📄 কর্ম পরায়নতা
মসজিদে নববীর নির্মান কাজ চলছে। সাহাবায়ে কিরাম (রাযি.) সকলেই নির্মান কাজে সাহায্য করছেন। প্রয়োজনীয় সামান-পত্র সংগ্রহ করে দিচ্ছেন। এ সময় নবীজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ও অকর্মণ্য বসে থাকতে পসন্দ করেননি বরং তিনি নিজেও ইট বালু বহন করে কাজে যোগান দিতে লাগলেন। সাহাবায়ে কিরাম (রাযি.) এ অবস্থা দেখে বিচলিত হয়ে বার বার প্রিয় নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে কাজ থেকে বিরত থাকতে অনুরোধ জানালেন। কিন্তু তিনি কোন ক্রমেই কাজে সহযোগিতা করা থেকে বিরত থাকলেন না।
অন্য এক দিনের কথা—সাহাবায়ে কিরাম (রাযি) কোথাও যাওয়ার সময় একস্থানে কাফেলার যাত্রা বিরতি করা হলো এবং সেখানে রান্না-বান্নার কাজ করার জন্য আয়োজন চলতে লাগলো। নিয়ম মাফিক সকলের মাঝে কাজ বন্টন করে দেয়া হলো এবং প্রত্যেকেই দায়িত্ব অনুযায়ী নিজ নিজ কাজ আঞ্জাম দিয়ে চললেন। কেউ পানি আনছেন, কেউ আগুন জ্বালাচ্ছেন, কেউ পাত্রসমূহ ধুয়ে প্রস্তুত করছেন। এ সময় প্রিয় নবী সাল্লাল্লাহu আলাইহি ওয়া সাল্লাম লাকড়ী সংগ্রহের কঠিন কাজটি নিজের দায়িত্বে নিলেন।
সাহাবায়ে কিরাম (রাযি.) অত্যন্ত বিনীত ভাবে প্রিয় নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর দরবারে অনুরোধ করলেন, ইয়া রাসূলাল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম! এ কাজটিও আমরাই সমাধা করবো, আপনাকে কষ্ট করতে হবে না। কিন্তু অত্যন্ত কর্মপরায়ন ও কঠিন পরিশ্রমী-কর্মঠ প্রিয় নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম জবাব দিলেন, তোমরা যা বলেছো তা তোমাদের হিসেবে ঠিকই বলেছো। কিন্তু তোমরা সকলে কাজ করবে আর আমি তোমাদের সাথে থাকা সত্ত্বেও হাতপা গুটিয়ে বসে থাকবো, এমনটি আমার মোটেও পসন্দ নয়। আর মূলতঃ এমন ব্যক্তিকে আল্লাহ পাকও পসন্দ করেন না।
এভাবেই আমাদের প্রিয় নবী সাল্লাল্লাহu আলাইহি ওয়া সাল্লাম সকলের সাথে সমান ভাবে কাজে অংশ গ্রহণ করতেন। নিজেকে বিশিষ্ট একজন ভেবে শান-শতকত নিয়ে বসে থাকা তিনি কোনদিনও পসন্দ করতেন না। অথচ মহান আল্লাহর পরেই তিনি মহান। দুনিয়া ও আখিরাতের তিনি বাদশাহ। বর্তমান সময়ের রাজা-বাদশাহ আর আমীর নেতারা মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর এ মহান আদর্শগত বিষয়টি ভেবে দেখবেন কি?
📄 আল্লাহর প্রতি ভরসা
ঐতিহাসিক গাতফান যুদ্ধের কথা। তথা হতে ফিরার পথে প্রিয় নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম একটি গাছের নিচে আরাম করছিলেন। সাহাবায়ে কিরাম (রাযি.) ছিলেন খানিকটা দূরে। এ অবস্থা দেখতে পেলো কাফির নেতা দু'সূর। সে নবীজী সাল্লাল্লাহu আলাইহি ওয়া সাল্লামকে একাকী দেখে এটাকে একটা সুযোগ মনে করলো। বিধায় সে সুযোগ হাত ছাড়া করতে চাইলো না দু'সূর।
টিপ টিপ করে গোপনে সে নবীজী সাল্লাল্লাহu আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর কাছে চলে এলো, হযরত সাল্লাল্লাহu আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর তলোয়ারটি তখন গাছের ডালে ঝুলানো ছিলো। চটকরে দু'সূর তলোয়ারটি নিজের হাতে নিয়ে নিলো আর অমনি তা উঁচিয়ে ধরলো প্রিয় নবী সাল্লাল্লাহu আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর দিকে। বললো মুহাম্মদ! (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) এখন আমার হাত থেকে তোমাকে কে রক্ষা করবে?
