📘 নবী (ﷺ) জীবনের টুকরো কথা 📄 সহনশীলতা

📄 সহনশীলতা


সাফা পর্বতের পাদদেশে ধ্যানমগ্ন বিশ্ব নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম। ধূর্ত আবু জাহল যাচ্ছিলো সে পথ ধরে। নবীজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে দেখে গা জ্বলে উঠলো তার। সে নবীজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর প্রতি বিভিন্ন কটুবাক্য ব্যয় করে চললো। হযরত সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর ধৈর্য্যচ্যুতি ঘটাতে অনেক চেষ্টা করেও সে ব্যর্থ হলো। আবু জাহলের শত কটুক্তি সত্ত্বেও প্রিয় নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম কোন জবাব না দিয়ে সম্পূর্ণ নিঃশ্চুপ রইলেন।

কোন ভাবেই কিছু করতে না পেরে পাষণ্ড আবু জাহল প্রিয় নবী সাল্লাল্লাহu আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর নিস্পাপ ও নিস্কলঙ্ক মুবারক বদনে এক টুকরা পাথর ছুঁড়ে মারলো। পাথর খণ্ডটি নবীজী সাল্লাল্লাহu আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর পবিত্র মাথায় আঘাত হানলো আর অমনি ফিনকি দিয়ে রক্ত বেরোতে লাগলো। হযরত সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ছিলেন অত্যন্ত ত্যাগী। তিনি ছিলেন ধৈর্য্যের পর্বত। তিনি সবই নিরবে সয়ে গেলেন। এ ব্যাপারে তিনি কাউকেই কিছু বললেন না। অপরদিকে এ পুরো ঘটনাটিই দূর থেকে এক মহিলা প্রত্যক্ষ করলো। সে প্রিয় নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর চাচা হযরত হামযা (রাযি.) বাড়িতে এলে তাঁর কাছে সব বলে দিলো। (উল্লেখ্য যে, হযরত হামযা (রাযি.) তখনো ইসলাম গ্রহণ করেননি।)

নিজ ভাতিজার উপর এহেন অন্যায় আচরণ সহ্য করতে না পেরে তখনই তিনি আবু জাহলের খোঁজে বেরোলেন। আজ তিনি এ অন্যায় আচরণের প্রতিশোধ নিয়েই তবে ক্ষ্যান্ত হবেন। অল্পক্ষণের মধ্যেই তিনি আবু জাহলকে পেয়ে গেলেন। আর অমনি তার মাথায় আঘাত করে জখম করলেন এবং রক্ত বের করে দিলেন। এভাবে তাকে তিনি বেদম প্রহার করলেন। এরপর হযরত হামযা (রাযি.) প্রিয় নবী সাল্লাল্লাহu আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর কাছে এসে বললেন, ভাতিজা! এক্ষণে আমি আবু জাহলের মাথা জখম করে রক্ত বের করে দিয়ে তোমার প্রতি তার অন্যায় আচরণের প্রতিশোধ নিয়ে এলাম।

কিন্তু ত্যাগ ও ধৈর্য্যের মহিমায় ভাস্বর প্রিয় নবী সাল্লাল্লাহu আলাইহি ওয়া সাল্লাম স্নিগ্ধ কণ্ঠে জবাব দিলেন, চাচাজান! এ জাতীয় সংবাদ আমার জন্য কোন আনন্দের বিষয় নয়। এতে আমি সামান্যও আনন্দ পাইনি। তবে আমি যদি আপনার মুখে আপনার ইসলাম গ্রহণের কথা শুনতাম তবে তা আমার জন্য মহা আনন্দের বিষয় হতো।

বিবেকবানদের প্রিয় নবী সাল্লাল্লাহu আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর একথা ভেবে দেখা উচিৎ। কতটুকু ত্যাগী এবং ধৈর্য্যশীল হলে এহেন অন্যায় আচরণ নীরবে সহ্য করে নেয়া যায়? প্রতিশোধ গ্রহণের সুযোগ থাকা সত্ত্বেও কেমন সহ্য শক্তি থাকলে প্রতিশোধ গ্রহণে সম্পূর্ণ নিরুদ্যোগী থাকা যায়? শুধু কি তাই? প্রতিশোধ নেয়া হয়েছে শুনেও কতটুকু দরদী হলে এ মন্তব্য করা যায় যে, এতে আমার জন্য খুশির কিছুই নেই?

