📘 নবী (ﷺ) জীবনের টুকরো কথা 📄 অতিথি পরায়নতা

📄 অতিথি পরায়নতা


কয়েকজন ইয়াহুদী প্রিয় নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর দরবারে মেহমান হলো। তিনি সাহাবায়ে কিরামের (রাযি.) মাঝে দু'একজন করে মেহমান বণ্টন করে দিয়ে দিলেন। একজন ইয়াহুদী খুবই দুরাচার ছিলো বলে তাকে কেউ মেহমান হিসেবে গ্রহণ করতে চাইলো না। তাই তাকে প্রিয় নবী সাল্লাল্লাহu আলাইহি ওয়া সাল্লাম নিজের ঘরে মেহমান হিসেবে নিয়ে নিলেন। স্বভাব সুলভ ভাবে তিনি অত্যন্ত যত্নের সাথে লোকটির মেহমানদারী করলেন।

খাওয়ার সময় হলে সে লোকটি একাই বেশ কয়েকজনের খানা খেয়ে সাবাড় করে দিলো। এ জাতীয় দুরভীসন্ধী পূর্ব থেকেই তার মনের মাঝে লুকায়িত ছিলো। খাওয়া-দাওয়ার পর প্রিয় নবী সাল্লাল্লাহu আলাইহি ওয়া সাল্লাম সাধ্যমত উমদা বিছানায় তাকে শুইতে দিলেন। ঐ ইয়াহুদী দুরাচারের উদ্দেশ্য পূর্ব থেকেই খারাপ ছিলো। মাত্রাতিরিক্ত খাওয়ার কারণে তার পেটে গোলমাল দেখা দিলো, ফলে রাত্রে সে মলমূত্র দ্বারা বিছানা এবং কক্ষ নষ্ট করে সকাল হওয়ার পূর্বেই পালিয়ে গেলো।

কিন্তু মহান মাওলার মঞ্জুরী ছিলো অন্য কিছু। তিনি ঐ ইয়াহুদীকে প্রিয় নবী সাল্লাল্লাহu আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর সংস্পর্শের সুফল ভোগ করাতে চান। সামনের ঘটনা তারই প্রমাণ—যাওয়ার সময় ইয়াহুদী ভুল বশতঃ তার একটি মূল্যবান তরবারী প্রিয় নবী সাল্লাল্লাহu আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর কক্ষে ফেলে গেলো। কিছু দূর যাওয়ার পর তার তরবারীটির কথা স্মরণ হলে মূল্যবান তরবারীর মায়ায় সে পুনরায় ফিরে এলো। ফিরে আসার সময় সে যা কল্পনা করলো এবং পরে বাস্তবে যা দেখতে পেলো তাতেই ইয়াহুদীর জীবনের মোড় পরিবর্তনের সূচনা হলো।

ইয়াহুদী দেখলো প্রিয় নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম স্বয়ং নিজ হস্তে সে সব মলমূত্র পরিস্কার করছেন আর বলছেন আহ! লোকটির যেন কত কষ্ট হয়েছে। অতঃপর ঐ ইয়াহুদীকে দেখার সাথে সাথে নবীজী সাল্লাল্লাহu আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাকে বললেন, আহ! আমার ব্যবস্থাপনার ত্রুটির কারণে রাতে আপনার অনেক কষ্ট হয়েছে। আপনি তো আমার মেহমান ছিলেন। এ কষ্টের জন্য আমি দুঃখিত, আপনি আমাকে ক্ষমা করে দিন। আর আপনি যাওয়ার সময় আপনার তরবারীটি রেখে চলে গেছেন। একটু দাঁড়ান আমি আপনার তরবারীটি এনে দিচ্ছি বলেই নবীজী সাল্লাল্লাহu আলাইহি ওয়া সাল্লাম নিজ কক্ষ থেকে ইয়াহুদীর তরবারীটি এনে তার হাতে দিলেন।

