📄 অনুকম্পা প্রদর্শন
প্রিয় নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম মসজিদে নববীতে বসে আছেন। সাথে রয়েছেন সাহাবায়ে কিরামের (রাযি.) এক জামা'আত। একটি লোক মসজিদে প্রবেশ করলো। লোকটি গ্রাম্য মূর্খ, মসজিদের পবিত্রতা সম্পর্কে তার কিছুই জানা নেই। তার পেশাবের প্রয়োজন দেখা দিলে মসজিদের মধ্যে দাঁড়িয়েই সে পেশাব করতে শুরু করলো।
এ অবস্থা দেখে সাহাবায়ে কিরাম (রাযি.) আশপাশ থেকে তেড়ে গিয়ে তাকে ধরতে চাইলেন। কিন্তু প্রিয় নবী, করুণার ছবি হযরত সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাদের বারণ করে বললেন, একে পেশাব করতে দাও!
পেশাব শেষে সাহাবায়ে কিরাম (রাযি.) তাকে প্রহার করে এ অন্যায়ের শাস্তি দিতে চাইলে নবীজী সাল্লাল্লাহu আলাইহি ওয়া সাল্লাম এবারও বারণ করলেন। তিনি লোকটিকে ডেকে সুন্দরভাবে, শান্ত কণ্ঠে মসজিদের পবিত্রতা সম্পর্কে বুঝিয়ে দিয়ে বললেন, এটি পেশাব করার জায়গা নয় বরং এটি হলো মহান আল্লাহ পাকের ইবাদত বন্দেগী করার জায়গা। এটি অত্যন্ত পবিত্র স্থান মসজিদ। এখানে পেশাব করা যায় না।
অতঃপর নবীজী সাল্লাল্লাহu আলাইহি ওয়া সাল্লাম সাহাবায়ে কিরাম (রাযি.) কে হুকুম করলেন, তোমরা এক বালতি পানি এনে এ স্থানটি ধুয়ে পরিষ্কার করে দাও। মহান আল্লাহ আমাদেরকে মানুষের প্রতি কঠোরতা প্রদর্শনের জন্য প্রেরণ করেননি বরং নম্র ও সহজ আচরণের জন্যই প্রেরণ করেছেন।
একদম নিজস্ব পরিবেশে, অপরাধীকে শাস্তি দেয়ার সম্পূর্ণ ক্ষমতা ও শক্তি থাকার পরও এ ধরণের অপরাধীকে এভাবে ক্ষমা প্রদর্শন করে তার প্রতি এহেন অনুকম্পা প্রদর্শনের দুর্লভ নযীর স্থাপন শুধু উত্তম আদর্শের মূর্তপ্রতীক প্রিয়নবী হযরত সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর দ্বারাই সম্ভব। ওহে মানবমণ্ডলী! শিক্ষাগ্রহণ কর।
📄 সঠিকপন্থা নিরূপন
সাহাবায়ে কিরাম (রাযি.) ছিলেন প্রিয় রাসূল সাল্লাল্লাহu আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর প্রেমানলের পতেঙ্গা তুল্য। দেশ বিদেশের প্রত্যন্ত অঞ্চল থেকে পঙ্গপালের ন্যায় ছুটে এসে যারা জড়ো হয়েছিলেন প্রিয় নবী সাল্লাল্লাহu আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর দরবারে।
একদিনের কথা—নবীজী সাল্লাল্লাহu আলাইহি ওয়া সাল্লাম অযু করছেন। সাহাবায়ে কিরাম (রাযি.) তাঁর চারপাশে জড়ো হয়ে দণ্ডায়মান। তাঁরা প্রিয় নবী সাল্লাল্লাহu আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর অঙ্গ নিঃসৃত পানি হাতে নিয়ে নিজেদের গায়ে মুছে দিচ্ছেন। নবীজী সাল্লাল্লাহu আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাদের জিজ্ঞাসা করলেন, তোমরা এরূপ করছো কেন? সকলে জবাব দিলেন, মহান আল্লাহ ও তদ্বীয় রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর প্রতি মহব্বতের কারণে।
এর প্রেক্ষিতে প্রিয় নবী হযরত সাল্লাল্লাহu আলাইহি ওয়া সাল্লাম ইরশাদ করলেন, যদি কেউ মহান আল্লাহ ও তার প্রিয় হাবীব সাল্লাল্লাহu আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর প্রতি মহব্বত করার আনন্দ লাভ করতে চায় তবে তার পদ্ধতি হবে—সে ব্যক্তি কথা বলার সময় যেনো সত্য কথা বলে এবং যথার্থ ভাবে আমানতদারী বজায় রাখে আর প্রতিবেশীর সাথে উত্তম আচরণ করে।