এটাই হচ্ছে আমাদের প্রিয় নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর উন্নত স্বভাব। এইতো আকায়ে নামদার, তাজদারে মদীনা হযরত রাসূলে আকরাম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর মোহনীয় আখলাক। অবশ্য নবীজী সাল্লাল্লাহu আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর সে কথা শুনে তাৎক্ষণিক ভাবে হযরত হামযা (রাযি.) ইসলাম গ্রহণ করেন এবং সকলকে তার ইসলাম গ্রহণের কথা জানিয়ে দেন। তার ইসলাম গ্রহণের পরেই অমুসলিম শক্তিগুলো ইসলামের একটি স্বতন্ত্র প্রভাব ও শক্তি আঁচ করতে পেরেছিলো।

📘 নবী (ﷺ) জীবনের টুকরো কথা 📄 নম্রতা

📄 নম্রতা


ইয়াহুদী সম্প্রদায় এবং তাদের দোসররা আজীবন বেয়াদব। নবীজী সাল্লাল্লাহu আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর মত একজন নম্র ও পবিত্র মানবাত্মার সাথেও ওরা হাজারো রকমের বেয়াদবী মূলক আচরণ করেছে। আর সে সব ক্ষেত্রেও নবীজী সাল্লাল্লাহu আলাইহি ওয়া সাল্লাম অত্যন্ত নম্র ও ভদ্র আচরণ প্রদর্শন করেছেন। ধৈর্য্য ও আদর্শের স্বাক্ষর রেখেছেন।

এক দিনের কথা—এক ইয়াহুদী দুরাচার এলো প্রিয় নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর দরবারে। এসেই সে সালাম না দিয়ে বললো, "আস্সামু আলাইকুম” যার অর্থ তোমার মৃত্যু হোক। আম্মাজান হযরত আইশা সিদ্দীকা (রাযি.) সেখানে উপস্থিত ছিলেন। তিনি ইয়াহুদীর এহেন বেয়াদবী সহ্য করতে না পেরে তার জবাবে বললেন, তোমাদেরই মৃত্যু হোক এবং তোমাদের উপর অভিশাপ বর্ষিত হোক।

হযরত আইশা সিদ্দীকা (রাযি.)-এর এ উক্তি প্রিয় নবী সাল্লাল্লাহu আলাইহি ওয়া সাল্লাম পসন্দ করলেন না। তিনি বললেন, হে আইশা! মহান আল্লাহ অত্যন্ত দয়ালু এবং সকল ক্ষেত্রেই তিনি দয়ার আচরণ করা পসন্দ করেন। হযরত আইশা সিদ্দীকা (রাযি.) বলেন, আমি তখন আরয করলাম, ইয়া রাসূলাল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম! এ ইয়াহুদী আপনার প্রতি কি উক্তি করেছে আপনি কি তা শুনতে পাননি? হযরত সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম জবাব দিলেন, আমি তার সে উক্তি শুনিনি তা নয়। আমি তার চালাকীর জবাবে শুধু "ওয়া আলাইকা" বলে দিয়েছি, যার অর্থ তোমারও মৃত্যু আসবে।

এখানে লক্ষ্যনীয় বিষয় হচ্ছে, প্রিয় নবী সাল্লাল্লাহu আলাইহি ওয়া সাল্লাম সব জেনে শুনেও ইয়াহুদীর প্রতি কোন কঠোর আচরণ করলেন না, বরং তখনো তিনি অত্যন্ত বিনয়ী ও নম্রতা সুলভ ব্যবহার করে গেলেন। আম্মাজান হযরত আইশা সিদ্দীকা (রাযি.) কিছু বললেন বটে, কিন্তু নবীজী সাল্লাল্লাহu আলাইহি ওয়া সাল্লাম তা পসন্দ করলেন না। এটাই ছিলো প্রিয়নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর আদর্শ আর এই ছিলো নবীজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর নম্রতার একটি ক্ষুদ্র দৃষ্টান্ত।

