📄 দু‘আ কবুল
সর্বাধিক হাদীস বর্ণনাকারী সাহাবী হযরত আবু হুরাইরা (রাযি.) ইসলাম গ্রহণ করেছেন অনেক আগেই, কিন্তু তাঁর আম্মা এখনো অমুসলিম। হযরত আবু হুরাইরা (রাযি.) নবীজী সাল্লাল্লাহu আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর দরবারে যাতায়াত করেন এটা তিনি পসন্দ করেন না। যখনই তিনি বাড়ী আসেন, তাঁর মা তাঁকে বকাবকি করেন, প্রহার করেন। হযরত আবু হুরাইরা (রাযি.) প্রতি নিয়তই তাঁর মাকে ইসলাম সম্পর্কে বুঝাতে চেষ্টা করেন। প্রিয় নবী সাল্লাল্লাহu আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর মাহাত্ম্য সম্পর্কে বুঝিয়ে ইসলামের দাওয়াত দেন। কিন্তু তাঁর মা বরাবরই তা প্রত্যাখ্যান করতে থাকেন।
একবার খুব ভাল ভাবে হযরত আবু হুরাইরা (রাযি.) তাঁর মাকে ইসলামের দাওয়াত দিলে তিনি তা প্রত্যাখ্যান তো করলেনই, সাথে নবীজী সাল্লাল্লাহu আলাইহি ওয়া সাল্লাম সম্পর্কেও একটি বেয়াদবীপূর্ণ কটুক্তি করে বসলেন। এতে হযরত আবু হুরাইরা (রাযি.) খুবই ব্যথিত হলেন এবং তিনি মনের ব্যথায় কাঁদতে কাঁদতে প্রিয় নবী সাল্লাল্লাহu আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর দরবারে এসে সব খুলে বললেন এবং নবীজী সাল্লাল্লাহu আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর খিদমতে তাঁর মাতার ইসলাম নসীব হওয়ার জন্য দু'আর আবেদন জানালেন। প্রিয় নবী সাল্লাল্লাহu আলাইহি ওয়া সাল্লাম হযরত আবু হুরাইরা (রাযি.)-এর মাতার ইসলাম নসীব হওয়ার জন্য মহান আল্লাহর দরবারে ফরিয়াদ করলেন "ইয়া আল্লাহ! আবু হুরাইরা (রাযি.)-এর আম্মাকে তুমি ইসলাম গ্রহণ করার তাওফীক দান কর এবং তাকে সঠিক হিদায়াত দাও"।
এ দু'আর পর হযরত আবু হুরাইরা (রাযি.)-এর মনে এই দৃঢ় বিশ্বাস সৃষ্টি হলো যে, নিঃসন্দেহে এ দু'আ কবুল হয়ে গেছে। তাই তিনি খুব দ্রুত নিজের বাড়ীতে রওয়ানা করলেন। মনে মনে ভাবলেন আজ আমি দেখবো, আমি বাড়ীতে আগে পৌঁছুতে পারি, নাকি আল্লাহর নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর দু'আ আগে পৌঁছে যায়। এই ভেবে তিনি খুব দ্রুত গতিতে বাড়ী গেলেন। বাড়ী পৌঁছে তিনি দেখলেন, ঘরের দরজা বন্ধ। ভিতরে তার আম্মার গোসলের শব্দ শোনা যাচ্ছে। তখন তিনি ভাবলেন, আল্লাহর নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর দু'আই হয়তো আমার আগে বাড়ীতে পৌঁছে গেছে, আম্মাজান ইসলাম গ্রহণের জন্যই হয়তো গোসল করছেন।
