📘 নবী (ﷺ) জীবনের টুকরো কথা 📄 আনন্দ-কৌতুক

📄 আনন্দ-কৌতুক


হাদীস শরীফে বর্ণিত হয়েছে প্রিয় নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম হাসি-মযাকের ক্ষেত্রে কখনোই নিয়ন্ত্রণের বাইরে যাননি। আবার সর্বদা একেবারে মুখ ভার করেও বসে থাকেননি। বিভিন্ন সময়ে তিনি নিয়ন্ত্রিত পর্যায়ের মযাক করেছেন। তবে তার মধ্যেও নিহিত ছিলো শিক্ষা যেখানে বাস্তবতা পরিপন্থী কোন কথার স্থান ছিল না কখনো। এমনি একটি ঘটনা—

হযরত সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম একবার হযরত আবু বকর সিদ্দীক (রাযি.) এবং হযরত আলী (রাযি.) কে সাথে নিয়ে খেজুর খাচ্ছিলেন, তিনি খেজুর খেয়ে খেয়ে তার বিচিগুলো হযরত আলী (রাযি.)-এর দিকে রাখছিলেন। এভাবে যখন হযরত আলী (রাযি.)-এর সামনে অনেকগুলো বিচি জমা হলো তখন প্রিয় নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম কৌতুকের ছলে হযরত আলী (রাযি.) কে বললেন, আলী! তুমি আজ অনেক খেজুর খেয়েছো (তোমার সামনের বিচি তাই প্রমাণ করছে)। হযরত আলী (রাযি.) ও অত্যন্ত তীক্ষ্ণ উপস্থিত বুদ্ধির অধিকারী ছিলেন। তিনি অত্যন্ত আদব ও বিনয়ের সাথে নবীজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে লক্ষ্য করে বললেন, আপনিও কম খাননি—তবে আপনি হয়তো বিচিসহই খেয়ে ফেলেছেন, বিধায় আপনার সামনে কোন বিচি নেই। হযরত আলী (রাযি.)-এর জবাব শুনে প্রিয় নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম মুচকী হাসলেন।

অন্য একদিনের কথা—এক বৃদ্ধা মহিলা এলো প্রিয় নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর দরবারে। সে হযরত সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর খিদমতে আরয করলো, ইয়া রাসূলাল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম! আপনি আমার জন্য দু'আ করুন, যাতে আমি জান্নাতে প্রবেশ করতে পারি। বৃদ্ধার এ আবেদনের পরে নবীজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম খানিকটা কৌতুক জড়ানো কণ্ঠে বললেন, "কোন বৃদ্ধাই বেহেশতে যাবে না।” একথা শুনে বৃদ্ধা মহিলা ভয়ানক ভাবে ভয় পেয়ে মনকষ্টে ক্রন্দন করতে লাগলো।

কাঁদতে কাঁদতে বৃদ্ধা মহিলা যখন ফিরে যাচ্ছে তখন নবীজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাকে ডেকে বললেন, কোন বৃদ্ধা ঠিকই জান্নাতে যাবে না কারণ জান্নাতে যাওয়ার পূর্বে সব বৃদ্ধা মহিলাই যুবতীতে পরিণত হয়ে যাবে। যেমনটি পবিত্র কুরআনেও ইরশাদ হয়েছে "আমি জান্নাতী রমনীগণকে বিশেষরূপে সৃষ্টি করেছি, অতঃপর তাদেরকে চির কুমারী রূপে তৈরী করেছি।" অর্থাৎ জান্নাতে যাওয়ার পূর্বে বৃদ্ধা রমনীকেও যুবতী ও চির কুমারী বানিয়ে অতঃপর বেহেশতে প্রবেশ করানো হবে।

📘 নবী (ﷺ) জীবনের টুকরো কথা 📄 সংযত হাসি

📄 সংযত হাসি


প্রিয় নবী হযরত সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর সবকিছুই ছিল অনুসরণযোগ্য। তাঁর চলন-বলন খানা-পিনা এমনকি হাসিও ছিল সংযত ও অনুসরণীয়। এখানে প্রিয় নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর হাসির কথাই বলা হচ্ছে।