লোকটি ভেবেছিলো, আমাকে দেখলেই মুহাম্মদ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) তেলে বেগুনে জ্বলে উঠবেন এবং আমার হয়তো বারটা বাজিয়ে ছাড়বেন। সে মনে মনে ঠিক করে রেখেছিলো, পরিস্থিতি খারাপ দেখলে দূর থেকেই পালিয়ে ভাগবে। কিন্তু এখানে এসে তার ধারণা সম্পূর্ণ ভুল প্রমাণিত হলো। সে সম্পূর্ণ অদ্ভূত আচরণ প্রত্যক্ষ করলো যা ছিলো তার কল্পনারও অনেক দূরে। মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর এ মোহনীয় আদর্শিক আচরণের প্রভাবে সে আর ইসলাম থেকে দূরে থাকতে পারলো না বরং নবী আদর্শের স্বর্ণ ছোঁয়ার সে পবিত্র ইসলাম গ্রহণের গৌরব অর্জন করলো। তাই তো আমরা বলি "তরোয়ারে নয় উদারতায়"। অর্থাৎ, তরবারীর শক্তির জোরে নয় বরং গোটা বিশ্বে ইসলাম প্রসারিত হয়েছে তার উদারনীতি ও মোহনীয় আদর্শের প্রভাবে।

📘 নবী (ﷺ) জীবনের টুকরো কথা 📄 অনাড়ম্বরতা

📄 অনাড়ম্বরতা


প্রিয় নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর জীবন ছিলো সম্পূর্ণ অনাড়ম্বর। তিনি সাজ সজ্জা, আরাম-আয়েশ মোটেও পসন্দ করতেন না। নিজের অনুসারী ও পরিবারের কাউকেই তা গ্রহণ করতে দিতেন না, নিজেও যথেষ্ট সাদা-সিধা, আড়ম্বরহীন জীবন যাপন করতেন।

হযরত সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম একটি মোটা কম্বলে শুয়ে রাত যাপন করতেন। আম্মাজান হযরত আইশা সিদ্দীকা (রাযি.) দুই ভাজ করে সেটি মেঝেতে বিছিয়ে দিতেন। হযরত আইশা সিদ্দীকা (রাযি.) বলেন, একদিন আমি সে চাদরটি চার ভাজ করে বিছিয়ে দিলাম। সেদিন বিছানাটি একটু মোলায়েম হলো, তাতে শুইতে একটু আরাম হলো। প্রিয় নবী সাল্লাল্লাহu আলাইহি ওয়া সাল্লাম আরাম প্রিয় ছিলেন না। তিনি সকালে ঘুম থেকে উঠেই হযরত আইশা সিদ্দীকা (রাযি.) কে জিজ্ঞাসা করলেন, আজ আমার বিছানাটি কিভাবে বিছানো হয়েছিলো? হযরত আইশা সিদ্দীকা (রাযি.) জবাব দিলেন, এটি আজ চার ভাজ করে বিছিয়ে ছিলাম যাতে আপনার শুইতে একটু আরাম হয়। প্রিয় নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন, এভাবে বিছানোর প্রয়োজন নেই বরং পূর্বের ন্যায় দুইভাজ করেই চাদরটি বিছিয়ে দাও। কারণ গতরাতে বেশী আরামের কারণে আমার ইবাদতে বিঘ্ন সৃষ্টি হয়েছে।

অন্য এক দিনের কথা—প্রিয় হাবীব সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম কোন এক যুদ্ধ থেকে প্রত্যাবর্তন করছিলেন। হযরত ফাতিমা (রাযি.) এ খবর শুনে প্রিয় নবীজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর সম্মানার্থে ঘরের দরজায় একটি সুন্দর পর্দা ঝুলিয়ে দিলেন এবং হযরত হাসান (রাযি.) ও হুসাইন (রাযি.) দ্বয়কে রূপার কংকন পরিয়ে সাজালেন। প্রিয় নবী সাল্লাল্লাহu আলাইহি ওয়া সাল্লাম এ অবস্থা প্রত্যক্ষ করে তাৎক্ষনিক ভাবে তথা হতে প্রস্থান করলেন।