মহান আল্লাহ যাকে শত্রুদের হাত থেকে রক্ষা করার ওয়াদা করেছেন তাঁর আবার কিসের ভয়? নবীজী সাল্লাল্লাহu আলাইহি ওয়া সাল্লাম এ অবস্থায় সামান্যতমও বিচলিত হলেন না। বরং তিনি অত্যন্ত স্থির চিত্তে জবাব দিলেন, 'আল্লাহ'। প্রিয় নবী সাল্লাল্লাহu আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর এই একটি মাত্র শব্দ দু'সূর-এর মধ্যে দারুণ ভয়ের সঞ্চার করলো। তার সমস্ত শরীর আশ্চর্য কম্পন শুরু হয়ে গেলো। সে ভয়ে এতবেশী অস্থির হয়ে পড়লো যে, কাঁপতে কাঁপতে এক পর্যায়ে তার হাত হতে তরবারীটি ছুটে নিচে পড়ে গেলো।
রাসূলেপাক সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তার অবস্থা প্রত্যক্ষ করছিলেন। তলোয়ারটি নিচে পড়তেই তিনি পট করে তা উঠিয়ে হাতে নিলেন এবং দু'সূরের দিকে তা বাড়িয়ে ধরে বললেন, "বলো এবার আমার হাত থেকে তোমাকে কে রক্ষা করবে?" দু'সূর এবার হতভম্ব হয়ে ফ্যাল ফ্যাল করে শুধু তাকিয়ে রইলো এবং নিজের অসহায়ত্ব প্রকাশ করলো। ইতিমধ্যেই সাহাবায়ে কিরামের (রাযি.) মাঝে খবর ছড়িয়ে পড়লে তাঁরা সেখানে ছুটে এলেন। এখনই দু'সূরের বারটা বাজাবার উপযুক্ত সময়। কিন্তু দয়ার নবী সাল্লাল্লাহu আলাইহি ওয়া সাল্লাম ছিলেন ক্ষমা ও অনুগ্রহের মূর্ত প্রতীক। তিনি দু'সূরকে কিছুই বললেন না এবং তাকে কোনরূপ শাস্তিও দিলেন না বরং সম্পূর্ণ নিরাপত্তার সাথে তাকে ছেড়ে দিলেন।
নবীজী সাল্লাল্লাহu আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর এ আদর্শে বিমুগ্ধ হয়ে পরবর্তীতে দু'সূর তার দলবল ও গোত্রসহ এসে ইসলাম গ্রহণ করে নিয়েছিলেন। তিনি শামিল হয়েছিলেন স্বর্ণযুগের স্বর্ণ মানব হযরত সাহাবায়ে কিরামের (রাযি.) নূরানী কাফেলায়। তলোয়ার আর শক্তির প্রভাবে নয় এভাবে আদর্শ ও উদারতার স্নিগ্ধ-শীতল পরশেই প্রিয়নবী হযরত সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম গোটা বিশ্ব জয় করতে সক্ষম হয়েছিলেন। প্রমাণ করতে সক্ষম হয়েছিলেন তিনি মহান তিনিই অপ্রতিদ্বন্দী।
📄 অতিথি পরায়নতা
কয়েকজন ইয়াহুদী প্রিয় নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর দরবারে মেহমান হলো। তিনি সাহাবায়ে কিরামের (রাযি.) মাঝে দু'একজন করে মেহমান বণ্টন করে দিয়ে দিলেন। একজন ইয়াহুদী খুবই দুরাচার ছিলো বলে তাকে কেউ মেহমান হিসেবে গ্রহণ করতে চাইলো না। তাই তাকে প্রিয় নবী সাল্লাল্লাহu আলাইহি ওয়া সাল্লাম নিজের ঘরে মেহমান হিসেবে নিয়ে নিলেন। স্বভাব সুলভ ভাবে তিনি অত্যন্ত যত্নের সাথে লোকটির মেহমানদারী করলেন।
