📘 নবী (ﷺ) জীবনের টুকরো কথা 📄 সংযত হাসি

📄 সংযত হাসি


প্রিয় নবী হযরত সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর সবকিছুই ছিল অনুসরণযোগ্য। তাঁর চলন-বলন খানা-পিনা এমনকি হাসিও ছিল সংযত ও অনুসরণীয়। এখানে প্রিয় নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর হাসির কথাই বলা হচ্ছে।

হযরত সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম নিতান্তই সংযত পর্যায়ের হাসি হাসতেন। হযরত আইশা সিদ্দীকা (রাযি.) সম্পর্কে একটি ঘটনা বর্ণিত আছে। একবার এক অন্তরঙ্গ মুহূর্তে প্রিয় নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম হযরত আইশা সিদ্দীকা (রাযি.) কে বললেন, আইশা! তুমি যদি আমার আগে ইন্তেকাল কর তবে তোমার তাতে ক্ষতি কি? বরং এতেই তো তোমার বেশী লাভ। কারণ এমনটি হলে আমি নিজের হাতে তোমাকে গোসল করাবো, কাফন পরাবো, আমিই জানাযার নামায পড়াবো, অতঃপর আমার হাতেই তোমাকে কবরে সমাহিত করবো।

শত হলেও হযরত আইশা (রাযি.) একজন মহিলা মানুষ ছিলেন। তাঁর মাঝেও মেয়েলী ঈর্ষনীয় মনোভাব বিরাজমান ছিলো। হযরত সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর একথা শুনে হযরত আইশা সিদ্দীকা (রাযি.) প্রভাবিত হয়ে গোস্বার স্বরে জবাব দিলেন—জি হ্যাঁ, এসবই তো আপনি করবেন, আর এর সাথে আরো একটি কাজ করবেন, আর তা হচ্ছে সেদিন আমার ঘরে আপনি অন্য কোন বিবিকে নিয়ে রাত্রি যাপন করবেন। ইয়া রাসূলাল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম! আমি কি আপনার উপর কোন বোঝা হয়ে গেছি? প্রিয় নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম নিজের মাহবুবা জীবন সঙ্গীনীর মুখ থেকে এহেন গোস্বা ভরা অভিমানী জবাব শুনে হেসে ফেললেন। অবশ্য সে হাসি ছিলো অত্যন্ত সংযত মুচকী হাসি। যেখানে ছিলো না হো হো কিংবা হি হি পর্যায়ের কোন অশোভনীয় আওয়ায। ছিল না অট্টহাসির কোন শ্রুতিকটু শব্দ। এরপরও কি আমরা শিক্ষা নেব না?

📘 নবী (ﷺ) জীবনের টুকরো কথা 📄 হৃদয়ের কোমলতা

📄 হৃদয়ের কোমলতা


অষ্টম হিজরীর কথা। প্রিয় নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর জ্যেষ্ঠ কন্যা হযরত যয়নব (রাযি.) ইন্তেকাল করলেন। নবীজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর নিজস্ব তত্ত্বাবধানে তাঁর দাফন কাফনের কাজ সম্পন্ন হলো। লাশ যখন কবরের সামনে রাখা হলো, তখন প্রিয় নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর পবিত্র আঁখি যুগল থেকে অঝোরে অশ্রু ঝরছিলো। কিন্তু তখনো তিনি মুখে কোন বাক্যই ব্যয় করেননি।

অন্য এক সময়ের কথা—প্রিয় নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর শিশু পুত্র হযরত ইবরাহীম মুমূর্ষ অবস্থায় উপনীত। নিজের চোখে নিজ সন্তানের এহেন অবস্থা দর্শন করে প্রিয় নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর দু'চোখে অশ্রু নেমে এলো। হযরত আবদুর রহমান ইবনে আউফ (রাযি.) জিজ্ঞাসা করলেন, ইয়া রাসূলাল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম! একি? আপনিও যে কাঁদছেন? তখন তিনি জবাব দিলেন, এ হচ্ছে আল্লাহ পাকের রহমত।