হযরত সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম নিতান্তই সংযত পর্যায়ের হাসি হাসতেন। হযরত আইশা সিদ্দীকা (রাযি.) সম্পর্কে একটি ঘটনা বর্ণিত আছে। একবার এক অন্তরঙ্গ মুহূর্তে প্রিয় নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম হযরত আইশা সিদ্দীকা (রাযি.) কে বললেন, আইশা! তুমি যদি আমার আগে ইন্তেকাল কর তবে তোমার তাতে ক্ষতি কি? বরং এতেই তো তোমার বেশী লাভ। কারণ এমনটি হলে আমি নিজের হাতে তোমাকে গোসল করাবো, কাফন পরাবো, আমিই জানাযার নামায পড়াবো, অতঃপর আমার হাতেই তোমাকে কবরে সমাহিত করবো।

শত হলেও হযরত আইশা (রাযি.) একজন মহিলা মানুষ ছিলেন। তাঁর মাঝেও মেয়েলী ঈর্ষনীয় মনোভাব বিরাজমান ছিলো। হযরত সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর একথা শুনে হযরত আইশা সিদ্দীকা (রাযি.) প্রভাবিত হয়ে গোস্বার স্বরে জবাব দিলেন—জি হ্যাঁ, এসবই তো আপনি করবেন, আর এর সাথে আরো একটি কাজ করবেন, আর তা হচ্ছে সেদিন আমার ঘরে আপনি অন্য কোন বিবিকে নিয়ে রাত্রি যাপন করবেন। ইয়া রাসূলাল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম! আমি কি আপনার উপর কোন বোঝা হয়ে গেছি? প্রিয় নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম নিজের মাহবুবা জীবন সঙ্গীনীর মুখ থেকে এহেন গোস্বা ভরা অভিমানী জবাব শুনে হেসে ফেললেন। অবশ্য সে হাসি ছিলো অত্যন্ত সংযত মুচকী হাসি। যেখানে ছিলো না হো হো কিংবা হি হি পর্যায়ের কোন অশোভনীয় আওয়ায। ছিল না অট্টহাসির কোন শ্রুতিকটু শব্দ। এরপরও কি আমরা শিক্ষা নেব না?

📘 নবী (ﷺ) জীবনের টুকরো কথা 📄 হৃদয়ের কোমলতা

📄 হৃদয়ের কোমলতা


অষ্টম হিজরীর কথা। প্রিয় নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর জ্যেষ্ঠ কন্যা হযরত যয়নব (রাযি.) ইন্তেকাল করলেন। নবীজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর নিজস্ব তত্ত্বাবধানে তাঁর দাফন কাফনের কাজ সম্পন্ন হলো। লাশ যখন কবরের সামনে রাখা হলো, তখন প্রিয় নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর পবিত্র আঁখি যুগল থেকে অঝোরে অশ্রু ঝরছিলো। কিন্তু তখনো তিনি মুখে কোন বাক্যই ব্যয় করেননি।

অন্য এক সময়ের কথা—প্রিয় নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর শিশু পুত্র হযরত ইবরাহীম মুমূর্ষ অবস্থায় উপনীত। নিজের চোখে নিজ সন্তানের এহেন অবস্থা দর্শন করে প্রিয় নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর দু'চোখে অশ্রু নেমে এলো। হযরত আবদুর রহমান ইবনে আউফ (রাযি.) জিজ্ঞাসা করলেন, ইয়া রাসূলাল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম! একি? আপনিও যে কাঁদছেন? তখন তিনি জবাব দিলেন, এ হচ্ছে আল্লাহ পাকের রহমত।