📘 নবী (ﷺ) জীবনের টুকরো কথা 📄 সাম্য নীতি

📄 সাম্য নীতি


ইসলাম সাম্যের ধর্ম। প্রিয় নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ছিলেন সাম্যের মূর্ত প্রতীক। আর একারণে তাঁর চরম দুশমনরাও ন্যায় বিচার পাওয়ার আশায় তাঁর দরবারে মুকাদ্দমা নিয়ে হাযির হতো। মহানবী সাল্লাল্লাহu আলাইহি ওয়া সাল্লামও আপন-পর শত্রু-মিত্র নির্বিশেষে সকলের প্রতি ইনসাফ ও সাম্য নীতি প্রদর্শন করতেন। এক্ষেত্রে সাধারণ-বিশেষের পার্থক্য তিনি করতেন না। এমনি একটি টুকরো কাহিনী—

প্রিয় নবী সাল্লাল্লাহu আলাইহি ওয়া সাল্লাম হযরত আনাস (রাযি.)-এর ঘরে বসে আছেন। তার বাম পাশে বসে আছেন হযরত আবু বকর সিদ্দীক (রাযি.)। হযরত উমর (রাযি.) বসা ছিলেন নবীজী সাল্লাল্লাহu আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর সামনে। হযরত সাল্লাল্লাহu আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর ডান পার্শ্বে বসে আছে একজন গ্রাম্য সাধারণ লোক। এ অবস্থায় রাসূলে পাক সাল্লাল্লাহu আলাইহি ওয়া সাল্লাম হযরত আনাস (রাযি.)-এর কাছে একটু পানি চাইলেন। হযরত আনাস (রাযি.) তাঁকে কিছু দুধ এনে দিলেন।

প্রিয় নবী সাল্লাল্লাহu আলাইহি ওয়া সাল্লাম নিজে প্রথমে সে পাত্র থেকে কিছু দুধ পান করলেন। এরপর হযরত উমর (রাযি.) হযরত আবু বকর সিদ্দীক (রাযি.) কে বাকী দুধ পান করতে দেয়ার জন্য ইশারা করলেন। কারণ তাঁদের ধারণা ছিলো যে, হযরত সাল্লাল্লাহu আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর পান করার পর যে দুধ টুকু বাকী থাকবে তা প্রথমে তিনি হয়তো হযরত আবু বকর (রাযি.) কিংবা হযরত উমর (রাযি.) কেই দিবেন, যেহেতু এ মজলিসে প্রিয় নবী সাল্লাল্লাহu আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর পরে তাঁরা দু'জনই অধিক মর্যাদাবান ব্যক্তিত্ব। আর সে জন্য হযরত উমর (রাযি.) হযরত আবু বকর সিদ্দীক (রাযি.) এর প্রতি ইশারা করে বুঝালেন যে, তাঁকেই আগে পান করতে দিন এতে আমার কোন আপত্তি নেই।

কিন্তু প্রিয় নবীজী সাল্লাল্লাহu আলাইহি ওয়া সাল্লাম দু'জনের কাউকেই আগে পান করতে দিলেন না। বরং তিনি বললেন, যে ডান দিকে বসা থাকে তারই আগে পান করার হক। একথা বলে নবী সাল্লাল্লাহu আলাইহি ওয়া সাল্লাম দুধের পাত্রটি প্রথমে ঐ গ্রাম্য লোকটিকে দিলেন। সে পান করলো। এরপর হযরত আবু বকর সিদ্দীক (রাযি.) পান করলেন। অতঃপর হযরত উমর (রাযি.) পান করলেন।