এখানে বিশেষভাবে লক্ষ্যনীয় বিষয় হচ্ছে, সাহাবায়ে কিরাম (রাযি.) নবীজী সাল্লাল্লাহu আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর প্রতি অগাধ ভক্তি শ্রদ্ধার বহিঃপ্রকাশ হিসেবে প্রিয় নবী সাল্লাল্লাহu আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর অঙ্গ নিঃসৃত পানি নিজেদের গায়ে মুছে দিচ্ছিলেন। যা ছিলো তাঁর প্রতি সাহাবায়ে কিরাম (রাযি.)-এর চূড়ান্ত ভালবাসার নিদর্শন। কিন্তু প্রিয় নবী সাল্লাল্লাহu আলাইহি ওয়া সাল্লাম কোন অনিয়মতান্ত্রিক ভক্তি শ্রদ্ধার বহিঃপ্রকাশ মেনে নিতে রাযী নন বিধায় তিনি তাদেরকে অত্যন্ত হিকমতের সাথে এ পদ্ধতি পরিহার করে সঠিক পদ্ধতি অবলম্বন করার পন্থা বাতলে দিলেন।
এজন্য আমাদের উচিৎ কারো প্রতি আন্তরিকতা ও ভক্তি শ্রদ্ধা প্রকাশ করতে গিয়ে যাতে এমন কোন পথ ও পন্থা গ্রহণ না করি, যা শুধু আবেগ উচ্ছাসের বহিঃপ্রকাশ—নিষ্ফল আচরণ মাত্র। যার ফলে শুধু অতি ভক্তিই প্রকাশ পায় এ ছাড়া কোন সার্থক ফলাফল সেখানে লাভ করা যায় না।
📄 ঝগড়ার হৃদ্যতা
প্রিয় রাসূল হযরত সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উম্মাহাতুল মুমিনীনগণের প্রতি অত্যন্ত স্নেহ ও মহব্বতের আচরণ করতেন। কখনো মহব্বতের কারণেই সামান্য গোস্বারও বহিঃপ্রকাশ ঘটতো। এমনি একদিনের কথা—
হযরত আইশা সিদ্দীকা (রাযি.) বলেন, আমার মধ্যে এবং রাসূলে পাক সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর মধ্যে একবার কোন এক ব্যাপারে মতের কিছুটা ভিন্নতা দেখা দিলো। নবীজী সাল্লাল্লাহu আলাইহি ওয়া সাল্লাম আমাকে বললেন, এজন্য কোন একজনকে সালিস নিয়োগ করা হোক, যে আমাদের মাঝে বিষয়টি মীমাংসা করে দিবে। অতঃপর নবীজী সাল্লাল্লাহu আলাইহি ওয়া সাল্লাম প্রথমে হযরত আবু উবাইদা (রাযি.)-এর নাম প্রস্তাব করলে আমি তাকে অধিক নরম বলে প্রত্যাখ্যান করলাম। এরপর তিনি হযরত উমর (রাযি.)-এর নাম উল্লেখ করলে আমি তাকে অত্যন্ত রাগী মানুষ বলে উপেক্ষা করলাম। শেষ পর্যায়ে তিনি আমার আব্বা হযরত আবু বকর (রাযি.)-এর নাম প্রস্তাব করলে আমি তাতে সম্মত হলাম।
এরপর প্রিয় নবী সাল্লাল্লাহu আলাইহি ওয়া সাল্লাম সংবাদ দিয়ে হযরত আবু বকর (রাযি.) কে হাযির করলেন এবং বললেন, আপনি আমাদের উভয়ের মাঝে মধ্যস্থতা করুন। হযরত আইশা (রাযি.) বলেন, এরই মাঝে আমি বলে উঠলাম, ইয়া রাসূলাল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম! আমার প্রতি যেন ইনসাফ করা হয়।
আমার একথা শুনেই আমার আব্বা হযরত আবু বকর (রাযি.) খুব রেগে গেলেন এবং বললেন, আল্লাহর নবী সম্পর্কে তোমার এহেন মন্তব্য! এই বলে তিনি আমাকে সজোরে এক চপেটাঘাত করলেন যার কারণে আমার নাক দিয়ে রক্ত বেরিয়ে পড়লো।
এ অবস্থা দেখে প্রিয় নবী সাল্লাল্লাহu আলাইহি ওয়া সাল্লাম খুব ব্যথা পেলেন। তিনি হযরত আবু বকর (রাযি.) কে লক্ষ্য করে বললেন, আমরা আপনাকে শুধু মধ্যস্থতা করার জন্যই ডেকেছি, কাউকে প্রহার করার জন্য নয়। এ বলে তিনি দ্রুত তাঁর পবিত্র চাদর দ্বারা আমার নাকে-মুখের রক্ত মুছে পরিষ্কার করে দিলেন। আহ! কত মায়াময় সে দৃশ্য, কত স্নেহ ও মাধুরতাপূর্ণ পরিবেশ। নিজ স্ত্রীর প্রতি রাগের মুহূর্তেও এহেন আচরণ করতে হলে কতটা উদার ও আদর্শবান হতে হয় সেটাই এখানে ভাববার বিষয়।
📄 সহনশীলতা