হযরত আইশা সিদ্দীকা (রাযি.) প্রিয় নবী সাল্লাল্লাহu আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর অসন্তুষ্টির কারণ বুঝতে পেরে সাথে সাথে পর্দাটি ছিঁড়ে ফেললেন এবং হযরত হাসান (রাযি.) ও হযরত হুসাইন (রাযি.) দ্বয়ের হাত থেকে কংকন খুলে ফেললেন। হযরত হাসান ও হযরত হুসাইন (রাযি.) কংকন খুলে নেয়ার কারণে কাঁদতে কাঁদতে নবীজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর দরবারে হাযির হলেন। তখন তিনি ইরশাদ করলেন, এরা আমার পরিবারের সদস্য আমি চাই না যে, এরা পার্থিব কোন সাজ সজ্জায় জড়িয়ে পড়ুক। এভাবেই হযরত সাল্লাল্লাহu আলাইহি ওয়া সাল্লাম নিজে এবং তাঁর অধিনস্থদের পার্থিব সাজসজ্জা থেকে বিরত রেখে অনাড়ম্বর জীবন যাপন অবলম্বন করেছেন। আড়ম্বরপূর্ণ ও বিলাসী জীবন যাপনে অভ্যস্ত প্রিয়নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর প্রিয় উম্মতেরা বিষয়টি ভেবে দেখবেন কি?

📘 নবী (ﷺ) জীবনের টুকরো কথা 📄 দু‘আ কবুল

📄 দু‘আ কবুল


সর্বাধিক হাদীস বর্ণনাকারী সাহাবী হযরত আবু হুরাইরা (রাযি.) ইসলাম গ্রহণ করেছেন অনেক আগেই, কিন্তু তাঁর আম্মা এখনো অমুসলিম। হযরত আবু হুরাইরা (রাযি.) নবীজী সাল্লাল্লাহu আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর দরবারে যাতায়াত করেন এটা তিনি পসন্দ করেন না। যখনই তিনি বাড়ী আসেন, তাঁর মা তাঁকে বকাবকি করেন, প্রহার করেন। হযরত আবু হুরাইরা (রাযি.) প্রতি নিয়তই তাঁর মাকে ইসলাম সম্পর্কে বুঝাতে চেষ্টা করেন। প্রিয় নবী সাল্লাল্লাহu আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর মাহাত্ম্য সম্পর্কে বুঝিয়ে ইসলামের দাওয়াত দেন। কিন্তু তাঁর মা বরাবরই তা প্রত্যাখ্যান করতে থাকেন।

একবার খুব ভাল ভাবে হযরত আবু হুরাইরা (রাযি.) তাঁর মাকে ইসলামের দাওয়াত দিলে তিনি তা প্রত্যাখ্যান তো করলেনই, সাথে নবীজী সাল্লাল্লাহu আলাইহি ওয়া সাল্লাম সম্পর্কেও একটি বেয়াদবীপূর্ণ কটুক্তি করে বসলেন। এতে হযরত আবু হুরাইরা (রাযি.) খুবই ব্যথিত হলেন এবং তিনি মনের ব্যথায় কাঁদতে কাঁদতে প্রিয় নবী সাল্লাল্লাহu আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর দরবারে এসে সব খুলে বললেন এবং নবীজী সাল্লাল্লাহu আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর খিদমতে তাঁর মাতার ইসলাম নসীব হওয়ার জন্য দু'আর আবেদন জানালেন। প্রিয় নবী সাল্লাল্লাহu আলাইহি ওয়া সাল্লাম হযরত আবু হুরাইরা (রাযি.)-এর মাতার ইসলাম নসীব হওয়ার জন্য মহান আল্লাহর দরবারে ফরিয়াদ করলেন "ইয়া আল্লাহ! আবু হুরাইরা (রাযি.)-এর আম্মাকে তুমি ইসলাম গ্রহণ করার তাওফীক দান কর এবং তাকে সঠিক হিদায়াত দাও"।

এ দু'আর পর হযরত আবু হুরাইরা (রাযি.)-এর মনে এই দৃঢ় বিশ্বাস সৃষ্টি হলো যে, নিঃসন্দেহে এ দু'আ কবুল হয়ে গেছে। তাই তিনি খুব দ্রুত নিজের বাড়ীতে রওয়ানা করলেন। মনে মনে ভাবলেন আজ আমি দেখবো, আমি বাড়ীতে আগে পৌঁছুতে পারি, নাকি আল্লাহর নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর দু'আ আগে পৌঁছে যায়। এই ভেবে তিনি খুব দ্রুত গতিতে বাড়ী গেলেন। বাড়ী পৌঁছে তিনি দেখলেন, ঘরের দরজা বন্ধ। ভিতরে তার আম্মার গোসলের শব্দ শোনা যাচ্ছে। তখন তিনি ভাবলেন, আল্লাহর নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর দু'আই হয়তো আমার আগে বাড়ীতে পৌঁছে গেছে, আম্মাজান ইসলাম গ্রহণের জন্যই হয়তো গোসল করছেন।