এভাবেই প্রিয় নবী সাল্লাল্লাহu আলাইহি ওয়া সাল্লাম মানুষের মাঝে সাম্যনীতি প্রতিষ্ঠা করেছেন এবং তাদেরকে তাদের যথার্থ অধিকার দান করেছেন। সাধারণ-বিশেষ নির্বিশেষে এক্ষেত্রে সকলেই ছিলো সমান। আর এরই নাম হলো ইসলাম এটাই হচ্ছে ইসলামের আদর্শ আর এ মোহনীয় ও সমতাপূর্ণ আদর্শই ইসলামকে গোটা বিশ্বে ছড়িয়ে দিয়েছে। প্রমাণ করেছে ইসলামই হলো শ্রেষ্ঠ ও একমাত্র জীবন বিধান।

📘 নবী (ﷺ) জীবনের টুকরো কথা 📄 কর্ম পরায়নতা

📄 কর্ম পরায়নতা


মসজিদে নববীর নির্মান কাজ চলছে। সাহাবায়ে কিরাম (রাযি.) সকলেই নির্মান কাজে সাহায্য করছেন। প্রয়োজনীয় সামান-পত্র সংগ্রহ করে দিচ্ছেন। এ সময় নবীজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ও অকর্মণ্য বসে থাকতে পসন্দ করেননি বরং তিনি নিজেও ইট বালু বহন করে কাজে যোগান দিতে লাগলেন। সাহাবায়ে কিরাম (রাযি.) এ অবস্থা দেখে বিচলিত হয়ে বার বার প্রিয় নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে কাজ থেকে বিরত থাকতে অনুরোধ জানালেন। কিন্তু তিনি কোন ক্রমেই কাজে সহযোগিতা করা থেকে বিরত থাকলেন না।

অন্য এক দিনের কথা—সাহাবায়ে কিরাম (রাযি) কোথাও যাওয়ার সময় একস্থানে কাফেলার যাত্রা বিরতি করা হলো এবং সেখানে রান্না-বান্নার কাজ করার জন্য আয়োজন চলতে লাগলো। নিয়ম মাফিক সকলের মাঝে কাজ বন্টন করে দেয়া হলো এবং প্রত্যেকেই দায়িত্ব অনুযায়ী নিজ নিজ কাজ আঞ্জাম দিয়ে চললেন। কেউ পানি আনছেন, কেউ আগুন জ্বালাচ্ছেন, কেউ পাত্রসমূহ ধুয়ে প্রস্তুত করছেন। এ সময় প্রিয় নবী সাল্লাল্লাহu আলাইহি ওয়া সাল্লাম লাকড়ী সংগ্রহের কঠিন কাজটি নিজের দায়িত্বে নিলেন।

সাহাবায়ে কিরাম (রাযি.) অত্যন্ত বিনীত ভাবে প্রিয় নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর দরবারে অনুরোধ করলেন, ইয়া রাসূলাল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম! এ কাজটিও আমরাই সমাধা করবো, আপনাকে কষ্ট করতে হবে না। কিন্তু অত্যন্ত কর্মপরায়ন ও কঠিন পরিশ্রমী-কর্মঠ প্রিয় নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম জবাব দিলেন, তোমরা যা বলেছো তা তোমাদের হিসেবে ঠিকই বলেছো। কিন্তু তোমরা সকলে কাজ করবে আর আমি তোমাদের সাথে থাকা সত্ত্বেও হাতপা গুটিয়ে বসে থাকবো, এমনটি আমার মোটেও পসন্দ নয়। আর মূলতঃ এমন ব্যক্তিকে আল্লাহ পাকও পসন্দ করেন না।

এভাবেই আমাদের প্রিয় নবী সাল্লাল্লাহu আলাইহি ওয়া সাল্লাম সকলের সাথে সমান ভাবে কাজে অংশ গ্রহণ করতেন। নিজেকে বিশিষ্ট একজন ভেবে শান-শতকত নিয়ে বসে থাকা তিনি কোনদিনও পসন্দ করতেন না। অথচ মহান আল্লাহর পরেই তিনি মহান। দুনিয়া ও আখিরাতের তিনি বাদশাহ। বর্তমান সময়ের রাজা-বাদশাহ আর আমীর নেতারা মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর এ মহান আদর্শগত বিষয়টি ভেবে দেখবেন কি?

ফন্ট সাইজ
15px
17px