সাফা পর্বতের পাদদেশে ধ্যানমগ্ন বিশ্ব নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম। ধূর্ত আবু জাহল যাচ্ছিলো সে পথ ধরে। নবীজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে দেখে গা জ্বলে উঠলো তার। সে নবীজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর প্রতি বিভিন্ন কটুবাক্য ব্যয় করে চললো। হযরত সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর ধৈর্য্যচ্যুতি ঘটাতে অনেক চেষ্টা করেও সে ব্যর্থ হলো। আবু জাহলের শত কটুক্তি সত্ত্বেও প্রিয় নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম কোন জবাব না দিয়ে সম্পূর্ণ নিঃশ্চুপ রইলেন।
কোন ভাবেই কিছু করতে না পেরে পাষণ্ড আবু জাহল প্রিয় নবী সাল্লাল্লাহu আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর নিস্পাপ ও নিস্কলঙ্ক মুবারক বদনে এক টুকরা পাথর ছুঁড়ে মারলো। পাথর খণ্ডটি নবীজী সাল্লাল্লাহu আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর পবিত্র মাথায় আঘাত হানলো আর অমনি ফিনকি দিয়ে রক্ত বেরোতে লাগলো। হযরত সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ছিলেন অত্যন্ত ত্যাগী। তিনি ছিলেন ধৈর্য্যের পর্বত। তিনি সবই নিরবে সয়ে গেলেন। এ ব্যাপারে তিনি কাউকেই কিছু বললেন না। অপরদিকে এ পুরো ঘটনাটিই দূর থেকে এক মহিলা প্রত্যক্ষ করলো। সে প্রিয় নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর চাচা হযরত হামযা (রাযি.) বাড়িতে এলে তাঁর কাছে সব বলে দিলো। (উল্লেখ্য যে, হযরত হামযা (রাযি.) তখনো ইসলাম গ্রহণ করেননি।)
নিজ ভাতিজার উপর এহেন অন্যায় আচরণ সহ্য করতে না পেরে তখনই তিনি আবু জাহলের খোঁজে বেরোলেন। আজ তিনি এ অন্যায় আচরণের প্রতিশোধ নিয়েই তবে ক্ষ্যান্ত হবেন। অল্পক্ষণের মধ্যেই তিনি আবু জাহলকে পেয়ে গেলেন। আর অমনি তার মাথায় আঘাত করে জখম করলেন এবং রক্ত বের করে দিলেন। এভাবে তাকে তিনি বেদম প্রহার করলেন। এরপর হযরত হামযা (রাযি.) প্রিয় নবী সাল্লাল্লাহu আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর কাছে এসে বললেন, ভাতিজা! এক্ষণে আমি আবু জাহলের মাথা জখম করে রক্ত বের করে দিয়ে তোমার প্রতি তার অন্যায় আচরণের প্রতিশোধ নিয়ে এলাম।
কিন্তু ত্যাগ ও ধৈর্য্যের মহিমায় ভাস্বর প্রিয় নবী সাল্লাল্লাহu আলাইহি ওয়া সাল্লাম স্নিগ্ধ কণ্ঠে জবাব দিলেন, চাচাজান! এ জাতীয় সংবাদ আমার জন্য কোন আনন্দের বিষয় নয়। এতে আমি সামান্যও আনন্দ পাইনি। তবে আমি যদি আপনার মুখে আপনার ইসলাম গ্রহণের কথা শুনতাম তবে তা আমার জন্য মহা আনন্দের বিষয় হতো।
বিবেকবানদের প্রিয় নবী সাল্লাল্লাহu আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর একথা ভেবে দেখা উচিৎ। কতটুকু ত্যাগী এবং ধৈর্য্যশীল হলে এহেন অন্যায় আচরণ নীরবে সহ্য করে নেয়া যায়? প্রতিশোধ গ্রহণের সুযোগ থাকা সত্ত্বেও কেমন সহ্য শক্তি থাকলে প্রতিশোধ গ্রহণে সম্পূর্ণ নিরুদ্যোগী থাকা যায়? শুধু কি তাই? প্রতিশোধ নেয়া হয়েছে শুনেও কতটুকু দরদী হলে এ মন্তব্য করা যায় যে, এতে আমার জন্য খুশির কিছুই নেই?
এটাই হচ্ছে আমাদের প্রিয় নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর উন্নত স্বভাব। এইতো আকায়ে নামদার, তাজদারে মদীনা হযরত রাসূলে আকরাম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর মোহনীয় আখলাক। অবশ্য নবীজী সাল্লাল্লাহu আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর সে কথা শুনে তাৎক্ষণিক ভাবে হযরত হামযা (রাযি.) ইসলাম গ্রহণ করেন এবং সকলকে তার ইসলাম গ্রহণের কথা জানিয়ে দেন। তার ইসলাম গ্রহণের পরেই অমুসলিম শক্তিগুলো ইসলামের একটি স্বতন্ত্র প্রভাব ও শক্তি আঁচ করতে পেরেছিলো।