📘 নবী (ﷺ) জীবনের টুকরো কথা 📄 নম্রতা

📄 নম্রতা


ইয়াহুদী সম্প্রদায় এবং তাদের দোসররা আজীবন বেয়াদব। নবীজী সাল্লাল্লাহu আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর মত একজন নম্র ও পবিত্র মানবাত্মার সাথেও ওরা হাজারো রকমের বেয়াদবী মূলক আচরণ করেছে। আর সে সব ক্ষেত্রেও নবীজী সাল্লাল্লাহu আলাইহি ওয়া সাল্লাম অত্যন্ত নম্র ও ভদ্র আচরণ প্রদর্শন করেছেন। ধৈর্য্য ও আদর্শের স্বাক্ষর রেখেছেন।

এক দিনের কথা—এক ইয়াহুদী দুরাচার এলো প্রিয় নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর দরবারে। এসেই সে সালাম না দিয়ে বললো, "আস্সামু আলাইকুম” যার অর্থ তোমার মৃত্যু হোক। আম্মাজান হযরত আইশা সিদ্দীকা (রাযি.) সেখানে উপস্থিত ছিলেন। তিনি ইয়াহুদীর এহেন বেয়াদবী সহ্য করতে না পেরে তার জবাবে বললেন, তোমাদেরই মৃত্যু হোক এবং তোমাদের উপর অভিশাপ বর্ষিত হোক।

হযরত আইশা সিদ্দীকা (রাযি.)-এর এ উক্তি প্রিয় নবী সাল্লাল্লাহu আলাইহি ওয়া সাল্লাম পসন্দ করলেন না। তিনি বললেন, হে আইশা! মহান আল্লাহ অত্যন্ত দয়ালু এবং সকল ক্ষেত্রেই তিনি দয়ার আচরণ করা পসন্দ করেন। হযরত আইশা সিদ্দীকা (রাযি.) বলেন, আমি তখন আরয করলাম, ইয়া রাসূলাল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম! এ ইয়াহুদী আপনার প্রতি কি উক্তি করেছে আপনি কি তা শুনতে পাননি? হযরত সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম জবাব দিলেন, আমি তার সে উক্তি শুনিনি তা নয়। আমি তার চালাকীর জবাবে শুধু "ওয়া আলাইকা" বলে দিয়েছি, যার অর্থ তোমারও মৃত্যু আসবে।

এখানে লক্ষ্যনীয় বিষয় হচ্ছে, প্রিয় নবী সাল্লাল্লাহu আলাইহি ওয়া সাল্লাম সব জেনে শুনেও ইয়াহুদীর প্রতি কোন কঠোর আচরণ করলেন না, বরং তখনো তিনি অত্যন্ত বিনয়ী ও নম্রতা সুলভ ব্যবহার করে গেলেন। আম্মাজান হযরত আইশা সিদ্দীকা (রাযি.) কিছু বললেন বটে, কিন্তু নবীজী সাল্লাল্লাহu আলাইহি ওয়া সাল্লাম তা পসন্দ করলেন না। এটাই ছিলো প্রিয়নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর আদর্শ আর এই ছিলো নবীজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর নম্রতার একটি ক্ষুদ্র দৃষ্টান্ত।

📘 নবী (ﷺ) জীবনের টুকরো কথা 📄 সাম্য নীতি

📄 সাম্য নীতি


ইসলাম সাম্যের ধর্ম। প্রিয় নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ছিলেন সাম্যের মূর্ত প্রতীক। আর একারণে তাঁর চরম দুশমনরাও ন্যায় বিচার পাওয়ার আশায় তাঁর দরবারে মুকাদ্দমা নিয়ে হাযির হতো। মহানবী সাল্লাল্লাহu আলাইহি ওয়া সাল্লামও আপন-পর শত্রু-মিত্র নির্বিশেষে সকলের প্রতি ইনসাফ ও সাম্য নীতি প্রদর্শন করতেন। এক্ষেত্রে সাধারণ-বিশেষের পার্থক্য তিনি করতেন না। এমনি একটি টুকরো কাহিনী—