এ থেকে এ কথাই স্পষ্ট ভাবে প্রমাণিত হয় যে, প্রিয় নবী হযরত সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামও আমাদের মত মানুষ ছিলেন, তার মনেও ছিল পুত্র-কন্যাদের প্রতি পিতৃসুলভ মায়া, মমতা, স্নেহ ও ভালবাসা। তবে একথা খুবই স্পষ্ট যে, এ স্নেহ-মমতা কখনোই নবীজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে ইসলামের নীতি-আদর্শের বাস্তবায়নে অন্তরায় সৃষ্টি করতে পারেনি বরং হাজারো স্নেহ-মমতার মাঝেও ইসলামী নীতি-বিধান বাস্তবায়নে ছিলেন অটল-অবিচল।

📘 নবী (ﷺ) জীবনের টুকরো কথা 📄 লাজ-শরম

📄 লাজ-শরম


নির্লজ্জ সমাজ ব্যবস্থায় অশ্লীলতার স্রোত যখন তীব্র গতিতে প্রবাহমান। পবিত্র কা'বা গৃহ বিবস্ত্র অবস্থায় প্রদক্ষিণ করাকে যখন ইবাদত বলে জ্ঞান করা হতো। সে মানবতাহীন বৈরী পরিবেশেও শিশু নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম নিজের লাজ-শরম ও সম্ভ্রম যথাযথ ভাবে সংরক্ষণ করেছেন। হযরত সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর লাজ-শরম একজন কুমারী মেয়ের লাজ-শরমের চাইতেও বেশী ছিলো।

পবিত্র কা'বাগৃহ পুনঃনির্মাণ কালে আবাল, বৃদ্ধ-বনিতা নির্বিশেষে সকলেই পরিধেয় বস্ত্র খুলে মাথায় বেঁধে পাথর বয়ে নিয়ে যাচ্ছিলো। নবীজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামও সকলের সাথে পাথর বহন করছিলেন। কিন্তু নবীজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর পরনে তখনো বস্ত্র ছিলো। কচি ও নম্র শরীর বিধায় অমসৃন পাথরের ঘায়ে শরীর বা মাথায় ক্ষত হয়ে যেতে পারে ভেবে চাচা আব্বাস (রাযি.) পরনের লুঙ্গি খুলে নবীজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর মাথায় বেঁধে দিলেন। আর অমনি নবীজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বেহুঁশ হয়ে মাটিতে লুটিয়ে পড়লেন, চোখ দু'টো বড় বড় হয়ে গেলো। কিছুক্ষণ পরে হুঁশ ফিরে এলে তিনি বলতে লাগলেন, আমার লুঙ্গি! আমার লুঙ্গি!! সাথে সাথে হযরত আব্বাস (রাযি.) নবীজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে লুঙ্গি পরিয়ে দিলেন।

হযরত তুফাইল (রাযি.) বর্ণনা করেন, যখন নবীজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর সতর নগ্ন করা হলো। সাথে সাথে তিনি একটি গায়েবী আওয়ায শুনতে পেলেন "হে মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম! তোমার লজ্জাস্থানকে নগ্নতা থেকে রক্ষা কর, তোমার সতর হিফাযত কর।" আর এটিই ছিলো প্রিয় নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর শ্রুত সর্বপ্রথম অদৃশ্যের আওয়ায।

অপর এক বর্ণনায় আছে যে, প্রিয় নবী হযরত সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর লুঙ্গি খোলা হয়নি বরং হযরত আব্বাস (রাযি.) শুধু তাকে লুঙ্গি খুলে মাথায় বেঁধে নিতে বলেছিলেন, আর তিনি তার কথা শুনে লুঙ্গি খুলবেন কি না তা ভাবছিলেন এ ভাবনার এক পর্যায়ে কাপড় খুললে কেমন শরম হবে সে অনুভূতিতেই তিনি বেহুশ হয়ে জমিনে লুটিয়ে পড়েছিলেন। সুবহানাল্লাহ ওয়াল হামদুলিল্লাহ ওয়া লা-ইলাহা ইল্লাল্লাহু আল্লাহু আকবার।