হযরত আবু হুরাইরা (রাযি.)-এর ধারণা সঠিক ছিলো। গোসল সেরে তাঁর আম্মা ঘরের দরজা খুললেন এবং তৎক্ষণাৎ হযরত আবু হুরাইরা (রাযি.)-এর সামনে তিনি পড়ে নিলেন "লা-ইলাহা ইল্লাল্লাহু মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ" এভাবে ইসলামের কালেমা পাঠ করে তিনি মুসলমান হয়ে গেলেন। প্রিয় নবী সাল্লাল্লাহu আলাইহি ওয়া সাল্লাম এমনি ভাবে যখনই কোন বিষয়ে মহান মাওলার শাহী দরবারে হাত তুলে ফরিয়াদ করতেন, তখন মহান আল্লাহ সাথে সাথে তার প্রিয় বান্দা হযরত সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর ফরিয়াদ কবুল করে নিতেন।

📘 নবী (ﷺ) জীবনের টুকরো কথা 📄 অসুস্থের খোঁজ-খবর

📄 অসুস্থের খোঁজ-খবর


প্রিয়নবী হযরত সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর হাজারো উন্নত ও আদর্শপূর্ণ গুণাবলীর মাঝে অসুস্থের খোঁজখবর নেয়া ছিল একটি বিশেষ গুণ। নিজের আত্মীয়স্বজন তো বটেই কোন সাধারণ মুসলমানের অসুস্থ হওয়ার খবর পেলেও তিনি ছুটে যেতেন তার কাছে, তার খোঁজখবর নিতেন, তাকে সাহস স্মিত যোগাতেন, তার জন্য দু'আ করতেন। শুধু মুসলমান কেন দয়ার নবী কোন অমুসলিম প্রতিবেশী অসুস্থ হলে তারও খোঁজখবর নিতে ভুলেননি কখনো।

একবার প্রিয় নবী সাল্লাল্লাহu আলাইহি ওয়া সাল্লাম হযরত সা'দ ইবনে উবাদা (রাযি.)-এর অসুস্থতার সংবাদ শুনতে পেলেন। সাথে সাথে তিনি তাঁকে দেখার জন্য তাঁর বাড়ীতে যান। অসুস্থ হযরত সা'দ (রাযি.) কে দেখেই নবীজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর অন্তর বেদনায় ভরে উঠে। ধৈর্য্যের পর্বত স্বয়ং মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর এহেন বিচলিত ভাব লক্ষ্য করে ঘরের অন্যান্য লোকেরা ক্রন্দন করতে শুরু করলো।

অন্য একদিনের কথা প্রিয় নবী সাল্লাল্লাহu আলাইহি ওয়া সাল্লাম হযরত জাবির (রাযি.)-এর অসুস্থতার সংবাদ পেয়ে তাকে দেখতে যাওয়ার ইচ্ছা করলেন। হযরত জাবির (রাযি.)-এর বাড়ী ছিলো বেশ দূরে, তা সত্ত্বেও প্রিয় নবী সাল্লাল্লাহu আলাইহি ওয়া সাল্লাম সে দীর্ঘ পথ অতিক্রম করে নিয়মিত তার বাড়ীতে গিয়ে তার খোঁজ-খবর নিতে থাকেন। রোগের আধিক্য হেতু তিনি মাঝে মাঝেই বেহুশ হয়ে পড়তেন, তখন প্রিয় নবী সাল্লাল্লাহu আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাঁর চেহারায় নিজের অযূর উদ্বৃত্ত পানি ছিটিয়ে দিতেন, এতে তিনি আবার হুশ ফিরে পেতেন। এভাবেই নবীজী সাল্লাল্লাহu আলাইহি ওয়া সাল্লাম কারো অসুস্থ্য হওয়ার খবর পেলে তার কাছে ছুটে যেতেন, তার খোঁজখবর নিতেন। আমরাও কি পারি না প্রিয়নবী হযরত সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর এ প্রিয় সুন্নাতটির উপর আমল করে আমাদের জীবন ধন্য করতে?

ফন্ট সাইজ
15px
17px