প্রিয় নবী সাল্লাল্লাহu আলাইহি ওয়া সাল্লাম হযরত আনাস (রাযি.)-এর ঘরে বসে আছেন। তার বাম পাশে বসে আছেন হযরত আবু বকর সিদ্দীক (রাযি.)। হযরত উমর (রাযি.) বসা ছিলেন নবীজী সাল্লাল্লাহu আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর সামনে। হযরত সাল্লাল্লাহu আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর ডান পার্শ্বে বসে আছে একজন গ্রাম্য সাধারণ লোক। এ অবস্থায় রাসূলে পাক সাল্লাল্লাহu আলাইহি ওয়া সাল্লাম হযরত আনাস (রাযি.)-এর কাছে একটু পানি চাইলেন। হযরত আনাস (রাযি.) তাঁকে কিছু দুধ এনে দিলেন।

প্রিয় নবী সাল্লাল্লাহu আলাইহি ওয়া সাল্লাম নিজে প্রথমে সে পাত্র থেকে কিছু দুধ পান করলেন। এরপর হযরত উমর (রাযি.) হযরত আবু বকর সিদ্দীক (রাযি.) কে বাকী দুধ পান করতে দেয়ার জন্য ইশারা করলেন। কারণ তাঁদের ধারণা ছিলো যে, হযরত সাল্লাল্লাহu আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর পান করার পর যে দুধ টুকু বাকী থাকবে তা প্রথমে তিনি হয়তো হযরত আবু বকর (রাযি.) কিংবা হযরত উমর (রাযি.) কেই দিবেন, যেহেতু এ মজলিসে প্রিয় নবী সাল্লাল্লাহu আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর পরে তাঁরা দু'জনই অধিক মর্যাদাবান ব্যক্তিত্ব। আর সে জন্য হযরত উমর (রাযি.) হযরত আবু বকর সিদ্দীক (রাযি.) এর প্রতি ইশারা করে বুঝালেন যে, তাঁকেই আগে পান করতে দিন এতে আমার কোন আপত্তি নেই।

কিন্তু প্রিয় নবীজী সাল্লাল্লাহu আলাইহি ওয়া সাল্লাম দু'জনের কাউকেই আগে পান করতে দিলেন না। বরং তিনি বললেন, যে ডান দিকে বসা থাকে তারই আগে পান করার হক। একথা বলে নবী সাল্লাল্লাহu আলাইহি ওয়া সাল্লাম দুধের পাত্রটি প্রথমে ঐ গ্রাম্য লোকটিকে দিলেন। সে পান করলো। এরপর হযরত আবু বকর সিদ্দীক (রাযি.) পান করলেন। অতঃপর হযরত উমর (রাযি.) পান করলেন।

এভাবেই প্রিয় নবী সাল্লাল্লাহu আলাইহি ওয়া সাল্লাম মানুষের মাঝে সাম্যনীতি প্রতিষ্ঠা করেছেন এবং তাদেরকে তাদের যথার্থ অধিকার দান করেছেন। সাধারণ-বিশেষ নির্বিশেষে এক্ষেত্রে সকলেই ছিলো সমান। আর এরই নাম হলো ইসলাম এটাই হচ্ছে ইসলামের আদর্শ আর এ মোহনীয় ও সমতাপূর্ণ আদর্শই ইসলামকে গোটা বিশ্বে ছড়িয়ে দিয়েছে। প্রমাণ করেছে ইসলামই হলো শ্রেষ্ঠ ও একমাত্র জীবন বিধান।