📘 নবী (ﷺ) জীবনের টুকরো কথা 📄 যৌবনে প্রবৃত্তি দমন

📄 যৌবনে প্রবৃত্তি দমন


প্রিয় নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আপন যৌবনে কুপ্রবৃত্তির চাহিদা দমন ও নিয়ন্ত্রণের ক্ষেত্রে এমন বিরল দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন, যা হযরত ইউসুফ (আ.)-এর পবিত্রতা ও প্রবৃত্তি দমনের চাইতেও অধিক বিস্ময়কর ছিল। যৌবনের শুরু থেকে পঁচিশ বৎসর বয়স পর্যন্ত মানুষের মন বিভিন্ন কামনা-বাসনা ও উচ্চাভিলাসে পূর্ণ থাকে। কিন্তু যৌবনের এ প্রধান অংশটাই প্রিয় নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম কাটিয়েছেন সম্পূর্ণ একা। তখন প্রিয় নবী সাল্লাল্লাহu আলাইহি ওয়া সাল্লাম নিজ স্বভাব ও চরিত্রকে এত উন্নত ও পবিত্র রেখেছেন, যার ফলে কোন দুশমনও নবীজী সাল্লাল্লাহu আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর চারিত্রিক ব্যাপারে সামান্যতম অপবাদ দেয়া কিংবা অঙ্গুলি নির্দেশ করার অবকাশ পায়নি।

আবু জাহল ও তার দলবল কঠোর থেকে কঠোরতম বিরোধিতায় লিপ্ত ছিলো। হযরত সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে মস্তিষ্ক বিকৃত পাগল, মাতাল, জাদুকর ইত্যাদিসহ হাজারো রকমের মিথ্যা ও ভিত্তিহীন অভিযোগে অভিযুক্ত করতো। কিন্তু এত কিছুর পরেও এ পবিত্র জীবনে কোনরূপ চারিত্রিক অভিযোগ উত্থাপনের সাহস পর্যন্ত কেউ করেনি। এ দুশমন গোষ্ঠী নবী সাল্লাল্লাহu আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর জীবনে সামান্যতম স্পট খুঁজে পেলেই তাকে অপপ্রচারের বিরাট হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করতো, কিন্তু ওরা তা পারেনি, কারণ ফুলের ন্যায় শিশির শুভ্র নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম চরিত্রের অদ্ভূত স্বচ্ছতা ও পরিচ্ছন্নতা তাদেরকে মুখ খোলার সুযোগ পর্যন্ত দেয়নি।

দীর্ঘ পঁচিশ বৎসর একাকী জীবন যাপনের পরও তিনি কোন সুন্দরী যুবতী মেয়েকে বিয়ে করেননি বরং চল্লিশ বছরের এক বিধবা মহিলাকে তিনি পত্নী হিসেবে বরণ করেন। যখন নবীজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর বয়স ছিলো মাত্র পঁচিশ বছর। তবে যে বিধবা মহিলাকে প্রিয় নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বরণ করলেন, তিনিও ছিলেন সারা আরবে সৎ স্বভাব ও উন্নত গুণাবলীর কারণে প্রসিদ্ধ। লোকেরা তাকে ডাকতো "ত্বাহিরা” বা পবিত্রতার অধিকারিনী মহিলা নামে। আর সে দিকটি লক্ষ্য করেই মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এ প্রৌঢ়া মহিলাকে পত্নী হিসেবে গ্রহণ করে নিলেন।

হযরত খাদীজা (রাযি.)-এর সাথে প্রিয় নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর বৈবাহিক জীবন ২৮ বছর স্থায়ী ছিলো। এর মধ্যে নবুওওতের পূর্বে পনেরো বছর আর নবুওওতের পরে তের বছর, নবুওওতপূর্ব পনেরো বছরের বেশীর ভাগ সময় ব্যবসা, জনসেবা ও নির্জনে সাধনা অধ্যাবসায়ের মাধ্যমেই কেটেছে। আর নবুওওত পরবর্তী তের বছর ইসলামের দাওয়াত ও তাবলীগ এবং এক্ষেত্রে কাফির গোষ্ঠীর অমানবিক অত্যাচার ও নির্যাতন সহ্য করেই কাটাতে হয়েছে। প্রিয় নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর বয়স যখন তিপ্পান্ন বছর তখন হযরত খাদীজা (রাযি.) ইন্তিকাল করেন। হযরত খাদীজা (রাযি.)-এর বয়স তখন আটষট্টি বৎসর। এ সময় পর্যন্ত নবীজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম অন্য কোন মহিলার সাথে বৈবাহিক বন্ধনে আবদ্ধ হননি। জীবনের প্রায় পুরোটাই তিনি এক প্রৌঢ়া মহিলাকে নিয়ে কাটিয়ে দিলেন। এর থেকেই বুঝা যায় নবীজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম নিজ প্রবৃত্তিকে কিভাবে অবদমিত করেছিলেন।

ফন্ট সাইজ
15px
17px