খাওয়ার সময় হলে সে লোকটি একাই বেশ কয়েকজনের খানা খেয়ে সাবাড় করে দিলো। এ জাতীয় দুরভীসন্ধী পূর্ব থেকেই তার মনের মাঝে লুকায়িত ছিলো। খাওয়া-দাওয়ার পর প্রিয় নবী সাল্লাল্লাহu আলাইহি ওয়া সাল্লাম সাধ্যমত উমদা বিছানায় তাকে শুইতে দিলেন। ঐ ইয়াহুদী দুরাচারের উদ্দেশ্য পূর্ব থেকেই খারাপ ছিলো। মাত্রাতিরিক্ত খাওয়ার কারণে তার পেটে গোলমাল দেখা দিলো, ফলে রাত্রে সে মলমূত্র দ্বারা বিছানা এবং কক্ষ নষ্ট করে সকাল হওয়ার পূর্বেই পালিয়ে গেলো।
কিন্তু মহান মাওলার মঞ্জুরী ছিলো অন্য কিছু। তিনি ঐ ইয়াহুদীকে প্রিয় নবী সাল্লাল্লাহu আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর সংস্পর্শের সুফল ভোগ করাতে চান। সামনের ঘটনা তারই প্রমাণ—যাওয়ার সময় ইয়াহুদী ভুল বশতঃ তার একটি মূল্যবান তরবারী প্রিয় নবী সাল্লাল্লাহu আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর কক্ষে ফেলে গেলো। কিছু দূর যাওয়ার পর তার তরবারীটির কথা স্মরণ হলে মূল্যবান তরবারীর মায়ায় সে পুনরায় ফিরে এলো। ফিরে আসার সময় সে যা কল্পনা করলো এবং পরে বাস্তবে যা দেখতে পেলো তাতেই ইয়াহুদীর জীবনের মোড় পরিবর্তনের সূচনা হলো।
ইয়াহুদী দেখলো প্রিয় নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম স্বয়ং নিজ হস্তে সে সব মলমূত্র পরিস্কার করছেন আর বলছেন আহ! লোকটির যেন কত কষ্ট হয়েছে। অতঃপর ঐ ইয়াহুদীকে দেখার সাথে সাথে নবীজী সাল্লাল্লাহu আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাকে বললেন, আহ! আমার ব্যবস্থাপনার ত্রুটির কারণে রাতে আপনার অনেক কষ্ট হয়েছে। আপনি তো আমার মেহমান ছিলেন। এ কষ্টের জন্য আমি দুঃখিত, আপনি আমাকে ক্ষমা করে দিন। আর আপনি যাওয়ার সময় আপনার তরবারীটি রেখে চলে গেছেন। একটু দাঁড়ান আমি আপনার তরবারীটি এনে দিচ্ছি বলেই নবীজী সাল্লাল্লাহu আলাইহি ওয়া সাল্লাম নিজ কক্ষ থেকে ইয়াহুদীর তরবারীটি এনে তার হাতে দিলেন।
লোকটি ভেবেছিলো, আমাকে দেখলেই মুহাম্মদ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) তেলে বেগুনে জ্বলে উঠবেন এবং আমার হয়তো বারটা বাজিয়ে ছাড়বেন। সে মনে মনে ঠিক করে রেখেছিলো, পরিস্থিতি খারাপ দেখলে দূর থেকেই পালিয়ে ভাগবে। কিন্তু এখানে এসে তার ধারণা সম্পূর্ণ ভুল প্রমাণিত হলো। সে সম্পূর্ণ অদ্ভূত আচরণ প্রত্যক্ষ করলো যা ছিলো তার কল্পনারও অনেক দূরে। মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর এ মোহনীয় আদর্শিক আচরণের প্রভাবে সে আর ইসলাম থেকে দূরে থাকতে পারলো না বরং নবী আদর্শের স্বর্ণ ছোঁয়ার সে পবিত্র ইসলাম গ্রহণের গৌরব অর্জন করলো। তাই তো আমরা বলি "তরোয়ারে নয় উদারতায়"। অর্থাৎ, তরবারীর শক্তির জোরে নয় বরং গোটা বিশ্বে ইসলাম প্রসারিত হয়েছে তার উদারনীতি ও মোহনীয় আদর্শের প্রভাবে।
📄 অনাড়ম্বরতা