📘 নবী (ﷺ) জীবনের টুকরো কথা 📄 কর্ম পরায়নতা

📄 কর্ম পরায়নতা


মসজিদে নববীর নির্মান কাজ চলছে। সাহাবায়ে কিরাম (রাযি.) সকলেই নির্মান কাজে সাহায্য করছেন। প্রয়োজনীয় সামান-পত্র সংগ্রহ করে দিচ্ছেন। এ সময় নবীজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ও অকর্মণ্য বসে থাকতে পসন্দ করেননি বরং তিনি নিজেও ইট বালু বহন করে কাজে যোগান দিতে লাগলেন। সাহাবায়ে কিরাম (রাযি.) এ অবস্থা দেখে বিচলিত হয়ে বার বার প্রিয় নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে কাজ থেকে বিরত থাকতে অনুরোধ জানালেন। কিন্তু তিনি কোন ক্রমেই কাজে সহযোগিতা করা থেকে বিরত থাকলেন না।

অন্য এক দিনের কথা—সাহাবায়ে কিরাম (রাযি) কোথাও যাওয়ার সময় একস্থানে কাফেলার যাত্রা বিরতি করা হলো এবং সেখানে রান্না-বান্নার কাজ করার জন্য আয়োজন চলতে লাগলো। নিয়ম মাফিক সকলের মাঝে কাজ বন্টন করে দেয়া হলো এবং প্রত্যেকেই দায়িত্ব অনুযায়ী নিজ নিজ কাজ আঞ্জাম দিয়ে চললেন। কেউ পানি আনছেন, কেউ আগুন জ্বালাচ্ছেন, কেউ পাত্রসমূহ ধুয়ে প্রস্তুত করছেন। এ সময় প্রিয় নবী সাল্লাল্লাহu আলাইহি ওয়া সাল্লাম লাকড়ী সংগ্রহের কঠিন কাজটি নিজের দায়িত্বে নিলেন।

সাহাবায়ে কিরাম (রাযি.) অত্যন্ত বিনীত ভাবে প্রিয় নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর দরবারে অনুরোধ করলেন, ইয়া রাসূলাল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম! এ কাজটিও আমরাই সমাধা করবো, আপনাকে কষ্ট করতে হবে না। কিন্তু অত্যন্ত কর্মপরায়ন ও কঠিন পরিশ্রমী-কর্মঠ প্রিয় নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম জবাব দিলেন, তোমরা যা বলেছো তা তোমাদের হিসেবে ঠিকই বলেছো। কিন্তু তোমরা সকলে কাজ করবে আর আমি তোমাদের সাথে থাকা সত্ত্বেও হাতপা গুটিয়ে বসে থাকবো, এমনটি আমার মোটেও পসন্দ নয়। আর মূলতঃ এমন ব্যক্তিকে আল্লাহ পাকও পসন্দ করেন না।

এভাবেই আমাদের প্রিয় নবী সাল্লাল্লাহu আলাইহি ওয়া সাল্লাম সকলের সাথে সমান ভাবে কাজে অংশ গ্রহণ করতেন। নিজেকে বিশিষ্ট একজন ভেবে শান-শতকত নিয়ে বসে থাকা তিনি কোনদিনও পসন্দ করতেন না। অথচ মহান আল্লাহর পরেই তিনি মহান। দুনিয়া ও আখিরাতের তিনি বাদশাহ। বর্তমান সময়ের রাজা-বাদশাহ আর আমীর নেতারা মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর এ মহান আদর্শগত বিষয়টি ভেবে দেখবেন কি?

📘 নবী (ﷺ) জীবনের টুকরো কথা 📄 আল্লাহর প্রতি ভরসা

📄 আল্লাহর প্রতি ভরসা


ঐতিহাসিক গাতফান যুদ্ধের কথা। তথা হতে ফিরার পথে প্রিয় নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম একটি গাছের নিচে আরাম করছিলেন। সাহাবায়ে কিরাম (রাযি.) ছিলেন খানিকটা দূরে। এ অবস্থা দেখতে পেলো কাফির নেতা দু'সূর। সে নবীজী সাল্লাল্লাহu আলাইহি ওয়া সাল্লামকে একাকী দেখে এটাকে একটা সুযোগ মনে করলো। বিধায় সে সুযোগ হাত ছাড়া করতে চাইলো না দু'সূর।