হযরত আবু হুরাইরা (রাযি.)-এর ধারণা সঠিক ছিলো। গোসল সেরে তাঁর আম্মা ঘরের দরজা খুললেন এবং তৎক্ষণাৎ হযরত আবু হুরাইরা (রাযি.)-এর সামনে তিনি পড়ে নিলেন "লা-ইলাহা ইল্লাল্লাহু মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ" এভাবে ইসলামের কালেমা পাঠ করে তিনি মুসলমান হয়ে গেলেন। প্রিয় নবী সাল্লাল্লাহu আলাইহি ওয়া সাল্লাম এমনি ভাবে যখনই কোন বিষয়ে মহান মাওলার শাহী দরবারে হাত তুলে ফরিয়াদ করতেন, তখন মহান আল্লাহ সাথে সাথে তার প্রিয় বান্দা হযরত সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর ফরিয়াদ কবুল করে নিতেন।
📄 অসুস্থের খোঁজ-খবর
প্রিয়নবী হযরত সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর হাজারো উন্নত ও আদর্শপূর্ণ গুণাবলীর মাঝে অসুস্থের খোঁজখবর নেয়া ছিল একটি বিশেষ গুণ। নিজের আত্মীয়স্বজন তো বটেই কোন সাধারণ মুসলমানের অসুস্থ হওয়ার খবর পেলেও তিনি ছুটে যেতেন তার কাছে, তার খোঁজখবর নিতেন, তাকে সাহস স্মিত যোগাতেন, তার জন্য দু'আ করতেন। শুধু মুসলমান কেন দয়ার নবী কোন অমুসলিম প্রতিবেশী অসুস্থ হলে তারও খোঁজখবর নিতে ভুলেননি কখনো।
একবার প্রিয় নবী সাল্লাল্লাহu আলাইহি ওয়া সাল্লাম হযরত সা'দ ইবনে উবাদা (রাযি.)-এর অসুস্থতার সংবাদ শুনতে পেলেন। সাথে সাথে তিনি তাঁকে দেখার জন্য তাঁর বাড়ীতে যান। অসুস্থ হযরত সা'দ (রাযি.) কে দেখেই নবীজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর অন্তর বেদনায় ভরে উঠে। ধৈর্য্যের পর্বত স্বয়ং মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর এহেন বিচলিত ভাব লক্ষ্য করে ঘরের অন্যান্য লোকেরা ক্রন্দন করতে শুরু করলো।
অন্য একদিনের কথা প্রিয় নবী সাল্লাল্লাহu আলাইহি ওয়া সাল্লাম হযরত জাবির (রাযি.)-এর অসুস্থতার সংবাদ পেয়ে তাকে দেখতে যাওয়ার ইচ্ছা করলেন। হযরত জাবির (রাযি.)-এর বাড়ী ছিলো বেশ দূরে, তা সত্ত্বেও প্রিয় নবী সাল্লাল্লাহu আলাইহি ওয়া সাল্লাম সে দীর্ঘ পথ অতিক্রম করে নিয়মিত তার বাড়ীতে গিয়ে তার খোঁজ-খবর নিতে থাকেন। রোগের আধিক্য হেতু তিনি মাঝে মাঝেই বেহুশ হয়ে পড়তেন, তখন প্রিয় নবী সাল্লাল্লাহu আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাঁর চেহারায় নিজের অযূর উদ্বৃত্ত পানি ছিটিয়ে দিতেন, এতে তিনি আবার হুশ ফিরে পেতেন। এভাবেই নবীজী সাল্লাল্লাহu আলাইহি ওয়া সাল্লাম কারো অসুস্থ্য হওয়ার খবর পেলে তার কাছে ছুটে যেতেন, তার খোঁজখবর নিতেন। আমরাও কি পারি না প্রিয়নবী হযরত সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর এ প্রিয় সুন্নাতটির উপর আমল করে আমাদের জীবন ধন্য করতে?
