📄 মু‘জিযাহ
মক্কার কুরাইশদের নিপীড়নে শেষ পর্যন্ত প্রিয় নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম হিজরত করতে বাধ্য হন। দীর্ঘ পথ প্রান্তর মাড়িয়ে নবীজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এগিয়ে চলছেন মদীনার পানে। দীর্ঘ সফরে প্রিয় নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ক্লান্ত শ্রান্ত হয়ে পড়লেন। ক্ষুধায় হয়ে পড়লেন অস্থির। ইতিমধ্যে তাঁর নযরে পড়লো একটি তাবু, এগিয়ে গেলেন তিনি তাবুর কাছে। অতঃপর খাবার কিছু থাকলে তিনি তা দেয়ার জন্য তাদেরকে অনুরোধ করলেন। ঘরে তখন শুধু ছিলেন একজন মহিলা। তিনি ছাড়া অন্য কোন পুরুষ বাড়ীতে ছিলো না। মহিলার নাম ছিলো উম্মে মা'বাদ। তিনি জানালেন, ঘরে খাবার মত কিছুই নেই।
সে ঘরের পাশেই তখন বাঁধা ছিলো হাড্ডিসার একটি বকরী। দুর্বল ও ক্ষীণকায় সে বকরীটির দুধের স্তন ছিলো একেবারে শুকনো। প্রিয় নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ঐ মহিলাকে বললেন, আপনি অনুমতি দিলে আমি বকরীটি দোহন করে কিছু দুধ লাভের চেষ্টা করতে পারি। মহিলা উত্তর দিলেন, এ বকরীটি বহুদিন যাবৎ কোন বাচ্চা দেয় না, এক ফোটা দুধ ও এ বকরীতে নেই, এ যাবৎ কোন দিনও এ বকরীটি আমাদেরকে দুধ দেয়নি। আর এটি এত বেশী দুর্বল যে, নিজে হেটে মাঠে গিয়ে ঘাস খাওয়ার ক্ষমতা পর্যন্ত রাখে না। সুতরাং আপনারা এ বকরীর স্তনে দুধ পাবেন কোথা থেকে?
প্রিয় নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন, আপনি শুধু অনুমতি দিন এরপর যদি কিছু না পাওয়া যায় তবে আর কি? আমরা শুধু একটু চেষ্টা করে দেখি। সব শুনে মহিলা অনুমতি দিলেন। অনুমতি পেয়ে বিশ্বনবী হযরত সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বকরীটির কাছে এগিয়ে গেলেন এবং "বিসমিল্লাহ” বলে শুধু বকরীটির স্তনে হাত বুলালেন, আর অমনি বকরীটির স্তন দুধে ভরে গেলো। এবার নবীজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আপন মোবারক হাতে দুধ দোহন করতে থাকলেন। বকরীর দুধে একটি বড় পাত্র পূর্ণ হয়ে গেলো। এরপর প্রথমে তিনি উম্মে মা'বাদকে দুধ পান করতে দিলেন। তিনি তৃপ্তি সহকারে দুধ পান করলেন। অপ্রত্যাশিত এ দুধ লাভ করে তিনি পরম বিস্ময় ও আনন্দ উপভোগ করলেন।
এরপর সাহাবায়ে কিরাম (রাযি.) গণসহ নবীজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তৃপ্তি সহকারে পেট ভরে দুধ পান করলেন। এ সময় বকরীটির স্তন দুধের ভারে ছিলো টলটলায়মান। হযরত সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম দ্বিতীয় বার দুধ দোহন করে সে বড় পাত্রটি আবার পূর্ণ করে নিলেন এবং তথা হতে সামনের দিকে রওয়ানা হয়ে গেলেন। মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর পবিত্র হাতের অলৌকিক স্পর্শের বরকতে বকরীটি দীর্ঘ দিন জীবিত ছিলো। এমনকি হযরত উমর (রাযি.)-এর শাসনকালে সংঘটিত ভয়ানক দুর্ভিক্ষের সময়েও সেটি বেঁচে ছিলো এবং মানুষকে তখনও ঐ বকরীটি দুধ দিয়ে উপকৃত করেছে।
📄 অসাধারণত্ব
এক বাটি দুধ। সারা ঘর খুঁজে এছাড়া আর কিছুই পেলেন না প্রিয় নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম। এক পেয়ালা দুধ হলেও প্রিয় নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তা একা পান করবেন না। তিনি হযরত আবু হুরাইরা (রাযি.) কে বললেন, যাও! আসহাবে সুফফাকে সংবাদ দিয়ে নিয়ে এসো। হযরত আবু হুরাইরা (রাযি.) মনে মনে ভাবলেন, আমাকেই যদি দুধ টুকু পান করতে দেয়া হতো, তবে আমি তৃপ্তি সহকারে পান করতে পারতাম।
নবীজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর হুকুম মত তিনি আসহাবে সুফফাকে ডেকে আনলেন। অতঃপর প্রিয় নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম হযরত আবু হুরাইরা (রাযি.) কে সে দুধ একে একে সকলকে পান করাবার হুকুম করলেন। হযরত আবু হুরাইরা (রাযি.) তাদেরকে দুধ পান করাতে শুরু করলেন। নিজের অভিজ্ঞতা বর্ণনা করে হযরত আবু হুরাইরা (রাযি.) বলেন, সকলেই খুব তৃপ্তি সহকারে দুধ পান করলো। অতঃপর প্রিয় নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আমাকে দুধ পান করতে বললেন। আমিও পান করলাম। হযরত সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আবার বললেন, আরো পান কর, আমি আরো পান করলাম। তিনি পুনরায় বললেন, আরো পান কর, আমি আরো পান করলাম। তিনি পুনরায় বললেন, আরো পান কর। আমি এবার বিনীত কণ্ঠে আরয করলাম, ইয়া রাসূলাল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম! আমি শপথ করে বলছি, আমার পেটে আর সামান্যতম জায়গাও নেই। এরপর প্রিয় নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আমার হাত থেকে পেয়ালাটি নিজ হাতে নিলেন এবং বাকি দুধটুকু তিনি পান করলেন, এবং তিনিও পরিতৃপ্ত হলেন।
এ কোন সাধারণ বিবেক বুদ্ধি দিয়ে অনুধাবন করতে পারার মত বিষয় নয় বরং এ ছিলো এক অসাধারণ ও তাৎপর্যমন্ডিত বিশেষ বিষয়। যে দুধ টুকু মাত্র একজন মানুষের জন্য কোন মতে যথেষ্ট হতে পারে সে দুধ টুকুই আসহাবে সুফফার সকল সদস্যসহ হযরত আবু হুরাইরা (রাযি.) এবং হযরত সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম নিজেও তৃপ্তি ভরে পান করলেন। বিপুল সংখ্যক লোকের সকলেই সে দুধটুকু থেকে পান করে পরিতৃপ্ত হলেন। তাতেও দুধ শেষ হলো না। অবশেষে পেয়ালা হাতে নিয়ে দেখা গেলো এখনো পেয়ালাতে ততটুকু দুধই আছে যতটুকু প্রথমে ছিলো। এরপর সেই টুকু নবীজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম নিজে পান করে নিলেন। সুবহানাল্লাহ!
📄 অলৌকিকত্ব
খন্দক যুদ্ধকালীন সময়ের কথা। হযরত জাবির (রাযি.) প্রিয় নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে দাওয়াত করবেন ইচ্ছা করে একটি ছাগল ছানা জবাই করলেন এবং তিন সের কিংবা তার চাইতে সামান্য বেশী গমের আটা তৈরী করে প্রিয় নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর দরবারে এসে চুপিসারে বললেন, ইয়া রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম! আপনি কয়েকজন সাহাবীকে নিয়ে দয়া করে আমার বাড়ীতে তাশরীফ গ্রহণ করুন। আমি সামান্য কিছু খাবারের ব্যবস্থা করেছি। তা দ্বারা আপনাকে মেহমানদারী করতে চাই।
হযরত জাবির (রাযি.)-এর দাওয়াত পেয়ে প্রিয় নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম খন্দক যুদ্ধে উপস্থিত প্রায় এক হাজার সাহাবীর (রাযি.) সকলকে সাথে নিয়ে হযরত জাবির (রাযি.)-এর বাড়ীতে গিয়ে হাযির হলেন। হযরত জাবির (রাযি.) কে নবীজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলে দিয়ে ছিলেন, আমি এসে পৌঁছার পূর্ব পর্যন্ত চুলা থেকে পাতিল নামাবে না।
সাহাবায়ে কিরামের (রাযি.) এক বিশাল কাফেলা নিয়ে নবীজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম যখন হযরত জাবির (রাযি.)-এর বাড়ীতে উপস্থিত হলেন তখন হযরত জাবির (রাযি.) তো একেবারে হতভম্ব। তিনি ভাবলেন, ইয়া আল্লাহ! এত অল্প খাবার দ্বারা এত অধিক মুজাহিদের মেহমানদারী কি করে সম্ভব (!) তখন নবীজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম নিজ পবিত্র মুখ থেকে খানিকটা থুথু মুবারক নিয়ে পাতিল ও আটাতে মিশিয়ে দিলেন এবং বললেন, এ বিশেষ পাত্রসমূহ উনান থেকে সরাবে না, বরং উনানের উপর রেখে তথা হতেই খাবার পরিবেশন করে দিতে থাক।