এ থেকে এ কথাই স্পষ্ট ভাবে প্রমাণিত হয় যে, প্রিয় নবী হযরত সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামও আমাদের মত মানুষ ছিলেন, তার মনেও ছিল পুত্র-কন্যাদের প্রতি পিতৃসুলভ মায়া, মমতা, স্নেহ ও ভালবাসা। তবে একথা খুবই স্পষ্ট যে, এ স্নেহ-মমতা কখনোই নবীজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে ইসলামের নীতি-আদর্শের বাস্তবায়নে অন্তরায় সৃষ্টি করতে পারেনি বরং হাজারো স্নেহ-মমতার মাঝেও ইসলামী নীতি-বিধান বাস্তবায়নে ছিলেন অটল-অবিচল।

📘 নবী (ﷺ) জীবনের টুকরো কথা 📄 লাজ-শরম

📄 লাজ-শরম


নির্লজ্জ সমাজ ব্যবস্থায় অশ্লীলতার স্রোত যখন তীব্র গতিতে প্রবাহমান। পবিত্র কা'বা গৃহ বিবস্ত্র অবস্থায় প্রদক্ষিণ করাকে যখন ইবাদত বলে জ্ঞান করা হতো। সে মানবতাহীন বৈরী পরিবেশেও শিশু নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম নিজের লাজ-শরম ও সম্ভ্রম যথাযথ ভাবে সংরক্ষণ করেছেন। হযরত সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর লাজ-শরম একজন কুমারী মেয়ের লাজ-শরমের চাইতেও বেশী ছিলো।

পবিত্র কা'বাগৃহ পুনঃনির্মাণ কালে আবাল, বৃদ্ধ-বনিতা নির্বিশেষে সকলেই পরিধেয় বস্ত্র খুলে মাথায় বেঁধে পাথর বয়ে নিয়ে যাচ্ছিলো। নবীজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামও সকলের সাথে পাথর বহন করছিলেন। কিন্তু নবীজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর পরনে তখনো বস্ত্র ছিলো। কচি ও নম্র শরীর বিধায় অমসৃন পাথরের ঘায়ে শরীর বা মাথায় ক্ষত হয়ে যেতে পারে ভেবে চাচা আব্বাস (রাযি.) পরনের লুঙ্গি খুলে নবীজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর মাথায় বেঁধে দিলেন। আর অমনি নবীজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বেহুঁশ হয়ে মাটিতে লুটিয়ে পড়লেন, চোখ দু'টো বড় বড় হয়ে গেলো। কিছুক্ষণ পরে হুঁশ ফিরে এলে তিনি বলতে লাগলেন, আমার লুঙ্গি! আমার লুঙ্গি!! সাথে সাথে হযরত আব্বাস (রাযি.) নবীজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে লুঙ্গি পরিয়ে দিলেন।

হযরত তুফাইল (রাযি.) বর্ণনা করেন, যখন নবীজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর সতর নগ্ন করা হলো। সাথে সাথে তিনি একটি গায়েবী আওয়ায শুনতে পেলেন "হে মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম! তোমার লজ্জাস্থানকে নগ্নতা থেকে রক্ষা কর, তোমার সতর হিফাযত কর।" আর এটিই ছিলো প্রিয় নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর শ্রুত সর্বপ্রথম অদৃশ্যের আওয়ায।

অপর এক বর্ণনায় আছে যে, প্রিয় নবী হযরত সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর লুঙ্গি খোলা হয়নি বরং হযরত আব্বাস (রাযি.) শুধু তাকে লুঙ্গি খুলে মাথায় বেঁধে নিতে বলেছিলেন, আর তিনি তার কথা শুনে লুঙ্গি খুলবেন কি না তা ভাবছিলেন এ ভাবনার এক পর্যায়ে কাপড় খুললে কেমন শরম হবে সে অনুভূতিতেই তিনি বেহুশ হয়ে জমিনে লুটিয়ে পড়েছিলেন। সুবহানাল্লাহ ওয়াল হামদুলিল্লাহ ওয়া লা-ইলাহা ইল্লাল্লাহু আল্লাহু আকবার।

ফন্ট সাইজ
15px
17px