📄 আকর্ষণ
ইয়ামানের বিখ্যাত জাদুকর, নাম তার "যেমাদ”। জাদুবিদ্যায় তার ছিলো অসাধারণ অহংকার। সে একবার মক্কায় এসে কুরাইশ সরদারের কাছে নিজের শ্রেষ্ঠত্ব আর গুণ কীর্তন আলোচনা করে বললো, মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর উপর ভূত সওয়ার হয়েছে যার কারণে সে বাপ-দাদার ধর্ম বাদ দিয়ে আবোল-তাবোল বকতে শুরু করেছে। আমি তার উপর থেকে দুষ্ট ভূতের প্রভাব দূর করে দিতে পারি। যেমাদের একথা শুনে কুরাইশ সরদাররা বেশ খুশি হলো, কারণ তাদেরও ধারণা যে, প্রিয় নবী সাল্লাল্লাহu আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর উপর আসলেই ভূতের আছর হয়েছে এবং তার প্রভাবেই তিনি মানুষকে বিমুহিত করে ফেলেন।
অবশেষে কুরাইশ সরদাররা সকলে যেমাদকে মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর উপর থেকে ভূত তাড়ানোর কথা বললো, কথা মত যেমাদও হযরত সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর উপর থেকে ভূত তাড়ানোর খাহেশ প্রকাশ করলো। সে মতে যেমাদ নবীজী সাল্লাল্লাহu আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর দরবারে উপস্থিত হয়ে বললো, আপনার উপর ভূত সওয়ার হয়েছে। আমি সে ভূত তাড়াতে এসেছি। প্রিয় নবী সাল্লাল্লাহu আলাইহি ওয়া সাল্লাম মৃদু হেসে বললেন, ভূত তাড়াতে এসেছো ভাল কথা। তার আগে আমার কিছু কথা শুনে নাও! অতঃপর তিনি যেমাদকে পবিত্র কুরআনের কয়েকটি আয়াত তিলাওয়াত করে শোনালেন।
তিলাওয়াত শুনে যেমাদ দারুণ ভাবে আকর্ষিত হলো। সে প্রিয় নবী সাল্লাল্লাহu আলাইহি ওয়া সাল্লামকে আয়াতগুলো পুনরায় তিলাওয়াত করার অনুরোধ জানালো। এবারও তিলাওয়াত শুনে সে সীমাহীন ভাবে বিস্মিত ও বিমোহিত হলো এবং তার যেনো অতৃপ্ততা রয়েই গেলো সে তা দূর করতে নবীজী সাল্লাল্লাহu আলাইহি ওয়া সাল্লামকে আবার সে আয়াতগুলো তিলাওয়াত করার অনুরোধ জানালো। হযরত সাল্লাল্লাহu আলাইহি ওয়া সাল্লাম আবারও তিলাওয়াত করলেন। এভাবে সে আয়াত ক'টি তৃতীয় বারের মত শোনার পরে যেমাদের মধ্যে এক অভূতপূর্ব পরিবর্তন দেখা দিলো। অত্যন্ত বিস্মিত কন্ঠে বলে উঠলো, আমি অনেক গণক ও ভবিষ্যৎ প্রবক্তার কথা শুনেছি কিন্তু এ আয়াত তা থেকে সম্পূর্ণ ব্যতিক্রম। এ বাণী কতই না গভীর, কতই না মর্মস্পর্শী। একথা বলেই সে প্রিয় নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর পবিত্র চরণে নিজেকে সপে দিয়ে বললো, ইয়া রাসূলাল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম! অনুগ্রহ পূর্বক আপনার হস্ত মুবারক সম্প্রসারিত করুন এবং এ অধমকে আপনার অনুগতদের অন্তর্ভুক্ত বানিয়ে নিন। এই ছিলো প্রিয় নবী সাল্লাল্লাহu আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর সংস্পর্শ ও বাণীর অপূর্ব আকর্ষণ। যেমাদ এসেছিলো নবীজী সাল্লাল্লাহu আলাইহি ওয়া সাল্লাম থেকে ভূত তাড়াতে এখন যা হলো, তাতে আমরা একথা ছাড়া আর কি বলতে পারি যে, ভূত ছাড়াতে এসে খোদ যেমাদকেই ভূতে পেয়ে বসেছে (!)