টিপ টিপ করে গোপনে সে নবীজী সাল্লাল্লাহu আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর কাছে চলে এলো, হযরত সাল্লাল্লাহu আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর তলোয়ারটি তখন গাছের ডালে ঝুলানো ছিলো। চটকরে দু'সূর তলোয়ারটি নিজের হাতে নিয়ে নিলো আর অমনি তা উঁচিয়ে ধরলো প্রিয় নবী সাল্লাল্লাহu আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর দিকে। বললো মুহাম্মদ! (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) এখন আমার হাত থেকে তোমাকে কে রক্ষা করবে?

মহান আল্লাহ যাকে শত্রুদের হাত থেকে রক্ষা করার ওয়াদা করেছেন তাঁর আবার কিসের ভয়? নবীজী সাল্লাল্লাহu আলাইহি ওয়া সাল্লাম এ অবস্থায় সামান্যতমও বিচলিত হলেন না। বরং তিনি অত্যন্ত স্থির চিত্তে জবাব দিলেন, 'আল্লাহ'। প্রিয় নবী সাল্লাল্লাহu আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর এই একটি মাত্র শব্দ দু'সূর-এর মধ্যে দারুণ ভয়ের সঞ্চার করলো। তার সমস্ত শরীর আশ্চর্য কম্পন শুরু হয়ে গেলো। সে ভয়ে এতবেশী অস্থির হয়ে পড়লো যে, কাঁপতে কাঁপতে এক পর্যায়ে তার হাত হতে তরবারীটি ছুটে নিচে পড়ে গেলো।

রাসূলেপাক সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তার অবস্থা প্রত্যক্ষ করছিলেন। তলোয়ারটি নিচে পড়তেই তিনি পট করে তা উঠিয়ে হাতে নিলেন এবং দু'সূরের দিকে তা বাড়িয়ে ধরে বললেন, "বলো এবার আমার হাত থেকে তোমাকে কে রক্ষা করবে?" দু'সূর এবার হতভম্ব হয়ে ফ্যাল ফ্যাল করে শুধু তাকিয়ে রইলো এবং নিজের অসহায়ত্ব প্রকাশ করলো। ইতিমধ্যেই সাহাবায়ে কিরামের (রাযি.) মাঝে খবর ছড়িয়ে পড়লে তাঁরা সেখানে ছুটে এলেন। এখনই দু'সূরের বারটা বাজাবার উপযুক্ত সময়। কিন্তু দয়ার নবী সাল্লাল্লাহu আলাইহি ওয়া সাল্লাম ছিলেন ক্ষমা ও অনুগ্রহের মূর্ত প্রতীক। তিনি দু'সূরকে কিছুই বললেন না এবং তাকে কোনরূপ শাস্তিও দিলেন না বরং সম্পূর্ণ নিরাপত্তার সাথে তাকে ছেড়ে দিলেন।

নবীজী সাল্লাল্লাহu আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর এ আদর্শে বিমুগ্ধ হয়ে পরবর্তীতে দু'সূর তার দলবল ও গোত্রসহ এসে ইসলাম গ্রহণ করে নিয়েছিলেন। তিনি শামিল হয়েছিলেন স্বর্ণযুগের স্বর্ণ মানব হযরত সাহাবায়ে কিরামের (রাযি.) নূরানী কাফেলায়। তলোয়ার আর শক্তির প্রভাবে নয় এভাবে আদর্শ ও উদারতার স্নিগ্ধ-শীতল পরশেই প্রিয়নবী হযরত সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম গোটা বিশ্ব জয় করতে সক্ষম হয়েছিলেন। প্রমাণ করতে সক্ষম হয়েছিলেন তিনি মহান তিনিই অপ্রতিদ্বন্দী।

ফন্ট সাইজ
15px
17px