প্রিয় নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর জীবন ছিলো সম্পূর্ণ অনাড়ম্বর। তিনি সাজ সজ্জা, আরাম-আয়েশ মোটেও পসন্দ করতেন না। নিজের অনুসারী ও পরিবারের কাউকেই তা গ্রহণ করতে দিতেন না, নিজেও যথেষ্ট সাদা-সিধা, আড়ম্বরহীন জীবন যাপন করতেন।
হযরত সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম একটি মোটা কম্বলে শুয়ে রাত যাপন করতেন। আম্মাজান হযরত আইশা সিদ্দীকা (রাযি.) দুই ভাজ করে সেটি মেঝেতে বিছিয়ে দিতেন। হযরত আইশা সিদ্দীকা (রাযি.) বলেন, একদিন আমি সে চাদরটি চার ভাজ করে বিছিয়ে দিলাম। সেদিন বিছানাটি একটু মোলায়েম হলো, তাতে শুইতে একটু আরাম হলো। প্রিয় নবী সাল্লাল্লাহu আলাইহি ওয়া সাল্লাম আরাম প্রিয় ছিলেন না। তিনি সকালে ঘুম থেকে উঠেই হযরত আইশা সিদ্দীকা (রাযি.) কে জিজ্ঞাসা করলেন, আজ আমার বিছানাটি কিভাবে বিছানো হয়েছিলো? হযরত আইশা সিদ্দীকা (রাযি.) জবাব দিলেন, এটি আজ চার ভাজ করে বিছিয়ে ছিলাম যাতে আপনার শুইতে একটু আরাম হয়। প্রিয় নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন, এভাবে বিছানোর প্রয়োজন নেই বরং পূর্বের ন্যায় দুইভাজ করেই চাদরটি বিছিয়ে দাও। কারণ গতরাতে বেশী আরামের কারণে আমার ইবাদতে বিঘ্ন সৃষ্টি হয়েছে।
অন্য এক দিনের কথা—প্রিয় হাবীব সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম কোন এক যুদ্ধ থেকে প্রত্যাবর্তন করছিলেন। হযরত ফাতিমা (রাযি.) এ খবর শুনে প্রিয় নবীজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর সম্মানার্থে ঘরের দরজায় একটি সুন্দর পর্দা ঝুলিয়ে দিলেন এবং হযরত হাসান (রাযি.) ও হুসাইন (রাযি.) দ্বয়কে রূপার কংকন পরিয়ে সাজালেন। প্রিয় নবী সাল্লাল্লাহu আলাইহি ওয়া সাল্লাম এ অবস্থা প্রত্যক্ষ করে তাৎক্ষনিক ভাবে তথা হতে প্রস্থান করলেন।
হযরত আইশা সিদ্দীকা (রাযি.) প্রিয় নবী সাল্লাল্লাহu আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর অসন্তুষ্টির কারণ বুঝতে পেরে সাথে সাথে পর্দাটি ছিঁড়ে ফেললেন এবং হযরত হাসান (রাযি.) ও হযরত হুসাইন (রাযি.) দ্বয়ের হাত থেকে কংকন খুলে ফেললেন। হযরত হাসান ও হযরত হুসাইন (রাযি.) কংকন খুলে নেয়ার কারণে কাঁদতে কাঁদতে নবীজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর দরবারে হাযির হলেন। তখন তিনি ইরশাদ করলেন, এরা আমার পরিবারের সদস্য আমি চাই না যে, এরা পার্থিব কোন সাজ সজ্জায় জড়িয়ে পড়ুক। এভাবেই হযরত সাল্লাল্লাহu আলাইহি ওয়া সাল্লাম নিজে এবং তাঁর অধিনস্থদের পার্থিব সাজসজ্জা থেকে বিরত রেখে অনাড়ম্বর জীবন যাপন অবলম্বন করেছেন। আড়ম্বরপূর্ণ ও বিলাসী জীবন যাপনে অভ্যস্ত প্রিয়নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর প্রিয় উম্মতেরা বিষয়টি ভেবে দেখবেন কি?