📄 মু‘জিযাহ
মক্কার কুরাইশদের নিপীড়নে শেষ পর্যন্ত প্রিয় নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম হিজরত করতে বাধ্য হন। দীর্ঘ পথ প্রান্তর মাড়িয়ে নবীজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এগিয়ে চলছেন মদীনার পানে। দীর্ঘ সফরে প্রিয় নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ক্লান্ত শ্রান্ত হয়ে পড়লেন। ক্ষুধায় হয়ে পড়লেন অস্থির। ইতিমধ্যে তাঁর নযরে পড়লো একটি তাবু, এগিয়ে গেলেন তিনি তাবুর কাছে। অতঃপর খাবার কিছু থাকলে তিনি তা দেয়ার জন্য তাদেরকে অনুরোধ করলেন। ঘরে তখন শুধু ছিলেন একজন মহিলা। তিনি ছাড়া অন্য কোন পুরুষ বাড়ীতে ছিলো না। মহিলার নাম ছিলো উম্মে মা'বাদ। তিনি জানালেন, ঘরে খাবার মত কিছুই নেই।
সে ঘরের পাশেই তখন বাঁধা ছিলো হাড্ডিসার একটি বকরী। দুর্বল ও ক্ষীণকায় সে বকরীটির দুধের স্তন ছিলো একেবারে শুকনো। প্রিয় নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ঐ মহিলাকে বললেন, আপনি অনুমতি দিলে আমি বকরীটি দোহন করে কিছু দুধ লাভের চেষ্টা করতে পারি। মহিলা উত্তর দিলেন, এ বকরীটি বহুদিন যাবৎ কোন বাচ্চা দেয় না, এক ফোটা দুধ ও এ বকরীতে নেই, এ যাবৎ কোন দিনও এ বকরীটি আমাদেরকে দুধ দেয়নি। আর এটি এত বেশী দুর্বল যে, নিজে হেটে মাঠে গিয়ে ঘাস খাওয়ার ক্ষমতা পর্যন্ত রাখে না। সুতরাং আপনারা এ বকরীর স্তনে দুধ পাবেন কোথা থেকে?
প্রিয় নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন, আপনি শুধু অনুমতি দিন এরপর যদি কিছু না পাওয়া যায় তবে আর কি? আমরা শুধু একটু চেষ্টা করে দেখি। সব শুনে মহিলা অনুমতি দিলেন। অনুমতি পেয়ে বিশ্বনবী হযরত সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বকরীটির কাছে এগিয়ে গেলেন এবং "বিসমিল্লাহ” বলে শুধু বকরীটির স্তনে হাত বুলালেন, আর অমনি বকরীটির স্তন দুধে ভরে গেলো। এবার নবীজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আপন মোবারক হাতে দুধ দোহন করতে থাকলেন। বকরীর দুধে একটি বড় পাত্র পূর্ণ হয়ে গেলো। এরপর প্রথমে তিনি উম্মে মা'বাদকে দুধ পান করতে দিলেন। তিনি তৃপ্তি সহকারে দুধ পান করলেন। অপ্রত্যাশিত এ দুধ লাভ করে তিনি পরম বিস্ময় ও আনন্দ উপভোগ করলেন।
এরপর সাহাবায়ে কিরাম (রাযি.) গণসহ নবীজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তৃপ্তি সহকারে পেট ভরে দুধ পান করলেন। এ সময় বকরীটির স্তন দুধের ভারে ছিলো টলটলায়মান। হযরত সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম দ্বিতীয় বার দুধ দোহন করে সে বড় পাত্রটি আবার পূর্ণ করে নিলেন এবং তথা হতে সামনের দিকে রওয়ানা হয়ে গেলেন। মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর পবিত্র হাতের অলৌকিক স্পর্শের বরকতে বকরীটি দীর্ঘ দিন জীবিত ছিলো। এমনকি হযরত উমর (রাযি.)-এর শাসনকালে সংঘটিত ভয়ানক দুর্ভিক্ষের সময়েও সেটি বেঁচে ছিলো এবং মানুষকে তখনও ঐ বকরীটি দুধ দিয়ে উপকৃত করেছে।