কথামত খাবার পরিবেশিত হতে থাকলো। এখানেই প্রিয় নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর এক আশ্চর্য ও অলৌকিক মু'জিযাহ প্রকাশ পেলো। আস্তে আস্তে সে খাবার থেকে খন্দকের যুদ্ধে উপস্থিত প্রায় এক হাজার সাহাবীর (রাযি.) সকলেই আহার করলেন। কিন্তু বিস্ময়ের ব্যাপার হলো, যখন তরকারীর পাত্রের ঢাকনা তোলা হলো, তখন দেখা গেলো খাবার একটুও কমেনি। এ জাতীয় আরো অজস্র ঘটনা বর্ণিত রয়েছে ইসলামী ইতিহাসের পাতায় পাতায়। এসবের মাঝে একদিকে যেমন প্রিয় নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর অসাধারণত্ব ও অলৌকিকত্ব প্রকাশ পায়, অপর দিকে এসব বিমোহিতকর ও চিত্তাকর্ষক বিষয়াদির মধ্যে চরম ইসলাম বিরোধী কট্টর মানুষেরাও শুনতে পায় ইসলামে অনুপ্রবেশের এক মৌন আহ্বান, খুঁজে পায় ইসলামের সত্যতা ও হক্কানিয়্যাতের শক্তিশালী প্রমাণ।
📄 আনন্দ-কৌতুক
হাদীস শরীফে বর্ণিত হয়েছে প্রিয় নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম হাসি-মযাকের ক্ষেত্রে কখনোই নিয়ন্ত্রণের বাইরে যাননি। আবার সর্বদা একেবারে মুখ ভার করেও বসে থাকেননি। বিভিন্ন সময়ে তিনি নিয়ন্ত্রিত পর্যায়ের মযাক করেছেন। তবে তার মধ্যেও নিহিত ছিলো শিক্ষা যেখানে বাস্তবতা পরিপন্থী কোন কথার স্থান ছিল না কখনো। এমনি একটি ঘটনা—
হযরত সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম একবার হযরত আবু বকর সিদ্দীক (রাযি.) এবং হযরত আলী (রাযি.) কে সাথে নিয়ে খেজুর খাচ্ছিলেন, তিনি খেজুর খেয়ে খেয়ে তার বিচিগুলো হযরত আলী (রাযি.)-এর দিকে রাখছিলেন। এভাবে যখন হযরত আলী (রাযি.)-এর সামনে অনেকগুলো বিচি জমা হলো তখন প্রিয় নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম কৌতুকের ছলে হযরত আলী (রাযি.) কে বললেন, আলী! তুমি আজ অনেক খেজুর খেয়েছো (তোমার সামনের বিচি তাই প্রমাণ করছে)। হযরত আলী (রাযি.) ও অত্যন্ত তীক্ষ্ণ উপস্থিত বুদ্ধির অধিকারী ছিলেন। তিনি অত্যন্ত আদব ও বিনয়ের সাথে নবীজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে লক্ষ্য করে বললেন, আপনিও কম খাননি—তবে আপনি হয়তো বিচিসহই খেয়ে ফেলেছেন, বিধায় আপনার সামনে কোন বিচি নেই। হযরত আলী (রাযি.)-এর জবাব শুনে প্রিয় নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম মুচকী হাসলেন।
অন্য একদিনের কথা—এক বৃদ্ধা মহিলা এলো প্রিয় নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর দরবারে। সে হযরত সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর খিদমতে আরয করলো, ইয়া রাসূলাল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম! আপনি আমার জন্য দু'আ করুন, যাতে আমি জান্নাতে প্রবেশ করতে পারি। বৃদ্ধার এ আবেদনের পরে নবীজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম খানিকটা কৌতুক জড়ানো কণ্ঠে বললেন, "কোন বৃদ্ধাই বেহেশতে যাবে না।” একথা শুনে বৃদ্ধা মহিলা ভয়ানক ভাবে ভয় পেয়ে মনকষ্টে ক্রন্দন করতে লাগলো।
কাঁদতে কাঁদতে বৃদ্ধা মহিলা যখন ফিরে যাচ্ছে তখন নবীজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাকে ডেকে বললেন, কোন বৃদ্ধা ঠিকই জান্নাতে যাবে না কারণ জান্নাতে যাওয়ার পূর্বে সব বৃদ্ধা মহিলাই যুবতীতে পরিণত হয়ে যাবে। যেমনটি পবিত্র কুরআনেও ইরশাদ হয়েছে "আমি জান্নাতী রমনীগণকে বিশেষরূপে সৃষ্টি করেছি, অতঃপর তাদেরকে চির কুমারী রূপে তৈরী করেছি।" অর্থাৎ জান্নাতে যাওয়ার পূর্বে বৃদ্ধা রমনীকেও যুবতী ও চির কুমারী বানিয়ে অতঃপর বেহেশতে প্রবেশ করানো হবে।