চাচী, মামা-মামীসহ সকলেই ছিলেন সমান শ্রদ্ধার পাত্র। প্রিয় নবী সাল্লাল্লাহu আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর পারিবারিক জীবন পর্যালোচনা করলে আমরা তা যথার্থ ভাবে অনুধাবন করতে পারি।

জন্মের পূর্বেই নবীজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর পিতা ইন্তেকাল করলেন। শৈশবকালে তিনি স্নেহময়ী মাতাকে হারালেন। কিন্তু জন্ম থেকে শুরু করে জীবনের শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত তিনি তাদের ভুলতে পারেননি। যখনই স্মরণ হতো দু'হাত তুলে আল্লাহ পাকের দরবারে তাদের জন্য তিনি দু'আ করতেন। মাতৃ-পিতৃহীন ইয়াতীম নবী চাচা আবু তালিবের তত্ত্বাবধানে লালিত-পালিত হলেন। চাচাকে কোন কাজ করতে দেখলে দৌড়ে গিয়ে নবীজী সাল্লাল্লাহu আলাইহি ওয়া সাল্লাম সে কাজটি করে দিতেন। সম্ভব না হলেও অন্ততঃ সহযোগিতা করতেন। আবু তালিবের মক্কার দোকানে তিনি উল্লেখযোগ্য ভাবে সহযোগিতা করতেন।

একবার চাচা আবু তালিব অসুস্থ হয়ে পড়লে নবীজী সাল্লাল্লাহu আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাঁকে দেখতে গেলেন। আবু তালিব হযরত সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম কে বললেন, তুমি শুধু আমাকে দেখতে আর আমার খোঁজ খবর নিতে এলে? যে আল্লাহ তোমাকে তার রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম হিসেবে পাঠিয়েছেন তাঁর কাছে আমার জন্য একটু দু'আ কর না কেন? একথা শুনে প্রিয় নবী সাল্লাল্লাহu আলাইহি ওয়া সাল্লাম আপন শ্রদ্ধেয় চাচার জন্য আল্লাহ পাকের দরবারে দু'হাত উঁচিয়ে প্রার্থনা করলেন। সাথে সাথে আবু তালিব সুস্থ হয়ে উঠে বসলেন এবং বললেন, মুহাম্মদ! (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) প্রভু স্বয়ং তোমার কথা মানেন। নবীজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম সুযোগ পেয়ে বললেন, চাচাজান! আপনিও যদি আমার কথা মেনে নেন তবে আল্লাহপাক আপনার কথাও মেনে নিবেন। (সীরাতুন্নবী সা. প্রথম খণ্ড)

সীরাতে ইবনে হিশামের এক বর্ণনা মতে আবু তালিব ইন্তিকালের পূর্বে কালেমা পড়ে মুসলমান হয়েছিলেন। আল্লামা শিবলী (রহ.) আবু তালিবের ইসলাম গ্রহণের বর্ণনাটিকে অগ্রাধিকার দিয়েছেন। অবশ্য কারো কারো মতে এ ব্যাপারে কোন মন্তব্য না করাই ভাল। (আখলাকে রাসূলে আকরাম সা. পৃ. ৪৭)

আপন দুধ মাতা-পিতার প্রতি ছিলো প্রিয় নবী সাল্লাল্লাহu আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর অগাধ ভক্তি ও শ্রদ্ধা। প্রকৃত পিতা মাতার মতই তিনি তাদেরকে শ্রদ্ধা প্রদর্শন করতেন এবং তাদের হক ও অধিকার স্বীকার করতেন। একবার প্রিয় নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর দুধ মাতা হযরত হালীমা সা'দিয়া (রাযি.) নবীজী সাল্লাল্লাহu আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর সাথে সাক্ষাৎ করতে এলে হযরত সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ভক্তির আতিশয্যে আমার আম্মা! আমার আম্মা! বলতে বলতে তার কাছে গেলেন।

হযরত হালীমা (রাযি.)-এর স্বামী হযরত হারেস (রাযি.) একবার প্রিয় নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর সাথে সাক্ষাৎ করতে এলে হযরত সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম নিজের গায়ের চাদর মুবারক খুলে তার জন্য যমীনে বিছিয়ে দিলেন। অতঃপর হযরত হারেস (রাযি.) কিয়ামত সম্পর্কে জানতে চাইলে হযরত সাল্লাল্লাহu আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন, আব্বাজান! যেদিন কিয়ামত সংঘটিত হবে সেদিন আমি আপনার হাত ধরে বলে দিব এই দেখুন আব্বা—আজ কিয়ামত কায়েম হয়ে গেছে। হযরত হারেস (রাযি.) এ ঘটনাটি খুব আগ্রহ ও গর্বের সাথে বর্ণনা করতেন। তিনি বলতেন, আমার ছেলে কিয়ামতের দিন যখন আমার হাত ধরবে বলে জানিয়েছে সেমতে আমার দৃঢ় বিশ্বাস সে আমাকে সেদিন জান্নাতে না নিয়ে ছাড়বে না।

আবু তালিবের ইন্তেকালের পর তাঁর স্ত্রী হযরত ফাতিমা বিনতে আসাদ (রাযি.) আবু তালিবের মতই প্রিয় নবী সাল্লাল্লাহu আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর সাথে সদাচরণ করতেন। তিনি ইন্তেকালের পর হযরত সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম নিজ চাচীর কবর নিজেই খনন করলেন। অতঃপর সে কবরে প্রথমে নিজে শুয়ে পড়লেন। এর পর আপন জামা দ্বারা তাকে কাফন পরিয়ে কবরে রাখলেন। (জযবুল কুলুব/২১৪)

ফন্ট সাইজ
15px
17px